📄 অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্ছিত ও অনর্থক কথা বলা
মানুষের কথা বলার ক্ষমতা আল্লাহ তা'আলার এক মহান নি'মাত এবং এটার যথার্থ ব্যবহার হওয়া উচিত। উল্লেখ্য যে, কথা বলার যোগ্যতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা করে পৃথক মর্যাদা দিয়েছে। ৪২০ ইসলামের নির্দেশ হলো- প্রতিটি মু'মিনের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র, সুন্দর ও অর্থপূর্ণ কথা বলা এবং কথার অপব্যবহার না করা এবং অর্থহীন, অশ্লীল ও অযাচিত কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। ৪২১ কথা বলার যৌক্তিক কারণ না থাকলে এবং ভালো ও উত্তম কথা বলা না গেলে নীরব থাকাই শ্রেয়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী ঈমানদারগণের অন্যতম গুণ এই যে, তারা অর্থহীন কথাবার্তা বলে না এবং অলস বাচালতায় লিপ্ত লোকদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ﴾وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرضُونَ -"আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪২২ অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ﴾وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غير- "যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহে ছিদ্রান্বেষণের উদ্দেশ্যে আলোচনা-সমালোচনা করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান, যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়।”৪২৩ এ আয়াতে যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, উদ্দেশ্য হলো তাঁর উম্মাত। এখানে তাদেরকে বাতিল ও মিথ্যাপন্থীদের মাজলিস এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইমাম আবু বাকর আল-জাসসাস [৩০৫-৩৭০ হি.] (রাহ.) বলেন, এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, যে মাজলিসে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল কিংবা শারী'আতের বিরুদ্ধে কথাবার্তা হয় এবং তা বন্ধ করা কিংবা কমপক্ষে সত্য কথা প্রকাশ করার সাধ্য না থাকে, তবে এরূপ প্রত্যেকটি মাজলিস বর্জন করা মুসলমানদের উচিত। ৪২৪
পবিত্র হাদীসেও অনর্থক ও অযাচিত কথাবার্তার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ-"যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে। "৪২৫ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ وَلَا يَدْخُلُ رَجُلُ الْجَنَّةَ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ.
অন্তর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দাহর ঈমান ঠিক হবে না এবং জিহ্বা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্তর ঠিক হবে না। আর এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার নিপীড়ন থেকে নিরাপদ নয়। ৪২৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথাগুলোর অর্থ হলো- মানুষের ঈমান বিশুদ্ধ হবে না যদি তার কথা বিশুদ্ধ অর্থাৎ উত্তম ও ভালো না হয়। অর্থাৎ কথার বিশুদ্ধতার ওপরই ঈমানের বিশুদ্ধতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অধিকন্তু, একজন মানুষ তার মুখের কথার বিষয়ে সতর্ক না হলে সে এই দুনিয়ার জীবন এবং আখিরাতে বহু বিপদের সম্মুখীন হবে। বেপরোয়া ও লাগামহীন কথাবার্তা যেমন আখিরাতে মানুষের ক্ষতির কারণ হবে, তেমনি দুনিয়ার জীবনেও তা মারাত্মক শত্রুতার জন্ম দিতে পারে। 'উকবাহ ইবনু 'আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, يَا رَسُولَ اللَّهُ مَا النَّجَاةُ؟ -" ইয়া রাসূলাল্লাহ, মুক্তি কোন্ পথে?" তিনি জবাব দিলেন, ...أَمْسَكَ عَلَيْكَ لِسَانَكَ-"তোমার যবানকে নিয়ন্ত্রণ করো।....”৪২৭ একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম وَإِنْ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الثَّرْتَارُونَ وَالْمُتَشَدِّقُونَ وَالْمُتَفَيْهِقُونَ “কিয়ামাতের দিন আমার কাছে সবচাইতে ঘৃণিত ও আমার নিকট থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল, কটুভাষী ও দাম্ভিকরা।”৪২৮ তিনি আরো বলেন,
لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنْ كَثْرَةَ الْكَلَامِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ قَسْوَةُ الْقَلْبِ، وَإِنْ أَبَعْدَ النَّاسِ مِنَ اللَّهِ الْقَلْبُ الْقَاسِي.
তোমরা আল্লাহর যিকরবিহীন অধিক কথাবার্তা বলো না। কেননা, আল্লাহর যিকরবিহীন কথাবার্তা অন্তরকে কঠিন করে তোলে। আর আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য থেকে সব চাইতে বেশি দূরে অবস্থানকারী হলো কঠিন অন্তর ওয়ালা ব্যক্তিই। ৪২৯
ইসলামের আরো নির্দেশনা হলো- দুটি বিবদমান প্রতিপক্ষের মধ্যে শত্রুতা ও বিরোধ কমাতে হলে মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দিয়ে দেবার প্রবণতা ত্যাগ করা উচিত। বরঞ্চ মুসলমানদের উচিত, শত্রুদের বৈরিতার জবাব বন্ধুত্ব দিয়ে দেয়া, যাতে চূড়ান্তভাবে শত্রুতাকারী ব্যক্তির হৃদয় জয় করা যায়। বস্তুতপক্ষে এ পন্থায় শত্রুতাসম্পন্ন লোকেরাও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّكُمْ لَا تَسَعُونَ النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَسْعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ الْوَجْهِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ "তোমরা তোমাদের অর্থ-সম্পদ দিয়ে সকলের মন জয় করতে পারবে না। কিন্তু দুটি জিনিস দিয়ে তোমরা সবার মন জয় করতে পারবে। তা হচ্ছে সদাহাস্যমুখ ও সুন্দর ব্যবহার।”৪৩০ তিনি আরো বলেন যে, "যদি কোনো মুসলিম দেখে যে, তার কারো সাথে আলোচনা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি ও বিবাদের দিকে মোড় নিচ্ছে, তখন সে যেন বিতর্ক বন্ধ করে নিজের কথার জন্য অগ্রিম ক্ষমা চায়।" তবে ইসলাম সর্বক্ষেত্রে নতজানু হতে বলে না; বরং তাদের বিনয়ী ও আত্মমর্যাদাশীল হতে বলে। কোনো অজ্ঞ, বদমেজাজী ও ক্রুদ্ধ ব্যক্তির অন্যায় ও অশ্লীল কথার জবাব অন্যায় কথা দিয়ে দিতে গেলে মুসলিম অবশ্যই তার মর্যাদাই হারাবে। এ জন্য এসব পরিস্থিতিতে নীরব থাকাই কল্যাণকর। অতএব, যদিও এমন প্রতিটি পরিস্থিতিই অন্য পরিস্থিতির চেয়ে পৃথক। কাজেই স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোন্ পন্থা অবলম্বন করা উত্তম, সেটা মুসলিম নিজেই বিবেচনা করবে। তবে তাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, তার কথার মাধ্যমে যেন শত্রুতা-বৈরিতা কোনোভাবে না বাড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّعَانِ وَلَا الْفَاحِشَ وَلَا الْبَذِيء “মু'মিন না দোষারোপকারী হয়, না লা'নাতকারী, না অশ্লীলভাষী আর না বাচাল হয়। "৪৩১
পারস্পরিক কথাবার্তায় অনেক সময় তর্ক-বিতর্ক হয়। একজন মু'মিনকে যথাসম্ভব এ তর্ক-বিতর্কও এড়িয়ে চলা দরকার। মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রা.) বলেন, إِيَّاكُمْ وَالْمِرَاء فَإِنَّهَا سَاعَةُ جَهْلِ الْعَالِمِ وَبِهَا يَبْتَغِي الشَّيْطَانُ زَلْتَهُ. “তোমরা তর্ক-বিতর্ক থেকে বেঁচে থাকো। কেননা এটি 'আলিমের অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করার মুহূর্ত। আর শাইতান এর মাধ্যমে তার পদস্খলন ঘটাতে চায়।”৪৩২ উল্লেখ্য যে, কখনো যুক্তি-তর্কে ইতিবাচক দিকও থাকে। আর এটা হলো- এমন তর্ক বা যুক্তি, যার পেছনে মহৎ উদ্দেশ্য আছে এবং যেখানে উভয় পক্ষই খোলামেলা সত্যের সন্ধানে উৎসুক। পবিত্র কোরআনে এমন তর্ককে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴿ - “আর সবচেয়ে সুন্দর উপায়ে তর্ক-বিতর্ক করো।”৪৩৩ এ আয়াতের মর্ম হলো- যদি দা'ওয়াতের কাজে কোথাও তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে তাও অতীব উত্তম উপায়ে হতে হবে। এখানে উত্তম উপায় বলতে বোঝানো হয়েছে, কথাবার্তায় নম্রতা ও নমনীয়তা অবলম্বন করতে হবে, এমন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যা প্রতিপক্ষ বোঝতে সক্ষম হয়। বিশুদ্ধ ও বাস্তবসম্পন্ন দলীল-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষের সন্দেহ দূরীভূত হয় এবং সে হঠকারিতার পথ পরিহার করে।
পক্ষান্তরে ইসলাম যুক্তি-তর্কের নামে ঐ সব লোকের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়াকে অনুৎসাহিত করেছে, যারা সত্য থেকে তাদের মনের দুয়ার রুদ্ধ করেছে এবং তর্কের খাতিরেই তর্ক করে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও এ জাতীয় লোকদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে উম্মাতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْحَدَلَ. "যে কোনো কাওম হিদায়াত লাভের পরে যখনই অর্থহীন তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়, তখন তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।" রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথার প্রমাণ হিসেবে তিলাওয়াত করলেন, مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ -"তারা আপনার কাছে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে, তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুত তারা হলো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।” (আল-কোরআন, ৪৩:৫৮) ৪৩৪ এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকেরাও স্বার্থান্ধ, বাচাল, তর্ককারী লোকের সাথে অর্থহীন আলোচনায় জড়িয়ে পড়ে পথ হারাতে পারে।
টিকাঃ
৪২০. দ্র. আল কোরআন, সূরা আর-রাহমান, ৫৫:৪
৪২১. দ্র. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৮৩; সূরা আল-ইসরা', ১৭: ৫৩
৪২২. আল কোরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, ২৩:৩
৪২৩. আল কোরআন, সূরা আল-আন'আম, ৬: ৬৮
৪২৪. জাসসাস, আহকামুল কোরআন, খ.৪, পৃ.১৬৬
৪২৫. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং:৫৬৭২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৮২
৪২৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩০৪৮; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৮৮৭ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শু'আইব আল-আরনাউত (রাহ.)-এর মতে, এ হাদীসের সনদ দুর্বল।
৪২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪০৬; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২২২৩৫
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০১৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪১১; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৪: হিফযুল লিসান), হা. নং: ৪৬০০; ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। তাছাড়া এ হাদীসটি সামান্য শব্দগত পরিবর্তনসহ 'মুওয়াত্তা' (হা. নং: ৯৭৫)-এর মধ্যেও বর্ণিত আছে।
৪৩০. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-'ইলম), হা. নং: ৪২৭, ৪২৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৬৯৫ বিশিষ্ট, মুহাদ্দিস আল-হাকিম (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ। তবে শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, খ. ১১, পৃ. ৩০০, হা. নং: ৪৮৫৩)
৪৩১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯৭৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৩৮৩৯ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দাঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৪, পৃ. ৪৭৭)
৪৩২. দারিমী, আস-সুনান, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৩৯৬ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হুসাইন সালীম (রাহ.) বলেন, হাদীসটির সনদ সাহীহ।
৪৩৩. আল কোরআন, সূরা আন-নাহল, ১৬: ১২৫
৪৩৪. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩২৫৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মুকাদ্দামাহ, বাব: ইজতিনাবুল বিদা'..), হা. নং: ৪৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।
মানুষের কথা বলার ক্ষমতা আল্লাহ তা'আলার এক মহান নি'মাত এবং এটার যথার্থ ব্যবহার হওয়া উচিত। উল্লেখ্য যে, কথা বলার যোগ্যতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা করে পৃথক মর্যাদা দিয়েছে। ৪২০ ইসলামের নির্দেশ হলো- প্রতিটি মু'মিনের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র, সুন্দর ও অর্থপূর্ণ কথা বলা এবং কথার অপব্যবহার না করা এবং অর্থহীন, অশ্লীল ও অযাচিত কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। ৪২১ কথা বলার যৌক্তিক কারণ না থাকলে এবং ভালো ও উত্তম কথা বলা না গেলে নীরব থাকাই শ্রেয়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী ঈমানদারগণের অন্যতম গুণ এই যে, তারা অর্থহীন কথাবার্তা বলে না এবং অলস বাচালতায় লিপ্ত লোকদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ﴾وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرضُونَ -"আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪২২ অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ﴾وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غير- "যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহে ছিদ্রান্বেষণের উদ্দেশ্যে আলোচনা-সমালোচনা করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান, যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়।”৪২৩ এ আয়াতে যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, উদ্দেশ্য হলো তাঁর উম্মাত। এখানে তাদেরকে বাতিল ও মিথ্যাপন্থীদের মাজলিস এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইমাম আবু বাকর আল-জাসসাস [৩০৫-৩৭০ হি.] (রাহ.) বলেন,
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, যে মাজলিসে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল কিংবা শারী'আতের বিরুদ্ধে কথাবার্তা হয় এবং তা বন্ধ করা কিংবা কমপক্ষে সত্য কথা প্রকাশ করার সাধ্য না থাকে, তবে এরূপ প্রত্যেকটি মাজলিস বর্জন করা মুসলমানদের উচিত। ৪২৪
পবিত্র হাদীসেও অনর্থক ও অযাচিত কথাবার্তার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ-"যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে। "৪২৫ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ وَلَا يَدْخُلُ رَجُلُ الْجَنَّةَ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ.
অন্তর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দাহর ঈমান ঠিক হবে না এবং জিহ্বা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্তর ঠিক হবে না। আর এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার নিপীড়ন থেকে নিরাপদ নয়। ৪২৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথাগুলোর অর্থ হলো- মানুষের ঈমান বিশুদ্ধ হবে না যদি তার কথা বিশুদ্ধ অর্থাৎ উত্তম ও ভালো না হয়। অর্থাৎ কথার বিশুদ্ধতার ওপরই ঈমানের বিশুদ্ধতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অধিকন্তু, একজন মানুষ তার মুখের কথার বিষয়ে সতর্ক না হলে সে এই দুনিয়ার জীবন এবং আখিরাতে বহু বিপদের সম্মুখীন হবে। বেপরোয়া ও লাগামহীন কথাবার্তা যেমন আখিরাতে মানুষের ক্ষতির কারণ হবে, তেমনি দুনিয়ার জীবনেও তা মারাত্মক শত্রুতার জন্ম দিতে পারে। 'উকবাহ ইবনু 'আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, يَا رَسُولَ اللَّهُ مَا النَّجَاةُ؟ -" ইয়া রাসূলাল্লাহ, মুক্তি কোন্ পথে?" তিনি জবাব দিলেন, ...أَمْسَكَ عَلَيْكَ لِسَانَكَ-"তোমার যবানকে নিয়ন্ত্রণ করো।....”৪২৭ একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَإِنْ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الثَّرْتَارُونَ وَالْمُتَشَدِّقُونَ وَالْمُتَفَيْهِقُونَ “কিয়ামাতের দিন আমার কাছে সবচাইতে ঘৃণিত ও আমার নিকট থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল, কটুভাষী ও দাম্ভিকরা।”৪২৮ তিনি আরো বলেন,
لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنْ كَثْرَةَ الْكَلَامِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ قَسْوَةُ الْقَلْبِ، وَإِنْ أَبَعْدَ النَّاسِ مِنَ اللَّهِ الْقَلْبُ الْقَاسِي.
তোমরা আল্লাহর যিকরবিহীন অধিক কথাবার্তা বলো না। কেননা, আল্লাহর যিকরবিহীন কথাবার্তা অন্তরকে কঠিন করে তোলে। আর আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য থেকে সব চাইতে বেশি দূরে অবস্থানকারী হলো কঠিন অন্তর ওয়ালা ব্যক্তিই। ৪২৯
ইসলামের আরো নির্দেশনা হলো- দুটি বিবদমান প্রতিপক্ষের মধ্যে শত্রুতা ও বিরোধ কমাতে হলে মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দিয়ে দেবার প্রবণতা ত্যাগ করা উচিত। বরঞ্চ মুসলমানদের উচিত, শত্রুদের বৈরিতার জবাব বন্ধুত্ব দিয়ে দেয়া, যাতে চূড়ান্তভাবে শত্রুতাকারী ব্যক্তির হৃদয় জয় করা যায়। বস্তুতপক্ষে এ পন্থায় শত্রুতাসম্পন্ন লোকেরাও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّكُمْ لَا تَسَعُونَ النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَسْعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ الْوَجْهِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ "তোমরা তোমাদের অর্থ-সম্পদ দিয়ে সকলের মন জয় করতে পারবে না। কিন্তু দুটি জিনিস দিয়ে তোমরা সবার মন জয় করতে পারবে। তা হচ্ছে সদাহাস্যমুখ ও সুন্দর ব্যবহার।”৪৩০ তিনি আরো বলেন যে, "যদি কোনো মুসলিম দেখে যে, তার কারো সাথে আলোচনা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি ও বিবাদের দিকে মোড় নিচ্ছে, তখন সে যেন বিতর্ক বন্ধ করে নিজের কথার জন্য অগ্রিম ক্ষমা চায়।" তবে ইসলাম সর্বক্ষেত্রে নতজানু হতে বলে না; বরং তাদের বিনয়ী ও আত্মমর্যাদাশীল হতে বলে। কোনো অজ্ঞ, বদমেজাজী ও ক্রুদ্ধ ব্যক্তির অন্যায় ও অশ্লীল কথার জবাব অন্যায় কথা দিয়ে দিতে গেলে মুসলিম অবশ্যই তার মর্যাদাই হারাবে। এ জন্য এসব পরিস্থিতিতে নীরব থাকাই কল্যাণকর। অতএব, যদিও এমন প্রতিটি পরিস্থিতিই অন্য পরিস্থিতির চেয়ে পৃথক। কাজেই স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোন্ পন্থা অবলম্বন করা উত্তম, সেটা মুসলিম নিজেই বিবেচনা করবে। তবে তাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, তার কথার মাধ্যমে যেন শত্রুতা-বৈরিতা কোনোভাবে না বাড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّعَانِ وَلَا الْفَاحِشَ وَلَا الْبَذِيء “মু'মিন না দোষারোপকারী হয়, না লা'নাতকারী, না অশ্লীলভাষী আর না বাচাল হয়। "৪৩১
পারস্পরিক কথাবার্তায় অনেক সময় তর্ক-বিতর্ক হয়। একজন মু'মিনকে যথাসম্ভব এ তর্ক-বিতর্কও এড়িয়ে চলা দরকার। মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রা.) বলেন, إِيَّاكُمْ وَالْمِرَاء فَإِنَّهَا سَاعَةُ جَهْلِ الْعَالِمِ وَبِهَا يَبْتَغِي الشَّيْطَانُ زَلْتَهُ. “তোমরা তর্ক-বিতর্ক থেকে বেঁচে থাকো। কেননা এটি 'আলিমের অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করার মুহূর্ত। আর শাইতান এর মাধ্যমে তার পদস্খলন ঘটাতে চায়।”৪৩২ উল্লেখ্য যে, কখনো যুক্তি-তর্কে ইতিবাচক দিকও থাকে। আর এটা হলো- এমন তর্ক বা যুক্তি, যার পেছনে মহৎ উদ্দেশ্য আছে এবং যেখানে উভয় পক্ষই খোলামেলা সত্যের সন্ধানে উৎসুক। পবিত্র কোরআনে এমন তর্ককে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴿ - “আর সবচেয়ে সুন্দর উপায়ে তর্ক-বিতর্ক করো।”৪৩৩ এ আয়াতের মর্ম হলো- যদি দা'ওয়াতের কাজে কোথাও তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে তাও অতীব উত্তম উপায়ে হতে হবে। এখানে উত্তম উপায় বলতে বোঝানো হয়েছে,
কথাবার্তায় নম্রতা ও নমনীয়তা অবলম্বন করতে হবে, এমন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যা প্রতিপক্ষ বোঝতে সক্ষম হয়। বিশুদ্ধ ও বাস্তবসম্পন্ন দলীল-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষের সন্দেহ দূরীভূত হয় এবং সে হঠকারিতার পথ পরিহার করে।
পক্ষান্তরে ইসলাম যুক্তি-তর্কের নামে ঐ সব লোকের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়াকে অনুৎসাহিত করেছে, যারা সত্য থেকে তাদের মনের দুয়ার রুদ্ধ করেছে এবং তর্কের খাতিরেই তর্ক করে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও এ জাতীয় লোকদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে উম্মাতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْحَدَلَ. "যে কোনো কাওম হিদায়াত লাভের পরে যখনই অর্থহীন তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়, তখন তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।" রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথার প্রমাণ হিসেবে তিলাওয়াত করলেন, مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ -"তারা আপনার কাছে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে, তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুত তারা হলো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।” (আল-কোরআন, ৪৩:৫৮) ৪৩৪ এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকেরাও স্বার্থান্ধ, বাচাল, তর্ককারী লোকের সাথে অর্থহীন আলোচনায় জড়িয়ে পড়ে পথ হারাতে পারে।
টিকাঃ
৪২০. দ্র. আল কোরআন, সূরা আর-রাহমান, ৫৫:৪
৪২১. দ্র. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৮৩; সূরা আল-ইসরা', ১৭: ৫৩
৪২২. আল কোরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, ২৩:৩
৪২৩. আল কোরআন, সূরা আল-আন'আম, ৬: ৬৮
৪২৪. জাসসাস, আহকামুল কোরআন, খ.৪, পৃ.১৬৬
৪২৫. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং:৫৬৭২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৮২
৪২৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩০৪৮; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৮৮৭ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শু'আইব আল-আরনাউত (রাহ.)-এর মতে, এ হাদীসের সনদ দুর্বল।
৪২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪০৬; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২২২৩৫
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০১৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪১১; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৪: হিফযুল লিসান), হা. নং: ৪৬০০; ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। তাছাড়া এ হাদীসটি সামান্য শব্দগত পরিবর্তনসহ 'মুওয়াত্তা' (হা. নং: ৯৭৫)-এর মধ্যেও বর্ণিত আছে।
৪৩০. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-'ইলম), হা. নং: ৪২৭, ৪২৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৬৯৫ বিশিষ্ট, মুহাদ্দিস আল-হাকিম (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ। তবে শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, খ. ১১, পৃ. ৩০০, হা. নং: ৪৮৫৩)
৪৩১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯৭৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৩৮৩৯ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দাঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৪, পৃ. ৪৭৭)
৪৩২. দারিমী, আস-সুনান, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৩৯৬ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হুসাইন সালীম (রাহ.) বলেন, হাদীসটির সনদ সাহীহ।
৪৩৩. আল কোরআন, সূরা আন-নাহল, ১৬: ১২৫
৪৩৪. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩২৫৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মুকাদ্দামাহ, বাব: ইজতিনাবুল বিদা'..), হা. নং: ৪৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।
📄 অপ্রয়োজনীয় বা অনর্থক কাজ করা
একজন মু'মিন যেমন অনর্থক ও বাজে কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকেন, তেমনি তিনি যে কোনো অনর্থক ও বাজে কার্যকলাপ থেকেও বিরত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ -“আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪৩৫ অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا -“এবং তারা যখন অসার কার্যকলাপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তারা ভদ্রভাবে চলে যায়।” এ আয়াতগুলো থেকে জানা যায়, মু'মিনরা কখনো বাজে ও অসার কার্যকলাপে লিপ্ত তো হতেই পারে না এবং এরূপ কাজের পাশেও তারা যায় না। এটা সত্যিকার ঈমানের পরিপন্থী। তবে ঘটনাচক্রে যদি তাদের কখনো কোনো বাজে ও অনর্থক কার্যকলাপের পাশ দিয়ে গমন করতে হয়, তখন তারা ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত লোকদের ন্যায় চলে যায়। ইব্রাহীম ইবনু মায়সারাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন ইবনু মাস'উদ (রা.) ঘটনাক্রমে একটি বাজে কাজের পাশ দিয়ে গমন করেন। তিনি সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা চলে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা জানতে পেরে বললেন, أصبح ابن مَسْعُودٍ وَأَمْسَى كَرِيمًا “ইবনু মাস'উদ ভদ্র হয়ে গেছে।” অতঃপর ইবনু মায়সারাহ (রা.) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। ৪৩৬
মোট কথা, যে সব কাজে কোনো উপকারিতা নেই; বরং ক্ষতিই বিদ্যমান, তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। তবে যে সব কাজে কোনো উপকারও নেই, ক্ষতিও নেই, এ সব অর্থহীন বিষয়ও বর্জন করে চলা ন্যূনপক্ষে উত্তম ও প্রশংসনীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ -"মানুষ যখন অনর্থক বিষয় ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে। "৪৩৭ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুত্তাকীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, لَا يَبْلُغُ الْعَبْدُ أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُتَّقِينَ حَتَّى يَدَعَ مَا لَا بَأْسَ بِهِ حذرًا لِمَا بِهِ الْبَأْسُ . পৌঁছতে পারবে না, যে যাবত না সে অবাঞ্ছিত বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় (অনেক) নির্দোষ বিষয়ও বর্জন করে চলবে। "৪৩৮ এ কারণেই উপযুক্ত আয়াতগুলোতে অনর্থক ও অর্থহীন কাজ এড়িয়ে চলাকে পরিপূর্ণ মু'মিনের বিশেষ গুণরূপে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকাঃ
৪৩৫. আল কোরআন, ২৩ (সূরা আল-মু'মিনূন): ৩
৪৩৬. ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৬. পৃ. ১৩১
৪৩৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব আয-যুহদ), হা. নং: ২৩১৭, ২৩১৮; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-ফিতান), হা. নং: ৩৯৭৬ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৩১৭)
৪৩৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব সিফাতুল কিয়ামাহ,...), হা. নং: ২৪৫১; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২১৫ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৪৫১)
একজন মু'মিন যেমন অনর্থক ও বাজে কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকেন, তেমনি তিনি যে কোনো অনর্থক ও বাজে কার্যকলাপ থেকেও বিরত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ -“আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪৩৫ অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا -“এবং তারা যখন অসার কার্যকলাপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তারা ভদ্রভাবে চলে যায়।” এ আয়াতগুলো থেকে জানা যায়, মু'মিনরা কখনো বাজে ও অসার কার্যকলাপে লিপ্ত তো হতেই পারে না এবং এরূপ কাজের পাশেও তারা যায় না। এটা সত্যিকার ঈমানের পরিপন্থী। তবে ঘটনাচক্রে যদি তাদের কখনো কোনো বাজে ও অনর্থক কার্যকলাপের পাশ দিয়ে গমন করতে হয়, তখন তারা ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত লোকদের ন্যায় চলে যায়। ইব্রাহীম ইবনু মায়সারাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন ইবনু মাস'উদ (রা.) ঘটনাক্রমে একটি বাজে কাজের পাশ দিয়ে গমন করেন। তিনি সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা চলে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা জানতে পেরে বললেন, أصبح ابن مَسْعُودٍ وَأَمْسَى كَرِيمًا “ইবনু মাস'উদ ভদ্র হয়ে গেছে।" অতঃপর ইবনু মায়সারাহ (রা.) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। ৪৩৬
মোট কথা, যে সব কাজে কোনো উপকারিতা নেই; বরং ক্ষতিই বিদ্যমান, তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। তবে যে সব কাজে কোনো উপকারও নেই, ক্ষতিও নেই, এ সব অর্থহীন বিষয়ও বর্জন করে চলা ন্যূনপক্ষে উত্তম ও প্রশংসনীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ -"মানুষ যখন অনর্থক বিষয় ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে। "৪৩৭ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুত্তাকীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, لَا يَبْلُغُ الْعَبْدُ أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُتَّقِينَ حَتَّى يَدَعَ مَا لَا بَأْسَ بِهِ حذرًا لِمَا بِهِ الْبَأْسُ . পৌঁছতে পারবে না, যে যাবত না সে অবাঞ্ছিত বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় (অনেক) নির্দোষ বিষয়ও বর্জন করে চলবে। "৪৩৮ এ কারণেই উপযুক্ত আয়াতগুলোতে অনর্থক ও অর্থহীন কাজ এড়িয়ে চলাকে পরিপূর্ণ মু'মিনের বিশেষ গুণরূপে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকাঃ
৪৩৫. আল কোরআন, ২৩ (সূরা আল-মু'মিনূন): ৩
৪৩৬. ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৬. পৃ. ১৩১
৪৩৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব আয-যুহদ), হা. নং: ২৩১৭, ২৩১৮; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-ফিতান), হা. নং: ৩৯৭৬ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৩১৭)
৪৩৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব সিফাতুল কিয়ামাহ,...), হা. নং: ২৪৫১; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২১৫ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৪৫১)