📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 নাফল সাদাক্বাহ

📄 নাফল সাদাক্বাহ


দান-সাদাকাহ মু'মিন জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেক মু'মিনই নিজ নিজ সাধ্যমতো আল্লাহর পথে খরচ করে থাকে। ইসলামে এ দান-সাদাকাহ এতোই অনাবিল ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে, এর পেছনে কোনো ধরনের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য কিংবা কোনো প্রদর্শনের বা গৌরব প্রকাশের মনোভাব কার্যকর থাকে না। বরং একান্ত ভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনই এর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। পবিত্র কুর'আনে আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মশীল লোকদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, তারা এতোই মহান দানশীল যে, তারা তাদের দান-সাদাকাহর বিনিময়ে কোনো পার্থিব প্রতিদান বা শুকরিয়া কামনা করে না। তিনি বলেন,
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا . إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا
তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে। তারা বলে, আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাদেরকে আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। ৫০৪
এটি অত্যন্ত কঠিন 'আমাল যে, মানুষ তার সম্পদ ব্যয় করবে, অথচ এই ব্যয়ের পশ্চাতে সে কোনো ধরনের উপকার বা শুকরিয়া পেতে চাইবে না। ইসলামের সুমহান আদর্শ লোকদের এ কঠিন 'আমালের ওপর অভ্যস্ত করে গড়ে তোলে। মুসলিমগণ কেবল বিচার দিনের মহান প্রতিদানের আশায় এ কঠিন ত্যাগ স্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِئَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ . الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَا أَنْفَقُوا مِنَّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
যারা আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে অনেকগুণ বেশি দান করেন। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ। যারা আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের রাব্বের কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনো আশঙ্কা নেই। তারা চিন্তিতও হবে না। ৫০৫
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরজীবনাদর্শ ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ইতিহাস এই সুমহান ও পবিত্র দান-সাদাকাহর অসংখ্য ঘটনায় সমুজ্জ্বল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজ্জাগত স্বভাব ছিলেন দানশীলতা। তাঁর হাতে কোনো মাল এসে পৌঁছলে তা বণ্টন করে না দেয়া পর্যন্ত তিনি স্বস্তি বোধ করতেন না। উম্মুল মু'মিনীন উম্মু সালামাহ (রা.) বলেন, "একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিন্তিত দেখে তার কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, তাঁর হাতে ৭টি দীনার জমা হয়ে আছে, তা এখনও বণ্টন করা হয় নি।”৫০৬ অন্য একটি রিওয়ায়াতে রয়েছে, একদিন রাসূলুল্লাহ 'আসরের নামাযের পর বাড়িতে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে পুনরায় ফিরে আসলেন। সাহাবীগণের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন,
ذَكَرْتُ وَأَنَا فِي الصَّلَاةِ تِبْرًا عِنْدَنَا فَكَرِهْتُ أَنْ يُمْسِيَ أَوْ يَبِيتَ عِنْدَنَا فَأَمَرْتُ بقِسْمَتِهِ.
নামায পড়ার সময় খেয়াল হলো, ঘরে একটি স্বর্ণের পাত জমা আছে। এটি সন্ধ্যা বা রাত পর্যন্ত আমার কাছে থাকবে- তা আমি মেনে নিতে পারলাম না। তাই তা দান করে দেয়ার ব্যবস্থা করে এলাম।৫০৭
আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসাথে পথ চলার সময় তিনি বললেন,
يَا أَبَا ذَرِّ مَا يَسُرُّنِي أَنَّ عِنْدِي مِثْلَ أُحُدٍ هَذَا ذَهَبًا تَمْضِي عَلَيَّ ثَالِثَةٌ وَعِنْدِي مِنْهُ دِينَارٌ إِلَّا شَيْئًا أَرْصُدُهُ لِدَيْنِ.
আবূ যার! এই উহুদ পাহাড়টির সমপরিমাণ স্বর্ণও যদি আমার হাতে আসে, তবুও আমি ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়া তিন দিনের বেশি এক দীনারও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে হাতে রাখবো না। ৫০৮
বর্ণিত রয়েছে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হুজরাতে বসে আছেন। এমন সময় এক বালক এসে একটি কাপড় চাইলো। বললো, মা একটি কাপড়ের কথা বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরগায়ে তখন একটি মাত্র কাপড় ছিল। তিনি বালকটিকে বললেন, ঠিক আছে, এখন যাও, কোনো কাপড় এলে অবশ্যই পাবে। এখন আমার কাছে গায়ের চাদরটি ছাড়া আর কোনো কাপড় নেই। চলে গেলো বালকটি। কিছুক্ষণ পর সে আবার ফিরে এসে বললো, মা বলেছেন আপনার গায়ের চাদরটিই দিয়ে দিতে। এবার আর তিনি না করতে পারলেন না। কারণ, কাউকে কোনো বিষয়ে না করতে তাঁর দারুণ কষ্ট হয়। একমাত্র গায়ের চাদরটি খুলে দিলেন। কিন্তু খালি গায়ে বেরোবেন কী করে! তাই হুজরা খানায় বসে রইলেন। এ দিকে নামাযের আযান হয়েছে। সাহাবীগণ (রা.) মাসজিদে অপেক্ষা করছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসছেন না। এমন তো কখনো হয় না। কোনো বিপদ হয়নি তো! ইত্যবসরে একজন সাহাবী ওঠে আসলেন। ডাকলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হুজরার বাইরে থেকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা বললেন, দেরী হবার কারণ বললেন। সাহাবীটি দ্রুত একটি কাপড় এনে পবিত্র খিদমাতে পেশ করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেরিয়ে এলেন এবং মাসজিদে গিয়ে ইমামাত করলেন।
এভাবে দানশীলতার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন অসংখ্য নযীর স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে যেগুলোর তুলনা খোঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন যা হাতে পেতেন, সাথে সাথে তা অন্যকে দান করে দিতেন। দান করার ক্ষেত্রে তাঁর আনন্দ দান গ্রহণকারীর চেয়েও অনেক বেশি ছিল। নিজের প্রয়োজনের চেয়েও তিনি অন্যের প্রয়োজনকে বড় করে দেখতেন। শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামই নন; তাঁর স্বর্ণোজ্জ্বল সমাজের সদস্যগণও দানশীলতার ক্ষেত্রে প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দান-সাদাকাহ ছিলো তাঁদের অধিকতর প্রিয় 'আমাল। তাঁরা কেবল অভাব-অনটন ও দুঃসময়ে দান করতেন, তা নয়; বরং এটি ছিলো তাঁদের নিত্যকর্ম, যা তাঁদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। তাঁরা সাধ্যমতো কি যুদ্ধ, কি শান্তি, কি দুঃসময় কি সুসময় তথা সর্বাবস্থায় দান করতেন। পরবর্তীতে উম্মাতের মধ্যে আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দাহগণও সাহাবীগণের এ অনুপম আদর্শ অনুকরণ করেন। তাঁদের কেউ কেউ যাকাত আদায় করাকেও কার্পণ্যের লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁদের কথা হলো- এর চেয়ে কার্পণ্য আর কী হতে পারে যে, তার আশেপাশের লোকেরা অনাহারে থাকে, বিবস্ত্র থাকে, আর সে সারা বছর অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় করে রাখে এবং দরিদ্রদেরকে এভাবে দেখতে থাকে। বছর শেষে দুশত দিরহাম থেকে শুধু পাঁচ দিরহাম দান করে আর মনে করে যে, সে আল্লাহর নি'মাতের হক আদায় করেছে। তাঁরা আরো মনে করেন যে, মু'মিনদের গুণই হলো দানশীল হওয়া এবং দানশীলের অভ্যাস হলো দান করা। কাজেই দানশীল ব্যক্তি এতো পরিমাণ অর্থ-সম্পদ কখনোই জমা করতে পারে না যে, বছর শেষে তার ওপর যাকাত ফারয হতে পারে। একবার এক 'আলিম বিশিষ্ট 'আবিদ শাইখ আবু বাক্ আশ-শিবলী [২৪৭-৩৩৪ হি.) (রাহ.)- এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, কী পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত আদায় করতে হয়? তিনি উত্তরে বললেন,
'দু'শ দিরহাম যদি এক বছর কারো নিকট জমা থাকে, তবে পাঁচ দিরহাম যাকাত আদায় করতে হবে। বিশটি দীনার এক বছর থাকলে বছর শেষে অর্ধ দীনার যাকাত দিতে হয়। কিন্তু এ মাস'আলা হলো তোমাদের নীতি অনুযায়ী। আমাদের নীতি হলো, তোমার নিকট এমন কোনো সম্পদ থাকাই উচিত নয়, যাতে যাকাত ওয়াজিব হতে পারে।
উক্ত 'আলিম জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের এ নীতির ইমাম কে? তিনি বললেন, এ নীতিতে আমাদের ইমাম হলেন আবু বাক্স আস-সিদ্দীক (রা.)। তাবুক যুদ্ধের সময় যখন তিনি তাঁর যাবতীয় সম্পদ দান করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু বাক্স! তোমার পরিবারবর্গের জন্য কী রেখে এসেছো? তখন আবূ বাক্স (রা.) উত্তর দিলেন, 'তাদের জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলই যথেষ্ট। ৫১০
জনৈক কবি” কতো চমৎকার বলেছেন,
وما وجبت على زكاة مال ... وهل تجب الزكاة على الجواد؟ "আমার ওপর সম্পদের যাকাত ওয়াজিব হয় না। দানশীলদের ওপরও কী যাকাত ওয়াজিব হয়? ৫১২
অর্থাৎ দানশীলদের হাতে অর্থ-সম্পদ আসার সাথে সাথেই তাঁরা তা দান করে ফেলেন। সারা বছর অর্থ-সম্পদ জমা করে রাখার মতো সুযোগই তাঁদের হয় না। তাই তাঁদের জন্য যাকাতের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এর অর্থ এ নয় যে, দানশীল ব্যক্তিদের নিকট বৎসরান্তে যাকাত দেয়ার মতো সম্পদ থাকলেও যাকাত দিতে হবে না। আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন যা হাতে পেতেন, সাথে সাথে তা অন্যকে দান করে দিতেন।

টিকাঃ
৫০৪. আল-কোরআন, সূরা আদ-দাহর, ৭৬: ৮-৯
৫০৫. আল-কোরআন, সূরা আদ-দাহর, ৭৬: ৮-৯
৫০৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, (হাদীসু উম্মি সালামাহ), হা. নং: ২৬৬৭২; তাবারী, তাহযীবুল আসার, হা. নং: ২৪৭৮
৫০৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-'আমাল ফিস সালাত), হা. নং: ১১৬৩
৫০৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আর-রিকাক), হা. নং: ৬০৮০; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যাকাত), হা. নং: ২৩৫১
৫১০. হাজবিরী, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ১৭০-১
৫১১. কারো কারো মতে, এ কবিতাটি 'আলী (রা.)-এর রচিত। কারো মতে, বাক্স ইবনুন নাত্তাহ-এর রচিত।
৫১২. হাজবিরী, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ১৭১; ইবনু 'আব্দি রাব্বিহি, আল-'ইকদুল ফারীদ, খ. ১,পৃ. ৬৬; ইবনু হিব্বান, রাওদাতুল 'উকালা..., পৃ. ২৩৮; ইবনু সা'ঈদ আল-আন্দালুসী, আল-মুরাক্কিসাত..., পৃ. ১৮

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 নাফল হজ্জ ও 'উমরাহ

📄 নাফল হজ্জ ও 'উমরাহ


জীবনে একবার হাজ্জ পালন করা ফারয হলেও প্রত্যেক বছর হাজ্জ করতেও কোনো অসুবিধা নেই। অধিকন্তু, সামর্থ্যবান লোকদের জন্য প্রত্যেক বছর কিংবা কয়েক বছর পর পর হাজ্জ করা উত্তম। হাদীসে সামর্থ্যবান লোকদেরকে অন্তত প্রতি চার কিংবা পাঁচ বছর অন্তর অন্তর হজ্জ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يقول الله عز وجل : إن عبدا أصححت له بدنه ، وأوسعت عليه في الرزق ، لَمْ يعد إلي في كُلِّ أربعة أعوام لمحروم.
আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তিকে আমি সুস্থ দেহ ও পর্যাপ্ত সম্পদ দান করেছি, সে যদি প্রতি চার বৎসর অন্তর অন্তর আমার কাছে না আসে, তা হলে সে অবশ্যই (আমার রহমত থেকে) বঞ্চিত হবে। ৫১৩ 'উমরাহ হলো ছোট্ট হাজ্জ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়ামানবাসীদের নিকট তাঁর প্রেরিত এক পত্রে লিখেন, .إن العمرة الحج الأصغر "নিশ্চয় 'উমরাহ হলো ছোট্ট হাজ্জ।”৫১৪ কাজেই সামর্থ্যবান লোকদের জন্য জীবনে অন্তত একবার 'উমরাহ করা সুন্নাত (মুয়াক্কাদা)। তা ছাড়া যখনই সময় ও সুযোগ পাওয়া যাবে, তখনই 'উমরাহ করা যেতে পারে। এতে বান্দাহ প্রচুর কল্যাণ ও বারকাত লাভ করবে। হাদীসে 'উমরাহর বিভিন্ন ফাযীলাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْعُمْرَةُ إِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةً لِمَا بَيْنَهُمَا “এক 'উমরাহ পরবর্তী 'উমরাহর মধ্যবর্তী সময়ের সকল পাপের জন্য কাফফারা হয়।”৫১৫ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِي الْكِيرُ حَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ.
হাজ্জ ও 'উমরা পরপর আদায় করতে থাকো। কেননা হাজ্জ ও 'উমরাহ উভয়ই দারিদ্র ও গুনাহগুলোকে এমনভাবে দূরীভূত করে, যেমন আগুনের হাপর লোহা সোনা ও রূপার ময়লা দূরীভূত করে।৫১৬
উল্লেখ্য যে, রামাদানে 'উমারাহ করার বিশেষ ফাযীলাত রয়েছে। এ মাসে 'উমরাহ হাজ্জের সমতুল্য। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈকা মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, فَإِذَا جَاءَ رَمَضَانُ فَاعْتَمِرِي فَإِنْ عُمْرَةً فِيهِ تَعْدِلُ حَجَّةً -"যখন রামাদান আসবে, তখন তুমি 'উমরা করো। কেননা এ মাসে একটি 'উমরাহ একটি হাজ্জের সমান।”৫১৭ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَنَّهَا تَعْدِلُ حَجَّةٌ مَعِى “তা (অর্থাৎ রামাদানে 'উমরাহ করা) আমার সাথে হাজ্জ করার সমান।”৫১৮

টিকাঃ
৫১৩. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৪৯৩; 'আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৮৮২৬
ইমাম বাইহাকী (রা.) তাঁর 'আস-সুনানুল কুবরা' (৫/২৬২) গ্রন্থে এবং বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল- ফাকিহী তাঁর 'আখবারু মক্কা' (হা. নং: ৯০৩, ৯০৪) গ্রন্থে সাইয়িদুনা আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী ও সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে এ সংক্রান্ত দুটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তবে ইমাম বাইহাকীর দুটি বর্ণনাতেই চার বৎসরের স্থলে পাঁচ বৎসরের কথা বলা হয়েছে। আর ফাকিহী আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে যে বর্ণনাটি নকল করেছেন সেখানে 'চার কিংবা পাঁচ' বৎসরের কথা সন্দেহের সাথে উল্লেখিত রয়েছে। বিশিষ্ট হাদীসবিশারদ আলবানী হাদীসটিকে সাহীহ বলে উল্লেখ করেছেন। (আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ, খ. ৪,পৃ. ২২১-৪)
৫১৪. ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, (অধ্যায়: আত-তারীখ, পরিচ্ছেদ: কুতুবুন্নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম), হা. নং: ৬৫৫৯
৫১৫. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-'উমরাহ), হা. নং: ১৬৮৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-হাজ্জ), হা. নং: ৩৩৫৫
৫১৬. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-হাজ্জ) হা. নং: ৮১০; নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: মানাসিকুল হাজ্জ), হা. নং: ২৬৩১। ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ-গারীব।
৫১৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-'উমরাহ), হা. নং:১৬৯০; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-হাজ্জ), হা. নং: ৩০৯৭
৫১৮. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মানাসিক), হা. নং: ১৯৯২ শাইখ আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 ই'তিকাফ

📄 ই'তিকাফ


ই'তিকাফ একটি বিশিষ্ট মর্যাদাপূর্ণ 'ইবাদাত এবং আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির একটি অনন্য ব্যবস্থা। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রাহ.) ই'তিকাফের বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,
وَشَرَعَ لَهُمُ الاعْتِكَافَ الَّذِي مَقْصُودُهُ وَرُوحُهُ عُكُوفُ الْقَلْبِ عَلَى اللَّهِ تَعَالَى ، وَجَمْعِيتُهُ عَلَيْهِ وَالْحَلْوَةُ بِهِ وَالِانْقِطَاعُ عَنْ الِاشْتِغَالِ بِالْخَلْقِ وَالِاشْتِغَالُ بِهِ وَحْدَهُ سُبْحَانَهُ بِحَيْثُ يَصِيرُ ذِكْرُهُ وَحُبّهُ وَالْإِقْبَالُ عَلَيْهِ فِي مَحَلَّ هُمُومِ الْقَلْبِ وَخَطَرَاتِهِ، فَيَسْتَوْلِي عَلَيْهِ بَدَلَهَا ، وَيَصِيرُ الْهَمْ كُلَّهُ بِهِ وَالْخَطَرَاتُ كُلَّهَا بِذِكْرِهِ وَالتَّفَكَّرِ فِي تَحْصِيلِ مَرَاضِيهِ وَمَا يُقَرِّبُ مِنْهُ فَيَصِيرُ أَنْسُهُ بِاللَّهِ بَدَلًا عَنْ أُنْسِهِ بِالْخَلْقِ فَيَعُدُّهُ بِذَلِكَ لِأَنْسِهِ بِهِ يَوْمَ الْوَحْشَةِ فِي الْقُبُورِ حِينَ لَا أَنِيسَ لَهُ وَلَا مَا يَفْرَحُ بِهِ سِوَاهُ فَهَذَا مَقْصُودُ الاعْتِكَافِ الْأَعْظَمِ.
আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য ই'তিকাফের বিধান জারি করলেন। এর উদ্দেশ্য ও প্রাণ হলো- একান্ত নিভৃতে আল্লাহ তা'আলার প্রতি সর্বান্তকরণে নিবিষ্ট থাকা এবং সৃষ্টির সাথে যাবতীয় যোগাযোগ ছিন্ন করে আল্লাহর ধ্যানে একান্তই নিমগ্ন থাকা। যাতে মানবমনের যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা জুড়ে তাঁর যিকর, ভালোবাসা ও আকর্ষণই একাধিপত্য লাভ করতে পারে। মনের যাবতীয় চিন্তাই হবে আল্লাহকে ঘিরে এবং এর সকল ভাবনার উদয় হবে তাঁর যিকরকে কেন্দ্র করে। উপরন্তু, সে নিরন্তর তাঁর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য অর্জনের চিন্তায় রত থাকবে। এভাবে সৃষ্টির পরিবর্তে আল্লাহর সাথেই তাঁর দহরম গড়ে ওঠবে। এর ফলে সে কবরের নিঃসঙ্গতার সময়- যেখানে আল্লাহ ব্যতীত কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু কিংবা কোনো আনন্দদায়ক বিষয় থাকবে না তখন- তাঁর এ সম্পর্কের ফল পেতে থাকবে। এটিই হলো ই'তিকাফের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। ৫১৯
এ মহান উদ্দেশ্য অর্জন করার অভিপ্রায়ে ই'তিকাফের জন্য এমন মাসজিদ নির্বাচন করতে পারলে ভালো, যেখানে মু'তাকিফ কাউকে চিনবে না এবং তাকেও কেউ চিনবে না। তা হলেই নিভৃতে সর্বান্তকরণে আল্লাহ তা'আলার যিকর ও 'ইবাদাতে সর্বক্ষণ রত থাকা সম্ভব হবে।
সাইয়িদুনা ইব্রাহীম 'আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে সকল নাবী-রাসূলই ই'তিকাফ থাকতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ عَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السجود
এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমা'ঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই'তিকাফকারী ও রুকূ'-সাজদাকারীদের জন্য পবিত্র রেখো। ৫২০ এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, সাইয়িদুনা ইব্রাহীম 'আলাইহিস সালাম থেকে আল্লাহর ঘরে ই'তিকাফের সুন্নাত জারী হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ই'তিকাফের জন্য বৎসরের সেরা সময়- রামাদানের শেষ দশককে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি প্রতি বছর নিজেই রামাদানে এ সময় ই'তিকাফ থাকতেন। উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ইন্তিকাল পর্যন্ত প্রতি বছর রামাদানের শেষ দশকে ই'তিকাফে থাকতেন। তাঁর পরে তাঁর সহধর্মিণীগণ (রা.) ই'তিকাফে থাকতেন। ৫২১
বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে ই'তিকাফের জন্য উৎসাহিত করেছেন। 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
وَمَنْ اعْتَكَفَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ تَعَالَى جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ ثَلَاثَ خَنَادِقَ كُل خَنْدَقِ أَبْعَدُ مِمَّا بَيْنَ الْحَافِقَيْنِ .
যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একদিন ই'তিকাফ থাকলো, আল্লাহ তা'আলা তার ও জাহান্নামের মধ্যে তিনটি পরিখা সৃষ্টি করে দেবেন। প্রত্যেক পরিখার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিম দু দিগন্তের চেয়েও বেশি ব্যবধান থাকবে। ৫২২

টিকাঃ
৫১৯. ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মা'আদ, খ. ২, পৃ. ৮৭
৫২০. আল-কোরআন, ২ (সূরা আল-বাকারাহ): ১২৫
৫২১. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ই'তিকাফ), হা. নং: ১৯২২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ই'তিকাফ), হা. নং: ২৮৪১
৫২২. তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৭৫৩৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৪: আল- ই'তিকাফ), হা. নং: ৩৬৭৯ এ হাদীসটি দা'ঈফ। (আলবানী, দা'ঈফুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ২, ৯৫, হা. নং: ১৫৭৩)

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠ

📄 রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠ


রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ 'আমাল। এ 'আমালের মাধ্যমে একসাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। এটি মু'মিনের আত্মার একটি খোরাক। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরওপর সালাত ও সালাম পাঠের পদ্ধতি, উপকারিতা ও না পড়ার ক্ষতি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রয়েছে। পবিত্র কুর'আনেও এর প্রতি ব্যাপক তাগিদ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تسليما
নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নাবীর ওপর রাহমাত প্রেরণ করেন। হে মু'মিনগণ, তোমরা নবীর জন্য রাহমাতের দু'আ করো এবং তাঁর প্রতি সালাম পাঠাও। ৫২৩
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরওপর সালাত ও সালাম পেশ করার নির্দেশ দান করেছেন। তবে অন্যান্য নির্দেশের তুলনায় এ নির্দেশের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর সেটি হচ্ছে, এটা এমন একটা কাজ, যেটি তিনি নিজেও করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর সালাত ও সালাম পাঠের বহু ফাযীলাত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বলেছেন, مَنْ صَلَّى عَلَى وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرًا - "যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার সালাত পাঠ করে, আল্লাহ তা'আলা তার ওপর দশবার রাহমাত বর্ষণ করেন।” ৫২৪ শুধু তাই নয়; কোনো কোনো রিওয়ায়াতে এও এসেছে যে, وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيئَاتٍ وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ - "তার আমলনামা থেকে দশটি গুনাহ মুছে দেয়া হয় এবং তার জন্য দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয়া হয়।” ৫২৫ 'আবদুর রাহমান ইবনু 'আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসজিদ থেকে বের হয়ে কোনো এক খেজুর বাগানে ঢুকে পড়লেন। আমি তাঁর পেছনে অনুসরণ করলাম। অতঃপর তিনি সাজদারত হলেন। তাঁর সাজদা খুবই দীর্ঘায়িত হলো। এমনকি আমি এতে খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত হলাম। না জানি, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মৃত্যু দান করলেন এবং জান কাব্য করে নিলেন। তারপর আমি তাঁর খুব কাছে গিয়ে দেখতে লাগলাম। তিনি মাথা উঠিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আবদুর রাহমান! তুমি এখানে কেন এসেছো? 'আবদুর রাহমান (রা.) বলেন, আমি আমার ভীতিকর অবস্থার কথা বললাম। অতঃপর তিনি বললেন,
إِنَّ جَبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامِ قَالَ لِي أَنَا أَبَشِّرُكَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلٌ يَقُولُ لَكَ مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ صَلَّيْتُ عَلَيْهِ وَمَنْ سَلَّمَ عَلَيْكَ سَلَّمْتُ عَلَيْهِ.
নিঃসন্দেহে জিব্রা'ঈল (আ.) আমাকে বলেছেন, আমি কি আপনাকে সুসংবাদ দেবো না? নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি আপনার ওপর সালাত পাঠ করে, আমি তার প্রতি রাহমাত বর্ষণ করি। আর যে ব্যক্তি আপনার প্রতি সালাম পেশ করে, আমি তার শান্তি বিধান করি। ৫২৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরওপর সালাত ও সালাম পাঠ তাঁর প্রতি ভালোবাসার একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শনও। কেউ ঐকান্তিকভাবে এ 'আমাল করলে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসায় সিক্ত হবেই। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশাপাশি আল্লাহ তা'আলাও বান্দাহর প্রতি রাহমাতের দৃষ্টিপাত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلَاةً - "ক্বিয়ামাতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী সেই ব্যক্তি হবে, যে আমার ওপর অধিক মাত্রায় সালাত পাঠ করবে।”৫২৭ 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
إِنَّ الدُّعَاءَ مَوْقُوفٌ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا يَصْعَدُ مِنْهُ شَيْءٍ حَتَّى تُصَلِّيَ عَلَى نَبِيِّكَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
দু'আ আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে স্থগিত অবস্থায় থাকে। তা ওপরে ওঠে না, যে যাবত না তুমি নাবীর ওপর সালাত পাঠ করবে। ৫২৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরওপর সালাত ও সালাম পাঠ করার অনেক নিয়ম-পদ্ধতি রয়েছে। নামাযের মধ্যে প্রসিদ্ধ দরূদে ইব্রাহীমীটি পাঠ করা সুন্নাত। তবে সাধারণত কোনো স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম যখন উচ্চারণ করা হবে, তখন তাঁর ওপর সালাত পাঠ করা ওয়াজিব। এ প্রসঙ্গে 'আলিমগণ সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত-একটি হাদীস দলীল হিসেবে পেশ করেন। তিনি বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلْيُصَلِّ عَلَيَّ- “যার কাছে আমার নাম উল্লেখ করা হয়, সে যেন তৎক্ষণাৎ আমার ওপর সালাত পাঠ করে।”৫২৯ তবে একই মাজলিসে বারবার নাম উচ্চারিত হলে একবার সালাত পাঠ করলেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যায়। তবে প্রতিবার পাঠ করা মুস্তাহাব্ব। এ ছাড়া যে কোনো সময় ঐকান্তিকভাবে সালাত ও সালাম পাঠ করা অনেক পুণ্যের কাজ। বিশেষ করে জুমু'আর দিন ও রাতে সালাত ও সালাম পাঠ করা খুবই কল্যাণকর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَكْثِرُوا عَلَيَّ الصَّلَاةَ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ، وَلَيْلَةِ الْجُمُعَةِ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ كُنْتُ لَهُ شهِيدًا، أَوْ شَافِعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
তোমরা জুমু'আর দিন ও রাতে আমার ওপর বেশি করে সালাত পাঠ করো। যে ব্যক্তি এরূপ করবে কিয়ামাতের দিন আমি তার জন্য সাক্ষী ও সুপারিশকারী হবো। ৫৩০
উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সালাত ও সালামের মুখাপেক্ষী নন। এর কারণ, তিনি নিজেই রাহমাতুল লিল 'আলামীন, বিশ্ব জাহানের জন্য দয়ার সাগর। আমাদের সালাত ও সালাম পাঠানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁকে সম্মান করা, তা'যীম করা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর নাম চর্চা করা। তাঁর এ অনন্য সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ তা'আলাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সালাত ও সালাম পাঠানোর বিনিময়ে বহুগুণে যে প্রাপ্তি, তা আমাদের নিজেদেরই। বস্তুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাহাব্বাত অর্জন এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ-সুন্নাত অনুসরণের যে চেষ্টা-সাধনা ও অনুশীলন- প্রকৃতপক্ষে সেটি ঈমানেরই মেহনাত।

টিকাঃ
৫২৩. আল-কোরআন, ৩৩ (সূরা আল-আহযাব): ৫৬
৫২৪. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ৯৩৯
৫২৫. নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুস সালাت), হা, নং: ১২৯৭
৫২৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৬৬২; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-ইমামাহ), হা. নং: ৮১০, (কিতাব: আদ-দু'আ), হা. নং: ২০১৯ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শু'আইব আল-আরনাউত (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান লি-গাইরিহি।
৫২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিত্র), হা. নং: ৪৮৪; ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ৯১১ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব।
৫২৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিত্র), হা. নং: ৪৮৬ শাইখ আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান।
৫২৯. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৪৯৪৮; নাসা'ঈ, আস-সুনানুল কুবরা, হা. নং: ৯৮৮৯ শাইখ আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ লি-গাইরিহি। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ২, পৃ. ১৩৪, হা. নং: ১৬৫৭
৫৩০. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২১: আস-সালাত), হা. নং: ২৭৭১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00