📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 দৈহিক সততা

📄 দৈহিক সততা


নৈতিক সততা মানে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সততা অবলম্বনকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা। একজন লোকের মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, চেষ্টা-সাধনা, স্বভাব-চরিত্র, উদ্দেশ্য-আদর্শ, ধৈর্য-সহনশীলতা, রাগ-বিরাগ, ইচ্ছা-আকাঙ্খা, পছন্দ-অপছন্দ ও আচার-আচরণ ইত্যাদি একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নৈতিক সততার সাথে অতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। যেমন- মিথ্যা ও কপটতার আশ্রয় না নেয়ার বা সত্যের সাক্ষ্য দেয়ার মানসিক প্রস্তুতি কতোটা আছে, সৌন্দর্য চর্চার স্পৃহা কতোখানি প্রবল, ন্যায় প্রতিষ্ঠা বা অন্যায়কে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ দৃঢ়তা বিদ্যমান ইত্যাদি নীতি-নির্ধারণী বিষয়গুলোর মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তির নৈতিক সততা বিচার করা হয়। পবিত্র কোরআনে প্রত্যেক ঈমানদারকে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা জয় করে ন্যায়নীতির ওপর অটল থাকতে এবং সত্যের সাক্ষ্য দান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতামাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। ২৭১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সততার বিমূর্ত প্রতীক।
সততার বিমূর্ত প্রতীক ছিলেন প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। শৈশব থেকেই তিনি সত্যবাদী ও ন্যায়নিষ্ঠ ছিলেন। কথার সততায় তাঁকে ঘোর শত্রুও মুখে 'সত্যবাদী' বলে ডাকতো। রোম সম্রাটের দরবারে আবূ সুফইয়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নুবুওয়াত পাওয়ার পূর্বে কখনো মিথ্যা কথা বলতেন কি-না? আবূ সুফইয়ান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জবাব দিলেন, না, কখনো না।২৭২ আল্লাহর প্রতি নিখাদ বিশ্বাস ও অবিচল আত্মসমর্পণ তাঁকে করেছিল অপার্থিব বলে বলীয়ান। তাই ইসলামের দুশমনদের হাতে মর্মন্তদভাবে নির্যাতিত হবার পরেও এক মুহূর্তের জন্য সরে দাঁড়াননি সত্য পথ থেকে। কারণ, সত্য বলা, সত্য মানা আর সত্যের ওপর অবিচল থাকাই তো অনুপম আদর্শের প্রাণশক্তি। আর তিনি ছিলেন সে আদর্শেরই প্রতিবিম্ব।
একবার দীনের এক চরম শত্রুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে ছিল অতি ধূর্ত। কৌশলে সে নাবীজী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে পৌঁছে তাঁর কাছে সবিনয়ে ক্ষমা চাইলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে মাফ করে দিলেন। অথচ তাঁর অপরাধ ছিল ক্ষমার অযোগ্য। তাই সে চলে গেলে নাবীজী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে যখন আমার সাথে কথা বলছিল, তোমাদের কেউ তার মস্তকটা উড়িয়ে দিতে পারলে না? সাহাবীগণ (রা.) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি চোখে একটু ইশারা করলেই তো পারতেন! নাবীজী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, إِنَّهُ لَا يَنْبَغِي لِنَبِيٍّ أَنْ تَكُونَ لَهُ خَائِنَةُ الْأَعْيُنِ -" না, নাবীর চোখ খিয়ানাত করতে পারে না।”২৭৩ কতো কঠিন সততা! জাত শত্রুর বিরুদ্ধে একটু অগোচরে চোখের পাতা নাড়াবেন, তাও পারছেন না। কারণ, তিনি তো মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যপরায়ণ। তিনি মুখে ও মনে যাকে ক্ষমা করতে যাচ্ছেন, চোখের কোণে আবার বিরোধিতা করবেন কী করে!

টিকাঃ
২৭১. আল কোরআন, সূরা আন-নিসা', ৪ : ১৩৫
২৭২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৭
২৭৩. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-হুদূদ), হা. নং: ৪৩৫৯। শাইখ আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানি আবী দাউদ, খ. ৯, পৃ. ৩৫৯)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00