📄 মানবসেবা
ইসলাম সেবামূলক কাজের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ৫৮৯ ইসলামের পূর্বে পৃথিবীর কোনো ধর্মই ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি আইন প্রণয়ন করে গরীব, দুঃস্থ ও অনাথদের লালন এবং বিধবাদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেনি। ইসলামে তাদেরকে সহযোগিতা করা প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের জন্য অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। যারা ইয়াতীমের প্রতি সদাচরণ করে না, দুঃস্থদের খাদ্য দান করে না- এমন লোকদের কথা কোরআন মাজীদে এভাবে বর্ণিত হয়েছে- ۞أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ . فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُ الْيَتِيمَ . وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ المسكين তুমি কি এমন লোককে দেখেছো! যে দীনকে অস্বীকার করে। সে তো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়, আর সে মিসকীনদের খাবার দানে মানুষকে উৎসাহিত করেনা। ৫৯০
ইসলাম ঘোষণা দেয়, মানুষের সেবা করলে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি খুশি হন। মানুষকে নিয়েই তো আল্লাহর সব আয়োজন। এ দুনিয়ার সবকিছুই তিনি মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ৫৯১ নাবী-রাসূলগণ সকলেই এসেছিলেন মানুষের কল্যাণের জন্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الْخَلْقُ عِيَالُ الله .وَأَحَبُّ عِبَادِ اللَّهِ إِلَى اللَّهُ أَنْفَعُهُمْ لِعِيَالِهِ -"সৃষ্টিজীব হলো আল্লাহ প্রতিপাল্য স্বরূপ।
অতএব, যে ব্যক্তি সৃষ্টির প্রতি সর্বাধিক কল্যাণ করবে, সে-ই হচ্ছে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয়। "৫৯২
ইসলামের একজন অনুসারীর আল্লাহতে বিশ্বাস করার পর তার একটি প্রধান দায়িত্ব হলো- আল্লাহর বান্দাহদের অধিকার আদায় করা। আল্লাহ দয়ালু হিসেবে হয়তো স্বীয় প্রাপ্য ছেড়ে দিতে পারেন; কিন্তু মানুষের প্রাপ্য যদি কেউ আদায় না করে, তা আল্লাহ তা'আলা মা'ফ করবেন না, যতক্ষণ না ঐ বান্দাহ তা মা'ফ করে দেয়। বস্তুত আন্তরিকতার সাথে মানুষের অধিকারসমূহ আদায় করা মুসলিম জীবনের অপরিহার্য শর্ত। এ ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশ এতোই দৃঢ় যে, গৃহদ্বারে মানবেতর প্রাণী একটি কুকুরকে উপবাসী রেখে নিজে উদর পূর্ণ করে আহার গ্রহণ করা মুসলিমের জন্য না-জায়িয। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা ইয়াতীমের প্রতি বিরূপভাবাপন্ন, যারা ক্ষুধার্তকে অনুদানে বিমুখ এবং যারা প্রতিবেশির প্রতি উদাসীন, সে সকল 'ইবাদাতকারী অভিশপ্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ . وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ . فَكُ رَقَبَةٍ ، أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمِ ذِي مَسْغَبَةٍ . يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ (١٥) أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ
অতঃপর সে ধর্মের ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি জানেন কি, সে ঘাঁটি কি? তা হচ্ছে দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি অথবা দুর্ভিক্ষের সময় অন্ন দান ইয়াতীম আত্মীয়কে অথবা ধুলায়-ধসরিত মিসকীনকে। ৫৯৩
তিনি আরো বলেন,
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَأَتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ ...
সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে; বরং সৎ কাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, কিয়ামাত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নাবী-রাসূলের ওপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তারই মাহাব্বাতে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য। ৫৯৪
সমাজের প্রতিটি মানুষ অপরের কল্যাণের জন্য। পরস্পর পরস্পরকে আপদে- বিপদে সাহায্য করা ও সমবেদনা প্রকাশ করা আর্তমানবতার সেবার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য দিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ.
বিধবা রমণী ও গরীব-দুঃখীদের সেবাকারীদের মর্যাদা ও সম্মান আল্লাহর পথে জিহাদকারী অথবা রাতভর নামায আদায়কারী ও দিনভর রোযা পালনকারীর মর্যাদার সমপর্যায়ভুক্ত। ৫৯৫
অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেছেন,
مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرْجَ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةٌ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
যে ব্যক্তি আপন ভাইয়ের অভাব দূর করার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তা'আলা তার অভাব দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তা'আলাও কিয়ামাতের দিন তার একটি বিপদ দূর করে দেবেন। ৫৯৬
আর্তমানবতার সেবা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য সম্পাদনে আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর জীবনের সমগ্র দিকই সেবামূলক কাজে ভরপুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরকাছে সর্বপ্রথম যখন অহী আসে, তখন তিনি নিজের জীবনের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় উম্মুল মু'মিনীন খাদীজাতুল কুবরা (রা.) তাকে প্রবোধ দিয়ে বলেছিলেন,
كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكَلِّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ.
আল্লাহর শপথ! তিনি কখনই আপনাকে অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি নিজ আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, দুর্বল-দুঃখীদের সেবা করেন, বঞ্চিত ও অভাবীদেরকে উপার্জনক্ষম করেন, মেহমানদারী করেন এবং বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন। ৫৯৭
যে বুড়ী৫৮৮ শত্রুতা করে মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরপথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো, তার অসুস্থতার সময় তিনি তার সেবা করেছিলেন। যে মক্কাবাসী একদিন নিজ মাতৃভূমি থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, মাক্কা বিজয়ের পর তিনি • তাদেরকে ক্ষমা করে আবার আপন করে নিয়েছিলেন। দয়া ও সেবার যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শন করেছিলেন, তা পৃথিবীতে আর কেউ দেখাতে পারেনি। তাঁর সাহাবীগণও তাঁর এ আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন। আল্লাহর 'ইবাদাতের পরে মানবসেবাই ছিল তাঁদের মহান ব্রত। খিলাফাতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সাইয়িদুনা আবূ বাকর (রা.) কর্তৃক এক বৃদ্ধা রমণীর বকরীর দুধ দোহনের নিয়মিত দায়িত্ব পালন৫৯৯ এবং মদীনার শহরতলীর এক অন্ধ বুড়ীর বাড়িতে খিদমাতের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ভোরে নিয়মিতভাবে প্রতিযোগিতা দিয়ে সাইয়িদুনা আবূ বাকর ও উমার (রা.)-এর যাতায়ত৬০০ প্রভৃতি ঘটনা যুগে যুগে প্রত্যেক মুসলামানকে মানবসেবার প্রতি অনুপ্রেরণা দান করে থাকে।
টিকাঃ
৫৮৯. প্রত্যেক ধর্মেই মানব সেবার অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মমতে, কারো প্রতি হিংসা নয়; সকলের প্রতি করুণা ও ভালবাসা প্রদর্শন এবং সকলের সুখ কামনা করা একজন বৌদ্ধের অবশ্যই পালনীয় শর্ত। এ কারণে প্রত্যেক বৌদ্ধকে তার মনোভাব এভাবে প্রকাশ করতে হয়- "সবে সত্তা সুখীতা হন্ত" (অর্থাৎ সকল প্রাণি সুখী হোক)। বুদ্ধের মতে, নির্বাণ লাভ করতে হলে সর্বজীবে দয়া, মঙ্গল, প্রেম ও মৈত্রীর ভাব জাগিয়ে তুলতে হবে। তিনি বলেছেন: "মাতা যথা নিজং পুত্তং আয়ূসা এক পুত্তমনুরদখে এবম্পি সব্বভূতেসু মানুসম্ভাবয়ে অপরিমানং" অর্থাৎ মা যেমন নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েও পুত্রের প্রাণ রক্ষা করেন, সেইরূপ সকল প্রাণির প্রতি অসীম দয়াভাব জন্মাবে। (নীরুকুমার চাকমা, বুদ্ধঃ ধর্ম ও দর্শন, ঢাকা: অবসর প্রকাশনী, ১৯৯০, পৃ. ৪৪) তদুপরি বৌদ্ধ ধর্মমতে, 'দান পারমিতা' হল বুদ্ধত্ব লাভের অন্যতম উপায়। 'দান পারমিতা' হচ্ছে সকল প্রাণির মঙ্গলের জন্য নিজের সর্বস্ব এমনকি শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা সমস্ত শরীর নিঃস্বার্থভাবে দান করা এবং দানের ফল পরিত্যাগ করা। হিন্দু ধর্মেও পরোপকার ও দরিদ্রপালনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। ঋগ্বেদে রয়েছে, "অখ স্বপ্নস্য নির্বিদেহভুঞ্জতশ্চ রেবতঃ। উভা তা বশ্রি নশ্যতঃ।" অর্থাৎ আমি স্বপ্ন ঘৃণা করি আর যে ধনবান লোক পরকে প্রতিপালন করে না তাকেও ঘৃণা করি। উভয়ই শ্রীঘ্র নাশ প্রাপ্ত হয়। (ঋগ্বেদ, ১:১২০:১২) এ ধর্ম মতে, মানবসেবা কেবলমাত্র সামাজিক কর্তব্য বা পুণ্য কাজ নয়। এটা মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি বা ঈশ্বর-প্রাপ্তি সাধনার চরম সোপান। অর্থাৎ ধর্মের অন্যান্য অনুশাসন ও নিয়ম পালন করে সাধক দেবত্বের স্পর্শ লাভ করবার পরও মোক্ষ বা ভগবৎ প্রাপ্তির জন্য আরো কিছু বাকী থেকে যায়। তা হচ্ছে 'সর্বভূতহিত' সাধন। শ্রীরাম কৃষ্ণের মানসপুত্র স্বামীজী বলেন, "আত্মনং মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ" অর্থাৎ নিজের মোক্ষের জন্যই জগৎহিতের সাধনা করতে হবে। (বিবেকানন্দ রচনাবলী, খ. ৯,পৃ. ৪৮)
৫৯০. আল-কোরআন, সূরা মা'উন, ১০৭ : ১-৩
৫৯১. আল্লাহ তা'আলা বলেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ حَمِيعًا -"তিনিই সে সত্তা যিনি পৃথিবীর সকল কিছুকেই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।" (আল-কোরআন, সূরা আল-বাকারা, ২: ২৯) এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, এ জগতের সকল কিছুর আয়োজন মানুষের কল্যাণের জন্যই।
৫৯২. আবূ ইয়া'লা, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৩৩১৫, ৩৩৭০,৩৪৭৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, হা. নং: ৭৪৪৪
৫৯৩. আল-কোরআন, সূরা আল-বালাদ, ৯০: ১১-১৬
৫৯৪. আল-কোরআন, সূরা আল-বাকারা, ২: ১৭৭
৫৯৫. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আন-নাফাকাত), হা. নং: ৫০৩৮, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৬৬০; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৭৩৯৩
৫৯৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-মাযালিম), হা. নং: ২৩১০; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৪৩
৫৯৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: বাদ'উল ওয়াহ্ই), হা. নং:৩
৫৯৮. এখানে বুড়ী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আবু লাহবের স্ত্রী উম্মু জামীল আরওয়া বিনতু হারব ইবনি উমাইয়্যাহ। সে আল্লাহর রাসূলের যাতায়াতের পথে কাটা বিছিয়ে রাখতো। (বাইহাকী, দালা'য়িলুন নুবুওয়াত, খ. ২, পৃ. ৫৫, হা. নং: ৪৮৮) পবিত্র কোরআনে তাকে 'حمالة الحطب )কাঠ বহনকারিনী) বলা হয়েছে। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) বলেন, সে রাতের বেলা কাঁটা গাছের ডালপালা এনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরজায় ফেলে রাখতো। তাই তাকে কাঠ বহনকারিনী বলা হয়েছে। (মাওদূদী, তাফহীমুল কোরআন, খ. ১৯, পৃ. ৩০০)
৫৯৯. বর্ণিত আছে, খিলাফাত লাভের পূর্বে আবূ বাকর (রা.) পাড়ার বকরীগুলোর দুধ দোহন করে দিতেন। কিন্তু খিলাফাতের গুরুদায়িত্ব যখন তাঁর ওপর অর্পিত হয়, তখন এক মহিলা চিন্তায় পড়েন যে, কে তার বকরীর দুধ দোহন করে দেবে? এ দুশ্চিন্তার কথা আবূ বাকর (রা.) জানতে পেরে মহিলাকে বলে পাঠান, بَلَى، لَعَمْرِي لَأَخْلِبْنَهَا لَكُمْ، وَإِنِّي لَأَرْجُو أَنْ لَا يُغيِّرَنِي مَا دَخَلْتُ فِيْهِ عَنْ خُلُقٍ كُنْتُ عَلَيْهِ. "আমার জীবনের শপথ! আমি এখনো তোমাদের বকরীগুলোর দুধ দোহন করবো। আমার একান্ত আশা, খিলাফাতের দায়িত্ব আল্লাহর বান্দাদের সেবা থেকে আমাকে বিরত রাখবে না।" এর পর তিনি তাদের বকরীগুলোর দুধ দোহন করতেন। (ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ১৮৬; ইবনুল আসীর, আল-কামিল, খ. ১, পৃ. ৩৯৭, উসদুল গাবাহ, খ. ২, পৃ. ১৪৮; তাবারী, তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, খ. ২, পৃ. ২২১)
৬০০. ঘটনাটি হলো, আবু সালিহ আল-গিফারী (রা.) বলেন, মাদীনার শহরতলীতে এক অন্ধ বৃদ্ধা বাস করতেন। 'উমার (রা.) প্রতিদিন ভোরে গিয়ে তার প্রয়োজনীয় খিদমাত আঞ্জাম দিয়ে আসতেন। কিন্তু কয়েক দিন পর তিনি অনুভব করলেন যে, তাঁর পূর্বে কেউ এসে বৃদ্ধার খিদমাত আঞ্জাম দিয়ে যান। লোকটিকে চেনার জন্য 'উমার (রা.) দারুনভাবে উদগ্রীব হয়ে পড়েন। তাই রহস্য উন্মোচন করার জন্য একদিন খুব ভোরে ওঠে তিনি সেখানে যান। গিয়ে দেখেন, খালীফা আবূ বাকর (রা.) তার সেবা-যত্ন সেরে বেরিয়ে আসছেন। 'উমার (রা.) খালীফাকে সম্বোধন করে বলে ওঠেন, ات هو لعمري - "আমার জীবন আপনার জন্য কুরবান হোক! হে খালীফাতুর রাসূল, তবে কি আপনিই প্রতিদিন আমার পূর্বে এসে বৃদ্ধার বিদমাত করে যান!" (ইবনুল আসীর, আল-কামিল, খ. ১, পৃ. ৩৯৭)
📄 সাদাকাহ ও দিন্দ্র জীবন যাপন (যুহ্দ)
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্য হলো- সরল, সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন। ইসলামের দৃষ্টিতে এ পার্থিব জীবন হলো আল্লাহ প্রদত্ত একটি বড় নি'মাত এবং একে ন্যায়ানুগভাবে ভোগ করতে কোনো অসুবিধা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা প্রশংসনীয়ও। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ، عَلَيْهِ نِعْمَةً، فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ.
আল্লাহ তা'আলা যাকে কোনো নি'মাত দান করেন, নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন যে, যেন তাঁর দেওয়া সে নি'মাতের নিদর্শন তাঁর বান্দাহর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।৬০ ১
তবে এ জীবন ভোগ করার ক্ষেত্রে সরলতা ও অনাড়ম্বরতাই ইসলামে একান্ত কাম্য। কৃত্রিম আচরণ ও জীবন যাপন এবং বড় মানুষী ও অহঙ্কার প্রদর্শন ইসলাম মোটেও সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إن .الْبَذَادَةَ مِنَ الإِيمَانِ "সরলতা ও সাদাসিধে জীবন যাপন হলো ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।”৬০২ সাইয়িদুনা 'উমার (রা.) বলেন, تهينًا عَنْ التَّكَلُّفِ - "আমাদেরকে কৃত্রিম আচরণ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।”৬০৩
উল্লেখ্য যে, যার অন্তরে আল্লাহর ভয় স্থায়ী ও সুদৃঢ় হয়, তার নিকট পার্থিব জগত একটি মূল্যহীন বস্তুতে পরিণত হয় এবং এ দুনিয়া ও তার সুখ-সম্ভোগের প্রতি তার আগ্রহ লোপ পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর খালীফা ও সাহাবীগণ (রা.) অত্যন্ত সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। এ দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব, ভোগ-বিলাস, মান-মর্যাদা ও আসবাবপত্রের প্রতি তাঁদের না ছিল কোনো লোভ, না ছিল কোনো আগ্রহ। অনাড়ম্বর পোশাক-পরিচ্ছদ, সাধারণ খাদ্য, জাঁকজমকহীন মামুলি বাড়ি-ঘর, সাদাসিধে ও গরীবানা জীবন যাপন ছিল তাঁদের জীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্য। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এ দুনিয়াটা তাঁদের আসল আবাসস্থল নয়; এটা একটা সরাইখানা অর্থাৎ একজন মুসাফিরের ক্ষণকালের বিশ্রামস্থল মাত্র। কাজেই একজন মুসাফির সফরের জন্য যে সাদামাটা ও একান্ত প্রয়োজনীয় রসদপত্র সংগ্রহ করে, ঠিক সে ধরনের রসদপত্রই দুনিয়ায় বসবাসের জন্য যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ- “দুনিয়ায় তুমি বসবাস করো এমন নিরাসক্তভাবে, যেন তুমি একজন প্রবাসী কিংবা পথিক।”৬০৪ দুজাহানের সর্দার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট এ বলে দু'আ করতেন,
اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مِسْكِينًا، وَأَمِتْنِي مِسْكِينًا، وَاحْشُرْنِي فِي زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- “হে আল্লাহ! আমাকে মিসকীনরূপে জীবিত রাখুন! মিসকীনরূপে মৃত্যু দান করুন এবং কিয়ামাতের দিনে মিসকীনদের দলেই আমার হাশর করুন!”৬০৫
তাঁর বিছানা ছিল খেজুর পাতার চাটাই। একদিন ঘুম থেকে জাগলেন। কাছেই ছিলেন প্রিয় সাহাবী 'উমার (রা.)। চেয়ে দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসারা পিঠে খেজুর পাতার দাগ পড়ে আছে। রোম পারস্যের বেদীন বাদশাহরা কতো আড়ম্বরের জীবন কাটায় আর আখিরী নবী সাইয়িদুল মুরসালীন এতো কষ্টে জীবন যাপন করবেন- এসব ভেবেই হয়তো প্রিয়নবীর জন্য একটু কোমল বিছানা তৈরির অনুমতি চাইলেন 'উমার (রা.)। কিন্তু সাইয়িদুল মুরসালীন এই বলে বারণ করলেন যে,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا مَا مَثَلِي وَمَثَلُ الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِب سَارَ فِي يَوْمٍ صَائِفِ فَاسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ سَاعَةً مِنْ نَهَارِ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا.
দুনিয়ার প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। দুনিয়ায় আমার একমাত্র উদাহরণ হলো ঐ উষ্ট্রারোহী, যে গ্রীষ্মের দিনে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, অতঃপর তা ছেড়ে চলে যায়। ৬০৬
আরেক দিনের ঘটনা। দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দিয়ে আদুরের দুলালী ফাতিমা (রা.)-এর গৃহপ্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হঠাৎ দেখতে পেলেন ফাতিমা (রা.)-এর গৃহদ্বারে একটি রঙিন পর্দা ঝুলছে। নবী- নন্দিনী ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে ইতঃপূর্বে কখনো আড়ম্বরের কিছু দেখা যায়নি।
মূলত আজ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরআগমন উপলক্ষেই এমনটি করা হয়েছিল। এ মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো ভাবলেন, এই আরবে এখনো কতো দুঃখী-দরিদ্র মানুষের রোনাজারি। কতো বুভুক্ষের ক্রন্দন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চিন্তায় অধীর সারাক্ষণ, আর তাঁর দুলালীর দ্বারে রঙিন পর্দা ঝুলবে! চোখেমুখে ক্রোধের ছাপ নিয়ে এবার সেখান থেকেই ফিরে এলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ওদিকে খাতুনে জান্নাত সাইয়িদা ফাতিমা (রা.)-এর মনে সীমাহীন উৎকণ্ঠা। অতঃপর আলী (রা.) খবর নিয়ে এসে জানালো, নবী-নন্দিনীর এ সামান্য বিলাসিতাটুকুও নবীজীর পছন্দ নয়। তৎক্ষণাৎ তিনি ক্ষমা চেয়ে সংবাদ পাঠিয়ে দিলেন যে, আব্বাজানকে বলো, তিনি যেন তাঁর ইচ্ছানুযায়ী দুঃখী-দরিদ্রদেরকে দান করে দেন। ৬০৭
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসাহাবীগণের মধ্যেও কেউ কেউ অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও ধনৈশ্বর্যের মালিক হওয়া সত্ত্বেও চলাফেরা করতেন একজন মামুলি লোকের মতো। আবূ বাকর (রা.) ছিলেন এরূপ একজন মহান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরহীন, অত্যন্ত সহজ-সরল। তিনি প্রায় এ বলে দু'আ করতেন, اللَّهُمَّ ابْسُطُ لِي الدُّنْيَا وَزَهُدْنِى فَيْهَا - “হে আল্লাহ, দুনিয়া আমার জন্য প্রশস্ত করে দাও। কিন্তু এর ঘূর্ণাবর্তে নিমগ্ন ও আসক্ত হওয়া থেকে আমাকে রক্ষা করো। ”৬০৮ তাঁর খিলাফাত কালেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মুসলিমরা জয় লাভ করে। এতদসত্ত্বেও তাঁর অনাড়ম্বর জীবন যাপনের প্রতি আগ্রহের অবস্থা এই ছিলো যে, তিনি নিজে পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করা পছন্দ করতেন। খালীফা হওয়ার পরও তিনি কিছু দিন সংসারের খরচের জন্য বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। রাজকোষ থেকে সামান্য ভাতা নিতেন। মুসলিম বিশ্বের খালীফা হয়েও তিনি জাতীয় সম্পদ ভোগ করার ব্যাপারে যে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, তা সর্বকালের মানুষের আদর্শ হয়ে থাকবে।
একবার তাঁর স্ত্রীর হালুয়া খাওয়ার সাধ জাগলো। তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা স্বামীকে জানালে তিনি উত্তরে বলেন, "তা কেনার মতো সামর্থ্য আমার নেই।" স্ত্রী বললেন, "আচ্ছা! আপনি প্রতি দিনের খরচের জন্য আমাকে যা কিছু দিয়ে থাকেন, তা থেকে আমি কিছু কিছু সঞ্চয় করে হালুয়ার মূল্য সংগ্রহ করবো।"
আবূ বাক্স (রা.) বললেন, আচ্ছা, তা করো। কয়েকদিনের মধ্যে হালুয়ার অর্থ সংগৃহীত হয়ে গেলো। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আবূ বাক্স (রা.) বললেন, "এটা তো আমাদের খাদ্যের উদ্বৃত্ত অংশ।" অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে, কিছু অর্থ হ্রাস করলেও আমাদের প্রতিদিনের ব্যয় নির্বাহ হতে পারে। তাই প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্থ তাঁর স্ত্রী জমা করেছিল, সে পরিমাণ অর্থ তিনি ভাতা থেকে হ্রাস করে দেন। আর ইতোমধ্যে তাঁর স্ত্রী হালুয়ার জন্য যে অর্থ জমা করেছিল, তাও তিনি রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। "৬০৯
আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) লোকদেরকে এক সাথে নানা সুস্বাদু খাবার গ্রহণ করা থেকে বারণ করতেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, এভাবে লোকেরা নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে লেগে যাবে, ভালো ভালো খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে এবং এর জন্য বাড়াবাড়ি ও কৃত্রিম আচরণ শুরু করে দেবে।৬১০
সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) জাঁকজমক পছন্দ করতেন না। নিজে কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মুসলিম জাহানের খালীফা হয়েও তিনি সংসারের কাজ নিজেই করতেন। তাঁর সহধর্মিণী ফাতিমাতুয যাহরা (রা.) নিজের হাতে যাঁতা পিষে গম গুঁড়ো করতেন। তাঁর কোনো দাসদাসী ছিল না।
এ হলো প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার ও খালীফাগণের সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের কয়েকটি সাধারণ দৃষ্টান্ত। আজকের পৃথিবীতে আমাদের নিকট এসব কথা গল্পের মতোই মনে হবে। কারণ এ যুগের ক্ষমতাশীল ও তাদের পরিবারবর্গের পক্ষে এসব বিষয়ের কল্পনাও যেন কষ্টকর।
টিকাঃ
৬০ ১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৯৯৩৪
৬০২. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আত-তাজ্জল), হা. নং: ৪১৬৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১১৮
৬০৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ই'তিসাম), হা. নং: ৬৮৬৩
৬০৪. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আর-রিকাক), হা. নং: ৬০৫৩; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩৩৩
৬০৫. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩৫২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১২৬
৬০৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২৭৪৪
৬০৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-হিবাহ), হা. নং: ২৪৭১। পূর্ণ হাদীসটি হলো- عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْتَ فَاطِمَةً فَلَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهَا وَجَاءَ عَلِيٌّ فَذَكَرَتْ لَهُ ذَلِكَ فَذَكَرَهُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنِّي رَأَيْتُ عَلَى بَابِهَا سِتْرًا مَوْشِيًّا فَقَالَ مَا لِي وَلِلدُّنْيَا فَأَتَاهَا عَلِيٌّ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهَا فَقَالَتْ لِيَأْمُرْنِي فِيهِ بِمَا شَاءَ قَالَ تَرْسِيلُ بِهِ إِلَى فُلَانٍ أَهْلِ بَيْتٍ بِهِمْ حَاجَةٌ.
৬০৮. দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ৭০; হাক্কী, রূহুল বায়ান, খ. ৫, পৃ. ৩৩০ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও প্রায় অনুরূপ দু'আ বর্ণিত রয়েছে। (দ্র. তাবারানী, আদ-দু'আ, হা. নং: ১৪৪৯)
৬০৯. ইবনুল আসীর, আল-কামিল, খ. ১,পৃ. ৩৯৭
৬১০. 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার সাইয়িদুনা 'উমার (রা.)-এর নিকট খবর পৌছে যে, ইয়াযীদ ইবুন আবী সুষ্ঠুয়ান (রা.) নানা আইটেমের খাবার খান। এ খবর জানার পর 'উমার (রা.) তাঁর গোলাম ইয়ারফা' (রা.) কে বললেন, যখন তুমি জানতে পারবে যে, রাতে তাঁর খাবার পৌঁছে গেছে, তখন তুমি আমাকে অবহিত করবে। অতএব, যখন রাতে ইয়াযীদ (রা.)-এর নিকট তাঁর খাবার পৌঁছলো, তখন ইয়ারফা' 'উমার (রা.)কে অবহিত করলো। এরপর 'উমার (রা.) তাঁর বাড়িতে এসে প্রথমে সালাম করলেন, তারপর বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ইয়াযীদ (রা.) তাঁকে অনুমতি দিলেন এবং তিনি বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। এ অবস্থায় প্রথম খাবার আসলো রুটি-গোস্ত। 'উমার (রা.) তাঁর সাথে বসে খেলেন। এরপর ভুনা গোশত আনা হলো। ইয়াযীদ (রা.) খাবার জন্য হাত বাড়ালেন। এমতাবস্থায় 'উমার (রা.) তাঁকে বারণ করলেন এবং বললেন,
والله يا يزيد بن أبي سفيان أطعام بعد طعام والذي نفس عمر بيده لأن خالفتم عن سنتهم ليخالفن بكم عن طريقتهم. "ইয়াযীদ! এক খাবারের সাথে দ্বিতীয় খাবার! আল্লাহর কসম, যদি তোমরা লোকদের সাধারণ রীতির অনুসরণ না করো, তবে লোকেরাও তোমাদের রীতি অনুসরণ করে একপর্যায়ে নিজেদের রীতি ছেড়ে দেবে।” (ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ, হা.নং:৫৭৮; 'আলী আল-হিন্দী, কানযুল 'উম্মাল, হা.নং: ৩৫৯২১)
📄 আত্মসমালেচনা করা (মুহাসাবাহ)
আত্মশুদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য একটি কার্যকর ও উপকারী ব্যবস্থা হলো আত্মসমালোচনা। মানুষ যখন সদিচ্ছা নিয়ে নিজের নাফসের অবস্থা ও কার্যকলাপ নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে, তখন তার পক্ষে আর মন্দ পথে বা অন্যায় কাজে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ থাকে না। কেননা, যখন সে নিজের নাফসকে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ভৎর্সনা ও শাসন করবে, তখন সে নাফস বাজে পথে ও অন্যায় কাজে জড়িত হওয়ার জন্য আর প্রেরণা যোগাবে না। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে নিজের নাফসের হিসাব-নিকাশ নেয়ার জন্য তাগাদা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ﴿ - "প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনা করা উচিত যে, কাল কিয়ামাতের দিনের জন্য সে কি পাথেয় সংগ্রহ করছে।”৬১১ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللهِ.
বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি, যে নিজের নাফসের সমালোচনা করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সাফল্যের জন্য 'আমাল করে। আর নির্বোধ বা অক্ষম ঐ ব্যক্তি যে নিজের নাফসের কামনা-বাসনার অনুকরণ করে চলে এবং আল্লাহর নিকট বড় বড় আশা পোষণ করে। ৬১২
আমীরুল মু'মিনীন উমার (রা.) বলেন,
حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا، وَزِنُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُوزَنُوا ، وَتَزَيَّنُوا لِلْعَرْضِ الْأَكْبَرِ وَإِنَّمَا يَخِفُ الْحِسَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى مَنْ حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا.
(কিয়ামতের দিন) তোমাদের 'আমালের হিসাব নেয়ার আগে তোমরা নিজেরা নিজেদের নাফসের হিসাব-নিকাশ করো ৬১৩ এবং তোমাদের 'আমালগুলো পরিমাপ করার আগে তোমরা নিজেরা নিজেদের নাফসকে মাপো। অধিকন্তু, (সে দিনে) 'আমালের বড় হিসাবের জন্য সুন্দররূপে প্রস্তুত হও। কেননা, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিজেই নিজের নাফসের হিসাব-নিকাশ করবে, কিয়ামাতের দিন তার হিসাব-নিকাশ সহজ হবে। ৬১৪
মাইমূন ইবনু মিহরান [৩৭-১১৭] (রা.) বলেন, لَا يَكُونُ الْعَبْدُ تَقِيًّا حَتَّى يُحَاسِبَ نَفْسَهُ كَمَا يُحَاسِبُ شَرِيكَهُ مِنْ أَيْنَ مَطْعَمُهُ وَمَلْبَسُهُ.
না, যে যাবত না সে নিজের নাফসের হিসাব নেয়, যেমন সে নিজের অংশীদারের হিসাব নিয়ে থাকে যে, তার খাবার কোথেকে এলো, তার পোশাক কিভাবে সংগৃহীত হলো।”৬১৫
উল্লেখ্য, মানুষ আত্মসমালোচনার এ প্রেরণা আল্লাহর ভয় থেকে লাভ করে থাকে। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহকে যতো বেশি ভয় করে, তার মধ্যে আত্মসমালোচনার মনোবৃত্তিও ততো বেশি পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়। তারীকাতের শাইখগণ মানুষের নাফস ও কর্মজীবনকে পরিশুদ্ধ করতে মুহাসাবা ও মু'আতাবাহ অর্থাৎ আত্মসমালোচনা ও আত্মভৎর্সনার তালীম দেন। বলাই বাহুল্য, এ আত্মসমালোচনা দিনে-রাতে যতো বেশি করা যায়, ততোই ভালো। অন্তত প্রতি দিন শেষে শোয়ার সময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে কাজগুলো করা হয়েছে তার পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এ সময় চিন্তা করা উচিত, দিনে যে কাজগুলো করা হয়েছে এবং করা হয়নি- তা যথার্থ ও সঠিক হয়েছে কি-না, যদি যথার্থ ও সঠিক হয়, তা হলে তার জন্য আল্লাহর শুকর আদায় করা উচিত। যদি তা যথার্থ ও সঠিক না হয়, তা হলে কি কারণে এমন হলো- তা খোঁজে বের করা দরকার এবং এর জন্য নাফসকে ভৎর্সনা করা উচিত।
মুহাসাবাহর অন্য একটি প্রকরণ হলো- মনের মধ্যে কোনো কাজ করার ইচ্ছা জাগ্রত হবার সময় চিন্তা-ভাবনা করে দেখা যে, কাজটি ভালো না-কি মন্দ? যদি ভালো হয়, তাহলে তা কি আজই সম্পাদন করা উত্তম হবে, না-কি আজ তা থেকে বিরত থাকা উত্তম হবে? যদি তা আজ সম্পাদন করা উত্তম হয়, তা হলে চিন্তা করতে হবে, তা করার পেছনে উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, না-কি কেবল পার্থিব স্বার্থ লাভই উদ্দেশ্য? যদি চিন্তা-ভাবনার পর মন সাক্ষ্য দেয় যে, তা ভালো ও তার জন্য উপকারী এবং তা আজই সম্পন্ন করা প্রয়োজন, অধিকন্তু এর পেছনে উদ্দেশ্যও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, তবেই কাজটি সম্পাদন করতে তৎপর হতে হবে। অন্যথায় কাজটি করা থেকে বিরত থাকতে হকে। বলাই বাহুল্য, এরূপ চিন্তা-ভাবনা প্রতিটি কাজের আগেই কাজের চিন্তা জাগ্রত হবার শুরুতেই করতে পারলে ভালো। বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.) বলেন,
رَحِمَ اللهُ عَبْدًا وقف عِنْدَ هَمِّهِ ، فَإِنَّهُ لَيْسَ مِنْ عَبْدٍ يَعْمَلُ حَتَّى يَهُمْ ، فَإِنْ كَانَ خَيْرًا أَمْضَاهُ ، وَإِنْ كَانَ شَرًّا كَفَّ عَنْهُ.
আল্লাহ তা'আলা সে বান্দাহর প্রতি রাহমাত করুন, যে তার ইচ্ছার কাছে থেমে যায়! (অর্থাৎ ইচ্ছা জাগ্রত হবার পর সে তা দ্রুত বাস্তবায়নে নেমে পড়ে না; বরং চিন্তা-ভাবনা করে দেখে।) কেননা, প্রত্যেক বান্দাহই কাজের শুরুতে ইচ্ছা করে, তারপর কাজে অবতীর্ণ হয়। যদি চিন্তাভাবনা করে জানতে পারে যে, কাজটি ভালো, তবেই সে তা কার্যকর করে, আর যদি জানতে পারে যে, তা খারাপ, তবে সে বিরত থাকে। ৬১৬
যদি প্রতিটি কাজের শুরুতে এরূপ চিন্তা-ভাবনা করা না যায়, তা হলে অন্তত প্রত্যেক দিন সকালে ওঠে ফাজরের নামায শেষ করে কিছুক্ষণ বসে এভাবে চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে যে, তার আজ কি কি কাজ করার দরকার আছে এবং এ কাজ ও দায়িত্বগুলোর গুরুত্ব কতোটুকু? তন্মধ্যে কোনটি ভালো ও উপকারী এবং কোনটি অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক? কোনটি আল্লাহর জন্য এবং কোনটি কেবল পার্থিব উদ্দেশ্যে? এ সব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নাফসকে এভাবে উপদেশ দেয়া যেতে পারে যে, তুমি আজ অমুক অমুক কাজ করবে, অমুক অমুক কাজ থেকে বিরত থাকবে। সারা দিন এ উপদেশসমূহ মেনে চলবে। সূফীগণের পরিভাষায় নাফসকে প্রত্যহ দৈনন্দিন কার্যকলাপ সম্পর্কে পরামর্শ দান করাকে (المشارطة )মুশারাতাহ) বলা হয়। ৬১৭
টিকাঃ
৬১১. আল-কোরআন, সূরা আল-হাশর, ৫৯: ১৮
৬১২. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৬০
৬১৩. আবূ বাকর আস-সিদ্দীক (রা.) থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত রয়েছে। (দীনাউরী, আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল 'উলূম, হা. নং: ১২৯০)
৬১৪. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৫৬০০
৬১৫. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯
৬১৬. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, (কালামুল হাসান আল-বাসরী রাহ.) হা. নং: ৩৬৩৩৫ কোনো কোনো রিওয়ায়াতে আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.)-এর বক্তব্যের শেষাংশটি এভাবে এসেছে .فَإِنْ كَانَ لِلَّهِ عَزَّ وَحَلْ مَضَى، وَإِنْ كَانَ لِغَيْرِ اللَّهُ أَمْسَكَ ........ যদি জানতে পারে যে, কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হবে, তবেই সে তা কার্যকর করে, আর যদি জানতে পারে যে, তা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো উদ্দেশ্যে হবে, তবে সে তা থেকে বিরত থাকে।" (বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৭: মু'আলাজাতু কুল্লি যানবিন বিত-তাওবাহ, হা. নং: ৬৮৯৪)
৬১৭. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৯৪
📄 নাফসকে শাস্তি দান (বিশেষ মুজাহাদাহ)
যদি কখনো কোনো গুনাহ বা অন্যায় কাজ সংঘটিত হয় অথবা কোনো ভালো কাজ ছুটে যায় এবং তাওবাহ ও ভৎর্সনা দ্বারা কাজ না হয়; বরং তা পুনঃ পুনঃ সংঘটিত হতে থাকে, তা হলে নাফসের জন্য কিছু শিক্ষামূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেমন- প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও সুস্থতার প্রতি খেয়াল রেখে অতিরিক্ত বিশ্রাম ও পানাহার ত্যাগ করা, অতিরিক্ত সাজসজ্জা ত্যাগ করা, মানুষের সাথে একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত মেলামেশা পরিহার করা, নিজের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক বা আর্থিক কোনো দায়িত্ব (যেমন- নাফল নামায, নাফল রোযা, নাফল সাদাকাহ) আরোপ করা বা নিজের ওপর শারীরিক কোনো হালকা দণ্ড চাপানো, শারীরিকভাবে গরীব-মিসকীনদের খিদমাত ও সেবা করা এবং নিজের অতীতের অসহায়ত্ব ও দুর্দশার কথা বর্ণনা করা প্রভৃতি। নাফসের দোষ-ত্রুটি সংশোধনের জন্য চিকিৎসাস্বরূপ এ প্রকৃতির যে সব 'আমাল করা হয়, সূফীদের পরিভাষায় এগুলোকে 'মুজাহাদাহ' বলা হয়। কেননা, এতেও নাফস দলিত হয় এবং প্রকৃত মুজাহাদাহর প্রশিক্ষণ ও তাকে অভ্যাসে পরিণত করার ক্ষেত্রে এ কাজের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সালাফে সালিহীনের 'আমালের মধ্যেও এভাবে নাফসকে শাস্তি দেওয়ার ও দলিত করার নজীর খোঁজে পাওয়া যায়। নিম্নে এরূপ কাজের কয়েকটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করা হলো-
উম্মুল মু'মিনীন হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে বিছানায় আরাম করতেন, সেটি ছিলো চটের। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেটিকে দ্বিগুণ করে দিতাম। তিনি তার ওপর বিশ্রাম করতেন। এক রাতে আমি সেটিকে আরো দ্বিগুণ করে মোট চারপাট করে বিছিয়ে দিলাম, যাতে তিনি আরো বেশি প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। সকাল বেলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, مَا فَرَشْتُمْ لِيَ اللَّيْلَةَ؟ -"আজ রাতে তুমি আমার জন্য কী বিছিয়েছিলে?" আমি আরয করলাম, هُوَ فِرَاشُكَ إِلَّا أَنَّا .ثَنَيْنَاهُ بأربع ثَنْيَاتٍ ، قُلْنَا : هُوَ أَوْطَأَ لَكَ "সে পুরাতন বিছানাটিই। আমি শুধু তাকে চার ভাঁজ করে দিয়েছিলাম। মনে করলাম, এটা আপনার জন্য অধিক আরামপ্রদ হবে।" তিনি বলেন, رُدُّوهُ لِحَالَتِهِ الْأُولَى ، فَإِنَّهُ مَنَعَتْنِي وَطَاءَتُهُ صَلَاتِي : اللَّيْلَ-"ওটিকে পূর্বেকার মতো করে দাও। কেননা, সে বিছানার কোমলতা আজ রাতে আমাকে নামায থেকে বিরত রেখেছে। "৬১৮
আসলাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার 'উমার আল-ফারুক (রা.) খালীফা আবূ বাক্স আস-সিদ্দীক (রা.)-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে দেখেন, তিনি স্বীয় জিহ্বা ধরে টানছেন। তা দেখে 'উমার (রা.) আরয করলেন, مَهْ ، يَغْفِرُ الله لَكَ-" আপনি এ কি করছেন? ছেড়ে দিন! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন!" উত্তরে খালীফা আবু বাক্স (রা.) বললেন, .إِنْ هَذَا أَوْرَدَنِي الْمَوَارِدَ “এ জিহ্বা আমাকে অনেক বিপদে ফেলেছে। "৬১৯
'উমার আল-মাখযূমী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) তাঁর এক বক্তব্যে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরওপর সালাত ও সালাম পাঠ করে সমবেত লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, أَيُّهَا النَّاسُ : لَقَدْ رَأَيْتُنِي أَرْعَى عَلَى خَالاتٍ لِي مِنْ بَنِي مَحْزُومٍ ، فَيَقْبِضْنَ لِي الْقَبْضَةَ مِنَ التَّمْرِ أَو الرَّبِيبِ ، فَأَظَلَّ يَوْمِي وَأَيُّ يَوْمٍ . হে জনমণ্ডলী, আমি সে যুগও দেখেছি যে, যখন আমি বানু মাখযূমে আমার খালাদের বকরী চরাতাম। তারা এর বিনিময়ে আমাকে এক মুষ্টি খেজুর আর কিসমিস দিতো। আমি তা দিয়ে সারা দিন কাটিয়ে দিতাম। সে এক করুণ সময় ছিলো।
বক্তব্য শেষে 'আবদুর রাহমান ইবনু 'আউফ (রা.) তাঁকে সম্বোধন করে বললেন, يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ ! ما زدت على أن قئمت نَفْسَكَ - يَعْنِي : عِبْتَ -
হে আমীরুল মু'মিনীন, আজ তো আপনি নিজের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই বললেন না। তিনি উত্তর দিলেন,
وَيْحَكَ يَا ابْنَ عَوْفٍ ! إِنِّي خَلَوْتُ ؛ فَحَدَّثَتْنِي نفسي ؛ قال : أَنْتَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ ؛ فَمَنْ ذَا أَفْضَلُ مِنْكَ ؟ فَأَرَدْتُ أَنْ أُعَرِّفَهَا نَفْسَهَا.
হে ইবনু 'আউফ, ধিক তোমাকে! আমি একাকী ছিলাম। এ সময় আমার মন আমাকে বলে, তুমি তো আজ আমীরুল মু'মিনীন! মুসলিমদের মধ্যে তোমার চাইতে শ্রেষ্ঠ কে হবে? তাই আমি ইচ্ছা করেছি, স্বীয় নাফসকে দলিত করবো এবং তাকে আমার পূর্বের অবস্থা জানাবো। ৬২০
উপর্যুক্ত রিওয়ায়াতসমূহ থেকে নাফসের নিয়ন্ত্রণ ও শারী'আতের বিধি-নিষেধ পালনে নাফসকে অভ্যস্ত করার উদ্দেশ্যে নাফসের জন্য কিছু শিক্ষামূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা যায়। তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, যাতে এ কাজে কোনোরূপ সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করা না হয়। যেমন- হালালকে হারামে পরিণত করা, বিয়ে-শাদী ত্যাগ করা, প্রয়োজনীয় পানাহার, বিশ্রাম ও সাজসজ্জা পরিহার করা, পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরাফেরা করা, নিভৃতে 'ইবাদাতের উদ্দেশ্যে লোকালয় ছেড়ে চলে যাওয়া এবং অরুচিকর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করা প্রভৃতি। সনাতন হিন্দু ও খ্রিস্ট প্রভৃতি ধর্মে সাধনার নামে এ সব কাজ প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ইসলামী শারী'আতে এ সব কাজ সমর্থনযোগ্য নয়।
টিকাঃ
৬১৮. তিরমিযী, আশ-শামা'য়িল, হা. নং:৩২৯; বাগাভী, আল-আনওয়ারু ফী শামা'য়িলিন নাবী, হা. নং: ৮৩৫
৬১৯. মালিক, আল-মুওয়াত্তা, হা. নং: ৩৬২১; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৪: হিফযুল লিসান), হা. নং:৪৫৯৬, ৪৬৩৬
৬২০. দীনাউরী, আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল 'ইলম, হা. নং: ১৬৮২; 'আলাউদ্দীন আল-মুত্তাকী, কানযুল 'উম্মাল, হা. নং: ৩৫৯৯২