📘 তাযকিয়াতুন নাফস 📄 মানবিক ও সামাজিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধন

📄 মানবিক ও সামাজিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধন


পবিত্র মাহে রামাদানের সিয়াম সাধনার মধ্যে আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক দিকও রয়েছে। মাহে রামাদান মানুষের মানবিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রামাদান মাসের রোযার গুরুত্ব অপরিসীম। হাদীসে মাহে রামাদানকে 'শাহরুল মুওয়াসাত' (পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশের মাস) ১৫১ বলা হয়েছে। প্রতিটি রোযাদার মু'মিন বান্দাহ রামাদান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে গরীব-দুঃখী লোকেরা যে কতো কষ্ট অনুভব করে, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে, তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হয় এবং দারিদ্র-পীড়িত অগণিত আদম সন্তানের অনাহারক্লিষ্ট মুখ তার অন্তরে সহানুভূতি উদ্রেক করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَنْ خَفَّفَ عَنْ مَمْلُوكِهِ فِيهِ , غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَأَعْتَقَهُ مِنَ النَّارِ-"যে ব্যক্তি রামাদান মাসে তার অধীনস্থ লোকের কাজের চাপ কমিয়ে দেবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন।”১৫২ সমাজের ধনী-সামর্থ্যবান রোযাদার ব্যক্তি রোযা পালনের সাথে গরীব-দুঃখী, দুস্থ, অভাবী, অনাথ, ইয়াতীম, মিসকীন এবং কপর্দকহীন ব্যক্তিকে প্রয়োজনে অর্থ বণ্টন করে দেবে। তারা ক্ষুধার্ত হলে প্রয়োজনে সাহরী ও ইফতারীর ব্যবস্থা করবে। এটা মাহে রামাদানে সহানুভূতি প্রদর্শনের সুবর্ণ সুযোগ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَنْ فَطْرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا. একজন রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে এবং ওই রোযাদারের সাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্রও কমানো হবে না।”১৫৩ অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, وَمَنْ - أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللهُ مِنْ حَوْضِي شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ.
রোযাদারকে পেটভরে খাওয়াবে আল্লাহ তা'আলা তাকে আমার হাউযে কাউসার থেকে এমনভাবে পান করাবেন, যাতে সে জান্নাতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত (পিপাসায়) আর কষ্ট পাবে না। "১৫৪ বিশিষ্ট তাবি'ঈ ও মুহাদ্দিস ইবনু শিহাব আয-যুহরী [৫৮-১২৪ হি.] (রাহ.) কে একবার জিজ্ঞেস করা হয় যে, রামাদান মাসে কোন্ 'আমাল বেশি বেশি করা প্রয়োজন? তিনি জবাব দেন, فَإِنَّمَا هُوَ تِلَاوَةٌ الْقُرْآنِ وَإِطْعَامُ الطَّعَامِ “কোরআন তিলাওয়াত করা ও খাবার দান করা। "১৫৫
সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم - أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ كَانَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم - أَجود بِالْخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে উদার ও দানশীল ছিলেন। রামাদান মাসে তাঁর দান ও বদান্যতা এতোই বেড়ে যেতো যে, তখন তাঁর দানশীলতা প্রবল বেগে বহমান বাতাসকেও হার মানাতো। ১৫৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতের বাস্তব শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে রামাদান মাসে দান-সাদাকাহ ও বদান্যতার হাত বেশি করে প্রসারিত করতেন এবং এ মাসটিকে তিনি দানশীলতার ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাস হিসেবে গ্রহণ করেন।

টিকাঃ
১৫১. ইবনু খুযাইমাহ, আস-সাহীহ, হা. নং: ১৮৮৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৩: আস-সিয়াম), হা. নং: ৩৩৩৬
১৫২. ইবনু খুযাইমাহ, আস-সাহীহ, হা.নং: ১৮৮৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৩: আস-সিয়াম), হা. নং: ৩৩৩৬ শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, এ হাদীসটি দা'ঈফ। (তাবরিযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, তাহকীক: শাইখ আল-আলবানী, খ. ১, পৃ. ৪৪৩, হা. নং: ১৯৬৫)
১৫৩. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সাওম), হা. নং: ৮০৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১৬৭৬
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ওয়া দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ৩০৭)
১৫৪. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৩: আস-সিয়াম), হা. নং: ৩৩৩৬; হায়ছামী, বুগইয়াতুল বাহিছ, হা. নং: ৩২১
শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, এ হাদীসটি দা'ঈফ। (তাবরিযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, তাহকীক: শাইখ আল-আলবানী, খ. ১, পৃ. ৪৪৩, হা. নং: ১৯৬৫)
১৫৫. 'আবদুর রাযযাক, ফিকহুল আদ'ইয়াতি ওয়াল আযকার, খ. ১, পৃ. ৭২; ইবনু 'আবদিল বার, আত-তামহীদ.., খ. ৬, পৃ. ১১১
১৫৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (বাব: কাইফা কানা বাদউল ওয়াহয়ি...), হা. নং: ৬; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ফাদা'য়িল), হা. নং: ৬১৪৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px