📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 সাবর বা ধৈর্য

📄 সাবর বা ধৈর্য


'সাবর' শব্দের বাংলায় অনুবাদ করা হয় ধৈর্য। তবে ধৈর্য শব্দ দ্বারা 'সাবর' শব্দের পুরো অর্থ প্রকাশিত হয় না। ইসলামে 'সাবর' বলতে সাধারণভাবে ধৈর্যের চাইতে অনেক বৃহত্তর ধারণা প্রকাশিত হয়। কেননা ধৈর্য বলতে সাধারণত ভাগ্যের প্রতি নেতিবাচক, নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণ বা অনুমোদনের ধারণা প্রকাশিত হয়। আর ইসলামে 'সাবর' কোনো নেতিবাচক গুণ নয়; এটা সক্রিয় ও গতিশীল গুণ। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে সর্বমুহূর্তে ও সর্বপরিস্থিতিতে সাবরের অনুশীলনের নির্দেশ দিয়েছে। এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে সব ধরনের সাফল্য লাভের চাবিকাঠি। এটা যেমন নাফসের স্বভাবগত কামনা-বাসনার মোকাবেলায় দীন ও শারী'আতের আনুগত্যের ওপর অটল থাকতে উৎসাহিত করে, তেমনি এ পথে আপতিত কষ্ট-যাতনা-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়ে যেতে উৎসাহিত করে। ইসলামে সাবর এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, এক হাদীসে একে نصْفُ الْإِيمَانِ অর্থাৎ ঈমানের অর্ধেক ২৭৪ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, সাবর মানুষের মধ্যে এমন বহু আত্মিক ও নৈতিক গুণের বিকাশ সাধন করে, যা ছাড়া ঈমানের দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। যেমন-
* সাবর মানুষকে আল্লাহর নি'মাতের শুকর আদায় করতে শিক্ষা দেয়।
* সাবর মানুষের মধ্যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আস্থা ও নির্ভরতা বাড়ায়।
* সাবর মানুষকে আল্লাহর পথে জিহাদে অবিচল রাখে।
* সাবর মানুষকে সর্বাবস্থায় আল্লাহর 'ইবাদাত ও আনুগত্যে অটল রাখে।
* সাবর মানুষকে দয়ালু, সহানুভূতিপ্রবণ ও ক্ষমাশীল করে।
'সাবর' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- الْإمْسَاكُ فِيْ ضِيْقٍ অর্থাৎ সংকীর্ণ অবস্থায় বেঁধে রাখা। যেমন' বলা হয় صبرت الدابة অর্থাৎ আমি প্রাণীটিকে আহার্য ছাড়াই বেঁধে রাখলাম। ২৭৫ পরিভাষায় 'সাবর' বলা হয়, নাফসকে তার যাবতীয় অবাঞ্ছিত কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখা এবং সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল-অবিচল থাকা এবং এ পথে যে সব কষ্ট-যাতনা ও বাধা-বিপত্তি আসবে তা স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে মেনে নেয়া। রাগিব আল-ইস্পাহানী [মৃ. ৫০২ হি.] (রাহ.) বলেন, الصَّبْرُ حَبْسُ النَّفْسِ عَلَى مَا يَقْتَضِيْهِ الْعَقْلُ وَالشَّرْعُ أَوْ عَمَّا يَقْتَضِيَانِ حَبْسُهَا "সাবর হলো বিবেক-বুদ্ধি কিংবা শারী'আত অথবা দুটির দাবি অনুযায়ী নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করা।”২৭৬ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম [৬৯১-৭৫১ হি.] (রাহ.)
هُوَ حَبْسُ النَّفْسُ عَنِ الْجَزْعِ وَالتَّسَخْطِ، وَحَبْسُ اللِّسَانِ عَنِ الشَّكْوَى، .وَحَبْسُ الْجَوَارِحِ عَنِ التَّسْوِيْشِ - "সাবর হলো নাফসকে অস্থিরতা ও অসন্তুষ্টি থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে বিরত রাখা। "২৭৭
বিশিষ্ট 'আলিমগণ সাবরকে বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত করেছেন। তবে সবক'টি প্রকারকে বিশ্লেষণ করলে এগুলো তিনটি ভাগে এসে মিলিত হয়। এ তিনটি ভাগ হলো-
এক. আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ )الصبر على الطاعات(
দুই. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ )الصبر عن المعاصي(
তিন. বিপদাপদের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ )الصبر على المصائب( !
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এ দুনিয়া মু'মিনদের জন্য বিরাট পরীক্ষাগার। এখানে তাদেরকে নানা দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন করা হয়। তাঁদের মধ্যে যে যতো বেশি সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে চাইবে, সে ততো বেশি দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন হবে। কাজেই প্রত্যেক মু'মিনকে জীবনের সকল অবস্থায় ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, সকল পরিস্থিতিতেই যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে হবে এবং আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَوَّلُ مَنْ يُدْعَى إِلَى الْجَنَّةِ الَّذِينَ-يَحْمَدُونَ اللهُ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاء.
"জান্নাতের দিকে সর্বপ্রথম আমন্ত্রণ জানানো হবে সে সব লোককে, যারা সুখ-দুঃখ নির্বিশেষে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে।"২৭৮ এ জন্য পবিত্র কোরআন ও হাদীসে প্রত্যেক মু'মিনকেই ধৈর্যগুণ অর্জন ও বৃদ্ধির জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২৭৯ ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলো চর্চা করা হলে আমাদের ধৈর্যগুণ বাড়তে পারে-
এক. সমগ্র জাহানের মালিক, নিয়ন্ত্রক ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থাকে বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ক্ষমতার আওতার বাইরে কেউ নেই।
দুই. অন্তরে এই বিশ্বাস সব সময় বদ্ধমূল রাখতে হবে যে, আমাদের জান-মাল আসলে আল্লাহ তা'আলার। কাজেই তিনি যে কোনো মুহূর্তে চাইলে তা নিয়ে নিতে পারেন।
তিন. জগতে যা কিছু ঘটবে তা পৃথিবী সৃষ্টির আগেই আল্লাহ কর্তৃক পরিকল্পিত। কাজেই গোটা জগতও যদি কারো ক্ষতি বা কল্যাণ করার জন্য একত্রিত হয়, তবু তারা ব্যর্থ হবে, যদি তাতে আল্লাহর অনুমোদন না থাকে।
চার. এটাও মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়ার বিপদগুলো গুনাহ মাফের বা তার সাজা দুনিয়াতে শেষ করার উসিলা হতে পারে। কাজেই বিপদে ধৈর্যশীল হতে হবে।
পাঁচ. যে কোনো বিপর্যয়ের মুখে আল্লাহর কাছে নত হয়ে শুধুমাত্র তাঁর কাছেই বিপদ উত্তরণের জন্য সাহায্য চাইতে হবে।
ছয়. দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধারের পথ প্রশস্ত দেখে এবং সাফল্যের সুযোগ-সুবিধা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে প্রবঞ্চিত না হওয়া। মনে করতে হবে যে, এগুলো পরীক্ষার উপকরণ ও অবকাশ প্রদানও হতে পারে।

টিকাঃ
২৭৪. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আত-তাফসীর), হা. নং: ৩৬৬৬ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হাকিম বলেন, এ হাদীসের সনদ সাহীহ। হাফিয যাহাবী (রাহ.) ও একে সাহীহ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশিষ্ট হাদীসবিশারদ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি মারফু অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীসরূপে দা'ঈফ; তবে মাওকূফ হাদীস (অর্থাৎ সাহাবীর উক্তি) রূপে বিশুদ্ধ। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ৩, পৃ. ১৭৮, হা. নং: ৩৩৯৭)
২৭৫. রাগিব ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাতু..., পৃ. ২৭৩
২৭৬. রাগিব ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাতু..., পৃ. ২৭৩
২৭৭. ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন, খ. ২, পৃ. ১৫৬
২৭৮. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আদ-দু'আ...), হা. নং: ১৮৫১; তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ২৮৮
২৭৯. দ্র. আল কোরআন, ২:৪৫, ১৫৩, ১৫৫-৭; ৩:২০০; ৮:৪৬; ....

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 শুকর (কৃতজ্ঞতা) জ্ঞাপন করা

📄 শুকর (কৃতজ্ঞতা) জ্ঞাপন করা


আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এ পৃথিবীতে সুন্দর দেহ, স্বাস্থ্য, কর্মদক্ষতা, ধন- সম্পদ ও মান-সম্মানসহ অসংখ্য নি'মাত দিয়েছেন। তবে বান্দাহর ওপর আল্লাহর সবচাইতে বড় নি'মাত হলো ঈমান ও ইসলাম। তদুপরি একজন মু'মিন বিশ্বাস পোষণ করে যে, তার জীবনের সমুদয় কল্যাণ আল্লাহ তা'আলার অসীম করুণা থেকে নিঃসৃত। কাজেই একজন মু'মিনের ওপর তার ঈমানের একান্ত দাবি হলো- সর্বপরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলার এ নি'মাতসমূহের শুকর আদায় করা।
আল্লাহ তা'আলার নি'মাতসমূহের কৃতজ্ঞতা জানানোর একটি উপায় হলো- মানুষ তার মুখের কথার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, তাঁর প্রশংসা করবে; তবে এ ক্ষেত্রে একজন মু'মিনের নিকট শারী'আতের বড় কামনা হলো- সে তাঁর প্রদত্ত নি'মাতসমূহের হক আদায় করবে, এ নি'মাতসমূহ কখনোই তাঁর অবাধ্যতায় ও অবৈধ কাজে ব্যয় করবে না এবং সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, অভাবে ও প্রাচুর্যে তথা সর্বপরিস্থিতিতে এগুলোকে তাঁর 'ইবাদাত ও আনুগত্যের মধ্যে নিয়োজিত রাখবে। বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) গভর্নর আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.)-এর নিকট পত্র লিখেন,
اقنع برزقك من الدنيا، فإن الرحمن فضل بعض عباده على بعض في الرزق، بل يبتلي به كلا فيبتلي من بسط له، كيف شكره الله وأداؤه الحق الذي افترض عليه فيما رزقه وخوله؟
দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্ত রিযকের (কম হোক বা বেশি) ওপর সন্তুষ্ট থাকো। কেননা পরম করুণাময় তাঁর বান্দাদের মধ্যে একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। উপরন্তু, তিনি এ রিযকের মাধ্যমে তাদেরকে পরীক্ষায় নিমজ্জিত করেন। কাজেই আল্লাহ তা'আলা যাকে প্রচুর সহায়-সম্পদ দান করেছেন, তাকে পরীক্ষা করে দেখতে চান যে, সে কীভাবে আল্লাহর শুকর জ্ঞাপন করে এবং তাঁর প্রদত্ত রিযক ও শক্তি-সামর্থ্যের অত্যাবশ্যকভাবে পালনীয় হক কিভাবে আদায় করে? ২৮০
এ রিওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর নি'মাতের শুকর আদায় করার সর্বोत्कृष्ट উপায় হলো- তাঁর প্রদত্ত প্রতিটি বিষয়ের হক যথার্থ ও সুচারুরূপে আদায় করা। যেমন- আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদের শুকর আদায় করার যথার্থ উপায় হলো- আল্লাহর রাস্তায় কেবল তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তা ব্যয় করা। অনুরূপভাবে আল্লাহ প্রদত্ত 'ইলমের শুকর আদায় করার উপায় হলো- তদনুসারে 'আমাল করা এবং তা প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২৮১ এ ধরনের শুক্রে যেমন আল্লাহ তা'আলার প্রতি তার যথার্থ কৃতজ্ঞতা বোধের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি তা তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে এবং জীবনকে সমৃদ্ধ ও বারকাতময় করতে যথার্থ ভূমিকা রাখে। বলাই বাহুল্য, যে ব্যক্তি উপর্যুক্ত পদ্ধতিতে ঐকান্তিকতা সহকারে আল্লাহ তা'আলার নি'মাতসমূহের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, তার পক্ষে আল্লাহ তা'আলার কোনো আদেশ বা নিষেধ লঙ্ঘন করা সম্ভব নয়। কাজেই এরূপ ব্যক্তির আত্মা পরিশুদ্ধ এবং চরিত্র ও জীবন সুন্দর হয়। উপরন্তু, আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর নি'মাত আরো অধিকহারে দান করেন। তিনি বলেন, لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ “যদি তোমরা শুকর করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের নি'মাত বাড়িয়ে দেবো। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।"২৮২ এর মানে হলো- যদি তোমরা আমার নি'মাতসমূহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো অর্থাৎ সেগুলোকে আমার অবাধ্যতায় ও অবৈধ কাজে ব্যয় না করো এবং নিজেদের কার্যকলাপকে আমার মর্জির অনুগামী করার চেষ্টা করো, তবেই আমি এ সব নি'মাত আরো বাড়িয়ে দেবো। ২৮৩ পক্ষান্তরে যদি তোমরা আমার নি'মাতসমূহের না-শুকরী করো, তবে আমার শাস্তিও হবে ভয়ঙ্কর। আল্লাহর না- শুকরী করার মর্ম হলো- আল্লাহর নি'মাতকে তাঁর অবাধ্যতায় এবং অবৈধ কাজে ব্যয় করা অথবা তাঁর ফারয ও ওয়াজিব পালনে অবহেলা করা। অকৃতজ্ঞতার কঠোর শাস্তিস্বরূপ দুনিয়াতেও নি'মাত ছিনিয়ে নেয়া যেতে পারে অথবা এমন বিপদ আসতে পারে যে, নি'মাত ভোগ করা সম্ভবপর না হয় এবং পরকালেও আযাবে গ্রেফতার হতে পারে।

টিকাঃ
২৮০. ইবনু আবী হাতিম, আত-তাফসীর, রি.নং: ১৩৪৪৩; ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৪, পৃ. ৫৮৬
২৮১. মুহাম্মাদ 'আলী আল-বাকরী, দালীলুল ফালিহীন..., খ. ৪, পৃ. ৪৮৬; ইসমা'ঈল হাক্কী, রূহুল বায়ান, খ. ২, পৃ. ১৬৫

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 অন্যের উপকার ও অবদান স্বীকার করা

📄 অন্যের উপকার ও অবদান স্বীকার করা


আল্লাহ তাআলার নি'মাতের শুকর আদায় করার পাশাপাশি মানুষের উপকার স্বীকার করা এবং তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করাও প্রয়োজন। কৃতজ্ঞ মানুষকে আল্লাহ তা'আলা যেমন ভালোবাসেন, তেমনি মানুষও কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য আরও কিছু করার আগ্রহ পোষণ করে থাকে。
উল্লেখ যে, অপরের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার উপলব্ধিকে প্রকাশ করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ একটি উত্তম ব্যবস্থা। কেননা, যখন কোনো ব্যক্তি বোঝতে পারে যে, তার ভাই তার কৃত কার্যাবলির গুরুত্ব ও মূল্য যথাযথ উপলব্ধি করছে, তখন ভাইয়ের প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে ভালোবাসা পোষণকারী ব্যক্তি যদি বোঝতে পারে যে, তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই, তবে তার হৃদয়াবেগ স্বভাবতই নিষ্প্রভ হতে থাকবে। এ কারণেই এক ব্যক্তি যখন অন্য ব্যক্তিকে সাহায্য করে বা তার সাথে কোনো সদাচরণ করে বা তাকে কোনো ভালো কথা বলে অথবা তাকে কোনো হাদিয়া দেয়, তখন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তা সানন্দচিত্তে স্বীকার করে নেওয়া উচিত। এভাবে সে যে তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মূল্য উপলব্ধি করছে, এ কথা তাকে জানিয়ে দেবে। সাধারণত অহঙ্কারী ও স্বার্থান্ধ লোকেরা অন্যের অবদান ও উপকারের কথা সহজে স্বীকার করতে চায় না। তারা এটাকে নিজের জন্য অবমাননাকর মনে করে থাকে। এটা একটা অত্যন্ত গর্হিত চরিত্র। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে সাহাবীগণ (রা.) বলেন, কেউ যখন তাঁর খিদমাতে কিছু পেশ করতো, তিনি শুকরিয়ার সাথে তা গ্রহণ করতেন এবং কেউ তাঁর কোনো কাজ করে দিলে সে জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তিনি নিজেও লোকদেরকে অপরের উপকার সানন্দচিত্তে স্বীকার করে নেওয়ার এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন,
مَنْ أُوتِيَ إِلَيْهِ مَعْرُوفٌ فَوَجَدَ فَلْيُكَافِتْهُ وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَلْيُثْنِ بِهِ فَإِنْ مَنْ أَثْنَى بِهِ فَقَدْ شكَرَهُ وَمَنْ كَتَمَهُ فَقَدْ كَفَرَهُ.
যার প্রতি কোনো সদাচরণ করা হলো, যদি সে সদাচরণকারীকে কাছে পায়, তবে তার উচিত তাকে বিনিময় দান করা। যদি সে তাকে কাছে না পায়, তবে তার উচিত তার কাজের প্রশংসা করা। কেননা যে ব্যক্তি তার কাজের প্রশংসা করলো, প্রকারান্তরে সে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো, আর যে তা গোপন করলো, প্রকারান্তরে সে তার প্রতি অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিলো। ২৮৪
অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, لَا يَشْكُرُ اللهَ مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسِ. অর্থাৎ “যে ব্যক্তি মানুষের শুকর আদায় করে না, বস্তুতপক্ষে সে আল্লাহর শুকরও আদায় করে না।”২৮৫ তিনি আরো বলেন, إِنْ أَشْكَرَ النَّاسِ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَشْكُرُهُمْ لِلنَّاسِ.
“আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বড় শুকরগুযার বান্দাহ হলো, যে ব্যক্তি মানুষের কাজের সবচেয়ে বেশি শুকর আদায় করে।”২৮৬

টিকাঃ
২৮২. আল-কুরআন, ১৪ (সূরা ইব্রাহীম): ৭
২৮৩. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট মুফাসসির আল-বাগাভী (রাহ.) বলেন, نعمتي فآمنتم {لين شكرتم } وأطعتم { لأزيدنكم } في النعمة- "যদি তোমরা আমার নি'মাতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে ঈমান আনো এবং আনুগত্য করো, তবেই আমি তোমাদের নি'মাত আরো বাড়িয়ে দেবো।" (বাগাভী, মা'আলিমুত তানযীল, খ. ৪, পৃ. ৩৩৭)
২৮৪. বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আল-হিবাত), হা. নং: ১২৩৮৯; সুনানে আবী দাউদের (হা. নং: ৪৮১৫) মধ্যেও হাদীসটি কিছুটা শব্দগত পরিবর্তনসহ বর্ণিত রয়েছে।
২৮৫. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮১৩; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিরর্...), হা. নং: ১৯৫৪
২৮৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১৮৪৬; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৪২৫

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 বিনয় ও নম্রতা

📄 বিনয় ও নম্রতা


বিনয় ও নম্রতা চরিত্রের একটি মহৎ গুণ, যা মানুষের সৌন্দর্য ও সৌকর্যকে পূর্ণতা দান করে। ইসলামে বিনয় ও নম্রতার ধারণাকে দুভাগে আলোচনা করা যায়।
এক. আল্লাহর প্রতি বিনয়। এর অর্থ হলো- আল্লাহর ওপর ঈমান, তাঁর ইচ্ছার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তাঁর আদেশসমূহ যথাবিহিত বিনয় সহকারে পালন করা।
দুই. অন্যান্য মানুষের প্রতি বিনয় ও নম্রতা। এর অর্থ হলো- সকল মানুষের প্রতি ভদ্র আচরণ। সকল ধরনের গর্ব, অহঙ্কার, দাপাদাপি, আত্মপ্রদর্শন, অহমিকা ও অপরের ওপর কর্তৃত্ব দেখানোর প্রবণতা পরিহার করে নম্রতা অবলম্বন।
পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অজস্র জায়গায় বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের নির্দেশ ও এর বিভিন্ন রূপ ফাযীলাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, } { وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَن أَتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ - "আপনি আপনার অনুসারী মু'মিনদের প্রতি বিনম্র হন।”২৮৭ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেন,
إنَّ الله أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ.
"আল্লাহ তা'আলা আমার কাছে এ মর্মে নির্দেশ নাযিল করেছেন যে, তোমরা বিনম্র ও বিনয়ী হও, যাতে তোমাদের মধ্যে একজন অপরজনের ওপর গর্ব প্রকাশ না করে এবং একে অপরের ওপর চড়াও না হয়।"২৮৮
কোরআনের অন্য একটি আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, আপনার অন্তর যদি নরম না হতো, তা হলে লোকেরা কখনো আপনার কাছে ঘেঁষতো না। আর অন্তরের এ কোমলতা আল্লাহ
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِئْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ "আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের জন্য বিনম্র হয়েছেন। যদি আপনি বদমেজাজী ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে লোকেরা আপনার নিকট থেকে দূরে সরে যেতো। "২৮৯
এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, বিনয় ও নম্রতা মানুষকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং সাধারণ লোকদেরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে। বলাই বাহুল্য, ঈমানের স্বতঃস্ফূর্ত পরিণতিই হচ্ছে প্রেম-ভালোবাসা। আর প্রেম-ভালোবাসা ও কঠিন হৃদয় কখনো একত্রিত হতে পারে না। তাই একজন মু'মিন যখন প্রেম- ভালোবাসাপ্রবণ হয়, তখন স্বভাবতই সে নম্র স্বভাবের হয়। নতুবা তার ঈমানে কোনো কল্যাণ নেই। এ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু الْمُؤْمِنُ مُؤْلَفٌ وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلْفُ وَلَا يُؤْلَفُ. "মু'মিন হচ্ছে প্রেম-ভালোবাসার উজ্জ্বল প্রতীক। যে ব্যক্তি না কাউকে ভালোবাসে আর না তাকে কেউ ভালোবাসে, তার ভেতরে কোনো কল্যাণ নেই।”২৯০ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, .مَنْ يُحْرَمِ الرُّفْقَ يُحْرَمِ الْخَيْر كله
"যে ব্যক্তি নম্রতা থেকে বঞ্চিত, বস্তুতপক্ষে সে সর্বপ্রকারের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।”২৯১ তিনি আরো বলেন, .مَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ - "যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নম্রতা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তা'আলা তার সম্মান বাড়িয়ে দেবেন।”২৮২ একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنِّي لَا أَتَقَبَّلُ " - الصَّلَاةَ إِلَّا مِمَّنْ تَوَاضَعَ بِهَا لِعَظْمَتِي وَلَمْ يَسْتَطِلْ عَلَى خَلْقِي সব লোকের সালাতই কবূল করি, যারা আমার মর্যাদার সামনে বিনয়াবনত হয় এবং আমার সৃষ্টির সাথে রূঢ় বা অভদ্র আচরণ করে না, ...”২৯৩
বস্তুতপক্ষে একজন মুসলিম তার ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নম্রপ্রকৃতির হয়ে থাকে এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে তার দিলকে খুশি রাখা, তাকে কষ্ট পেতে না দেয়া এবং তার প্রতিটি ন্যায় সঙ্গত দাবি পূরণ করার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। এ বিষয়টিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিম্নোক্ত দৃষ্টান্ত দ্বারা তোলে ধরেছেন-
الْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ لَيِّنُونَ كَالْجَمَلِ الْأَنِفِ، إِنْ قِيدَ انْقَادَ، وَإِنْ أُنِيْخَ اسْتَنَاخَ عَلَى صخرة.
মু'মিন ব্যক্তি সেই উটের মতো সহজ-সরল ও নম্র হয়ে থাকে, যার নাকে পতর পরিহিত। তাকে টানলে সে চলে আসে আর বসাতে চাইলে পাথরের ওপরও বসে পড়ে। ২৯৪
পবিত্র কোরআন অত্যন্ত সংক্ষেপে এ বিষয়টি বর্ণনা করেছে- أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ “তারা মু'মিনদের প্রতি বিনম্র হবে।”২৯৫

টিকাঃ
২৮৭. আল কোরআন, সূরা আশ-শু'আরা', ২৬: ২১৫
২৮৮. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-জান্নাত....), হা. নং: ৭৩৮৯
২৮৯. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১৫৯
২৯০. আহমাদ, আল-মুসনাد, হা. নং: ৯১৯৮, ২২৮৪০; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৫৭৪৪, ৮৯৭৬
২৯১. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৬৩, ৬৭৬৪; আবূ দাউদ, আস- সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নংঃ ৪৮১১
২৯২. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭৫৭
২৯৩. বাযযার, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৪৮২৩, ৪৮৫৫
২৯৪. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), হা. নং: ৭৭৭৭
২৯৫. আল কোরআন, সূরা আল-মা'য়িদাহ, ৫: ৫৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00