📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আয়াতের মর্ম অনুযায়ী যথাযথ কর্তব্য পালন করা

📄 আয়াতের মর্ম অনুযায়ী যথাযথ কর্তব্য পালন করা


প্রত্যেক আয়াত তিলাওয়াতের সময় তার কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা উচিত। শান্তি ও ভীতিপূর্ণ আয়াতসমূহ পাঠ করার সময় আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে, অনুগ্রহের আয়াত পাঠকালে অনুগ্রহ প্রার্থনা করবে এবং সাজদার আয়াত আসলে 'আল্লাহু আকবার' বলে সাজদা করবে। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ لَا يَمُرُّ بِآيَةِ عَذَابٍ إِلَّا تَعَوَذَ، وَلَا بِآيَةِ رَحْمَةٍ إِلَّا سَأَلَ، وَلَا بِآيَةٍ تَنْزِيْهِ إِلَّا سبح.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম ছিল, তিলাওয়াতের সময় যখনই কোনো শাস্তি ও ভীতিপূর্ণ আয়াত আসতো, তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যখন কোনো অনুগ্রহের আয়াত আসতো, তখন তিনি অনুগ্রহ প্রার্থনা করতেন, আর যখন আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা সংক্রান্ত কোনো আয়াত আসতো, তখন 'সুবহানাল্লাহ' পাঠ করতেন। ২০৬
সর্বোপরি, কোরআনের বিধি-নিষেধ অনুযায়ী 'আমাল করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِقْرَأَ الْقُرْآنَ مَا نَهَاكَ .فَإِنْ لَمْ يَنْهَكَ فَلَسْتَ تَقْرَؤُهُ "কোরআন পড়ো। কোরআন যা কিছু তোমাকে করতে নিষেধ করে, এ জাতীয় কিছু থেকে যদি কোরআন তোমাকে বারণ করতে না পারে, তা হলে তুমি যেন কোরআনই পাঠ করলে না।”২০৭ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, إِنَّ أَكْثَرَ مُنَافِقِي أُمَّتِي قُرَّاؤُهَا - "আমার উম্মাতের অধিকাংশ মুনাফিক হলো উম্মাতের কারীগণই।" ২০৮ অর্থাৎ তারা কোরআন পড়ে; কিন্তু তার মর্মানুযায়ী 'আমাল করে না।

টিকাঃ
২০৫. গাযালী, ইহয়া, খ. ১, পৃ. ২৭৭; যামাখশারী, আল-কাশশাফ, খ. ৩, পৃ. ২৭
২০৬. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৬৬৭২, ৩৫৬৯৫; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ৩৮৩৮, ৩৮৪০
২০৭. কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৩৯২, ৭৪১; তাবারানী, মুসনাদুশ শামিয়ীন, হা. নং: ১৩৪৫
হাদীসটির সানাদ দুর্বল। (আবুল ফাদল আল-'ইরাকী, আল-মুগনী 'আন হামলিল আসফার, খ. ১, পৃ. ২২৩, হা. নং: ৮৭০)
২০৮. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৬৬৩৩, ৬৬৩৪, ১৭৩৬৭; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৫৪৭৬; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৫: ইখলাসুল 'আমাল), হা. নং: ৬৫৫৯-৬১ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ, খ. ২, পৃ. ২৪৯, হা. নং: ৭৫০)

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 প্রদর্শনেচ্ছা থেকে বেঁচে থাকা

📄 প্রদর্শনেচ্ছা থেকে বেঁচে থাকা


তিলাওয়াতের সময় মনকে প্রদর্শনেচ্ছা থেকে রক্ষা করা উচিত। যদি তিলাওয়াতের সময় লোকেরা দেখবে, শোনবে এবং প্রশংসা করবে- এরূপ রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব জাগ্রত হবার আশঙ্কা থাকে কিংবা অন্যের সালাতের ক্ষতি হবে মনে করলে চুপে চুপেই কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে। নিম্নস্বরে কোরআন তিলাওয়াতের ফাযীলাত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْجَاهِرُ بِالْقُرْآنِ كَالْجَاهِرِ بِالصَّدَقَةِ وَالْمُسِرُّ بِالْقُرْآنِ كَالْمُسِرِ بِالصَّدَقَةِ -"প্রকাশ্যে কোরআন পাঠকারী হলো প্রকাশ্যে সাদাকাহ কারীর মতো। আর গোপনে কোরআন পাঠকারী হলো গোপনে সাদাকাহ কারীর মতোই।” ২০৯ অর্থাৎ গোপনে দান করার মধ্যে যেমন প্রকাশ্য দান অপেক্ষা অধিক সাওয়াব হয়, তেমনি গোপনে কোরআন পাঠ করার মধ্যে প্রকাশ্যে পাঠ করার চাইতে অধিক সাওয়াব হয়।
কিন্তু নিজের কোরআন পাঠ যদি অন্যকে শোনাবার প্রয়োজন হয় আর এ অবস্থায় যদি লোকদেরকে দেখানোর মনোভাব না থাকে এবং পার্শ্ববর্তী লোকদের সালাতের ক্ষতি না করে, তা হলে উচ্চস্বরে কোরআন তিলাওয়াত করতে কোনো দোষ নেই; বরং অবস্থাভেদে তা উত্তমও। কারণ, এতে নিকটবর্তী লোকেরা কোরআন শোনতে পায়। বলাই বাহুল্য, কোরআন শোনলেও যথেষ্ট সাওয়াব হয়। তদুপরি এতে স্বয়ং পাঠকেরও অনেক উপকারিতা রয়েছে। তার মন সজাগ ও সতর্ক হয়। অধিক পড়ার সাহস জন্মে, উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।

টিকাঃ
২০৯. নাসাঈ, আস-সুনান, হা. নং: ২৫৬১; আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আত-তাতাও'উ), হা. নং: ১৩৩৫

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 মধুর ও সুন্দর স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করা

📄 মধুর ও সুন্দর স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করা


মধুর ও সুন্দর স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করতে চেষ্টা করা উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধুর স্বরে এবং বিশুদ্ধভাবে কোরআন পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ -“ তোমরা তোমাদের কণ্ঠগুলো দ্বারা কোরআনকে সুন্দর করে পরিবেশন করো।" ২১১ বলাই বাহুল্য, যার স্বর যত মধুর ও সুশ্রাব্য হয়, তার কোরআন তিলাওয়াত ততবেশি পরিমাণে তার নিজের এবং অন্যের অন্তরে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করে।
তবে সুন্দর কণ্ঠের নামে সুর দিয়ে গানের মতো করে কোরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ ও বিদ'আত। ২১২ তদুপরি এভাবে পড়ার কারণে কোরআনের শব্দ ও অর্থের বিকৃতি ঘটলে তা হবে হারাম। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, اقْرَءُوا الْقُرْآنَ بِلُحُوْنِ الْعَرَبِ وَأَصْوَاتِهَا، وَإِيَّاكُمْ وَلُحُوْنَ أَهْلِ الْفِسْقِ وَأَهْلِ الْكِتَابَيْنِ ، فَإِنَّهُ سَيَحِيءٍ مِنْ بَعْدِي قَوْمٌ يُرَجِعُوْنَ بِالْقُرْآنِ تَرْجِيعَ الْغِنَاءِ وَالرُّهْبَانِيَّةِ وَالنَّوْحِ لَا يُحَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ ، مَفْتُونَةً قُلُوبُهُمْ وَقُلُوْبُ مَنْ يُعْجِبُهُمْ شَأْنَهُمْ.
তোমরা 'আরবদের (কৃত্রিমতা বিবর্জিত) সুর ও কণ্ঠে কোরআন পড়ো। খবরদার! পাপিষ্ঠ ও আহলুল কিতাবদের সুর অনুকরণ করো না। আমার ইন্তিকালের পর অচিরেই এমন কিছু লোক জন্ম নেবে, যারা গান, সন্ন্যাস-কণ্ঠ ও বিলাপের মতো গলা টেনে টেনে কোরআন পড়বে। কোরআন এদের কণ্ঠদেশ অতিক্রম করবে না। তাদের অন্তকরণসমূহ মোহাবিষ্ট এবং তাদের অনুরক্তদের অন্ত করণসমূহও। ২১৩

টিকাঃ
২১০. গাযালী, ইহয়া, খ. ১, পৃ. ২৭৯
২১১. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ১২৫৬; নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ১০০৫
২১২. আবূ তালিব আল-মাক্কী, কুতুল কুলুব, খ. ১, পৃ. ২৩১; ইবনু মুফলিহ আল-মাকদিসী, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ২, পৃ. ৪২৮; খাদিমী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২২১
২১৩. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৭৪৩০; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৯: তারকুত তা'আম্মুক ফিল কোরআন), হা. নং: ২৪০৬

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 পারিশ্রমিকের আশায় কোরআন তিলাওয়াত না করা

📄 পারিশ্রমিকের আশায় কোরআন তিলাওয়াত না করা


পারিশ্রমিক লাভের আশায় কোরআন তিলাওয়াত করা সমীচীন নয়। এরূপ তিলাওয়াত না 'ইবাদাতরূপে গণ্য হবে, না পাঠকারীর আত্মশুদ্ধির কোনো কাজে আসবে। বলাই বাহুল্য, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোরআন পড়া বা খাতম করা এবং এ কাজকে জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হারাম ও বিদ'আত। ২১৬ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবা কিরাম (রা.) ও সালাফে সালিহীনের মধ্যে কেউ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোরআন পড়েছেন বা খাতম করেছেন এবং এ কাজকে জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছেন- এ ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অধিকন্তু, যারা কোরআন পড়ে অর্থকড়ি উপার্জন করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ يَتَأَكُلُ بِهِ النَّاسَ جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَوَجْهُهُ عَظْمٌ لَيْسَ عَلَيْهِ لَحْمٌ.
যে ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে রুটি-রুজি অর্জন করার উদ্দেশ্যে কোরআন পড়ে, সে কিয়ামাতের দিন এমন অবস্থায় উত্থিত হবে যে, তার চেহারায় কেবল, হাড়গোড়ই অবশিষ্ট থাকবে এবং তাতে গোশত থাকবে না। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাকে অপমানিত করবেন। ২১৭
'ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি এক কাহিনীকার ওয়া'ইযের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে কোরআন পড়ে বিনিময় চাচ্ছিল। এ দেখে তিনি 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন' পড়লেন। অতঃপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ فَلْيَسْأَلُ اللهُ بِهِ فَإِنَّهُ سَيَحِيءُ أَقْوَامٌ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ يَسْأَلُونَ بِهِ الناس.
যে ব্যক্তি কোরআন পড়ে তার যা চাওয়ার আছে তা যেন আল্লাহর নিকটই চায়। কেননা অচিরেই এমন এক দল লোকের আবির্ভাব হবে, যারা কোরআন পাঠ করবে এবং মানুষের কাছে এর বিনিময় চাইবে। ২১৮

টিকাঃ
২১৪. ইবনু মুফলিহ আল-মাকদিসী, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ২, পৃ. ৪২৭
২১৫. ইবনুল হাজ্জ, আল-মাদখাল, খ. ২, পৃ. ৩৭১
২১৬. এ বিষয়ে আমি আমার বিদ'আত ১ম খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সম্মানিত পাঠকগণকে সংশ্লিষ্ট অংশটি পড়ার জন্য অনুরোধ করছি।
২১৭. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৯: তা'যীমুল কোরআন), হা. নং: ২৩৮৪ ইবনু আবী হাতিম (রাহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীসরূপে এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। (মুনাবী, ফায়যুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৫৪) শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটি মাওদু' (জাল)। (আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দা'ঈফাহ..., খ. ৩, পৃ. ৫৩১, হা. নং: ১৩৫৬) যতটুকু জানা যায়, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা নয়। এটা বিশিষ্ট সাহাবী যাযান (রা.)-এর উক্তি। (ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৭৮২৪; ইবনু বাত্তাল, শারহু সাহীহিল বুখারী, খ. ১০, পৃ. ২৮৪) পরবর্তীকালে তাঁর এ কথাকে কোনো রাবী হয়তো ভুলক্রমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যরূপে উল্লেখ করেন।
২১৮. তিরমিযী, আল-জামি', (কিতাব: ফাদা'ইলুল কোরআন), হা. নং: ২৯১৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৯০৩৯, ১৯০৯৭ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান। শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা মতেও, হাদীসটি হাসান। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফুত সুনানিত তিরমিযী, খ. ১, পৃ. ২৫৬, হা. নং: ২৯১৭)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00