📄 ইখলাস
মানুষ পার্থিব স্বার্থ লাভ কিংবা প্রশংসা ও সুনাম অর্জন বা নিন্দার ভয়েও অনেক 'আমাল করে থাকে। অন্তরকে এ সব উদ্দেশ্য থেকে পবিত্র ও মুক্ত করে কেবল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই 'আমাল করাকে ইখলাস বলা হয়। ২৫৩
এক কথায় 'ইখলাস' বলতে নিয়্যাতের বিশুদ্ধতা ও পবিত্রতাকে বোঝানো হয়。
ইসলামের পরিভাষায় 'ইখলাস'-এর বিপরীত শব্দ হলো 'রিয়া'। এর অর্থ হলো- আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য ছাড়া পার্থিব স্বার্থ লাভ কিংবা সুনাম ও প্রশংসা অর্জন প্রভৃতি উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা। 'রিয়া' ভালো কাজকেও বাতিল ও নিষ্ফল করে দেয়। এর ফলে মানুষ তার কাজের কোনো ভালো পুরষ্কার আশা তো করতেই পারে না; বরং, তার এরূপ উদ্দেশ্যের জন্য সাজাও হতে পারে। ২৫৪ আমরা এ সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ।
উল্লেখ্য যে, প্রত্যেকটি 'আমালের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো- যাহিরী অর্থাৎ বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, অপরটি হলো- বাতিনী অর্থাৎ নিয়্যাতের বিশুদ্ধতা ও পবিত্রতা। 'আমালের যাহিরী দিককে যেমন শারী'আতের বিধান অনুযায়ী সংশোধন করা কর্তব্য, তেমনি বাতিনী দিককেও সংশোধন করা অবশ্য কর্তব্য। ইখলাস বা নিয়্যাতের বিশুদ্ধতা ও পবিত্রতা ব্যতীত শুধু বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান পালন যথেষ্ট নয়। ২৫৫ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِامْرِئٍ مَا نَوَى فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ لِدُنْيَا يُصِيبُهَا أَوِ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ.
'আমালসমূহ (অর্থাৎ এগুলোর ফলাফল কিংবা বিশুদ্ধতা) একান্তই নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকে কেবল তার নিয়্যাত অনুযায়ীই ফলাফল ভোগ করবে। সুতরাং যে ব্যক্তির হিজরাত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরাত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই বিবেচিত হবে। পক্ষান্তরে যার হিজরাত দুনিয়া উপার্জনের উদ্দেশ্যে হবে অথবা কোনো মহিলাকে বিবাহের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরাত নিয়্যাত মুতাবিকই বিবেচিত হবে। ২৫৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বিশিষ্ট সাহাবী মু'আয ইবনু জাবাল (রা.)কে ইয়ামানের কাযী করে প্রেরণ করার সময় উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন, أَخْلِصِ دِيْنَكَ يَكْفِكَ الْعَمَلُ الْقَلِيلُ "তোমার দীনকে খাঁটি করো (অর্থাৎ খাঁটি নিয়্যাতে দীনের বিধি-বিধানসমূহ পালন করো), তবে অল্প 'আমালই তোমার (নাজাতের) জন্য যথেষ্ট হবে।” ২৫৭
উপর্যুক্ত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে, একজন মু'মিনের নিকট তাঁর ঈমানের দাবি হলো, তার জীবনের প্রতিটি কাজের পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য থাকতে হবে এবং নিয়্যাতের বিশুদ্ধতার মাধ্যমে তার সকল কাজই - ছোট হোক বা বড়- আল্লাহর 'ইবাদাতে পরিণত হবে। এমনকি নিয়্যাতের বিশুদ্ধতার কারণে অনেক ছোট ও অল্প 'আমালও বড় উপকার ও কল্যাণে আসতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক [১১৮-১৮১হি.] (রাহ.) বলেন, رب عمل صغير تعظمه النية ورب عمل كبير تصغره النية - “অনেক ছোট ছোট ‘আমাল নিয়্যাতের কারণে বিশাল মর্যাদার অধিকারী হয়। পক্ষান্তরে অনেক বড় বড় ‘আমাল নিয়্যাতের কারণে তুচ্ছ ‘আমালে পরিণত হয়।”২৫৮
উল্লেখ্য যে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সকল কাজই আল্লাহর ‘ইবাদাতে পরিণত হতে পারে, যদি তা সঠিক পন্থায় পালন করা হয় এবং তার পেছনে সৎ উদ্দেশ্য থাকে। যেমন- কেউ খাবার খাচ্ছে, সে যদি এ নিয়্যাতে খায় যে, সে তার শরীর-স্বাস্থ্যকে উন্নত করে তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর মিশন বাস্ত বায়নে নিয়োজিত করবে, তবে তার এ খাবারও ‘ইবাদাতে পরিণত হয়। পক্ষান্ত রে কোনো ব্যক্তি যদি বড় বড় ‘আমালও করে; কিন্তু তার নিয়্যাত যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে তার সে ‘আমালগুলো সম্পূর্ণ বিফলে যাবে। বলা হয় যে, ‘আমাল হলো ঈমানের ফসল, আর ইখলাস হলো তার পানি। ২৫৯ কাজেই পানির অভাবে যেমন ফসল শুকিয়ে মারা যায়, তেমনি ইখলাসের অভাবে ‘আমালও নষ্ট হয়ে যায়।
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ “তাঁদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছে যে, তারা পূর্ণ অনুরাগ নিয়ে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ‘ইবাদাত করবে।”২৬০ অর্থাৎ তারা যেন এমন খাঁটি অন্তরে আল্লাহর ‘ইবাদাত করে, যাতে সেখানে অন্য কারো অংশিদারিত্ব না থাকে, এমনকি তা যেন গোপন শিরক যেমন- লোক দেখানো ও নাম-যশ লাভের মতো অবাঞ্ছিত উদ্দেশ্য থেকেও পবিত্র হয়। আবূ সুমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, হাওয়ারীগণ সাইয়িদুনা ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ما الإخلاص لِلَّهِ ؟ -"আল্লাহর প্রতি ইখলাসের অর্থ কি?" তিনি জবাব দিলেন, أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ الْعَمَلَ لا يُحِبُّ أَنْ يَحْمَدَهُ عَلَيْهِ أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ "ইখলাস হলো মানুষ 'আমাল করবে; কিন্তু সে তার এ ‘আমালের জন্য কোনো মানুষের প্রশংসা পেতে চাইবে না।”২৬১
বলাই বাহুল্য, ঘরের অভ্যন্তরে বা নিভৃতে বসে যারা আল্লাহর ‘ইবাদাত করে, হয়তো তাদের জন্য ইখলাসের গুণ অর্জন করা অধিকতর সহজ; কিন্তু যারা ব্যক্তি সংশোধন, জনসেবা ও সমাজ গঠনমূলক কাজ করে, তাদের পক্ষে ইখলাসের গুণ অর্জন করা এবং তাদের প্রতিটি ‘আমালকে পার্থিব স্বার্থ লাভ কিংবা সুনাম ও প্রশংসা অর্জনের চিন্তা থেকে মুক্ত রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। ২৬২ এ জন্য কঠোর পরিশ্রম, প্রচেষ্টা ও সাধনার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সামান্যতম গাফলতিও পার্থিব চিন্তা অনুপ্রবেশের পথ তৈরি করতে পারে।
অন্তরে ইখলাস জাগ্রত করার উপায়
* অন্তরে আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের ধারণা বদ্ধমূল রাখা
কোরআনের ১১২ নং সূরায় আল্লাহর একত্বের কথা আলোচনা করা হয়েছে এবং এ সূরার নাম রাখা হয়েছে ইখলাস। এখানে মানুষের নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ ও পবিত্র করতে সর্বাগ্রে তার অন্তরে আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের ধারণাকে বদ্ধমূল করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
* সবসময় অন্তরে আল্লাহ-সচেতনতা ও ভয় জাগ্রত রাখা
অন্তরে সর্বক্ষণ আল্লাহ-সচেতনতা ও ভয় জাগ্রত রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা’আলা আমাদের মনের সব চিন্তা, ইচ্ছা ও পরিকল্পনার খবর রাখেন।
* কাজ শুরু করার পূর্বে উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিন্তা করা
টিকাঃ
২৫৩. বিশিষ্ট সূফী জুনাইদ আল-বাগদাদী (মৃ. ২৯৭ হি.) (রাহ.) বলেন, تصفية العمل من الكدورات "ইখলাস হলো 'আমালকে বিভিন্ন কদর্যতা থেকে মুক্ত করা।" (গাযালী, ইহয়া, খ. ৪, পৃ. ৩৮২) বিশিষ্ট 'আবিদ ফুদাইল ইবনু 'ইয়াদ (১০৫-১৮৭ হি.) (রাহ.) বলেন, ترك العمل من أجل الناس رياء والعمل من أجل الناس شرك والإخلاص أن يعافيك الله منهما. "মানুষের নিন্দার ভয়ে কোনো কাজ ত্যাগ করা 'রিয়া'র মধ্যে শামিল এবং মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য কোনো কাজ করা শিরকের নামান্তর। আর ইখলাস হলো- এ দুটি প্রান্তিক অবস্থা থেকে আল্লাহ তোমাকে মুক্তি দেবেন।” (কুশাইরী, আর-রিসালাহ, পৃ.৯৬; গাযালী, ইহয়া, খ.৪,পৃ.৩৮২)
বিশিষ্ট সূফী ইয়া'কুব আল-মাকফ (রাহ.) বলেন, المخلص من يكتم حسناته كما يكتم سيئاته "মুখলিস হলো সে ব্যক্তি, যে নিজের সৎ কর্মসমূহ গোপন করে রাখে যেমন নিজের কুকর্মগুলো গোপন করে রাখে।” (গাযালী, ইহয়া, খ. ৪, পৃ. ৩৭৮)
বিশিষ্ট সূফী আস-সূসী (রাহ.) বলেন, الإخلاص فقد رؤية الإخلاص فإن من شاهد في إخلاصه الإخلاص فقد احتاج إخلاصه إلى إخلاص. "ইখলাস হলো ইখলাসকে দেখতে না পাওয়া। কেননা যে ব্যক্তি তার ইখলাসের মধ্যে ইখলাসকে দেখতে পাবে, তার এ ইখলাসও ইখলাসের প্রতি মুখাপেক্ষী।"
২৫৪. প্রত্যেক ধর্মেই পার্থিব স্বার্থ ও কামনা-বাসনার উর্ধ্বে ওঠে পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে কর্ম করার অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় কর্মকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক. নিষ্কাম কর্ম অর্থাৎ যে কর্মে পার্থিব ফলাফলের আকাঙ্খা করা হয় না। দুই, সকাম কর্ম অর্থাৎ যে কর্মে পার্থিব ফলাফল লাভের ইচ্ছা করা হয়। গীতার মতানুসারে- সকাম কর্মের চেয়ে নিষ্কাম কর্ম অনেক শ্রেয় ও শ্রেষ্ঠ। এতে একটি শ্লোকে বলা হয়েছে- "তস্মাদসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচার। অসক্তো হ্যাচরন কর্ম পরমাপ্লোতি পুরুষঃ।" (গীতা, ৩/১৯) অর্থাৎ (পার্থিব কোনো কিছুর প্রতি) আসক্তি ত্যাগ করে সর্বদা তুমি কর্তব্য কর্ম সমাধা করো। কারণ, অনাসক্ত কর্মের ভেতর দিয়েই শ্রেষ্ঠ ভগবদ পদ অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করা যায়।
২৫৫. ইব্রাহীম ইবনুল আশ'আস (রাহ.) বলেন, إن العمل إذا كان خالصا ولم يكن صوابا لم يقبل ، وإذا كان صوابا ولم يكن خالصا لم يقبل حتى يكون خالصا صوابا ، والخالص إذا كان الله ، والصواب : إذا كان على السنة.
"'আমাল যদি খালিস হয়; কিন্তু তা বিশুদ্ধ না হয়, তরে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। অনুরূপভাবে 'আমাল যদি বিশুদ্ধ হয়; কিন্তু খালিস না হয়, তাও গ্রহণযোগ্য হবে না, যে যাবত না তা খালিস ও নিখুঁতভাবে আদায় করা হয়। আর খালিস হলো- যে 'আমাল কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা হয়। আর বিশুদ্ধ হলো- যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তারীকা অনুযায়ী সম্পাদন করা হয়।" (ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইখলাসু ওয়ান নিয়্যাতু, হা. নং: ১৯) বিশিষ্ট মুফাসসির ইবনু কাসীর (রাহ.) বলেন, فإنه تعالى لا يتقبل العمل حتى يجمع هذين الركنين أن يكون صوابا موافقا للشريعة، وأن يكون خالصا من الشرك. "আল্লাহ তা'আলা কোনো 'আমালকে কবুল করেন না, যে যাবত না তাতে দুটি মৌলিক বিষয় পাওয়া যায়। একটি হলো- 'আমালটি শারী'আতের বিধান অনুযায়ী নিখুঁতভাবে পালিত হতে হবে। অপরটি হলো- তা শিরক থেকে মুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ সেখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অংশিদারিত্ব থাকতে পারবে না।" (ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৩, পৃ. ৪০৩)
২৫৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (বাব: কাইফা কানা বাদ'উল ওয়াহয়ি), হা. নং: ১; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ইমারাহ), হা. নং: ৫০৩৬ (মাতন সাহীহু মুসলিমের)
২৫৭. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আর-রিকাক), হা. নং: ৭৮৪৪
২৫৮. ইবনু রাজাব, জামি'উল 'উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ.১৩; গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৬৪; আবূ তালিব আল-মাক্কী, কুতুল কুলুব, খ. ২, পৃ. ২৬৮, ২৭৫
২৫৯. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৭৮
২৬০. আল কোরআন, সূরা আল-বাইয়িনাহ, ৯৮: ৫
২৬১. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৫৩৭৫; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইখলাসু ওয়ান নিয়্যাতু, হা. নং:১
সাইয়িদুনা ‘আলী ইবনু আবি তালিব (ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইখলাসু ওয়ান নিয়্যাতু, হা. নং:২), আবু হামযাহ [রা] (বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান, [৪৫: ইখলাসুল ‘আমাল), হা. নংঃ ৬৪৬৬) প্রমুখ থেকেও ইখলাসের অনুরূপ সংজ্ঞা বর্ণিত রয়েছে।
২৬২. এ কারণে বিশিষ্ট তাবি‘ঈ আইয়ূব আস-সিখাতিয়ানী [৬৬-১৩১ হি.) (রাহ.) বলেন, تخليص النيات من فساد النية أشد عليهم من جميع الأعمال - على العمال أشد عليهم من جميع الأعمال ‘আমালের চাইতেও কঠিন।" (আবূ তালিব আল-মাক্কী, কুতুল কুল্ব, খ. ২, পৃ. ২৬৮; গাযালী, ইহয়া... খ. ৪, পৃ. ৩৭৮) বিশিষ্ট সূফী সাহল ইবনু ‘আবদিল্লাহ আত-তুস্তারী [২০০-২৮৩ হি.] (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করা হয় اى شيء أشد على النفس؟-"কোন্ বিষয়টি নাফসের জন্য মেনে নেয়া সবচাইতে কঠিন?" তিনি জবাব দেন, ." الإخلاص ، إذ ليس لها فيه نصیب-"ইখলাস। কেননা, তাতে নাফসের কোনো অংশ নেই।” (গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৮১; কুশায়রী, আর-রিসালাহ, পৃ. ৯৬) জনৈক বিশিষ্ট সূফী বলেন, نجاة الأبد ولكن الإخلاص عزيز من إخلاص ساعة -‘‘এক মুহূর্তের ইখলাস চিরকালের মুক্তির উপলক্ষ। কিন্তু ইখলাস তো একটি অতি দুষ্প্রাপ্য বিষয়।" (গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৭৮)
📄 সাবর বা ধৈর্য
'সাবর' শব্দের বাংলায় অনুবাদ করা হয় ধৈর্য। তবে ধৈর্য শব্দ দ্বারা 'সাবর' শব্দের পুরো অর্থ প্রকাশিত হয় না। ইসলামে 'সাবর' বলতে সাধারণভাবে ধৈর্যের চাইতে অনেক বৃহত্তর ধারণা প্রকাশিত হয়। কেননা ধৈর্য বলতে সাধারণত ভাগ্যের প্রতি নেতিবাচক, নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণ বা অনুমোদনের ধারণা প্রকাশিত হয়। আর ইসলামে 'সাবর' কোনো নেতিবাচক গুণ নয়; এটা সক্রিয় ও গতিশীল গুণ। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে সর্বমুহূর্তে ও সর্বপরিস্থিতিতে সাবরের অনুশীলনের নির্দেশ দিয়েছে। এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে সব ধরনের সাফল্য লাভের চাবিকাঠি। এটা যেমন নাফসের স্বভাবগত কামনা-বাসনার মোকাবেলায় দীন ও শারী'আতের আনুগত্যের ওপর অটল থাকতে উৎসাহিত করে, তেমনি এ পথে আপতিত কষ্ট-যাতনা-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়ে যেতে উৎসাহিত করে। ইসলামে সাবর এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, এক হাদীসে একে نصْفُ الْإِيمَانِ অর্থাৎ ঈমানের অর্ধেক ২৭৪ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, সাবর মানুষের মধ্যে এমন বহু আত্মিক ও নৈতিক গুণের বিকাশ সাধন করে, যা ছাড়া ঈমানের দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। যেমন-
* সাবর মানুষকে আল্লাহর নি'মাতের শুকর আদায় করতে শিক্ষা দেয়।
* সাবর মানুষের মধ্যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আস্থা ও নির্ভরতা বাড়ায়।
* সাবর মানুষকে আল্লাহর পথে জিহাদে অবিচল রাখে।
* সাবর মানুষকে সর্বাবস্থায় আল্লাহর 'ইবাদাত ও আনুগত্যে অটল রাখে।
* সাবর মানুষকে দয়ালু, সহানুভূতিপ্রবণ ও ক্ষমাশীল করে।
'সাবর' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- الْإمْسَاكُ فِيْ ضِيْقٍ অর্থাৎ সংকীর্ণ অবস্থায় বেঁধে রাখা। যেমন' বলা হয় صبرت الدابة অর্থাৎ আমি প্রাণীটিকে আহার্য ছাড়াই বেঁধে রাখলাম। ২৭৫ পরিভাষায় 'সাবর' বলা হয়, নাফসকে তার যাবতীয় অবাঞ্ছিত কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখা এবং সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল-অবিচল থাকা এবং এ পথে যে সব কষ্ট-যাতনা ও বাধা-বিপত্তি আসবে তা স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে মেনে নেয়া। রাগিব আল-ইস্পাহানী [মৃ. ৫০২ হি.] (রাহ.) বলেন, الصَّبْرُ حَبْسُ النَّفْسِ عَلَى مَا يَقْتَضِيْهِ الْعَقْلُ وَالشَّرْعُ أَوْ عَمَّا يَقْتَضِيَانِ حَبْسُهَا "সাবর হলো বিবেক-বুদ্ধি কিংবা শারী'আত অথবা দুটির দাবি অনুযায়ী নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করা।”২৭৬ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম [৬৯১-৭৫১ হি.] (রাহ.)
هُوَ حَبْسُ النَّفْسُ عَنِ الْجَزْعِ وَالتَّسَخْطِ، وَحَبْسُ اللِّسَانِ عَنِ الشَّكْوَى، .وَحَبْسُ الْجَوَارِحِ عَنِ التَّسْوِيْشِ - "সাবর হলো নাফসকে অস্থিরতা ও অসন্তুষ্টি থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে বিরত রাখা। "২৭৭
বিশিষ্ট 'আলিমগণ সাবরকে বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত করেছেন। তবে সবক'টি প্রকারকে বিশ্লেষণ করলে এগুলো তিনটি ভাগে এসে মিলিত হয়। এ তিনটি ভাগ হলো-
এক. আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ )الصبر على الطاعات(
দুই. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ )الصبر عن المعاصي(
তিন. বিপদাপদের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ )الصبر على المصائب( !
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এ দুনিয়া মু'মিনদের জন্য বিরাট পরীক্ষাগার। এখানে তাদেরকে নানা দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন করা হয়। তাঁদের মধ্যে যে যতো বেশি সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে চাইবে, সে ততো বেশি দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন হবে। কাজেই প্রত্যেক মু'মিনকে জীবনের সকল অবস্থায় ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, সকল পরিস্থিতিতেই যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে হবে এবং আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَوَّلُ مَنْ يُدْعَى إِلَى الْجَنَّةِ الَّذِينَ-يَحْمَدُونَ اللهُ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاء.
"জান্নাতের দিকে সর্বপ্রথম আমন্ত্রণ জানানো হবে সে সব লোককে, যারা সুখ-দুঃখ নির্বিশেষে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে।"২৭৮ এ জন্য পবিত্র কোরআন ও হাদীসে প্রত্যেক মু'মিনকেই ধৈর্যগুণ অর্জন ও বৃদ্ধির জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২৭৯ ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলো চর্চা করা হলে আমাদের ধৈর্যগুণ বাড়তে পারে-
এক. সমগ্র জাহানের মালিক, নিয়ন্ত্রক ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থাকে বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ক্ষমতার আওতার বাইরে কেউ নেই।
দুই. অন্তরে এই বিশ্বাস সব সময় বদ্ধমূল রাখতে হবে যে, আমাদের জান-মাল আসলে আল্লাহ তা'আলার। কাজেই তিনি যে কোনো মুহূর্তে চাইলে তা নিয়ে নিতে পারেন।
তিন. জগতে যা কিছু ঘটবে তা পৃথিবী সৃষ্টির আগেই আল্লাহ কর্তৃক পরিকল্পিত। কাজেই গোটা জগতও যদি কারো ক্ষতি বা কল্যাণ করার জন্য একত্রিত হয়, তবু তারা ব্যর্থ হবে, যদি তাতে আল্লাহর অনুমোদন না থাকে।
চার. এটাও মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়ার বিপদগুলো গুনাহ মাফের বা তার সাজা দুনিয়াতে শেষ করার উসিলা হতে পারে। কাজেই বিপদে ধৈর্যশীল হতে হবে।
পাঁচ. যে কোনো বিপর্যয়ের মুখে আল্লাহর কাছে নত হয়ে শুধুমাত্র তাঁর কাছেই বিপদ উত্তরণের জন্য সাহায্য চাইতে হবে।
ছয়. দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধারের পথ প্রশস্ত দেখে এবং সাফল্যের সুযোগ-সুবিধা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে প্রবঞ্চিত না হওয়া। মনে করতে হবে যে, এগুলো পরীক্ষার উপকরণ ও অবকাশ প্রদানও হতে পারে।
টিকাঃ
২৭৪. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আত-তাফসীর), হা. নং: ৩৬৬৬ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হাকিম বলেন, এ হাদীসের সনদ সাহীহ। হাফিয যাহাবী (রাহ.) ও একে সাহীহ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশিষ্ট হাদীসবিশারদ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতে, এটি মারফু অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীসরূপে দা'ঈফ; তবে মাওকূফ হাদীস (অর্থাৎ সাহাবীর উক্তি) রূপে বিশুদ্ধ। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ৩, পৃ. ১৭৮, হা. নং: ৩৩৯৭)
২৭৫. রাগিব ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাতু..., পৃ. ২৭৩
২৭৬. রাগিব ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাতু..., পৃ. ২৭৩
২৭৭. ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন, খ. ২, পৃ. ১৫৬
২৭৮. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আদ-দু'আ...), হা. নং: ১৮৫১; তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ২৮৮
২৭৯. দ্র. আল কোরআন, ২:৪৫, ১৫৩, ১৫৫-৭; ৩:২০০; ৮:৪৬; ....
📄 শুকর (কৃতজ্ঞতা) জ্ঞাপন করা
আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এ পৃথিবীতে সুন্দর দেহ, স্বাস্থ্য, কর্মদক্ষতা, ধন- সম্পদ ও মান-সম্মানসহ অসংখ্য নি'মাত দিয়েছেন। তবে বান্দাহর ওপর আল্লাহর সবচাইতে বড় নি'মাত হলো ঈমান ও ইসলাম। তদুপরি একজন মু'মিন বিশ্বাস পোষণ করে যে, তার জীবনের সমুদয় কল্যাণ আল্লাহ তা'আলার অসীম করুণা থেকে নিঃসৃত। কাজেই একজন মু'মিনের ওপর তার ঈমানের একান্ত দাবি হলো- সর্বপরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলার এ নি'মাতসমূহের শুকর আদায় করা।
আল্লাহ তা'আলার নি'মাতসমূহের কৃতজ্ঞতা জানানোর একটি উপায় হলো- মানুষ তার মুখের কথার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, তাঁর প্রশংসা করবে; তবে এ ক্ষেত্রে একজন মু'মিনের নিকট শারী'আতের বড় কামনা হলো- সে তাঁর প্রদত্ত নি'মাতসমূহের হক আদায় করবে, এ নি'মাতসমূহ কখনোই তাঁর অবাধ্যতায় ও অবৈধ কাজে ব্যয় করবে না এবং সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, অভাবে ও প্রাচুর্যে তথা সর্বপরিস্থিতিতে এগুলোকে তাঁর 'ইবাদাত ও আনুগত্যের মধ্যে নিয়োজিত রাখবে। বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) গভর্নর আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.)-এর নিকট পত্র লিখেন,
اقنع برزقك من الدنيا، فإن الرحمن فضل بعض عباده على بعض في الرزق، بل يبتلي به كلا فيبتلي من بسط له، كيف شكره الله وأداؤه الحق الذي افترض عليه فيما رزقه وخوله؟
দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্ত রিযকের (কম হোক বা বেশি) ওপর সন্তুষ্ট থাকো। কেননা পরম করুণাময় তাঁর বান্দাদের মধ্যে একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। উপরন্তু, তিনি এ রিযকের মাধ্যমে তাদেরকে পরীক্ষায় নিমজ্জিত করেন। কাজেই আল্লাহ তা'আলা যাকে প্রচুর সহায়-সম্পদ দান করেছেন, তাকে পরীক্ষা করে দেখতে চান যে, সে কীভাবে আল্লাহর শুকর জ্ঞাপন করে এবং তাঁর প্রদত্ত রিযক ও শক্তি-সামর্থ্যের অত্যাবশ্যকভাবে পালনীয় হক কিভাবে আদায় করে? ২৮০
এ রিওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর নি'মাতের শুকর আদায় করার সর্বोत्कृष्ट উপায় হলো- তাঁর প্রদত্ত প্রতিটি বিষয়ের হক যথার্থ ও সুচারুরূপে আদায় করা। যেমন- আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদের শুকর আদায় করার যথার্থ উপায় হলো- আল্লাহর রাস্তায় কেবল তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তা ব্যয় করা। অনুরূপভাবে আল্লাহ প্রদত্ত 'ইলমের শুকর আদায় করার উপায় হলো- তদনুসারে 'আমাল করা এবং তা প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২৮১ এ ধরনের শুক্রে যেমন আল্লাহ তা'আলার প্রতি তার যথার্থ কৃতজ্ঞতা বোধের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি তা তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে এবং জীবনকে সমৃদ্ধ ও বারকাতময় করতে যথার্থ ভূমিকা রাখে। বলাই বাহুল্য, যে ব্যক্তি উপর্যুক্ত পদ্ধতিতে ঐকান্তিকতা সহকারে আল্লাহ তা'আলার নি'মাতসমূহের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, তার পক্ষে আল্লাহ তা'আলার কোনো আদেশ বা নিষেধ লঙ্ঘন করা সম্ভব নয়। কাজেই এরূপ ব্যক্তির আত্মা পরিশুদ্ধ এবং চরিত্র ও জীবন সুন্দর হয়। উপরন্তু, আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর নি'মাত আরো অধিকহারে দান করেন। তিনি বলেন, لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ “যদি তোমরা শুকর করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের নি'মাত বাড়িয়ে দেবো। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।"২৮২ এর মানে হলো- যদি তোমরা আমার নি'মাতসমূহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো অর্থাৎ সেগুলোকে আমার অবাধ্যতায় ও অবৈধ কাজে ব্যয় না করো এবং নিজেদের কার্যকলাপকে আমার মর্জির অনুগামী করার চেষ্টা করো, তবেই আমি এ সব নি'মাত আরো বাড়িয়ে দেবো। ২৮৩ পক্ষান্তরে যদি তোমরা আমার নি'মাতসমূহের না-শুকরী করো, তবে আমার শাস্তিও হবে ভয়ঙ্কর। আল্লাহর না- শুকরী করার মর্ম হলো- আল্লাহর নি'মাতকে তাঁর অবাধ্যতায় এবং অবৈধ কাজে ব্যয় করা অথবা তাঁর ফারয ও ওয়াজিব পালনে অবহেলা করা। অকৃতজ্ঞতার কঠোর শাস্তিস্বরূপ দুনিয়াতেও নি'মাত ছিনিয়ে নেয়া যেতে পারে অথবা এমন বিপদ আসতে পারে যে, নি'মাত ভোগ করা সম্ভবপর না হয় এবং পরকালেও আযাবে গ্রেফতার হতে পারে।
টিকাঃ
২৮০. ইবনু আবী হাতিম, আত-তাফসীর, রি.নং: ১৩৪৪৩; ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৪, পৃ. ৫৮৬
২৮১. মুহাম্মাদ 'আলী আল-বাকরী, দালীলুল ফালিহীন..., খ. ৪, পৃ. ৪৮৬; ইসমা'ঈল হাক্কী, রূহুল বায়ান, খ. ২, পৃ. ১৬৫
📄 অন্যের উপকার ও অবদান স্বীকার করা
আল্লাহ তাআলার নি'মাতের শুকর আদায় করার পাশাপাশি মানুষের উপকার স্বীকার করা এবং তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করাও প্রয়োজন। কৃতজ্ঞ মানুষকে আল্লাহ তা'আলা যেমন ভালোবাসেন, তেমনি মানুষও কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য আরও কিছু করার আগ্রহ পোষণ করে থাকে。
উল্লেখ যে, অপরের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার উপলব্ধিকে প্রকাশ করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ একটি উত্তম ব্যবস্থা। কেননা, যখন কোনো ব্যক্তি বোঝতে পারে যে, তার ভাই তার কৃত কার্যাবলির গুরুত্ব ও মূল্য যথাযথ উপলব্ধি করছে, তখন ভাইয়ের প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে ভালোবাসা পোষণকারী ব্যক্তি যদি বোঝতে পারে যে, তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই, তবে তার হৃদয়াবেগ স্বভাবতই নিষ্প্রভ হতে থাকবে। এ কারণেই এক ব্যক্তি যখন অন্য ব্যক্তিকে সাহায্য করে বা তার সাথে কোনো সদাচরণ করে বা তাকে কোনো ভালো কথা বলে অথবা তাকে কোনো হাদিয়া দেয়, তখন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তা সানন্দচিত্তে স্বীকার করে নেওয়া উচিত। এভাবে সে যে তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মূল্য উপলব্ধি করছে, এ কথা তাকে জানিয়ে দেবে। সাধারণত অহঙ্কারী ও স্বার্থান্ধ লোকেরা অন্যের অবদান ও উপকারের কথা সহজে স্বীকার করতে চায় না। তারা এটাকে নিজের জন্য অবমাননাকর মনে করে থাকে। এটা একটা অত্যন্ত গর্হিত চরিত্র। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে সাহাবীগণ (রা.) বলেন, কেউ যখন তাঁর খিদমাতে কিছু পেশ করতো, তিনি শুকরিয়ার সাথে তা গ্রহণ করতেন এবং কেউ তাঁর কোনো কাজ করে দিলে সে জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তিনি নিজেও লোকদেরকে অপরের উপকার সানন্দচিত্তে স্বীকার করে নেওয়ার এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন,
مَنْ أُوتِيَ إِلَيْهِ مَعْرُوفٌ فَوَجَدَ فَلْيُكَافِتْهُ وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَلْيُثْنِ بِهِ فَإِنْ مَنْ أَثْنَى بِهِ فَقَدْ شكَرَهُ وَمَنْ كَتَمَهُ فَقَدْ كَفَرَهُ.
যার প্রতি কোনো সদাচরণ করা হলো, যদি সে সদাচরণকারীকে কাছে পায়, তবে তার উচিত তাকে বিনিময় দান করা। যদি সে তাকে কাছে না পায়, তবে তার উচিত তার কাজের প্রশংসা করা। কেননা যে ব্যক্তি তার কাজের প্রশংসা করলো, প্রকারান্তরে সে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো, আর যে তা গোপন করলো, প্রকারান্তরে সে তার প্রতি অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিলো। ২৮৪
অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, لَا يَشْكُرُ اللهَ مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسِ. অর্থাৎ “যে ব্যক্তি মানুষের শুকর আদায় করে না, বস্তুতপক্ষে সে আল্লাহর শুকরও আদায় করে না।”২৮৫ তিনি আরো বলেন, إِنْ أَشْكَرَ النَّاسِ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَشْكُرُهُمْ لِلنَّاسِ.
“আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বড় শুকরগুযার বান্দাহ হলো, যে ব্যক্তি মানুষের কাজের সবচেয়ে বেশি শুকর আদায় করে।”২৮৬
টিকাঃ
২৮২. আল-কুরআন, ১৪ (সূরা ইব্রাহীম): ৭
২৮৩. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট মুফাসসির আল-বাগাভী (রাহ.) বলেন, نعمتي فآمنتم {لين شكرتم } وأطعتم { لأزيدنكم } في النعمة- "যদি তোমরা আমার নি'মাতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে ঈমান আনো এবং আনুগত্য করো, তবেই আমি তোমাদের নি'মাত আরো বাড়িয়ে দেবো।" (বাগাভী, মা'আলিমুত তানযীল, খ. ৪, পৃ. ৩৩৭)
২৮৪. বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আল-হিবাত), হা. নং: ১২৩৮৯; সুনানে আবী দাউদের (হা. নং: ৪৮১৫) মধ্যেও হাদীসটি কিছুটা শব্দগত পরিবর্তনসহ বর্ণিত রয়েছে।
২৮৫. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮১৩; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-বিরর্...), হা. নং: ১৯৫৪
২৮৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১৮৪৬; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৪২৫