📄 জিহাদ
'জিহাদ' হলো মানুষের ওপর থেকে গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য শক্তির) প্রভুত্ব বিদূরিত করে কেবল মহান সার্বভৌম আল্লাহ তা'আলার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তাগুতের (আল্লাহদ্রোহী শক্তির) বিরুদ্ধে জান-মাল উৎসর্গ করে সর্বাত্মক চেষ্টা-সংগ্রাম করা। এ জিহাদ প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফারয। ১৬৪ বিশিষ্ট সাহাবী হুযাইফাহ ইবনুল ইয়ামান ও 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর ইবনুল 'আস (রা.) একে ইসলামের পাঁচটি রুকনের পর ষষ্ঠ রুকন রূপে গণ্য করেছেন। ১৬৫ প্রত্যেকেই এ পথে পরিবেশ ও পরিস্থিতির চাহিদা মাফিক নিজ নিজ সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাবে- এটাই হলো তার প্রতি ঈমানের অনিবার্য দাবি এবং মাগফিরাত ও নাজাত লাভের একটি শ্রেষ্ঠ পথ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْحِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ . تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ . يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ . وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِنَ اللهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ)
হে সে সব লোক, যারা ঈমান এনেছো! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের নির্দেশনা দেবো, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে রেহাই দেবে? তা হলো এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যাবতীয় বিধি-নিষেধ মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নেবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের জান-মাল উৎসর্গ করে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম ব্যবস্থা, যদি তোমরা বোঝে থাকো। তবেই তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা সতত প্রবহমান, (সর্বোপরি) তিনি তোমাদের আরো প্রবেশ করাবেন জান্নাতের স্থায়ী নিবাসস্থলের পবিত্র ঘরসমূহে। আর এটাই হলো মহাসাফল্য। তদুপরি আরো একটি অনুগ্রহ তিনি দান করবেন, যা তোমরা পছন্দ করো। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। মু'মিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন। ১৬৬
ইসলাম-পূর্ববর্তী বিভিন্ন ধর্মের দরবেশ ও সাধকরা আত্মশুদ্ধি, উন্নয়ন ও আল্লাহপ্রাপ্তির মহান উদ্দেশ্যে সংসার ও পার্থিব আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে লোকালয় থেকে দূরে কোথাও জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ে গিয়ে কিংবা বনে-জঙ্গলে- তেপান্তরে ঘুরে ঘুরে নির্জনে একাগ্রচিত্তে সর্বক্ষণ আল্লাহর যিকর, 'ইবাদাত ও ধ্যানকেই একান্ত মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তবে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহপ্রাপ্তির জন্য এ পথ আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব রচিত ও নতুন উদ্ভাবিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَرَهْبَانِيَّةُ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে। আমি এটা তাদের ওপর ফারয করিনি। কিন্তু তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এটা অবলম্বন করেছে। "১৬৭
ইসলাম একটি বিজ্ঞান ও স্বভাবসম্মত জীবনব্যবস্থা হিসেবে অতীতের সাধক ও দরবেশগণের এ নতুন উদ্ভাবিত সাধনা-পদ্ধতিকে সমর্থন করতে পারে নি; বরং ইসলাম তা সম্পূর্ণরূপে রহিত ঘোষণা করেছে এবং এর পরিবর্তে তাগুতের বিরুদ্ধে জান-মাল উৎসর্গ করে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছে। আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এক অভিযানে যাচ্ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এক গুহার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে কিছু পানি রয়েছে। তখন সে মনে মনে ভাবলো, ঐ গুহাতে সে অবস্থান করবে এবং সেখানে যে পানি রয়েছে এবং আশেপাশে যে সবজি রয়েছে তা সে ভক্ষণ করবে। এভাবে সে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এরপর সে মনে মনে বললো, যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছি, তাঁকে কথাটি বলবো। যদি তিনি অনুমতি দেন তো ভালো, তা-ই করবো। অন্যথায় তা করবো না। এরপর লোকটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে তার মনের ইচ্ছার কথা তাঁকে প্রকাশ করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথা শুনে জবাব দিলেন,
إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ بِالْيَهُودِيَّةِ وَلَا بِالنَّصْرَانِيَّةِ وَلَكِنِّي بُعِثْتُ بِالْحَنِيفِيَّةِ السَّمْحَةِ وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَغَدْوَةٌ أَوْ رَوْحَةٌ فِي سَبِيلِ اللهِ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا وَلَمُقَامُ أَحَدِكُمْ فِي الصَّفِّ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِهِ سِتِّينَ سَنَةً.
আমি ইয়াহুদী ধর্মদর্শন এবং খ্রিস্টান ধর্মদর্শন যোগে প্রেরিত হইনি। আমি প্রেরিত হয়েছি এক সত্যনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত উদারনৈতিক জীবনব্যবস্থা নিয়ে। সে যাতের কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে! আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়িত একটি সকাল বা একটি বিকাল দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল কিছু থেকেই উত্তম। যুদ্ধের কাতারে তোমাদের কারো দাঁড়ানো তার ষাট বৎসরের সালাতের চেয়ে উত্তম। ১৬৮
অপর একটি হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, জনৈক ব্যক্তি আরয করলো, يَا رَسُولَ اللهِ انْذَنْ لِي فِي السَّيَاحَةِ “ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে 'ইবাদাতের জন্য অরণ্যে পরিভ্রমণ করতে অনুমতি দিন।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, إِنَّ سِيَاحَةَ أُمَّتِي الْجَهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ تَعَالَى-"আমার উম্মাতের পরিভ্রমণ হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।”১৬৯ আরো বর্ণিত রয়েছে, 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.)-এর সময় কয়েকজন 'আবিদ কুফার বাইরে গিয়ে একটি মাসজিদ তৈরি করেন এবং সেখানে তাঁরা একান্তে নিভৃতে 'ইবাদাত করতেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: 'আমর ইবনু 'উতবাহ ও মুফাদ্দাল আল-'আজালী (রাহ.) প্রমুখ। ইবনু মাস'উদ (রা.) এ খবর পেয়ে তাঁদের কাছে যান এবং তাঁদেরকে কৃষ্ণায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন ও তাঁদের মাসজিদটি ভেঙ্গে দেন। উপরন্তু, তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, إما أن تَكُونُوا أَهْدَى مِنْ أَصْحَابِ مُحَمَّدٍ أَوْ تَكُونُوا مُتَمَسْكِينَ بِذَنْبِ الضَّلَالَةِ. তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের চাইতে অধিক হিদায়াতপ্রাপ্ত অথবা তোমরা ভ্রষ্টতাকেই আঁকড়ে ধরেছো। "১৭০
উপর্যুক্ত হাদীসসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, সমাজ ও লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো গুহায় বা আশ্রমে নিভৃতে 'ইবাদাত করার যে রীতি তা ইসলামে অনুমোদিত নয়; এটা অন্যান্য ধর্মের সংসারত্যাগী সাধকদের রীতি।
এর পরিবর্তে ইসলাম তাঁর অনুসারীগণকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের নির্দেশ দান করেছে। আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, عَلَيْكَ بِالْجِهَادِ فَإِنَّهُ رَهْبَائِيَّةُ أُمَّتِي - “তোমার জিহাদ করা উচিত। কেননা জিহাদই হলো আমার উম্মাতের বৈরাগ্য-সাধনা।”১৭১ সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'উসমান ইবনু মায'উন (রা.)-এর এক ছেলে মারা যাওয়ার পর তিনি এতোই বিমর্ষ হয়ে পড়েন যে, তিনি বাইরে যাতায়াত বন্ধ করে দেন এবং নিজের বাড়ির মধ্যে 'ইবাদাতের জন্য একটি মাসজিদ তৈরি করেন। এ খবর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছার পর তিনি তাঁকে ডেকে বললেন, يَا عُثْمَانُ ، إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمْ يَكْتُبْ عَلَيْنَا الرَّهْبَانِيَّةَ ، إِنَّمَا رَهْبَانِيَّةُ أُمَّتِي الْحِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - “উসমান! আল্লাহ তা'আলা আমাদের ওপর বৈরাগ্য-সাধনাকে ফারয করে দেননি। আমার উম্মাতের বৈরাগ্যসাধনা হলো আল্লাহর পথে জিহাদ।"১৭২ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِنَ نِفَاقٍ - "যে ব্যক্তি মারা গেলো এ অবস্থায় যে, সে কোনো যুদ্ধই করলো না কিংবা। তার অন্তরে এরূপ কোনো ভাবনাই উদ্রেক হলো না, তবে সে নিফাকের একটি ডালের ওপর মৃত্যুবরণ করলো। ১৭৩
'জিহাদ' আত্মশুদ্ধির একটি উৎকৃষ্ট ব্যবস্থাও। আল্লাহ তা'আলা মানুষের স্বভাবের মধ্যে পরস্পর বিরোধী কিছু প্রবণতা (যেমন রাগ, কঠোরতা ও প্রতিশোধস্পৃহা এবং দয়া, সহানুভূতি, ভালোবাসা ও ক্ষমা প্রভৃতি) দান করেছেন এবং এগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রও পৃথক পৃথক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমন- রাগ, কঠোরতা ও প্রতিশোধস্পৃহা প্রভৃতি প্রবণতার আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত প্রায়োগিক ক্ষেত্র হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুরা। অপর দিকে দয়া, সহানুভূতি, ভালোবাসা ও ক্ষমা প্রভৃতি প্রবণতার উপযুক্ত প্রায়োগিক ক্ষেত্র হলো আল্লাহর মু'মিন বান্দাহগণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাহদের গুণাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاء بَيْنَهُمْ - "মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। ১৭৪ এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, মু'মিনদের রাগ ও কঠোরতার একান্ত ক্ষেত্র হলো কাফিররা, অপর দিকে তাঁদের দয়া ও সহানুভূতির একান্ত ক্ষেত্র হলো তাঁদের মু'মিন ভাইয়েরা।
উল্লেখ যে, এ প্রবণতাগুলো যেহেতু মানুষের স্বভাবজাত এবং অবশ্যই প্রকাশমান, তাই এগুলো যদি স্ব স্ব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা না হয়, তা হলে এগুলো বিপরীত ক্ষেত্রে যে ব্যবহৃত হবে, তা বলাই বাহুল্য। অর্থাৎ মু'মিনগণ যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদেরকে তাঁদের রাগ, কঠোরতা ও প্রতিশোধস্পৃহা পূরণের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে না নেন, তা হলে তাঁদের এ মন্দ প্রবণতাগুলোর ক্ষেত্রে পরিণত হবে তার মু'মিন ভাইয়েরাই। এরূপ অবস্থায় মু'মিন ব্যক্তিদের নিজেদের ব্যক্তিগত চরিত্র যেমন কলুষিত হবে, তেমনি মুসলিম সমাজেও এর অনিবার্য পরিণতিস্বরূপ দেখা দেবে ভাঙ্গন, বিশৃঙ্খলা, হানাহানি ও পরাজয়। এ দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِلَّا تَنْفِرُوا يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْئًا وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
যদি তোমরা জিহাদের জন্য বের না হও, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দান করবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। ১৭৫
অপর দিকে তাঁরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদেরকে তাঁদের রাগ, কঠোরতা ও প্রতিশোধস্পৃহা পূরণের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন, তবেই তাঁদের নিজেদের মধ্যে দয়া, সহানুভূতি, ভালোবাসা ও ক্ষমা প্রভৃতি প্রবণতার চর্চা শুরু হবে এবং তা ক্রমশ বৃদ্ধি লাভ করতে থাকবে। এর ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে যেমন সুন্দর ও নির্মল চরিত্রের বিকাশ ঘটবে, তেমনি তাঁদের সমাজেও বিরাজ করবে অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশ এবং তা উত্তরোত্তর শান্তি, সমৃদ্ধি ও বিজয়ের পথে এগিয়ে চলবে এবং এক পর্যায়ে গিয়ে আল্লাহর দীন পরিপূর্ণরূপে বিজয় লাভ করবে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَاللَّهُ لَيَتِمَّنَّ اللَّهُ هَذَا الأَمْرَ حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مَا بَيْنَ صَنْعَاءَ وَحَضْرَمَوْتَ مَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهُ تَعَالَى.
আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা'আলা এ দীনকে অবশ্যই বিজয়ী করবেন। তখন উষ্ট্রারোহী ব্যক্তি সান'আ থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত (দীর্ঘ পথ এরূপ নিরাপদে) অতিক্রম করবে যে, তার মনে আল্লাহর ভয় ছাড়া আর কারো কোনো ভয় থাকবে না। ১৭৬
টিকাঃ
১৬৪. অনেকেই জিহাদকে 'ফারযে কিফায়াহ' বলেছেন। উল্লেখ্য যে, তাঁদের কথায় 'জিহাদ' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- যুদ্ধ। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, 'জিহাদ' দ্বারা যদি যুদ্ধই উদ্দেশ্য হয়, তবে তা নারী-পুরুষ, সক্ষম-অক্ষম নির্বিশেষে সকলের ওপর ফারয নয়। তবে আমার কথায় 'জিহাদ' দ্বারা শুধু যুদ্ধই উদ্দেশ্য নয়; বরং আল্লাহর শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় যে কোনো রূপ চেষ্টা করাই উদ্দেশ্য। তা যেমন সামরিক হতে পারে, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিকও হতে পারে। জিহাদ যেমন হাতের সাহায্যে হতে পারে, তেমনি মুখ ও কলমের সাহায্যেও হতে পারে, অন্তরে পরিকল্পনা করার মাধ্যমেও হতে পারে। এরূপ জিহাদ পরিবেশ ও পরিস্থিতির দাবি মুতাবিক প্রত্যেকের ওপর নিজ নিজ সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী ফারয হবে। (যাফর 'আহমাদ উসমানী, ই'লাউস সুনান, খ., পৃ...) ৫. ইবনু রাজাব, ফাতহুল বারী, খ. ৩, পৃ. ৪৪
১৬৬. আল কোরআন, সূরা আস্-সাফ, ৬১: ১০ জিহাদের ফাযীলাত ও গুরুত্বের ওপর কোরআন ও হাদীসে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে।
১৬৭. আলকোরআন, সূরা আল হাদীদ, ৫৭: ২৭
১৬৮. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২২২৯১; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৭৮৬৮ বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ নাসির উদ্দীন আল আলবানী (রাহ.) এর মতে, হাদীসটির সনদ সাহীহ। (আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ, খ. ৬, পৃ. ৪২৩, হা. নং: ২৯২৪)
১৬৯. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-জিহাদ), হা. নং: ২৪৮৮; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আস-সিয়ার), হা. নং: ১৮৯৭৬ বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটির সনদ সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু আবী দাউদ, খ. ৭, পৃ. ২৪৮, হা. নং: ২২৪৭)
১৭০. ইবনু রাজাব, ফাতহুল বারী, খ. ১, পৃ. ১০২ অন্য একটি রিওয়ায়াতে রয়েছে, মু'আদ্দাদ (রাহ.) ও তাঁর সাথীরা নির্জনে 'ইবাদাতের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণার লোকালয়ের বাইরে এসে একটি মাসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) এ সংবাদ জানতে পেরে তাদের নিকট চলে আসলেন এবং বললেন, جِئْتُ لأَكْسِرَ مَسْجِدَ الْحِبَالِ - "আমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মাসজিদটি চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে এসেছি।" (ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ.৬, পৃ.২০৬; ইবনুল আছীর, আন-নিহায়াতু ফী গারীবিল আছার, খ.২, পৃ.১২; ইবনুল জাওযী, গারীবুল হাদীস, খ.১,পৃ. ২৬৩; আবূ শামাহ, আল-বা'য়িছ 'আলা ইনকারিল বিদা', পৃ.৬৮)
فِتْنَةٌ। অর্থ ফ্যাসাদ, বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা। নির্জনে 'ইবাদাতের উদ্দেশ্যে লোকালয়ের বাইরে নির্মিত মাসজিদকে সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.( مَسْجِدَ الْحِبَالِ নামে অভিহিত করেন। এর কারণ, এরূপ মাসজিদ দীনের ধ্বংস ও বিপর্যয় ডেকে আনে।
১৭১. ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ৩৬১; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ১৬৫১; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৭৪০
১৭২. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৭০: আস-সাবরু 'আলাল মাসা'য়িব), হা. নং: ৯৩০৪; সুয়ূতী, জামি'উল আহাদীস, হা. নং: ৩৫৮৩৭
১৭৩. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ইমারাহ), হা. নং: ৫০৪০; আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-জিহাদ), হা. নং: ২৫০৪
১৭৪. আল কোরআন, সূরা আল-ফাতহ, ৪৮: ২৯
১৭৫. আল কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৩৯
১৭৬. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-জিহাদ), হা. নং: ২৬৫১; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১০৭০
📄 আল-আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহী 'আনিল মুনকার
'আল-আমরু বিল মা'রূফ ওয়ান নাহয় 'আনিল মুনকার'-এর অর্থ হলো সৎ কাজের আদেশ দান করা ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করা। এটা দীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফারয। কেউ কেউ একে ইসলামের ষষ্ঠ রুকন রূপেও গণ্য করেছেন। ১৭৭ প্রত্যেক মু'মিনই অপর মু'মিন ভাইয়ের সংশোধনের উদ্দেশ্যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে নিজ নিজ সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী এ দায়িত্ব পালন করে যাবে- এটাই হলো তার প্রতি ঈমানের অনিবার্য দাবি। অর্থাৎ একজন মু'মিনের সাফল্যের জন্য শুধু এতটুকু পদক্ষেপই যথেষ্ট নয় যে, সে শুধু নিজেই ভালো কাজ করে যাবে; বরং সে নিজের চরিত্র ও কার্যকলাপ যেমন সংশোধন করবে, তেমনি তাকে তার অন্যান্য ভাইয়ের চরিত্র ও কার্যকলাপ সংশোধনের জন্যও চেষ্টা চালাতে হবে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ
মু'মিন নর-নারীগণ প্রত্যেকেই একে অপরের বন্ধু। তারা পরস্পরকে ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা দেবে। ১৭৮ এ বিষয়টি সূরা আল-'আসরে আরো জোরালোভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالْعَصْرِ (১) إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ (২) إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
কালের শপথ! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে নির্দেশ দেয় সত্যের এবং নির্দেশ দেয় সবরের। ১৭৯ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ.
তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় কর্ম হতে দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা (অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ করে) পরিবর্তন করে দেয়। যদি সে তা করতে অক্ষম হয়, তবে সে মুখ দ্বারা তার প্রতিবাদ করবে। যদি সে তাও না পারে, তা হলে সে অন্তত তা কীভাবে প্রতিহত করা যায়- তা অন্তর দ্বারা চিন্তা করবে। এটা ঈমানের দুর্বলতম স্তর। ১৮০
কখনো কখনো সামষ্টিকভাবেও এ দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, উম্মাতের মধ্যে সর্বসময় এমন একটি দল থাকা প্রয়োজন, যাদের কাজই হবে লোকদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান জানানো, সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে কল্যাণের দিকে, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর এ সব লোকই সফলকাম। ১৮১
বলাই বাহুল্য, মুসলিম উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্বের রহস্যও এ গুরু দায়িত্ব পালনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بالله
তোমরাই হলে সর্বোত্তম দল, মানব জাতির কল্যাণ সাধনের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে, অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর বিধি-নিষেধ মনেপ্রাণে মেনে নেবে। ১৮২
উপর্যুক্ত আয়াতগুলো থেকে জানা যায় যে, সাফল্য, কল্যাণ ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভের জন্য নিজের সংশোধনই যথেষ্ট নয়; বরং অপরের সংশোধনের চিন্তাও জরুরী। বরঞ্চ নিজের সংশোধন যতটুকু জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ, অন্য মুসলিমের সংশোধনের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করাও ঠিক ততটুকুই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের জাতিসমূহের ওপরও এ দায়িত্বটি ন্যস্ত ছিল। কিন্তু তারা তা পালনের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেছিল। এ কারণে তারা অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ . كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ﴾
বানু ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফির, তাদেরকে দাউদ ও মারইয়াম তনয় 'ঈসা (আ.)-এর মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করতো এবং সীমা লঙ্ঘন করতো। তারা পরস্পরকে অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করতো না, যা তারা করতো। আর তারা যা করতো তা খুবই খারাপ ছিল। ১৮৩
উপর্যুক্ত আয়াতগুলো থেকে আরো জানা যায় যে, কেবল নিজেদের 'আমাল মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে না, বিশেষত আপন পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের কুকর্ম থেকে ফিরিয়ে রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তা না হলে নিজের মুক্তির পথও রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে, যদিও নিজে পুরোপুরিই সৎকর্মপরায়ণ হয়।
টিকাঃ
১৭৭. উসাইমীন, শারহু রিয়াদিস সালিহীন, পৃ.২২৬
১৭৮. আল কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৭১
১৭৯. আল কোরআন, সূরা আল-'আসর, ১০৩: ১-৩
১৮০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৮৬
১৮১. আল কোরআন, সূরা আলি 'ইমরান, ৩: ১০৪
১৮২. আল কোরআন, সূরা আলু 'ইমরান, ৩: ১১০