📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 সর্বোত্তম 'আমল

📄 সর্বোত্তম 'আমল


আবুদ দারদা' (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَأَرْكَاهَا عِنْدَ مَلِيكِكُمْ وَأَرْفَعِهَا فِي دَرَجَاتِكُمْ وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ إِنْفَاقِ الذَّهَبِ وَالْوَرِقِ وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ أَنْ تَلْقَوْا عَدُوَّكُمْ فَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ وَيَضْرِبُوا أَعْنَاقَكُمْ.
আমি কী তোমাদেরকে এমন একটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবো না, যা তোমাদের যাবতীয় 'আমালের চাইতে উত্তম, তোমাদের রাব্বের নিকট সর্বাধিক পবিত্র, তোমাদের মর্যাদা বিশেষভাবে বর্দ্ধনকারী, আল্লাহর রাস্তায় সোনা-রূপা দান করা এবং আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে শত্রুদের মুকাবিলা করতে গিয়ে তাদেরকে হত্যা করা বা নিজে শাহাদাত বরণ করার চাইতে উত্তম?
সাহাবা কিরাম (রা.) আরয করলেন, بَلَى" অবশ্যই বলবেন।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ذِكْرُ اللَّهِ تَعَالَى " তা হলো আল্লাহ তা'আলার স্মরণ।”৫৫১

টিকাঃ
৫৫১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আদ-দা'ওয়াত), হা. নং: ৩৩৭৭; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং:৩৭৯০

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 নির্দিষ্ট সময়, অবস্থা ও কাজের জন্য প্রযোজ্য দু'আ মা'সূরাতগুলো পড়া

📄 নির্দিষ্ট সময়, অবস্থা ও কাজের জন্য প্রযোজ্য দু'আ মা'সূরাতগুলো পড়া


যদিও ব্যাপক অর্থে সমস্ত নেক 'আমালই যিকরের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু যিকরের সবচাইতে বড় প্রকাশস্থল এবং উত্তম নমূনা হচ্ছে দু'আ। ইসলাম এ দু'আকে একটি বিশিষ্ট মর্যাদা দান করেছে। বলা হয়েছে, الدُّعَاءُ مُخُ الْعِبَادَةِ - "দু'আ হলো 'ইবাদাতের মগয।”৫৫২ অন্য একটি রিওয়ায়াতে এসেছে- إِنَّ الدُّعَاءَ هُوَ الْعِبَادَةُ "বস্তুত দু'আই হলো 'ইবাদাত।”৫৫৩ কাজেই একজন মু'মিনের প্রতি তার ঈমানের একান্ত দাবি হলো- সে যতো বেশি সম্ভব আল্লাহর নিকট দু'আ করবে।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا تَعْجَزُوا فِي الدُّعَاء .فَإِنَّهُ لَنْ يَهْلِكَ مَعَ الدُّعَاءِ أَحَدٌ- "তোমরা দু'আ করার ক্ষেত্রে অক্ষম ও দুর্বল হয়ে যেও না। কেননা দু'আ করলে কেউ কখনো ধ্বংস হবে না।”৫৫৪ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও উম্মাতকে প্রত্যেকটি কাজ, অবস্থা ও সময়ের চাহিদা ও দাবি অনুযায়ী পড়ার জন্য বিভিন্ন দু'আ শিখিয়ে গেছেন।
যেমন- সকাল ও সন্ধ্যার সময় পড়ার দু'আসমূহ (أذكار الصباح والمساء), অযু শুরু করার সময়, অযু শেষে, মাসজিদের দিকে রওয়ানার হওয়ার সময়, মাসজিদে প্রবেশের সময়, মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়, আযানের সময়, ঘুম যাওয়ার সময়, ঘুম না আসা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে, ঘুমের মধ্যে ভালো বা খারাপ স্বপ্ন দেখে, ঘুম থেকে হঠাৎ চোখ খুলে গেলে, পার্শ্ব পরিবর্তন করলে, ঘুম থেকে ওঠার সময়, ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, ঘরে প্রবেশ করার সময়, পায়খানায় প্রবেশের সময়, পায়খানা থেকে বের হওয়ার সময়, খাওয়া শুরু করার সময়, খাওয়া শেষে, দাওয়াত খাওয়ার পর, বাজারে যাওয়ার সময়, সফরে যাওয়ার সময়, সফর শেষে ঘরে ফিরে, কাউকে বিদায় জানানোর সময়, ইফতারীর সময়, সাহরীর সময়, বিবাহের 'আকদের পর, বাসর রাতে স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের পর, স্ত্রী সহবাসের সময়, অসুস্থ ব্যক্তির সাথে সাক্ষাতের সময়, বিপদগ্রস্ত কাউকে দেখলে, মাজলিস শেষে, কাপড় পরিধানের সময়, নতুন কাপড় পরিধান করার সময়, নতুন চাঁদ দেখার সময়, আশ্চর্য কিছু দেখলে বা শুনলে, খুশির সময়, গাছে ফসল আসার সময়, কাজে সাফল্য লাভ করার জন্য, যুদ্ধে বা শত্রুর ওপর জয় লাভ করে, ভয়ের সময়, চিন্তা-পেরেশানীর সময়, বিভিন্ন বিপদ ও সঙ্কট মুহূর্তে, মানুষ, জিন ও শাইতান প্রভৃতির বিভিন্ন অনিষ্টতা থেকে বাঁচার জন্য, ঋণ থেকে পরিত্রান লাভের জন্য, কারো কোনো উপকারের কৃতজ্ঞতার জানানোর সময়, মেঘ দেখলে, বৃষ্টিপাতের সময়, ঝড়ের সময়, ... প্রভৃতি কাজ ও সময় পড়ার দু'আসমূহ। পবিত্র হাদীসে এ সকল দু'আর বিভিন্ন রূপ ফাযীলাত ও উপকারিতার কথা বর্ণিত রয়েছে। ৫৫৫
উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো এ সব দু'আ তাঁর স্বতন্ত্র মু'জিযা এবং নুবুওয়াতের দলীল। এসব দু'আর শব্দাবলি সাক্ষ্য প্রদান করে যে, এগুলো কোনো একজন নাবীর মুখ থেকেই নিঃসৃত। এগুলোতে আছে নুবুওয়াতের নূর, নাবীর ইয়াকীন, 'আব্দে কামিলের আকুতি, প্রেমের আধার বিশ্ব অধিপতির ওপর পূর্ণ আস্থা, তাঁর ভালোবাসার পূর্ণ অভিব্যক্তি, নুবুওয়াতের সরলতা, ব্যথিত ও ব্যাকুল হৃদয়ের কাকুতি-মিনতি। রয়েছে একজন মুখাপেক্ষী ব্যক্তির বারংবার আরজি, প্রভুর দরবারে আদাব রক্ষাকারী সতর্কতা, অন্তরের ব্যথার জ্বলন এবং আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার ইয়াকীন ও আশার আনন্দ।
অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো দু'আ-যিকর পরিত্যাগ করে আমরা অনেকেই নিজেদের রচিত নতুন নতুন দু'আ-ওযীফা-খাতম এবং পদ্ধতির পেছনে পড়ে আছি। আমরা বলছি না যে, এগুলো পড়া ঢালাওভাবে না-জায়িয। ৫৫৬ তবে কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত দু'আগুলোর সাথে এগুলোর তুলনা হতে পারে না। ৫৫৭ তদুপরি এ দু'আসমূহ বাদ দিয়ে শুধুই এ সকল ওযীফা-খাতম পড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আবার অনেক সময় এ খাতমগুলো শুধু বালা-মুসীবাতের সময়ই পড়া হয়, তাও আবার নিজে না পড়ে অন্যের দ্বারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পড়ানো হয়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে, দু'আ মাছুরাসমূহ যেভাবে বর্ণিত হয়ে এসেছে ঠিক সেভাবেই পাঠ করা উচিত। তন্মধ্যে কোনো শব্দের পরিবর্তন করা কিংবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো শব্দ বা বাক্য সংযোজন করা সমীচীন নয়। সাইয়িদুনা বারা' ইবনু 'আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, যখন তুমি শয্যায় শুইতে যাবে, তখন নামাযের ওযুর মতো ওযু করবে, অতঃপর ডান কাত হয়ে শুয়ে বলবে-
اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ وَالْحَاتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ رَهْبَةً وَرَغْبَةً إِلَيْكَ لا مَلْحَا وَلا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ، فَإِنْ مُتْ مُتْ عَلَى الْفِطْرَةِ فَاجْعَلْهُنَّ آخِرَ مَا تَقُولُ .
বারা' ইবনু 'আযিব (রা.) বলেন, আমি এ কথাগুলো মুখস্ত করবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট পুনরাবৃত্তি করলাম। যখন আমি 'آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ ' পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন বললাম, وَبِرَسُولِكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ । তিনি বললেন, না, বরং বলো, بَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ
হাফিয ইবনু হাজার আল-'আসকালানী (রাহ.) বলেন, الْحِكْمَةِ فِي رَدُّه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى من قال ( الرَّسُول ) بَدَل ( النَّبِيِّ ) أَنَّ الفاظ الأذكار تَوْقِيفِيَّة، وَلَهَا خَصَائِصِ وَأَسْرَارِ لا يَدْخُلَهَا الْقِيَاسِ فَتَحِب الْمُحَافَظَةِ عَلَى اللَّفْظ الَّذِي وَرَدَتْ بِهِ
'নাবী' শব্দের পরিবর্তে 'রাসূল' শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের কারণ হলো- যিকরের শব্দাবলি তাওকীফী (আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক নির্দেশিত)। এগুলোর কতিপয় বিশিষ্ট মর্ম ও গূঢ় তাৎপর্য থাকে। এগুলোতে কিয়াসের সুযোগ নেই। তাই যিকরের শব্দগুলো যেভাবেই বর্ণিত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই সংরক্ষণ করা ওয়াজিব। ৫৫৯
ইমাম নাবাবী (রাহ.) বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আবূ 'আবদিল্লাহ আল-মাযিরী [৪৫৩-৫৩৬ হি.] (রাহ.) ও অন্যান্য 'আলিম থেকে নকল করেন,
أَنَّ سَبَبَ الإنْكَارِ هَذَا ذِكْرٌ وَدُعَاء، فَيَنْبَغِي فِيهِ الاقْتِصَارَ عَلَى اللَّفْظَ الْوَارِد بِحُرُوفِهِ، وَقَدْ يَتَعَلَّقَ الْجَزَاء بِتِلْكَ الْحُرُوف، وَلَعَلَّهُ أُوحِيَ إِلَيْهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بهَذِهِ الْكَلِمَاتِ، فَيَتَعَيَّنَ أَدَاؤُهَا بِحُرُوفِهَا .
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের কারণ হলো- এটা একটি যিকর ও দু'আ। কাজেই এ ক্ষেত্রে বর্ণিত ভাষার ওপরই অক্ষরে অক্ষরে একান্ত নির্ভর করা উচিত। তদুপরি এ অক্ষরগুলোর সাথেও প্রতিদানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সম্ভবত এ শব্দগুলোই আল্লাহ তা'আলা ওহীরূপে তাঁর নিকট অবতীর্ণ করেছেন। এ কারণে এ শব্দগুলো অক্ষরে অক্ষরে আদায় করার ব্যাপারটি সুনির্ধারিত।
এরপর উপর্যুক্ত কথার ওপর ইমাম নাবাবী (রাহ.) এভাবে মন্তব্য করেন, وهذا . القول حسن -"এ কথাটি চমৎকার।”৫৬০

টিকাঃ
৫৫২. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আদ-দা'ওয়াত), হা. নং: ৩৩৭১
৫৫৩. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আদ-দু'আ), হা. নং: ৩৮২৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৮৩৫২
৫৫৪. ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ৮৭১; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আদ-দু'আ), হা. নং: ১৮১৮
৫৫৫. এ সকল দু'আ ও যিকর সম্পর্কে জানার জন্য পড়ুন, ইমাম আশ-শাওকানী (রাহ.)-এর সংকলিত "تحفة الذاكرين بعدة الحصن الحصين", 'আবদুর রাযযাক ইবনু 'আবদিল মুহসিন আল-বাদরের রচিত "فقه الأدعية والأذكار "
৫৫৬. নিজের সব সময়ের প্রয়োজন পূরণ ও সমস্যার সমাধান চেয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট যে দু'আ করা হয় সে ব্যাপারে মানুষ স্বাধীন। এ ক্ষেত্রে কেবল দু'আর আদাব ও শর্তাবলির প্রতি খেয়াল রেখে যে কোনো বাক্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করা যায়।
৫৫৭. যেমন ধরুন, 'হিযবুল বাহার' একটি সুন্দর দু'আ। এ দু'আর অধিকাংশ শব্দই কোরআন-হাদীসে যদিও বিক্ষিপ্তভাবে বিদ্যমান আছে; কিন্তু সরাসরি ঐভাবে উক্ত দু'আ বর্ণিত নেই। আশরাফ 'আলী থানবী (রাহ.)-এর অনুমতিক্রমে এ দু'আটি তাঁর মুনাজাতে মাককূলের শেষাংশে সংযোজিত হয়েছে। কিন্তু সেখানে তিনি এ সতর্কও করেছেন যে, "নিঃসন্দেহে এ দু'আ একটি বারকাতময় দু'আ। তবে কোরআন-হাদীসে বর্ণিত দু'আসমূহের মর্যাদা এবং প্রভাব-ক্রিয়া এর চাইতে অনেক বেশি। স্মরণ রাখবেন, লোকজন এ ব্যাপারে খুব ভুল করে থাকে।" (থানবী, মুনাজাতে মাককূল, পৃ. ২০৮) পরবর্তীতে এ দু'আর ব্যাপারে লোকদের বাড়াবাড়ি দেখে তিনি বলতে বাধ্য হন যে, "সাধারণভাবে লোকদের অন্তরে 'হিযবুল বাহার' সম্পর্কে বিশ্বাস এতো গাঢ় যে, আদ'ইয়ায়ে মাছুরাহ সম্পর্কেও এতোটুকু নেই। এটা সম্পূর্ণ বাড়াবাড়ি। কাজেই এর ওযীফা বন্ধ রাখা দরকার।" (থানবী, কামালাতে আশরাফিয়াহ, পৃ. ৪১)
৫৫৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাবুল ওযু), হা.নং: ২৪৪, (কিতাবুদ দা'ওয়াত), হা.নং: ৫৯৫২
৫৫৯. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, খ. ১১, পৃ. ১১২
৫৬০. নাবাবী, আল-মিনহাজ শারহু সাহীহি মুসলিম, খ. ১৭, পৃ. ৩৩

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 বেশি বেশি তাওবাহ ও ইস্তিগফার করা

📄 বেশি বেশি তাওবাহ ও ইস্তিগফার করা


যত বেশি সম্ভব এবং যখনই সময় ও সুযোগ পাওয়া যাবে, কায়মনোবাক্যে বেশি বেশি নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তাওবা করবে। বর্ণিত আছে, লুকমান 'আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্রকে অসিয়্যাত করে বলেন, يَا بُنَيَّ عَوِّدْ لِسَانَكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي فَإِنَّ لِلَّهِ سَاعَاتٍ لَا يَرُدُّ فِيهَا سَائِلًا. প্রিয় বৎস! তোমার জিহ্বাকে (اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন!) বলতে অভ্যস্ত করো। কেননা, আল্লাহর এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যেগুলোতে তিনি কোনো প্রার্থীকে ফিরিয়ে দেন না।”৫৬৮ বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল- বাসরী (রাহ.) বলেন, أَكْثِرُوا مِنَ الْإِسْتِغْفَارِ فِي بُيُوتِكُمْ ، وَعَلَى مَوَائِدِكُمْ ، وَفِي طُرُقِكُمْ ، وَفِي أَسْوَاقِكُمْ، وَفِي مَجَالِسِكُمْ ، وَأَيْنَمَا كُنْتُمْ ، فَإِنَّكُمْ مَا تَدْرُونَ مَتَى تَنْزِلُ الْمَغْفِرَةُ তোমরা বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমাদের ঘরে, খাবারের দস্তারখানায়, রাস্তা-ঘাটে, হাট-বাজারে, মেলা-মাজলিসে এবং যেখানেই তোমরা থাকো সর্বত্রই। কেননা তোমরা জানো না যে, কখন মাগফিরাত নাযিল হবে? ৫৬৯
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তাওবা ও ইস্তিগফার আত্মপ্রীতি ও আত্মপূজার মতো ধ্বংসাত্মক রোগসমূহ থেকে থেকে বাঁচার একটি প্রকৃষ্ট চিকিৎসা ও সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় মু'মিনগণকে নানাভাবে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, মু'মিন যেন কোনো সময় আত্মপূজা ও আত্মপ্রীতির রোগে আক্রান্ত না হয়, কখনো আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত না হয়, নিজের দুর্বলতা ও দোষ-ত্রুটি অনুভব ও ভুল-ভ্রান্তি স্বীকার করতে থাকে এবং কোনো বিরাট কাজ করার পরও অহঙ্কারে বুক ফুলাবার পরিবর্তে দীনতার সাথে নিজের রাব্বের সামনে এই মর্মে আর্জি পেশ করে যে, তার কাজের মধ্যে যে গলদ রয়ে গেছে সেগুলো যেন মাফ করে দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরচাইতে বড় পূর্ণতার অধিকারী আর কে হতে পারে? পৃথিবীর কোন্ ব্যক্তি তাঁর চাইতে বড় কাজ সম্পাদন করেছে? কিন্তু ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ও মহত্তম কাজ সম্পাদন করার পর আল্লাহ তা'আলার দরবার থেকে তাঁকে যে নির্দেশ দেয়া হলো তা হচ্ছে-
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ . وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا . فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং দেখবে যে, লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দীনের মধ্যে প্রবেশ করছে, তখন নিজের রাব্বের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং তাঁর নিকট মাগফিরাত কামনা করো। অবশ্য তিনি তাওবা কবুলকারী। ৫৭০
অর্থাৎ যে মহান কাজ তুমি সম্পাদন করেছো সে সম্পর্কে জেনে রেখো, তার জন্য তুমি নও; বরং তোমার রাব্বই প্রশংসা পাওয়ার হকদার। কারণ তাঁরই একান্ত দয়া ও অনুগ্রহে তুমি এ মহান কাজ সম্পাদন করতে সফলকাম হয়েছো এবং নিজের সম্পর্কে তোমার এ অনুভূতি ও আশঙ্কা থাকা উচিত যে, যে কাজ তুমি সম্পাদন করেছো, না জানি তাতে কোনো অসম্পূর্ণতা বা দুর্বলতা রয়ে গেলো কি- না। এ কারণে আত্মতুষ্ট ও প্রীত হওয়ার পরিবর্তে তোমার রাব্বের নিকট দু'আ করো এবং মাগফিরাত কামনা করো। এমনিতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হরহামেশা তাওবা ও ইস্তিগফার করতেন। এ নির্দেশের পর তিনি আরো বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তাওবাহ করতেন। উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يُكْثِرُ أَنْ يَقُولَ قَبْلَ أَنْ يَمُوتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে প্রায়ই বলতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আপনার কাছে মাগফিরাত কামনা করছি এবং আপনার কাছে তাওবাহ করছি। ৫৭১ সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
"আল্লাহর কসম! আমি দিনে সত্ত্বর বারের চাইতেও অধিক পরিমাণে আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার ও তাওবাহ করি।”৫৭২ তিনি উম্মাতকেও বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তাওবা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ "হে জনমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করো ও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমি নিজেও প্রতি দিন একশবার আল্লাহর নিকট তাওবা ও ইস্তিগফার করি।”৫৭৩ উল্লেখ যে, প্রত্যেক গুনাহ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব। যদি গুনাহ আল্লাহ ও বান্দাহর মধ্যে হয়ে থাকে এবং তাতে মানুষের কোনো হক জড়িত না থাকে, তা হলে তাওবা সাহীহ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। এগুলো হলো- এক. গুনাহটি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে হবে। দুই. কৃতকাজের জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনা প্রকাশ করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। তিন. সেই গুনাহটি ভবিষ্যতে কখনো করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ তিনটি শর্তের মধ্যে যদি একটিও পাওয়া না যায়, তবে তা তাওবা হবে না। আর যদি গুনাহের কাজটি কোনো মানুষের সাথে সম্পর্কিত হয়, তা হলে তা থেকে তাওবা করার জন্য উপযুক্ত তিনটি শর্তসহ অপর একটি শর্তও রয়েছে। তা হলো- যে ব্যক্তির অধিকার বা হক নষ্ট করা হয়েছে, তার নিকট থেকে মুক্তি অর্জন করতে হবে। যেমন- কোনো মানুষের অর্থ-সম্পদ বা এ জাতীয় অন্য কিছু নিয়ে থাকলে তা মালিকের কাছে ফেরত দিতে হবে। কারো প্রতি মিথ্যারোপ, মিথ্যা সাক্ষ্য, কারো গীবাত বা নিন্দা চর্চা করে থাকলে তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। ৫৭৪

টিকাঃ
৫৬৮. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আত-তাওবাহ, হা. নং: ১৫২; ইবনু রাজাব আল-হাম্বালী, জামি 'উল 'উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ. ৩৯৪
৫৬৯. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আত-তাওবাহ, হা. নং: ১৫১; ইবনু রাজাব আল-হাম্বালী, জামি 'উল 'উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ. ৩৯৪
৫৭০. আল-কোরআন, সূরা আন-নাহর, ১১০: ১-৩
৫৭১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ১১১৪
৫৭২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আদ-দা'ওয়াত), হা. নং: ৫৯৪৮ কোনো কোনো রিওয়ায়াতে একশ বারের কথাও উল্লেখ রয়েছে। (তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩২৫৯; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, [কিতাব: আল-আদাব], হা. নং: ৩৮১৫)
৫৭৩. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৮২৯৩
৫৭৪. নাবাবী, শারহু সাহীহি মুসলিম, খ. ১৭,পৃ. ২৫

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 সকল অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে কাজ করা

📄 সকল অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে কাজ করা


বান্দাহ যখন যে অবস্থায় থাকুক না কেন, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ রাখবে, তাঁকে ভয় করে চলবে, তাঁর বিধি-নিষেধ পালনের প্রতি মনোযোগী হবে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর যিকরের প্রতিফলিত স্বরূপ হলো তাঁর বিধি-নিষেধের পরিপূর্ণ আনুগত্য। সুতরাং যে ব্যক্তি সর্বাধিক তাঁকে ভয় করে চলবে এবং তাঁর আনুগত্য করবে, প্রকৃত অর্থে সে-ই সকলের চাইতে বেশি যিকরকারী রূপে গণ্য হবে এবং সফলকাম হবে। প্রকারান্তরে যে মুখে আল্লাহর যিকর করে; কিন্তু তাঁর বিধি-নিষেধ অমান্য করে চলে, প্রকৃত অর্থে সে যেন আল্লাহর কোনো যিকর-ই করে নি। সা'ঈদ ইবনু যুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
الذِّكْرُ طَاعَةُ اللهِ ، فَمَنْ لَمْ يُطِعْهُ لَمْ يَذْكُرْهُ وَإِنْ أَكْثَرَ التَّسْبِيحَ وَالتَّهْلِيلَ وَقِرَاءَةَ الْقُرْآنَ.
যিকর হলো আল্লাহর আনুগত্যের নাম। কাজেই যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করবে না, সে (প্রকৃত অর্থে) তাঁর যিকরই করেনি। যদিও সে বেশি বেশি তাসবীহ-তাহলীল পড়েছে এবং কোরআন তিলাওয়াত করেছে। ৫৭৫
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا . يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
হে মু'মিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তবেই তিনি তোমাদের 'আমাল-আচরণ সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। ৫৭৬
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ - "আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর ভয়ে নিষিদ্ধ কর্মসমূহ থেকে বিরত থাকে, তারাই কেবল কৃতকার্য।”৫৭৭
এ আয়াতগুলোতে মু'মিনদের প্রতি আল্লাহকে ভয় করার চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এর বাস্তব স্বরূপ হলো আল্লাহ ও রাসূলের পরিপূর্ণ আনুগত্য। সুতরাং আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য ছাড়া যেমন মুত্তাকী হওয়া সম্ভব নয়, তেমনি প্রকৃত যিকরকারীর মর্যাদা লাভ করাও সম্ভব নয়।

টিকাঃ
৫৭৫. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ২,পৃ. ১৭১, খ. ১৮,পৃ. ১০৯
৫৭৬. আল-কোরআন, সূরা আল-আহযাব, ৩৩ ৭০-৭১
৫৭৭. আল-কোরআন, সূরা আন-নূর, ২৪ ৫২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00