📄 মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তা
মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তাও আত্মশুদ্ধি, আত্মিক শক্তি ও নৈতিক উৎকর্ষ লাভের অন্যতম ব্যবস্থা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দুনিয়াই মু'মিনের কর্মস্থল এবং সবকিছু তাকে এখানেই করতে হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে বিশ্বাস করে যে, এ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় সে যা কিছু করে, তা এখানেই শেষ হয়ে যায় না; বরং এ দুনিয়ার পর আরো একটি জগত রয়েছে, যা স্থায়ী এবং যেখানে তাকে তার প্রত্যেকটি কাজের জন্য হিসাব দিতে হবে এবং এর জন্য তাকে ভালো কি মন্দ ফল ভোগ করতে হবে। এ বিশ্বাস যতো সুদৃঢ় হবে এবং এ চিন্তা বেশি সময় ধরে স্থায়ী হবে, ততোই তার অনুভব-মনন, কথা, কর্ম ও আচার-আচরণের মধ্যে এ বিশ্বাস ও চিন্তার প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। কোনো মু'মিনের অন্তরে যখন এ বিশ্বাস প্রগাঢ় হয়, তখন সে এ দুনিয়ায় যা কিছু করে, তা বস্তুতপক্ষে এ দুনিয়ার সাফল্য লাভের জন্য করে না; বরং আখিরাতের জন্য করে এবং দুনিয়ার ফলাফলের দিকে তার লক্ষ্য থাকে না; বরং তার লক্ষ্য থাকে আখিরাতের ফলাফলের প্রতি। যে সব কাজ আখিরাতে লাভজনক সেসব সে করে এবং যে কাজের ফলে আখিরাতে কোনো লাভ হবে না বা ক্ষতি হবে, সেগুলো সে বর্জন করে চলে। তার অন্ত রজুড়ে বিরাজ করে একমাত্র আখিরাতের সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং শান্তি ও পুরস্কারের চিন্তা। এর মুকাবিলায় দুনিয়ার কোনো শান্তি ও পুরস্কারের গুরুত্ব তার কাছে থাকে না। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে নানাভাবে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ ও আখিরাতে সাফল্য লাভের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ “ পার্থিব সুখ-সম্ভোগের প্রতি মোহভঙ্গকারী মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো।”৫৭৮ তিনি আরো বলেন, الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ "বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি, যে নিজের নাফসের সমালোচনা করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সাফল্যের জন্য 'আমাল করে। "৫৭৯ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ أَكْيْسَ النَّاسِ أَكْثَرُهُمْ لِلْمَوْتِ ذِكْرًا، وَأَحْسَنُهُمْ لِلْمَوْتِ اسْتِعْدَادًا - "সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমান লোক হলো যে ব্যক্তি সকলের চাইতে বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এবং মৃত্যুর জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করে।”৫৮০
দীর্ঘদিন গুনাহ করার কারণে অন্তরের মধ্যে যে গাফলাতি, কাঠিন্য ও রুচিবিকৃতির সৃষ্টি হয়, তা দূরীভূত করার একটি প্রধান ব্যবস্থা হলো বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ هَذِهِ الْقُلُوبَ تَصْدَأُ ، كَا .يَصْدَأُ الْحَدِيدُ إِذَا أَصَابَهُ الْمَاءِ -"এ অন্তরগুলোতে মরিচা ধরে যেমন লোহায় মরিচা ধরে যখন তাতে পানি লাগে।" সাহাবীগণ আরয করলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا جَلَاؤُهَا ؟- "ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা পরিষ্কার করার উপায় কী?” তিনি জবাব দিলেন, কَثرَةُ ذِكْرِ الْمَوْتِ وَتِلَاوَةُ الْقُرْآنِ. - "বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা ও কোরআন তিলাওয়াত করা।”৫৮১ উল্লেখ্য যে, ইসলামে কবর যিয়ারাতের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ এবং দুনিয়ার প্রতি নির্মোহভাব সৃষ্টি।
মানুষ যখন কার দেখতে পায় এবং স্মরণ করে, যে জীবনে সে আনন্দ-ভোগ-বিলাসে মত্ত, সে জীবন অচিরেই ফুরিয়ে যাবে, তাকে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করতেই হবে, অতঃপর কবরের সংকীর্ণতা ও তার কঠিন শাস্তি নিয়ে চিন্তা করে এবং ভবিষ্যতের কঠোর হিসাব ও জবাবদিহিতার চিত্র হৃদয়পটে ভেসে ওঠে, তখন অবশ্যই তার অন্তর পরকালের ভয়ে একান্তই নরম ও বিগলিত হয়ে যাবে, যা তার বাকী জীবনের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের একান্ত পাথেয় রূপে কাজ করবে। সাইয়িদুনা আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইhi ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنِّي نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَرُورُوهَا فَإِنَّ .فِيهَا عِبْرَة - "আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারাত করা থেকে নিষেধ করতাম। এখন তোমরা কবর যিয়ারাত করো। কেননা যিয়ারাতের মধ্যে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উপকরণ রয়েছে।”৫৮২ বর্ণিত রয়েছে যে, বিশিষ্ট তাবি'ঈ রাবী' ইবনু খায়সাম (রাহ.) যখনই কোনোরূপ গাফলাতি অনুভব করতেন, তখন তিনি কবরের দিকে চলে যেতেন এবং কাঁদতেন ও বলতেন যে, আমরাও ছিলাম, তোমরাও ছিলে! এভাবে পুরো রাত সেখানে কেটে দিতেন। সকালে যেন তাঁকে কবর থেকে বের করা হতো। ৫৮৩ এ কারণেই অনেক 'আলিমই বলেছেন, অন্তরের জন্য- বিশেষ করে যখন তা কঠোর হয়ে যায়- কবর যিয়ারাতের চেয়ে অধিক উপকারী আর কিছুই নেই। জনৈক ব্যক্তি ইমাম আহমাদ (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করলো, كَيْفَ يَرقُ قلبي ؟-"কিভাবে আমার অন্তর বিনম্র হবে? তিনি জবাব দিলেন, .اَدْخُلْ الْمَقْبَرَةَ - “তুমি কবরস্থানে গমন করো।”৫৮৪
টিকাঃ
১৩১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩০৭; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৫৮
৫৭৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৬০
৫৮০. হাইসামী, বুগইয়াতুল বাহিস.., বাব: যিকরুল মাওত, হা. নং: ১১১৬-৭; তাবারানী (রাহ.) ও অন্য একটি সূত্রে সামান্য শব্দগত পরিবর্তন হাদীসটি তাঁর মু'জামসমূহে উল্লেখ করেছেন। (দ্র. আল-মুজামুস সাগীর, হা. নং: ১০০৮, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ২১০৩: আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ১৩৬৩৬)
৫৮১. কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ১১৭৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৯: তা'যীমুল কোরআন), হা. নং: ১৮৫৯ এ হাদীসটি দা'ঈফ। (আবুল ফাদল আল-'ইরাকী, আল-মুগনী 'আন হামলিল আসফার, খ. ১, পৃ. ২২২, হা. নং: ৮৬৬)
৫৮২. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১০৯০১। এ হাদীসটি সাহীহ।
৫৮৩. 'আলী মাহফুয, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৮
৫৮৪. ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ. ৩,পৃ. ৩৪৬; মিরদাভী, আল-ইনসাফ, খ. ৪,পৃ. ৩৭৭
📄 যালিম, দুরাচারী ও আল্লাহদ্রোহী শক্তির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না রাখা
যালিম, দুরাচারী ও মুনাফিকদের সাথে অবাধ সংশ্রব, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব নিজের ও মিল্লাতের ধ্বংসের একটি প্রধান উপলক্ষ ও সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا أَبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ. قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبُّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ )
হে মু'মিনগণ! তোমরা নিজেদের পিতা ও ভাইদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমানের পরিবর্তে কুফরকে ভালোবাসে। আর তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা একান্তই সীমালঙ্ঘনকারী। (হে রাসূল,) আপনি বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান- সন্ততি, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন- সম্পদ, তোমাদের ব্যবসায়- যা অচল হয়ে যাওয়ার ভয় করো- এবং তোমাদের বাসস্থান- যাকে তোমরা পছন্দ করো- আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ তা'আলা ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। ৫৮৫
বলাই বাহুল্য, পবিত্র কোরআন ও হাদীসে নানাভাবে পিতামাতা, ভাইবোন ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উপর্যুক্ত আয়াতে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক সম্পর্কেরই একেকটি সীমা আছে এবং এ সকল সম্পর্ক- তা পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয়- স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব- যার বেলায় হোক, দীন ও শারী'আতের প্রশ্নে বাদ দেয়ার উপযুক্ত। অর্থাৎ আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সকল সম্পর্কের ওপর দীন ও শারী'আতের সম্পর্ক অগ্রগণ্য। যে ক্ষেত্রে এ দু সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, সেখানে আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ককে জলাঞ্জলি দিতে হবে। উম্মাতের শ্রেষ্ঠ জামা'আত সাহাবা কিরাম (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মূলে রয়েছে তাঁদের এ ত্যাগ ও কুরবানী। তাঁরা সর্বক্ষেত্রে ও সর্বাবস্থায় দীন ও শারী'আতের সম্পর্ককেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। অপরদিকে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসের মূলে রয়েছে অসত্য ও অন্যায়ের সাথে তাদের আপোষকামিতা এবং দুরাচারী ও যালিমদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। উল্লেখ্য যে, এটিই ছিল বানু ইসরা'ঈলের ধ্বংসের একটি প্রধান কারণ। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَمَّا وَقَعَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ فِي الْمَعَاصِي نَهَتْهُمْ عُلَمَاؤُهُمْ فَلَمْ يَنْتَهُوا فَجَالَسُوهُمْ فِي مَجَالِسِهِمْ وَوَاكَلُوهُمْ وَشَارَبُوهُمْ فَضَرَبَ اللهُ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ بِبَعْضٍ وَلَعَنَهُمْ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ﴿ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ ).
বানী ইসরা'ইল যখন পাপাচারে লিপ্ত হলো, তখন তাদের 'আলিমরা (শুরুতে) তাদের নিষেধ করেছিল। কিন্তু তারা তাঁদের কথায় পাপাচার থেকে বিরত থাকলো না। এরপর 'আলিমরা পাপাচারীদের মাজলিসে অংশগ্রহণ করতে লাগলো এবং তাদের সাথে একত্রে বসে খানা-পিনা করতে লাগলো। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদের পরস্পরের অন্তরগুলোর মধ্যে সাযুজ্য তৈরি করে দিলেন। উপরন্তু, দা'উদ ও ঈসা ইবনু মারইয়াম 'আলাইহিমাস সালামের মুখে তিনি তাদের অভিসম্পাত করেছেন। এর কারণ হলো- তারা অবাধ্যতা করতো এবং সীমা লঙ্ঘন করতো। ৫৮৬
আজকাল মুসলিমদের মধ্যে সাধারণ লোকদের কথা তো বলাই বাহুল্য; বেশিরভাগ 'আলিম ও শাইখ যালিম, দুরাচারী ও মুনাফিকদের সাথে কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করেই চলেন, তা নয়; বরং তাঁদের অনেকেই যালিম ও দুরাচারী শাসকদের দান ও উপহার গ্রহণ করেই জীবন নির্বাহ করেন এবং এ প্রবণতা তাঁদের মাঝে ক্রমশ বেড়েই চলছে। এটা দীনের 'আলিম ও শাইখগণের চরিত্রের একটি নতুন দিক। বস্তুতপক্ষে যালিম ও দুরাচারী শাসকদের দান ও উপহার একটি ফিতনা। এটা নৈতিক চরিত্রকে ঘুনের মতো খেয়ে ফেলে, কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেয় এবং প্রতিভাকে করে দেয় অবদমিত। আমাদের সালাফে সালিহীন এবং যুগে যুগে ইসলামের নিষ্ঠাবান সংস্কারক ও তাকওয়ার অধিকারী ব্যক্তিগণ কখনো এ জাতীয় লোকদের দান ও হাদিয়া-তুহফা গ্রহণ করতেন না।
বর্ণিত রয়েছে, তাউস ইবনু কায়সান [৩৩-১০৬হি.) (রাহ.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবি'ঈ, ফাকীহ ও মুহাদ্দিস। তিনি ইয়ামানে বসবাস করতেন। শাসক ও ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহের প্রতি তাঁর ছিল প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা। একবার তিনি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বাহ [৩৪-১১৪হি.) (রাহ.)-এর সাথে হাজ্জাজ ইবনু ইউসূফের ভাই মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফের কাছে যান। তখন শীতকাল ছিল। এ সময় মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফ তাউস (রাহ.)-এর শরীরে একটি চাদর পরিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি চাদরটি শরীর থেকে ফেলে দিলেন। এতে মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফ রাগে ফুলতে থাকে। কিন্তু তাউস (রাহ.) এর কোনোই পারওয়া করলেন না। সেখান থেকে বিদায়ের পর ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বাহ (রাহ.) বললেন,
والله إن كنت لغنيا أن تغضبه علينا لو أخذت الطيلسان فبعته وأعطيت ثمنه المساكين.
আল্লাহর কাসাম! চাদর আপনার প্রয়োজন না থাকলেও মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফের রাগ থেকে লোকদের বাঁচানোর জন্য তখন চাদরটা গায়ে রেখে দেয়াটাই ভালো ছিল। পরে তা বিক্রি করে মিসকীনদের মধ্যে তার মূল্য বণ্টন করে দিতে পারতেন।
তাউস (রাহ.) জবাব দেন ,نعم، لولا أن يقال من بعدي أخذه طاوس فلا يصنع فيه .ما أصنع إذا لفعلت -"তুমি স্বাভাবিক কথাই বলছো। কিন্তু তুমি কি জানো না, আজ যদি আমি এ চাদর গ্রহণ করতাম, তবে আমার এ কাজ জনগণের জন্য সনদ ও দলীলে পরিণত হতো।”৫৮৭
এরূপ অন্য একটি ঘটনা হলো, একবার উমাইয়্যা খালীফা সুলাইমান ইবনু 'আবদিল মালিক (৫৪-৯৯হি.) মাদীনায় এলেন। তিনি মাদীনার গভর্নর সাইয়িদুনা 'উমার ইবনু 'আবদিল 'আযীয (রাহ.) কে সাথে নিয়ে মাসজিদে নাবাবীতে যুহরের নামায পড়তে আসেন। নামায শেষ করে খালীফা মাকসূরার দরজার দিকে এগোলে সেখানে সাফওয়ান ইবনু সুলাইম [মৃ.১৩২হি.) (রাহ.) কে দেখতে পান। তিনি ছিলেন একজন বুযর্গ তাবি'ঈ। খালীফা সুলাইমান 'উমার ইবনু 'আবদিল 'আযীয (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করলেন, "এ বুযর্গ ব্যক্তিটি কে?" 'উমার (রাহ.) জবাব দেন, "আমীরুল মু'মিনীন, ইনি সাফওয়ান ইবনু সুলাইম।" খালীফা তাঁর গোলামকে নির্দেশ দিলেন, পাঁচশ আশরাফীর একটা থলে তাঁকে দিয়ে এসো।” গোলামটি থলেটি নিয়ে সাফওয়ান (রাহ.)-এর নিকট গিয়ে বললো, "আমীরুল মু'মিনীন উপঢৌকন হিসেবে আপনাকে এ থলে দিয়েছেন। তিনি মাসজিদেই আছেন।" সাফওয়ান (রাহ.) গোলামটিকে বললেন, "মিয়া! তুমি ভুল বুঝেছো। থলে তিনি অন্য কাউকে পাঠিয়েছেন।" গোলাম জিজ্ঞেস করলো, "আপনি সাফওয়ান নন?" তিনি জবাব দেন, "সাফওয়ান তো আমিই। কিন্তু তুমি আবার গিয়ে জিজ্ঞেস করে এসো।" গোলামটি খালীফার দিকে অগ্রসর হতেই সাফওয়ান (রাহ.) মাসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। খালীফা যতক্ষণ মাসজিদে ছিলেন, ততক্ষণ আর মাসজিদে ফিরেননি। গোলামটি অনেক খোজাখুঁজি করে নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। ৫৮৮
টিকাঃ
৫৮৫. আল-কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ২২
৫৮৬. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩০৪৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং:৩৫২৯
৫৮৭. ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ৫, পৃ. ৫৪২; ইবনু 'আসাকির, তারীখু দিমাশক, খ. ৫৬, পৃ. ৩১২; ইবনুল জাওযী, সিফাতুস সাফওয়াতি, খ. ২, পৃ. ২৮৫
৫৮৮. ইবনু 'আসাকির, তারীখু দিমাশক, খ. ২৪, পৃ. ১৩০; ইবনুল জাওযী, সিফাতুস সাফওয়াতি, খ. ২, পৃ. ১৫৫; আবূ নু'আইম আল-ইস্পাহানী, হিলইয়াতুল আউলিয়া, খ. ৩, পৃ. ১৬০
📄 মানবসেবা
ইসলাম সেবামূলক কাজের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ৫৮৯ ইসলামের পূর্বে পৃথিবীর কোনো ধর্মই ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি আইন প্রণয়ন করে গরীব, দুঃস্থ ও অনাথদের লালন এবং বিধবাদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেনি। ইসলামে তাদেরকে সহযোগিতা করা প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের জন্য অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। যারা ইয়াতীমের প্রতি সদাচরণ করে না, দুঃস্থদের খাদ্য দান করে না- এমন লোকদের কথা কোরআন মাজীদে এভাবে বর্ণিত হয়েছে- ۞أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ . فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُ الْيَتِيمَ . وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ المسكين তুমি কি এমন লোককে দেখেছো! যে দীনকে অস্বীকার করে। সে তো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়, আর সে মিসকীনদের খাবার দানে মানুষকে উৎসাহিত করেনা। ৫৯০
ইসলাম ঘোষণা দেয়, মানুষের সেবা করলে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি খুশি হন। মানুষকে নিয়েই তো আল্লাহর সব আয়োজন। এ দুনিয়ার সবকিছুই তিনি মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ৫৯১ নাবী-রাসূলগণ সকলেই এসেছিলেন মানুষের কল্যাণের জন্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الْخَلْقُ عِيَالُ الله .وَأَحَبُّ عِبَادِ اللَّهِ إِلَى اللَّهُ أَنْفَعُهُمْ لِعِيَالِهِ -"সৃষ্টিজীব হলো আল্লাহ প্রতিপাল্য স্বরূপ।
অতএব, যে ব্যক্তি সৃষ্টির প্রতি সর্বাধিক কল্যাণ করবে, সে-ই হচ্ছে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয়। "৫৯২
ইসলামের একজন অনুসারীর আল্লাহতে বিশ্বাস করার পর তার একটি প্রধান দায়িত্ব হলো- আল্লাহর বান্দাহদের অধিকার আদায় করা। আল্লাহ দয়ালু হিসেবে হয়তো স্বীয় প্রাপ্য ছেড়ে দিতে পারেন; কিন্তু মানুষের প্রাপ্য যদি কেউ আদায় না করে, তা আল্লাহ তা'আলা মা'ফ করবেন না, যতক্ষণ না ঐ বান্দাহ তা মা'ফ করে দেয়। বস্তুত আন্তরিকতার সাথে মানুষের অধিকারসমূহ আদায় করা মুসলিম জীবনের অপরিহার্য শর্ত। এ ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশ এতোই দৃঢ় যে, গৃহদ্বারে মানবেতর প্রাণী একটি কুকুরকে উপবাসী রেখে নিজে উদর পূর্ণ করে আহার গ্রহণ করা মুসলিমের জন্য না-জায়িয। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা ইয়াতীমের প্রতি বিরূপভাবাপন্ন, যারা ক্ষুধার্তকে অনুদানে বিমুখ এবং যারা প্রতিবেশির প্রতি উদাসীন, সে সকল 'ইবাদাতকারী অভিশপ্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ . وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ . فَكُ رَقَبَةٍ ، أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمِ ذِي مَسْغَبَةٍ . يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ (١٥) أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ
অতঃপর সে ধর্মের ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি জানেন কি, সে ঘাঁটি কি? তা হচ্ছে দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি অথবা দুর্ভিক্ষের সময় অন্ন দান ইয়াতীম আত্মীয়কে অথবা ধুলায়-ধসরিত মিসকীনকে। ৫৯৩
তিনি আরো বলেন,
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَأَتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ ...
সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে; বরং সৎ কাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, কিয়ামাত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নাবী-রাসূলের ওপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তারই মাহাব্বাতে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য। ৫৯৪
সমাজের প্রতিটি মানুষ অপরের কল্যাণের জন্য। পরস্পর পরস্পরকে আপদে- বিপদে সাহায্য করা ও সমবেদনা প্রকাশ করা আর্তমানবতার সেবার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য দিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ.
বিধবা রমণী ও গরীব-দুঃখীদের সেবাকারীদের মর্যাদা ও সম্মান আল্লাহর পথে জিহাদকারী অথবা রাতভর নামায আদায়কারী ও দিনভর রোযা পালনকারীর মর্যাদার সমপর্যায়ভুক্ত। ৫৯৫
অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেছেন,
مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرْجَ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةٌ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
যে ব্যক্তি আপন ভাইয়ের অভাব দূর করার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তা'আলা তার অভাব দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তা'আলাও কিয়ামাতের দিন তার একটি বিপদ দূর করে দেবেন। ৫৯৬
আর্তমানবতার সেবা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য সম্পাদনে আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর জীবনের সমগ্র দিকই সেবামূলক কাজে ভরপুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরকাছে সর্বপ্রথম যখন অহী আসে, তখন তিনি নিজের জীবনের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় উম্মুল মু'মিনীন খাদীজাতুল কুবরা (রা.) তাকে প্রবোধ দিয়ে বলেছিলেন,
كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكَلِّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ.
আল্লাহর শপথ! তিনি কখনই আপনাকে অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি নিজ আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, দুর্বল-দুঃখীদের সেবা করেন, বঞ্চিত ও অভাবীদেরকে উপার্জনক্ষম করেন, মেহমানদারী করেন এবং বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন। ৫৯৭
যে বুড়ী৫৮৮ শত্রুতা করে মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরপথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো, তার অসুস্থতার সময় তিনি তার সেবা করেছিলেন। যে মক্কাবাসী একদিন নিজ মাতৃভূমি থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, মাক্কা বিজয়ের পর তিনি • তাদেরকে ক্ষমা করে আবার আপন করে নিয়েছিলেন। দয়া ও সেবার যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শন করেছিলেন, তা পৃথিবীতে আর কেউ দেখাতে পারেনি। তাঁর সাহাবীগণও তাঁর এ আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন। আল্লাহর 'ইবাদাতের পরে মানবসেবাই ছিল তাঁদের মহান ব্রত। খিলাফাতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সাইয়িদুনা আবূ বাকর (রা.) কর্তৃক এক বৃদ্ধা রমণীর বকরীর দুধ দোহনের নিয়মিত দায়িত্ব পালন৫৯৯ এবং মদীনার শহরতলীর এক অন্ধ বুড়ীর বাড়িতে খিদমাতের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ভোরে নিয়মিতভাবে প্রতিযোগিতা দিয়ে সাইয়িদুনা আবূ বাকর ও উমার (রা.)-এর যাতায়ত৬০০ প্রভৃতি ঘটনা যুগে যুগে প্রত্যেক মুসলামানকে মানবসেবার প্রতি অনুপ্রেরণা দান করে থাকে।
টিকাঃ
৫৮৯. প্রত্যেক ধর্মেই মানব সেবার অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মমতে, কারো প্রতি হিংসা নয়; সকলের প্রতি করুণা ও ভালবাসা প্রদর্শন এবং সকলের সুখ কামনা করা একজন বৌদ্ধের অবশ্যই পালনীয় শর্ত। এ কারণে প্রত্যেক বৌদ্ধকে তার মনোভাব এভাবে প্রকাশ করতে হয়- "সবে সত্তা সুখীতা হন্ত" (অর্থাৎ সকল প্রাণি সুখী হোক)। বুদ্ধের মতে, নির্বাণ লাভ করতে হলে সর্বজীবে দয়া, মঙ্গল, প্রেম ও মৈত্রীর ভাব জাগিয়ে তুলতে হবে। তিনি বলেছেন: "মাতা যথা নিজং পুত্তং আয়ূসা এক পুত্তমনুরদখে এবম্পি সব্বভূতেসু মানুসম্ভাবয়ে অপরিমানং" অর্থাৎ মা যেমন নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েও পুত্রের প্রাণ রক্ষা করেন, সেইরূপ সকল প্রাণির প্রতি অসীম দয়াভাব জন্মাবে। (নীরুকুমার চাকমা, বুদ্ধঃ ধর্ম ও দর্শন, ঢাকা: অবসর প্রকাশনী, ১৯৯০, পৃ. ৪৪) তদুপরি বৌদ্ধ ধর্মমতে, 'দান পারমিতা' হল বুদ্ধত্ব লাভের অন্যতম উপায়। 'দান পারমিতা' হচ্ছে সকল প্রাণির মঙ্গলের জন্য নিজের সর্বস্ব এমনকি শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা সমস্ত শরীর নিঃস্বার্থভাবে দান করা এবং দানের ফল পরিত্যাগ করা। হিন্দু ধর্মেও পরোপকার ও দরিদ্রপালনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। ঋগ্বেদে রয়েছে, "অখ স্বপ্নস্য নির্বিদেহভুঞ্জতশ্চ রেবতঃ। উভা তা বশ্রি নশ্যতঃ।" অর্থাৎ আমি স্বপ্ন ঘৃণা করি আর যে ধনবান লোক পরকে প্রতিপালন করে না তাকেও ঘৃণা করি। উভয়ই শ্রীঘ্র নাশ প্রাপ্ত হয়। (ঋগ্বেদ, ১:১২০:১২) এ ধর্ম মতে, মানবসেবা কেবলমাত্র সামাজিক কর্তব্য বা পুণ্য কাজ নয়। এটা মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি বা ঈশ্বর-প্রাপ্তি সাধনার চরম সোপান। অর্থাৎ ধর্মের অন্যান্য অনুশাসন ও নিয়ম পালন করে সাধক দেবত্বের স্পর্শ লাভ করবার পরও মোক্ষ বা ভগবৎ প্রাপ্তির জন্য আরো কিছু বাকী থেকে যায়। তা হচ্ছে 'সর্বভূতহিত' সাধন। শ্রীরাম কৃষ্ণের মানসপুত্র স্বামীজী বলেন, "আত্মনং মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ" অর্থাৎ নিজের মোক্ষের জন্যই জগৎহিতের সাধনা করতে হবে। (বিবেকানন্দ রচনাবলী, খ. ৯,পৃ. ৪৮)
৫৯০. আল-কোরআন, সূরা মা'উন, ১০৭ : ১-৩
৫৯১. আল্লাহ তা'আলা বলেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ حَمِيعًا -"তিনিই সে সত্তা যিনি পৃথিবীর সকল কিছুকেই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।" (আল-কোরআন, সূরা আল-বাকারা, ২: ২৯) এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, এ জগতের সকল কিছুর আয়োজন মানুষের কল্যাণের জন্যই।
৫৯২. আবূ ইয়া'লা, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৩৩১৫, ৩৩৭০,৩৪৭৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, হা. নং: ৭৪৪৪
৫৯৩. আল-কোরআন, সূরা আল-বালাদ, ৯০: ১১-১৬
৫৯৪. আল-কোরআন, সূরা আল-বাকারা, ২: ১৭৭
৫৯৫. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আন-নাফাকাত), হা. নং: ৫০৩৮, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৬৬০; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৭৩৯৩
৫৯৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-মাযালিম), হা. নং: ২৩১০; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৪৩
৫৯৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: বাদ'উল ওয়াহ্ই), হা. নং:৩
৫৯৮. এখানে বুড়ী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আবু লাহবের স্ত্রী উম্মু জামীল আরওয়া বিনতু হারব ইবনি উমাইয়্যাহ। সে আল্লাহর রাসূলের যাতায়াতের পথে কাটা বিছিয়ে রাখতো। (বাইহাকী, দালা'য়িলুন নুবুওয়াত, খ. ২, পৃ. ৫৫, হা. নং: ৪৮৮) পবিত্র কোরআনে তাকে 'حمالة الحطب )কাঠ বহনকারিনী) বলা হয়েছে। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) বলেন, সে রাতের বেলা কাঁটা গাছের ডালপালা এনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরজায় ফেলে রাখতো। তাই তাকে কাঠ বহনকারিনী বলা হয়েছে। (মাওদূদী, তাফহীমুল কোরআন, খ. ১৯, পৃ. ৩০০)
৫৯৯. বর্ণিত আছে, খিলাফাত লাভের পূর্বে আবূ বাকর (রা.) পাড়ার বকরীগুলোর দুধ দোহন করে দিতেন। কিন্তু খিলাফাতের গুরুদায়িত্ব যখন তাঁর ওপর অর্পিত হয়, তখন এক মহিলা চিন্তায় পড়েন যে, কে তার বকরীর দুধ দোহন করে দেবে? এ দুশ্চিন্তার কথা আবূ বাকর (রা.) জানতে পেরে মহিলাকে বলে পাঠান, بَلَى، لَعَمْرِي لَأَخْلِبْنَهَا لَكُمْ، وَإِنِّي لَأَرْجُو أَنْ لَا يُغيِّرَنِي مَا دَخَلْتُ فِيْهِ عَنْ خُلُقٍ كُنْتُ عَلَيْهِ. "আমার জীবনের শপথ! আমি এখনো তোমাদের বকরীগুলোর দুধ দোহন করবো। আমার একান্ত আশা, খিলাফাতের দায়িত্ব আল্লাহর বান্দাদের সেবা থেকে আমাকে বিরত রাখবে না।" এর পর তিনি তাদের বকরীগুলোর দুধ দোহন করতেন। (ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ১৮৬; ইবনুল আসীর, আল-কামিল, খ. ১, পৃ. ৩৯৭, উসদুল গাবাহ, খ. ২, পৃ. ১৪৮; তাবারী, তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, খ. ২, পৃ. ২২১)
৬০০. ঘটনাটি হলো, আবু সালিহ আল-গিফারী (রা.) বলেন, মাদীনার শহরতলীতে এক অন্ধ বৃদ্ধা বাস করতেন। 'উমার (রা.) প্রতিদিন ভোরে গিয়ে তার প্রয়োজনীয় খিদমাত আঞ্জাম দিয়ে আসতেন। কিন্তু কয়েক দিন পর তিনি অনুভব করলেন যে, তাঁর পূর্বে কেউ এসে বৃদ্ধার খিদমাত আঞ্জাম দিয়ে যান। লোকটিকে চেনার জন্য 'উমার (রা.) দারুনভাবে উদগ্রীব হয়ে পড়েন। তাই রহস্য উন্মোচন করার জন্য একদিন খুব ভোরে ওঠে তিনি সেখানে যান। গিয়ে দেখেন, খালীফা আবূ বাকর (রা.) তার সেবা-যত্ন সেরে বেরিয়ে আসছেন। 'উমার (রা.) খালীফাকে সম্বোধন করে বলে ওঠেন, ات هو لعمري - "আমার জীবন আপনার জন্য কুরবান হোক! হে খালীফাতুর রাসূল, তবে কি আপনিই প্রতিদিন আমার পূর্বে এসে বৃদ্ধার বিদমাত করে যান!" (ইবনুল আসীর, আল-কামিল, খ. ১, পৃ. ৩৯৭)
📄 সাদাকাহ ও দিন্দ্র জীবন যাপন (যুহ্দ)
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্য হলো- সরল, সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন। ইসলামের দৃষ্টিতে এ পার্থিব জীবন হলো আল্লাহ প্রদত্ত একটি বড় নি'মাত এবং একে ন্যায়ানুগভাবে ভোগ করতে কোনো অসুবিধা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা প্রশংসনীয়ও। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ، عَلَيْهِ نِعْمَةً، فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ.
আল্লাহ তা'আলা যাকে কোনো নি'মাত দান করেন, নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন যে, যেন তাঁর দেওয়া সে নি'মাতের নিদর্শন তাঁর বান্দাহর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।৬০ ১
তবে এ জীবন ভোগ করার ক্ষেত্রে সরলতা ও অনাড়ম্বরতাই ইসলামে একান্ত কাম্য। কৃত্রিম আচরণ ও জীবন যাপন এবং বড় মানুষী ও অহঙ্কার প্রদর্শন ইসলাম মোটেও সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إن .الْبَذَادَةَ مِنَ الإِيمَانِ "সরলতা ও সাদাসিধে জীবন যাপন হলো ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।”৬০২ সাইয়িদুনা 'উমার (রা.) বলেন, تهينًا عَنْ التَّكَلُّفِ - "আমাদেরকে কৃত্রিম আচরণ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।”৬০৩
উল্লেখ্য যে, যার অন্তরে আল্লাহর ভয় স্থায়ী ও সুদৃঢ় হয়, তার নিকট পার্থিব জগত একটি মূল্যহীন বস্তুতে পরিণত হয় এবং এ দুনিয়া ও তার সুখ-সম্ভোগের প্রতি তার আগ্রহ লোপ পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর খালীফা ও সাহাবীগণ (রা.) অত্যন্ত সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। এ দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব, ভোগ-বিলাস, মান-মর্যাদা ও আসবাবপত্রের প্রতি তাঁদের না ছিল কোনো লোভ, না ছিল কোনো আগ্রহ। অনাড়ম্বর পোশাক-পরিচ্ছদ, সাধারণ খাদ্য, জাঁকজমকহীন মামুলি বাড়ি-ঘর, সাদাসিধে ও গরীবানা জীবন যাপন ছিল তাঁদের জীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্য। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এ দুনিয়াটা তাঁদের আসল আবাসস্থল নয়; এটা একটা সরাইখানা অর্থাৎ একজন মুসাফিরের ক্ষণকালের বিশ্রামস্থল মাত্র। কাজেই একজন মুসাফির সফরের জন্য যে সাদামাটা ও একান্ত প্রয়োজনীয় রসদপত্র সংগ্রহ করে, ঠিক সে ধরনের রসদপত্রই দুনিয়ায় বসবাসের জন্য যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ- “দুনিয়ায় তুমি বসবাস করো এমন নিরাসক্তভাবে, যেন তুমি একজন প্রবাসী কিংবা পথিক।”৬০৪ দুজাহানের সর্দার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট এ বলে দু'আ করতেন,
اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مِسْكِينًا، وَأَمِتْنِي مِسْكِينًا، وَاحْشُرْنِي فِي زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- “হে আল্লাহ! আমাকে মিসকীনরূপে জীবিত রাখুন! মিসকীনরূপে মৃত্যু দান করুন এবং কিয়ামাতের দিনে মিসকীনদের দলেই আমার হাশর করুন!”৬০৫
তাঁর বিছানা ছিল খেজুর পাতার চাটাই। একদিন ঘুম থেকে জাগলেন। কাছেই ছিলেন প্রিয় সাহাবী 'উমার (রা.)। চেয়ে দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসারা পিঠে খেজুর পাতার দাগ পড়ে আছে। রোম পারস্যের বেদীন বাদশাহরা কতো আড়ম্বরের জীবন কাটায় আর আখিরী নবী সাইয়িদুল মুরসালীন এতো কষ্টে জীবন যাপন করবেন- এসব ভেবেই হয়তো প্রিয়নবীর জন্য একটু কোমল বিছানা তৈরির অনুমতি চাইলেন 'উমার (রা.)। কিন্তু সাইয়িদুল মুরসালীন এই বলে বারণ করলেন যে,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا مَا مَثَلِي وَمَثَلُ الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِب سَارَ فِي يَوْمٍ صَائِفِ فَاسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ سَاعَةً مِنْ نَهَارِ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا.
দুনিয়ার প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। দুনিয়ায় আমার একমাত্র উদাহরণ হলো ঐ উষ্ট্রারোহী, যে গ্রীষ্মের দিনে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, অতঃপর তা ছেড়ে চলে যায়। ৬০৬
আরেক দিনের ঘটনা। দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দিয়ে আদুরের দুলালী ফাতিমা (রা.)-এর গৃহপ্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হঠাৎ দেখতে পেলেন ফাতিমা (রা.)-এর গৃহদ্বারে একটি রঙিন পর্দা ঝুলছে। নবী- নন্দিনী ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে ইতঃপূর্বে কখনো আড়ম্বরের কিছু দেখা যায়নি।
মূলত আজ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরআগমন উপলক্ষেই এমনটি করা হয়েছিল। এ মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো ভাবলেন, এই আরবে এখনো কতো দুঃখী-দরিদ্র মানুষের রোনাজারি। কতো বুভুক্ষের ক্রন্দন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চিন্তায় অধীর সারাক্ষণ, আর তাঁর দুলালীর দ্বারে রঙিন পর্দা ঝুলবে! চোখেমুখে ক্রোধের ছাপ নিয়ে এবার সেখান থেকেই ফিরে এলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ওদিকে খাতুনে জান্নাত সাইয়িদা ফাতিমা (রা.)-এর মনে সীমাহীন উৎকণ্ঠা। অতঃপর আলী (রা.) খবর নিয়ে এসে জানালো, নবী-নন্দিনীর এ সামান্য বিলাসিতাটুকুও নবীজীর পছন্দ নয়। তৎক্ষণাৎ তিনি ক্ষমা চেয়ে সংবাদ পাঠিয়ে দিলেন যে, আব্বাজানকে বলো, তিনি যেন তাঁর ইচ্ছানুযায়ী দুঃখী-দরিদ্রদেরকে দান করে দেন। ৬০৭
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসাহাবীগণের মধ্যেও কেউ কেউ অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও ধনৈশ্বর্যের মালিক হওয়া সত্ত্বেও চলাফেরা করতেন একজন মামুলি লোকের মতো। আবূ বাকর (রা.) ছিলেন এরূপ একজন মহান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরহীন, অত্যন্ত সহজ-সরল। তিনি প্রায় এ বলে দু'আ করতেন, اللَّهُمَّ ابْسُطُ لِي الدُّنْيَا وَزَهُدْنِى فَيْهَا - “হে আল্লাহ, দুনিয়া আমার জন্য প্রশস্ত করে দাও। কিন্তু এর ঘূর্ণাবর্তে নিমগ্ন ও আসক্ত হওয়া থেকে আমাকে রক্ষা করো। ”৬০৮ তাঁর খিলাফাত কালেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মুসলিমরা জয় লাভ করে। এতদসত্ত্বেও তাঁর অনাড়ম্বর জীবন যাপনের প্রতি আগ্রহের অবস্থা এই ছিলো যে, তিনি নিজে পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করা পছন্দ করতেন। খালীফা হওয়ার পরও তিনি কিছু দিন সংসারের খরচের জন্য বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। রাজকোষ থেকে সামান্য ভাতা নিতেন। মুসলিম বিশ্বের খালীফা হয়েও তিনি জাতীয় সম্পদ ভোগ করার ব্যাপারে যে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, তা সর্বকালের মানুষের আদর্শ হয়ে থাকবে।
একবার তাঁর স্ত্রীর হালুয়া খাওয়ার সাধ জাগলো। তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা স্বামীকে জানালে তিনি উত্তরে বলেন, "তা কেনার মতো সামর্থ্য আমার নেই।" স্ত্রী বললেন, "আচ্ছা! আপনি প্রতি দিনের খরচের জন্য আমাকে যা কিছু দিয়ে থাকেন, তা থেকে আমি কিছু কিছু সঞ্চয় করে হালুয়ার মূল্য সংগ্রহ করবো।"
আবূ বাক্স (রা.) বললেন, আচ্ছা, তা করো। কয়েকদিনের মধ্যে হালুয়ার অর্থ সংগৃহীত হয়ে গেলো। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আবূ বাক্স (রা.) বললেন, "এটা তো আমাদের খাদ্যের উদ্বৃত্ত অংশ।" অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে, কিছু অর্থ হ্রাস করলেও আমাদের প্রতিদিনের ব্যয় নির্বাহ হতে পারে। তাই প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্থ তাঁর স্ত্রী জমা করেছিল, সে পরিমাণ অর্থ তিনি ভাতা থেকে হ্রাস করে দেন। আর ইতোমধ্যে তাঁর স্ত্রী হালুয়ার জন্য যে অর্থ জমা করেছিল, তাও তিনি রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। "৬০৯
আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) লোকদেরকে এক সাথে নানা সুস্বাদু খাবার গ্রহণ করা থেকে বারণ করতেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, এভাবে লোকেরা নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে লেগে যাবে, ভালো ভালো খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে এবং এর জন্য বাড়াবাড়ি ও কৃত্রিম আচরণ শুরু করে দেবে।৬১০
সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) জাঁকজমক পছন্দ করতেন না। নিজে কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মুসলিম জাহানের খালীফা হয়েও তিনি সংসারের কাজ নিজেই করতেন। তাঁর সহধর্মিণী ফাতিমাতুয যাহরা (রা.) নিজের হাতে যাঁতা পিষে গম গুঁড়ো করতেন। তাঁর কোনো দাসদাসী ছিল না।
এ হলো প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার ও খালীফাগণের সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের কয়েকটি সাধারণ দৃষ্টান্ত। আজকের পৃথিবীতে আমাদের নিকট এসব কথা গল্পের মতোই মনে হবে। কারণ এ যুগের ক্ষমতাশীল ও তাদের পরিবারবর্গের পক্ষে এসব বিষয়ের কল্পনাও যেন কষ্টকর।
টিকাঃ
৬০ ১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৯৯৩৪
৬০২. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আত-তাজ্জল), হা. নং: ৪১৬৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১১৮
৬০৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ই'তিসাম), হা. নং: ৬৮৬৩
৬০৪. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আর-রিকাক), হা. নং: ৬০৫৩; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩৩৩
৬০৫. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩৫২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১২৬
৬০৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২৭৪৪
৬০৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-হিবাহ), হা. নং: ২৪৭১। পূর্ণ হাদীসটি হলো- عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْتَ فَاطِمَةً فَلَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهَا وَجَاءَ عَلِيٌّ فَذَكَرَتْ لَهُ ذَلِكَ فَذَكَرَهُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنِّي رَأَيْتُ عَلَى بَابِهَا سِتْرًا مَوْشِيًّا فَقَالَ مَا لِي وَلِلدُّنْيَا فَأَتَاهَا عَلِيٌّ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهَا فَقَالَتْ لِيَأْمُرْنِي فِيهِ بِمَا شَاءَ قَالَ تَرْسِيلُ بِهِ إِلَى فُلَانٍ أَهْلِ بَيْتٍ بِهِمْ حَاجَةٌ.
৬০৮. দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ৭০; হাক্কী, রূহুল বায়ান, খ. ৫, পৃ. ৩৩০ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও প্রায় অনুরূপ দু'আ বর্ণিত রয়েছে। (দ্র. তাবারানী, আদ-দু'আ, হা. নং: ১৪৪৯)
৬০৯. ইবনুল আসীর, আল-কামিল, খ. ১,পৃ. ৩৯৭
৬১০. 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার সাইয়িদুনা 'উমার (রা.)-এর নিকট খবর পৌছে যে, ইয়াযীদ ইবুন আবী সুষ্ঠুয়ান (রা.) নানা আইটেমের খাবার খান। এ খবর জানার পর 'উমার (রা.) তাঁর গোলাম ইয়ারফা' (রা.) কে বললেন, যখন তুমি জানতে পারবে যে, রাতে তাঁর খাবার পৌঁছে গেছে, তখন তুমি আমাকে অবহিত করবে। অতএব, যখন রাতে ইয়াযীদ (রা.)-এর নিকট তাঁর খাবার পৌঁছলো, তখন ইয়ারফা' 'উমার (রা.)কে অবহিত করলো। এরপর 'উমার (রা.) তাঁর বাড়িতে এসে প্রথমে সালাম করলেন, তারপর বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ইয়াযীদ (রা.) তাঁকে অনুমতি দিলেন এবং তিনি বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। এ অবস্থায় প্রথম খাবার আসলো রুটি-গোস্ত। 'উমার (রা.) তাঁর সাথে বসে খেলেন। এরপর ভুনা গোশত আনা হলো। ইয়াযীদ (রা.) খাবার জন্য হাত বাড়ালেন। এমতাবস্থায় 'উমার (রা.) তাঁকে বারণ করলেন এবং বললেন,
والله يا يزيد بن أبي سفيان أطعام بعد طعام والذي نفس عمر بيده لأن خالفتم عن سنتهم ليخالفن بكم عن طريقتهم. "ইয়াযীদ! এক খাবারের সাথে দ্বিতীয় খাবার! আল্লাহর কসম, যদি তোমরা লোকদের সাধারণ রীতির অনুসরণ না করো, তবে লোকেরাও তোমাদের রীতি অনুসরণ করে একপর্যায়ে নিজেদের রীতি ছেড়ে দেবে।” (ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ, হা.নং:৫৭৮; 'আলী আল-হিন্দী, কানযুল 'উম্মাল, হা.নং: ৩৫৯২১)