📄 অল্পে তুষ্ট থাকা
মু'মিন চরিত্রের একটি প্রধান ভূষণ হলো অল্পে তুষ্ট থাকা। একজন মু'মিন ন্যায়ানুগভাবে যখন যা পাবে- চাই তা যতোই অল্প ও সাধারণ হোক না কেন- তার ওপর সন্তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহর শুকর আদায় করবে। সে অন্যায়ভাবে কিংবা অপরের স্বার্থহানি করে কোনো কিছু অর্জন করতে উদ্যত হবে না। এগুণটি একদিকে মানুষকে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন করে গড়ে তোলে, অপরদিকে নাফসকে বহু খারাপ প্রবণতা ও অনাচার থেকে রক্ষা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَأَرْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ “আল্লাহ্ তা'আলা তোমার ভাগ্যে যা রেখেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকো, তবেই তুমি সব চাইতে ধনী বলে গণ্য হবে।”৩২৭
চরিত্রের এ গুণটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, হাদীসে একে একটি অনিঃশেষ সম্পদ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রত্যেক মু'মিনকে তা অর্জন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, عَلَيْكُمْ بِالْقَنَاعَةِ فَإِنَّ .الْقَنَاعَةَ مَالٌ لَا يَنْفَدُ -"তোমরা কানা'আত (অল্পে তুষ্টি ভাব) কে আঁকড়ে ধরো। কেননা কানা'আত এমন এক সম্পদ, যা কখনোই নিঃশেষ হবে না।”৩২৮ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ وَرُزِقَ كَفَافًا وَقَنْعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ - "সে ব্যক্তি সফল হয়েছে, যে ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তাকে প্রয়োজন মাফিক রিযক দান করা হলো। আর আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর প্রদত্ত রিযকের ওপর সন্তুষ্টি দান করেছেন।”৩২৯
ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্নের বিষয়গুলো চর্চা করা হলে এ গুণটি বাড়তে পারে-
* নিম্নস্তরের লোকদের দিকে তাকানো। এরূপ অবস্থায় ব্যক্তি যা লাভ করবে -তা যতোই অল্প ও সাধারণ হোক না কেন- তা তার কাছে অনেক বেশি ও বড় বলে প্রতীয়মান হবে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَحْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ.
তোমরা তোমাদের নিম্নস্তরের লোকদের দিকে তাকাবে, তোমাদের ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকাবে না। তা হলেই তোমরা আল্লাহর নি'মাতকে তুচ্ছ রূপে দেখতে পাবে না। ৩৩০
* নিজেদেরকে সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা।
* এ ধারণা সব সময় মনে বদ্ধমূল রাখতে হবে যে, যা কিছু আমাদের ভাগ্যে জুটে তা পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত। কাজেই আমাদের ভাগ্যে যা আছে- কম হোক বা বেশি, তা-ই আমরা পাবো। মাইমূন ইবনু মিহরান [৩৭-১১৭ হি.] (রাহ.) বলেন, مَنْ لَمْ يَرْضَ بِالْقَضَاء
.فَلَيْسَ لِحُمْقِهِ دَوَاءً - “যে আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট নয়, তার নির্বুদ্ধিতার কোনো ওষুধ নেই।”৩৩১
টিকাঃ
৩২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩০৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৮০৯৫
৩২৮. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৬৯২২
৩২৯. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যাকাত), হা. নং: ২৪৭৩
৩৩০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৭৬১৯
৩৩১. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৪৬
📄 সকলের সাথে সদ্ভাব ও বন্ধুত্ব বজায় রাখা
সকলের সাথে সদ্ভাব ও বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলা উচিত। এ জন্য প্রতিটি মু'মিনের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র, সুন্দর ও নম্রভাবে কথা বলা, কাউকে কথায় ও কাজে যে কোনো রূপ কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, প্রত্যেককে তার স্ব স্ব অধিকার দান করা এবং তার দুঃখ-কষ্টে কাছে থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। পবিত্র কোরআন ও হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় এ সকল বিষয়ের প্রতি নানাভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ﴿ - “মুমিনরাই পরস্পর ভাই- ভাই।”৩৩২ দৃশ্যত এ আয়াতটি তিনটি শব্দবিশিষ্ট একটি ছোট্ট বাক্য মাত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং তার আদর্শিক মর্যাদা প্রকাশ করার নিমিত্ত এ ছোট্ট বাক্যটি যথেষ্ট। এ আয়াত থেকে জানা যায়, এক ভাইয়ের সাথে অপর ভাই যেমন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ও মিলিত হয় এবং তারা নিজেদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য, ঝগড়া-ফ্যাসাদকে প্রশ্রয় দেয় না, ঈমানের সম্পর্কে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরকেও ঠিক তেমনি ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পর যুক্ত ও মিলিত হতে হবে। দুই সহোদর ভাই যেমন পরস্পরের জন্য নিজেদের সবকিছুকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়, পরস্পর পরস্পরের শুভাকাঙ্খী হয়, সাহায্য-সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকে এবং একে অপরের সহায়ক ও পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়, ঈমানদারগণের মধ্যেও ঠিক তেমনি সম্পর্ক গড়ে ওঠতে হবে। আর এ হচ্ছে ঈমানের একটি অনিবার্য দাবি। কাজেই যার ঈমান যতোটা সবল ও গভীর হবে, ঈমানদার ভাইয়ের প্রতি তার সম্পর্কটাও ততোটা সবল ও গভীর হবে।
ভ্রাতৃত্বের এ সম্পর্কের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম الحب (আল্লাহর জন্য ভালোবাসা)-এর মতো পবিত্র, ব্যাপক ও মনোরম পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। 'ভালোবাসা' নিজেই এক বিরাট চিত্তাকর্ষক ও শ্রুতিমধুর পরিভাষা। এর সাথে 'আল্লাহর জন্য' বিশেষণটি একে তামাম স্থূলতা ও অপবিত্রতা থেকে মহত্ত্বের উচ্চতম পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর পথে ভালোবাসা এ দুটি বিষয়ের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। যেখানে এর একটি থাকবে, সেখানে অপরটিও দেখা যাবে। একটি যদি না থাকে, তবে অপরটি সন্দেহজনকে পরিণত হবে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا -"তোমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হবে না, যতোক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে।”৩৩৩ অন্য হাদীসে তিনি বলেন, مَنْ أَحَبُّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ - “যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর জন্য ভালোবাসলো, আল্লাহর জন্য শত্রুতা করলো, আল্লাহর জন্য কাউকে কিছু দান করলো এবং আল্লাহর জন্য কাউকে বারণ করলো, সে তার ঈমানকেই পূর্ণ করে নিলো।”৩৩৪
এ হাদীসে মু'মিনদেরকে গোটা সম্পর্ককেই ভালোবাসার ভিত্তির ওপর স্থাপন করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ভালোবাসাকে শুধুই আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়াকে ঈমানের পূর্ণতার জন্য অপরিহার্য শর্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে।
টিকাঃ
৩৩২. আল কোরআন, সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ১০
৩৩৩. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২০৩
৩৩৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সুন্নাহ), হা. নং: ৪৬৮৩
📄 অপরের কল্যাণ কামনা
মানবীয় চরিত্রের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ হলো অপরের কল্যাণ কামনা। এর দ্বারা মানব-মনের স্বচ্ছতার পরিচয় পাওয়া যায়। পবিত্র হাদীসে দীন বলতে কল্যাণ কামনাকে বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الدِّينُ النصيحة “দীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা।”৩৫৫ যাদের জন্য কল্যাণ কামনা করা উচিত, তাদের মধ্যে সাধারণ মুসলিম ভাইদের কথাও হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বিভিন্ন সাহাবীর কাছ থেকে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনার বাই'আত গ্রহণ করেন। ৩৬
উল্লেখ্য, মুসলিম ভাইয়ের জন্য কল্যাণ কামনার প্রকৃত মানদণ্ড হচ্ছে যে, মানুষ তাঁর নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্যও ঠিক তাই পছন্দ করবে। কারণ, মানুষ কখনো তার নিজের অকল্যাণ কামনা করতে পারে না। বরং নিজের জন্য সে যতটুকু সম্ভব ফায়দা, কল্যাণ ও মঙ্গল বিধানে সচেষ্ট থাকে। নিজের অধিকারের বেলায় সে সামান্যতম ক্ষতি স্বীকার করতে পারে না, নিজের ফায়দার জন্য সময় ও অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করে না, নিজের অনিষ্টের কথা সে শোনতে পারে না, নিজের বে-'ইযযাতী কখনো বরদাশত করতে পারে না; বরং নিজের জন্য সে সর্বাধিক পরিমাণে সুযোগ-সুবিধা পেতে আগ্রহী। অতএব, কল্যাণ কামনার অর্থ হচ্ছে এই যে, মানুষ নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্যও ঠিক তা-ই পছন্দ করবে। এমনি পবিত্র ধারায় তার আচার-আচরণ বিকাশ লাভ করতে থাকবে। এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানের অপরিহার্য শর্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
টিকাঃ
৩৫৫. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২০৫
৩৬. জারীর ইবনু 'আবদিল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, بَايَعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى إِقَامِ الصَّلَاةِ وَلِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ - "আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট নামায কায়িম করা, যাকাত আদায় করা এবং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করার ওপর বাই'য়াত গ্রহণ করলাম।" (বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৫৭; মুসলিম, আস-সাহীহ, [কিতাব: আল-ঈমান, হা. নং: ২০৮)
📄 অন্যের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া
একজন মু'মিন নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও শুধু তা পছন্দ করে, তা নয়; বরং তাকে নিজের ওপর অগ্রাধিকারও দেয়। চরিত্রের এ অত্যুজ্জ্বল গুণকে আত্মত্যাগ (إيثار) বলা হয়। এর অর্থ হলো- নিজের কল্যাণ ও মঙ্গলের ওপর অন্যের কল্যাণ ও মঙ্গলচিন্তাকে অগ্রাধিকার দেবে। নিজের প্রয়োজনকে মুলতবী রেখে অন্যের প্রয়োজন মেটাবে। নিজে কষ্ট স্বীকার করে অন্যকে আরাম দেবে। নিজে ক্ষুধার্ত থেকে অন্যের ক্ষুন্নিবৃত্তি করবে। নিজের জন্য প্রয়োজন হলে স্বভাব-বিরুদ্ধ জিনিস মেনে নেবে; কিন্তু স্বীয় ভাইয়ের অন্ত রকে যথাসম্ভব অপ্রীতিকর অবস্থা থেকে রক্ষা করবে।
আত্মত্যাগ হচ্ছে একটি উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, এর দ্বারা মানব-মন সম্প্রসারিত হয়, আর মনের সম্প্রসারণের ফলে মানুষ সংকীর্ণতা ও কার্পণ্য থেকে মুক্তি লাভ করে।৩৩৮ তবে এ আত্মত্যাগ সকলের কাছ থেকে আশা করা যায় না। কারণ, এর ভিত্তিমূলে কোনো অধিকার বা কর্তব্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। এ আত্মত্যাগ সর্বপ্রথম প্রয়োজন-সীমার মধ্যে হওয়া উচিত। তারপর আরাম- আয়েশের ক্ষেত্রে এবং সর্বশেষ রুচি ও পছন্দের ক্ষেত্রে। এ সর্বশেষ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যেহেতু স্বভাবতই বিভিন্ন প্রকৃতির, তাই তাদের চাহিদা ও পছন্দও বিভিন্ন রূপ। এরূপ অবস্থায় প্রতিটি মানুষই যদি তার চাহিদা ও পছন্দের ওপর অনড় হয়ে থাকে, তা হলে মানব-সম্পর্ক ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেতে বাধ্য। পক্ষান্তরে সে যদি অন্যের রুচি, পছন্দ, ঝোঁক-প্রবণতাকে অগ্রাধিকার দিতে শিখে, তা হলে অত্যন্ত চমৎকার ও হৃদতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠতে পারে।
এ আত্মত্যাগেরই উচ্চতর পর্যায় হচ্ছে, নিজে অভাব-অনটন ও দূরবস্থার মধ্যে থেকে আপন ভাইয়ের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের চাইতে অগ্রাধিকার দেয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের জীবনে এ ধরনের বহু ঘটনার নযীর পাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনে তাঁদের এ মহত্তম গুণটির প্রশংসা করে বলা হয়েছে- وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَة - "এবং তারা নিজের ওপর অন্যের (প্রয়োজনকে) অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাব-অনটনের মধ্যে রয়েছে।”৩৩৯
বস্তুত নিজেদের অভাব অনটন সত্ত্বেও আনসারগণ (রা.) যেভাবে অভ্যাগত মুহাজির ভাইদের অভ্যর্থনা করেছেন এবং নিজেদের মধ্যে তাঁদেরকে স্থান দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উপর্যুক্ত আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে আবূ তালহা আল-আনসারী (রা.)-এর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনা থেকে আত্মত্যাগের একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায়। আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একজন ক্ষুধার্ত লোক এলো। তখন তাঁর গৃহে কোনো খাবার ছিলো না। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আজ রাতে এ লোকটিকে মেহমান হিসেবে রাখবে, আল্লাহ তার প্রতি করুণা বর্ষণ করবেন। আবূ তালহা (রা.) লোকটিকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ঘরে গিয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে জানতে পারলেন যে, ঘরে শুধু মেহমানের পেট ভরার মতো খাবারই আছে। তিনি বললেন, ছেলেমেয়েদের খাইয়ে বাতি নিভিয়ে দাও। আমরা উভয়ে সারা রাত অভুক্ত থাকবো। অবশ্য মেহমান বোঝতে পারবে যে, আমরাও খাচ্ছি। অবশেষে তাঁরা তা-ই করলেন। সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমাতে হাযির হলে তিনি বললেন, ضَحِكَ اللَّهُ اللَّيْلَةَ أَوْ عَحِبَ "مِنْ فَعَالِكُمَا -"আল্লাহ তা'আলা তোমাদের এ সদাচরণে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। এরপর উপর্যুক্ত আয়াতটি নাযিল হয়। ৩৪০
এ তো হচ্ছে আর্থিক অনটনের মধ্যে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত। কিন্তু এর চাইতেও চমৎকার ঘটনা হচ্ছে ইয়ারমুক যুদ্ধের, যাকে আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা বলা যায়। ঘটনাটি হলো- যুদ্ধের ময়দানে কয়েকজন মুজাহিদ শত্রুদের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন। এমন সময় প্রথমে একজন আহত মুজাহিদের নিকট পানি নিয়ে যাওয়া হলো। ঠিক সে মুহূর্তে নিকট থেকে অপর একজন লোকের আর্তনাদ শোনা গেলো। প্রথম লোকটি বললেন, ঐ লোকটির কাছে আগে নিয়ে যাও। দ্বিতীয় লোকটির কাছে গিয়ে পৌঁছলে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো এবং সে মুমূর্ষাবস্থায়ও লোকটি নিজের সঙ্গীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিলেন। এভাবে ষষ্ঠ ব্যক্তি পর্যন্ত একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলো এবং প্রত্যেকেই নিজের ওপর অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে লাগলেন। কিন্তু ষষ্ঠ ব্যক্তির কাছে গিয়ে দেখা গেলো তার জীবনপ্রদীপ ইতিমধ্যে নিভে গেছে। এভাবে প্রথম লোকটির কাছে ফিরে আসতে আসতে একে একে সবারই জীবনাবসান হলো এবং তাঁদের কারো পানি পান করার সুযোগ হলো না। ৩৪১
আত্মত্যাগের অন্য একটি অর্থ হচ্ছে, নিজে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের জিনিসে তুষ্ট থাকা এবং নিজের সাথীকে উৎকৃষ্ট জিনিস দান করা। বর্ণিত আছে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দুটি মিসওয়াক কাটলেন। তার একটি ছিলো সোজা এবং অপরটি বাঁকা। তাঁর সাথে একজন সাহাবী ছিলেন। তিনি সোজা মিসওয়াকটি তাঁকে দিলেন এবং বাঁকাটি নিজে রাখলেন। সাহাবী বললেন, يا رسول الله كنت والله أحق بالمستقيم مني -"ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম! সোজাটিই আপনার জন্য বেশি প্রযোজ্য হবে।' তিনি বললেন,
ما من صاحب يصحب صاحبا ولو ساعة من النهار إلا سئل عن صحبته هل أقام فيها حق الله أم أضاعه.
'কেউ যদি কোনো ব্যক্তির সাথে দিনের এক ঘণ্টা পরিমাণও সংশ্রব রাখে, তবে কিয়ামাতের দিন তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, এ লোকটি কি সংশ্রবকালীন আল্লাহর হাক্ক আদায়ের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে কিংবা তাকে নষ্ট করেছে?৩৪২
এ হাদীসে আত্মত্যাগ যে সংশ্রবেরও একটি অধিকার, তার প্রতিই ইশারা করা হয়েছে।
টিকাঃ
৩৩৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল- ঈমান), হা. নং: ১৮০
৩৩৮. প্রত্যেক ধর্মেই নাফসের পরিশুদ্ধি ও উন্নতির জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগের কথা বলা হয়েছে। যেমন- সনাতন হিন্দুধর্মে 'ত্যাগবাদ' একটি শ্রেষ্ঠ দর্শন। কৈবল্য উপনিষদের (১/২-৩) শ্লোকে এবং নারায়ণ উপনিষদের (১২/১৪-১৫) শ্লোকে বলা হয়েছে যে, " কেবলমাত্র ত্যাগের দ্বারাই অমৃতত্ত্ব বা মোক্ষ লাভ করা যায়। ত্যাগের মাধ্যমে যে পরম আনন্দ লাভ হয়, তার নাম দেয়া হয়েছে 'ভূমানন্দ লাভ'।" সনাতন হিন্দু ধর্ম মনে করে, নিজস্ব স্বার্থ ত্যাগের দ্বারা চিত্ত সম্প্রসারিত হয়, আর 'চিত্ত সম্প্রসারণ' মানুষকে ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্তি দিয়ে এক সুবিশাল ক্ষেত্রের সন্ধান দেয়। 'ভূমানন্দ' লাভ করা মোক্ষ লাভেরর জন্য অপরিহার্য। (ভবেশ রায়, সনাতন হিন্দুধর্ম কী এবং কেন, পৃ.৪৭)
৩৩৯. আল কোরআন, সূরা আল-হাশর, ৫৯: ৯
৩৪০. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: ফাদা'য়িলুস সাহাবাহ), হা. নং: ৩৫৮৭, (কিতাব: আত-তাফসীর), হা. নং: ৪৬০৭; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আশরিবাহ), হা. নং: ৫৪৮১
৩৪১. ওয়াকিদী, ফুতূহুশ শাম, খ. ১, পৃ. ২৭-৮; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়াতু..., খ. ৭, পৃ. ১৫
৩৪২. গাযালী, ইহয়া, খ. ২, পৃ. ১৭৪ ও বিদয়াতুল হিদায়াহ, পৃ. ২৩; আবু তালিব আল-মাক্কী, কুতুল কুলুব, খ. ২, পৃ. ৩৮৭, ৩৯৪ এ হাদীসের কোনো ভিত্তি আমি খোঁজে পাই নি।