📄 কেঁদে কেঁদে কোরআন তিলাওয়াত করা
কেঁদে কেঁদে কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। সাইয়িদুনা সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, اثْلُوا الْقُرْآنَ وَابْكُوا، فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكُوا "তোমরা কুর'আন তিলাওয়াত করো আর কাঁদো। যদি একান্তই তোমাদের কান্না না আসে, তা হলে অন্তত কাঁদতে চেষ্টা করো।”২০১ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, إِذَا قَرَأْتُمْ سَجْدَةَ سُبْحَانَ فَلَا تُعَجِلُوا بِالسُّجُودِ حَتَّى تَبْكُوا فَإِنْ لَمْ تَبْكِ عَيْنُ أَحَدِكُمْ فَلْيَبْكِ قَلْبُهُ. সূরা বানী ইসরা'ঈল তিলাওয়াতের সময় সাজদার স্থানে উপস্থিত হলে তাড়াতাড়ি সাজদা না করে অন্তরের মধ্যে ক্রন্দনের ভাব জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষা করো। ক্রন্দনের চিহ্নস্বরূপ চোখে অশ্রু না আসলেও অন্তরে ক্রন্দনের ভাব আনয়ন করো। ২০২
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ نَزَلَ بِحُزْنٍ فَإِذَا - قَرَأْتُمُوهُ فَابْكُوا / فتحازَنُوا فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا হৃদয়ের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। কাজেই যখন তোমরা কোরআন তিলাওয়াত করবে, তখন তোমরা কাঁদো / চিন্তাক্লিষ্ট হও। যদি একান্তই তোমাদের কান্না না আসে, তা হলে অন্তত কাঁদতে চেষ্টা করো। "২০৩ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উবাইদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়্যাহ (রা.) কিছু লোককে সূরা সাজদাহ পাঠ করতে দেখলেন। এ সময় তারা আয়াতে সাজদায় পৌঁছে সাজদা করলেন। তখন সাফিয়্যাহ (রা.) তাদেরকে ডেকে বললেন, هَذَا السُّجُودُ وَالدُّعَاءُ فَأَيْنَ الْبُكَاءُ؟ “এই তো হলো সাজদা ও দু'আ! ক্রন্দন কোথায়?”২০৪ বিশিষ্ট যাহিদ সালিহ আল-মুররী [মৃ. ১৭৩/৬ হি.] (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট কোরআন পাঠ করছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, صَالِحُ، هَذِهِ الْقِرَاءَةُ فَأَيْنَ الْبَكَاءُ؟- "হে সালিহ, এই তো হলো নিরেট পঠন। ক্রন্দন কোথায়?” ২০৫
অতএব, কোরআনের মধ্যে যে সকল শুভ সংবাদ এবং ভীতি প্রদর্শনকারী বাণী আছে, তা মনোযোগের সাথে পাঠ করবে, অর্থের প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং নিজের দোষ-ত্রুটির কথা স্মরণ করলে অবশ্যই অন্তরে দুঃখ-চিন্তার সঞ্চার হয়ে আপনা-আপনি কান্না আসবে।
টিকাঃ
২০১. আবু 'আওয়ানাহ, আল-মুস্তাখরাজ, হা. নং: ৩১৪৭; কাদা'ঈ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১১০৭
২০২. যামাখশারী, আল-কাশাফ, খ. ৩, পৃ. ২৭; রাযী, মাফাতীহুল গায়ব, খ. ২১, পৃ. ২০০
২০৩. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: ইকামাতুস সালাত), হা. নং: ১৩৩৭; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আশ-শাহাদাত), হা. নং: ২১৫৮৯; আবূ ইয়া'লা, আল-muসনাদ, হা. নং: ৬৮৯; যামাখশারী, আল-কাশ্শাফ, খ. ৩, পৃ. ২৭। হাদীসটি সূত্রগতদিক থেকে দুর্বল।
২০৪. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৬৬৮১
📄 আয়াতের মর্ম অনুযায়ী যথাযথ কর্তব্য পালন করা
প্রত্যেক আয়াত তিলাওয়াতের সময় তার কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা উচিত। শান্তি ও ভীতিপূর্ণ আয়াতসমূহ পাঠ করার সময় আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে, অনুগ্রহের আয়াত পাঠকালে অনুগ্রহ প্রার্থনা করবে এবং সাজদার আয়াত আসলে 'আল্লাহু আকবার' বলে সাজদা করবে। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ لَا يَمُرُّ بِآيَةِ عَذَابٍ إِلَّا تَعَوَذَ، وَلَا بِآيَةِ رَحْمَةٍ إِلَّا سَأَلَ، وَلَا بِآيَةٍ تَنْزِيْهِ إِلَّا سبح.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম ছিল, তিলাওয়াতের সময় যখনই কোনো শাস্তি ও ভীতিপূর্ণ আয়াত আসতো, তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যখন কোনো অনুগ্রহের আয়াত আসতো, তখন তিনি অনুগ্রহ প্রার্থনা করতেন, আর যখন আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা সংক্রান্ত কোনো আয়াত আসতো, তখন 'সুবহানাল্লাহ' পাঠ করতেন। ২০৬
সর্বোপরি, কোরআনের বিধি-নিষেধ অনুযায়ী 'আমাল করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِقْرَأَ الْقُرْآنَ مَا نَهَاكَ .فَإِنْ لَمْ يَنْهَكَ فَلَسْتَ تَقْرَؤُهُ "কোরআন পড়ো। কোরআন যা কিছু তোমাকে করতে নিষেধ করে, এ জাতীয় কিছু থেকে যদি কোরআন তোমাকে বারণ করতে না পারে, তা হলে তুমি যেন কোরআনই পাঠ করলে না।”২০৭ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, إِنَّ أَكْثَرَ مُنَافِقِي أُمَّتِي قُرَّاؤُهَا - "আমার উম্মাতের অধিকাংশ মুনাফিক হলো উম্মাতের কারীগণই।" ২০৮ অর্থাৎ তারা কোরআন পড়ে; কিন্তু তার মর্মানুযায়ী 'আমাল করে না।
টিকাঃ
২০৫. গাযালী, ইহয়া, খ. ১, পৃ. ২৭৭; যামাখশারী, আল-কাশশাফ, খ. ৩, পৃ. ২৭
২০৬. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৬৬৭২, ৩৫৬৯৫; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ৩৮৩৮, ৩৮৪০
২০৭. কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৩৯২, ৭৪১; তাবারানী, মুসনাদুশ শামিয়ীন, হা. নং: ১৩৪৫
হাদীসটির সানাদ দুর্বল। (আবুল ফাদল আল-'ইরাকী, আল-মুগনী 'আন হামলিল আসফার, খ. ১, পৃ. ২২৩, হা. নং: ৮৭০)
২০৮. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৬৬৩৩, ৬৬৩৪, ১৭৩৬৭; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৫৪৭৬; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৫: ইখলাসুল 'আমাল), হা. নং: ৬৫৫৯-৬১ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ, খ. ২, পৃ. ২৪৯, হা. নং: ৭৫০)
📄 প্রদর্শনেচ্ছা থেকে বেঁচে থাকা
তিলাওয়াতের সময় মনকে প্রদর্শনেচ্ছা থেকে রক্ষা করা উচিত। যদি তিলাওয়াতের সময় লোকেরা দেখবে, শোনবে এবং প্রশংসা করবে- এরূপ রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব জাগ্রত হবার আশঙ্কা থাকে কিংবা অন্যের সালাতের ক্ষতি হবে মনে করলে চুপে চুপেই কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে। নিম্নস্বরে কোরআন তিলাওয়াতের ফাযীলাত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْجَاهِرُ بِالْقُرْآنِ كَالْجَاهِرِ بِالصَّدَقَةِ وَالْمُسِرُّ بِالْقُرْآنِ كَالْمُسِرِ بِالصَّدَقَةِ -"প্রকাশ্যে কোরআন পাঠকারী হলো প্রকাশ্যে সাদাকাহ কারীর মতো। আর গোপনে কোরআন পাঠকারী হলো গোপনে সাদাকাহ কারীর মতোই।” ২০৯ অর্থাৎ গোপনে দান করার মধ্যে যেমন প্রকাশ্য দান অপেক্ষা অধিক সাওয়াব হয়, তেমনি গোপনে কোরআন পাঠ করার মধ্যে প্রকাশ্যে পাঠ করার চাইতে অধিক সাওয়াব হয়।
কিন্তু নিজের কোরআন পাঠ যদি অন্যকে শোনাবার প্রয়োজন হয় আর এ অবস্থায় যদি লোকদেরকে দেখানোর মনোভাব না থাকে এবং পার্শ্ববর্তী লোকদের সালাতের ক্ষতি না করে, তা হলে উচ্চস্বরে কোরআন তিলাওয়াত করতে কোনো দোষ নেই; বরং অবস্থাভেদে তা উত্তমও। কারণ, এতে নিকটবর্তী লোকেরা কোরআন শোনতে পায়। বলাই বাহুল্য, কোরআন শোনলেও যথেষ্ট সাওয়াব হয়। তদুপরি এতে স্বয়ং পাঠকেরও অনেক উপকারিতা রয়েছে। তার মন সজাগ ও সতর্ক হয়। অধিক পড়ার সাহস জন্মে, উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
টিকাঃ
২০৯. নাসাঈ, আস-সুনান, হা. নং: ২৫৬১; আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আত-তাতাও'উ), হা. নং: ১৩৩৫
📄 মধুর ও সুন্দর স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করা
মধুর ও সুন্দর স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করতে চেষ্টা করা উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধুর স্বরে এবং বিশুদ্ধভাবে কোরআন পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ -“ তোমরা তোমাদের কণ্ঠগুলো দ্বারা কোরআনকে সুন্দর করে পরিবেশন করো।" ২১১ বলাই বাহুল্য, যার স্বর যত মধুর ও সুশ্রাব্য হয়, তার কোরআন তিলাওয়াত ততবেশি পরিমাণে তার নিজের এবং অন্যের অন্তরে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করে।
তবে সুন্দর কণ্ঠের নামে সুর দিয়ে গানের মতো করে কোরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ ও বিদ'আত। ২১২ তদুপরি এভাবে পড়ার কারণে কোরআনের শব্দ ও অর্থের বিকৃতি ঘটলে তা হবে হারাম। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, اقْرَءُوا الْقُرْآنَ بِلُحُوْنِ الْعَرَبِ وَأَصْوَاتِهَا، وَإِيَّاكُمْ وَلُحُوْنَ أَهْلِ الْفِسْقِ وَأَهْلِ الْكِتَابَيْنِ ، فَإِنَّهُ سَيَحِيءٍ مِنْ بَعْدِي قَوْمٌ يُرَجِعُوْنَ بِالْقُرْآنِ تَرْجِيعَ الْغِنَاءِ وَالرُّهْبَانِيَّةِ وَالنَّوْحِ لَا يُحَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ ، مَفْتُونَةً قُلُوبُهُمْ وَقُلُوْبُ مَنْ يُعْجِبُهُمْ شَأْنَهُمْ.
তোমরা 'আরবদের (কৃত্রিমতা বিবর্জিত) সুর ও কণ্ঠে কোরআন পড়ো। খবরদার! পাপিষ্ঠ ও আহলুল কিতাবদের সুর অনুকরণ করো না। আমার ইন্তিকালের পর অচিরেই এমন কিছু লোক জন্ম নেবে, যারা গান, সন্ন্যাস-কণ্ঠ ও বিলাপের মতো গলা টেনে টেনে কোরআন পড়বে। কোরআন এদের কণ্ঠদেশ অতিক্রম করবে না। তাদের অন্তকরণসমূহ মোহাবিষ্ট এবং তাদের অনুরক্তদের অন্ত করণসমূহও। ২১৩
টিকাঃ
২১০. গাযালী, ইহয়া, খ. ১, পৃ. ২৭৯
২১১. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ১২৫৬; নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ১০০৫
২১২. আবূ তালিব আল-মাক্কী, কুতুল কুলুব, খ. ১, পৃ. ২৩১; ইবনু মুফলিহ আল-মাকদিসী, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ২, পৃ. ৪২৮; খাদিমী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২২১
২১৩. তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৭৪৩০; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৯: তারকুত তা'আম্মুক ফিল কোরআন), হা. নং: ২৪০৬