📄 অন্যের উপকার ও অবদান স্বীকার করা
আল্লাহ তাআলার নি'মাতের শুকর আদায় করার পাশাপাশি মানুষের উপকার স্বীকার করা এবং তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করাও প্রয়োজন। কৃতজ্ঞ মানুষকে আল্লাহ তা'আলা যেমন ভালোবাসেন, তেমনি মানুষও কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য আরও কিছু করার আগ্রহ পোষণ করে থাকে。
উল্লেখ যে, অপরের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার উপলব্ধিকে প্রকাশ করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ একটি উত্তম ব্যবস্থা। কেননা, যখন কোনো ব্যক্তি বোঝতে পারে যে, তার ভাই তার কৃত কার্যাবলির গুরুত্ব ও মূল্য যথাযথ উপলব্ধি করছে, তখন ভাইয়ের প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে ভালোবাসা পোষণকারী ব্যক্তি যদি বোঝতে পারে যে, তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই, তবে তার হৃদয়াবেগ স্বভাবতই নিষ্প্রভ হতে থাকবে। এ কারণেই এক ব্যক্তি যখন অন্য ব্যক্তিকে সাহায্য করে বা তার সাথে কোনো সদাচরণ করে বা তাকে কোনো ভালো কথা বলে অথবা তাকে কোনো হাদিয়া দেয়, তখন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তা সানন্দচিত্তে স্বীকার করে নেওয়া উচিত। এভাবে সে যে তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মূল্য উপলব্ধি করছে, এ কথা তাকে জানিয়ে দেবে। সাধারণত অহঙ্কারী ও স্বার্থান্ধ লোকেরা অন্যের অবদান ও উপকারের কথা সহজে স্বীকার করতে চায় না। তারা এটাকে নিজের জন্য অবমাননাকর মনে করে থাকে। এটা একটা অত্যন্ত গর্হিত চরিত্র। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে সাহাবীগণ (রা.) বলেন, কেউ যখন তাঁর খিদমাতে কিছু পেশ করতো, তিনি শুকরিয়ার সাথে তা গ্রহণ করতেন এবং কেউ তাঁর কোনো কাজ করে দিলে সে জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তিনি নিজেও লোকদেরকে অপরের উপকার সানন্দচিত্তে স্বীকার করে নেওয়ার এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন,
مَنْ أُوتِيَ إِلَيْهِ مَعْرُوفٌ فَوَجَدَ فَلْيُكَافِتْهُ وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَلْيُثْنِ بِهِ فَإِنْ مَنْ أَثْنَى بِهِ فَقَدْ شكَرَهُ وَمَنْ كَتَمَهُ فَقَدْ كَفَرَهُ.
যার প্রতি কোনো সদাচরণ করা হলো, যদি সে সদাচরণকারীকে কাছে পায়, তবে তার উচিত তাকে বিনিময় দান করা। যদি সে তাকে কাছে না পায়, তবে তার উচিত তার কাজের প্রশংসা করা। কেননা যে ব্যক্তি তার কাজের প্রশংসা করলো, প্রকারান্তরে সে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো, আর যে তা গোপন করলো, প্রকারান্তরে সে তার প্রতি অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিলো। ২৮৪
অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, لَا يَشْكُرُ اللهَ مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسِ. অর্থাৎ “যে ব্যক্তি মানুষের শুকর আদায় করে না, বস্তুতপক্ষে সে আল্লাহর শুকরও আদায় করে না।”২৮৫ তিনি আরো বলেন, إِنْ أَشْكَرَ النَّاسِ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَشْكُرُهُمْ لِلنَّاسِ.
“আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বড় শুকরগুযার বান্দাহ হলো, যে ব্যক্তি মানুষের কাজের সবচেয়ে বেশি শুকর আদায় করে।”২৮৬
টিকাঃ
২৮২. আল-কুরআন, ১৪ (সূরা ইব্রাহীম): ৭
২৮৩. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট মুফাসসির আল-বাগাভী (রাহ.) বলেন, نعمتي فآمنتم {لين شكرتم } وأطعتم { لأزيدنكم } في النعمة- "যদি তোমরা আমার নি'মাতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে ঈমান আনো এবং আনুগত্য করো, তবেই আমি তোমাদের নি'মাত আরো বাড়িয়ে দেবো।" (বাগাভী, মা'আলিমুত তানযীল, খ. ৪, পৃ. ৩৩৭)
২৮৪. বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আল-হিবাত), হা. নং: ১২৩৮৯; সুনানে আবী দাউদের (হা. নং: ৪৮১৫) মধ্যেও হাদীসটি কিছুটা শব্দগত পরিবর্তনসহ বর্ণিত রয়েছে।
২৮৫. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮১৩; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিরর্...), হা. নং: ১৯৫৪
২৮৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১৮৪৬; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৪২৫
📄 বিনয় ও নম্রতা
বিনয় ও নম্রতা চরিত্রের একটি মহৎ গুণ, যা মানুষের সৌন্দর্য ও সৌকর্যকে পূর্ণতা দান করে। ইসলামে বিনয় ও নম্রতার ধারণাকে দুভাগে আলোচনা করা যায়।
এক. আল্লাহর প্রতি বিনয়। এর অর্থ হলো- আল্লাহর ওপর ঈমান, তাঁর ইচ্ছার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তাঁর আদেশসমূহ যথাবিহিত বিনয় সহকারে পালন করা।
দুই. অন্যান্য মানুষের প্রতি বিনয় ও নম্রতা। এর অর্থ হলো- সকল মানুষের প্রতি ভদ্র আচরণ। সকল ধরনের গর্ব, অহঙ্কার, দাপাদাপি, আত্মপ্রদর্শন, অহমিকা ও অপরের ওপর কর্তৃত্ব দেখানোর প্রবণতা পরিহার করে নম্রতা অবলম্বন।
পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অজস্র জায়গায় বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের নির্দেশ ও এর বিভিন্ন রূপ ফাযীলাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, } { وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَن أَتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ - "আপনি আপনার অনুসারী মু'মিনদের প্রতি বিনম্র হন।”২৮৭ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেন,
إنَّ الله أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ.
"আল্লাহ তা'আলা আমার কাছে এ মর্মে নির্দেশ নাযিল করেছেন যে, তোমরা বিনম্র ও বিনয়ী হও, যাতে তোমাদের মধ্যে একজন অপরজনের ওপর গর্ব প্রকাশ না করে এবং একে অপরের ওপর চড়াও না হয়।"২৮৮
কোরআনের অন্য একটি আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, আপনার অন্তর যদি নরম না হতো, তা হলে লোকেরা কখনো আপনার কাছে ঘেঁষতো না। আর অন্তরের এ কোমলতা আল্লাহ
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِئْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ "আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের জন্য বিনম্র হয়েছেন। যদি আপনি বদমেজাজী ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে লোকেরা আপনার নিকট থেকে দূরে সরে যেতো। "২৮৯
এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, বিনয় ও নম্রতা মানুষকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং সাধারণ লোকদেরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে। বলাই বাহুল্য, ঈমানের স্বতঃস্ফূর্ত পরিণতিই হচ্ছে প্রেম-ভালোবাসা। আর প্রেম-ভালোবাসা ও কঠিন হৃদয় কখনো একত্রিত হতে পারে না। তাই একজন মু'মিন যখন প্রেম- ভালোবাসাপ্রবণ হয়, তখন স্বভাবতই সে নম্র স্বভাবের হয়। নতুবা তার ঈমানে কোনো কল্যাণ নেই। এ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু الْمُؤْمِنُ مُؤْلَفٌ وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلْفُ وَلَا يُؤْلَفُ. "মু'মিন হচ্ছে প্রেম-ভালোবাসার উজ্জ্বল প্রতীক। যে ব্যক্তি না কাউকে ভালোবাসে আর না তাকে কেউ ভালোবাসে, তার ভেতরে কোনো কল্যাণ নেই।”২৯০ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, .مَنْ يُحْرَمِ الرُّفْقَ يُحْرَمِ الْخَيْر كله
"যে ব্যক্তি নম্রতা থেকে বঞ্চিত, বস্তুতপক্ষে সে সর্বপ্রকারের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।”২৯১ তিনি আরো বলেন, .مَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ - "যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নম্রতা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তা'আলা তার সম্মান বাড়িয়ে দেবেন।”২৮২ একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنِّي لَا أَتَقَبَّلُ " - الصَّلَاةَ إِلَّا مِمَّنْ تَوَاضَعَ بِهَا لِعَظْمَتِي وَلَمْ يَسْتَطِلْ عَلَى خَلْقِي সব লোকের সালাতই কবূল করি, যারা আমার মর্যাদার সামনে বিনয়াবনত হয় এবং আমার সৃষ্টির সাথে রূঢ় বা অভদ্র আচরণ করে না, ...”২৯৩
বস্তুতপক্ষে একজন মুসলিম তার ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নম্রপ্রকৃতির হয়ে থাকে এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে তার দিলকে খুশি রাখা, তাকে কষ্ট পেতে না দেয়া এবং তার প্রতিটি ন্যায় সঙ্গত দাবি পূরণ করার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। এ বিষয়টিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিম্নোক্ত দৃষ্টান্ত দ্বারা তোলে ধরেছেন-
الْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ لَيِّنُونَ كَالْجَمَلِ الْأَنِفِ، إِنْ قِيدَ انْقَادَ، وَإِنْ أُنِيْخَ اسْتَنَاخَ عَلَى صخرة.
মু'মিন ব্যক্তি সেই উটের মতো সহজ-সরল ও নম্র হয়ে থাকে, যার নাকে পতর পরিহিত। তাকে টানলে সে চলে আসে আর বসাতে চাইলে পাথরের ওপরও বসে পড়ে। ২৯৪
পবিত্র কোরআন অত্যন্ত সংক্ষেপে এ বিষয়টি বর্ণনা করেছে- أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ “তারা মু'মিনদের প্রতি বিনম্র হবে।”২৯৫
টিকাঃ
২৮৭. আল কোরআন, সূরা আশ-শু'আরা', ২৬: ২১৫
২৮৮. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-জান্নাত....), হা. নং: ৭৩৮৯
২৮৯. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৫৯
২৯০. আহমাদ, আল-মুসনাد, হা. নং: ৯১৯৮, ২২৮৪০; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৫৭৪৪, ৮৯৭৬
২৯১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৬৩, ৬৭৬৪; আবূ দাউদ, আস- সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নংঃ ৪৮১১
২৯২. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৫৭
২৯৩. বাযযার, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৪৮২৩, ৪৮৫৫
২৯৪. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৭৭৭
২৯৫. আল কোরআন, সূরা আল-মা'য়িদাহ, ৫: ৫৪
📄 দয়া ও সহানুভূতি
দয়া ও সহানুভূতি অন্তরের নম্রতা ও কোমলতার একটি প্রতিফলিত রূপ। অর্থাৎ কোনো মানুষের অন্তর যদি নম্র ও কোমল হয়, তবে তার আচরণে তার ভাইয়ের জন্য গভীর ভালোবাসা, স্নেহ-প্রীতি, দয়া-দরদ ও ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। তার দ্বারা তার ভাইয়ের মনে অণু পরিমাণ কষ্ট বা আঘাত লাগবার কল্পনাও তার পক্ষে বেদনাদায়ক ব্যাপার। এ দয়া ও সহানুভূতির গুণই একদিকে মানুষকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং সাধারণ লোকদেরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে, অপরদিকে সে আল্লাহর দয়া ও রাহমাত লাভের উপযুক্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمُكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ.
যারা দয়া করে, পরম করুণাময় তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া করো, তবেই আসমানবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। ২৯৬
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার মানুষের প্রতি দয়া ও রাহম করে না, তার চেয়ে হতভাগ্য আর কেউ নয়। কারণ, দুনিয়া ও আখিরাতে সে আল্লাহর রাহমাত থেকে বঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাহদের প্রতি রাহম করে, তার জন্য আল্লাহর রাহমাতও অনিবার্য হয়ে যায়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, لَا تُنْزَعُ الرَّحْمَةُ إِلَّا مِنْ شقی-"হতভাগ্য ছাড়া অপর কারো থেকে রাহমাত ছিনিয়ে নেয়া হয় না।”২৯৭ কোরআন ও হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী সকল মানুষের প্রতি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল হওয়া কর্তব্য। তারপরও নিম্নোক্ত মানুষদের প্রতি বিশেষভাবে দয়া ও সহানুভূতি দেখাতে বলা হয়েছে-
এক. পিতামাতা। কোরআনের একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার 'ইবাদাতের পরই পিতামাতার প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
দুই. সন্তান-সন্ততি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আকরা' ইবনু হাবিস (রা.)কে তিরস্কার করেন, যখন তিনি জানতে পারেন যে, সে তার দশজন সন্তানের কাউকে কখনো আদর করে চুমো খায়নি। অধিকন্তু, তিনি বলেন যে, مَن لا يَرْحَمْ لا يُرْحَمْ-"যে মমত্ব প্রদর্শন করে না, সে আল্লাহর নিকট থেকেও মমত্ব লাভ করে না।"২৯৮
তিন. স্বামী-স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, خِيَارُكُمْ لِنسَائِهِمْ خُلُقًا-" তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম লোক হলো, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।"২৯৯ এখানে তিনি বিশেষভাবে স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহারের কথা বলেছেন।
চার. আত্মীয়-স্বজন। আল কোরআনের বহু আয়াতে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদাচরণ করতে বলা হয়েছে।
পাঁচ. ইয়াতীম। কোরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে তাদের প্রতি দরদী হতে বলা হয়েছে।
ছয়. অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি। বিভিন্ন হাদীসে অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নিতে এবং বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সাত. পরিচারক-পরিচারিকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের পরিচারক-পরিচারিকাদের প্রতি কর্কশ ও রূঢ় আচরণ করতে নিষেধ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিলো দয়া ও সহানুভূতির এক বাস্তব অত্যুজ্জ্বল আদর্শ। আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে সম্বোধন করে বলেছেন, ﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ﴾ “আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সমস্ত জগতের প্রতি রাহমাত হিসেবে।”৩০০ অন্য একটি আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রধান গুণরাজির মধ্যে দয়া ও রাহমাতকে একটি বিশিষ্ট গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ ﴾ “তিনি মু'মিনদের প্রতি অতীব দয়াশীল ও মেহেরবান।”৩০১ বস্তুতপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি কাজে যেমন মানুষের প্রতি তাঁর পরম দয়া ও সহানুভূতির প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি তাঁর প্রচারিত দাওয়াতও ছিল মানবজাতির জন্য এক অনুপম রাহমাত। কারণ,
এক. এটা মানুষকে ভ্রান্ত মতবাদের অনুসরণ থেকে মুক্ত করে আল্লাহর পথে পরিচালিত করে।
দুই. এটা সমাজের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষকে দুর্দশা থেকে মুক্ত করে।
তিন. এটা মানুষকে যুলম-নির্যাতন ও বে-ইনসাফী থেকে মুক্ত করে। বিশেষভাবে ধনী ও ক্ষমতাশীল লোকদের দ্বারা দরিদ্র ও দুর্বলদের ওপর শোষণ ও নিপীড়ন বন্ধ করে।
টিকাঃ
২৯৬. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯২৪; আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯৪৩
২৯৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ১৯২৩; আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯৪৪
২৯৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৬৫১; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ফাদা'য়িল), হা. নং: ৬১৭০
২৯৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আর-রিদা'), হা. নং: ১১৬২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আন-নিকাহ), হা. নং: ১৯৭৮
৩০০. আল কোরআন, সূরা আল-আম্বিয়া, ২১: ১০৭
৩০১. আল কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ১২৮
📄 অন্যের দোষ-ত্রুটি মার্জনা করা
মার্জনা অর্থ ক্ষমা করে দেয়া। এটি মানব চরিত্রের একটি অনুপম বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে মার্জনাকে মু'মিন জীবনের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের নিকট তাকওয়ার গুণাবলি তোলে ধরতে গিয়ে বলেন, ﴿وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ﴾ আর যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। "৩০২
এ বৈশিষ্ট্যটি অতি বড়ো সাহসের কাজ, এটা সহজে অর্জন করা যায় না। কারণ, কোনো মানুষ যখন কষ্ট পায় অথবা তার কোনো ক্ষতি সাধন হয়, তখন সর্বপ্রথম ক্রোধই তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করার প্রয়াস পায়। আর ক্রোধ যদি তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করতে পারে, তা হলে মার্জনা তো দূরের কথা, সে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে। এ কারণে এ গুণ অর্জন করতে হলে প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে নাফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। প্রকৃত দয়া ও নম্রতা যা মানুষের অন্তরে থাকে, আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যদি তার যথার্থ বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়, তবেই তা মানুষের আচরণকে মার্জিত করে। এ ধরনের মানুষই সবসময় তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা নিয়োজিত করে আল্লাহর ক্ষমাশীলতার সাথে সম্পৃক্ত হতে। ফলে তারা অন্যদের প্রতি সদয় ও ক্ষমাশীল হয়। পবিত্র কোরআনে এ গুণকে একটি সাহসিকতাপূর্ণ কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنْ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ - "যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরলো ও ক্ষমা করে দিলো, তার এ কাজ বিরাট সাহসিকতার পরিচায়ক।”৩০৩
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় মু'মিনদেরকে এ গুণ অর্জনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং এক জায়গায় তাদের সামনে এ যুক্তিও পেশ করা হয়েছে যে, প্রত্যেকেই যেন এ কথা মনে রাখে, সেও আল্লাহর নিকট ক্ষমার মুখাপেক্ষী। কাজেই তাকে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা পেতে হলে সে নিজেও যেন অন্যের ভুলত্রুটির প্রতি যৌক্তিকভাবে সুবিবেচক ও ক্ষমাশীল হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ - "তাদের ক্ষমা ও মার্জনার নীতি গ্রহণ করা উচিত। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ক্ষমা করে দিন। বস্তুত আল্লাহ তা'আলা মার্জনাকারী ও দয়া প্রদর্শনকারী।”৩০৪ একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ বাকর আস-সিদ্দীক (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, مِنْ عَبْدٍ ظُلِمَ بِمَظْلَمَةٍ فَيُغْضِي عَنْهَا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلٌ إِلَّا أَعَزَّ اللَّهُ بِهَا نَصْرَهُ - "কোনো বান্দাহর ওপর যদি কোনো অন্যায় আচরণ করা হয় এবং সে যদি তা আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করে দেয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে বিরাট সাহায্য করেন।”৩০৫ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, مَنِ اعْتَذَرَ إِلَى أَخِيهِ بِمَعْذِرَةٍ فَلَمْ - يَقْبَلْهَا مِنْهُ كَانَ عَلَيْهِ مِثْلُ خَطِيئَةِ صَاحِبِ الْمَكْسِ . নিজের অন্যায়ের জন্য কোনো ওযর পেশ করলো; কিন্তু সে তা কবুল করলো না, তার এতোখানি গুনাহ হলো যতোটা একজন (অবৈধ) শুল্ক আদায়কারীর হয়ে থাকে। "৩০৬
উল্লেখ্য যে, অন্যায়ের সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করা যেতে পারে; কিন্তু যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহর নিকট তার বিশাল প্রতিদান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَزَاء سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهُ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ - "আর অন্যায়ের বদলা সমান পরিমাণ প্রতিশোধ। কিন্তু যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দিলো এবং আপোষ-রফা করলো, তার প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে। তিনি যালিমদেরকে পছন্দ করেন না।”৩০৭
এখানে এ বিষয়টিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, ক্ষমা অবশ্যই একটি মহত্তম গুণ; কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তিবিশেষে ক্ষমা করলে তার অত্যাচার বেড়ে যাওয়ার কিংবা তার ধৃষ্টতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে তার ক্ষেত্রে ক্ষমা করার চাইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করাই শ্রেয় বিবেচিত হবে। তবে এ সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে সীমা লঙ্ঘন না হয়। কাযী আবূ বাকর ইবনুল 'আরাবী ও কুরতুবী (রাহ.) প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন, ক্ষমা ও প্রতিশোধ দুটিই অবস্থা ভেদে উত্তম। যে ব্যক্তি অনাচার করার পর লজ্জিত হয়, তাকে ক্ষমা করা উত্তম এবং যে ব্যক্তি স্বীয় জেদে ও অত্যাচারে অটল থাকে, তার ক্ষেত্রে প্রতিশোধ নেয়াই উত্তম। ৩০৮ এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট তাবি'ঈ ইব্রাহীম আন-নাখ'ঈ (রাহ.) বলেন, انهم كانوا يكرهون للمؤمنين أن يذلوا أنفسهم فيجترى عليهم الفساق - মনীষীগণ এটা অপছন্দ করতেন যে, মু'মিনগণ পাপাচারী লোকদের সামনে নিজেদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করবেন। ফলে তাদের ওপর পাপিষ্ঠদের ধৃষ্টতা আরও বেড়ে যাবে।”৩০৯
টিকাঃ
৩০২. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৩৪
৩০৩. আল কোরআন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৪৩
৩০৪. আল কোরআন, সূরা আন-নূর, ২৪: ২২
৩০৫. আহমাদ, আল-মুসনাদ, বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আশ-শাহাদাত), হা. নং: ২১৬২৬
৩০৬. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৩৭১৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৯৮১
৩০৭. আল কোরআন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৪০
৩০৮. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ১৬, পৃ. ৩৯
৩০৯. ফাররা', মা'আনিউল কোরআন, খ. ৪, পৃ. ১৪৪; কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ১৬, পৃ. ৩৯; যামাখশারী, আল-কাশশাফ, খ. ৪, পৃ. ২৩৩