📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 দয়া ও সহানুভূতি

📄 দয়া ও সহানুভূতি


দয়া ও সহানুভূতি অন্তরের নম্রতা ও কোমলতার একটি প্রতিফলিত রূপ। অর্থাৎ কোনো মানুষের অন্তর যদি নম্র ও কোমল হয়, তবে তার আচরণে তার ভাইয়ের জন্য গভীর ভালোবাসা, স্নেহ-প্রীতি, দয়া-দরদ ও ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। তার দ্বারা তার ভাইয়ের মনে অণু পরিমাণ কষ্ট বা আঘাত লাগবার কল্পনাও তার পক্ষে বেদনাদায়ক ব্যাপার। এ দয়া ও সহানুভূতির গুণই একদিকে মানুষকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং সাধারণ লোকদেরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে, অপরদিকে সে আল্লাহর দয়া ও রাহমাত লাভের উপযুক্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمُكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ.
যারা দয়া করে, পরম করুণাময় তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া করো, তবেই আসমানবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। ২৯৬
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার মানুষের প্রতি দয়া ও রাহম করে না, তার চেয়ে হতভাগ্য আর কেউ নয়। কারণ, দুনিয়া ও আখিরাতে সে আল্লাহর রাহমাত থেকে বঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাহদের প্রতি রাহম করে, তার জন্য আল্লাহর রাহমাতও অনিবার্য হয়ে যায়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, لَا تُنْزَعُ الرَّحْمَةُ إِلَّا مِنْ شقی-"হতভাগ্য ছাড়া অপর কারো থেকে রাহমাত ছিনিয়ে নেয়া হয় না।”২৯৭ কোরআন ও হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী সকল মানুষের প্রতি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল হওয়া কর্তব্য। তারপরও নিম্নোক্ত মানুষদের প্রতি বিশেষভাবে দয়া ও সহানুভূতি দেখাতে বলা হয়েছে-
এক. পিতামাতা। কোরআনের একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার 'ইবাদাতের পরই পিতামাতার প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
দুই. সন্তান-সন্ততি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আকরা' ইবনু হাবিস (রা.)কে তিরস্কার করেন, যখন তিনি জানতে পারেন যে, সে তার দশজন সন্তানের কাউকে কখনো আদর করে চুমো খায়নি। অধিকন্তু, তিনি বলেন যে, مَن لا يَرْحَمْ لا يُرْحَمْ-"যে মমত্ব প্রদর্শন করে না, সে আল্লাহর নিকট থেকেও মমত্ব লাভ করে না।"২৯৮
তিন. স্বামী-স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, خِيَارُكُمْ لِنسَائِهِمْ خُلُقًا-" তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম লোক হলো, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।"২৯৯ এখানে তিনি বিশেষভাবে স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহারের কথা বলেছেন।
চার. আত্মীয়-স্বজন। আল কোরআনের বহু আয়াতে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদাচরণ করতে বলা হয়েছে।
পাঁচ. ইয়াতীম। কোরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে তাদের প্রতি দরদী হতে বলা হয়েছে।
ছয়. অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি। বিভিন্ন হাদীসে অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নিতে এবং বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সাত. পরিচারক-পরিচারিকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের পরিচারক-পরিচারিকাদের প্রতি কর্কশ ও রূঢ় আচরণ করতে নিষেধ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিলো দয়া ও সহানুভূতির এক বাস্তব অত্যুজ্জ্বল আদর্শ। আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে সম্বোধন করে বলেছেন, ﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ﴾ “আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সমস্ত জগতের প্রতি রাহমাত হিসেবে।”৩০০ অন্য একটি আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রধান গুণরাজির মধ্যে দয়া ও রাহমাতকে একটি বিশিষ্ট গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ ﴾ “তিনি মু'মিনদের প্রতি অতীব দয়াশীল ও মেহেরবান।”৩০১ বস্তুতপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি কাজে যেমন মানুষের প্রতি তাঁর পরম দয়া ও সহানুভূতির প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি তাঁর প্রচারিত দাওয়াতও ছিল মানবজাতির জন্য এক অনুপম রাহমাত। কারণ,
এক. এটা মানুষকে ভ্রান্ত মতবাদের অনুসরণ থেকে মুক্ত করে আল্লাহর পথে পরিচালিত করে।
দুই. এটা সমাজের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষকে দুর্দশা থেকে মুক্ত করে।
তিন. এটা মানুষকে যুলম-নির্যাতন ও বে-ইনসাফী থেকে মুক্ত করে। বিশেষভাবে ধনী ও ক্ষমতাশীল লোকদের দ্বারা দরিদ্র ও দুর্বলদের ওপর শোষণ ও নিপীড়ন বন্ধ করে।

টিকাঃ
২৯৬. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯২৪; আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯৪৩
২৯৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯২৩; আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯৪৪
২৯৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৬৫১; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ফাদা'য়িল), হা. নং: ৬১৭০
২৯৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আর-রিদা'), হা. নং: ১১৬২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আন-নিকাহ), হা. নং: ১৯৭৮
৩০০. আল কোরআন, সূরা আল-আম্বিয়া, ২১: ১০৭
৩০১. আল কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ১২৮

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 অন্যের দোষ-ত্রুটি মার্জনা করা

📄 অন্যের দোষ-ত্রুটি মার্জনা করা


মার্জনা অর্থ ক্ষমা করে দেয়া। এটি মানব চরিত্রের একটি অনুপম বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে মার্জনাকে মু'মিন জীবনের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের নিকট তাকওয়ার গুণাবলি তোলে ধরতে গিয়ে বলেন, ﴿وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ﴾ আর যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। "৩০২
এ বৈশিষ্ট্যটি অতি বড়ো সাহসের কাজ, এটা সহজে অর্জন করা যায় না। কারণ, কোনো মানুষ যখন কষ্ট পায় অথবা তার কোনো ক্ষতি সাধন হয়, তখন সর্বপ্রথম ক্রোধই তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করার প্রয়াস পায়। আর ক্রোধ যদি তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করতে পারে, তা হলে মার্জনা তো দূরের কথা, সে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে। এ কারণে এ গুণ অর্জন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে নাফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। প্রকৃত দয়া ও নম্রতা যা মানুষের অন্তরে থাকে, আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যদি তার যথার্থ বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়, তবেই তা মানুষের আচরণকে মার্জিত করে। এ ধরনের মানুষই সবসময় তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা নিয়োজিত করে আল্লাহর ক্ষমাশীলতার সাথে সম্পৃক্ত হতে। ফলে তারা অন্যদের প্রতি সদয় ও ক্ষমাশীল হয়। পবিত্র কোরআনে এ গুণকে একটি সাহসিকতাপূর্ণ কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنْ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ - "যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরলো ও ক্ষমা করে দিলো, তার এ কাজ বিরাট সাহসিকতার পরিচায়ক।”৩০৩
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় মু'মিনদেরকে এ গুণ অর্জনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং এক জায়গায় তাদের সামনে এ যুক্তিও পেশ করা হয়েছে যে, প্রত্যেকেই যেন এ কথা মনে রাখে, সেও আল্লাহর নিকট ক্ষমার মুখাপেক্ষী। কাজেই তাকে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা পেতে হলে সে নিজেও যেন অন্যের ভুলত্রুটির প্রতি যৌক্তিকভাবে সুবিবেচক ও ক্ষমাশীল হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ - "তাদের ক্ষমা ও মার্জনার নীতি গ্রহণ করা উচিত। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ক্ষমা করে দিন। বস্তুত আল্লাহ তা'আলা মার্জনাকারী ও দয়া প্রদর্শনকারী।”৩০৪ একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ বাকর আস-সিদ্দীক (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, مِنْ عَبْدٍ ظُلِمَ بِمَظْلَمَةٍ فَيُغْضِي عَنْهَا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلٌ إِلَّا أَعَزَّ اللَّهُ بِهَا نَصْرَهُ - "কোনো বান্দাহর ওপর যদি কোনো অন্যায় আচরণ করা হয় এবং সে যদি তা আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করে দেয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে বিরাট সাহায্য করেন।”৩০৫ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, مَنِ اعْتَذَرَ إِلَى أَخِيهِ بِمَعْذِرَةٍ فَلَمْ - يَقْبَلْهَا مِنْهُ كَانَ عَلَيْهِ مِثْلُ خَطِيئَةِ صَاحِبِ الْمَكْسِ . নিজের অন্যায়ের জন্য কোনো ওযর পেশ করলো; কিন্তু সে তা কবুল করলো না, তার এতোখানি গুনাহ হলো যতোটা একজন (অবৈধ) শুল্ক আদায়কারীর হয়ে থাকে। "৩০৬
উল্লেখ্য যে, অন্যায়ের সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করা যেতে পারে; কিন্তু যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহর নিকট তার বিশাল প্রতিদান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَزَاء سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهُ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ - "আর অন্যায়ের বদলা সমান পরিমাণ প্রতিশোধ। কিন্তু যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দিলো এবং আপোষ-রফা করলো, তার প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে। তিনি যালিমদেরকে পছন্দ করেন না।”৩০৭
এখানে এ বিষয়টিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, ক্ষমা অবশ্যই একটি মহত্তম গুণ; কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তিবিশেষে ক্ষমা করলে তার অত্যাচার বেড়ে যাওয়ার কিংবা তার ধৃষ্টতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে তার ক্ষেত্রে ক্ষমা করার চাইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করাই শ্রেয় বিবেচিত হবে। তবে এ সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে সীমা লঙ্ঘন না হয়। কাযী আবূ বাকর ইবনুল 'আরাবী ও কুরতুবী (রাহ.) প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন, ক্ষমা ও প্রতিশোধ দুটিই অবস্থা ভেদে উত্তম। যে ব্যক্তি অনাচার করার পর লজ্জিত হয়, তাকে ক্ষমা করা উত্তম এবং যে ব্যক্তি স্বীয় জেদে ও অত্যাচারে অটল থাকে, তার ক্ষেত্রে প্রতিশোধ নেয়াই উত্তম। ৩০৮ এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট তাবি'ঈ ইব্রাহীম আন-নাখ'ঈ (রাহ.) বলেন, انهم كانوا يكرهون للمؤمنين أن يذلوا أنفسهم فيجترى عليهم الفساق - মনীষীগণ এটা অপছন্দ করতেন যে, মু'মিনগণ পাপাচারী লোকদের সামনে নিজেদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করবেন। ফলে তাদের ওপর পাপিষ্ঠদের ধৃষ্টতা আরও বেড়ে যাবে।”৩০৯

টিকাঃ
৩০২. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৩৪
৩০৩. আল কোরআন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৪৩
৩০৪. আল কোরআন, সূরা আন-নূর, ২৪: ২২
৩০৫. আহমাদ, আল-মুসনাদ, বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আশ-শাহাদাত), হা. নং: ২১৬২৬
৩০৬. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৩৭১৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৯৮১
৩০৭. আল কোরআন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৪০
৩০৮. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ১৬, পৃ. ৩৯
৩০৯. ফাররা', মা'আনিউল কোরআন, খ. ৪, পৃ. ১৪৪; কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ১৬, পৃ. ৩৯; যামাখশারী, আল-কাশশাফ, খ. ৪, পৃ. ২৩৩

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 সত্য কথা বলা

📄 সত্য কথা বলা


সত্য কথা বলা মু'মিন জীবনের একটি অপরিহার্য গুণ। একজন মু'মিনের প্রতি ঈমানের একান্ত দাবি হলো, সে সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলবে, কখনো মিথ্যা কথা বলবে না। আল্লাহর নাবী-রাসূলগণ ও তাঁর সকল প্রিয় বান্দাহই সত্যবাদী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ও চরিত্রে সত্যবাদিতার অনুপম প্রকাশ ঘটেছিল। এ কারণে তাঁর শত্রু কাফিররাও তাঁকে 'সত্যবাদী' বলে ডাকতো। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, রোম সম্রাটের দরবারে আবূ সুফ্য়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নুবুওয়াত পাওয়ার পূর্বে কখনো মিথ্যা কথা বলতেন কি-না? আবূ সুফইয়ান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জবাব দিলেন, "না, কখনো না।"
উল্লেখ্য যে, নুবুওয়াতের পর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আধ্যাত্মিক স্তর হলো সিদ্দীকদের। আর সত্যবাদিতাই বান্দাহকে এ মহান স্তরে পৌঁছে দেয়। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِى إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرِّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ الله صديقا.
তোমরা সত্যবাদিতাকে আঁকড়ে ধরো। অর্থাৎ সর্বদা সত্য কথা বলবে। কেননা সত্যবাদিতা ন্যায়ের দিকে চালিত করে, আর ন্যায় জান্নাতের দিকে চালিত করে। ব্যক্তি সদা সত্য কথা বলতে এবং সত্য অনুসন্ধানে অভ্যস্ত হলে আল্লাহর নিকট তার নাম 'সিদ্দীক' হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। ৩১০
অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
اضمَنُوا لِي سِنًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنُ لَكُمُ الْجَنَّةَ اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اوْ تُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ.
তোমরা তোমাদের পক্ষ থেকে আমাকে ছয়টি বিষয়ের নিশ্চয়তা দাও, তবে আমি তোমাদেরকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেবো। এ ছয়টি বিষয় হলো- এক. তোমরা যখন কথা বলবে, সত্য কথা বলবে। দুই. যখন ওয়াদা করবে তা পূর্ণ করবে। তিন. যখন তোমাদের নিকট আমানাত রাখা হয়, তা আদায় করবে। চার. তোমাদের লজ্জাস্থান হিফাযাত করবে। পাঁচ. তোমাদের দৃষ্টিশক্তি সংযত রাখবে। ও ছয়. তোমাদের হাতকে বারণ করবে। ৩১১

টিকাঃ
৩১০. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭৪৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৮০৫ (মাতনটি সাহীহ মুসলিম থেকে গৃহীত)
৩১১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২২৭৫৭; ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ২৭১ বিশিষ্ট হাদীসগবেষক শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটি সাহীহ লি-গাইরিহি। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ৩, পৃ. ৮৬, হা. নং: ২৯৯৩)

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 ওয়া'দা প্রতিপালন করা

📄 ওয়া'দা প্রতিপালন করা


ওয়াদা প্রতিপালন করাও মু'মিন জীবনের একটি অপরিহার্য গুণ। একজন মু'মিনের প্রতি ঈমানের একান্ত দাবি হলো, সে সর্বাবস্থায় কৃত ওয়াদা পালন করে যাবে। হাদীস শারীফে বলা হয়েছে- لَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ “ওয়াদার প্রতি যার দায়বদ্ধতা নেই, বস্তুতপক্ষে তার দীনও নেই।”৩১২ অন্য একটি হাদীসে ওয়াদা ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের একটি প্রধান লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثَ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا اثْتُمِنَ حَانَ - "মুনাফিকের লক্ষণ হলো তিনটি। এগুলো হলো- এক. সে যখন কথা বলে মিথ্যা বলে। দুই. যখন সে ওয়াদা করে ভঙ্গ করে। তিন. যখন তাঁর কাছে আমানাত রাখা হয় খিয়ানাত করে।”৩১৩
উল্লেখ্য যে, ইসলামে যদিও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি লিখিতভাবে করার নির্দেশনা রয়েছে, তবুও এটা কোনো বাধ্যবাধকতা নয় যে, সব চুক্তিই লিখিত হতে হবে। বরং ইসলাম তার অনুসারীদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক মুসলিমের কথাই তার স্বাক্ষরের মতো মূল্যবান। তাকে তার প্রতিটি কথাই রক্ষা করে চলা উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ -"মুসলিমগণ তাদের কথার ওপরই অটল থাকে।”৩১৪ এমনকি নিজের শিশুকেও যদি তার কোনো কাজের জন্য পুরস্কার স্বরূপ বা এমনিতেই কিছু প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়, তাও পূরণ করা কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ قَالَ لِصَبِيٌّ تَعَالَ .هَاكَ ثُمَّ لَمْ يُعْطِهِ فَهِيَ كَذَّبَةٌ -“যে ব্যক্তি কোনো বালককে বলে যে, আসো, নাও; কিন্তু আসার পর সে তাকে কিছু দিলো না, তবে তা একটি মিথ্যাচার রূপে পরিগণিত হবে।”৩১৫

টিকাঃ
৩১২. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩১৯৯, ১৩৬৩৭; ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ১৯৪ বিশিষ্ট হাদীসগবেষক শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ৩, পৃ. ৮৮, হা. নং: ৩০০৪)
৩১৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৩৩; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২২০
৩১৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আকদিয়াহ), হা. নং: ৩৫৯৬; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আহকাম), হা. নং: ১৩৫২ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।
৩১৫. আহমাদ, আল-মুসনাদ, (মুসনাদু আবী হুরাইরাহ রা.), হা. নং: ৯৮৩৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00