📄 গীবত (পরনিন্দা)
গীবাত অর্থ হলো কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ চর্চা করা। গীবাতের সবচেয়ে উত্তম ও বাস্তবসম্মত সংজ্ঞা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করেন, أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ ؟ “গীবত কাকে বলে, তা কি তোমরা জানো?" সাহাবীগণ আরয করলেন, اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ "আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন?" তিনি বললেন, ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يُكْرَهُ - "গীবাত হচ্ছে এই যে, তোমার ভাইয়ের এমন কোনো বিষয় চর্চা করা, যা সে অপছন্দ করে।" একজন সাহাবী জানতে চাইলেন, أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি যে দোষের কথা বলি, তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তা হলেও কী গীবাত হবে?" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দেন, إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اعْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَنَّهُ -"তুমি যে দোষের কথা বলেছো, তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তবে তুমি অবশ্যই গীবাত করলে। আর তুমি যা বলছো, তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিলে।”৪০১
গীবাত একটি মারাত্মক নৈতিক অপরাধ এবং ইসলামে হারাম ও কাবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ "ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।”৪০২ পবিত্র কোরআনে একে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ
কেউ যেন অপরের গীবাত না করে। তোমাদের কেউ কি আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? এ কাজকে তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে। ৪০৩ অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার হলো- কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ যতোক্ষণ তার জ্ঞান অবশিষ্ট থাকে, ততোক্ষণ মৃত মানুষ তো দূরের কথা, যে পশু জীবিত থাকলে হালাল, সেই পশু মৃত হলে তার গোশতও ভক্ষণ করে না, অথচ সে মানুষই সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে গীবাতের মতো জঘন্য ফেতনায় নিয়মিত লিপ্ত হয়! বর্তমানে মুসলিমরা ব্যাপকভাবে এ অপরাধটিতে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষভাবে মহিলারা এ কাজে বেশ এগিয়ে রয়েছে। সমাজে ব্যাপকভাবে এর চর্চা থাকার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও গীবাতের ব্যাপারে উম্মাতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسِ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ -"যখন আমাকে মি'রাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমি তামার নখ বিশিষ্ট একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তারা নখগুলো দিয়ে তাদের চেহারা ও বক্ষদেশ আঁচড়াচ্ছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, مَنْ هَؤلاء يَا جبريل؟ "জিব্রাঈল! এরা কারা?” তিনি বললেন, هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ - “এরা হলো সে সব লোক, যারা লোকদের গোশত খেতো অর্থাৎ গীবাত করতো এবং এভাবে তাদের মান- সম্মানের ওপর আঘাত হানতো।”৪০৪ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন,
مَنْ أَكَلَ لَحْمَ أَخِيهِ فِي الدُّنْيَا قُرِّبَ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ لَهُ : كُلْهُ مَيْتًا كَمَا أكلته حَيًّا . فَيَأْكُلُهُ وَيَكْلَحُ وَيَصِيحُ.
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে তার ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে (গীবাত করবে), কিয়ামাতের দিন গীবাতকারীর সামনে গীবাতকৃত ব্যক্তিকে মৃতাবস্থায় উপস্থিত করা হবে এবং বলা হবে, তুমি মৃতাবস্থায় তার গোশত ভক্ষণ করো যেমনভাবে জীবিতাবস্থায় তার গোশত ভক্ষণ করতে। অতঃপর সে অতি অনিচ্ছাসত্ত্বেও চিৎকার করতে করতে তা ভক্ষণ করবে। ৪০৫
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী ও জাবির ইবনু 'আবদিল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, الْغِيبَةُ أَشَدُّ من الزنا - "গীবাত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ।" সাহাবা কিরাম (রা.) আরয করলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزَّنَا ؟ - "ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা কীভাবে হয়?! তিনি বললেন, إِنَّ الرَّجُلَ لَيَزْنِي فَيَتُوبُ فَيَغْفِرُ لَهُ، وَإِنْ صَاحِبَ الْغِيبَةِ يُغْفَرُ لَهُ حَتَّى يَغْفِرَهَا لَهُ صَاحِبُهُ - "ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তাওবা করলে আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ মা'ফ করে দেন, কিন্তু গীবাত যে করে তার গুনাহ আক্রান্ত প্রতিপক্ষের ক্ষমা না করা পর্যন্ত মা'ফ হয় না।”৪০৬
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলো যে, গীবাত একটি জঘন্য পাপাচার। এ থেকে সবাইকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিরত থাকতে হবে। উপরন্তু, যদি কোনো ব্যক্তি অপর কাউকে গীবাত করতে দেখে, তা হলে সে সাধ্যমতো তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করবে। আর যদি প্রতিরোধের শক্তি না থাকে, তবে অন্তত সে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গীবাত শোনা নিজে গীবাত করার মতোই। অপরাধ: হাদীসে আছে, সাহাবী মায়মূন ইবনু সিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে। আমি বললাম, আমি একে কেন ভক্ষণ করবো? সে বললো, কারণ তুমি তোমার অমুক সঙ্গীর গীবাত করেছো। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনি। সে বললো, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কিন্তু তুমি তার গীবাত শুনেছো এবং সম্মত রয়েছো। ৪০৭
টিকাঃ
৪০১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৫৮
৪০২. আল কোরআন, সূরা হুমুযাহ, ১০৪: ১
৪০৩. আল কোরআন, সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ১২
৪০৪. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৮০; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩৩৪০
৪০৫. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ১৬৫৬
৪০৬. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৪: তাহরীমু আ'রাযিন নাস...), হা. নং: ৬৩১৫; দীনাউরী, আল- মুজালাসাতু... হা. নং: ৩৫৪১
৪০৭. বাগাভী, মা'আলিমুত তানযীল, খ.৭, পৃ.৩৪৭; সা'লাবী, আল-কাশফু ওয়াল বায়ানু, খ.৯, পৃ.৮৪
গীবাত অর্থ হলো কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ চর্চা করা। গীবাতের সবচেয়ে উত্তম ও বাস্তবসম্মত সংজ্ঞা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করেন, أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ ؟ “গীবত কাকে বলে, তা কি তোমরা জানো?" সাহাবীগণ আরয করলেন, اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ "আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন?" তিনি বললেন, ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يُكْرَهُ - "গীবাত হচ্ছে এই যে, তোমার ভাইয়ের এমন কোনো বিষয় চর্চা করা, যা সে অপছন্দ করে।" একজন সাহাবী জানতে চাইলেন, أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি যে দোষের কথা বলি, তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তা হলেও কী গীবাত হবে?" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দেন, إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اعْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَنَّهُ -"তুমি যে দোষের কথা বলেছো, তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তবে তুমি অবশ্যই গীবাত করলে। আর তুমি যা বলছো, তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিলে।”৪০১
গীবাত একটি মারাত্মক নৈতিক অপরাধ এবং ইসলামে হারাম ও কাবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ "ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।”৪০২ পবিত্র কোরআনে একে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ
কেউ যেন অপরের গীবাত না করে। তোমাদের কেউ কি আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? এ কাজকে তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে। ৪০৩ অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার হলো- কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ যতোক্ষণ তার জ্ঞান অবশিষ্ট থাকে, ততোক্ষণ মৃত মানুষ তো দূরের কথা, যে পশু জীবিত থাকলে হালাল, সেই পশু মৃত হলে তার গোশতও ভক্ষণ করে না, অথচ সে মানুষই সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে গীবাতের মতো জঘন্য ফেতনায় নিয়মিত লিপ্ত হয়! বর্তমানে মুসলিমরা ব্যাপকভাবে এ অপরাধটিতে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষভাবে মহিলারা এ কাজে বেশ এগিয়ে রয়েছে। সমাজে ব্যাপকভাবে এর চর্চা থাকার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও গীবাতের ব্যাপারে উম্মাতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسِ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ -"যখন আমাকে মি'রাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমি তামার নখ বিশিষ্ট একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তারা নখগুলো দিয়ে তাদের চেহারা ও বক্ষদেশ আঁচড়াচ্ছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, مَنْ هَؤلاء يَا جبريل؟ "জিব্রাঈল! এরা কারা?” তিনি বললেন, هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ - “এরা হলো সে সব লোক, যারা লোকদের গোশত খেতো অর্থাৎ গীবাত করতো এবং এভাবে তাদের মান- সম্মানের ওপর আঘাত হানতো।"৪০৪ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন,
مَنْ أَكَلَ لَحْمَ أَخِيهِ فِي الدُّنْيَا قُرِّبَ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ لَهُ : كُلْهُ مَيْتًا كَمَا أكلته حَيًّا . فَيَأْكُلُهُ وَيَكْلَحُ وَيَصِيحُ.
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে তার ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে (গীবাত করবে), কিয়ামাতের দিন গীবাতকারীর সামনে গীবাতকৃত ব্যক্তিকে মৃতাবস্থায় উপস্থিত করা হবে এবং বলা হবে, তুমি মৃতাবস্থায় তার গোশত ভক্ষণ করো যেমনভাবে জীবিতাবস্থায় তার গোশত ভক্ষণ করতে। অতঃপর সে অতি অনিচ্ছাসত্ত্বেও চিৎকার করতে করতে তা ভক্ষণ করবে। ৪০৫
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী ও জাবির ইবনু 'আবদিল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, الْغِيبَةُ أَشَدُّ من الزنا - "গীবাত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ।" সাহাবা কিরাম (রা.) আরয করলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزَّنَا ؟ - "ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা কীভাবে হয়?! তিনি বললেন, إِنَّ الرَّجُلَ لَيَزْنِي فَيَتُوبُ فَيَغْفِرُ لَهُ، وَإِنْ صَاحِبَ الْغِيبَةِ يُغْفَرُ لَهُ حَتَّى يَغْفِرَهَا لَهُ صَاحِبُهُ - "ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তাওবা করলে আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ মা'ফ করে দেন, কিন্তু গীবাত যে করে তার গুনাহ আক্রান্ত প্রতিপক্ষের ক্ষমা না করা পর্যন্ত মা'ফ হয় না।”৪০৬
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলো যে, গীবাত একটি জঘন্য পাপাচার। এ থেকে সবাইকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিরত থাকতে হবে। উপরন্তু, যদি কোনো ব্যক্তি অপর কাউকে গীবাত করতে দেখে, তা হলে সে সাধ্যমতো তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করবে। আর যদি প্রতিরোধের শক্তি না থাকে, তবে অন্তত সে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গীবাত শোনা নিজে গীবাত করার মতোই অপরাধ: হাদীসে আছে, সাহাবী মায়মূন ইবনু সিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে। আমি বললাম, আমি একে কেন ভক্ষণ করবো? সে বললো, কারণ তুমি তোমার অমুক সঙ্গীর গীবাত করেছো। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনি। সে বললো, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কিন্তু তুমি তার গীবাত শুনেছো এবং সম্মত রয়েছো। ৪০৭
টিকাঃ
৪০১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৫৮
৪০২. আল কোরআন, সূরা হুমুযাহ, ১০৪: ১
৪০৩. আল কোরআন, সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ১২
৪০৪. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৮০; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩৩৪০
৪০৫. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ১৬৫৬
৪০৬. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৪: তাহরীমু আ'রাযিন নাস...), হা. নং: ৬৩১৫; দীনাউরী, আল- মুজালাসাতু... হা. নং: ৩৫৪১
৪০৭. বাগাভী, মা'আলিমুত তানযীল, খ.৭, পৃ.৩৪৭; সা'লাবী, আল-কাশফু ওয়াল বায়ানু, খ.৯, পৃ.৮৪
📄 ছিদ্রান্বেষণ
ছিদ্রান্বেষণের অর্থ হলো- আপন ভাইয়ের দোষ খোঁজে বেড়ানো। এটিও গীবাতের মতো একটি মারাত্মক নৈতিক অপরাধ। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾وَلَا تَحَسَّسُوا﴿ -"আর তোমরা দোষ খোঁজে বেড়িয়ো না।”৪০৮ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ ، فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَّبَعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ ، وَمَنْ تَتَّبَعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ.
তোমরা মুসলমানদের দোষ খোঁজে বেড়িয়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ খোঁজতে থাকে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপন দোষ ফাঁস করতে লেগে যান। আর আল্লাহ তা'আলা যার দোষ প্রকাশ করতে লেগে যান, তাকে তিনি অপমান করেই ছাড়েন, যদিও সে তার ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকুক না কেন। ৪০৯
টিকাঃ
৪০৮. আল কোরআন, (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ১২
৪০৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০৩২; আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৮২
ছিদ্রান্বেষণের অর্থ হলো- আপন ভাইয়ের দোষ খোঁজে বেড়ানো। এটিও গীবাতের মতো একটি মারাত্মক নৈতিক অপরাধ। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾وَلَا تَحَسَّسُوا﴿ -"আর তোমরা দোষ খোঁজে বেড়িয়ো না।”৪০৮ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ ، فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ ، وَمَنْ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ.
তোমরা মুসলমানদের দোষ খোঁজে বেড়িয়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ খোঁজতে থাকে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপন দোষ ফাঁস করতে লেগে যান। আর আল্লাহ তা'আলা যার দোষ প্রকাশ করতে লেগে যান, তাকে তিনি অপমান করেই ছাড়েন, যদিও সে তার ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকুক না কেন। ৪০৯
টিকাঃ
৪০৮. আল কোরআন, (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ১২
৪০৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০৩২; আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৮২
📄 চোগলখোরি করা
গীবাতের একটি বিশেষ রূপ হচ্ছে চুগলখোরি। এর অর্থ হলো- মানুষের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি বা ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্য জনের নিকট বর্ণনা করা। এটাও একটা অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ। পবিত্র কোরআন এর নিন্দা করতে গিয়ে বলেছে, ﴾هَمَّازِ مَشَّاء بِنَمِيمٍ - "যারা লোকদের প্রতি বিদ্রূপ প্রদর্শন করে এবং চুগলখোরি করে বেড়ায়। "৪১০ হাদীসেও চুগলখোরি সম্পর্কে কঠোর সর্তক করা হয়েছে। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শোনেছি যে, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ "চুগলখোর জান্নাতে যাবে না।”৪১১ 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে বিশেষভাবে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, لَا يُبَلِّغْنِي أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِي عَنْ أَحَدٍ شَيْئًا - فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصَّدْرِ কারো সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা আমার কাছে পৌঁছাবে না। কারণ আমি যখন তোমাদের কাছে আসি, তখন সবার প্রতিই আমার মন পরিষ্কার থাকুক- এটাই আমি পছন্দ করি।”৪১২
হাদীস থেকে জানা যায় যে, কবরের 'আযাবের একটি প্রধান কারণও হলো- চুগলখোরি করা। 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাদীনা বা মাক্কার কোনো একটি বাগানের পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। সেখানে তিনি দুজন এমন মানুষের আওয়ায শোনতে পেলেন, যাদেরকে কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, يُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ "তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, অথচ বড় কোনো অপরাধের কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না।" অতঃপর তিনি বললেন, بَلَى كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ - “তাদের একজন পেশাব করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতো না। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগাতো। "৪১৩ কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমাদেরকে বলা হয়েছে যে, কবরের 'আযাবের এক তৃতীয়াংশ হবে গীবাতের কারণে, এক তৃতীয়াংশ পেশাব থেকে সাবধান না থাকার কারণে এবং এক তৃতীয়াংশ চোগলখোরীর কারণে যেহেতু গীবাতকারী ও চোগলখোর মিথ্যা কথাও বলে থাকে, তাই সে মিথ্যাবাদীর শাস্তিও ভোগ করবে। ৪১৪
টিকাঃ
৪১০. আল কোরআন, সূরা আল-কালাম, ৬৮: ১১
৪১১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩০৩
৪১২. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৬২; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মানাকিব) হা. নং: ৩৮৯৬। ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব।
৪১৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ওযু), হা. নং: ২১৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আত- তাহারাত), হা. নং: ৭০৩
৪১৪. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৩, পৃ. ১৪৩; ইবনু রাজাব, আহওয়ালুল কাবর, পৃ. ৮৫; ইবনু হাজার আল- হাইতামী, আয-যাওয়াজির 'আন ইকতিরাফিল কাবা'য়ির, খ. ২, পৃ. ২৩৯
গীবাতের একটি বিশেষ রূপ হচ্ছে চুগলখোরি। এর অর্থ হলো- মানুষের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি বা ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্য জনের নিকট বর্ণনা করা। এটাও একটা অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ। পবিত্র কোরআন এর নিন্দা করতে গিয়ে বলেছে, ﴾هَمَّازِ مَشَّاء بِنَمِيمٍ - "যারা লোকদের প্রতি বিদ্রূপ প্রদর্শন করে এবং চুগলখোরি করে বেড়ায়। "৪১০ হাদীসেও চুগলখোরি সম্পর্কে কঠোর সর্তক করা হয়েছে। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শোনেছি যে, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ "চুগলখোর জান্নাতে যাবে না।”৪১১ 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে বিশেষভাবে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, لَا يُبَلِّغْنِي أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِي عَنْ أَحَدٍ شَيْئًا - فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصَّدْرِ কারো সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা আমার কাছে পৌঁছাবে না। কারণ আমি যখন তোমাদের কাছে আসি, তখন সবার প্রতিই আমার মন পরিষ্কার থাকুক- এটাই আমি পছন্দ করি।”৪১২
হাদীস থেকে জানা যায় যে, কবরের 'আযাবের একটি প্রধান কারণও হলো- চুগলখোরি করা। 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাদীনা বা মাক্কার কোনো একটি বাগানের পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। সেখানে তিনি দুজন এমন মানুষের আওয়ায শোনতে পেলেন, যাদেরকে কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, يُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ "তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, অথচ বড় কোনো অপরাধের কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না।" অতঃপর তিনি বললেন, بَلَى كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ - “তাদের একজন পেশাব করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতো না। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগাতো। "৪১৩ কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমাদেরকে বলা হয়েছে যে, কবরের 'আযাবের এক তৃতীয়াংশ হবে গীবাতের কারণে, এক তৃতীয়াংশ পেশাব থেকে সাবধান না থাকার কারণে এবং এক তৃতীয়াংশ চোগলখোরীর কারণে যেহেতু গীবাতকারী ও চোগলখোর মিথ্যা কথাও বলে থাকে, তাই সে মিথ্যাবাদীর শাস্তিও ভোগ করবে। ৪১৪
টিকাঃ
৪১০. আল কোরআন, সূরা আল-কালাম, ৬৮: ১১
৪১১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩০৩
৪১২. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৬২; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-মানাকিব) হা. নং: ৩৮৯৬। ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি গারীব।
৪১৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ওযু), হা. নং: ২১৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আত- তাহারাত), হা. নং: ৭০৩
৪১৪. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৩, পৃ. ১৪৩; ইবনু রাজাব, আহওয়ালুল কাবর, পৃ. ৮৫; ইবনু হাজার আল- হাইতামী, আয-যাওয়াজির 'আন ইকতিরাফিল কাবা'য়ির, খ. ২, পৃ. ২৩৯
📄 রাগ
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। এটা আমাদেরকে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি থেকেও বাঁচিয়ে রাখে। উল্লেখ্য যে, ইসলাম আল্লাহর পথে রাগ বা ক্ষোভের সাথে ব্যক্তি স্বার্থ বা অহংবোধের কারণে সৃষ্ট রাগের মধ্যে পার্থক্য করেছে। প্রথম ধরনের ক্ষোভ ঈমানদারদের মধ্যে তৈরি হয়, যখন তারা দেখে যে, মানুষ আল্লাহ তা'আলার বিধান অমান্য বা অবজ্ঞা করছে। এ ধরনের ক্ষোভ হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। কারণ, এটা দৃঢ় ঈমানের আলামাত। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে ক্ষুব্ধ বা রাগান্বিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। বিশেষত যদি রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, মানুষ প্রচণ্ড ক্রোধান্ধ হয়ে যায় এবং সামান্য উস্কানীতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া করে। ইসলাম মানুষকে উস্কানীর মুখে একেবারে অনুভূতিহীন হতে বলে না; কিন্তু এটা এই শিক্ষা দেয় যে, রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ক্ষমার মানসিকতা রাখতে হবে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের নিকট তাকওয়ার গুণাবলি তোলে ধরতে গিয়ে বলেন, وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ) "... আর যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে।”৪১৫ ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এ বৈশিষ্ট্যটি অতি বড়ো সাহসের কাজ, এটা সহজে অর্জন করা যায় না। কারণ, কোনো মানুষ যখন কষ্ট পায় অথবা তার কোনো ক্ষতি সাধন হয়, তখন সর্বপ্রথম স্বভাবত ক্রোধই তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করার প্রয়াস পায়। আর ক্রোধ যদি তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করতে পারে, তা হলে সে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে। এ কারণে এ গুণ অর্জন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে নাফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও শাসন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ -"সে প্রকৃত শক্তিশালী নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সে-ই প্রকৃত শক্তিশালী, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। "৪১৬ সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললো, আমাকে সংক্ষেপে কিছু শিক্ষা দিন, যাতে আমি তা মনে রাখতে পারি। তিনি বললেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।" সে বারংবার একই কথা বলছিলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও প্রতিবারই ইরশাদ করেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।”৪১৭ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উপদেশটি দেওয়ার কারণ এই ছিলো যে, তিনি বোঝতে পেরেছিলেন, কেউ রাগান্বিত হয়ে পড়লে তা তার এবং তার আশেপাশের লোকজনের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে কতোটা ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে, রাগের মুহূর্তে এই উপদেশটা মেনে চলা এতো সহজ কাজ নয়, তাই তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মাতকে। আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعُ - "তোমাদের কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া, আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।”৪১৮
যে ব্যক্তি রাগান্বিত হওয়া সত্ত্বেও তার ভাইকে ক্ষমা করে দেয়, তার জন্য আখিরাতেও রয়েছে শ্রেষ্ঠতর প্রতিদান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - dَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ.
'যে ব্যক্তি ক্রোধ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও তাকে হযম করে ফেললো, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডাকবেন এবং হুরের মধ্য থেকে যা সে ইচ্ছা করবে তা মনোনীত করার ইখতিয়ার দেবেন। ৪১৯
টিকাঃ
৪১৫. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৩৪
৪১৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৮০৯
৪১৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৫; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০২০
৪১৮. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৮৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১০৪৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন এই উপদেশ দিয়েছেন আমাদের তা সঠিকভাবে বোঝতে হলে আমাদের জানতে হবে, আমাদের শরীর ও মনের ওপর রাগের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো কী কী, আর বসে বা শোয়ে পড়ার সাথে রাগের সম্পর্কটা বা কী? কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তখন তার কিডনির ওপরে অবস্থিত অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রেনালিন নামক এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়। রাগ, ভয়, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়া বা এ জাতীয় যে কোনো শারীরিক বা মানসিক চাপের কারণে এই হরমোনের নিঃসরণ ঘটতে পারে। আর এই অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে নরঅ্যাড্রেনালিন নামক আরও এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ ঘটে, যদিও কিনা এই হরমোনের প্রধান উৎস হলো হৃদপিণ্ডে সিম্পেথেটিক স্নায়ুর প্রান্ত ভাগে। তবে এ দু প্রকার হরমোনই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং এদের নিঃসরণও ঘটে একই সাথে।
রাগের ফলে আমাদের শরীরে এ দু প্রকারের হরমোনই অধিক পরিমাণে নিঃসরিত হতে থাকে। এর মধ্যে একটা হরমোন যেহেতু হৃদপিণ্ড থেকে নিঃসরিত হয়, তাই রাগান্বিত অবস্থায় আমাদের হৃদপিণ্ড অধিকতর সক্রিয় হয়ে পড়ে, ফলে হৃদকম্পন হয়ে ওঠে আরও দ্রুত ও অনিয়মিত। শারীরিক বা মানসিক চাপের ফলে হৃদপিণ্ডের এই তীব্র পরিবর্তন আমরা অনেকেই প্রায় সময় অনুভব করতে পারি। তা ছাড়াও আমাদের রেগে যাবার ফলে হৃদপিণ্ডের অতি সক্রিয়তার কারণে অতিরিক্ত অক্সিজেনের জোগান দেওয়ার জন্য হৃদপেশীর সংকোচনও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে ধমনীতে চাপ পড়ে। আর তাই রাগান্বিত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়। আর যাদের ধমনীর প্রশস্ততা কম, তাদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কেননা তাদের সঙ্কুচিত ধমনী দিয়ে হঠাৎ অধিক বেগে রক্ত সঞ্চালনের ফলে ধমনীতে সৃষ্ট অতিরিক্ত চাপের কারণে তা ছিঁড়ে যেতে পারে যে কোনো সময়ে। শরীরে এ দু হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যাবার ফলে আমাদের রক্তচাপও বৃদ্ধি পায় অনেক, যা ব্লাড প্রেসারের (অধিক বা কম রক্তচাপের) সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য খুবই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর। তা ছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের সাধারণত রাগ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়। কেননা রাগ বা মানসিক চাপের ফলে সৃষ্ট অ্যাড্রেনালিন আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা একজন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য খুবই বিপজ্জনক।
এবার দেখা যাক, রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে উপায় বলে দিয়েছেন আমাদের জন্য তা কতোটা বিজ্ঞানসম্মত? চিকিৎসা শাস্ত্রের বিখ্যাত লেখক হ্যারিসন বলেন, "এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, পাঁচ মিনিট শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন একজন ব্যক্তির রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু বিভিন্ন রকমের মানসিক চাপ রক্তে অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা খুব বাড়িয়ে দিতে পারে।"
সহজ কথায় বলতে হয়, শান্তভাবে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই মানুষের রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়, সাথে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। এখানে মনে রাখা উচিত যে, অ্যাড্রেনালিন নামক হরমোনটি প্রধানত রাগ বা মানসিক চাপের কারণে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই সুস্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হয় যে, দাঁড়ানো অবস্থায় রেগে গেলে এই হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ আমাদের শরীরের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এর থেকেই বোঝা যায়, আজ থেকে পনেরো শ' বছর আগে যখন বর্তমানের তুলনায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানুষের জ্ঞান বা অগ্রগতি ছিল যৎসামান্য, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিয়ে যাওয়া এই উপদেশ বাণীর গুরুত্ব কতোটুকু! "কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।" এটাই হলো সর্বকালের সর্বাধুনিক ডাক্তারী পরামর্শ।
৪১৯. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৭৯; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিরর...), হা. নং: ২০২১, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), ২৪৯৩ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। এটা আমাদেরকে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি থেকেও বাঁচিয়ে রাখে। উল্লেখ্য যে, ইসলাম আল্লাহর পথে রাগ বা ক্ষোভের সাথে ব্যক্তি স্বার্থ বা অহংবোধের কারণে সৃষ্ট রাগের মধ্যে পার্থক্য করেছে। প্রথম ধরনের ক্ষোভ ঈমানদারদের মধ্যে তৈরি হয়, যখন তারা দেখে যে, মানুষ আল্লাহ তা'আলার বিধান অমান্য বা অবজ্ঞা করছে। এ ধরনের ক্ষোভ হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। কারণ, এটা দৃঢ় ঈমানের আলামাত। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে ক্ষুব্ধ বা রাগান্বিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। বিশেষত যদি রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, মানুষ প্রচণ্ড ক্রোধান্ধ হয়ে যায় এবং সামান্য উস্কানীতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া করে। ইসলাম মানুষকে উস্কানীর মুখে একেবারে অনুভূতিহীন হতে বলে না; কিন্তু এটা এই শিক্ষা দেয় যে, রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ক্ষমার মানসিকতা রাখতে হবে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের নিকট তাকওয়ার গুণাবলি তোলে ধরতে গিয়ে বলেন, وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ) "... আর যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে।”৪১৫ ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এ বৈশিষ্ট্যটি অতি বড়ো সাহসের কাজ, এটা সহজে অর্জন করা যায় না। কারণ, কোনো মানুষ যখন কষ্ট পায় অথবা তার কোনো ক্ষতি সাধন হয়, তখন সর্বপ্রথম স্বভাবত ক্রোধই তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করার প্রয়াস পায়। আর ক্রোধ যদি তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করতে পারে, তা হলে সে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে। এ কারণে এ গুণ অর্জন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে নাফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও শাসন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ -"সে প্রকৃত শক্তিশালী নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সে-ই প্রকৃত শক্তিশালী, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। "৪১৬ সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললো, আমাকে সংক্ষেপে কিছু শিক্ষা দিন, যাতে আমি তা মনে রাখতে পারি। তিনি বললেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।" সে বারংবার একই কথা বলছিলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও প্রতিবারই ইরশাদ করেন, لَا تَغْضَبْ - "রাগ করো না।”৪১৭ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উপদেশটি দেওয়ার কারণ এই ছিলো যে, তিনি বোঝতে পেরেছিলেন, কেউ রাগান্বিত হয়ে পড়লে তা তার এবং তার আশেপাশের লোকজনের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে কতোটা ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে, রাগের মুহূর্তে এই উপদেশটা মেনে চলা এতো সহজ কাজ নয়, তাই তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মাতকে। আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعُ - "তোমাদের কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া, আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।”৪১৮
যে ব্যক্তি রাগান্বিত হওয়া সত্ত্বেও তার ভাইকে ক্ষমা করে দেয়, তার জন্য আখিরাতেও রয়েছে শ্রেষ্ঠতর প্রতিদান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - dَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ.
'যে ব্যক্তি ক্রোধ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও তাকে হযম করে ফেললো, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডাকবেন এবং হুরের মধ্য থেকে যা সে ইচ্ছা করবে তা মনোনীত করার ইখতিয়ার দেবেন। ৪১৯
টিকাঃ
৪১৫. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৩৪
৪১৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৮০৯
৪১৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৬৫; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ২০২০
৪১৮. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৮৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১০৪৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন এই উপদেশ দিয়েছেন আমাদের তা সঠিকভাবে বোঝতে হলে আমাদের জানতে হবে, আমাদের শরীর ও মনের ওপর রাগের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো কী কী, আর বসে বা শোয়ে পড়ার সাথে রাগের সম্পর্কটা বা কী? কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তখন তার কিডনির ওপরে অবস্থিত অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে অ্যাড্রেনালিন নামক এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়। রাগ, ভয়, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়া বা এ জাতীয় যে কোনো শারীরিক বা মানসিক চাপের কারণে এই হরমোনের নিঃসরণ ঘটতে পারে। আর এই অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে নরঅ্যাড্রেনালিন নামক আরও এক প্রকার হরমোন নিঃসরণ ঘটে, যদিও কিনা এই হরমোনের প্রধান উৎস হলো হৃদপিণ্ডে সিম্পেথেটিক স্নায়ুর প্রান্ত ভাগে। তবে এ দু প্রকার হরমোনই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং এদের নিঃসরণও ঘটে একই সাথে।
রাগের ফলে আমাদের শরীরে এ দু প্রকারের হরমোনই অধিক পরিমাণে নিঃসরিত হতে থাকে। এর মধ্যে একটা হরমোন যেহেতু হৃদপিণ্ড থেকে নিঃসরিত হয়, তাই রাগান্বিত অবস্থায় আমাদের হৃদপিণ্ড অধিকতর সক্রিয় হয়ে পড়ে, ফলে হৃদকম্পন হয়ে ওঠে আরও দ্রুত ও অনিয়মিত। শারীরিক বা মানসিক চাপের ফলে হৃদপিণ্ডের এই তীব্র পরিবর্তন আমরা অনেকেই প্রায় সময় অনুভব করতে পারি। তা ছাড়াও আমাদের রেগে যাবার ফলে হৃদপিণ্ডের অতি সক্রিয়তার কারণে অতিরিক্ত অক্সিজেনের জোগান দেওয়ার জন্য হৃদপেশীর সংকোচনও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে ধমনীতে চাপ পড়ে। আর তাই রাগান্বিত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়। আর যাদের ধমনীর প্রশস্ততা কম, তাদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কেননা তাদের সঙ্কুচিত ধমনী দিয়ে হঠাৎ অধিক বেগে রক্ত সঞ্চালনের ফলে ধমনীতে সৃষ্ট অতিরিক্ত চাপের কারণে তা ছিঁড়ে যেতে পারে যে কোনো সময়ে। শরীরে এ দু হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যাবার ফলে আমাদের রক্তচাপও বৃদ্ধি পায় অনেক, যা ব্লাড প্রেসারের (অধিক বা কম রক্তচাপের) সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য খুবই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর। তা ছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের সাধারণত রাগ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়। কেননা রাগ বা মানসিক চাপের ফলে সৃষ্ট অ্যাড্রেনালিন আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা একজন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য খুবই বিপজ্জনক।
এবার দেখা যাক, রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে উপায় বলে দিয়েছেন আমাদের জন্য তা কতোটা বিজ্ঞানসম্মত? চিকিৎসা শাস্ত্রের বিখ্যাত লেখক হ্যারিসন বলেন, "এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, পাঁচ মিনিট শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন একজন ব্যক্তির রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু বিভিন্ন রকমের মানসিক চাপ রক্তে অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা খুব বাড়িয়ে দিতে পারে।"
সহজ কথায় বলতে হয়, শান্তভাবে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই মানুষের রক্তে নরঅ্যাড্রেনালিনের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়, সাথে অ্যাড্রেনালিনও সামান্য পরিমাণ বেড়ে যায়। এখানে মনে রাখা উচিত যে, অ্যাড্রেনালিন নামক হরমোনটি প্রধানত রাগ বা মানসিক চাপের কারণে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই সুস্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হয় যে, দাঁড়ানো অবস্থায় রেগে গেলে এই হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ আমাদের শরীরের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এর থেকেই বোঝা যায়, আজ থেকে পনেরো শ' বছর আগে যখন বর্তমানের তুলনায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানুষের জ্ঞান বা অগ্রগতি ছিল যৎসামান্য, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিয়ে যাওয়া এই উপদেশ বাণীর গুরুত্ব কতোটুকু! "কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে তার উচিত সাথে সাথে বসে পড়া আর রাগ না কমা পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকা। অন্যথায় তার উচিত শোয়ে পড়া।" এটাই হলো সর্বকালের সর্বাধুনিক ডাক্তারী পরামর্শ।
৪১৯. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৭৭৯; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিরর...), হা. নং: ২০২১, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), ২৪৯৩ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব।