📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 চোগলখোরি করা

📄 চোগলখোরি করা


গীবাতের একটি বিশেষ রূপ হচ্ছে চুগলখোরি। এর অর্থ হলো- মানুষের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি বা ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্য জনের নিকট বর্ণনা করা। এটাও একটা অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ। পবিত্র কোরআন এর নিন্দা করতে গিয়ে বলেছে, ﴾هَمَّازِ مَشَّاء بِنَمِيمٍ - "যারা লোকদের প্রতি বিদ্রূপ প্রদর্শন করে এবং চুগলখোরি করে বেড়ায়। "৪১০ হাদীসেও চুগলখোরি সম্পর্কে কঠোর সর্তক করা হয়েছে। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শোনেছি যে, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ "চুগলখোর জান্নাতে যাবে না।”৪১১ 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে বিশেষভাবে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, لَا يُبَلِّغْنِي أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِي عَنْ أَحَدٍ شَيْئًا - فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصَّدْرِ কারো সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা আমার কাছে পৌঁছাবে না। কারণ আমি যখন তোমাদের কাছে আসি, তখন সবার প্রতিই আমার মন পরিষ্কার থাকুক- এটাই আমি পছন্দ করি।”৪১২
হাদীস থেকে জানা যায় যে, কবরের 'আযাবের একটি প্রধান কারণও হলো- চুগলখোরি করা। 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাদীনা বা মাক্কার কোনো একটি বাগানের পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। সেখানে তিনি দুজন এমন মানুষের আওয়ায শোনতে পেলেন, যাদেরকে কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, يُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ "তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, অথচ বড় কোনো অপরাধের কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না।" অতঃপর তিনি বললেন, بَلَى كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ - “তাদের একজন পেশাব করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতো না। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগাতো। "৪১৩ কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমাদেরকে বলা হয়েছে যে, কবরের 'আযাবের এক তৃতীয়াংশ হবে গীবাতের কারণে, এক তৃতীয়াংশ পেশাব থেকে সাবধান না থাকার কারণে এবং এক তৃতীয়াংশ চোগলখোরীর কারণে যেহেতু গীবাতকারী ও চোগলখোর মিথ্যা কথাও বলে থাকে, তাই সে মিথ্যাবাদীর শাস্তিও ভোগ করবে। ৪১৪

টিকাঃ
৪১০. আল কোরআন, সূরা আল-কালাম, ৬৮: ১১
৪১১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩০৩
৪১২. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৬২; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মানাকিব) হা. নং: ৩৮৯৬। ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব।
৪১৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ওযু), হা. নং: ২১৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আত- তাহারাত), হা. নং: ৭০৩
৪১৪. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৩, পৃ. ১৪৩; ইবনু রাজাব, আহওয়ালুল কাবর, পৃ. ৮৫; ইবনু হাজার আল- হাইতামী, আয-যাওয়াজির 'আন ইকতিরাফিল কাবা'য়ির, খ. ২, পৃ. ২৩৯

গীবাতের একটি বিশেষ রূপ হচ্ছে চুগলখোরি। এর অর্থ হলো- মানুষের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি বা ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্য জনের নিকট বর্ণনা করা। এটাও একটা অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ। পবিত্র কোরআন এর নিন্দা করতে গিয়ে বলেছে, ﴾هَمَّازِ مَشَّاء بِنَمِيمٍ - "যারা লোকদের প্রতি বিদ্রূপ প্রদর্শন করে এবং চুগলখোরি করে বেড়ায়। "৪১০ হাদীসেও চুগলখোরি সম্পর্কে কঠোর সর্তক করা হয়েছে। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শোনেছি যে, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ "চুগলখোর জান্নাতে যাবে না।”৪১১ 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে বিশেষভাবে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, لَا يُبَلِّغْنِي أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِي عَنْ أَحَدٍ شَيْئًا - فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصَّدْرِ কারো সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা আমার কাছে পৌঁছাবে না। কারণ আমি যখন তোমাদের কাছে আসি, তখন সবার প্রতিই আমার মন পরিষ্কার থাকুক- এটাই আমি পছন্দ করি।”৪১২
হাদীস থেকে জানা যায় যে, কবরের 'আযাবের একটি প্রধান কারণও হলো- চুগলখোরি করা। 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাদীনা বা মাক্কার কোনো একটি বাগানের পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। সেখানে তিনি দুজন এমন মানুষের আওয়ায শোনতে পেলেন, যাদেরকে কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, يُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ "তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, অথচ বড় কোনো অপরাধের কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না।" অতঃপর তিনি বললেন, بَلَى كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ - “তাদের একজন পেশাব করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতো না। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগাতো। "৪১৩ কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমাদেরকে বলা হয়েছে যে, কবরের 'আযাবের এক তৃতীয়াংশ হবে গীবাতের কারণে, এক তৃতীয়াংশ পেশাব থেকে সাবধান না থাকার কারণে এবং এক তৃতীয়াংশ চোগলখোরীর কারণে যেহেতু গীবাতকারী ও চোগলখোর মিথ্যা কথাও বলে থাকে, তাই সে মিথ্যাবাদীর শাস্তিও ভোগ করবে। ৪১৪

টিকাঃ
৪১০. আল কোরআন, সূরা আল-কালাম, ৬৮: ১১
৪১১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩০৩
৪১২. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৬২; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মানাকিব) হা. নং: ৩৮৯৬। ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব।
৪১৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ওযু), হা. নং: ২১৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আত- তাহারাত), হা. নং: ৭০৩
৪১৪. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৩, পৃ. ১৪৩; ইবনু রাজাব, আহওয়ালুল কাবর, পৃ. ৮৫; ইবনু হাজার আল- হাইতামী, আয-যাওয়াজির 'আন ইকতিরাফিল কাবা'য়ির, খ. ২, পৃ. ২৩৯

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 রাগ

📄 রাগ


আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। এটা আমাদেরকে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি থেকেও বাঁচিয়ে রাখে। উল্লেখ্য যে, ইসলাম আল্লাহর পথে রাগ বা ক্ষোভের সাথে ব্যক্তি স্বার্থ বা অহংবোধের কারণে সৃষ্ট রাগের মধ্যে পার্থক্য করেছে। প্রথম ধরনের ক্ষোভ ঈমানদারদের মধ্যে তৈরি হয়, যখন তারা দেখে যে, মানুষ আল্লাহ তা'আলার বিধান অমান্য বা অবজ্ঞা করছে। এ ধরনের ক্ষোভ হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। কারণ, এটা দৃঢ় ঈমানের আলামাত। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে ক্ষুব্ধ বা রাগান্বিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। বিশেষত যদি রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, মানুষ প্রচণ্ড ক্রোধান্ধ হয়ে যায় এবং সামান্য উস্কানীতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া করে। ইসলাম মানুষকে উস্কানীর মুখে একেবারে অনুভূতিহীন হতে বলে না; কিন্তু এটা এই শিক্ষা দেয় যে, রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ক্ষমার মানসিকতা রাখতে হবে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের নিকট তাকওয়ার গুণাবলি তোলে ধরতে গিয়ে বলেন, وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ) "... আর যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে।”৪১৫ ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এ বৈশিষ্ট্যটি অতি বড়ো সাহসের কাজ, এটা সহজে অর্জন করা যায় না। কারণ, কোনো মানুষ যখন কষ্ট পায় অথবা তার কোনো ক্ষতি সাধন হয়, তখন সর্বপ্রথম স্বভাবত ক্রোধই তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করার প্রয়াস পায়। আর ক্রোধ যদি তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করতে পারে, তা হলে সে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে। এ কারণে এ গুণ অর্জন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে নাফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও শাসন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ -"সে প্রকৃত শক্তিশালী নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সে-ই প্রকৃত শক্তিশালী, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। "৪১৬ সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললো, আমাকে সংক্ষেপে কিছু শিক্ষা দিন, যাতে আমি তা মনে রাখতে পারি। তিনি বললেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।" সে বারংবার একই কথা বলছিলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও প্রতিবারই ইরশাদ করেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।”৪১৭ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উপদেশটি দেওয়ার কারণ এই ছিলো যে, তিনি বোঝতে পেরেছিলেন, কেউ রাগান্বিত হয়ে পড়লে তা তার এবং তার আশেপাশের লোকজনের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে কতোটা ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে, রাগের মুহূর্তে এই উপদেশটা মেনে চলা এতো সহজ কাজ নয়, তাই তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মাতকে। আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعُ - "তোমাদের কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া, আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।”৪১৮
যে ব্যক্তি রাগান্বিত হওয়া সত্ত্বেও তার ভাইকে ক্ষমা করে দেয়, তার জন্য আখিরাতেও রয়েছে শ্রেষ্ঠতর প্রতিদান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - dَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ.
'যে ব্যক্তি ক্রোধ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও তাকে হযম করে ফেললো, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডাকবেন এবং হুরের মধ্য থেকে যা সে ইচ্ছা করবে তা মনোনীত করার ইখতিয়ার দেবেন। ৪১৯

টিকাঃ
৪১৫. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৩৪
৪১৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৮০৯
৪১৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৫; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০২০
৪১৮. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৮৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১০৪৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন এই উপদেশ দিয়েছেন আমাদের তা সঠিকভাবে বোঝতে হলে আমাদের জানতে হবে, আমাদের শরীর ও মনের ওপর রাগের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো কী কী, আর বসে বা শোয়ে পড়ার সাথে রাগের সম্পর্কটা বা কী? কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তখন তার কিডনির ওপরে অবস্থিত অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রেনালিন নামক এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়। রাগ, ভয়, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়া বা এ জাতীয় যে কোনো শারীরিক বা মানসিক চাপের কারণে এই হরমোনের নিঃসরণ ঘটতে পারে। আর এই অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে নরঅ্যাড্রেনালিন নামক আরও এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ ঘটে, যদিও কিনা এই হরমোনের প্রধান উৎস হলো হৃদপিণ্ডে সিম্পেথেটিক স্নায়ুর প্রান্ত ভাগে। তবে এ দু প্রকার হরমোনই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং এদের নিঃসরণও ঘটে একই সাথে।
রাগের ফলে আমাদের শরীরে এ দু প্রকারের হরমোনই অধিক পরিমাণে নিঃসরিত হতে থাকে। এর মধ্যে একটা হরমোন যেহেতু হৃদপিণ্ড থেকে নিঃসরিত হয়, তাই রাগান্বিত অবস্থায় আমাদের হৃদপিণ্ড অধিকতর সক্রিয় হয়ে পড়ে, ফলে হৃদকম্পন হয়ে ওঠে আরও দ্রুত ও অনিয়মিত। শারীরিক বা মানসিক চাপের ফলে হৃদপিণ্ডের এই তীব্র পরিবর্তন আমরা অনেকেই প্রায় সময় অনুভব করতে পারি। তা ছাড়াও আমাদের রেগে যাবার ফলে হৃদপিণ্ডের অতি সক্রিয়তার কারণে অতিরিক্ত অক্সিজেনের জোগান দেওয়ার জন্য হৃদপেশীর সংকোচনও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে ধমনীতে চাপ পড়ে। আর তাই রাগান্বিত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়। আর যাদের ধমনীর প্রশস্ততা কম, তাদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কেননা তাদের সঙ্কুচিত ধমনী দিয়ে হঠাৎ অধিক বেগে রক্ত সঞ্চালনের ফলে ধমনীতে সৃষ্ট অতিরিক্ত চাপের কারণে তা ছিঁড়ে যেতে পারে যে কোনো সময়ে। শরীরে এ দু হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যাবার ফলে আমাদের রক্তচাপও বৃদ্ধি পায় অনেক, যা ব্লাড প্রেসারের (অধিক বা কম রক্তচাপের) সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য খুবই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর। তা ছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের সাধারণত রাগ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়। কেননা রাগ বা মানসিক চাপের ফলে সৃষ্ট অ্যাড্রেনালিন আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা একজন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য খুবই বিপজ্জনক।
এবার দেখা যাক, রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে উপায় বলে দিয়েছেন আমাদের জন্য তা কতোটা বিজ্ঞানসম্মত? চিকিৎসা শাস্ত্রের বিখ্যাত লেখক হ্যারিসন বলেন, "এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, পাঁচ মিনিট শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন একজন ব্যক্তির রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু বিভিন্ন রকমের মানসিক চাপ রক্তে অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা খুব বাড়িয়ে দিতে পারে।"
সহজ কথায় বলতে হয়, শান্তভাবে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই মানুষের রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়, সাথে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। এখানে মনে রাখা উচিত যে, অ্যাড্রেনালিন নামক হরমোনটি প্রধানত রাগ বা মানসিক চাপের কারণে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই সুস্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হয় যে, দাঁড়ানো অবস্থায় রেগে গেলে এই হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ আমাদের শরীরের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এর থেকেই বোঝা যায়, আজ থেকে পনেরো শ' বছর আগে যখন বর্তমানের তুলনায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানুষের জ্ঞান বা অগ্রগতি ছিল যৎসামান্য, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিয়ে যাওয়া এই উপদেশ বাণীর গুরুত্ব কতোটুকু! "কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।" এটাই হলো সর্বকালের সর্বাধুনিক ডাক্তারী পরামর্শ।
৪১৯. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৭৯; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিরর...), হা. নং: ২০২১, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), ২৪৯৩ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। এটা আমাদেরকে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি থেকেও বাঁচিয়ে রাখে। উল্লেখ্য যে, ইসলাম আল্লাহর পথে রাগ বা ক্ষোভের সাথে ব্যক্তি স্বার্থ বা অহংবোধের কারণে সৃষ্ট রাগের মধ্যে পার্থক্য করেছে। প্রথম ধরনের ক্ষোভ ঈমানদারদের মধ্যে তৈরি হয়, যখন তারা দেখে যে, মানুষ আল্লাহ তা'আলার বিধান অমান্য বা অবজ্ঞা করছে। এ ধরনের ক্ষোভ হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। কারণ, এটা দৃঢ় ঈমানের আলামাত। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে ক্ষুব্ধ বা রাগান্বিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। বিশেষত যদি রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, মানুষ প্রচণ্ড ক্রোধান্ধ হয়ে যায় এবং সামান্য উস্কানীতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া করে। ইসলাম মানুষকে উস্কানীর মুখে একেবারে অনুভূতিহীন হতে বলে না; কিন্তু এটা এই শিক্ষা দেয় যে, রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ক্ষমার মানসিকতা রাখতে হবে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের নিকট তাকওয়ার গুণাবলি তোলে ধরতে গিয়ে বলেন, وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ) "... আর যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে।”৪১৫ ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এ বৈশিষ্ট্যটি অতি বড়ো সাহসের কাজ, এটা সহজে অর্জন করা যায় না। কারণ, কোনো মানুষ যখন কষ্ট পায় অথবা তার কোনো ক্ষতি সাধন হয়, তখন সর্বপ্রথম স্বভাবত ক্রোধই তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করার প্রয়াস পায়। আর ক্রোধ যদি তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করতে পারে, তা হলে সে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে। এ কারণে এ গুণ অর্জন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে নাফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও শাসন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ -"সে প্রকৃত শক্তিশালী নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সে-ই প্রকৃত শক্তিশালী, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। "৪১৬ সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললো, আমাকে সংক্ষেপে কিছু শিক্ষা দিন, যাতে আমি তা মনে রাখতে পারি। তিনি বললেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।" সে বারংবার একই কথা বলছিলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও প্রতিবারই ইরশাদ করেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।”৪১৭ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উপদেশটি দেওয়ার কারণ এই ছিলো যে, তিনি বোঝতে পেরেছিলেন, কেউ রাগান্বিত হয়ে পড়লে তা তার এবং তার আশেপাশের লোকজনের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে কতোটা ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে, রাগের মুহূর্তে এই উপদেশটা মেনে চলা এতো সহজ কাজ নয়, তাই তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মাতকে। আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعُ - "তোমাদের কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া, আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।”৪১৮
যে ব্যক্তি রাগান্বিত হওয়া সত্ত্বেও তার ভাইকে ক্ষমা করে দেয়, তার জন্য আখিরাতেও রয়েছে শ্রেষ্ঠতর প্রতিদান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - dَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ.
'যে ব্যক্তি ক্রোধ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও তাকে হযম করে ফেললো, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডাকবেন এবং হুরের মধ্য থেকে যা সে ইচ্ছা করবে তা মনোনীত করার ইখতিয়ার দেবেন। ৪১৯

টিকাঃ
৪১৫. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৩৪
৪১৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৮০৯
৪১৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৫; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০২০
৪১৮. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৮৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১০৪৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন এই উপদেশ দিয়েছেন আমাদের তা সঠিকভাবে বোঝতে হলে আমাদের জানতে হবে, আমাদের শরীর ও মনের ওপর রাগের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো কী কী, আর বসে বা শোয়ে পড়ার সাথে রাগের সম্পর্কটা বা কী? কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তখন তার কিডনির ওপরে অবস্থিত অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রেনালিন নামক এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়। রাগ, ভয়, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়া বা এ জাতীয় যে কোনো শারীরিক বা মানসিক চাপের কারণে এই হরমোনের নিঃসরণ ঘটতে পারে। আর এই অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে নরঅ্যাড্রেনালিন নামক আরও এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ ঘটে, যদিও কিনা এই হরমোনের প্রধান উৎস হলো হৃদপিণ্ডে সিম্পেথেটিক স্নায়ুর প্রান্ত ভাগে। তবে এ দু প্রকার হরমোনই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং এদের নিঃসরণও ঘটে একই সাথে।
রাগের ফলে আমাদের শরীরে এ দু প্রকারের হরমোনই অধিক পরিমাণে নিঃসরিত হতে থাকে। এর মধ্যে একটা হরমোন যেহেতু হৃদপিণ্ড থেকে নিঃসরিত হয়, তাই রাগান্বিত অবস্থায় আমাদের হৃদপিণ্ড অধিকতর সক্রিয় হয়ে পড়ে, ফলে হৃদকম্পন হয়ে ওঠে আরও দ্রুত ও অনিয়মিত। শারীরিক বা মানসিক চাপের ফলে হৃদপিণ্ডের এই তীব্র পরিবর্তন আমরা অনেকেই প্রায় সময় অনুভব করতে পারি। তা ছাড়াও আমাদের রেগে যাবার ফলে হৃদপিণ্ডের অতি সক্রিয়তার কারণে অতিরিক্ত অক্সিজেনের জোগান দেওয়ার জন্য হৃদপেশীর সংকোচনও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে ধমনীতে চাপ পড়ে। আর তাই রাগান্বিত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়। আর যাদের ধমনীর প্রশস্ততা কম, তাদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কেননা তাদের সঙ্কুচিত ধমনী দিয়ে হঠাৎ অধিক বেগে রক্ত সঞ্চালনের ফলে ধমনীতে সৃষ্ট অতিরিক্ত চাপের কারণে তা ছিঁড়ে যেতে পারে যে কোনো সময়ে। শরীরে এ দু হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যাবার ফলে আমাদের রক্তচাপও বৃদ্ধি পায় অনেক, যা ব্লাড প্রেসারের (অধিক বা কম রক্তচাপের) সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য খুবই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর। তা ছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের সাধারণত রাগ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়। কেননা রাগ বা মানসিক চাপের ফলে সৃষ্ট অ্যাড্রেনালিন আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা একজন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য খুবই বিপজ্জনক।
এবার দেখা যাক, রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে উপায় বলে দিয়েছেন আমাদের জন্য তা কতোটা বিজ্ঞানসম্মত? চিকিৎসা শাস্ত্রের বিখ্যাত লেখক হ্যারিসন বলেন, "এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, পাঁচ মিনিট শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন একজন ব্যক্তির রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু বিভিন্ন রকমের মানসিক চাপ রক্তে অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা খুব বাড়িয়ে দিতে পারে।"
সহজ কথায় বলতে হয়, শান্তভাবে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই মানুষের রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়, সাথে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। এখানে মনে রাখা উচিত যে, অ্যাড্রেনালিন নামক হরমোনটি প্রধানত রাগ বা মানসিক চাপের কারণে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই সুস্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হয় যে, দাঁড়ানো অবস্থায় রেগে গেলে এই হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ আমাদের শরীরের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এর থেকেই বোঝা যায়, আজ থেকে পনেরো শ' বছর আগে যখন বর্তমানের তুলনায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানুষের জ্ঞান বা অগ্রগতি ছিল যৎসামান্য, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিয়ে যাওয়া এই উপদেশ বাণীর গুরুত্ব কতোটুকু! "কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।" এটাই হলো সর্বকালের সর্বাধুনিক ডাক্তারী পরামর্শ।
৪১৯. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৭৯; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিরর...), হা. নং: ২০২১, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), ২৪৯৩ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব।

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্ছিত ও অনর্থক কথা বলা

📄 অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্ছিত ও অনর্থক কথা বলা


মানুষের কথা বলার ক্ষমতা আল্লাহ তা'আলার এক মহান নি'মাত এবং এটার যথার্থ ব্যবহার হওয়া উচিত। উল্লেখ্য যে, কথা বলার যোগ্যতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা করে পৃথক মর্যাদা দিয়েছে। ৪২০ ইসলামের নির্দেশ হলো- প্রতিটি মু'মিনের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র, সুন্দর ও অর্থপূর্ণ কথা বলা এবং কথার অপব্যবহার না করা এবং অর্থহীন, অশ্লীল ও অযাচিত কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। ৪২১ কথা বলার যৌক্তিক কারণ না থাকলে এবং ভালো ও উত্তম কথা বলা না গেলে নীরব থাকাই শ্রেয়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী ঈমানদারগণের অন্যতম গুণ এই যে, তারা অর্থহীন কথাবার্তা বলে না এবং অলস বাচালতায় লিপ্ত লোকদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ﴾وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرضُونَ -"আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪২২ অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ﴾وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غير- "যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহে ছিদ্রান্বেষণের উদ্দেশ্যে আলোচনা-সমালোচনা করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান, যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়।”৪২৩ এ আয়াতে যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, উদ্দেশ্য হলো তাঁর উম্মাত। এখানে তাদেরকে বাতিল ও মিথ্যাপন্থীদের মাজলিস এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইমাম আবু বাকর আল-জাসসাস [৩০৫-৩৭০ হি.] (রাহ.) বলেন, এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, যে মাজলিসে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল কিংবা শারী'আতের বিরুদ্ধে কথাবার্তা হয় এবং তা বন্ধ করা কিংবা কমপক্ষে সত্য কথা প্রকাশ করার সাধ্য না থাকে, তবে এরূপ প্রত্যেকটি মাজলিস বর্জন করা মুসলমানদের উচিত। ৪২৪
পবিত্র হাদীসেও অনর্থক ও অযাচিত কথাবার্তার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ-"যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে। "৪২৫ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ وَلَا يَدْخُلُ رَجُلُ الْجَنَّةَ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ.
অন্তর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দাহর ঈমান ঠিক হবে না এবং জিহ্বা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্তর ঠিক হবে না। আর এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার নিপীড়ন থেকে নিরাপদ নয়। ৪২৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথাগুলোর অর্থ হলো- মানুষের ঈমান বিশুদ্ধ হবে না যদি তার কথা বিশুদ্ধ অর্থাৎ উত্তম ও ভালো না হয়। অর্থাৎ কথার বিশুদ্ধতার ওপরই ঈমানের বিশুদ্ধতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অধিকন্তু, একজন মানুষ তার মুখের কথার বিষয়ে সতর্ক না হলে সে এই দুনিয়ার জীবন এবং আখিরাতে বহু বিপদের সম্মুখীন হবে। বেপরোয়া ও লাগামহীন কথাবার্তা যেমন আখিরাতে মানুষের ক্ষতির কারণ হবে, তেমনি দুনিয়ার জীবনেও তা মারাত্মক শত্রুতার জন্ম দিতে পারে। 'উকবাহ ইবনু 'আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, يَا رَسُولَ اللَّهُ مَا النَّجَاةُ؟ -" ইয়া রাসূলাল্লাহ, মুক্তি কোন্ পথে?" তিনি জবাব দিলেন, ...أَمْسَكَ عَلَيْكَ لِسَانَكَ-"তোমার যবানকে নিয়ন্ত্রণ করো।....”৪২৭ একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম وَإِنْ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الثَّرْتَارُونَ وَالْمُتَشَدِّقُونَ وَالْمُتَفَيْهِقُونَ “কিয়ামাতের দিন আমার কাছে সবচাইতে ঘৃণিত ও আমার নিকট থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল, কটুভাষী ও দাম্ভিকরা।”৪২৮ তিনি আরো বলেন,
لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنْ كَثْرَةَ الْكَلَامِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ قَسْوَةُ الْقَلْبِ، وَإِنْ أَبَعْدَ النَّاسِ مِنَ اللَّهِ الْقَلْبُ الْقَاسِي.
তোমরা আল্লাহর যিকরবিহীন অধিক কথাবার্তা বলো না। কেননা, আল্লাহর যিকরবিহীন কথাবার্তা অন্তরকে কঠিন করে তোলে। আর আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য থেকে সব চাইতে বেশি দূরে অবস্থানকারী হলো কঠিন অন্তর ওয়ালা ব্যক্তিই। ৪২৯
ইসলামের আরো নির্দেশনা হলো- দুটি বিবদমান প্রতিপক্ষের মধ্যে শত্রুতা ও বিরোধ কমাতে হলে মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দিয়ে দেবার প্রবণতা ত্যাগ করা উচিত। বরঞ্চ মুসলমানদের উচিত, শত্রুদের বৈরিতার জবাব বন্ধুত্ব দিয়ে দেয়া, যাতে চূড়ান্তভাবে শত্রুতাকারী ব্যক্তির হৃদয় জয় করা যায়। বস্তুতপক্ষে এ পন্থায় শত্রুতাসম্পন্ন লোকেরাও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّكُمْ لَا تَسَعُونَ النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَسْعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ الْوَجْهِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ "তোমরা তোমাদের অর্থ-সম্পদ দিয়ে সকলের মন জয় করতে পারবে না। কিন্তু দুটি জিনিস দিয়ে তোমরা সবার মন জয় করতে পারবে। তা হচ্ছে সদাহাস্যমুখ ও সুন্দর ব্যবহার।”৪৩০ তিনি আরো বলেন যে, "যদি কোনো মুসলিম দেখে যে, তার কারো সাথে আলোচনা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি ও বিবাদের দিকে মোড় নিচ্ছে, তখন সে যেন বিতর্ক বন্ধ করে নিজের কথার জন্য অগ্রিম ক্ষমা চায়।" তবে ইসলাম সর্বক্ষেত্রে নতজানু হতে বলে না; বরং তাদের বিনয়ী ও আত্মমর্যাদাশীল হতে বলে। কোনো অজ্ঞ, বদমেজাজী ও ক্রুদ্ধ ব্যক্তির অন্যায় ও অশ্লীল কথার জবাব অন্যায় কথা দিয়ে দিতে গেলে মুসলিম অবশ্যই তার মর্যাদাই হারাবে। এ জন্য এসব পরিস্থিতিতে নীরব থাকাই কল্যাণকর। অতএব, যদিও এমন প্রতিটি পরিস্থিতিই অন্য পরিস্থিতির চেয়ে পৃথক। কাজেই স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোন্ পন্থা অবলম্বন করা উত্তম, সেটা মুসলিম নিজেই বিবেচনা করবে। তবে তাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, তার কথার মাধ্যমে যেন শত্রুতা-বৈরিতা কোনোভাবে না বাড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّعَانِ وَلَا الْفَاحِشَ وَلَا الْبَذِيء “মু'মিন না দোষারোপকারী হয়, না লা'নাতকারী, না অশ্লীলভাষী আর না বাচাল হয়। "৪৩১
পারস্পরিক কথাবার্তায় অনেক সময় তর্ক-বিতর্ক হয়। একজন মু'মিনকে যথাসম্ভব এ তর্ক-বিতর্কও এড়িয়ে চলা দরকার। মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রা.) বলেন, إِيَّاكُمْ وَالْمِرَاء فَإِنَّهَا سَاعَةُ جَهْلِ الْعَالِمِ وَبِهَا يَبْتَغِي الشَّيْطَانُ زَلْتَهُ. “তোমরা তর্ক-বিতর্ক থেকে বেঁচে থাকো। কেননা এটি 'আলিমের অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করার মুহূর্ত। আর শাইতান এর মাধ্যমে তার পদস্খলন ঘটাতে চায়।”৪৩২ উল্লেখ্য যে, কখনো যুক্তি-তর্কে ইতিবাচক দিকও থাকে। আর এটা হলো- এমন তর্ক বা যুক্তি, যার পেছনে মহৎ উদ্দেশ্য আছে এবং যেখানে উভয় পক্ষই খোলামেলা সত্যের সন্ধানে উৎসুক। পবিত্র কোরআনে এমন তর্ককে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴿ - “আর সবচেয়ে সুন্দর উপায়ে তর্ক-বিতর্ক করো।”৪৩৩ এ আয়াতের মর্ম হলো- যদি দা'ওয়াতের কাজে কোথাও তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে তাও অতীব উত্তম উপায়ে হতে হবে। এখানে উত্তম উপায় বলতে বোঝানো হয়েছে, কথাবার্তায় নম্রতা ও নমনীয়তা অবলম্বন করতে হবে, এমন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যা প্রতিপক্ষ বোঝতে সক্ষম হয়। বিশুদ্ধ ও বাস্তবসম্পন্ন দলীল-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষের সন্দেহ দূরীভূত হয় এবং সে হঠকারিতার পথ পরিহার করে।
পক্ষান্তরে ইসলাম যুক্তি-তর্কের নামে ঐ সব লোকের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়াকে অনুৎসাহিত করেছে, যারা সত্য থেকে তাদের মনের দুয়ার রুদ্ধ করেছে এবং তর্কের খাতিরেই তর্ক করে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও এ জাতীয় লোকদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে উম্মাতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْحَدَلَ. "যে কোনো কাওম হিদায়াত লাভের পরে যখনই অর্থহীন তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়, তখন তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।" রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথার প্রমাণ হিসেবে তিলাওয়াত করলেন, مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ -"তারা আপনার কাছে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে, তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুত তারা হলো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।” (আল-কোরআন, ৪৩:৫৮) ৪৩৪ এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকেরাও স্বার্থান্ধ, বাচাল, তর্ককারী লোকের সাথে অর্থহীন আলোচনায় জড়িয়ে পড়ে পথ হারাতে পারে।

টিকাঃ
৪২০. দ্র. আল কোরআন, সূরা আর-রাহমান, ৫৫:৪
৪২১. দ্র. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৮৩; সূরা আল-ইসরা', ১৭: ৫৩
৪২২. আল কোরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, ২৩:৩
৪২৩. আল কোরআন, সূরা আল-আন'আম, ৬: ৬৮
৪২৪. জাসসাস, আহকামুল কোরআন, খ.৪, পৃ.১৬৬
৪২৫. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং:৫৬৭২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৮২
৪২৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩০৪৮; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৮৮৭ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শু'আইব আল-আরনাউত (রাহ.)-এর মতে, এ হাদীসের সনদ দুর্বল।
৪২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪০৬; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২২২৩৫
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০১৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪১১; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৪: হিফযুল লিসান), হা. নং: ৪৬০০; ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। তাছাড়া এ হাদীসটি সামান্য শব্দগত পরিবর্তনসহ 'মুওয়াত্তা' (হা. নং: ৯৭৫)-এর মধ্যেও বর্ণিত আছে।
৪৩০. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-'ইলম), হা. নং: ৪২৭, ৪২৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৬৯৫ বিশিষ্ট, মুহাদ্দিস আল-হাকিম (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ। তবে শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, খ. ১১, পৃ. ৩০০, হা. নং: ৪৮৫৩)
৪৩১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯৭৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৩৮৩৯ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দাঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৪, পৃ. ৪৭৭)
৪৩২. দারিমী, আস-সুনান, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৩৯৬ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হুসাইন সালীম (রাহ.) বলেন, হাদীসটির সনদ সাহীহ।
৪৩৩. আল কোরআন, সূরা আন-নাহল, ১৬: ১২৫
৪৩৪. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩২৫৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মুকাদ্দামাহ, বাব: ইজতিনাবুল বিদা'..), হা. নং: ৪৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।

মানুষের কথা বলার ক্ষমতা আল্লাহ তা'আলার এক মহান নি'মাত এবং এটার যথার্থ ব্যবহার হওয়া উচিত। উল্লেখ্য যে, কথা বলার যোগ্যতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা করে পৃথক মর্যাদা দিয়েছে। ৪২০ ইসলামের নির্দেশ হলো- প্রতিটি মু'মিনের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র, সুন্দর ও অর্থপূর্ণ কথা বলা এবং কথার অপব্যবহার না করা এবং অর্থহীন, অশ্লীল ও অযাচিত কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। ৪২১ কথা বলার যৌক্তিক কারণ না থাকলে এবং ভালো ও উত্তম কথা বলা না গেলে নীরব থাকাই শ্রেয়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী ঈমানদারগণের অন্যতম গুণ এই যে, তারা অর্থহীন কথাবার্তা বলে না এবং অলস বাচালতায় লিপ্ত লোকদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ﴾وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرضُونَ -"আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪২২ অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ﴾وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غير- "যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহে ছিদ্রান্বেষণের উদ্দেশ্যে আলোচনা-সমালোচনা করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান, যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়।”৪২৩ এ আয়াতে যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, উদ্দেশ্য হলো তাঁর উম্মাত। এখানে তাদেরকে বাতিল ও মিথ্যাপন্থীদের মাজলিস এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইমাম আবু বাকর আল-জাসসাস [৩০৫-৩৭০ হি.] (রাহ.) বলেন,
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, যে মাজলিসে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল কিংবা শারী'আতের বিরুদ্ধে কথাবার্তা হয় এবং তা বন্ধ করা কিংবা কমপক্ষে সত্য কথা প্রকাশ করার সাধ্য না থাকে, তবে এরূপ প্রত্যেকটি মাজলিস বর্জন করা মুসলমানদের উচিত। ৪২৪
পবিত্র হাদীসেও অনর্থক ও অযাচিত কথাবার্তার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ-"যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে। "৪২৫ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ وَلَا يَدْخُلُ رَجُلُ الْجَنَّةَ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ.
অন্তর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দাহর ঈমান ঠিক হবে না এবং জিহ্বা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্তর ঠিক হবে না। আর এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার নিপীড়ন থেকে নিরাপদ নয়। ৪২৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথাগুলোর অর্থ হলো- মানুষের ঈমান বিশুদ্ধ হবে না যদি তার কথা বিশুদ্ধ অর্থাৎ উত্তম ও ভালো না হয়। অর্থাৎ কথার বিশুদ্ধতার ওপরই ঈমানের বিশুদ্ধতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অধিকন্তু, একজন মানুষ তার মুখের কথার বিষয়ে সতর্ক না হলে সে এই দুনিয়ার জীবন এবং আখিরাতে বহু বিপদের সম্মুখীন হবে। বেপরোয়া ও লাগামহীন কথাবার্তা যেমন আখিরাতে মানুষের ক্ষতির কারণ হবে, তেমনি দুনিয়ার জীবনেও তা মারাত্মক শত্রুতার জন্ম দিতে পারে। 'উকবাহ ইবনু 'আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, يَا رَسُولَ اللَّهُ مَا النَّجَاةُ؟ -" ইয়া রাসূলাল্লাহ, মুক্তি কোন্ পথে?" তিনি জবাব দিলেন, ...أَمْسَكَ عَلَيْكَ لِسَانَكَ-"তোমার যবানকে নিয়ন্ত্রণ করো।....”৪২৭ একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَإِنْ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الثَّرْتَارُونَ وَالْمُتَشَدِّقُونَ وَالْمُتَفَيْهِقُونَ “কিয়ামাতের দিন আমার কাছে সবচাইতে ঘৃণিত ও আমার নিকট থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল, কটুভাষী ও দাম্ভিকরা।”৪২৮ তিনি আরো বলেন,
لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنْ كَثْرَةَ الْكَلَامِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ قَسْوَةُ الْقَلْبِ، وَإِنْ أَبَعْدَ النَّاسِ مِنَ اللَّهِ الْقَلْبُ الْقَاسِي.
তোমরা আল্লাহর যিকরবিহীন অধিক কথাবার্তা বলো না। কেননা, আল্লাহর যিকরবিহীন কথাবার্তা অন্তরকে কঠিন করে তোলে। আর আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য থেকে সব চাইতে বেশি দূরে অবস্থানকারী হলো কঠিন অন্তর ওয়ালা ব্যক্তিই। ৪২৯
ইসলামের আরো নির্দেশনা হলো- দুটি বিবদমান প্রতিপক্ষের মধ্যে শত্রুতা ও বিরোধ কমাতে হলে মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দিয়ে দেবার প্রবণতা ত্যাগ করা উচিত। বরঞ্চ মুসলমানদের উচিত, শত্রুদের বৈরিতার জবাব বন্ধুত্ব দিয়ে দেয়া, যাতে চূড়ান্তভাবে শত্রুতাকারী ব্যক্তির হৃদয় জয় করা যায়। বস্তুতপক্ষে এ পন্থায় শত্রুতাসম্পন্ন লোকেরাও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّكُمْ لَا تَسَعُونَ النَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَسْعُهُمْ مِنْكُمْ بَسْطُ الْوَجْهِ، وَحُسْنُ الْخُلُقِ "তোমরা তোমাদের অর্থ-সম্পদ দিয়ে সকলের মন জয় করতে পারবে না। কিন্তু দুটি জিনিস দিয়ে তোমরা সবার মন জয় করতে পারবে। তা হচ্ছে সদাহাস্যমুখ ও সুন্দর ব্যবহার।”৪৩০ তিনি আরো বলেন যে, "যদি কোনো মুসলিম দেখে যে, তার কারো সাথে আলোচনা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি ও বিবাদের দিকে মোড় নিচ্ছে, তখন সে যেন বিতর্ক বন্ধ করে নিজের কথার জন্য অগ্রিম ক্ষমা চায়।" তবে ইসলাম সর্বক্ষেত্রে নতজানু হতে বলে না; বরং তাদের বিনয়ী ও আত্মমর্যাদাশীল হতে বলে। কোনো অজ্ঞ, বদমেজাজী ও ক্রুদ্ধ ব্যক্তির অন্যায় ও অশ্লীল কথার জবাব অন্যায় কথা দিয়ে দিতে গেলে মুসলিম অবশ্যই তার মর্যাদাই হারাবে। এ জন্য এসব পরিস্থিতিতে নীরব থাকাই কল্যাণকর। অতএব, যদিও এমন প্রতিটি পরিস্থিতিই অন্য পরিস্থিতির চেয়ে পৃথক। কাজেই স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোন্ পন্থা অবলম্বন করা উত্তম, সেটা মুসলিম নিজেই বিবেচনা করবে। তবে তাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, তার কথার মাধ্যমে যেন শত্রুতা-বৈরিতা কোনোভাবে না বাড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّعَانِ وَلَا الْفَاحِشَ وَلَا الْبَذِيء “মু'মিন না দোষারোপকারী হয়, না লা'নাতকারী, না অশ্লীলভাষী আর না বাচাল হয়। "৪৩১
পারস্পরিক কথাবার্তায় অনেক সময় তর্ক-বিতর্ক হয়। একজন মু'মিনকে যথাসম্ভব এ তর্ক-বিতর্কও এড়িয়ে চলা দরকার। মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রা.) বলেন, إِيَّاكُمْ وَالْمِرَاء فَإِنَّهَا سَاعَةُ جَهْلِ الْعَالِمِ وَبِهَا يَبْتَغِي الشَّيْطَانُ زَلْتَهُ. “তোমরা তর্ক-বিতর্ক থেকে বেঁচে থাকো। কেননা এটি 'আলিমের অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করার মুহূর্ত। আর শাইতান এর মাধ্যমে তার পদস্খলন ঘটাতে চায়।”৪৩২ উল্লেখ্য যে, কখনো যুক্তি-তর্কে ইতিবাচক দিকও থাকে। আর এটা হলো- এমন তর্ক বা যুক্তি, যার পেছনে মহৎ উদ্দেশ্য আছে এবং যেখানে উভয় পক্ষই খোলামেলা সত্যের সন্ধানে উৎসুক। পবিত্র কোরআনে এমন তর্ককে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴿ - “আর সবচেয়ে সুন্দর উপায়ে তর্ক-বিতর্ক করো।”৪৩৩ এ আয়াতের মর্ম হলো- যদি দা'ওয়াতের কাজে কোথাও তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে তাও অতীব উত্তম উপায়ে হতে হবে। এখানে উত্তম উপায় বলতে বোঝানো হয়েছে,
কথাবার্তায় নম্রতা ও নমনীয়তা অবলম্বন করতে হবে, এমন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যা প্রতিপক্ষ বোঝতে সক্ষম হয়। বিশুদ্ধ ও বাস্তবসম্পন্ন দলীল-প্রমাণ পেশ করতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষের সন্দেহ দূরীভূত হয় এবং সে হঠকারিতার পথ পরিহার করে।
পক্ষান্তরে ইসলাম যুক্তি-তর্কের নামে ঐ সব লোকের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়াকে অনুৎসাহিত করেছে, যারা সত্য থেকে তাদের মনের দুয়ার রুদ্ধ করেছে এবং তর্কের খাতিরেই তর্ক করে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও এ জাতীয় লোকদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে উম্মাতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْحَدَلَ. "যে কোনো কাওম হিদায়াত লাভের পরে যখনই অর্থহীন তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়, তখন তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।" রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথার প্রমাণ হিসেবে তিলাওয়াত করলেন, مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ -"তারা আপনার কাছে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে, তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুত তারা হলো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।” (আল-কোরআন, ৪৩:৫৮) ৪৩৪ এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকেরাও স্বার্থান্ধ, বাচাল, তর্ককারী লোকের সাথে অর্থহীন আলোচনায় জড়িয়ে পড়ে পথ হারাতে পারে।

টিকাঃ
৪২০. দ্র. আল কোরআন, সূরা আর-রাহমান, ৫৫:৪
৪২১. দ্র. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৮৩; সূরা আল-ইসরা', ১৭: ৫৩
৪২২. আল কোরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, ২৩:৩
৪২৩. আল কোরআন, সূরা আল-আন'আম, ৬: ৬৮
৪২৪. জাসসাস, আহকামুল কোরআন, খ.৪, পৃ.১৬৬
৪২৫. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং:৫৬৭২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৮২
৪২৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩০৪৮; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৮৮৭ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শু'আইব আল-আরনাউত (রাহ.)-এর মতে, এ হাদীসের সনদ দুর্বল।
৪২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪০৬; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২২২৩৫
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০১৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ।
৪২৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪১১; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৪: হিফযুল লিসান), হা. নং: ৪৬০০; ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। তাছাড়া এ হাদীসটি সামান্য শব্দগত পরিবর্তনসহ 'মুওয়াত্তা' (হা. নং: ৯৭৫)-এর মধ্যেও বর্ণিত আছে।
৪৩০. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-'ইলম), হা. নং: ৪২৭, ৪২৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৬৯৫ বিশিষ্ট, মুহাদ্দিস আল-হাকিম (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ। তবে শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, খ. ১১, পৃ. ৩০০, হা. নং: ৪৮৫৩)
৪৩১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯৭৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৩৮৩৯ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দাঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৪, পৃ. ৪৭৭)
৪৩২. দারিমী, আস-সুনান, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৩৯৬ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হুসাইন সালীম (রাহ.) বলেন, হাদীসটির সনদ সাহীহ।
৪৩৩. আল কোরআন, সূরা আন-নাহল, ১৬: ১২৫
৪৩৪. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩২৫৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মুকাদ্দামাহ, বাব: ইজতিনাবুল বিদা'..), হা. নং: ৪৮ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 অপ্রয়োজনীয় বা অনর্থক কাজ করা

📄 অপ্রয়োজনীয় বা অনর্থক কাজ করা


একজন মু'মিন যেমন অনর্থক ও বাজে কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকেন, তেমনি তিনি যে কোনো অনর্থক ও বাজে কার্যকলাপ থেকেও বিরত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ -“আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪৩৫ অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا -“এবং তারা যখন অসার কার্যকলাপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তারা ভদ্রভাবে চলে যায়।” এ আয়াতগুলো থেকে জানা যায়, মু'মিনরা কখনো বাজে ও অসার কার্যকলাপে লিপ্ত তো হতেই পারে না এবং এরূপ কাজের পাশেও তারা যায় না। এটা সত্যিকার ঈমানের পরিপন্থী। তবে ঘটনাচক্রে যদি তাদের কখনো কোনো বাজে ও অনর্থক কার্যকলাপের পাশ দিয়ে গমন করতে হয়, তখন তারা ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত লোকদের ন্যায় চলে যায়। ইব্রাহীম ইবনু মায়সারাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন ইবনু মাস'উদ (রা.) ঘটনাক্রমে একটি বাজে কাজের পাশ দিয়ে গমন করেন। তিনি সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা চলে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা জানতে পেরে বললেন, أصبح ابن مَسْعُودٍ وَأَمْسَى كَرِيمًا “ইবনু মাস'উদ ভদ্র হয়ে গেছে।” অতঃপর ইবনু মায়সারাহ (রা.) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। ৪৩৬
মোট কথা, যে সব কাজে কোনো উপকারিতা নেই; বরং ক্ষতিই বিদ্যমান, তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। তবে যে সব কাজে কোনো উপকারও নেই, ক্ষতিও নেই, এ সব অর্থহীন বিষয়ও বর্জন করে চলা ন্যূনপক্ষে উত্তম ও প্রশংসনীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ -"মানুষ যখন অনর্থক বিষয় ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে। "৪৩৭ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুত্তাকীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, لَا يَبْلُغُ الْعَبْدُ أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُتَّقِينَ حَتَّى يَدَعَ مَا لَا بَأْسَ بِهِ حذرًا لِمَا بِهِ الْبَأْسُ . পৌঁছতে পারবে না, যে যাবত না সে অবাঞ্ছিত বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় (অনেক) নির্দোষ বিষয়ও বর্জন করে চলবে। "৪৩৮ এ কারণেই উপযুক্ত আয়াতগুলোতে অনর্থক ও অর্থহীন কাজ এড়িয়ে চলাকে পরিপূর্ণ মু'মিনের বিশেষ গুণরূপে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিকাঃ
৪৩৫. আল কোরআন, ২৩ (সূরা আল-মু'মিনূন): ৩
৪৩৬. ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৬. পৃ. ১৩১
৪৩৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব আয-যুহদ), হা. নং: ২৩১৭, ২৩১৮; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-ফিতান), হা. নং: ৩৯৭৬ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৩১৭)
৪৩৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব সিফাতুল কিয়ামাহ,...), হা. নং: ২৪৫১; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২১৫ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৪৫১)

একজন মু'মিন যেমন অনর্থক ও বাজে কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকেন, তেমনি তিনি যে কোনো অনর্থক ও বাজে কার্যকলাপ থেকেও বিরত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত মু'মিনদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ -“আর যারা অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে। "৪৩৫ অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا -“এবং তারা যখন অসার কার্যকলাপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তারা ভদ্রভাবে চলে যায়।” এ আয়াতগুলো থেকে জানা যায়, মু'মিনরা কখনো বাজে ও অসার কার্যকলাপে লিপ্ত তো হতেই পারে না এবং এরূপ কাজের পাশেও তারা যায় না। এটা সত্যিকার ঈমানের পরিপন্থী। তবে ঘটনাচক্রে যদি তাদের কখনো কোনো বাজে ও অনর্থক কার্যকলাপের পাশ দিয়ে গমন করতে হয়, তখন তারা ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত লোকদের ন্যায় চলে যায়। ইব্রাহীম ইবনু মায়সারাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন ইবনু মাস'উদ (রা.) ঘটনাক্রমে একটি বাজে কাজের পাশ দিয়ে গমন করেন। তিনি সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা চলে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা জানতে পেরে বললেন, أصبح ابن مَسْعُودٍ وَأَمْسَى كَرِيمًا “ইবনু মাস'উদ ভদ্র হয়ে গেছে।" অতঃপর ইবনু মায়সারাহ (রা.) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। ৪৩৬
মোট কথা, যে সব কাজে কোনো উপকারিতা নেই; বরং ক্ষতিই বিদ্যমান, তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। তবে যে সব কাজে কোনো উপকারও নেই, ক্ষতিও নেই, এ সব অর্থহীন বিষয়ও বর্জন করে চলা ন্যূনপক্ষে উত্তম ও প্রশংসনীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ -"মানুষ যখন অনর্থক বিষয় ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে। "৪৩৭ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুত্তাকীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, لَا يَبْلُغُ الْعَبْدُ أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُتَّقِينَ حَتَّى يَدَعَ مَا لَا بَأْسَ بِهِ حذرًا لِمَا بِهِ الْبَأْسُ . পৌঁছতে পারবে না, যে যাবত না সে অবাঞ্ছিত বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় (অনেক) নির্দোষ বিষয়ও বর্জন করে চলবে। "৪৩৮ এ কারণেই উপযুক্ত আয়াতগুলোতে অনর্থক ও অর্থহীন কাজ এড়িয়ে চলাকে পরিপূর্ণ মু'মিনের বিশেষ গুণরূপে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিকাঃ
৪৩৫. আল কোরআন, ২৩ (সূরা আল-মু'মিনূন): ৩
৪৩৬. ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৬. পৃ. ১৩১
৪৩৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব আয-যুহদ), হা. নং: ২৩১৭, ২৩১৮; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-ফিতান), হা. নং: ৩৯৭৬ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৩১৭)
৪৩৮. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব সিফাতুল কিয়ামাহ,...), হা. নং: ২৪৫১; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২১৫ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৪৫১)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00