📄 বেশি বেশি তাওবাহ ও ইস্তিগফার করা
যত বেশি সম্ভব এবং যখনই সময় ও সুযোগ পাওয়া যাবে, কায়মনোবাক্যে বেশি বেশি নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তাওবা করবে। বর্ণিত আছে, লুকমান 'আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্রকে অসিয়্যাত করে বলেন, يَا بُنَيَّ عَوِّدْ لِسَانَكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي فَإِنَّ لِلَّهِ سَاعَاتٍ لَا يَرُدُّ فِيهَا سَائِلًا. প্রিয় বৎস! তোমার জিহ্বাকে (اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন!) বলতে অভ্যস্ত করো। কেননা, আল্লাহর এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যেগুলোতে তিনি কোনো প্রার্থীকে ফিরিয়ে দেন না।”৫৬৮ বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল- বাসরী (রাহ.) বলেন, أَكْثِرُوا مِنَ الْإِسْتِغْفَارِ فِي بُيُوتِكُمْ ، وَعَلَى مَوَائِدِكُمْ ، وَفِي طُرُقِكُمْ ، وَفِي أَسْوَاقِكُمْ، وَفِي مَجَالِسِكُمْ ، وَأَيْنَمَا كُنْتُمْ ، فَإِنَّكُمْ مَا تَدْرُونَ مَتَى تَنْزِلُ الْمَغْفِرَةُ তোমরা বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমাদের ঘরে, খাবারের দস্তারখানায়, রাস্তা-ঘাটে, হাট-বাজারে, মেলা-মাজলিসে এবং যেখানেই তোমরা থাকো সর্বত্রই। কেননা তোমরা জানো না যে, কখন মাগফিরাত নাযিল হবে? ৫৬৯
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তাওবা ও ইস্তিগফার আত্মপ্রীতি ও আত্মপূজার মতো ধ্বংসাত্মক রোগসমূহ থেকে থেকে বাঁচার একটি প্রকৃষ্ট চিকিৎসা ও সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় মু'মিনগণকে নানাভাবে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, মু'মিন যেন কোনো সময় আত্মপূজা ও আত্মপ্রীতির রোগে আক্রান্ত না হয়, কখনো আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত না হয়, নিজের দুর্বলতা ও দোষ-ত্রুটি অনুভব ও ভুল-ভ্রান্তি স্বীকার করতে থাকে এবং কোনো বিরাট কাজ করার পরও অহঙ্কারে বুক ফুলাবার পরিবর্তে দীনতার সাথে নিজের রাব্বের সামনে এই মর্মে আর্জি পেশ করে যে, তার কাজের মধ্যে যে গলদ রয়ে গেছে সেগুলো যেন মাফ করে দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরচাইতে বড় পূর্ণতার অধিকারী আর কে হতে পারে? পৃথিবীর কোন্ ব্যক্তি তাঁর চাইতে বড় কাজ সম্পাদন করেছে? কিন্তু ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ও মহত্তম কাজ সম্পাদন করার পর আল্লাহ তা'আলার দরবার থেকে তাঁকে যে নির্দেশ দেয়া হলো তা হচ্ছে-
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ . وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا . فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং দেখবে যে, লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দীনের মধ্যে প্রবেশ করছে, তখন নিজের রাব্বের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং তাঁর নিকট মাগফিরাত কামনা করো। অবশ্য তিনি তাওবা কবুলকারী। ৫৭০
অর্থাৎ যে মহান কাজ তুমি সম্পাদন করেছো সে সম্পর্কে জেনে রেখো, তার জন্য তুমি নও; বরং তোমার রাব্বই প্রশংসা পাওয়ার হকদার। কারণ তাঁরই একান্ত দয়া ও অনুগ্রহে তুমি এ মহান কাজ সম্পাদন করতে সফলকাম হয়েছো এবং নিজের সম্পর্কে তোমার এ অনুভূতি ও আশঙ্কা থাকা উচিত যে, যে কাজ তুমি সম্পাদন করেছো, না জানি তাতে কোনো অসম্পূর্ণতা বা দুর্বলতা রয়ে গেলো কি- না। এ কারণে আত্মতুষ্ট ও প্রীত হওয়ার পরিবর্তে তোমার রাব্বের নিকট দু'আ করো এবং মাগফিরাত কামনা করো। এমনিতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হরহামেশা তাওবা ও ইস্তিগফার করতেন। এ নির্দেশের পর তিনি আরো বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তাওবাহ করতেন। উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يُكْثِرُ أَنْ يَقُولَ قَبْلَ أَنْ يَمُوتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে প্রায়ই বলতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আপনার কাছে মাগফিরাত কামনা করছি এবং আপনার কাছে তাওবাহ করছি। ৫৭১ সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
"আল্লাহর কসম! আমি দিনে সত্ত্বর বারের চাইতেও অধিক পরিমাণে আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার ও তাওবাহ করি।”৫৭২ তিনি উম্মাতকেও বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তাওবা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ "হে জনমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করো ও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমি নিজেও প্রতি দিন একশবার আল্লাহর নিকট তাওবা ও ইস্তিগফার করি।”৫৭৩ উল্লেখ যে, প্রত্যেক গুনাহ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব। যদি গুনাহ আল্লাহ ও বান্দাহর মধ্যে হয়ে থাকে এবং তাতে মানুষের কোনো হক জড়িত না থাকে, তা হলে তাওবা সাহীহ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। এগুলো হলো- এক. গুনাহটি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে হবে। দুই. কৃতকাজের জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনা প্রকাশ করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। তিন. সেই গুনাহটি ভবিষ্যতে কখনো করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ তিনটি শর্তের মধ্যে যদি একটিও পাওয়া না যায়, তবে তা তাওবা হবে না। আর যদি গুনাহের কাজটি কোনো মানুষের সাথে সম্পর্কিত হয়, তা হলে তা থেকে তাওবা করার জন্য উপযুক্ত তিনটি শর্তসহ অপর একটি শর্তও রয়েছে। তা হলো- যে ব্যক্তির অধিকার বা হক নষ্ট করা হয়েছে, তার নিকট থেকে মুক্তি অর্জন করতে হবে। যেমন- কোনো মানুষের অর্থ-সম্পদ বা এ জাতীয় অন্য কিছু নিয়ে থাকলে তা মালিকের কাছে ফেরত দিতে হবে। কারো প্রতি মিথ্যারোপ, মিথ্যা সাক্ষ্য, কারো গীবাত বা নিন্দা চর্চা করে থাকলে তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। ৫৭৪
টিকাঃ
৫৬৮. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আত-তাওবাহ, হা. নং: ১৫২; ইবনু রাজাব আল-হাম্বালী, জামি 'উল 'উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ. ৩৯৪
৫৬৯. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আত-তাওবাহ, হা. নং: ১৫১; ইবনু রাজাব আল-হাম্বালী, জামি 'উল 'উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ. ৩৯৪
৫৭০. আল-কোরআন, সূরা আন-নাহর, ১১০: ১-৩
৫৭১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ১১১৪
৫৭২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আদ-দা'ওয়াত), হা. নং: ৫৯৪৮ কোনো কোনো রিওয়ায়াতে একশ বারের কথাও উল্লেখ রয়েছে। (তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩২৫৯; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, [কিতাব: আল-আদাব], হা. নং: ৩৮১৫)
৫৭৩. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৮২৯৩
৫৭৪. নাবাবী, শারহু সাহীহি মুসলিম, খ. ১৭,পৃ. ২৫
📄 সকল অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে কাজ করা
বান্দাহ যখন যে অবস্থায় থাকুক না কেন, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ রাখবে, তাঁকে ভয় করে চলবে, তাঁর বিধি-নিষেধ পালনের প্রতি মনোযোগী হবে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর যিকরের প্রতিফলিত স্বরূপ হলো তাঁর বিধি-নিষেধের পরিপূর্ণ আনুগত্য। সুতরাং যে ব্যক্তি সর্বাধিক তাঁকে ভয় করে চলবে এবং তাঁর আনুগত্য করবে, প্রকৃত অর্থে সে-ই সকলের চাইতে বেশি যিকরকারী রূপে গণ্য হবে এবং সফলকাম হবে। প্রকারান্তরে যে মুখে আল্লাহর যিকর করে; কিন্তু তাঁর বিধি-নিষেধ অমান্য করে চলে, প্রকৃত অর্থে সে যেন আল্লাহর কোনো যিকর-ই করে নি। সা'ঈদ ইবনু যুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
الذِّكْرُ طَاعَةُ اللهِ ، فَمَنْ لَمْ يُطِعْهُ لَمْ يَذْكُرْهُ وَإِنْ أَكْثَرَ التَّسْبِيحَ وَالتَّهْلِيلَ وَقِرَاءَةَ الْقُرْآنَ.
যিকর হলো আল্লাহর আনুগত্যের নাম। কাজেই যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করবে না, সে (প্রকৃত অর্থে) তাঁর যিকরই করেনি। যদিও সে বেশি বেশি তাসবীহ-তাহলীল পড়েছে এবং কোরআন তিলাওয়াত করেছে। ৫৭৫
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا . يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
হে মু'মিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তবেই তিনি তোমাদের 'আমাল-আচরণ সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। ৫৭৬
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ - "আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর ভয়ে নিষিদ্ধ কর্মসমূহ থেকে বিরত থাকে, তারাই কেবল কৃতকার্য।”৫৭৭
এ আয়াতগুলোতে মু'মিনদের প্রতি আল্লাহকে ভয় করার চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এর বাস্তব স্বরূপ হলো আল্লাহ ও রাসূলের পরিপূর্ণ আনুগত্য। সুতরাং আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য ছাড়া যেমন মুত্তাকী হওয়া সম্ভব নয়, তেমনি প্রকৃত যিকরকারীর মর্যাদা লাভ করাও সম্ভব নয়।
টিকাঃ
৫৭৫. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ২,পৃ. ১৭১, খ. ১৮,পৃ. ১০৯
৫৭৬. আল-কোরআন, সূরা আল-আহযাব, ৩৩ ৭০-৭১
৫৭৭. আল-কোরআন, সূরা আন-নূর, ২৪ ৫২