📄 ধীরে ধীরে কোরআন পাঠ করা
তারতীল সহকারে ধীরে ধীরে অর্থাৎ তাজবীদ শাস্ত্রের নিয়ম-কানুন মেনে কোরআন পাঠ করতে হবে। তাড়াতাড়ি শেষ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম ছিল, তিনি ধীরে ধীরে ও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। ইয়া'লা ইবনু মামলাক (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার উম্মুল মু'মিনীন উম্মু সালামাহ (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোরআন পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি এমন কিরাআত বর্ণনা করলেন, যা ছিল স্পষ্ট এবং পৃথক পৃথক হারফে।”১৯৯ অর্থাৎ তাঁর তিলাওয়াত ছিল ধীরে ধীরে এবং এতোটাই স্পষ্ট যে, হারফসমূহ এক একটি করে গণনা করাও সম্ভব। ইমামগণের সর্বসম্মত মতানুযায়ী অতি দ্রুত কোরআন পড়া মাকরূহ। তাঁদের মতে, তারতীল বিহীন দু'পারা কোরআন শারীফ পড়ার চেয়ে ঐ সময়ের মধ্যে তারতীলের সাথে এক পারা পড়াই শ্রেয়। ২০০ বর্তমানে খাতমে কোরআনের দাওয়াত পড়তে অভ্যস্ত অনেককেই কোরআন পড়ার সময় এবং সচরাচর হাফিযদেরকে তারাবীহ নামাযের সময় অতি দ্রুত কোরআন শারীফ পড়তে দেখা যায়। আবার অনেকেই এতো দ্রুত কোরআন পড়তে পারাকেই গৌরবের কাজ বলেও মনে করেন। তাঁদের কেউ কেউ এতো দ্রুততার সাথে তিলাওয়াত করেন যে, হারফগুলোই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় না এবং মুসাল্লীদের বোঝতে অসুবিধা হয়।
টিকাঃ
১৯৯. وَتَعْنَتْ قِرَاءَتَهُ فَإِذَا هِيَ تَنْعَتْ قِرَاءَةٌ مُفَسَّرَةً حَرْفًا حَرْفًا ... ۵۵۵ (আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ১৪৬৬; নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুস সালাত), হা. নং: ১০২২; তিরমিযী, আস-সুনান, [ কিতাব: ফাদা'য়িলুল কোরআন), হা. নং: ২৯২৩) ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ আলবানী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানি আবী দাউদ, খ. ৩, পৃ. ৪৬৬, হা. নং:১৪৬৬)
২০০. আল-মাওস্'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ. ১৩, পৃ. ২৫৪; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার 'ইয়্যাহ, খ. ২, পৃ. ৪২ বর্ণিত রয়েছে যে, সাইয়িদুনা 'আলকামাহ (রাহ.) খুবই সুন্দর করে কোরআন পড়তে জানতেন। একবার তিনি সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.)-এর নিকট একটু দ্রুত গতিতেই কুর'আন তিলাওয়াত করলেন। তা শোনে ইবনু মাস'উদ (রা.) বললেন, فِدَاكَ أَبِي وَأُمِّيْ، رَتِّلْ، رَتِّلْ زَيِّنُ القُرْآنَ- "আমার পিতামাতা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক! ধীর-স্থিরভাবে কোরআন পড়ো। কেননা এটাই হলো কোরআনের সৌন্দর্য।" (ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ১, পৃ. ৭৮) একবার বিশিষ্ট তাবি'ঈ মুজাহিদ (রা.) থেকে দু জন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়। তাদের একজন এক রাক'আতের মধ্যে সূরা বাকারাহ ও সূরা আলু 'ইমরান তিলাওয়াত করেন এবং অপরজন ঠিক একই সময়ের মধ্যে কেবল সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করেন। উপরন্তু, তাদের দু জনেরই রুকূ', সাজদা ও জালসা একই রূপ। এ দু'জনের মধ্যে কে উত্তম? তিনি জবাব দিলেন- তাদের মধ্যে উত্তম হলো যে ব্যক্তি কেবল সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করেছেন। এ বলে তিনি তিলাওয়াত করলেন- (..وَقُرْآنَا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثِ) - "আর আমি কোরআনকে ভাগ ভাগ করে পাঠের উপযোগী করেছি, যাতে আপনি তা লোকদের কাছে ধীরে ধীরে পাঠ করেন।..." [আল কোরআন, সূরা বনী ইসরা'ঈল, ১৭: ১০৬) (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, খ. ১৪, পৃ. ২৬৪; আজুরী, আখলাকু হামালাতিল কোরআন, হা. নং: ৮৫, পৃ. ৯৬)
📄 চিন্তা-ভাবনা সহকারে কোরআন পাঠ করা
অর্থের দিকে মনোযোগ ও চিন্তা-ভাবনা সহকারে কোরআন পাঠ করতে হবে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোরআন মাজীদ কেউ বোঝে পড়ক বা না- বোঝে পড়ুক- উভয় অবস্থায় যদিও পাঠক প্রচুর সাওয়াব ও কল্যাণ লাভ করবে; কিন্তু কোরআন যে উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে তা যদি অর্জন করতে হয়, তা হলে চিন্তা-ভাবনা সহকারে কোরআন পাঠ করতে হবে। তা না হলে পবিত্র কোরআন থেকে দুনিয়া ও আখিরাতের যথার্থ কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করা দুরূহ হবে।
📄 কেঁদে কেঁদে কোরআন তিলাওয়াত করা
কেঁদে কেঁদে কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। সাইয়িদুনা সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, اثْلُوا الْقُرْآنَ وَابْكُوا، فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكُوا "তোমরা কুর'আন তিলাওয়াত করো আর কাঁদো। যদি একান্তই তোমাদের কান্না না আসে, তা হলে অন্তত কাঁদতে চেষ্টা করো।”২০১ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, إِذَا قَرَأْتُمْ سَجْدَةَ سُبْحَانَ فَلَا تُعَجِلُوا بِالسُّجُودِ حَتَّى تَبْكُوا فَإِنْ لَمْ تَبْكِ عَيْنُ أَحَدِكُمْ فَلْيَبْكِ قَلْبُهُ. সূরা বানী ইসরা'ঈল তিলাওয়াতের সময় সাজদার স্থানে উপস্থিত হলে তাড়াতাড়ি সাজদা না করে অন্তরের মধ্যে ক্রন্দনের ভাব জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষা করো। ক্রন্দনের চিহ্নস্বরূপ চোখে অশ্রু না আসলেও অন্তরে ক্রন্দনের ভাব আনয়ন করো। ২০২
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ نَزَلَ بِحُزْنٍ فَإِذَا - قَرَأْتُمُوهُ فَابْكُوا / فتحازَنُوا فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا হৃদয়ের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। কাজেই যখন তোমরা কোরআন তিলাওয়াত করবে, তখন তোমরা কাঁদো / চিন্তাক্লিষ্ট হও। যদি একান্তই তোমাদের কান্না না আসে, তা হলে অন্তত কাঁদতে চেষ্টা করো। "২০৩ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উবাইদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়্যাহ (রা.) কিছু লোককে সূরা সাজদাহ পাঠ করতে দেখলেন। এ সময় তারা আয়াতে সাজদায় পৌঁছে সাজদা করলেন। তখন সাফিয়্যাহ (রা.) তাদেরকে ডেকে বললেন, هَذَا السُّجُودُ وَالدُّعَاءُ فَأَيْنَ الْبُكَاءُ؟ “এই তো হলো সাজদা ও দু'আ! ক্রন্দন কোথায়?”২০৪ বিশিষ্ট যাহিদ সালিহ আল-মুররী [মৃ. ১৭৩/৬ হি.] (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট কোরআন পাঠ করছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, صَالِحُ، هَذِهِ الْقِرَاءَةُ فَأَيْنَ الْبَكَاءُ؟- "হে সালিহ, এই তো হলো নিরেট পঠন। ক্রন্দন কোথায়?” ২০৫
অতএব, কোরআনের মধ্যে যে সকল শুভ সংবাদ এবং ভীতি প্রদর্শনকারী বাণী আছে, তা মনোযোগের সাথে পাঠ করবে, অর্থের প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং নিজের দোষ-ত্রুটির কথা স্মরণ করলে অবশ্যই অন্তরে দুঃখ-চিন্তার সঞ্চার হয়ে আপনা-আপনি কান্না আসবে।
টিকাঃ
২০১. আবু 'আওয়ানাহ, আল-মুস্তাখরাজ, হা. নং: ৩১৪৭; কাদা'ঈ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১১০৭
২০২. যামাখশারী, আল-কাশাফ, খ. ৩, পৃ. ২৭; রাযী, মাফাতীহুল গায়ব, খ. ২১, পৃ. ২০০
২০৩. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: ইকামাতুস সালাত), হা. নং: ১৩৩৭; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আশ-শাহাদাত), হা. নং: ২১৫৮৯; আবূ ইয়া'লা, আল-muসনাদ, হা. নং: ৬৮৯; যামাখশারী, আল-কাশ্শাফ, খ. ৩, পৃ. ২৭। হাদীসটি সূত্রগতদিক থেকে দুর্বল।
২০৪. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৬৬৮১
📄 আয়াতের মর্ম অনুযায়ী যথাযথ কর্তব্য পালন করা
প্রত্যেক আয়াত তিলাওয়াতের সময় তার কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা উচিত। শান্তি ও ভীতিপূর্ণ আয়াতসমূহ পাঠ করার সময় আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে, অনুগ্রহের আয়াত পাঠকালে অনুগ্রহ প্রার্থনা করবে এবং সাজদার আয়াত আসলে 'আল্লাহু আকবার' বলে সাজদা করবে। সাইয়িদুনা হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ لَا يَمُرُّ بِآيَةِ عَذَابٍ إِلَّا تَعَوَذَ، وَلَا بِآيَةِ رَحْمَةٍ إِلَّا سَأَلَ، وَلَا بِآيَةٍ تَنْزِيْهِ إِلَّا سبح.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম ছিল, তিলাওয়াতের সময় যখনই কোনো শাস্তি ও ভীতিপূর্ণ আয়াত আসতো, তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যখন কোনো অনুগ্রহের আয়াত আসতো, তখন তিনি অনুগ্রহ প্রার্থনা করতেন, আর যখন আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা সংক্রান্ত কোনো আয়াত আসতো, তখন 'সুবহানাল্লাহ' পাঠ করতেন। ২০৬
সর্বোপরি, কোরআনের বিধি-নিষেধ অনুযায়ী 'আমাল করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِقْرَأَ الْقُرْآنَ مَا نَهَاكَ .فَإِنْ لَمْ يَنْهَكَ فَلَسْتَ تَقْرَؤُهُ "কোরআন পড়ো। কোরআন যা কিছু তোমাকে করতে নিষেধ করে, এ জাতীয় কিছু থেকে যদি কোরআন তোমাকে বারণ করতে না পারে, তা হলে তুমি যেন কোরআনই পাঠ করলে না।”২০৭ অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন, إِنَّ أَكْثَرَ مُنَافِقِي أُمَّتِي قُرَّاؤُهَا - "আমার উম্মাতের অধিকাংশ মুনাফিক হলো উম্মাতের কারীগণই।" ২০৮ অর্থাৎ তারা কোরআন পড়ে; কিন্তু তার মর্মানুযায়ী 'আমাল করে না।
টিকাঃ
২০৫. গাযালী, ইহয়া, খ. ১, পৃ. ২৭৭; যামাখশারী, আল-কাশশাফ, খ. ৩, পৃ. ২৭
২০৬. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৬৬৭২, ৩৫৬৯৫; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ৩৮৩৮, ৩৮৪০
২০৭. কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৩৯২, ৭৪১; তাবারানী, মুসনাদুশ শামিয়ীন, হা. নং: ১৩৪৫
হাদীসটির সানাদ দুর্বল। (আবুল ফাদল আল-'ইরাকী, আল-মুগনী 'আন হামলিল আসফার, খ. ১, পৃ. ২২৩, হা. নং: ৮৭০)
২০৮. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৬৬৩৩, ৬৬৩৪, ১৭৩৬৭; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৫৪৭৬; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৫: ইখলাসুল 'আমাল), হা. নং: ৬৫৫৯-৬১ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ, খ. ২, পৃ. ২৪৯, হা. নং: ৭৫০)