📄 আল-আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহী 'আনিল মুনকার
'আল-আমরু বিল মা'রূফ ওয়ান নাহয় 'আনিল মুনকার'-এর অর্থ হলো সৎ কাজের আদেশ দান করা ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করা। এটা দীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফারয। কেউ কেউ একে ইসলামের ষষ্ঠ রুকন রূপেও গণ্য করেছেন। ১৭৭ প্রত্যেক মু'মিনই অপর মু'মিন ভাইয়ের সংশোধনের উদ্দেশ্যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে নিজ নিজ সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী এ দায়িত্ব পালন করে যাবে- এটাই হলো তার প্রতি ঈমানের অনিবার্য দাবি। অর্থাৎ একজন মু'মিনের সাফল্যের জন্য শুধু এতটুকু পদক্ষেপই যথেষ্ট নয় যে, সে শুধু নিজেই ভালো কাজ করে যাবে; বরং সে নিজের চরিত্র ও কার্যকলাপ যেমন সংশোধন করবে, তেমনি তাকে তার অন্যান্য ভাইয়ের চরিত্র ও কার্যকলাপ সংশোধনের জন্যও চেষ্টা চালাতে হবে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ
মু'মিন নর-নারীগণ প্রত্যেকেই একে অপরের বন্ধু। তারা পরস্পরকে ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা দেবে। ১৭৮ এ বিষয়টি সূরা আল-'আসরে আরো জোরালোভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالْعَصْرِ (১) إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ (২) إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
কালের শপথ! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে নির্দেশ দেয় সত্যের এবং নির্দেশ দেয় সবরের। ১৭৯ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ.
তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় কর্ম হতে দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা (অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ করে) পরিবর্তন করে দেয়। যদি সে তা করতে অক্ষম হয়, তবে সে মুখ দ্বারা তার প্রতিবাদ করবে। যদি সে তাও না পারে, তা হলে সে অন্তত তা কীভাবে প্রতিহত করা যায়- তা অন্তর দ্বারা চিন্তা করবে। এটা ঈমানের দুর্বলতম স্তর। ১৮০
কখনো কখনো সামষ্টিকভাবেও এ দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, উম্মাতের মধ্যে সর্বসময় এমন একটি দল থাকা প্রয়োজন, যাদের কাজই হবে লোকদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান জানানো, সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে কল্যাণের দিকে, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর এ সব লোকই সফলকাম। ১৮১
বলাই বাহুল্য, মুসলিম উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্বের রহস্যও এ গুরু দায়িত্ব পালনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بالله
তোমরাই হলে সর্বোত্তম দল, মানব জাতির কল্যাণ সাধনের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে, অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর বিধি-নিষেধ মনেপ্রাণে মেনে নেবে। ১৮২
উপর্যুক্ত আয়াতগুলো থেকে জানা যায় যে, সাফল্য, কল্যাণ ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভের জন্য নিজের সংশোধনই যথেষ্ট নয়; বরং অপরের সংশোধনের চিন্তাও জরুরী। বরঞ্চ নিজের সংশোধন যতটুকু জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ, অন্য মুসলিমের সংশোধনের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করাও ঠিক ততটুকুই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের জাতিসমূহের ওপরও এ দায়িত্বটি ন্যস্ত ছিল। কিন্তু তারা তা পালনের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেছিল। এ কারণে তারা অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ . كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ﴾
বানু ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফির, তাদেরকে দাউদ ও মারইয়াম তনয় 'ঈসা (আ.)-এর মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করতো এবং সীমা লঙ্ঘন করতো। তারা পরস্পরকে অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করতো না, যা তারা করতো। আর তারা যা করতো তা খুবই খারাপ ছিল। ১৮৩
উপর্যুক্ত আয়াতগুলো থেকে আরো জানা যায় যে, কেবল নিজেদের 'আমাল মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে না, বিশেষত আপন পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের কুকর্ম থেকে ফিরিয়ে রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তা না হলে নিজের মুক্তির পথও রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে, যদিও নিজে পুরোপুরিই সৎকর্মপরায়ণ হয়।
টিকাঃ
১৭৭. উসাইমীন, শারহু রিয়াদিস সালিহীন, পৃ.২২৬
১৭৮. আল কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৭১
১৭৯. আল কোরআন, সূরা আল-'আসর, ১০৩: ১-৩
১৮০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৮৬
১৮১. আল কোরআন, সূরা আলি 'ইমরান, ৩: ১০৪
১৮২. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১১০