📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 সুন্নাত নয়- এমন কাজকে সুন্নাত মনে করা

📄 সুন্নাত নয়- এমন কাজকে সুন্নাত মনে করা


অনেকেই সুন্নাতের অনুসরণের নামে অতিরঞ্জিতও করে থাকে। তারা সুন্নাত নয়- এমন কিছু কাজকেও সুন্নাত মনে করে নেয়। অথচ যা সুন্নাত নয়, তাকে সুন্নাত মনে করা বিদ'আত। তাই এ ব্যাপারেও খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য।
যেমন- কামীস অর্থাৎ কোর্তার কথা ধরুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত পুরো উম্মাতের মধ্যে কোর্তা পরিধানের সুন্নাতটি চলে আসছে। কিন্তু হাদীস শারীফের বিশাল ভাণ্ডারের কোথাও কোনো বিশেষ প্রকারের কোর্তাকে সুন্নাত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে কথা হলো- সমাজে যাকে কোর্তা নামে চিনে, আর তা বিজাতীয় কোনো ইউনিফর্মও নয় এবং পোশাক সম্পর্কিত শারী'আতের কোনো মূলনীতি বিরোধীও নয়, এ ধরনের যে কোনো কোর্তা দ্বারা সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। অতএব, কেউ যদি বলে, 'নিসফ সাক পর্যন্ত দীর্ঘ কল্লিদার কোর্তাই সুন্নাত। এ ছাড়া অন্য কোনো কোর্তা সুন্নাত নয়।' তা হলে এ ধরনের কথাবার্তা একেবারে বাড়াবাড়ি বলে গণ্য হবে এবং এটি বিদ'আতের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা, সুন্নাত নয় এমন জিনিসকে সুন্নাত বলাও বিদ'আত।
অনুরূপভাবে নখ কাটার কথাও উল্লেখ করা যায়। নখ কাটা সুন্নাত; কিন্তু কি নিয়মে নখ কাটতে হবে, কোন্ আঙ্গুল থেকে শুরু করে কোন আঙ্গুলে গিয়ে শেষ করতে হবে- এ ব্যাপারে হাদীস সম্পূর্ণ নীরব। হয়তো উম্মাতের বুযর্গ 'আলিমগণ বিভিন্ন হিকমাতের ভিত্তিতে কোনো কোনো নিয়ম বাতলিয়েছেন, যা বৈধতার মর্যাদা রাখে বা তাকে সর্বোচ্চ 'আলিমগণের রীতি' বলা যেতে পারে। তাই বলে কোনো বিশেষ নিয়মকে সুন্নাত বলার অবকাশ নেই।
অনুরূপভাবে সূফীদের গুদড়ী পরার কথাও উল্লেখ করা যায়। গুদড়ী বহু তালিযুক্ত পুরানো মামুলী জুব্বা। অনেক সূফীর মতে, এ ধরনের কাপড় পরিধান করা সুন্নাত। বলাই বাহুল্য, আর্থিক অস্বচ্ছলতাবশত এরূপ কাপড় পরতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু একে সুন্নাত বলা বাড়াবাড়ির নামান্তর। পোশাক সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবী ও তাবি'ঈগণের (রা.) সুন্নাতের সারকথা হলো, যেরূপ পোশাক সহজ লভ্য, তা-ই কৃতজ্ঞতার সাথে ব্যবহার করতে হবে। মোটা ও কম দামী কাপড় জুটলে যেমন তা পরবে, তেমনি উৎকৃষ্ট পোশাক জুটলে তাকে জেনে শুনে খারাপ মনে করবে না অথবা তার ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে না। উৎকৃষ্ট পোশাকের পেছনে লেগে থাকা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি উৎকৃষ্টকে খারাপ মনে করা কিংবা তা বাদ দিয়ে নিকৃষ্ট বস্তু ব্যবহার করাও নিন্দনীয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম [৬৯১-৭৫১হি.] (রাহ.) বলেন: একবার সান্ত নামক এক দরবেশ পশমের জুব্বা, ইযার ও পাগড়ী পরে বিখ্যাত তাবি'ঈ মুহাম্মদ ইবনু সিরীন [৩৩-১১০ হি.] (রাহ.)-এর কাছে প্রবে করলেন। মুহাম্মদ ইবনু সিরীন (রাহ.) তাঁর এ পোশাক দেখে অত্যন্ত অপছন্দ করলেন এবং বললেন: আমার ধারণা, কিছু লোক পশমী কাপড় পরিধান করে এবং দলীল হিসেবে পেশ করে যে, সাইয়িদুনা 'ঈসা 'আলাইহিস সালামও এ কাপড় পরিধান করেছিলেন। ২৪০ অথচ বিশ্বস্ত রাবীগণ আমাকে বর্ণনা করেছেন,
أن النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ لَبِسَ الْكِتَانَ وَالصُّوفَ وَالْقُطْنَ، وَسُنَّةُ نبينا أحقُّ أن تتبع.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম লিনেন, তুলা, কার্পাস ও পশমের কাপড়ের মধ্যে যখন যা জুটেছে তা-ই পরিধান করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতই আমাদের জন্য অধিক অনুসরণের উপযোগী। ২৪১
আমাদের দৃঢ়ভাবেই এ কথা মনে রাখতে হবে যে, মনের আবেগ পূর্ণ করার নাম দীন নয়; বরং নিজের সকল আশা-আকাঙ্খা ও আবেগকে শারী'আতের আনুগত্যে নিবেদিত করার নামই হলো দীন। লোকেরা আবেগের তাড়নায় দীন মনে করে যে সকল 'আমাল করবে, তা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শারী'আত ও সুন্নাতের সাথে না মিলে, তা হলে এ সকল কাজের পুরোটাই বিফলে যাবে। সুলাইমান আল-আ'মাশ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার বিশিষ্ট তাবি'ঈ ইব্রাহীম আন-নাখ'ঈ [৪৬-৯৬ হি.] (রাহ.) কে ইমামের সালাম ফিরানো পর صلى الله على محمد لا إله إلا الله বলা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি জবাব দিলেন, .ما كانَ مِنْ قَبْلِهِم يُصْنَعُ هَكذا "ইতঃপূর্বে এ ধরনের করা হতো না।" 'আতা ইবনুস সা'য়িব (রাহ.) থেকে বর্ণিত, বিশিষ্ট তাবি'ঈ আবুল বাখতারী (মৃ. ৮২ হি.] (রাহ.) বলেন, .هَذه بدْعَة - "এটা বিদ'আত।”২৪২ আবূ রাবাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার জনৈক ব্যক্তি ফাজরের দু রাক'আত সুন্নাত আদায় করার পর আরো কিছু (নাফল) নামায পড়ার জন্য দাঁড়ালেন। এ সময় বিশিষ্ট ফাকীহ তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব [১৩-৯৪ হি.] (রা.) তাঁকে এ সময় নামায পড়তে বারণ করলেন। তখন লোকটি বললো, يَا أَبَا مُحَمَّدٍ يُعَذِّبُنِى اللَّهُ عَلَى الصَّلَاةِ؟ ؟ - “আবু মুহাম্মদ! আল্লাহ কি আমাকে নামাযের জন্য শাস্তি দেবেন?” সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রা.) জবাব দিলেন, لَا وَلَكِنْ يُعَذِّبُكَ عَلَى خِلافِ السُّنَّةِ - “তা, অবশ্যই নয়; কিন্তু সুন্নাতের পরিপন্থী কাজের জন্য আল্লাহ তা'আলা তোমাকে 'আযাব দেবেন?” ২৪৩
লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ইব্রাহীম আন-নাখ'ঈ ও আবুল বাখতারী (রাহ:) প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও ফাকীহ রাবীগণ ইমামের সালাম ফিরানোর অব্যবহিত পর لا إله إلا الله محمد এর মতো যিকরকে মেনে নিতে পারলেন না। অনুরূপভাবে বিশিষ্ট তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রাহ.) ফাজরের দু রাক'আত সুন্নাত আদায় করার পর অতিরিক্ত নাফল নামায পড়াকে সমর্থন করতে পারলেন না। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ 'আমাল করার শিক্ষা দিয়ে যাননি। এগুলো ছিল নিছক তাদের আবেগতাড়িত কাজ। মোট কথা, দীন হলো শারী'আত ও সুন্নাতের অনুসরণের নাম। তাই আমাদের একান্ত দীনী কর্তব্য হলো- শুধু নিয়‍্যাত খালিস কিংবা মূল কাজটি ভালো- এতটুকুতেই ক্ষান্ত না হওয়া; বরং তার সাথে সাথে উক্ত কাজ সম্পর্কিত শারী'আত ও সুন্নাতের যে সকল হিদায়াত ও দিক-নির্দেশনা আছে, সেগুলোও যথাযথ পালন করা। বিশিষ্ট তাবি'ঈ সুফইয়ান আস-সাওরী [৯৭-১৬১ হি.] (রাহ.) বলেন,
لا يقبل قول إلا بعمل، ولا يستقيم قول وعمل إلا بنية، ولا يستقيم قول وعمل ونية إلا بمتابعة السنة .
কোনো কথাই কবুল করা হবে না, যতক্ষণ না সে অনুযায়ী 'আমাল করা হয় এবং কোনো কথা ও 'আমালই ঠিক হবে না, যতক্ষণ না নিয়্যাত বিশুদ্ধ হয়। আর কোনো কথা, 'আমাল ও নিয়‍্যাতই ঠিক হবে না, যতক্ষণ না তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী পালন করা হয়। ২৪৪

টিকাঃ
২৪০. অর্থাৎ তারা মনে করে যে, সব সময় পশমী কাপড় পরাই শ্রেয়। এ কারণে তারা সর্বদা পশমী কাপড় তালাশ করতে থাকে এবং অন্য কোনো কাপড় পরা থেকে নিজেদেরকে বারণ করে। তদুপরি তারা সর্বদা একই ধরনের পোশাক পরার জন্য সচেষ্ট থাকে, যা লঙ্ঘন করাকে তারা অন্যায় মনে করে।
২৪১. ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মা'আদ, খ. ১, পৃ. ৩৬
২৪২. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, খ. ১, পৃ. ৩৩৮
২৪৩. বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ৪৬২১; 'আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৪৭৫৫
২৪৪. আহমাদ ফারীদ, তাযকিয়াতুন নুফুস, পৃ. ৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00