📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 ওয়া'দা প্রতিপালন করা

📄 ওয়া'দা প্রতিপালন করা


ওয়াদা প্রতিপালন করাও মু'মিন জীবনের একটি অপরিহার্য গুণ। একজন মু'মিনের প্রতি ঈমানের একান্ত দাবি হলো, সে সর্বাবস্থায় কৃত ওয়াদা পালন করে যাবে। হাদীস শারীফে বলা হয়েছে- لَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ “ওয়াদার প্রতি যার দায়বদ্ধতা নেই, বস্তুতপক্ষে তার দীনও নেই।”৩১২ অন্য একটি হাদীসে ওয়াদা ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের একটি প্রধান লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثَ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا اثْتُمِنَ حَانَ - "মুনাফিকের লক্ষণ হলো তিনটি। এগুলো হলো- এক. সে যখন কথা বলে মিথ্যা বলে। দুই. যখন সে ওয়াদা করে ভঙ্গ করে। তিন. যখন তাঁর কাছে আমানাত রাখা হয় খিয়ানাত করে।”৩১৩
উল্লেখ্য যে, ইসলামে যদিও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি লিখিতভাবে করার নির্দেশনা রয়েছে, তবুও এটা কোনো বাধ্যবাধকতা নয় যে, সব চুক্তিই লিখিত হতে হবে। বরং ইসলাম তার অনুসারীদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক মুসলিমের কথাই তার স্বাক্ষরের মতো মূল্যবান। তাকে তার প্রতিটি কথাই রক্ষা করে চলা উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ -"মুসলিমগণ তাদের কথার ওপরই অটল থাকে।”৩১৪ এমনকি নিজের শিশুকেও যদি তার কোনো কাজের জন্য পুরস্কার স্বরূপ বা এমনিতেই কিছু প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়, তাও পূরণ করা কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ قَالَ لِصَبِيٌّ تَعَالَ .هَاكَ ثُمَّ لَمْ يُعْطِهِ فَهِيَ كَذَّبَةٌ -“যে ব্যক্তি কোনো বালককে বলে যে, আসো, নাও; কিন্তু আসার পর সে তাকে কিছু দিলো না, তবে তা একটি মিথ্যাচার রূপে পরিগণিত হবে।”৩১৫

টিকাঃ
৩১২. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩১৯৯, ১৩৬৩৭; ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ১৯৪ বিশিষ্ট হাদীসগবেষক শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ৩, পৃ. ৮৮, হা. নং: ৩০০৪)
৩১৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২২০
৩১৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আকদিয়াহ), হা. নং: ৩৫৯৬; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আহকাম), হা. নং: ১৩৫২ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।
৩১৫. আহমাদ, আল-মুসনাদ, (মুসনাদু আবী হুরাইরাহ রা.), হা. নং: ৯৮৩৬

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আমানত আদায় করা

📄 আমানত আদায় করা


আমানাত আদায় করাও মু'মিন জীবনের একটি অপরিহার্য গুণ। একজন মু'মিনের প্রতি ঈমানের একান্ত দাবি হলো, সে সর্বাবস্থায় আমানাত আদায় করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُوَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا - "আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন (তোমাদের প্রাপ্য কাছে রাখা) আমানাতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।”৩১৬ হাদীস শারীফে বলা হয়েছে- لَا إِمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ - "আমানাত রক্ষার প্রতি যার দায়বদ্ধতা নেই, প্রকৃত অর্থে তার ঈমানও নেই।”৩১৭ বস্তুতপক্ষে ব্যক্তির সত্যবাদিতা ও আমানাতদারির মাধ্যমেই তার দীনদারি ও ঈমানের পরিচয় পাওয়া যায়। এ কারণেই আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) বলেন,
لَا تَنْظُرُوا إِلَى صَلَاةِ أَحَدٍ وَلَا صِيَامِهِ، وَانْظُرُوا إِلَى صِدْقٍ حَدِيثِهِ إِذَا حَدَّثَ، وَإِلَى أَمَانَتِهِ إِذَا التُمِنَ، وَإِلَى وَرَعِهِ إِذَا أَشْفَى.
কারো নামায ও রোযার প্রতি তাকাবে না; বরং তাকাবে যে, সে কথা বলার সময় সত্য কথা বলে কিনা, তার কাছে আমানাত রাখা হলে তা রক্ষা করে কিনা এবং দুনিয়ার অর্থ-সম্পদ যখন তার নাগালে চলে আসে, সে পরহেয (অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় বাছ-বিচার) করে কিনা? ৩১৮
সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন,
أَوَّلُ مَا تَفْقِدُونَ مِنْ دِينِكُمُ الأَمَانَةُ وَآخِرُ مَا تَفْقِدُونَ الصَّلَاةُ وَسَيُصَلِّي أَقْوَامٌ لَا دِينَ إِيْمَانَ لَهُمْ.
তোমরা দীনের যে বিষয়টি সর্বপ্রথম হারাবে তা হলো আমানাতদারি। আর যে বিষয়টি সর্বশেষ হারাবে তা হলো সালাত। কাজেই অচিরেই এমন অনেক লোক সালাত আদায় করবে, যাদের মধ্যে কার্যত কোনোরূপ দীনদারি/ঈমান নেই। ৩১৯
মোটকথা, কারো মধ্যে আমানাত রক্ষার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ দুর্বলতা ও ত্রুটি দেখা দেবে, তার ঈমান ও দীনদারির মধ্যেও সে পরিমাণ দুর্বলতা ও ত্রুটি বিদ্যমান রয়েছে বলে সন্দেহাতীতভাবে ধরে নেওয়া যায়। 'উরওয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, مَا نَقَصَتْ أَمَانَةُ عَبْدٍ قَطْ إِلَّا نَقَصَ مِن إِيمَانِهِ "বান্দাহর আমানাতদারিতে যতটুকু পরিমাণ দুর্বলতা ও কমতি থাকবে, ঠিক ততটুকু পরিমাণ তার ঈমানের মধ্যেও দুর্বলতা ও কমতি থাকবে।”৩২০
'আমানাত' শব্দের সাধারণভাবে অর্থ করা হয় বিশ্বস্ততা। কিন্তু ইসলামের পরিভাষায় এর অর্থ অনেক ব্যাপক। আল্লাহর বান্দাহ হিসেবে যেমন প্রত্যেক মানুষের ওপর কতিপয় দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে, তেমনি সমাজের একজন সদস্য হিসেবে তার ওপর পারিবারিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, আর্থিক লেনদেন ও পেশাগত নির্দিষ্ট দায়-দায়িত্বও রয়েছে। ইসলাম এ সকল দায়িত্ব-কর্তব্যকে আমানাতরূপে দেখে। মানুষের ওপর সবচাইতে বড় আমানাত হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহ তা'আলা যে উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছেন তা পূরণের মাধ্যমে একটি অর্থবহ জীবন যাপন করা। ইসলামের কথা হলো- আল্লাহ তা'আলার সাথে প্রতিটি মানুষের এক ধরনের অঙ্গীকার রয়েছে, যা যথার্থ বিশ্বাস, আন্তরিক সাধনা ও নিখুঁত কর্মের মাধ্যমে পূরণ হয়। মানুষের দায়িত্ব হলো- একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করা এবং শাইতান ও তার দোসরদের অনুসরণ পরিত্যাগ করা। যদিও আল্লাহর এই আমানাত রক্ষা করতে মানুষকে দুনিয়ায় অনেক বাধা-বিপত্তির মুখে পড়তে হয় এবং কঠোর সাধনা করতে হয়, তবুও পৃথিবীতে আল্লাহর বান্দাহ হিসেবে সফল হয়ে আখিরাতে পুরস্কার পেতে হলে তাকে এটি করতেই হবে।
সমাজ জীবনের সাথেও ব্যক্তির আমানাতদারির ওতপ্রোত সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। ইসলামের কথা হলো- একজন মুসলিম সে তার ওপর অর্পিত যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য – চাই তা সামাজিক হোক বা প্রশাসনিক অথবা আর্থিক বা পেশাগত- সুচারু ও নিখুঁতরূপে পালন করে যাবে। কোনোরূপ ফাঁক-ফোকর, কৌশল ও চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা করা বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ ও আমানাতের খিয়ানাত। হাদীস শারীফে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন, مَنْ غَشَ فَلَيْسَ مِنَّا "যে ব্যক্তি বিশ্বাসঘাতকতা করলো, কাউকে ঠকালো সে আমার উম্মতভুক্ত নয়।”৩২১
কিয়ামাতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজ নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ الْإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا وَالْحَادِمُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ أَنَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ.
তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নেতা মাত্রই দায়িত্বশীল। তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নারী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্ববতী। তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। চাকর তার মালিকের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অতএব তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ৩২২
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
( وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ . وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ )
যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য ধ্বংস। যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় আর যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওযন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। ৩২৩
এ আয়াতে যে تطفيف (কম দেয়া)-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা কেবল ওযন ও পরিমাপে কম দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অপর কারো কোনো প্রকারের অধিকার আদায়ে গড়িমসি করার মধ্যেও ব্যাপ্ত। একবার 'উমার (রা.) জনৈক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে নামাযের রুকূ'-সাজদা ইত্যাদি ঠিকমতো আদায় করে না এবং দ্রুত নামায শেষ করে দেয়। তিনি তাকে বললেন, طففت "আল্লাহর প্রাপ্য আদায়ে তাতফীফ করেছো অর্থাৎ কম দিয়েছো।" এ বর্ণনার প্রেক্ষিতে ইমাম মালিক (রাহ.) বলেন, لِكُلِّ شَيْءٍ وَفَاءٌ وَتَطْفِيفٌ -" প্রত্যেক বিষয়েই পূর্ণমাত্রায় দেয়া ও কম দেয়ার বিষয় রয়েছে। ৩২৪ সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর এবং বান্দাহর যে কোনো অধিকার আদায় করতে ত্রুটি ও কম করে, সেও تطفيف -এর অপরাধে অপরাধী। অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি তার দায়িত্ব পরিপূর্ণরূপে আদায় না করে অথবা কাজে অবহেলা প্রদর্শন করে, এভাবে কোনো প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, আমলা, কর্মচারী, পিয়ন বা দীনী খিদমাতে নিয়োজিত ব্যক্তি যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব আদায় না করে, তা হলে সেও ওযনে কম দেয়ার অপরাধীর মতো জঘন্য অপরাধী হবে। ৩২৫ যাযান (রা.) থেকে বর্ণিত, 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন,
الْقَتْلُ فِي سَبِيلِ اللهِ يُكَفِّرُ الذُّنُوبَ كُلَّهَا إِلَّا الْأَمَانَةَ، يُؤْتَى بِالْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَإِنْ قُتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقَالُ: أَدْ أَمَانَتَكَ، فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ، كَيْفَ وَقَدْ ذَهَبَتِ الدُّنْيَا ؟ فَيُقَالُ: انْطَلِقُوا بِهِ إِلَى الْهَاوِيَةِ، فَيُنْطَلَقُ بِهِ إِلَى الْهَاوِيَةِ، وَيُمَثَّلُ لَهُ أَمَانَتُهُ كَهَيْئَتِهَا يَوْمَ دُفِعَتْ إِلَيْهِ، فَيَرَاهَا فَيَعْرِفَهَا فَيَهْوِي فِي أَثَرِهَا حَتَّى يُدْرِكَهَا، فَيَحْمِلَهَا عَلَى مَنْكِبَيْهِ حَتَّى إِذَا ظَنَّ أَنَّهُ خَارِجٌ زَلَت عَنْ مَنْكِبَيْهِ، فَهُوَ يَهْوِي فِي أَثَرِهَا أَبَدَ الآبدين.
আল্লাহর পথে শাহাদাত সকল পাপকেই মোচন করে দেয়। তবে আমানাতের ব্যাপারটি ভিন্ন। কিয়ামাতের দিন বান্দাহকে হাযির করা হবে, যদিও সে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেছে এবং তাকে বলা হবে, তোমার আমানাত আদায় করো। সে বলবে, ইয়া রাব্ব! এখন কীভাবে আমানাত আদায় করবো, দুনিয়া তো নিঃশেষ হয়ে গেছে? তখন ফেরেশতাগণকে বলা হবে, তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে এবং দুনিয়ায় তার নিকট সমর্পিত আমানাতের একটি প্রতীকী রূপ দেয়া হবে, যা সে চিনতে পারবে। ফলে সে তার পেছনে পেছনে ছুটতে থাকবে। এক পর্যায়ে তা নাগালের মধ্যে চলে আসবে এবং সে তা দু কাঁধে তোলে নেবে। এভাবে সে যখন মনে করবে যে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে গেছে, তখনই তা তার দু কাঁধ থেকে পিছলে পড়ে যাবে। এরপর সে আবার তার পেছনে পেছনে ছুটতে থাকবে। এভাবে চিরকাল ধরে তার এ তৎপরতা চলতে থাকবে।
রাবী বলেন, ইবনু মাস'উদ (রা.) আমানাতের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, الصَّلَاةُ أَمَانَةٌ، وَالْوُضُوءُ أَمَانَةٌ، وَالْوَزْنُ أَمَانَةٌ، وَالْكَيْلُ أَمَانَةٌ، وَأَشْيَاءُ عَدَّدَهَا، وَأَعْظَمُ ذَلِكَ الْوَدَائِعُ. "সালাত আমানাত, ওযু আমানাত, ওযন আমানাত ও পরিমাপ আমানাত। এভাবে তিনি আরো কয়েকটি বিষয়ের নাম উল্লেখ করলেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো গচ্ছিত অর্থ-সম্পদ।"
রাবী বলেন, এরপর আমি বারা' ইবনু 'আযিব (রা.)-এর নিকট আসলাম এবং 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.)-এর উপর্যুক্ত কথা সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাইলাম। তিনি জবাব দিলেন, صَدَقَ أَمَا سَمِعْتَ يَقُولُ اللَّهُ: { إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُوَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا } [النساء: ٥٨-তিনি সঠিক কথাই বলেছেন। তুমি কি শোনোনি যে, আল্লাহ কী বলেছেন, "আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন তোমাদের প্রাপ্য আমানাতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।" (নিসা':৫৮) ৩২৬

টিকাঃ
৩১৬. আল কোরআন, ৪ (সূরা আন-নিসা'): ৫৮
৩১৭. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩১৯৯, ১৩৬৩৭; ইবনু হিব্বان, আস-সাহীহ, হা. নং: ১৯৪
৩১৮. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৫: আল-আমানাত..), হা. নংঃ ৪৮৯৫; তাহাভী, মুশকিলুল আহার, হা. নং: ৩৬৪৫ কোথাও কোথাও 'উমার (রা.)-এর উপর্যুক্ত বক্তব্যটি এভাবেও বর্ণিত রয়েছে-
لا يغرنك صَلاةُ رَجُلٍ وَلَا صِيَامُهُ مَنْ شَاءَ صَامَ وَمَنْ شَاءَ صَلَّى وَلَكِنْ لَا دِينَ لِمَنْ لَا أَمَانَةً لَهُ. "কোনো ব্যক্তির নামায ও রোযা যেন তোমাকে প্রতারিত না করে। যে চায় সে রোযা রাখবে আর যে চায় সে নামায পড়বে। কিন্তু আমানাত রক্ষার প্রতি যার দায়বদ্ধতা নেই, প্রকৃত অর্থে তার ঈমান নেই।" (বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, [কিতাব: আল-ওয়াদী'আহা, হা. নং: ১৩০৬৯; ইবনুল মুকরি', আল-মু'জাম, হা. নং: ৭৫৪) সাইয়িদাহ 'আয়িশা (রা.) থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত রয়েছে। (দ্র. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, [৩৫: আল-আমানাত...], হা. নং: ৪৮৯৬; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-ঈমান, হা. নং: ১২)
৩১৯. বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আল-ওয়াদী'আহ), হা. নং: ১৩০৭১; হাকিম, আল- মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-ফিতান...), হা. নং: ৮৫৩৮; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৮৬৯৯, ৮৭০০, ৯৫৬২; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৬৯৮৪; 'আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৫৯৮১
৩২০. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ৫৭; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩০৯৫৯
৩২১. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-ইজারাহ), হা. নং: ৩৪৫৪; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বুয়ু'), হা. নং: ১৩১৫
৩২২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-জুমু'আহ), হা. নং: ৮৪৪; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ইমারাহ), হা. নং: ৩৪০৮
৩২৩. আল কোরআন, সূরা মুতাফফিফীন, ৮৩: ১-৩
৩২৪. মালিক, আল-মুওয়াত্তা, (কিতাবুস সালাত), হা. নং: ২২
৩২৫. মুফতী শাফী, মা'আরিফুল কোরআন, খ. ৮, পৃ. ৬৭৭
৩২৬. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৫: আল-আমানাত...), হা. নং: ৪৮৮৫ বিশিষ্ট হাদীসগবেষক শাইখ আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ২, পৃ. ১৫৭, হা. নং: ১৭৬৩)

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 অল্পে তুষ্ট থাকা

📄 অল্পে তুষ্ট থাকা


মু'মিন চরিত্রের একটি প্রধান ভূষণ হলো অল্পে তুষ্ট থাকা। একজন মু'মিন ন্যায়ানুগভাবে যখন যা পাবে- চাই তা যতোই অল্প ও সাধারণ হোক না কেন- তার ওপর সন্তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহর শুকর আদায় করবে। সে অন্যায়ভাবে কিংবা অপরের স্বার্থহানি করে কোনো কিছু অর্জন করতে উদ্যত হবে না। এগুণটি একদিকে মানুষকে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন করে গড়ে তোলে, অপরদিকে নাফসকে বহু খারাপ প্রবণতা ও অনাচার থেকে রক্ষা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَأَرْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ “আল্লাহ্ তা'আলা তোমার ভাগ্যে যা রেখেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকো, তবেই তুমি সব চাইতে ধনী বলে গণ্য হবে।”৩২৭
চরিত্রের এ গুণটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, হাদীসে একে একটি অনিঃশেষ সম্পদ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রত্যেক মু'মিনকে তা অর্জন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, عَلَيْكُمْ بِالْقَنَاعَةِ فَإِنَّ .الْقَنَاعَةَ مَالٌ لَا يَنْفَدُ -"তোমরা কানা'আত (অল্পে তুষ্টি ভাব) কে আঁকড়ে ধরো। কেননা কানা'আত এমন এক সম্পদ, যা কখনোই নিঃশেষ হবে না।”৩২৮ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ وَرُزِقَ كَفَافًا وَقَنْعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ - "সে ব্যক্তি সফল হয়েছে, যে ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তাকে প্রয়োজন মাফিক রিযক দান করা হলো। আর আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর প্রদত্ত রিযকের ওপর সন্তুষ্টি দান করেছেন।”৩২৯
ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্নের বিষয়গুলো চর্চা করা হলে এ গুণটি বাড়তে পারে-
* নিম্নস্তরের লোকদের দিকে তাকানো। এরূপ অবস্থায় ব্যক্তি যা লাভ করবে -তা যতোই অল্প ও সাধারণ হোক না কেন- তা তার কাছে অনেক বেশি ও বড় বলে প্রতীয়মান হবে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَحْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ.
তোমরা তোমাদের নিম্নস্তরের লোকদের দিকে তাকাবে, তোমাদের ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকাবে না। তা হলেই তোমরা আল্লাহর নি'মাতকে তুচ্ছ রূপে দেখতে পাবে না। ৩৩০
* নিজেদেরকে সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা।
* এ ধারণা সব সময় মনে বদ্ধমূল রাখতে হবে যে, যা কিছু আমাদের ভাগ্যে জুটে তা পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত। কাজেই আমাদের ভাগ্যে যা আছে- কম হোক বা বেশি, তা-ই আমরা পাবো। মাইমূন ইবনু মিহরান [৩৭-১১৭ হি.] (রাহ.) বলেন, مَنْ لَمْ يَرْضَ بِالْقَضَاء
.فَلَيْسَ لِحُمْقِهِ دَوَاءً - “যে আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট নয়, তার নির্বুদ্ধিতার কোনো ওষুধ নেই।”৩৩১

টিকাঃ
৩২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩০৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৮০৯৫
৩২৮. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৬৯২২
৩২৯. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যাকাত), হা. নং: ২৪৭৩
৩৩০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৭৬১৯
৩৩১. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৪৬

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 সকলের সাথে সদ্ভাব ও বন্ধুত্ব বজায় রাখা

📄 সকলের সাথে সদ্ভাব ও বন্ধুত্ব বজায় রাখা


সকলের সাথে সদ্ভাব ও বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলা উচিত। এ জন্য প্রতিটি মু'মিনের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র, সুন্দর ও নম্রভাবে কথা বলা, কাউকে কথায় ও কাজে যে কোনো রূপ কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, প্রত্যেককে তার স্ব স্ব অধিকার দান করা এবং তার দুঃখ-কষ্টে কাছে থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। পবিত্র কোরআন ও হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় এ সকল বিষয়ের প্রতি নানাভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ﴿ - “মুমিনরাই পরস্পর ভাই- ভাই।”৩৩২ দৃশ্যত এ আয়াতটি তিনটি শব্দবিশিষ্ট একটি ছোট্ট বাক্য মাত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং তার আদর্শিক মর্যাদা প্রকাশ করার নিমিত্ত এ ছোট্ট বাক্যটি যথেষ্ট। এ আয়াত থেকে জানা যায়, এক ভাইয়ের সাথে অপর ভাই যেমন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ও মিলিত হয় এবং তারা নিজেদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য, ঝগড়া-ফ্যাসাদকে প্রশ্রয় দেয় না, ঈমানের সম্পর্কে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরকেও ঠিক তেমনি ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পর যুক্ত ও মিলিত হতে হবে। দুই সহোদর ভাই যেমন পরস্পরের জন্য নিজেদের সবকিছুকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়, পরস্পর পরস্পরের শুভাকাঙ্খী হয়, সাহায্য-সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকে এবং একে অপরের সহায়ক ও পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়, ঈমানদারগণের মধ্যেও ঠিক তেমনি সম্পর্ক গড়ে ওঠতে হবে। আর এ হচ্ছে ঈমানের একটি অনিবার্য দাবি। কাজেই যার ঈমান যতোটা সবল ও গভীর হবে, ঈমানদার ভাইয়ের প্রতি তার সম্পর্কটাও ততোটা সবল ও গভীর হবে।
ভ্রাতৃত্বের এ সম্পর্কের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম الحب (আল্লাহর জন্য ভালোবাসা)-এর মতো পবিত্র, ব্যাপক ও মনোরম পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। 'ভালোবাসা' নিজেই এক বিরাট চিত্তাকর্ষক ও শ্রুতিমধুর পরিভাষা। এর সাথে 'আল্লাহর জন্য' বিশেষণটি একে তামাম স্থূলতা ও অপবিত্রতা থেকে মহত্ত্বের উচ্চতম পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর পথে ভালোবাসা এ দুটি বিষয়ের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। যেখানে এর একটি থাকবে, সেখানে অপরটিও দেখা যাবে। একটি যদি না থাকে, তবে অপরটি সন্দেহজনকে পরিণত হবে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا -"তোমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হবে না, যতোক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে।”৩৩৩ অন্য হাদীসে তিনি বলেন, مَنْ أَحَبُّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ - “যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর জন্য ভালোবাসলো, আল্লাহর জন্য শত্রুতা করলো, আল্লাহর জন্য কাউকে কিছু দান করলো এবং আল্লাহর জন্য কাউকে বারণ করলো, সে তার ঈমানকেই পূর্ণ করে নিলো।”৩৩৪
এ হাদীসে মু'মিনদেরকে গোটা সম্পর্ককেই ভালোবাসার ভিত্তির ওপর স্থাপন করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ভালোবাসাকে শুধুই আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়াকে ঈমানের পূর্ণতার জন্য অপরিহার্য শর্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে।

টিকাঃ
৩৩২. আল কোরআন, সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ১০
৩৩৩. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২০৩
৩৩৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সুন্নাহ), হা. নং: ৪৬৮৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00