📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সংযমের দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সংযমের দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ


রামাদানের সিয়াম সাধনা বস্তুত মানুষকে আলোকিত ও আদর্শ চরিত্রবান মানুষ রূপে গড়ে তোলার একটা দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ। এর উদ্দেশ্য হলো- প্রকৃত তাকওয়া অর্জন, আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন। রামাদান শব্দের অর্থও দাহন বা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়া। ১৪০ এখন প্রশ্ন হতে পারে, কিসের দাহন? মানব জীবনে প্রবৃত্তির দাহন। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে দুটি স্বভাবগত বিষয় রয়েছে। এক. প্রবৃত্তি ও দুই. বিবেক-বুদ্ধি। বিবেক-বুদ্ধি আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে সততা, নিষ্ঠা ও পবিত্রতা সৃষ্টিতে এবং সমাজ জীবনে সংহতি, ঐক্য, প্রেম ও ভালোবাসা সৃষ্টিতে সহায়তা করে। পক্ষান্তরে প্রবৃত্তি মানুষকে অসংযত, উদ্ধত ও উচ্ছৃঙ্খলে পরিণত করে। কখনো এর অসংযত আচরণের ফলে মানুষ পশুত্বের চরম নিম্নস্তরে নেমে যায়। লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ও মোহ প্রভৃতি সামাজিক জীবনে চরম বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি করে। এ জন্য এ সব অসৎ গুণ ও স্বভাবকে দাহন করে নাফসকে পরিপূর্ণরূপে বিশুদ্ধ ও পবিত্র করবার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা সিয়ামের প্রবর্তন করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে ঈমানদারগণ, তোমারদের ওপর রোযা ফারয করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর ফারয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। ১৪১
তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ হলো- সকল প্রকার অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। ১৪২ মানুষের মধ্যে যে সহজাত পাপপ্রবণতা রয়েছে রোযা মানুষকে এ পাপপ্রবণতা থেকে বিরত থাকতে শেখায়। একজন সত্যিকার রোযা পালনকারী কখনো অযথা ও বেহুদা কথা বলবে না, কখনো কোনো অন্যায় কাজ করতে পারে না।
বস্তুতপক্ষে রোযা কেবল সুবহি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকার নামই নয়; বরং রোযা তখনই পূর্ণাঙ্গ হবে, যখন রোযাদার যাবতীয় অন্যায় ও অশোভনীয় কথা-কর্ম থেকে নিবৃত্ত থাকবে এবং সৎ চরিত্রসমূহের বিকাশের প্রচেষ্টায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الرُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعْ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ.
যদি কেউ মিথ্যা কথা, পাপকর্ম ও জাহিলী আচরণ থেকে বিরত না হয়, তবে তার পানাহার বর্জনে অর্থাৎ উপবাস পালনে আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই। ১৪৩
কারণ, আল্লাহ তা'আলা সে রোযাকেই কেবল গ্রহণ করবেন, যার বুনিয়াদ হবে অন্যায় ও পাপ বর্জন। অর্থাৎ একজন রোযাদার যেমন তার পেটকে পানাহার থেকে বিরত রাখবে, তেমনি সে তার চোখকে অবৈধ কিছু দেখা থেকে, তার কানকে গীবত, মিথ্যা ও অপ্রয়োজনীয় কথা শ্রবণ করা থেকে, তার মুখকে মিথ্যা ও বেহুদা কথা বলা থেকে এবং তার দেহকে শারী'আত বিরোধী কাজ থেকে বিরত রাখবে। জাবির ইবনু 'আব্দিল্লাহ (রা.) বলেন,
إِذَا صُمْتَ فَلْيَصُمْ سَمْعُكَ وَبَصَرُكَ وَلِسَانُكَ عَنِ الْكَذِبِ وَالْمَاثَمِ، وَدَعْ أَذَى الْحَادِمِ ، وَلْيَكُنْ عَلَيْكَ وَقَارٌ وَسَكِينَةٌ يَوْمَ صِيَامِكَ ، وَلَا تَجْعَلْ يَوْمَ فِطْرِكَ وَيَوْمَ صِيَامِكَ سَوَاء.
যখন তুমি রোযা রাখবে, তখন যেন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বাও মিথ্যাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকে। (অর্থাৎ তুমি কোনোরূপ অন্যায় ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হবে না।) অধিকন্তু, তুমি (তোমার) খাদিমকেও কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। রোযার সময় যেন তোমার চলনে-বলনে সৌম্য ও গাম্ভীর্য ভাব প্রকাশ পায়। রোযার দিনটিকে অন্যান্য দিনের মতো বানিয়ে দিও না। ১৪৪
ইমাম গাযালী (রাহ.) বলেন, রোযার তিনটির স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর হলো- সর্বসাধারণের রোযা, তা হলো চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পানাহার ও যৌন কামনা থেকে বিরত থাকা। দ্বিতীয় স্তর হলো- বিশিষ্ট ব্যক্তিদের রোযা, তা হলো চোখ, কান, জিহ্বা, হাত-পা এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা। তৃতীয় স্তর হলো- উচু স্তরের ব্যক্তিদের রোযা, এ রোযা হলো পানাহার ও কামভাব থেকে বিরত থাকার সাথে সাথে চোখ, কান, জিহ্বা, হাত-পা এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে পাপকর্ম থেকে বিরত রাখা এবং মনকেও যাবতীয় কুচিন্তা এবং বৈষয়িক দুশ্চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকা। ১৪৫
বস্তুত সিয়াম সাধনা হলো নাফসের কামনাকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা। সূফীগণের মতে, সমস্ত তারীকাত এর মধ্যে লুকায়িত। ১৪৬ শাইখ জুনাইদ আল-বাগদাদী [মৃ.২৯৭ হি.] (রাহ.) বলেছেন, “রোযা তারীকাতের অর্ধাংশ। "১৪৭ শাইখ 'আলী আল-হাজবিরী [৪০০-৪৬৫হি.] (রাহ.) বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখে আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, .احْبَسَ حَوَاسْكَ - "তোমার পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখো। "১৪৮ কেননা মানুষ তার এ পঞ্চ ইন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখ, কান, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক- এর দ্বারা নেক ও পাপ কাজ করতে পারে। এ পঞ্চ ইন্দ্রিয় আল্লাহর আনুগত্য ও নাফরমানীর জন্য সমান উপযোগী। একদিকে জ্ঞান-ও বিবেককে এবং অপরদিকে নাফসকে জৈবিক কামনা-বাসনা পূরণের নিমিত্তে এ পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহারের জন্য সমান সুযোগ দেয়া হয়েছে। এবার এটা মানুষের ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করে যে, সে এ পঞ্চ ইন্দ্রিয় স্বীয় নিয়ন্ত্রণে রেখে তা জ্ঞান ও বিবেকের মাধ্যমে ব্যবহারের চেষ্টা করবে কিংবা তাকে নাফসের লাগামহীন কামনা-বাসনার ওপর ছেড়ে দেবে।
সুতরাং এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সিয়াম সাধনা অপেক্ষা আর কোনো উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা নেই। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সব যুবক বিয়ে করতে আর্থিকভাবে সক্ষম নয়, তাদেরকে তাদের যৌন কামনা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য রোযা রাখতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ .فَعَلَيْهِ بِالصُّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءَ “আর যে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোযা রাখে। কেননা রোযা তার যৌন কামনাকে নিবৃত্ত করবে।”১৪৯ ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে দু ধরনের চরিত্র রয়েছে। একটি হলো- মানবিক চরিত্র। অন্যটি হলো- পাশবিক চরিত্র। পাশবিক চরিত্র তাকে স্বেচ্ছাচারিতার পথে পরিচালিত ও সংযমহীন রূপে গড়ে তোলে। এর ফলে সমাজে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হত্যা, ছিনতাই, লুটপাট ইত্যাদি চারিত্রিক স্খলনের সৃষ্টি হয়। এক ধরনের অসংযমী, উচ্ছৃংখল লোক অন্যের অধিকারে হস্ত ক্ষেপ করে এবং সীমালঙ্ঘন করে। সমাজে যাতে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার ডানা বিস্তার করতে না পারে, তাই রোযার মাধ্যমে মানুষের উচ্ছৃংখল প্রবৃত্তিকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণে রাখার শিক্ষা দেয়া হয়। রোযা চরম খাদ্যাবিলাসী, আরামপ্রিয় ও যৌন স্বেচ্ছাচারীকে সংযমী করে তোলে। সর্বক্ষেত্রে রোযার মাধ্যমে সবরের শিক্ষা পাওয়া যায়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الصوم نصف الصبر - “রোযা সবরের অর্ধেক।”১৫০

টিকাঃ
১৪০. 'রামাদান' শব্দটি 'রামাদ' শব্দ থেকে উদ্ভূত। 'রামাদ' অর্থ হলো- প্রচণ্ড গরম; বালি, পাথর ইত্যাদির ওপর সূর্যের পতিত কড়া তাপ। বলা হয় যে, ريض الرحل অর্থাৎ প্রচণ্ড গরমে তার পদযুগল জ্বলে গেলো। (ইবনু মানযূর, লিসানুল 'আরব, খ. ৭, পৃ. ১৬০)
১৪১. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১২৩
১৪২. খালীফা 'উমার ইবনু 'আবদিল 'আযীয (রাহ.) তাকওয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,
ليس تقوى الله بصيام النهار ولا بقيام الليل والتخليط فيما بين ذلك ولكن تقوى الله ترك ما حرم الله وأداء ما افترض الله.
"তাকওয়া দিনে রোযা রাখা ও রাত জেগে 'ইবাদাত করা এবং এ দু ধরনের 'আমালকে একত্রিত করার নাম নয়; বরং তাকওয়া হলো- আল্লাহর নিষিদ্ধ ঘোষিত বিষয়গুলো ছেড়ে দেয়া এবং তাঁর নির্দেশাবলি পালন করা।” (ইবনু রাজাব, জামি'উল 'উলুম ওয়াল হিকাম, পৃ. ১৫৯; বাইহাকী, আয-যুহদুল কাবীর, খ. ২, পৃ. ৪৮০, হা. নং: ৯৭৪)
১৪৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৫৭১০; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সিয়াম), হা. নং: ১৬৮৯; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১০৫৬২
১৪৪. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৮৯৭৩; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৩: আস- সিয়াম), হা. নং: ৩৩৭৪
১৪৫. গাযালী, ইহয়া, খ. ১, পৃ. ২৩৪
১৪৬. দাতা গঞ্জে বখশ, প্রাগুক্ত, পৃ.১৭৭
১৪৭. দাতা গঞ্জে বখশ, প্রাগুক্ত, পৃ.১৭৭
১৪৮. দাতা গঞ্জে বখশ, প্রাগুক্ত, পৃ.১৭৭
১৪৯. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আন-নিকাহ), হা. নং: ৪৭৭৯; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব:আন-নিকাহ), হা. নং: ৩৪৬৪
১৫০. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আদ-দা'ওয়াত), হা. নং: ৩৫১৯; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৮২৮৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১০: মাহাব্বাতুল্লাহ), হা. নং: ৬২২
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান। শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, পৃ. ৪৫৯, হা. নং: ৭০১)

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 মানবিক ও সামাজিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধন

📄 মানবিক ও সামাজিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধন


পবিত্র মাহে রামাদানের সিয়াম সাধনার মধ্যে আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক দিকও রয়েছে। মাহে রামাদান মানুষের মানবিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রামাদান মাসের রোযার গুরুত্ব অপরিসীম। হাদীসে মাহে রামাদানকে 'শাহরুল মুওয়াসাত' (পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশের মাস) ১৫১ বলা হয়েছে। প্রতিটি রোযাদার মু'মিন বান্দাহ রামাদান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে গরীব-দুঃখী লোকেরা যে কতো কষ্ট অনুভব করে, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে, তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হয় এবং দারিদ্র-পীড়িত অগণিত আদম সন্তানের অনাহারক্লিষ্ট মুখ তার অন্তরে সহানুভূতি উদ্রেক করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَنْ خَفَّفَ عَنْ مَمْلُوكِهِ فِيهِ , غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَأَعْتَقَهُ مِنَ النَّارِ-"যে ব্যক্তি রামাদান মাসে তার অধীনস্থ লোকের কাজের চাপ কমিয়ে দেবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন।”১৫২ সমাজের ধনী-সামর্থ্যবান রোযাদার ব্যক্তি রোযা পালনের সাথে গরীব-দুঃখী, দুস্থ, অভাবী, অনাথ, ইয়াতীম, মিসকীন এবং কপর্দকহীন ব্যক্তিকে প্রয়োজনে অর্থ বণ্টন করে দেবে। তারা ক্ষুধার্ত হলে প্রয়োজনে সাহরী ও ইফতারীর ব্যবস্থা করবে। এটা মাহে রামাদানে সহানুভূতি প্রদর্শনের সুবর্ণ সুযোগ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَنْ فَطْرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا. একজন রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে এবং ওই রোযাদারের সাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্রও কমানো হবে না।”১৫৩ অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, وَمَنْ - أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللهُ مِنْ حَوْضِي شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ.
রোযাদারকে পেটভরে খাওয়াবে আল্লাহ তা'আলা তাকে আমার হাউযে কাউসার থেকে এমনভাবে পান করাবেন, যাতে সে জান্নাতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত (পিপাসায়) আর কষ্ট পাবে না। "১৫৪ বিশিষ্ট তাবি'ঈ ও মুহাদ্দিস ইবনু শিহাব আয-যুহরী [৫৮-১২৪ হি.] (রাহ.) কে একবার জিজ্ঞেস করা হয় যে, রামাদান মাসে কোন্ 'আমাল বেশি বেশি করা প্রয়োজন? তিনি জবাব দেন, فَإِنَّمَا هُوَ تِلَاوَةٌ الْقُرْآنِ وَإِطْعَامُ الطَّعَامِ “কোরআন তিলাওয়াত করা ও খাবার দান করা। "১৫৫
সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم - أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ كَانَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم - أَجود بِالْخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে উদার ও দানশীল ছিলেন। রামাদান মাসে তাঁর দান ও বদান্যতা এতোই বেড়ে যেতো যে, তখন তাঁর দানশীলতা প্রবল বেগে বহমান বাতাসকেও হার মানাতো। ১৫৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতের বাস্তব শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে রামাদান মাসে দান-সাদাকাহ ও বদান্যতার হাত বেশি করে প্রসারিত করতেন এবং এ মাসটিকে তিনি দানশীলতার ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাস হিসেবে গ্রহণ করেন।

টিকাঃ
১৫১. ইবনু খুযাইমাহ, আস-সাহীহ, হা. নং: ১৮৮৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৩: আস-সিয়াম), হা. নং: ৩৩৩৬
১৫২. ইবনু খুযাইমাহ, আস-সাহীহ, হা.নং: ১৮৮৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৩: আস-সিয়াম), হা. নং: ৩৩৩৬ শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, এ হাদীসটি দা'ঈফ। (তাবরিযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, তাহকীক: শাইখ আল-আলবানী, খ. ১, পৃ. ৪৪৩, হা. নং: ১৯৬৫)
১৫৩. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আস-সাওম), হা. নং: ৮০৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২১৬৭৬
ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, এটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ওয়া দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ৩০৭)
১৫৪. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (২৩: আস-সিয়াম), হা. নং: ৩৩৩৬; হায়ছামী, বুগইয়াতুল বাহিছ, হা. নং: ৩২১
শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, এ হাদীসটি দা'ঈফ। (তাবরিযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, তাহকীক: শাইখ আল-আলবানী, খ. ১, পৃ. ৪৪৩, হা. নং: ১৯৬৫)
১৫৫. 'আবদুর রাযযাক, ফিকহুল আদ'ইয়াতি ওয়াল আযকার, খ. ১, পৃ. ৭২; ইবনু 'আবদিল বার, আত-তামহীদ.., খ. ৬, পৃ. ১১১
১৫৬. বুখারী, আস-সাহীহ, (বাব: কাইফা কানা বাদউল ওয়াহয়ি...), হা. নং: ৬; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ফাদা'য়িল), হা. নং: ৬১৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00