📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ

📄 আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ


আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও তাঁর বিধি-বিধানের প্রতি দ্বিধাহীন আনুগত্য ঈমানের অপরিহার্য দাবি। হাজ্জ হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও তাঁর দ্বিধাহীন আনুগত্যের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। শাইখ 'আলী আল-হাজবিরী (রাহ.) বলেন, হাজ্জের মূল উদ্দেশ্যই হলো নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করা। ১৫৯ পবিত্র স্থানসমূহে বিচরণ, বায়তুল্লাহর তাওয়াফ, হাজারে আসওয়াদে চুম্বন, 'আরাফাতে ও মুযদালাফায় অবস্থান ও জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপসহ হাজ্জের সকল কর্মকাণ্ডেই সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে আল্লাহর প্রতি প্রবল আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের জীবন্ত উদাহরণ।
হাজ্জের পবিত্র ভূমিতে এসেই আল্লাহর প্রিয় নাবী ইব্রাহীম ও ইসমা'ঈল (আ.) তাঁদের নিজেদের জন্য ও অনাগত প্রজন্মের সন্তানদের জন্য অনুগত মুসলিম হওয়ার দু'আ করেছিলেন এভাবে,
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةٌ مُسْلِمَةٌ لَكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমাদের রাব্ব, আমাদেরকে আপনার অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকে আপনার অনুগত জাতি বানান। আর আমাদেরকে আমাদের 'ইবাদাতের বিধি-বিধান দেখিয়ে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। ১৬০
হাজ্জের সেই পবিত্র ভূমিসমূহে আজো তাই সম্মানিত হাজীগণের আগমন ঘটে নিরঙ্কুশ আনুগত্যের সে মহড়া দেয়ার জন্যই। আমীরুল মু'মিনীন 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) হাজারে আসওয়াদকে চুম্বন দিতে গিয়ে এ দৃষ্টিভঙ্গিরই সার্থক প্রতিধ্বনি করেছেন এ কথা বলে যে,
إِنِّي أَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ وَأَنَّكَ لَا تَضُرُّ وَلَا تَنْفَعُ وَلَوْلا أَنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يُقَبِّلُكَ مَا قَبَّلْتُكَ.
নিশ্চয়ই আমি জানি যে, তুমি একটি পাথর, তুমি কারো কোনো ক্ষতিও করতে পারো না এবং কারো কোনো উপকারও করতে পারো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে চুম্বন করেছেন- এটা যদি আমি না দেখতাম, তা হলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। ১৬১ হাফিয ইবনু হাজার (রাহ.) বলেন,
وفي قول عمر هذا التسليم للشارع في أمور الدين وحسن الاتباع فيما لم يكشف عن معانيها وهو قاعدة عظيمة في اتباع النبي صلى الله عليه و سلم فيما يفعله ولو لم يعلم الحكمة فيه.
'উমার (রা.)-এর এ উক্তির মধ্য দিয়ে দীনী ব্যাপারে দ্বিধাহীন আনুগত্য এবং শারী'আতের যে সকল বিষয়ের নিগূঢ় তত্ত্ব ও রহস্য জানা যায় না, সে সব ক্ষেত্রেও সুন্দর অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করেছেন, যদি তার অন্তর্নিহিত মর্ম ও হিকমাত বোঝাও না যায়, তবুও তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণের অপরিহার্যতার ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে শারী'আতের একটি মহান মূলনীতি। ১৬২

টিকাঃ
১৫৯. দাতা গঞ্জে বখশ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮২
১৬০. আল কোরআন, আল-বাকারাহ, ২: ১২৮

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 নফসকে নিয়ন্ত্রণ ও পাপ বর্জনের প্রশিক্ষণ

📄 নফসকে নিয়ন্ত্রণ ও পাপ বর্জনের প্রশিক্ষণ


হাজ্জ দীর্ঘ সময় ধরে নাফসের কামনাকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা। এর প্রতিটি পদক্ষেপেই চলে আত্মশুদ্ধির বাস্তব মহড়া। এখানে কোনো পাপ কিংবা খারাপ কিছু করার কোনো সুযোগই নেই। হাজ্জের মূল উদ্দেশ্য কী, এটা শাইখ জুনাইদ আল-বাগদাদী (মৃ. ২৯৭ হি.) (রাহ.)-এর নিম্নলিখিত ঘটনা থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়।
এক ব্যক্তি শাইখ জুনাইদ (রাহ.)-এর নিকট আগমন করলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথা থেকে এসেছো? সে উত্তর দিলো, আমি হাজ্জ করে এসেছি। শাইখ জুনাইদ (রাহ.) হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি হাজ্জ করেছো?
আগন্তুক: জি হ্যাঁ, আমি হাজ্জ করেছি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): যখন তুমি হাজ্জ করার নিয়্যাতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলে, তখন কি পাপ বর্জন করার নিয়্যাত করেছিলে?
আগন্তুক: না, আমি তো এ সম্পর্কে কোনো চিন্তা করিনি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তবে তো তুমি হাজ্জ করার জন্য বাড়ি থেকে বের হওনি। আচ্ছা! হাজ্জের সফরে তুমি যে সব মানযিল অতিক্রম করেছো এবং যে সব স্থানে রাত অতিবাহিত করেছো, তখন তুমি আল্লাহর নৈকট্য লাভের মানযিল এবং সে পথের ঘাঁটিসমূহ অতিক্রম করার নিয়্যাত করেছিলে?
আগন্তুক: না, তা আমি করিনি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তা হলে তো তুমি না আল্লাহর ঘরের দিকে ভ্রমণ করেছো, আর না কোনো মানযিল অতিক্রম করেছো। আচ্ছা! যখন তুমি ইহরাম বাঁধার নিয়্যাত করেছো এবং প্রাত্যাহিক কাপড় দেহ থেকে ত্যাগ করেছো, তখন এর সাথে তোমার খারাপ স্বভাবও কি পরিত্যাগ করেছো?
আগন্তুক: আমি তো সে দিকে খেয়াল করিনি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তবে তো তোমার ইহরাম বাঁধাই ঠিক হয়নি। আচ্ছা! যখন তুমি 'আরাফাতে দণ্ডায়মান হয়েছিলে, তখন কি তোমার মনে এ ধারণা হয়েছিলো যে, তুমি আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান এবং তুমি তাঁকে দেখছো?
আগন্তুক: না, আমার এমন খেয়াল হয়নি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তা হলে তো তুমি যেন আরাফাতেই যাওনি। আচ্ছা! তুমি মুযদালিফায় গিয়ে তোমার কামরিপু পরিত্যাগ করেছো কি?
আগন্তুক: এ ব্যাপারে আমার কোনো খেয়ালই হয়নি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তা হলে তোমার মুযদালিফায় যাওয়াই হয়নি। আচ্ছা! তুমি কা'বা শারীফে তাওয়াফের সময় আল্লাহ তা'আলার অসীম সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেছো কি?
আগন্তুক: না, আমি এরূপ কিছু অনুভব করিনি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তা হলে তুমি তাওয়াফই করোনি। আচ্ছা। তুমি সাফা- মারওয়ায় সা'ঈ করার সময় এর হাকীকাত ও উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেছো কি?
আগন্তুক: না, আমি এর হাকীকাত উপলব্ধি করিনি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তবে তো তোমার সা'ঈ হয়নি। আচ্ছা! কোরবানী করার সময় তুমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমার কামনা-বাসনা থেকে দূরে থাকার চিন্তা করেছো কি?
আগন্তুক: না, এরূপ তো করিনি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তা হলে তো তোমার কোরবানী করাই হয়নি। এখন বলো, কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তোমার অসৎ সঙ্গী ও অন্যায় কামনা-বাসনা থেকে দূরে থাকার চিন্তা করেছো কি?
আগন্তুক: না, এরূপ চিন্তা করিনি।
শাইখ জুনাইদ (রাহ.): তবে তোমার কঙ্কর নিক্ষেপ করাই হয়নি। তুমি ফিরে যাও এবং সমস্ত শর্ত মেনে হাজ্জ সম্পন্ন করে মাকামে ইব্রাহীম পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছো, যে মাকام সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي - “ইব্রাহীম (আ.) তাঁর রাব্বের কৃতজ্ঞতার হক আদায় করেছেন।” (৫৩:৩৭) ১৬৩

টিকাঃ
১৬১. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-হাজ্জ), হা. নং: ১৫২০; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-হাজ্জ), হা. নং: ৩১২৮
১৬২. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, খ. ৩, পৃ. ৪৬৩
১৬৩. দাতা.গঞ্জে বখশ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৩-৪

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি

📄 আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি


হাজ্জ হলো আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও তাঁর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য কর্মশালা। হাজী ইহরাম বাঁধার সময় থেকেই এ নৈকট্য লাভের এক উর্বর পরিবেশ উপলব্ধি করার সুযোগ লাভ করে। সে ইহরামের সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরিধানের মধ্য দিয়ে বাহ্যিকভাবে আড়ম্বরহীন একান্ত আল্লাহ প্রেমিক বান্দাহ হিসেবে নিজেকে মহান রাব্বুল 'আলামীনের দরবারে পেশ করে। এটি তাকে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ এবং তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে শেখায়। এ সময় সে সমগ্র দুনিয়ার প্রাপ্তি প্রত্যাশার চাইতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্যকেই আরাধ্য জ্ঞান লাভ করে এবং তাঁর কণ্ঠে বারংবার অনুরণিত হয় - لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنَّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ ، لَا شَرِيكَ لَكَ.
আমি উপস্থিত, হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত। আমি উপস্থিত, আপনার কোনো অংশীদার নেই। আমি উপস্থিত, নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা, সমস্ত নি'মাত এবং রাজত্ব আপনারই, আপনার কোনো অংশীদার নেই।
মূলত আল্লাহর নিকট উপস্থিতির এই অন্তর নিংড়ানো ঘোষণা একজন হাজ্জ পালনকারীর মহান রাব্বের নিকট পৌঁছানোর অনুভূতিকে শাণিত করে। সে তখন মনে প্রাণে উপলব্ধি করতে পারে, সে যেন লা-শারীক মহামহিয়ান এক অসীম সাম্রাজ্যের মালিক ও তার স্রষ্টার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার রাব্বের নৈকট্যের অনাবিল ঝর্ণাধারায় সে অবগাহন করে ধন্য হচ্ছে। একজন বান্দাহর এর চেয়ে আর বড় কল্যাণ প্রাপ্তির কোনো কিছু থাকতে পারে কি?

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আখিরাতের অনুভূতি শক্তিকরণ

📄 আখিরাতের অনুভূতি শক্তিকরণ


হাজ্জ আখিরাতমুখী জীবনগড়ার বাস্তব শিক্ষা গ্রহণের একটি কর্মশালাও। কাফনের মতো সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরিধান করে খালি মাথায় যখন একজন হাজী ইহরাম বাঁধে, তখন সে সরাসরি মৃত্যু ও তৎপরবর্তী জীবনকে উপলব্ধি করার এক মোক্ষম সুযোগ লাভ করে। একজন মৃত ব্যক্তি যেমন কোনো কিছুই করতে পারে না, ইহরাম অবস্থায় একজন হাজীরও ঠিক তেমনি কিছু করার থাকে না। কোনো পোকামাকড় তাকে কামড়ালেও তাকে মারার কোনো সামান্য অধিকারও নেই। উস্কোখুস্কো চুলটিও বিন্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। শরীর থেকে কোনো পশমটি পর্যন্ত খসানো তার জন্য বৈধ বলে স্বীকৃত নয়। সে যেন একজন মৃত মানুষ। তদুপরি 'আরাফাতে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি একজন হাজীকে কিয়ামাতের ময়দানের পরিবেশকেই বাস্তবভাবে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। মোটকথা, হাজ্জের সময় বিভিন্ন আহকামের অনুশীলন দুনিয়ার মায়াজালে আক্রান্ত নানা ভোগবিলাসে লিপ্ত থাকা মানুষকে জীবনের অবশিষ্ট সময়ে আখিরাতমুখী জীবন গড়তে শেখায় এবং দুনিয়ার জীবনের দুঃখ-বেদনা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশা, গ্রহণ-বর্জন, সহজ ও কঠিন পরীক্ষায় সঠিকভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00