📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 ইস্তিক্বামাত (সর্ব পরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা)

📄 ইস্তিক্বামাত (সর্ব পরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা)


ইস্তিকামাত অর্থ সর্বাবস্থায় ও সকল কাজে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা। এটি দীনের একটি অপিরহার্য বিষয় এবং আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা। নাফস সর্বমুহূর্তে মানুষকে তার স্বভাবগত চাহিদাগুলো ন্যায়ানুগভাবে হোক কিংবা অন্যায়ভাবে- পূরণ করতে প্রেরণা যোগায় ও তাগাদা দেয়। কাজেই এ স্বভাবগত প্রেরণা ও তাগাদা সত্ত্বেও সর্ব অবস্থায় ও সকল কাজে সত্য ও ন্যায়ের ওপর চলা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এর জন্য প্রয়োজন নাফসের ওপর পূর্ণ শাসন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তা ছাড়া মানব জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে বহু ধরনের পরীক্ষা হয় এবং এ সব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা কার্যত দেখতে চান যে, কে তাঁর প্রকৃত মু'মিন বান্দাহ, আর কে মিথ্যুক, কে তাঁর পূর্ণ অনুগত বান্দাহ, আর কে তাঁর অবাধ্য ও কপট দাবিদার? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ . الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ) এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সকলেই তাঁরই নিকট ফিরে যাবো। ২১৯
অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ . وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ ﴾ মানুষ কি মনে করে নিয়েছে যে, তারা এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না। অথচ আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। এভাবে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই কার্যত সত্যবাদীদের জেনে নেবেন এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যাবাদীদেরও। ২২০
সাইয়িদুনা সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি জিজ্ঞেস করেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَشَدُّ النَّاسِ بَلَاءً؟ - "ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কারা সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন হন?" তিনি জবাব দিলেন,
الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ يُبْتَلَى الْعَبْدُ عَلَى حَسْبِ دِينِهِ، فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلَابَةٌ زِيدَ صَلَابَةٌ، وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةٌ خُفْفَ عَنْهُ. সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন হন নাবীগণ, তারপর তাঁদের পরবর্তী উৎকৃষ্ট লোকগণ, অতঃপর তাঁদের পরবর্তী উৎকৃষ্ট লোকগণ। বস্তুত বান্দাহকে তার দীনদারির মাত্রা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। কাজেই যে ব্যক্তি দীনের ওপর কঠোরভাবে অটল থাকতে চাইবে, তার বিপদের কঠোরতাও বেড়ে যাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দীন পালনে কোনোরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন করবে, তার বিপদের মাত্রাও সে পরিমাণে হ্রাস পাবে। ২২১
উপর্যুক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, এ দুনিয়া, বিশেষ করে মু'মিনদের জন্য পরীক্ষাগার। এখানে তাদেরকে নানা দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন করা হয়। তাঁদের মধ্যে যে যতো বেশি সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে চাইবে, সে ততো বেশি দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন হবে। পক্ষান্তরে সুবিধাবাদী চরিত্রের লোকেরা অধিকতর সুখ-সাচ্ছন্দ্যের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করে থাকে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الدُّنْيا سِحْنٌ لِلْمُؤْمِنِ وَجَنَّةٌ لِلْكَافِرِ- "দুনিয়া হলো মু'মিনের জন্য কারাগার স্বরূপ আর কাফিরের জন্য জান্নাত স্বরূপ।”২২২
কাজেই প্রত্যেক মু'মিনের প্রতি তার ঈমানের একান্ত দাবি হলো, সে সকল পরিস্থিতিতে ও সকল কাজে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকবে এবং এ জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَنْ تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
অতএব, আপনি সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকুন, যেভাবে আপনাকে আদেশ দেয়া হয়েছে। আর যারা (শিরক ও কুফর থেকে) তাওবাহ করে আপনার সাথী হয়েছে, তারাও যেন সত্য পথে অবিচল থাকে আর আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করবে না। কেননা তিনি তোমাদের প্রতিটি কার্যকলাপ লক্ষ্য করছেন। ২২৩
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সকল মু'মিনকেই তাঁদের সকল কাজে সর্বাবস্থায় ইস্তিকামাত অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। 'ইস্তিকামাত'-এর প্রকৃত অর্থ হলো- কোনো দিকে একটু পরিমাণ না ঝুঁকে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা। বস্তুত এ কোনো সহজ কাজ নয়। কোনো লৌহদণ্ড বা পাথরের খাম একজন সুদক্ষ প্রকৌশলী হয়তো এমনভাবে দাঁড় করাতে পারে, কিন্তু কোনো মানুষের পক্ষে সর্বাবস্থায় সোজা দাঁড়িয়ে থাকা কতো দুষ্কর তা কোনো সাধারণ বোধসম্পন্ন ব্যক্তির অজানা নয়। আয়াতে সর্বাবস্থায় সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ হলো- 'আকাইদ, 'ইবাদাত, লেনদেন, আচার-ব্যবহার, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ উপার্জন ও ব্যয় তথা নীতি- নৈতিকতার যাবতীয় ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে তাঁরই নির্দেশিত সোজা পথে চলা। তন্মধ্যে কোনো ক্ষেত্রে, কোনো কার্যে এবং পরিস্থিতিতে গড়িমসি করা, বাড়াবাড়ি করা অথবা ডানে-বামে ঝুঁকে পড়া ইস্তি কামাতের পরিপন্থী।
দুনিয়ায় যত গোমরাহী ও পাপাচার দেখা যায়, তা সবই ইস্তিকামাত হতে সরে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। 'আকাইদের ক্ষেত্রে ইস্তিকামাত না থাকলে মানুষ বিদ'আত থেকে শুরু করে কুফর ও শিরক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ, তাঁর পবিত্র সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সুষ্ঠু ও সঠিক মূলনীতি শিক্ষা দিয়েছেন, তার মধ্যে বিন্দুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি বা পরিবর্ধন-পরিবর্জনকারী পথভ্রষ্টরূপে আখ্যায়িত হবে, যদিও তার নিয়্যাত ভালো হোক না কেন। অনুরূপভাবে নাবী-রাসূলগণের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার যে সীমারেখা নির্ধারিত হয়েছে, সে ব্যাপারে ত্রুটি করা কিংবা বাড়াবাড়ি করা স্পষ্ট ধৃষ্টতা ও পথভ্রষ্টতা। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা এরূপ বাড়াবাড়ির কারণেই বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়েছে।
'ইবাদাত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পথনির্দেশ করেছেন, তার মধ্যে কোনোরূপ কমতি বা গাফলাতি মানুষকে যেমন ইস্তিকামাতের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে, অনুরূপভাবে তার নিজের পক্ষ থেকে কোনো সংযোজন বা পরিবর্ধনও মানুষকে বিদ'আতে লিপ্ত করে।
অনুরূপভাবে স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, আদান-প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ উপার্জন, বিয়ে-শাদী ও সাধনা তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশিত মূলনীতিগুলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাস্তবে রূপায়িত করে একটা সুষ্ঠু ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা পত্তন করেছেন। এ ব্যবস্থা পুরোপুরি অবলম্বন করেই মানুষ সত্যিকার মানুষে পরিণত হতে পারে। তা থেকে বিচ্যুত হলেই একদিকে মানুষের নৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় ঘটবে, অপরদিকে সামাজিক বিপর্যয়ও দেখা দেবে।
সুফইয়ান ইবনু 'আবদিল্লাহ আস-সাকাফী (রা.) একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমীপে আরয করলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْ لِي فِي الإسلام قَوْلاً لَا أَسْأَلُ عَنْهُ أَحَدًا بَعْدَكَ- “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলাম সম্পর্কে আমাকে এমন একটি ব্যাপক শিক্ষা দান করুন, যেন আপনার পরে আমার আর কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না হয়।” তিনি বললেন, قُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ فَاسْتَقِمْ “তুমি বলো যে, আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। অতঃপর ইস্তিকামাত অবলম্বন করো।”২২৪
'উসমান ইবনু হাদির আল-আযদী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) সমীপে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম, أَوْصِنِي-"আপনি আমাকে উপদেশ দান করুন।” তদুত্তরে তিনি বললেন, عَلَيْكَ بِتَقْوَى الله وَالِاسْتِقَامَةِ، أَتَّبِعْ وَلَا تَبْتَدِعْ - “তাকওয়া ও ইস্তিকামাত অবলম্বন করো। (আর এর সঠিক পন্থা হলো) দীনী ব্যাপারে শারী'আতের অনুশাসন হুবহু মেনে চলো, নিজের পক্ষ থেকে হ্রাস-বৃদ্ধি করতে যেয়ো না।”২২৫ বস্তুতপক্ষে এ দুনিয়ায় ইস্তিকামাতই সবচেয়ে দুষ্কর কার্য। এ জন্যই দীনের বুযর্গ ব্যক্তিগণ বলেন যে, الاستقامة فوق الكرامة -"কারামাতের চেয়ে ইস্তিকামাতের মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে।" অর্থাৎ যে ব্যক্তি সর্বকাজে ইস্তিকামাত অবলম্বন করেন, যদি জীবনভর তাঁর দ্বারা কোনো অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত নাও হয়, তথাপি ওলীগণের মধ্যে তাঁর মর্যাদা সবার উর্ধ্বে।
সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) বলেন, مَا نَزَلَ عَلَى رَسُولُ الله صلى عليه وسلم آية هي : هيَ أَشَدُّ وَلَا أَشَقُّ مِنْ هَذِهِ الْآيَةِ عَلَيْهِ. " আল্লাহ মধ্যে উপযুক্ত আয়াত (অর্থাৎ فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ)-এর হুকমের চেয়ে কঠিন ও কষ্টকর কোনো হুকম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল হয়নি।"২২৬ একবার সাহাবা কিরাম (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়ি মুবারাকের কয়েক গাছি পেকে গেছে দেখতে পেলেন, তখন আফসোস করে বললেন, لَقَدْ أَسْرَعَ إِلَيْكَ الشَّيْبُ! - “আপনার দিকে দ্রুত গতিতে বার্ধক্য এগিয়ে আসছে!” তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, شَيَّبَتْنِي هُودُ وَأَخَوَاتُهَا -"সূরা হুদ এবং এ জাতীয় সূরাগুলো আমাকে বৃদ্ধ করেছে।”২২৭ সূরা হুদে বর্ণিত পূর্ববর্তী বিভিন্ন জাতির ওপর কঠোর আযাবের ঘটনাবলিও এর কারণ হতে পারে। তবে ইবনু 'আব্বাস (রা.) বলেন, "ইস্তিকামাতের নির্দেশই ছিল বার্ধক্যের কারণ।"২২৮ বিশিষ্ট সূফী শাইখ আবূ 'আলী মুহাম্মাদ ইবনু 'উমার আস-সিররী (রাহ.) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিয়ারাত লাভ করে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি এ কথা বলেছেন যে, সূরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ করেছে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবূ 'আলী আস-সিররী (রাহ.) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, উক্ত সূরায় বর্ণিত নাবীগণের কাহিনী ও তাঁদের কাওমসমূহের ওপর আপতিত আযাবের ঘটনাবলিই কি আপনাকে বৃদ্ধ করেছে? তিনি জবাব দিলেন, {فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ} - لا ولكن قوله : {فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ}. কথাটিই আমাকে বৃদ্ধ করেছে।”২২৯
উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিপূর্ণ মানুষের বাস্তব নমুনারূপে এ জগতে শুভাগমন করেছিলেন। ইস্তিকামাতের ওপর সুদৃঢ় থাকাই ছিল তাঁর জন্মগত স্বভাব। তথাপি অত্র নির্দেশকে এতটুকু গুরুভার মনে করার কারণ এই যে, অত্র আয়াতে আল্লাহ তাঁকে শুধু সোজা পথে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং "যেভাবে আপনাকে আদেশ করা হয়েছে" বলে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নাবী ও রাসূলগণের অন্তরে অপরিসীম আল্লাহভীতির প্রবল প্রভাবের কথা কারো অজানা নয়। তাই পূর্ণ ইস্তিকামাতের ওপর কায়িম থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যেরূপ ইস্তিকামাতের নির্দেশ দিয়েছেন, তা পুরোপুরি আদায় হচ্ছে কি না? আরেকটি কারণ এই হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ইস্তিকামাতের জন্য বিশেষ চিন্তিত ছিলেন না। কেননা, আল্লাহর অনুগ্রহে তা তাঁর পূর্ণমাত্রায় হাসিল ছিল। কিন্তু উক্ত আয়াতে সমগ্র উম্মাতকে সোজা পথে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ উম্মাতের জন্য এটা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টকর। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতীব চিন্তিত ও শঙ্কিত ছিলেন। ২৩০

টিকাঃ
২২৪. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৬৮
২২৫. দারিমী, আস-সুনান, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ১৩৯
২২৬. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৯, পৃ. ১০৭
২২৭. সা'ঈদ ইবনু মানছুর, আস-সুনান, খ. ৫, পৃ. ৩৭০
২২৮. মুহাম্মাদ আত-তাহির, আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, খ. ১২, পৃ. ১৭৬
২২৯. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৯, পৃ. ১০৭; যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', খ. ১৬, পৃ. ৪২৪
২৩০. শফী, মা'আরিফুল কোরআন, পৃ. ৬৪৬

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 নবী-রাসূল ও সাহাবীগণের জীবনী অধ্যয়ন

📄 নবী-রাসূল ও সাহাবীগণের জীবনী অধ্যয়ন


আত্মসংশোধন ও উন্নয়নের একটি শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা হলো নাবী-রাসূল ও সাহাবীগণের জীবনী অধ্যয়ন। বলাই বাহুল্য, নাবী-রাসূল ও তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারী সাহাবীগণ হলেন ইনসানী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম আদর্শ মানুষ। যে সকল উপাদান মানব মন ও চরিত্রকে সুন্দর, উন্নত, মহৎ ও পরিপূর্ণ করে তোলতে পারে, তার সবগুলোই তাঁদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিভাবে মানুষ তার আত্মার উন্নতি বিধান করবে, কিভাবে তার জীবন গঠন করবে, কিভাবে জীবন সংগ্রামে সে জয়ী হবে- সবকিছুর পরিপূর্ণ আদর্শ তাঁরা আমাদের দেখিয়ে গেছেন। কাজেই যে কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যত পথ-নির্দেশের জন্য তার উত্তম ও সত্যপরায়ণ পূর্বসূরীদেরকে গভীর দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করাই সর্বাধিক ফলপ্রসু ব্যবস্থা। ব্যক্তি জীবনে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, তা থেকে নিজেকে উদ্ধার করার জন্যও অতীতের সত্যনিষ্ঠ ও মহৎ লোকদের সংগ্রামমুখর ও স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসও নিজের সামনে সদা হাযির রাখা আবশ্যক। মোটকথা, অতীত প্রজন্মের ইতিহাসের মধ্যে বর্তমান ও অনাগত প্রজন্মসমূহের জন্য বিরাট শিক্ষা নিহিত থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ -"তাঁদের (অর্থাৎ নাবী-রাসূলগণের) কাহিনীতে বিবেকসম্পন্ন লোকদের জন্য রয়েছে শিক্ষার বিশেষ উপকরণ।”৫৩১ এসব শিক্ষার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মানুষের মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার চাইতে অধিক গভীর ও অনায়াসলব্ধ হয়। এ কারণেই গোটা মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নির্দেশনামা হিসেবে প্রেরিত পবিত্র কুর'আনের বিভিন্ন জায়গায় অতীতের নাবী-রাসূল ও তাঁদের সত্যনিষ্ঠ অনুসারীগণের বহু ঘটনা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যত সংশোধনের জন্য একটি অমোঘ ব্যবস্থাপত্র। কাজেই যে কোনো ব্যক্তি যদি সে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ এবং তার জীবনকে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে চায়, তবে সে যেন অবশ্যই নাবী-রাসূল ও তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীগণের সংযমী ও সংগ্রামমুখর জীবনীসমূহ অধ্যয়ন করে। তা থেকে সে নিঃসন্দেহে তার মনের অনেক খোরাক ও প্রেরণা লাভ করতে পারে।

টিকাঃ
৫৩১. আল-কোরআন, সূরা ইউসূফ, ১২: ১১১

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তা

📄 মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তা


মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তাও আত্মশুদ্ধি, আত্মিক শক্তি ও নৈতিক উৎকর্ষ লাভের অন্যতম ব্যবস্থা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দুনিয়াই মু'মিনের কর্মস্থল এবং সবকিছু তাকে এখানেই করতে হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে বিশ্বাস করে যে, এ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় সে যা কিছু করে, তা এখানেই শেষ হয়ে যায় না; বরং এ দুনিয়ার পর আরো একটি জগত রয়েছে, যা স্থায়ী এবং যেখানে তাকে তার প্রত্যেকটি কাজের জন্য হিসাব দিতে হবে এবং এর জন্য তাকে ভালো কি মন্দ ফল ভোগ করতে হবে। এ বিশ্বাস যতো সুদৃঢ় হবে এবং এ চিন্তা বেশি সময় ধরে স্থায়ী হবে, ততোই তার অনুভব-মনন, কথা, কর্ম ও আচার-আচরণের মধ্যে এ বিশ্বাস ও চিন্তার প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। কোনো মু'মিনের অন্তরে যখন এ বিশ্বাস প্রগাঢ় হয়, তখন সে এ দুনিয়ায় যা কিছু করে, তা বস্তুতপক্ষে এ দুনিয়ার সাফল্য লাভের জন্য করে না; বরং আখিরাতের জন্য করে এবং দুনিয়ার ফলাফলের দিকে তার লক্ষ্য থাকে না; বরং তার লক্ষ্য থাকে আখিরাতের ফলাফলের প্রতি। যে সব কাজ আখিরাতে লাভজনক সেসব সে করে এবং যে কাজের ফলে আখিরাতে কোনো লাভ হবে না বা ক্ষতি হবে, সেগুলো সে বর্জন করে চলে। তার অন্ত রজুড়ে বিরাজ করে একমাত্র আখিরাতের সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং শান্তি ও পুরস্কারের চিন্তা। এর মুকাবিলায় দুনিয়ার কোনো শান্তি ও পুরস্কারের গুরুত্ব তার কাছে থাকে না। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে নানাভাবে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ ও আখিরাতে সাফল্য লাভের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ “ পার্থিব সুখ-সম্ভোগের প্রতি মোহভঙ্গকারী মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো।”৫৭৮ তিনি আরো বলেন, الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ "বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি, যে নিজের নাফসের সমালোচনা করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সাফল্যের জন্য 'আমাল করে। "৫৭৯ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ أَكْيْسَ النَّاسِ أَكْثَرُهُمْ لِلْمَوْتِ ذِكْرًا، وَأَحْسَنُهُمْ لِلْمَوْتِ اسْتِعْدَادًا - "সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমান লোক হলো যে ব্যক্তি সকলের চাইতে বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এবং মৃত্যুর জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করে।”৫৮০
দীর্ঘদিন গুনাহ করার কারণে অন্তরের মধ্যে যে গাফলাতি, কাঠিন্য ও রুচিবিকৃতির সৃষ্টি হয়, তা দূরীভূত করার একটি প্রধান ব্যবস্থা হলো বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ هَذِهِ الْقُلُوبَ تَصْدَأُ ، كَا .يَصْدَأُ الْحَدِيدُ إِذَا أَصَابَهُ الْمَاءِ -"এ অন্তরগুলোতে মরিচা ধরে যেমন লোহায় মরিচা ধরে যখন তাতে পানি লাগে।" সাহাবীগণ আরয করলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا جَلَاؤُهَا ؟- "ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা পরিষ্কার করার উপায় কী?” তিনি জবাব দিলেন, কَثرَةُ ذِكْرِ الْمَوْتِ وَتِلَاوَةُ الْقُرْآنِ. - "বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা ও কোরআন তিলাওয়াত করা।”৫৮১ উল্লেখ্য যে, ইসলামে কবর যিয়ারাতের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ এবং দুনিয়ার প্রতি নির্মোহভাব সৃষ্টি।
মানুষ যখন কার দেখতে পায় এবং স্মরণ করে, যে জীবনে সে আনন্দ-ভোগ-বিলাসে মত্ত, সে জীবন অচিরেই ফুরিয়ে যাবে, তাকে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করতেই হবে, অতঃপর কবরের সংকীর্ণতা ও তার কঠিন শাস্তি নিয়ে চিন্তা করে এবং ভবিষ্যতের কঠোর হিসাব ও জবাবদিহিতার চিত্র হৃদয়পটে ভেসে ওঠে, তখন অবশ্যই তার অন্তর পরকালের ভয়ে একান্তই নরম ও বিগলিত হয়ে যাবে, যা তার বাকী জীবনের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের একান্ত পাথেয় রূপে কাজ করবে। সাইয়িদুনা আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইhi ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنِّي نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَرُورُوهَا فَإِنَّ .فِيهَا عِبْرَة - "আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারাত করা থেকে নিষেধ করতাম। এখন তোমরা কবর যিয়ারাত করো। কেননা যিয়ারাতের মধ্যে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উপকরণ রয়েছে।”৫৮২ বর্ণিত রয়েছে যে, বিশিষ্ট তাবি'ঈ রাবী' ইবনু খায়সাম (রাহ.) যখনই কোনোরূপ গাফলাতি অনুভব করতেন, তখন তিনি কবরের দিকে চলে যেতেন এবং কাঁদতেন ও বলতেন যে, আমরাও ছিলাম, তোমরাও ছিলে! এভাবে পুরো রাত সেখানে কেটে দিতেন। সকালে যেন তাঁকে কবর থেকে বের করা হতো। ৫৮৩ এ কারণেই অনেক 'আলিমই বলেছেন, অন্তরের জন্য- বিশেষ করে যখন তা কঠোর হয়ে যায়- কবর যিয়ারাতের চেয়ে অধিক উপকারী আর কিছুই নেই। জনৈক ব্যক্তি ইমাম আহমাদ (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করলো, كَيْفَ يَرقُ قلبي ؟-"কিভাবে আমার অন্তর বিনম্র হবে? তিনি জবাব দিলেন, .اَدْخُلْ الْمَقْبَرَةَ - “তুমি কবরস্থানে গমন করো।”৫৮৪

টিকাঃ
১৩১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩০৭; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৫৮
৫৭৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৬০
৫৮০. হাইসামী, বুগইয়াতুল বাহিস.., বাব: যিকরুল মাওত, হা. নং: ১১১৬-৭; তাবারানী (রাহ.) ও অন্য একটি সূত্রে সামান্য শব্দগত পরিবর্তন হাদীসটি তাঁর মু'জামসমূহে উল্লেখ করেছেন। (দ্র. আল-মুজামুস সাগীর, হা. নং: ১০০৮, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ২১০৩: আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ১৩৬৩৬)
৫৮১. কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ১১৭৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৯: তা'যীমুল কোরআন), হা. নং: ১৮৫৯ এ হাদীসটি দা'ঈফ। (আবুল ফাদল আল-'ইরাকী, আল-মুগনী 'আন হামলিল আসফার, খ. ১, পৃ. ২২২, হা. নং: ৮৬৬)
৫৮২. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১০৯০১। এ হাদীসটি সাহীহ।
৫৮৩. 'আলী মাহফুয, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৮
৫৮৪. ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ. ৩,পৃ. ৩৪৬; মিরদাভী, আল-ইনসাফ, খ. ৪,পৃ. ৩৭৭

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 যালিম, দুরাচারী ও আল্লাহদ্রোহী শক্তির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না রাখা

📄 যালিম, দুরাচারী ও আল্লাহদ্রোহী শক্তির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না রাখা


যালিম, দুরাচারী ও মুনাফিকদের সাথে অবাধ সংশ্রব, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব নিজের ও মিল্লাতের ধ্বংসের একটি প্রধান উপলক্ষ ও সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا أَبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ. قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبُّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ )
হে মু'মিনগণ! তোমরা নিজেদের পিতা ও ভাইদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমানের পরিবর্তে কুফরকে ভালোবাসে। আর তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা একান্তই সীমালঙ্ঘনকারী। (হে রাসূল,) আপনি বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান- সন্ততি, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন- সম্পদ, তোমাদের ব্যবসায়- যা অচল হয়ে যাওয়ার ভয় করো- এবং তোমাদের বাসস্থান- যাকে তোমরা পছন্দ করো- আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ তা'আলা ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। ৫৮৫
বলাই বাহুল্য, পবিত্র কোরআন ও হাদীসে নানাভাবে পিতামাতা, ভাইবোন ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উপর্যুক্ত আয়াতে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক সম্পর্কেরই একেকটি সীমা আছে এবং এ সকল সম্পর্ক- তা পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয়- স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব- যার বেলায় হোক, দীন ও শারী'আতের প্রশ্নে বাদ দেয়ার উপযুক্ত। অর্থাৎ আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সকল সম্পর্কের ওপর দীন ও শারী'আতের সম্পর্ক অগ্রগণ্য। যে ক্ষেত্রে এ দু সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, সেখানে আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ককে জলাঞ্জলি দিতে হবে। উম্মাতের শ্রেষ্ঠ জামা'আত সাহাবা কিরাম (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মূলে রয়েছে তাঁদের এ ত্যাগ ও কুরবানী। তাঁরা সর্বক্ষেত্রে ও সর্বাবস্থায় দীন ও শারী'আতের সম্পর্ককেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। অপরদিকে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসের মূলে রয়েছে অসত্য ও অন্যায়ের সাথে তাদের আপোষকামিতা এবং দুরাচারী ও যালিমদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। উল্লেখ্য যে, এটিই ছিল বানু ইসরা'ঈলের ধ্বংসের একটি প্রধান কারণ। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَمَّا وَقَعَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ فِي الْمَعَاصِي نَهَتْهُمْ عُلَمَاؤُهُمْ فَلَمْ يَنْتَهُوا فَجَالَسُوهُمْ فِي مَجَالِسِهِمْ وَوَاكَلُوهُمْ وَشَارَبُوهُمْ فَضَرَبَ اللهُ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ بِبَعْضٍ وَلَعَنَهُمْ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ﴿ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ ).
বানী ইসরা'ইল যখন পাপাচারে লিপ্ত হলো, তখন তাদের 'আলিমরা (শুরুতে) তাদের নিষেধ করেছিল। কিন্তু তারা তাঁদের কথায় পাপাচার থেকে বিরত থাকলো না। এরপর 'আলিমরা পাপাচারীদের মাজলিসে অংশগ্রহণ করতে লাগলো এবং তাদের সাথে একত্রে বসে খানা-পিনা করতে লাগলো। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদের পরস্পরের অন্তরগুলোর মধ্যে সাযুজ্য তৈরি করে দিলেন। উপরন্তু, দা'উদ ও ঈসা ইবনু মারইয়াম 'আলাইহিমাস সালামের মুখে তিনি তাদের অভিসম্পাত করেছেন। এর কারণ হলো- তারা অবাধ্যতা করতো এবং সীমা লঙ্ঘন করতো। ৫৮৬
আজকাল মুসলিমদের মধ্যে সাধারণ লোকদের কথা তো বলাই বাহুল্য; বেশিরভাগ 'আলিম ও শাইখ যালিম, দুরাচারী ও মুনাফিকদের সাথে কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করেই চলেন, তা নয়; বরং তাঁদের অনেকেই যালিম ও দুরাচারী শাসকদের দান ও উপহার গ্রহণ করেই জীবন নির্বাহ করেন এবং এ প্রবণতা তাঁদের মাঝে ক্রমশ বেড়েই চলছে। এটা দীনের 'আলিম ও শাইখগণের চরিত্রের একটি নতুন দিক। বস্তুতপক্ষে যালিম ও দুরাচারী শাসকদের দান ও উপহার একটি ফিতনা। এটা নৈতিক চরিত্রকে ঘুনের মতো খেয়ে ফেলে, কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেয় এবং প্রতিভাকে করে দেয় অবদমিত। আমাদের সালাফে সালিহীন এবং যুগে যুগে ইসলামের নিষ্ঠাবান সংস্কারক ও তাকওয়ার অধিকারী ব্যক্তিগণ কখনো এ জাতীয় লোকদের দান ও হাদিয়া-তুহফা গ্রহণ করতেন না।
বর্ণিত রয়েছে, তাউস ইবনু কায়সান [৩৩-১০৬হি.) (রাহ.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবি'ঈ, ফাকীহ ও মুহাদ্দিস। তিনি ইয়ামানে বসবাস করতেন। শাসক ও ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহের প্রতি তাঁর ছিল প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা। একবার তিনি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বাহ [৩৪-১১৪হি.) (রাহ.)-এর সাথে হাজ্জাজ ইবনু ইউসূফের ভাই মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফের কাছে যান। তখন শীতকাল ছিল। এ সময় মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফ তাউস (রাহ.)-এর শরীরে একটি চাদর পরিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি চাদরটি শরীর থেকে ফেলে দিলেন। এতে মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফ রাগে ফুলতে থাকে। কিন্তু তাউস (রাহ.) এর কোনোই পারওয়া করলেন না। সেখান থেকে বিদায়ের পর ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বাহ (রাহ.) বললেন,
والله إن كنت لغنيا أن تغضبه علينا لو أخذت الطيلسان فبعته وأعطيت ثمنه المساكين.
আল্লাহর কাসাম! চাদর আপনার প্রয়োজন না থাকলেও মুহাম্মাদ ইবনু ইউসূফের রাগ থেকে লোকদের বাঁচানোর জন্য তখন চাদরটা গায়ে রেখে দেয়াটাই ভালো ছিল। পরে তা বিক্রি করে মিসকীনদের মধ্যে তার মূল্য বণ্টন করে দিতে পারতেন।
তাউস (রাহ.) জবাব দেন ,نعم، لولا أن يقال من بعدي أخذه طاوس فلا يصنع فيه .ما أصنع إذا لفعلت -"তুমি স্বাভাবিক কথাই বলছো। কিন্তু তুমি কি জানো না, আজ যদি আমি এ চাদর গ্রহণ করতাম, তবে আমার এ কাজ জনগণের জন্য সনদ ও দলীলে পরিণত হতো।”৫৮৭
এরূপ অন্য একটি ঘটনা হলো, একবার উমাইয়্যা খালীফা সুলাইমান ইবনু 'আবদিল মালিক (৫৪-৯৯হি.) মাদীনায় এলেন। তিনি মাদীনার গভর্নর সাইয়িদুনা 'উমার ইবনু 'আবদিল 'আযীয (রাহ.) কে সাথে নিয়ে মাসজিদে নাবাবীতে যুহরের নামায পড়তে আসেন। নামায শেষ করে খালীফা মাকসূরার দরজার দিকে এগোলে সেখানে সাফওয়ান ইবনু সুলাইম [মৃ.১৩২হি.) (রাহ.) কে দেখতে পান। তিনি ছিলেন একজন বুযর্গ তাবি'ঈ। খালীফা সুলাইমান 'উমার ইবনু 'আবদিল 'আযীয (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করলেন, "এ বুযর্গ ব্যক্তিটি কে?" 'উমার (রাহ.) জবাব দেন, "আমীরুল মু'মিনীন, ইনি সাফওয়ান ইবনু সুলাইম।" খালীফা তাঁর গোলামকে নির্দেশ দিলেন, পাঁচশ আশরাফীর একটা থলে তাঁকে দিয়ে এসো।” গোলামটি থলেটি নিয়ে সাফওয়ান (রাহ.)-এর নিকট গিয়ে বললো, "আমীরুল মু'মিনীন উপঢৌকন হিসেবে আপনাকে এ থলে দিয়েছেন। তিনি মাসজিদেই আছেন।" সাফওয়ান (রাহ.) গোলামটিকে বললেন, "মিয়া! তুমি ভুল বুঝেছো। থলে তিনি অন্য কাউকে পাঠিয়েছেন।" গোলাম জিজ্ঞেস করলো, "আপনি সাফওয়ান নন?" তিনি জবাব দেন, "সাফওয়ান তো আমিই। কিন্তু তুমি আবার গিয়ে জিজ্ঞেস করে এসো।" গোলামটি খালীফার দিকে অগ্রসর হতেই সাফওয়ান (রাহ.) মাসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। খালীফা যতক্ষণ মাসজিদে ছিলেন, ততক্ষণ আর মাসজিদে ফিরেননি। গোলামটি অনেক খোজাখুঁজি করে নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। ৫৮৮

টিকাঃ
৫৮৫. আল-কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ২২
৫৮৬. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: তাফসীরুল কোরআন), হা. নং: ৩০৪৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং:৩৫২৯
৫৮৭. ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ৫, পৃ. ৫৪২; ইবনু 'আসাকির, তারীখু দিমাশক, খ. ৫৬, পৃ. ৩১২; ইবনুল জাওযী, সিফাতুস সাফওয়াতি, খ. ২, পৃ. ২৮৫
৫৮৮. ইবনু 'আসাকির, তারীখু দিমাশক, খ. ২৪, পৃ. ১৩০; ইবনুল জাওযী, সিফাতুস সাফওয়াতি, খ. ২, পৃ. ১৫৫; আবূ নু'আইম আল-ইস্পাহানী, হিলইয়াতুল আউলিয়া, খ. ৩, পৃ. ১৬০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00