📄 আত্মম্ভরিতা
মানুষের মধ্যে সহজাতভাবে আত্মপ্রীতির স্বাভাবিক প্রেরণা আছে। এ প্রেরণা অবশ্যই যথার্থ পর্যায়ে দূষণীয় নয়; বরং নিজের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে অপরিহার্য এবং উপকারীও। আল্লাহ তা'আলা মানুষের স্বভাবের মধ্যে তার ভালোর জন্য এ প্রেরণা উজ্জীবিত রেখেছেন। এর ফলে সে নিজের সংরক্ষণ, কল্যাণ ও উন্নতির জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারে। কিন্তু শাইতানের প্ররোচনায় যখন এ প্রেরণা আত্মপূজা ও আত্মকেন্দ্রিকতায় রূপান্তরিত হয়, তখন তা ভালোর পরিবর্তে মন্দের উৎসে পরিণত হয় এবং ক্রমে নতুন নতুন দোষের জন্ম দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ আত্মপ্রীতি )إِعْجَابُ (الْمَرْءِ بَنَفْسِهِ(ই হলো সবার চেয়ে বড় ও মারাত্মক বিপর্যয়সৃষ্টিকারী মানবিক ত্রুটি।৩৫৯
মানুষ যখন নিজেকে ত্রুটিহীন ও সমস্ত গুণের আধার মনে করে নিজের দোষ ও দুর্বলতার অনুভূতিকে ঢাকা দেয় এবং নিজের প্রতিটি দোষ-ত্রুটির ব্যাখ্যা করে নিজেকে সর্বদিক দিয়ে ভালো বলে মানসিক নিশ্চিন্ততা লাভ করে, তখন এ আত্মপ্রীতির প্রেরণা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং সর্পিল গতিতে অগ্রসর হতে থাকে। এ আত্মপ্রীতি প্রথম পদক্ষেপেই তার সংশোধন ও উন্নতির দ্বার নিজ হাতে বন্ধ করে দেয়। অতঃপর যখন 'আমি কতো ভালো ও যোগ্য' এ অনুভূতি নিয়ে মানুষ সমাজ জীবনে প্রবেশ করে, তখন সে নিজেকে যা মনে করে রেখেছে অন্যরাও তাকে তা-ই মনে করুক- এ আকাঙ্খা তার মনে জাগে। সে কেবল প্রশংসা শোনতে চায়। সমালোচনা তার নিকট পছন্দনীয় হয় না। তার নিজের কল্যাণার্থে যে কোনো উপদেশ বাণীও তার অহমকে পীড়িত করে। এভাবে এ ব্যক্তি নিজের সংশোধনের অভ্যন্তরীণ উপায়-উপকরণের সাথে সাথে বাইরের উপায়-উপকরণও বন্ধ করে দেয়।
বলাই বাহুল্য, সমাজ জীবনে সকল দিক দিয়ে নিজের আশা-আকাঙ্খা অনুযায়ী পছন্দসই অবস্থা লাভ করা দুনিয়ায় কোনো ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে আত্মপূজারী ব্যক্তি তো এখানে সর্বত্র ধাক্কা খায়। কারণ তার অহম নিজের মধ্যে এমন সব প্রেরণা সৃষ্টি করে, যা সমাজের অসংখ্য গুণ ও যোগ্যতার সাথে তার মানসিক দ্বন্দ্বকে অপরিহার্য করে তোলে। উপরন্তু, এ মানসিক দ্বন্দ্ব এবং আশা-আকাঙ্খায় সাফল্য অর্জনে ব্যর্থতার দুঃখ তার বিক্ষুব্ধ অহমকে একের পর এক মারাত্মক অসৎ কাজের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকে। সে জীবনে অনেক লোককে নিজের চাইতে ভালো ও যোগ্য দেখে। অনেক লোকের ব্যাপারে সে মনে করে, সমাজ তাদেরকে তার চাইতে বেশি গুরুত্ব দেয়। সে নিজে যে মর্যাদার প্রত্যাশী অনেক লোক তাকে তা দেয় না। সে নিজেকে যে সব মর্যাদার হকদার মনে করে সে পর্যন্ত পৌঁছার পথে অনেক লোক তার জন্য বাধার সৃষ্টি করে। অনেক লোক তার সমালোচনা করে এবং তার মর্যাদাহানি করে। এ ধরনের বিচিত্র অবস্থা তার মনে বিভিন্ন মানুষের বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সে অন্যের অবস্থা অনুসন্ধান করে, অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়, গীবাত করে, গীবাত শোনে তার স্বাদ গ্রহণ করে, চোগলখুরী করে, কানাকানি করে এবং ষড়যন্ত্র করে বেড়ায়। আর যদি তার নৈতিকতার বাঁধন ঢিলে হয়ে থাকে অথবা অনবরত ঐ সমস্ত কাজে লিপ্ত থাকার কারণে ঢিলে হয়ে যায়, তা হলে আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে মিথ্যা দোষারোপ, অপ্রপ্রচার প্রভৃতি মারাত্মক ধরনের অপরাধ করে বসে। এ সমস্ত অসৎ কাজ সম্পাদন করতে করতে সে নৈতিকতার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে যায়।
অধিকন্তু, আত্মপ্রীতির এ প্রবণতাই সামাজিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। কোনো এক ব্যক্তি এ অবস্থার সম্মুখীন হলে তাতে হয়তো কোনো সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয় না। এর প্রভাব বড় জোর কয়েক ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছে থেমে যায়। তবে যদি সমাজে বহু লোকের মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তা হলে তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে সমগ্র সমাজ জীবন বিপর্যস্ত হয়। বলাই বাহুল্য, যেখানে পরস্পরের মধ্যে কু-ধারণা, গোয়েন্দা মনোবৃত্তি, পরদোষ অনুসন্ধান, গীবাত ও চোগলখুরীর দীর্ঘ সিলসিলা চলতে থাকে, সেখানে অনেক লোক মনের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে অসৎ বৃত্তি লালন করে এবং হিংসা ও পরস্পরকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। যেখানে অনেক বিক্ষুব্ধ অহম প্রতিরোধ স্পৃহায় ভরপুর থাকে, সেখানে কোনো কিছুই গ্রুপ সৃষ্টির পথ রোধ করতে পারে না। সেখানে কোনো প্রকার গঠনমূলক সহযোগিতা তো দূরের কথা, মধুর সম্পর্কের সম্ভাবনাই থাকে না। এরূপ পরিবেশে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ইসলাম এ প্রবণতাটি দেখা যাওয়ার সাথে সাথে এর চিকিৎসা শুরু করে দিতে বলেছে এবং প্রতিটি পর্যায়ে এর পথ রোধ করার জন্য নির্দেশ দান করেছে। পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় মু'মিনগণকে নানাভাবে তাওবা ও ইস্তিগফার করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, মু'মিন যেন কোনো সময় আত্মপূজা ও আত্মপ্রীতির রোগে আক্রান্ত না হয়, কখনো আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত না হয়, নিজের দুর্বলতা ও দোষ-ত্রুটি অনুভব ও ভুল-ভ্রান্তি স্বীকার করতে থাকে এবং কোনো বিরাট কাজ করার পরও অহঙ্কারে বুক ফুলাবার পরিবর্তে দীনতার সাথে নিজের রাব্বের সামনে এই মর্মে আর্জি পেশ করে যে, তার কাজের মধ্যে যে গলদ রয়ে গেছে সেগুলো যেন মাফ করে দেয়া হয়।
হয়। এ শিক্ষার প্রাণবস্তুকে আত্মস্থ করার পর কোনো ব্যক্তির মনে আত্মপূজার বীজ অঙ্কুরিত হতে পারবে না এবং তা বিষবৃক্ষে পরিণত হয়ে বিপর্যয় সৃষ্টিতেও সক্ষম হবে না। আমরা পরে তাওবা ও ইস্তিগফার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইন-শা-আল্লাহ।
টিকাঃ
৩৫৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আর-রিকাক), হা. নং: ৬০৫৩
৩৫৯. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৭: মু'আলাজাতু কুল্লি যানবিন বিত-তাওবাহ), হা. নং: ৬৮৬৫
৩৬০. মাওদূদী, ইসলামী আন্দোলন: সাফল্যের শর্তাবলী, পৃ. ৩৬-৭
📄 হিংসা-বিদ্বেষ
হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা নাফসের এক ঘৃণ্য ব্যাধি। সাধারণত আত্মপ্রেমিক ও আত্মপূজারীর আত্মপ্রীতিতে যে ব্যক্তি আঘাত হানে অথবা যাকে সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, তার বিরুদ্ধেই সে হিংসা পোষণ করতে থাকে। এ ব্যাধিটা যদি কারো অন্তরে একবার ঠাঁই পায়, তা হলে অন্য লোকের সাথে তার সম্পর্কই শুধু ছিন্ন হয়, তা নয়; বরং তার ঈমানও বিপন্ন হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا يَحْتَمِعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدِ الْإِيْمَانُ وَالْحَسَدُ “কোনো বান্দাহর অন্তরের মধ্যে 'ঈমান ও হিংসা- এ দু'টি বিষয় একত্রিত হতে পারে না।”৩৬১ অর্থাৎ যার সত্যিকার ঈমান আছে সে কখনোই হিংসাপরায়ণ হতে পারে না। পক্ষান্তরে যে হিংসাপরায়ণ হয়, সে প্রকৃত অর্থে খাঁটি ঈমানদার নয়। তা ছাড়া এতে শুধু হিংসাকৃত ব্যক্তিই পার্থিব ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তা নয়; বরং হিংসাপরায়ণ ব্যক্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমীর মু'আবিয়া (রাহ.) বলেন, ليس في خلال الشر أشر من الحسد، لأنه قد يقتل الحاسد قبل أن يصل إلى المحسود. -"হিংসার চাইতে নিকৃষ্ট কোনো চরিত্র নেই। কেননা এর প্রভাব হিংসাকৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছার পূর্বে তা হিংসাকারী ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে ফেলে।”৩৬২ হিংসাপরায়ণ ব্যক্তি সর্বদা অস্বস্তি ও দুঃশ্চিন্তার মধ্যে থাকে। সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) বলেন, لَا رَاحَةَ لِحَسُودٍ -"হিংসুটে ব্যক্তির কোনো স্বস্তি নেই।”৩৬৩ বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.) বলেন, ما رأيت ظالماً أشبه بمظلوم من حاسد نفس دائم، وحزن لازم، وغم لا ينفد. -"আমি হিংসুটে ব্যক্তির চাইতে অধিক যুলমকারী কাউকে দেখিনি। তার বাহ্য আকৃতি অত্যাচারিতের মতোই। স্থায়ী তপ্ত নিঃশ্বাস, অবশ্যম্ভাবী দুঃখ ও অনিঃশেষ বিষণ্ণতা তার নিত্য ঘটনা।”৩৬৪
পবিত্র কোরআন ও হাদীসে হিংসা সম্পর্কে নানাভাবে সতর্ক করা হয়েছে। হিংসা এতোই মারাত্মক ক্ষতিকর ও সর্বগ্রাসী ব্যাধি যে, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মু'মিনকেই তা থেকে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ - “এবং (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুটের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।”৩৬৫ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الْأُمَمِ قَبْلَكُمُ الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ هِيَ الْحَالِقَةُ لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعَرَ وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ.
পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ব্যাধি তোমাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে। আর এ ব্যাধি হচ্ছে হিংসা-বিদ্বেষ। এটা মুণ্ডণকারী। আমার কথার উদ্দেশ্য এ নয় যে, তা চুল মুণ্ডন করে দেয়; বরং তা দীনকেই মুণ্ডন করে দেয়। ৩৬৬
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ -“তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, হিংসা সৎকর্মগুলোকে তেমনিভাবে খেয়ে ফেলে (অর্থাৎ ধ্বংস করে দেয়) যেমন করে আগুন লাকড়িকে খেয়ে ফেলে।”৩৬৭
হিংসার অর্থ হলো- কারো প্রতি আল্লাহ তা'আলার দেয়া কোনো নি'মাত (যেমন ধন-দৌলত, জ্ঞান-বুদ্ধি-যোগ্যতা, মান-সম্মান প্রভৃতি) কে পছন্দ না করা এবং মনে-প্রাণে তার থেকে এ নি'মাতের অপসারণ কামনা করা। হিংসার মধ্যে নিজের জন্য ঐ নি'মাতের কামনার চাইতে অন্যের থেকে অপসারণ কামনাটাই প্রবল থাকে। বস্তুতপক্ষে হিংসা আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার প্রতি ভারি বেজার হওয়ার নামান্তর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, كَادَ الْحَسَدُ أَنْ يَغْلِبَ الْقَدَرَ -“হিংসা ভাগ্যকেই পরাভূত করতে উপক্রম হয়। "৩৬৮ বিশিষ্ট আরবী ভাষাতত্ত্ববিদ আল-আসমা'ঈ [১২২-২১৬ হি.] (রাহ.) বলেন, আমার কাছে এ মর্মে রিওয়ায়াত পৌঁছেছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, الْحَاسِدُ عَدُوٌّ نِعْمَتِي ، مُتَسَخْطٌ لِقَضَائِي ، غَيْرُ رَاضٍ بَقَسْمِي بَيْنَ عِبَادِي . "হিংসুক ব্যক্তি আমার নি'মাতের শত্রু, আমার ফায়সালার প্রতি বেজার এবং বান্দাহদের মধ্যে আমার নি'মাত বণ্টন ব্যবস্থার ওপর অসন্তুষ্ট।”৩৬৯ 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন, لا تُعادُوا نعم الله -"তোমরা আল্লাহর নি'মাতের সাথে শত্রুতা পোষণ করো না।" তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, وَمَنْ يُعَادِي نعم الله؟ "কে সে-ই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নি'মাতের সাথে শত্রুতা পোষণ করে?" তিনি জবাব দেন الذين يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ - "যারা আল্লাহ প্রদত্ত নি'মাতের জন্য মানুষের সাথে হিংসা করে।”৩৭০
হিংসার মূলে থাকে কখনো বিদ্বেষ ও শত্রুতা, কখনো ব্যক্তিগত অহমিকা ও বড়ত্ব ভাব, কখনো অন্যকে অনুগত বানানোর প্রেরণা, কখনো কোনো কাজে নিজের ব্যর্থতা বা দুর্বলতা ও অপরের সাফল্য লাভ, আবার কখনো কেবল মান- 'ইযযাত লাভের আকাঙ্খাই এর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বলাই বাহুল্য, প্রতিবেশী, সহকর্মী ও সমপেশাজীবীদের মধ্যেই হিংসাত্মক মনোভাব বেশি দেখা যায় ৩৭১ এবং এটা স্থায়ীভাবে কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের মধ্যে চলতে থাকে। জনৈক কবি কতোই চমৎকার বলেছেন, كُلُّ الْعَدَاوَةِ قَدْ تُرْجَى إِمَانَتُهَا ... إِلَّا عَدَاوَةُ مَنْ عَادَاكَ بِالْحَسَدِ. প্রত্যেক শত্রুতা বিলোপের আশা করা যায়। কিন্তু হিংসার ফলে যে ব্যক্তি তোমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তা বিলুপ্ত হবার নয়। ৩৭২
আমীরে মু'আবিয়া (রা.) বলেন, كُلِّ النَّاسِ أَسْتَطِيعُ أَنْ أَرْضِيَهُ ؛ إِلَّا حَاسِدَ نِعْمَةٍ ؛ فَإِنَّهُ لَا يُرْضِيهِ إِلَّا زَوَالُهَا “প্রত্যেক লোককেই আমি সন্তুষ্ট করতে সক্ষম। তবে নি'মাতের প্রতি হিংসুটে ব্যক্তির কথা আলাদা। কেননা, নি'মাতের অপসারণ ছাড়া অন্য কিছুই তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না।”৩৭৩
টিকাঃ
৩৬১. নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-জিহাদ), হা. নং: ৩১০৯; ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ৪৬০৬
৩৬২. ইবনু 'আবদিল বার্, বাহজাতুল মাজালিস.., পৃ.৯০
৩৬৩. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৩: আল-হাসসু 'আলা তারকিল গিল্ল..), হা. নং: ৬২১০; ইবনু 'আব্দ রাব্বিহি, আল-'ইকদুল ফারীদ, খ. ১, পৃ. ১৯৩
৩৬৪. ইবনু 'আব্দ রাব্বিহি, আল-'ইকদুল ফারীদ, খ. ১, পৃ. ১৯৩
৩৬৫. আল কোরআন, সূরা আন-নাস, ১১৩: ৫
৩৬৬. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ...), হা. নং: ২৫১০; আহমাদ, আল- মুসনাদ, হা. নং: ১৪৩০
৩৬৭. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯০৫; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২১০
৩৬৮. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৩: আল- হাসসু 'আলা তারকিল গিল্লা..), হা. নং: ৬১৮৮; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ২৭১২৭; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৫৮৬
৩৬৯. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৩: আল-হাসসু 'আলা তারকিল গিল্প..), হা. নং: ৬২১৩; দীনাউরী (রাহ.) তাঁর আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল 'ইলম (হা. নং: ৬৫৮)-এর মধ্যে এরূপ একটি রিওয়ায়াত নকল করেছেন।
৩৭০. ইবনু 'আব্দ রাব্বিহি, আল-'ইকদুল ফারীদ, খ. ১, পৃ. ১৯৩
৩৭১. বিশর ইবনুল হারিস (রাহ.) বলেন, الْعَدَاوَةُ فِي الْقَرَابَةِ وَالْحَسَدُ فِي الْجِيرَانِ وَالْمَنْفَعَةُ فِي الْإِخْوَانِ আত্মীয়দের মধ্যে শত্রুতা, প্রতিবেশীদের মধ্যে হিংসা এবং ভাইদের মধ্যে উপকার সাধনের চর্চা হয় বেশি।” (বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, [৪৩: আল- হাসসু 'আলা তারকিল গিল..], হা. নং: ৬২১২, ৬২৩০)
৩৭২. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৩: আল- হাসসু 'আলা তারকিল গিল্প..), হা. নং: ৬২১৩; ইবনু 'আব্দ রাব্বিহি, আল-'ইকদুল ফারীদ, খ. ১, পৃ. ১৯৩; ইবনু 'আব্দিল বার, বাহজাতুল মাজালিস, পৃ.৯০
৩৭৩. দীনাউরী, আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল 'ইলম, হা. নং: ৬৫৭; ইবনু 'আব্দ রাব্বিহি, আল- 'ইকদুল ফারীদ, খ. ১, পৃ. ১৯৩
📄 গর্ব-অহংকার
গর্ব-অহঙ্কার, আত্মাভিমান ও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ হচ্ছে এক প্রকারের নৈতিক বিকৃতি, শাইতানী প্রেরণা এবং আল্লাহর নিকট সবচাইতে ঘৃণিত অপরাধ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَكْبِرِينَ “তিনি (আল্লাহ) অহঙ্কারীদেরকে পছন্দ করেন না।”৩৭৪ তদুপরি পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মানুষের শিক্ষার জন্য অহঙ্কারী শাইতানের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তা থেকে জানা যায়, নিজের অহঙ্কারবোধের কারণেই শাইতান আল্লাহর আদেশ সত্ত্বেও আদাম 'আলাইহিস সালামকে সাজদা করতে অস্বীকার করে এবং এ কারণে সে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়। পবিত্র হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে গর্ব-অহঙ্কারের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ - "যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”৩৭৫ একটি হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, الْكِبْرِيَاء رِدَائِي وَالْعَظَمَةُ إِزَارِى فَمَنْ نَازَعَنِى وَاحِدًا مِنْهُمَا قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ. হলো আমার চাদর আর বড়ত্ব হলো- আমার ইযার। কাজেই যে কেউ এ দু'টির কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে দ্বন্দ্বে জড়াবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।”৩৭৬ এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সাথে সংযুক্ত। বান্দাহর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ও অহঙ্কার একটি নির্জলা মিথ্যা বৈ কিছুই নয়। কাজেই অহঙ্কার ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ প্রকারান্তরে আল্লাহ তা'আলার শান ও মর্যাদা নিয়ে দ্বন্দ্বে অবর্তীণ হওয়ার নামান্তর। যে ব্যক্তি এ মিথ্যা গর্ব-অহঙ্কারে লিপ্ত থাকে, সে আল্লাহ তা'আলার সব ধরনের সাহায্য-সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনোক্রমেই সঠিক পথ লাভ করতে পারে না। সে অনবরত মুর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিতে থাকে। এভাবে সে অবশেষে ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়।
মানুষের জন্য নিকৃষ্টতম অহঙ্কার হচ্ছে সত্য তার সামনে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হবার পর এবং সে তা উপলব্ধি করার পরও তা প্রত্যাখ্যান করা। আর এক ধরনের অহঙ্কার হচ্ছে অন্যান্য মানুষের সাথে আচরণে যা প্রকাশিত হয়। যেমন হাঁটাচলায় ও বেশভূষায় অহঙ্কার, মানুষের প্রতি অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য ভাব ও রূঢ়তা ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে অহঙ্কারের ব্যাখ্যা প্রদান করেন এভাবে- الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ-"অহঙ্কার বলতে বোঝায় সত্যকে অস্বীকার করা এবং লোকদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।”৩৭৭ সুতরাং কোনো অবস্থাতেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও বুযর্গ ভাবা এবং কথাবার্তায়, আচার-আচরণে ও বেশ-ভূষায় এরূপ কিছু প্রদর্শন করা মোটেও সমীচীন নয়। এ কারণে যে ধরনের পোশাক পরলে বা বেশ-ভূষা ধারণ করলে গৌরব ও বড় মানুষী প্রকাশ পায়, নিজেকে পদস্থ ব্যক্তি বলে মনে হয় অথবা নিজেকে বুযর্গ ব্যক্তি বলে ধারণা হয়, সে ধরনের পোশাক পরা ও বেশ-ভূষা ধারণ করা জায়িয নয়।
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উচ্চ মনে করা একটি অত্যন্ত নিকৃষ্টতম ও ধ্বংসাত্মক মনোবৃত্তিও। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি ধ্বংসাত্মক বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ، وَهِيَ أَشَدُّهُنَّ -“একটি ধ্বংসাত্মক বিষয় হলো, নিজেকে নিজে বুযর্গ ও শ্রেষ্ঠ মনে করা। এটা সবার চেয়ে জঘন্য। "৩৭৮ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কখনো তিনি আচার-আচরণ ও বেশভূষায় বড় মানুষী ভাব প্রদর্শন করতেন না। তাঁর গোটা জীবনই ছিল বিনয় ও নম্রতার এক অনুপম অনুকরণীয় আদর্শ। বাড়িতে তিনি স্ত্রীদের গৃহস্থালীর কাজে সাহায্য করতেন এবং নিজের কাপড় ও জুতা সেলাই করতেন। ৩৭৯ এক সফরে তিনি এবং তাঁর সাথীগণ খাবার তৈরির জন্য যাত্রা বিরতি করলেন। এ সময় তিনি বসে থাকলেন না; বরং বললেন, "... আমি কোনো কাজ না করে বসে থাকা এবং তোমাদের ওপর কিঞ্চিত শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করাটাকে ঘৃণা করি।" অতঃপর তিনি জ্বালানী কাঠ কাটতে গেলেন। তা ছাড়া যখন তিনি কোনো লোকজনের সমাবেশে যোগ দিতেন, সবসময় খালি জায়গায় বসতেন, কখনো সামনে যাওয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করতেন না।
ইসলামের নির্দেশ হলো, প্রত্যেকেই অপরকে ছোট হোক বা বড়- ভালো নযরে দেখবে। মর্যাদাগত দিক থেকে মুসলিম ভাইদেরকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় এবং প্রত্যেক শ্রেণির সাথে কিছু বিশিষ্ট আচরণ রয়েছে।
এক. যে সকল লোক বয়সে বড় কিংবা জ্ঞানে-গুণে বা দীনদারীতে শ্রেষ্ঠ। এ শ্রেণীর লোকদের সাথে যখন দেখা-সাক্ষাত হবে, তখন তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বকে অকপটে স্বীকার করে নেয়া এবং তাঁদের যথাযথ 'ইযযাত-সম্মান করা উচিত।
দুই. যে সকল লোককে বয়সে কিংবা জ্ঞানে-গুণে নিজের সমপর্যায়ের ভাবা হয়। এদেরকেও 'ইয্যাত-সম্মান করা উচিত। কেননা হতে পারে যে, তারা এমন কিছু গুণের অধিকারী, যা সে জানে না। অপরদিকে সে নিজে তো নিজের যোগ্যতা ও দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকে। তাই নিজের দুর্বলতার দিকে নযর করে এ শ্রেণির লোকদেরকেও বড় ভাবা ও সম্মান করা উচিত।
তিন. যে সকল লোক নিজের চেয়ে বয়সে ছোট। এ সকল লোককে যেমন দয়া ও স্নেহের নযরে দেখা উচিত, তেমনি নিজের এ দুর্বলতার কথাও অকপটে স্বীকার করে নেয়া প্রয়োজন যে, তাদের গুনাহ আমার থেকে অনেক কম। কেননা আমি তো দুনিয়ায় তাদের আগেই এসেছি এবং তারা শারী'আতের বিধি- নিষেধের আদিষ্ট হওয়ার আগে না জানি- আমি কতো গুনাহেই লিপ্ত হয়েছি। যদি এমন কোনো লোকের সাক্ষাত হয় যে, যার দীনদারী খুব কম এবং তার ব্যাপারে ব্যাখ্যার অবকাশও কম থাকে, তা হলে সে নিজের ব্যাপারে চিন্তা- ভাবনা করবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহে যে সকল 'ইবাদাত ও ভালো কাজ করার তাওফীক লাভ করেছে, সেগুলোর জন্য আল্লাহর দরবারে শুকর আদায় করবে।
অধিকন্তু, সে এ অবস্থায় আল্লাহর নিকট তার পরিসমাপ্তি কামনা করবে। কেননা সে কি এ কথা জানে যে, কোন্ অবস্থায় তার পরিসমাপ্তি ঘটবে?
উল্লেখ্য যে, যারা সদিচ্ছা সহকারে নিজের ও মানুষের সংশোধনের প্রচেষ্টা চালায় তাদের মধ্যে বিভিন্ন পথে এ রোগটি অনুপ্রবেশ করে। যখন আশেপাশের দীনী ও নৈতিক অবস্থার তুলনায় তাদের অবস্থা অনেকটা ভালো হয়ে ওঠে এবং অন্যের মুখেও তাদের স্বীকৃতি শোনা যায়, তখন শাইতান তাদের মনে এ ভাব সঞ্চার করতে থাকে যে, সত্যিই তোমরা বুযর্গ হয়ে গেছো। শাইতানের প্ররোচনায়ই তারা নিজের মুখে ও নিজের কাজের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে থাকে।
গর্ব-অহঙ্কার থেকে বাঁচার উপায়
* বন্দেগীর প্রগাঢ় অনুভূতি
যারা সদিচ্ছা সহকারে নিজের ও মানুষের সংশোধনের জন্য কাজ করে তাদের মধ্যে অবশ্যই বন্দেগীর অনুভূতি নিছক বিদ্যমান থাকা নয়; বরং সর্বমুহূর্তে জীবিত ও তাজা থাকা উচিত। তাদের কখনো এ নির্জলা সত্য বিস্মৃত হওয়া উচিত নয় যে, অহঙ্কার ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ একমাত্র আল্লাহর সাথে সুনির্দিষ্ট। আল্লাহর তুলনায় অসহায়ত্ব, দীনতা ও অক্ষমতা ছাড়া বান্দাহর দ্বিতীয় কোনো পরিচয় নেই। কোনো বান্দাহর মধ্যে যদি সত্যিই কোনো সদগুণের সৃষ্টি হয়, তা হলে তা আল্লাহর একান্ত দয়া। তা গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয় নয়; বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার বিষয়। এজন্য আল্লাহর নিকট আরো বেশি দীনতা প্রকাশ করা উচিত এবং এ সামান্য মূলধনকে সৎকর্মশীলতার সেবায় নিযুক্ত করা প্রয়োজন।
* আত্মসমালোচনা
দ্বিতীয় যে বিষয়টি মানুষকে গর্ব-অহঙ্কার প্রবণতা থেকে রক্ষা করতে পারে, সেটি হচ্ছে আত্মসমালোচনা। যে ব্যক্তি নিজের সদগুণাবলি অনুভব করার সাথে সাথে নিজের দুর্বলতা, দোষ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও দেখে, সে কখনো আত্মপ্রীতি ও আত্মম্ভরিতার শিকার হতে পারে না। নিজের গুনাহ ও দোষ-ত্রুটির প্রতি যার নজর থাকে, ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে অহঙ্কার করার কথা চিন্তা করার মতো অবকাশ তার থাকে না। এ প্রসঙ্গে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইন-শা-আল্লাহ।
* মহৎ ব্যক্তিদের প্রতি দৃষ্টি
তৃতীয় যে বিষয়টি এ ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে তা হলো কেবল নিজের নিচের স্তরের লোকদের দিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত নয়, যাদের চাইতে সে নিজেকে বুলন্দ ও উন্নত প্রত্যক্ষ করে আসছে। বরং তাকে দীন ও নৈতিকতার উন্নত ও মূর্ত প্রতীকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা উচিত, যাদের চাইতে সে এখনো অনেক নিম্ন স্তরে অবস্থান করছে। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদেরকে দীনদারি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে নিজের চাইতে ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ৩৮০
উল্লেখ্য যে, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে উন্নতির মতো অবনতিও সীমাহীন। সবচাইতে দুষ্ট প্রকৃতির লোকও যদি নিচের স্তরের লোকদের দিকে তাকায়, তা হলে কাউকে নিজের চাইতেও দুষ্ট ও অসৎ দেখে নিজের উন্নত অবস্থার জন্য গর্ব করতে পারে। এ গর্বের ফলে সে নিজের বর্তমান অবস্থার ওপর নিশ্চিন্ত থাকে এবং নিজেকে উন্নত করার প্রচেষ্টা থেকে বিরত হয়। বরং এর চাইতেও আরো অগ্রসর হয়ে মনে শাইতানী প্রবৃত্তি তাকে আশ্বাস দেয় যে, এখনো আরো কিছুটা নিচে নামবার অবকাশ আছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র তারাই অবলম্বন করতে পারে, যারা নিজেদের উন্নতির দুশমন। যারা উন্নতির সত্যিকার আকাঙ্খা পোষণ করে, তারা নিচে তাকাবার পরিবর্তে হামেশা ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকায় : উন্নতির প্রতিটি পর্যায়ে পৌঁছে তাদের সামনে আরো উন্নতির পর্যায় দেখা দেয়। সেগুলো প্রত্যক্ষ করে গর্ব-অহঙ্কারের পরিবর্তে নিজের দুর্বলতার অনুভূতি তাদের মনে কাঁটার মতো বিঁধে। এ কাঁটার ব্যথা তাদেরকে উন্নতির আরো উচ্চমার্গে আরোহন করতে উদ্বুদ্ধ করে। ৩৮১
টিকাঃ
৩৭৪. আল কোরআন, সূরা আন-নাহল, ১৬: ২৩
৩৭৫. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২৭৫
৩৭৬. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-লিবাস), হা. নং: ৪০৯২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১৭৪, ৪১৭৫
৩৭৭. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২৭৫
৩৭৮. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৭: মু'আলাজাতু কুল্লি যানবিন বিত-তাওবাহ), হা. নং: ৬৮৬৫
৩৭৯. ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, ৫৬৭৭
৩৮০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
خَصْلَتَانِ مَنْ كَانَنَا فِيهِ ، كَتَبَهُ اللهُ شَاكِرًا صَابِرًا ، وَمَنْ لَمْ تَكُونَا فِيهِ ، لَمْ يَكْتُبُهُ اللَّهُ شَاكِرًا وَلَا صَابِرًا : مَنْ نظر فِي دِينِهِ إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَهُ ، فَاقْتَدَى بِهِ، وَنَظَرَ فِي دُنْيَاهُ إِلَى مَنْ هُوَ دُونَهُ فَحَمِدَ اللَّهَ عَلَى مَا فَضْلَهُ اللَّهُ فِيهِ عَلَيْهِ ، كَتَبَهُ اللَّهُ شَاكِرًا صَابِرًا ، وَمَنْ نَظَرَ فِي دِينِهِ إِلَى مَنْ دُونَهُ ، وَنَظَرَ فِي دُنْيَاهُ إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَهُ ، فَأَسِفَ عَلَى مَا فَاتَهُ مِنْهُ ، لَمْ يَكْتُبَهُ اللَّهُ شَاكِرًا وَلَا صَابِرًا
"দুটি স্বভাব যার মধ্যে আছে আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন। আর যার মধ্যে এ দুটি স্বভাব নেই আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন না। যে ব্যক্তি দীনের ক্ষেত্রে তার চাইতে ওপরের স্তরের লোকের দিকে তাকাবে এবং তার অনুসরণ করবে আর দুনিয়ার ক্ষেত্রে তার চাইতে নিম্ন স্তরের লোকদের দিকে তাকাবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত দয়া ও অনুগ্রহের ওপর তাঁর প্রশংসা করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দীনের ক্ষেত্রে তার চাইতে নিচের স্তরের লোকের দিকে তাকাবে আর দুনিয়ার ক্ষেত্রে তার চাইতে উঁচু স্তরের লোকদের দিকে তাকাবে এবং দুনিয়ার যে সব নি'মাত তার হস্তগত হয়নি তার জন্য অনুশোচনা করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দাহ রূপে লিপিবদ্ধ করবেন না।" (তিরমিযী, আস-সুনান, [কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ...], হা. নং: ২৫১২)
৩৮১. মাওদূদী, ইসলামী আন্দোলন: সাফল্যের শর্তাবলী, পৃ.২৮-৯
📄 মিথ্যাচার
মিথ্যাচার একটি চরম নিকৃষ্ট গুণ। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, মিথ্যা কথা বলা মুনাফিকের তিনটি প্রধান লক্ষণের মধ্যে অন্যতম। ৩৮২ পবিত্র কোরআন ও হাদীসে কথাবার্তা বা লেনদেনে আপন ভাইয়ের সাথে মিথ্যা কথা বলা সম্পর্কে মুসলমানদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ, মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস ও জাহান্নামের দিকে চালিত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ "আর মিথ্যা পাপাচারের দিকে ধাবিত করে, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে।”৩৮৩ তা ছাড়া মিথ্যাচার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতকে চূর্ণ করে দেয়। যেখানে একজন অন্যজনের সাথে মিথ্যা আচরণ করতে পারে, সেখানে কখনো একজন অপরজনের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আর যেখানে একজনের কথার ওপর অন্য জনের পক্ষে নির্ভর করা সম্ভব নয়, সেখানে পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও আস্থা কিছুতেই বিদ্যমান থাকতে পারে না। পবিত্র হাদীসে এ বিষয়টিকে 'নিকৃষ্টতম খিয়ানাত' বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, كبرت خيانة أن تحدث أخاك حديثا هو لك مصدق وأنت به كاذب."হলো এই যে, তুমি তোমার ভাইকে এমন কোনো কথা বললে, সে তোমাকে সত্যবাদী বলে মনে করলো, অথচ তুমি তাকে মিথ্যা কথা বললে। "৩৮৪
কোরআন ও হাদীসের বর্ণনা মতে, জঘন্যতম মিথ্যাচার হচ্ছে যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে সম্পর্কিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা যা বলেননি এমন কথাকে আল্লাহর কথা বলে চালিয়ে দেয়া এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা গোপন নির্দেশনা পাওয়ার মিথ্যা দাবি করা- এ সবই জঘন্য মিথ্যাচার হিসেবে পরিগণিত। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেননি এমন কথা তাঁর নামে প্রচার করাও একটি জঘন্যতর মিথ্যাচার। এটা দীনের অনুসারীদেরকে বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করে। ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে বিকৃত এবং তার সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব স্নান করবার অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে হাদীসের অবয়বে মিথ্যা সানাদ সহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে অসংখ্য বাণী রচনা করেছে এবং এগুলো বিভিন্ন গ্রন্থের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে সর্তক করে গেছেন। সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
سيكون في آخر أمتي أناس يُحَدِّثُونَكُم مَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُم ولا آباؤكم ، فإياكم وإياهم.
অচিরেই আমার শেষ পর্যায়ের উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু লোক জন্ম নেবে, যারা তোমাদেরকে এমন সব হাদীস শোনাবে, যা তোমরাও শোনোনি এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরাও শোনেনি। অতএব, তোমরা নিজেদেরকে তাদের থেকে রক্ষা করবে। ৩৮৫
এ কারণে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে। পুরোপুরি যাচাই-বাছাই না করে হাদীস বর্ণনা করলে চরম গুনাহ হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, كفى بالمرء كذباً أن يُحَدِّثُ بكل ما سمع. “যে ব্যক্তি কোনো কিছু শোনেই যাচাই-বাছাই না করে বর্ণনা করতে শুরু করে, তাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করার জন্য তার এ কাজটুকুই যথেষ্ট। ৩৮৬
টিকাঃ
৩৮২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২২০
৩৮৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৪৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির..), হা. নং: ৬৮০৩
৩৮৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯৭৩; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৭৬৩৫
৩৮৫. মুসলিম, আস-সাহীহ, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৭৯১৯
৩৮৬. মুসলিম, আস-সাহীহ, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৭; আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল- আদাব), হা. নং: ৪৯৯৪