📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 গর্ব-অহংকার

📄 গর্ব-অহংকার


গর্ব-অহঙ্কার, আত্মাভিমান ও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ হচ্ছে এক প্রকারের নৈতিক বিকৃতি, শাইতানী প্রেরণা এবং আল্লাহর নিকট সবচাইতে ঘৃণিত অপরাধ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَكْبِرِينَ “তিনি (আল্লাহ) অহঙ্কারীদেরকে পছন্দ করেন না।”৩৭৪ তদুপরি পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মানুষের শিক্ষার জন্য অহঙ্কারী শাইতানের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তা থেকে জানা যায়, নিজের অহঙ্কারবোধের কারণেই শাইতান আল্লাহর আদেশ সত্ত্বেও আদাম 'আলাইহিস সালামকে সাজদা করতে অস্বীকার করে এবং এ কারণে সে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়। পবিত্র হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে গর্ব-অহঙ্কারের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ - "যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”৩৭৫ একটি হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, الْكِبْرِيَاء رِدَائِي وَالْعَظَمَةُ إِزَارِى فَمَنْ نَازَعَنِى وَاحِدًا مِنْهُمَا قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ. হলো আমার চাদর আর বড়ত্ব হলো- আমার ইযার। কাজেই যে কেউ এ দু'টির কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে দ্বন্দ্বে জড়াবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।”৩৭৬ এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সাথে সংযুক্ত। বান্দাহর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ও অহঙ্কার একটি নির্জলা মিথ্যা বৈ কিছুই নয়। কাজেই অহঙ্কার ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ প্রকারান্তরে আল্লাহ তা'আলার শান ও মর্যাদা নিয়ে দ্বন্দ্বে অবর্তীণ হওয়ার নামান্তর। যে ব্যক্তি এ মিথ্যা গর্ব-অহঙ্কারে লিপ্ত থাকে, সে আল্লাহ তা'আলার সব ধরনের সাহায্য-সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনোক্রমেই সঠিক পথ লাভ করতে পারে না। সে অনবরত মুর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিতে থাকে। এভাবে সে অবশেষে ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়।
মানুষের জন্য নিকৃষ্টতম অহঙ্কার হচ্ছে সত্য তার সামনে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হবার পর এবং সে তা উপলব্ধি করার পরও তা প্রত্যাখ্যান করা। আর এক ধরনের অহঙ্কার হচ্ছে অন্যান্য মানুষের সাথে আচরণে যা প্রকাশিত হয়। যেমন হাঁটাচলায় ও বেশভূষায় অহঙ্কার, মানুষের প্রতি অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য ভাব ও রূঢ়তা ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে অহঙ্কারের ব্যাখ্যা প্রদান করেন এভাবে- الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ-"অহঙ্কার বলতে বোঝায় সত্যকে অস্বীকার করা এবং লোকদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।”৩৭৭ সুতরাং কোনো অবস্থাতেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও বুযর্গ ভাবা এবং কথাবার্তায়, আচার-আচরণে ও বেশ-ভূষায় এরূপ কিছু প্রদর্শন করা মোটেও সমীচীন নয়। এ কারণে যে ধরনের পোশাক পরলে বা বেশ-ভূষা ধারণ করলে গৌরব ও বড় মানুষী প্রকাশ পায়, নিজেকে পদস্থ ব্যক্তি বলে মনে হয় অথবা নিজেকে বুযর্গ ব্যক্তি বলে ধারণা হয়, সে ধরনের পোশাক পরা ও বেশ-ভূষা ধারণ করা জায়িয নয়।
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উচ্চ মনে করা একটি অত্যন্ত নিকৃষ্টতম ও ধ্বংসাত্মক মনোবৃত্তিও। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি ধ্বংসাত্মক বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ، وَهِيَ أَشَدُّهُنَّ -“একটি ধ্বংসাত্মক বিষয় হলো, নিজেকে নিজে বুযর্গ ও শ্রেষ্ঠ মনে করা। এটা সবার চেয়ে জঘন্য। "৩৭৮ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কখনো তিনি আচার-আচরণ ও বেশভূষায় বড় মানুষী ভাব প্রদর্শন করতেন না। তাঁর গোটা জীবনই ছিল বিনয় ও নম্রতার এক অনুপম অনুকরণীয় আদর্শ। বাড়িতে তিনি স্ত্রীদের গৃহস্থালীর কাজে সাহায্য করতেন এবং নিজের কাপড় ও জুতা সেলাই করতেন। ৩৭৯ এক সফরে তিনি এবং তাঁর সাথীগণ খাবার তৈরির জন্য যাত্রা বিরতি করলেন। এ সময় তিনি বসে থাকলেন না; বরং বললেন, "... আমি কোনো কাজ না করে বসে থাকা এবং তোমাদের ওপর কিঞ্চিত শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করাটাকে ঘৃণা করি।" অতঃপর তিনি জ্বালানী কাঠ কাটতে গেলেন। তা ছাড়া যখন তিনি কোনো লোকজনের সমাবেশে যোগ দিতেন, সবসময় খালি জায়গায় বসতেন, কখনো সামনে যাওয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করতেন না।
ইসলামের নির্দেশ হলো, প্রত্যেকেই অপরকে ছোট হোক বা বড়- ভালো নযরে দেখবে। মর্যাদাগত দিক থেকে মুসলিম ভাইদেরকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় এবং প্রত্যেক শ্রেণির সাথে কিছু বিশিষ্ট আচরণ রয়েছে।
এক. যে সকল লোক বয়সে বড় কিংবা জ্ঞানে-গুণে বা দীনদারীতে শ্রেষ্ঠ। এ শ্রেণীর লোকদের সাথে যখন দেখা-সাক্ষাত হবে, তখন তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বকে অকপটে স্বীকার করে নেয়া এবং তাঁদের যথাযথ 'ইযযাত-সম্মান করা উচিত।
দুই. যে সকল লোককে বয়সে কিংবা জ্ঞানে-গুণে নিজের সমপর্যায়ের ভাবা হয়। এদেরকেও 'ইয্যাত-সম্মান করা উচিত। কেননা হতে পারে যে, তারা এমন কিছু গুণের অধিকারী, যা সে জানে না। অপরদিকে সে নিজে তো নিজের যোগ্যতা ও দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকে। তাই নিজের দুর্বলতার দিকে নযর করে এ শ্রেণির লোকদেরকেও বড় ভাবা ও সম্মান করা উচিত।
তিন. যে সকল লোক নিজের চেয়ে বয়সে ছোট। এ সকল লোককে যেমন দয়া ও স্নেহের নযরে দেখা উচিত, তেমনি নিজের এ দুর্বলতার কথাও অকপটে স্বীকার করে নেয়া প্রয়োজন যে, তাদের গুনাহ আমার থেকে অনেক কম। কেননা আমি তো দুনিয়ায় তাদের আগেই এসেছি এবং তারা শারী'আতের বিধি- নিষেধের আদিষ্ট হওয়ার আগে না জানি- আমি কতো গুনাহেই লিপ্ত হয়েছি। যদি এমন কোনো লোকের সাক্ষাত হয় যে, যার দীনদারী খুব কম এবং তার ব্যাপারে ব্যাখ্যার অবকাশও কম থাকে, তা হলে সে নিজের ব্যাপারে চিন্তা- ভাবনা করবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহে যে সকল 'ইবাদাত ও ভালো কাজ করার তাওফীক লাভ করেছে, সেগুলোর জন্য আল্লাহর দরবারে শুকর আদায় করবে।
অধিকন্তু, সে এ অবস্থায় আল্লাহর নিকট তার পরিসমাপ্তি কামনা করবে। কেননা সে কি এ কথা জানে যে, কোন্ অবস্থায় তার পরিসমাপ্তি ঘটবে?
উল্লেখ্য যে, যারা সদিচ্ছা সহকারে নিজের ও মানুষের সংশোধনের প্রচেষ্টা চালায় তাদের মধ্যে বিভিন্ন পথে এ রোগটি অনুপ্রবেশ করে। যখন আশেপাশের দীনী ও নৈতিক অবস্থার তুলনায় তাদের অবস্থা অনেকটা ভালো হয়ে ওঠে এবং অন্যের মুখেও তাদের স্বীকৃতি শোনা যায়, তখন শাইতান তাদের মনে এ ভাব সঞ্চার করতে থাকে যে, সত্যিই তোমরা বুযর্গ হয়ে গেছো। শাইতানের প্ররোচনায়ই তারা নিজের মুখে ও নিজের কাজের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে থাকে।
গর্ব-অহঙ্কার থেকে বাঁচার উপায়
* বন্দেগীর প্রগাঢ় অনুভূতি
যারা সদিচ্ছা সহকারে নিজের ও মানুষের সংশোধনের জন্য কাজ করে তাদের মধ্যে অবশ্যই বন্দেগীর অনুভূতি নিছক বিদ্যমান থাকা নয়; বরং সর্বমুহূর্তে জীবিত ও তাজা থাকা উচিত। তাদের কখনো এ নির্জলা সত্য বিস্মৃত হওয়া উচিত নয় যে, অহঙ্কার ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ একমাত্র আল্লাহর সাথে সুনির্দিষ্ট। আল্লাহর তুলনায় অসহায়ত্ব, দীনতা ও অক্ষমতা ছাড়া বান্দাহর দ্বিতীয় কোনো পরিচয় নেই। কোনো বান্দাহর মধ্যে যদি সত্যিই কোনো সদগুণের সৃষ্টি হয়, তা হলে তা আল্লাহর একান্ত দয়া। তা গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয় নয়; বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার বিষয়। এজন্য আল্লাহর নিকট আরো বেশি দীনতা প্রকাশ করা উচিত এবং এ সামান্য মূলধনকে সৎকর্মশীলতার সেবায় নিযুক্ত করা প্রয়োজন।
* আত্মসমালোচনা
দ্বিতীয় যে বিষয়টি মানুষকে গর্ব-অহঙ্কার প্রবণতা থেকে রক্ষা করতে পারে, সেটি হচ্ছে আত্মসমালোচনা। যে ব্যক্তি নিজের সদগুণাবলি অনুভব করার সাথে সাথে নিজের দুর্বলতা, দোষ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও দেখে, সে কখনো আত্মপ্রীতি ও আত্মম্ভরিতার শিকার হতে পারে না। নিজের গুনাহ ও দোষ-ত্রুটির প্রতি যার নজর থাকে, ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে অহঙ্কার করার কথা চিন্তা করার মতো অবকাশ তার থাকে না। এ প্রসঙ্গে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইন-শা-আল্লাহ।
* মহৎ ব্যক্তিদের প্রতি দৃষ্টি
তৃতীয় যে বিষয়টি এ ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে তা হলো কেবল নিজের নিচের স্তরের লোকদের দিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত নয়, যাদের চাইতে সে নিজেকে বুলন্দ ও উন্নত প্রত্যক্ষ করে আসছে। বরং তাকে দীন ও নৈতিকতার উন্নত ও মূর্ত প্রতীকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা উচিত, যাদের চাইতে সে এখনো অনেক নিম্ন স্তরে অবস্থান করছে। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদেরকে দীনদারি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে নিজের চাইতে ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ৩৮০
উল্লেখ্য যে, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে উন্নতির মতো অবনতিও সীমাহীন। সবচাইতে দুষ্ট প্রকৃতির লোকও যদি নিচের স্তরের লোকদের দিকে তাকায়, তা হলে কাউকে নিজের চাইতেও দুষ্ট ও অসৎ দেখে নিজের উন্নত অবস্থার জন্য গর্ব করতে পারে। এ গর্বের ফলে সে নিজের বর্তমান অবস্থার ওপর নিশ্চিন্ত থাকে এবং নিজেকে উন্নত করার প্রচেষ্টা থেকে বিরত হয়। বরং এর চাইতেও আরো অগ্রসর হয়ে মনে শাইতানী প্রবৃত্তি তাকে আশ্বাস দেয় যে, এখনো আরো কিছুটা নিচে নামবার অবকাশ আছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র তারাই অবলম্বন করতে পারে, যারা নিজেদের উন্নতির দুশমন। যারা উন্নতির সত্যিকার আকাঙ্খা পোষণ করে, তারা নিচে তাকাবার পরিবর্তে হামেশা ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকায় : উন্নতির প্রতিটি পর্যায়ে পৌঁছে তাদের সামনে আরো উন্নতির পর্যায় দেখা দেয়। সেগুলো প্রত্যক্ষ করে গর্ব-অহঙ্কারের পরিবর্তে নিজের দুর্বলতার অনুভূতি তাদের মনে কাঁটার মতো বিঁধে। এ কাঁটার ব্যথা তাদেরকে উন্নতির আরো উচ্চমার্গে আরোহন করতে উদ্বুদ্ধ করে। ৩৮১

টিকাঃ
৩৭৪. আল কোরআন, সূরা আন-নাহল, ১৬: ২৩
৩৭৫. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২৭৫
৩৭৬. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-লিবাস), হা. নং: ৪০৯২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১৭৪, ৪১৭৫
৩৭৭. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২৭৫
৩৭৮. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৭: মু'আলাজাতু কুল্লি যানবিন বিত-তাওবাহ), হা. নং: ৬৮৬৫
৩৭৯. ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, ৫৬৭৭
৩৮০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
خَصْلَتَانِ مَنْ كَانَنَا فِيهِ ، كَتَبَهُ اللهُ شَاكِرًا صَابِرًا ، وَمَنْ لَمْ تَكُونَا فِيهِ ، لَمْ يَكْتُبُهُ اللَّهُ شَاكِرًا وَلَا صَابِرًا : مَنْ نظر فِي دِينِهِ إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَهُ ، فَاقْتَدَى بِهِ، وَنَظَرَ فِي دُنْيَاهُ إِلَى مَنْ هُوَ دُونَهُ فَحَمِدَ اللَّهَ عَلَى مَا فَضْلَهُ اللَّهُ فِيهِ عَلَيْهِ ، كَتَبَهُ اللَّهُ شَاكِرًا صَابِرًا ، وَمَنْ نَظَرَ فِي دِينِهِ إِلَى مَنْ دُونَهُ ، وَنَظَرَ فِي دُنْيَاهُ إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَهُ ، فَأَسِفَ عَلَى مَا فَاتَهُ مِنْهُ ، لَمْ يَكْتُبَهُ اللَّهُ شَاكِرًا وَلَا صَابِرًا
"দুটি স্বভাব যার মধ্যে আছে আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন। আর যার মধ্যে এ দুটি স্বভাব নেই আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন না। যে ব্যক্তি দীনের ক্ষেত্রে তার চাইতে ওপরের স্তরের লোকের দিকে তাকাবে এবং তার অনুসরণ করবে আর দুনিয়ার ক্ষেত্রে তার চাইতে নিম্ন স্তরের লোকদের দিকে তাকাবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত দয়া ও অনুগ্রহের ওপর তাঁর প্রশংসা করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দীনের ক্ষেত্রে তার চাইতে নিচের স্তরের লোকের দিকে তাকাবে আর দুনিয়ার ক্ষেত্রে তার চাইতে উঁচু স্তরের লোকদের দিকে তাকাবে এবং দুনিয়ার যে সব নি'মাত তার হস্তগত হয়নি তার জন্য অনুশোচনা করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন না।" (তিরমিযী, আস-সুনান, [কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ...], হা. নং: ২৫১২)
৩৮১. মাওদূদী, ইসলামী আন্দোলন: সাফল্যের শর্তাবলী, পৃ.২৮-৯

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 মিথ্যাচার

📄 মিথ্যাচার


মিথ্যাচার একটি চরম নিকৃষ্ট গুণ। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, মিথ্যা কথা বলা মুনাফিকের তিনটি প্রধান লক্ষণের মধ্যে অন্যতম। ৩৮২ পবিত্র কোরআন ও হাদীসে কথাবার্তা বা লেনদেনে আপন ভাইয়ের সাথে মিথ্যা কথা বলা সম্পর্কে মুসলমানদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ, মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস ও জাহান্নামের দিকে চালিত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ "আর মিথ্যা পাপাচারের দিকে ধাবিত করে, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে।”৩৮৩ তা ছাড়া মিথ্যাচার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতকে চূর্ণ করে দেয়। যেখানে একজন অন্যজনের সাথে মিথ্যা আচরণ করতে পারে, সেখানে কখনো একজন অপরজনের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আর যেখানে একজনের কথার ওপর অন্য জনের পক্ষে নির্ভর করা সম্ভব নয়, সেখানে পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও আস্থা কিছুতেই বিদ্যমান থাকতে পারে না। পবিত্র হাদীসে এ বিষয়টিকে 'নিকৃষ্টতম খিয়ানাত' বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, كبرت خيانة أن تحدث أخاك حديثا هو لك مصدق وأنت به كاذب."হলো এই যে, তুমি তোমার ভাইকে এমন কোনো কথা বললে, সে তোমাকে সত্যবাদী বলে মনে করলো, অথচ তুমি তাকে মিথ্যা কথা বললে। "৩৮৪
কোরআন ও হাদীসের বর্ণনা মতে, জঘন্যতম মিথ্যাচার হচ্ছে যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে সম্পর্কিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা যা বলেননি এমন কথাকে আল্লাহর কথা বলে চালিয়ে দেয়া এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা গোপন নির্দেশনা পাওয়ার মিথ্যা দাবি করা- এ সবই জঘন্য মিথ্যাচার হিসেবে পরিগণিত। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেননি এমন কথা তাঁর নামে প্রচার করাও একটি জঘন্যতর মিথ্যাচার। এটা দীনের অনুসারীদেরকে বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করে। ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে বিকৃত এবং তার সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব স্নান করবার অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে হাদীসের অবয়বে মিথ্যা সানাদ সহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে অসংখ্য বাণী রচনা করেছে এবং এগুলো বিভিন্ন গ্রন্থের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে সর্তক করে গেছেন। সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
سيكون في آخر أمتي أناس يُحَدِّثُونَكُم مَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُم ولا آباؤكم ، فإياكم وإياهم.
অচিরেই আমার শেষ পর্যায়ের উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু লোক জন্ম নেবে, যারা তোমাদেরকে এমন সব হাদীস শোনাবে, যা তোমরাও শোনোনি এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরাও শোনেনি। অতএব, তোমরা নিজেদেরকে তাদের থেকে রক্ষা করবে। ৩৮৫
এ কারণে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে। পুরোপুরি যাচাই-বাছাই না করে হাদীস বর্ণনা করলে চরম গুনাহ হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, كفى بالمرء كذباً أن يُحَدِّثُ بكل ما سمع. “যে ব্যক্তি কোনো কিছু শোনেই যাচাই-বাছাই না করে বর্ণনা করতে শুরু করে, তাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করার জন্য তার এ কাজটুকুই যথেষ্ট। ৩৮৬

টিকাঃ
৩৮২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২২০
৩৮৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৪৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির..), হা. নং: ৬৮০৩
৩৮৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯৭৩; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৭৬৩৫
৩৮৫. মুসলিম, আস-সাহীহ, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৭৯১৯
৩৮৬. মুসলিম, আস-সাহীহ, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৭; আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল- আদাব), হা. নং: ৪৯৯৪

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 প্রদর্শনেচ্ছা

📄 প্রদর্শনেচ্ছা


প্রদর্শনেচ্ছাকে 'আরবীতে 'রিয়া' বলা হয়। এর অর্থ হলো- মানুষ কোনো ভালো কাজ করার সময় বা ভালো কথা বলার সময় এমন ইচ্ছা করা যে, তাকে লোকেরা যেন এরূপ অবস্থায় দেখে এবং তার প্রশংসা করে। এটা দু প্রকারের হতে পারে। যেমন-
ক. বড় শিরকও তাওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এটা হলো মুনাফিকদের রিয়া। তারা মনের ভেতরে কুফর গোপন রেখে শুধুই মানুষকে দেখানোর জন ইসলাম প্রকাশ করে।
খ. ছোট শির্ক এবং তাওহীদের পরিপূর্ণতার পরিপন্থী। এটা হলো এমন মুসলিম ব্যক্তির রিয়া, যে কোনো ভালো কাজ সম্পাদন করে; কিন্তু তার উদ্দেশ্য হয় মানুষকে দেখানো।
'রিয়া' ইখলাসের পরিপন্থী একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি এবং মু'মিনের 'ইবাদাত ধ্বংস করার জন্য শাইতানের একটি বড় ফাঁদ। এর ফলে মানুষ আল্লাহর নিকট তার ভালো কাজের কোনো পুরস্কার লাভের আশাই তো করতে পারে না; বরং এ কাজের জন্য সে বিরাট সাজাও পাবে। আল্লাহ তা'আলা ভালো করেই জানেন যে, মানুষ কোন্ নিয়‍্যাতে নামায পড়ে, রোযা রাখে, দান-খায়রাত করে। যদি নেক কাজে মানুষের নিয়‍্যাত বিশুদ্ধ না হয় অথবা তা কেবলমাত্র তাঁকেই সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত না হয়, তবে তিনি মানুষকে আখিরাতে তার জন্য কোনো প্রতিদান দেবেন না। তিনি রিয়াকারী নামাযীদের সম্পর্কে বলেন, الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ . الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ -"অতএব, দুর্ভোগ সে সব নামাযীর জন্য, যারা তাদের নামায সম্পর্কে অমনোযোগী, যারা লোক দেখানোর জন্য করে।”** রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন হাদীসে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে উম্মাতকে সতর্ক করেছেন। তিনি একে কোনো হাদীসে 'শিরক আসগার' (ছোট শিক), আবার কোনো হাদীসে 'শির্ক খাফী' (প্রচ্ছন্ন শিক) নামে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা, আল্লাহর ওপর ঈমান আনার অপরিহার্য দাবি হচ্ছে এই যে, মানুষ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করবে, একমাত্র তাঁর নিকট থেকে পুরস্কার লাভের আশা পোষণ করবে এবং দুনিয়ার পরিবর্তে আখিরাতের ফলাফলের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। কিন্তু প্রদর্শনেচ্ছু ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনকে লক্ষ্যে পরিণত করে, মানুষের নিকট থেকে প্রশংসা ও পুরস্কার লাভ করতে চায়। এর অর্থ দাঁড়ায়, সে মানুষকে আল্লাহর শারীক ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে স্থির করে। এ শিরকের কারণে মু'মিন মুশরিক বলে গণ্য না হলেও তাঁর 'ইবাদাত বাতিল ও নিষ্ফল হয়ে যায়, তা যতোই বেশি ও বড় পর্যায়ের হোক না কেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
أنا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وشركه.
আমি অংশীদারদের শিরক (অংশীদারিত্ব) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো কাজ করে আর ঐ কাজে আমার সাথে অন্য কাউকে শারীক করে, আমি ঐ ব্যক্তিকে এবং তার শিককে প্রত্যাখ্যান করি। ৩৮৮
অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি নিজের 'আমালে আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সাথে অন্যের সন্তুষ্টিও আশা রাখে, তবে আল্লাহ তা'আলা এ ধরনের শির্ক থেকে মুক্ত। তিনি শুধু সে 'আমালই গ্রহণ করে থাকেন, যা একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টি লাভের জন্য হয়ে থাকে।
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর নিকট রিয়ামিশ্রিত কোনো 'আমালই গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং তা 'আমালকারীর দিকেই ফিরিয়ে দেয়া হবে। যদি কোনো 'ইবাদাত শুরু থেকেই পুরোটাই কেবল মানুষকে দেখানোর জন্য করা হয়, তবে তার পূরো 'ইবাদাতই বাতিল হয়ে যাবে এবং তার এ 'আমাল 'শিরকে আকবার' বলে গণ্য হবে। কিন্তু যদি 'ইবাদাতের ভক্তি ও বিনয় প্রকাশ একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে; তবে 'আমালকারী মানুষের কিছু প্রশংসা আশা করে (যেমন কোনো ব্যক্তি সালাত আদায় করতে গিয়ে লোকদেরকে দেখানোর মানসে রুকু', সাজদাহ লম্বা করে ও তাসবীহ বেশি বেশি পড়ে), তবেই তা রিয়া ও ছোট শির্ক বলে গণ্য হবে এবং এর ফলে উক্ত ব্যক্তি গুনাহগার হবে এবং তার ততোটুকু 'ইবাদাত বাতিল হবে, যতোটুকুতে সে রিয়া মিশ্রণ করেছে। উভয় প্রকার রিয়ার মধ্যে পার্থক্য হলো- প্রথম অবস্থায় 'ইবাদাতকারী লোকটি কাউকে না দেখলে 'ইবাদাতটিই পালন করবে না। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় অবস্থায় 'ইবাদাতকারী লোকটি কাউকে না দেখলেও 'ইবাদাতটি পালন করবে।
সাইয়িদুনা আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমরা মাসীহ দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে আমাদের বললেন, أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِي مِنْ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ -"আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবো না, যে বিষয়টি আমার নিকট মাসীহ দজ্জালের চেয়েও ভয়ঙ্কর?" সাহাবা কিরাম (রা.) বললেন, "হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!" তিনি বললেন, الشَّرْكُ الْحَفِي أَنْ يَقُومَ الرَّجُلُ يُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ. - "তা হলো শিরকে খাফী বা গোপন শির্ক। এর উদাহরণ হলো- একজন মানুষ দাঁড়িয়ে শুধু এ জন্যই তার সালাতকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোনো মানুষ তার সালাত দেখছে।”৩৮৯
মাহমূদ ইবনু লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنْ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ -"আমি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে তোমাদের ব্যাপারে আশঙ্কা করি তা হলো শিরকে আসগার অর্থাৎ ছোট শিরক।" সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলো, وَمَا الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟-"ইয়া রাসূলাল্লাহ! শিরক আসগার কী?" তিনি বলেন,
الرِّيَاءُ يَقُولُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاء. রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা। কিয়ামাতের দিন যখন মানুষদেরকে তাদের কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে, তখন রিয়াকারীদেরকে সম্বোধন করে বলবেন, তোমরা দুনিয়াতে যাদেরকে দেখানোর জন্য নেক 'আমাল করতে, আজ তাদের কাছে যাও। দেখ, তাদের নিকট এর কোনো বিনিময় পাও কি না?৩৯০
অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ صَلَّى يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ وَمَنْ صَامَ يُرَائِي فَقَدْ أَشْرَكَ وَمَنْ تَصَدَّقَ يُرَانِي فَقَدْ أَشْرَكَ. - "যে দেখানোর উদ্দেশ্যে নামায পড়লো, সে প্রকারান্তরে শিরক করলো, যে দেখানোর উদ্দেশ্যে রোযা রাখলো, সে প্রকারান্তরে শির্ক করলো, আর যে দেখানোর উদ্দেশ্যে সাদাকাহ করলো, সে প্রকারান্তরে শিরক করলো। "৩৯১
উপর্যুক্ত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, বান্দাহ যত বড় ও মহৎ 'আমালই করুক না কেন, তা রিয়ার কারণে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। উপরন্তু, তা তার জন্য কঠিন শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি দীর্ঘ হাদীসে বলেছেন, কিয়ামাতের দিন সর্বপ্রথম যাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তাদের মধ্যে থাকবে একজন প্রসিদ্ধ শাহীদ, একজন বড় 'আলিম ও কারী এবং একজন বড় দাতা। তারা আজীবন আল্লাহর 'ইবাদাত-বন্দেগীতে অতিবাহিত করলেও রিয়ার কারণে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। ৩৯২
এ মারাত্মক রোগটি যে কেবল ফলাফলের দিক থেকে কর্মকে নষ্ট করে তা নয়; বরং এ প্রবণতা সহকারে কোনো যথার্থ কাজ করাও সম্ভব নয়। এ প্রবণতার একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, মানুষ কাজের চাইতে কাজের প্রচারের চিন্তা করে বেশি। দুনিয়ায় যে কাজের প্রচার হয় বেশি এবং যেটি মানুষের প্রশংসা অর্জন করে, সেটিকেই সে কাজ মনে করে। যে নীরব কাজের খবর আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কেউ রাখেন না, সেটি তার কাছে কোনো কাজ বলে মনে হয় না। এভাবে মানুষের কাজের পরিমণ্ডল কেবল প্রচারযোগ্য কাজ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে এবং প্রচারের উদ্দেশ্য সাধিত হওয়ার পর ঐ কাজগুলোর প্রতি আর কোনো প্রকার আকর্ষণ থাকে না। যতোই আন্তরিকতার সাথে বাস্তব কার্যারম্ভ করা হোক না কেন, এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথেই যক্ষ্মারোগে জীবনীশক্তি ক্ষয় হওয়ার মতো মানুষের আন্তরিকতা অন্তর্হিত হতে থাকে। অতঃপর লোকচক্ষুর বাইরেও সৎভাবে বসবাস করা এবং নিজের কর্তব্য মনে করে কোনো কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। সে প্রত্যেক বিষয়কে লোক দেখানো মর্যাদা ও মৌখিক প্রশংসার মূল হিসেবে বিচার করে। প্রতিটি কাজে সে দেখে, মানুষ কোনটা পছন্দ করে। ঈমানদারির সাথে তার বিবেক কোনো কাজে সায় দিলেও যদি সে দেখে যে, এ কাজটি দুনিয়ায় তার জনপ্রিয়তা নষ্ট করে দেবে, তাহলে তার পক্ষে এমন কোনো কাজ করার চিন্তা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ঘরের কোণে বসে যারা নিভৃতে 'ইবাদাত করেন তাদের জন্য এ রোগ থেকে মুক্ত থাকা অধিকতর সহজ: পক্ষান্তরে যারা ব্যক্তি ও সমাজ সংশোধনের কাজ করে, তাদের এ রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। জনসম্মুখে প্রকাশিত হয় এমন বহু কাজ তাদের করতে হয়। যেগুলোর কারণে মানুষ তাদের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে এবং তাদের প্রশংসায় উচ্চকণ্ঠ হয়। কখনো তাদের বিরোধিতারও সম্মুখীন হতে হয় এবং এ সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও আত্মরক্ষার খাতিরে বাধ্য হয়ে নিজেদের ভালো কাজগুলোকে জনসমক্ষে তোলে ধরতে হয়।
এ অবস্থায় খ্যাতির সাথে খ্যাতির মোহ না থাকা, কাজের প্রদর্শনী সত্ত্বেও প্রদর্শনেচ্ছা না থাকা, জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও সেটি লক্ষ্যে পরিণত না হওয়া, মানুষের প্রশংসা বাণী সত্ত্বেও তা অর্জনের চিন্তা বা আকাঙ্খা না করা চাট্টিখানি কথা নয়।
এ জন্য কঠোর পরিশ্রম, প্রচেষ্টা ও সাধনার প্রয়োজন। এ রোগ থেকে পরিত্রান পেতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে অত্যন্ত সংগোপনে চুপে চুপে কিছু না কিছু সৎ কাজ (যেমন দান-সাদাকাহ) সম্পাদনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিজের মনোজগত বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে যে, সে ঐ গোপন সৎকাজগুলোর ও জনসমক্ষে প্রকাশিত সৎকাজগুলোর মধ্যে কোনগুলোর ব্যাপারে অধিক আকর্ষণ অনুভব করে। যদি দ্বিতীয়টির সাথে অধিক আকর্ষণ অনুভূত হয়ে থাকে, তা হলে তাকে সাথে সাথেই সাবধান হওয়া দরকার যে, প্রদর্শনেচ্ছা তার মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে এবং এ জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে দৃঢ় সংকল্প হয়ে মনের এ অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে। ৩৯৩

টিকাঃ
৩৮৭. আল কোরআন, সূরা আল-মা'উন, ১০৭:৫-৬
৩৮৮. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যুহদ...), হা. নং: ৭৬৬৬
৩৮৯. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২০৪ কোনো কোনো রিওয়ায়াতে 'শিরকে খাফী'-এর পরিচয় এভাবে এসেছে- الشَّرْكَ الْحَفِيُّ أَنْ يَقُومَ الرَّجُلُ يَعْمَلُ لِمَكَانِ رَجُلٍ. "কোনো ব্যক্তির অবস্থানের কারণে কারো কোনো 'আমাল করতে উদ্যত হওয়া।" (আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১১২৫২; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, কিতাব: আর-রিকাক), হা. নং: ৭৮৩৬)
৩৯০. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২৩৬৩০; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৪৩০১
৩৯১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৭১৪০; বাযযার, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২৯৪৩
৩৯২. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ইমারাহ), হা. নং: ৫০৩২
৩৯৩. মাওদূদী, ইসলামী আন্দোলন: সাফল্যের শর্তাবলী, পৃ. ৩১

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 জাগতিক স্বার্থচিন্তা

📄 জাগতিক স্বার্থচিন্তা


প্রদর্শনেচ্ছার মতো জাগতিক স্বার্থচিন্তাও ইখলাসের পরিপন্থী একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি। এটা নেক 'আমালকে বাতিল ও নিষ্ফল করে দেয়। যে 'আমালের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া উচিত, এরূপ যে কোনো 'আমাল দুনিয়ার কোনো স্বার্থ বা কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা হলে তার কোনো পুরস্কার আল্লাহর নিকট আশা করা যায় না। আল্লাহ তা'আলা জানেন যে, মানুষ কোন্ উদ্দেশ্যে কী কাজ করতেছে। কাজেই মানুষের নিয়‍্যাত যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে তিনি মানুষকে আখিরাতে তার কাজের জন্য কোনো প্রতিদান দেবেন না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ . أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾
যারা শুধুই পার্থিব জীবন ও এর চাকচিক্য কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কাজের প্রতিফল দুনিয়ায় পরিপূর্ণরূপে প্রদান করে দেই এবং দুনিয়াতে তাদের জন্য কিছুই কমতি করা হয় না। এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য আখিরাতে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই। আর তারা যা কিছু করেছিলো তা সবই অকেজো হবে এবং যা কিছু করতো তাও বিফল হবে। ৩৯৪
অন্য আয়াতে তিনি বলেন,
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَنْ نُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَدْحُورًا
যে ব্যক্তি (শুধু) দুনিয়ার স্বার্থ ও কল্যাণ কামনা করে, আমি যাকে চাই, যে পরিমাণ চাই তাকে সত্বর এ দুনিয়ায় তা দান করি। অতঃপর তার জন্য আমি জাহান্নাম নির্ধারণ করি। সে তাতে নিন্দিত ও বিতাড়িত হয়ে প্রবেশ করবে। ৩৯৫
... فَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ .....লোকদের মধ্যে যারা বলে, হে আমাদের রাব্ব! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দিন। বস্তুত তাদের জন্য পরকালে কোনো কল্যাণই নেই।”৩৯৬
এ আয়াতগুলো যদিও কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যাদের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল পার্থিব সুখ-সাচ্ছন্দ্য ও ভোগ-বিলাস; কিন্তু আয়াতের ভাবার্থ দ্বারা বোঝা যায় যে, যে সব মুসলিম তাদের 'আমাল দ্বারা দুনিয়া অর্জন করতে চাইবে, তারাও এ আয়াতের হুকমের আওতায় পড়বে।
উল্লেখ্য যে, বান্দাহ যে সব কাজ দুনিয়া অর্জনের লক্ষ্যে করে তা দু প্রকারের হতে পারে। যেমন-
ক. যে 'ইবাদাতগুলো শারী'আত বাধ্যতামূলক করেছে (যেমন- হাজ্জ ও জিহাদ প্রভৃতি), এরূপ কোনো 'আমাল যদি শুধু দুনিয়ার স্বার্থ ও কল্যাণ অর্জনের জন্যই সম্পাদন করা হয় এবং পরকালের কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তা শিরকে আকবারের পর্যায়ভুক্ত হবে এবং 'আমালগুলোর পুরোটাই বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে এরূপ কোনো 'আমাল যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়; কিন্তু এর সাথে দুনিয়ার কিছু স্বার্থ ও কল্যাণ লাভও উদ্দেশ্য থাকে (যেমন- আল্লাহর সন্তুষ্টি ও গানীমাতের সম্পদ লাভের জন্য জিহাদে অংশ গ্রহণ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে হাজ্জে গমন করা প্রভৃতি), তবে তা শিরকে আসগারের পর্যায়ভুক্ত হবে এবং যে পরিমাণ দুনিয়ার উদ্দেশ্যে মিশ্রিত থাকবে, ততটুকু 'আমালের সাওয়াব আল্লাহর নিকট পাওয়া যাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَا مِنْ غَازِيَةٍ أَوْ سَرِيَّةٍ تَغْزُو فَتَغْنَمُ وَتَسْلَمُ إِلَّا كَانُوا قَدْ تَعَجَّلُوا ثُلُثَى أُجُورِهِمْ وَمَا مِنْ غَازِيَةٍ أَوْ سَرِيَّةٍ تُخْفِقُ وَتُصَابُ إِلَّا تَمَّ أُجُورُهُمْ.
কোনো যুদ্ধ বা অভিযানে অংশ গ্রহণ করে যদি তুমি গানীমাতের সম্পদ লাভ করো এবং নিরাপদে ফিরে আসো, তা হলে তুমি তোমার পুরস্কারের দু-তৃতীয়াংশ নগদ পেয়ে গেলে। আর যে ব্যক্তি গানীমাতের সম্পদও লাভ করতে পারলো না, অধিকন্তু সে নিহতও হলো, তার পুরস্কার পুরোটাই বাকী রইলো। ৩৯৭
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, যদি কেউ তার 'আমালের কিছু পার্থিব কল্যাণ ও স্বার্থ দুনিয়ায় লাভ করে, তা হলে সে পরকালে তার আমালের পূর্ণ পুরস্কার পাবে না।
খ. যে কাজগুলোর ব্যাপারে শারী'আত উৎসাহ প্রদান করেছে (যেমন- 'ইলম অর্জন, সম্পদ উপার্জন ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা প্রভৃতি), এরূপ কোনো 'আমালও যদি কেবল দুনিয়ার স্বার্থ ও কল্যাণ লাভের জন্য সম্পাদন করা হয় এবং আখিরাতের কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তা শিরক আসগারের পর্যায়ভুক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, تَعِسَ عَبْدُ ....الدِّينَارِ وَعَبْدُ الدِّرْهَمِ “দীনার ও দিরহাম অর্থাৎ সম্পদের পূজারীরা ধ্বংস হোক!....”৩৯৮ এ হাদীসে যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়া অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে, তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীনার ও দিরহামের বান্দাহ বা পূজারী বলেছেন। এ থেকে জানা যায় যে, দাসত্ব ও বন্দেগীর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে একটি স্তর হলো- ছোট শিরক পর্যায়ের দাসত্ব বা বন্দেগী। বলাই বাহুল্য, যারা কেবল দুনিয়ার স্বার্থ ও কল্যাণ লাভের জন্য কাজ করে, তারা এরূপ শিরকে লিপ্ত।
কিন্তু এরূপ কোনো 'আমাল যদি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে করা হয় (যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চাকুরি লাভের জন্য 'ইলম অর্জন করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজের সুখ-সাচ্ছন্দ্যের জন্য সম্পদ উপার্জন করা), তবে তা বৈধ বলে গণ্য হবে; কিন্তু যে পরিমাণ দুনিয়ার উদ্দেশ্য তার সাথে মিশ্রিত হবে, ততটুকু 'আমালের সাওয়াব আল্লাহর নিকট পাওয়া যাবে না। অতএব, যে ব্যক্তি কোনো ভালো 'আমাল করলো, এতে তার উদ্দেশ্য যদি শুধু সম্পদ উপার্জন করা হয়, তবে তার এ 'আমাল শিরকে আসগার বলে গণ্য হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি 'ইলম অর্জন করলো, এতে তার উদ্দেশ্য যদি শুধুই চাকুরি অর্জন ও দুনিয়ার সুখ-সাচ্ছন্দ্য লাভ করা হয় এবং তার উদ্দেশ্য এ নয় যে, সে এ 'ইলমের মাধ্যমে নিজের ও অপরের পারলৌকিক উপকার সাধন করবে এবং জাতির সেবা ও কল্যাণের মাধ্যমে জান্নাত লাভ করবে, তবে তার এ কাজও শিরকে আসগার বলে গণ্য হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ .
যে ব্যক্তি 'ইলম অর্জন করে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হওয়া উচিত; কিন্তু অর্জন করে দুনিয়ার সামগ্রী লাভের উদ্দেশ্যে, কিয়ামাতের দিন সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। ৩৯৯
এ মারাত্মক রোগটি যে কেবল আল্লাহর নিকট মানুষের প্রাপ্য নষ্ট করে তা নয়; বরং এ প্রবণতা সহকারে দুনিয়াতেও কোনো যথার্থ কাজ করা সম্ভব নয়। উদ্দেশ্যগত ত্রুটির প্রভাব অবশ্যই কাজের ওপর পড়ে এবং ত্রুটিপূর্ণ কাজ নিয়ে কোনো প্রচেষ্টায় কাঙ্খিত সাফল্য লাভ করা সম্ভব নয়। যেমন- ধরুন, দুজন ছাত্রের মধ্যে একজন আত্ম গঠন ও জাতি গঠনের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অধ্যয়ন করে এবং অপরজন অর্থ উপার্জন ও চাকুরি লাভের উদ্দেশ্যে অধ্যয়ন করে। এ দুজন ছাত্রের মাঝে প্রথম জনের মধ্যে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ আন্ত রিকতা, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও নিয়মানুবর্তিতা থাকবে, দ্বিতীয় জনের মধ্যে তা থাকবে না। দ্বিতীয় জনের লক্ষ্য থাকবে কেবল পরীক্ষায় যে কোনোভাবে কৃতকার্য হওয়া এবং ভালো একটি চাকুরি পাওয়া আর প্রথম জন চাইবে সত্যিকারভাবে পড়ালেখা করে একজন সুন্দর ও আদর্শ নাগরিক হওয়া। কাজেই প্রথম জনের পক্ষে অধ্যয়নের কাজটি যেমন সুচারুরূপে পালিত হওয়া সম্ভব, দ্বিতীয় জনের পক্ষে তা সম্ভব নয়।
ইতঃপূর্বে প্রদর্শনেচ্ছার ক্ষেত্রে যে অসুবিধার কথা বলা হয়েছে এখানেও তা প্রযোজ্য। অর্থাৎ যারা ব্যক্তিগতভাবে কিছু সৎ কাজ করে, তাদের পক্ষে নিয়্যাতকে পার্থিব স্বার্থ চিন্তা থেকে মুক্ত রাখা বেশি কঠিন নয়। সামান্য পরিমাণ আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ও সাচ্চা প্রেরণাই এ জন্য যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু যারা সমগ্র দেশের জীবন ব্যবস্থা সংশোধন করার এবং সামগ্রিকভাবে তাকে ইসলাম নির্দেশিত ভিত্তিসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তারা নিজেদের উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য কেবল চিন্তা পরিগঠন বা প্রচার-প্রপাগান্ডা অথবা চরিত্র সংশোধনের প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করতে পারে না; বরং এই সাথে তাদেরকে অবশ্যই নিজেদের উদ্দেশ্যের দিকে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মোড় পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হয়। এভাবে ক্ষমতা সরাসরি তাদের হাতে আসে অথবা এমন কোনো দলের হাতে আসে, যে তাদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। এ দুটি অবস্থার যে কোনো একটিতেও ক্ষমতার কথা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চিন্তা করা যেতে পারে না।
ব্যাপারটি এমন যে, সমুদ্র গর্ভে অবস্থান করে গায়ে পানি না লাগাতে দেয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কোনো ব্যক্তি ও তার দল পরিপূর্ণ শক্তি নিয়োগ করে এ কাজ করবে এবং এরপরও তার ও তার দলের সদস্যগণের নিয়্যাত ক্ষমতার লোভ বিমুক্ত থাকবে, তা সহজ ব্যাপার নয়। এর জন্য কঠিন আত্মিক পরিশ্রম ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন। বলাই বাহুল্য, যারা নিজেদের জন্য ক্ষমতা চায় আর যারা নিজেদের আদর্শ ও লক্ষ্যের জন্য ক্ষমতা চায় তাদের উভয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। নীতি ও আদর্শের কর্তৃত্ব কার্যত নীতি ও আদর্শের বাহকদের কর্তৃত্ব হলেও নীতি ও আদর্শের কর্তৃত্ব চাওয়া এবং তার বাহকদের নিজেদের জন্য কর্তৃত্ব চাওয়া প্রকৃতপক্ষে দুটি আলাদা বিষয়। এ দুটি বিষয়ের মধ্যে প্রেরণা ও প্রাণবস্তুর দিক দিয়ে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। নিয়্যাতের ত্রুটি দ্বিতীয়টির মধ্যে আছে, প্রথমটির মধ্যে নেই। আর প্রথম বিষয়টির জন্য মরণপণ প্রচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিষয়টির সামান্যতম গন্ধও মনের মধ্যে প্রবেশ করবে না- তা সহজ ব্যাপার নয়। এ জন্য কঠোর আত্মিক সাধনা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। তাঁরা জাহিলিয়্যাতের সমগ্র জীবন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ইসলামী নীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালান। এ জন্য রাজনৈতিক বিজয় ও কর্তৃত্বের প্রয়োজন ছিল। কারণ, এ ছাড়া দীনকে পুরোপুরি বিজয়ী করা সম্ভব ছিল না। আর কার্যত এ প্রচেষ্টার ফলে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা তাদের হাতে আসলেও কোনো মু'মিন এ সন্দেহ পোষণ করতে পারে না যে, ক্ষমতা হস্তগত করা তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। অপরদিকে যারা নিজেদের কর্তৃত্ব চেয়েছিলো তাদের দৃষ্টান্তও ইতিহাসের পাতায় রয়েছে। বর্তমানেও এ দৃষ্টান্ত প্রচুর। দৃশ্যত উভয় দলের মধ্যে কর্তৃত্ব লাভের ক্ষেত্রে মিল দেখা গেলেও নিয়্যাতের দিক দিয়ে উভয় দলের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। কাজেই যে ব্যক্তি সাচ্চা দিলে ইসলামী নীতি আদর্শ অনুযায়ী জীবন ব্যবস্থায় সার্বিক কর্তৃত্ব কামনা করে, তাকে এ পার্থক্য যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নিজের নিয়্যাত ঠিক রাখা উচিত, যাতে নিজের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভের প্রত্যাশা কোনো অবস্থায়ও তার ধারে-কাছে ঘেঁষতে না পারে। ৪০০

টিকাঃ
৩৯৩. মাওদূদী, ইসলামী আন্দোলন: সাফল্যের শর্তাবলী, পৃ.৩৩
৩৯৪. আল কোরআন, সূরা হুদ, ১১: ১৫-১৬
৩৯৫. আল কোরআন, সূরা আল-ইসরা', ১৭: ১৮
৩৯৬. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ২০০
৩৯৭. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-'ইমারাহ), হা. নং: ৫০৩৫
৩৯৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-জিহাদ), হা. নং: ২৭৩০
৩৯৯. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-'ইলম), হা. নং: ৩৬৬৬
৪০০. মাওদূদী, ইসলামী আন্দোলন: সাফল্যের শর্তাবলী, পৃ.৩৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00