📄 সালাত থেকে সুফল পাওয়ার শর্ত
সালাতের প্রাণ হলো বিনয় ও একাগ্রতা। ইমাম গাযালী (রাহ.) বলেন, الصلاة الخشوع، وحضور القلب مع القراءة، والذكر بالتفهم সালাতের স্তম্ভ হলো বিনয়, একান্ত মনোনিবেশ সহকারে কোরআন তিলাওয়াত এবং গভীর উপলব্ধিসহ আল্লাহর যিকর।”¹²⁴ কাজেই সালাত থেকে উপর্যুক্ত উপকারিতাসমূহ পেতে হলে পূর্ণ নিষ্ঠা, বিনয়, ভয় ও আশা, একাগ্রতা, চিন্তা-ফিকর ও ধীর-সুস্থতার সাথে তা আদায় করতে হবে। তা না হলে সালাত থেকে প্রকৃত ও যথার্থ সুফল পাওয়া যাবে না। আল্লাহ তা'আলা সফল মু'মিনগণের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ (۱) الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ (২)-"নিশ্চিতভাবে সফলকাম হয়েছে সে সব মু'মিন, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়াবনত হয়।”¹²⁵ আয়াতে উল্লেখিত 'খুশু' শব্দের অর্থ হলো- কারো সামনে ঝুঁকে পড়া, দমিত বা বশীভূত হওয়া, বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করা। উল্লেখ্য যে, এরূপ অবস্থার সম্পর্ক যেমন মনের সাথে হয়ে থাকে, তেমনি দেহের বাহ্যিক অবস্থার সাথেও হয়ে থাকে। মনের 'খুশু' হচ্ছে, মানুষ কারোর ভীতি, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রতাপ ও পরাক্রমতার দরুন সন্ত্রস্ত ও আড়ষ্ট থাকবে। আর দেহের খুশু হচ্ছে, যখন সে তার সামনে যাবে, তখন মাথা নত হয়ে যাবে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঢিলে হয়ে যাবে, দৃষ্টি নত হবে, কণ্ঠস্বর নিম্নগামী হবে এবং কোনো জবরদস্ত প্রতাপশালী ব্যক্তির সামনে উপস্থিত হলে মানুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক ভীতি সঞ্চার হয়, তার যাবতীয় চিহ্ন তার মধ্যে ফুটে ওঠবে। সালাতে খুশ্' বলতে মন ও দেহের এ অবস্থাটা বোঝায় এবং এটা সালাতের আসল প্রাণ। বর্ণনা করা হয় যে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে সালাত আদায় করতে দেখলেন এবং সাথে সাথে এও দেখলেন যে, সে নিজের দাড়ি নিয়ে খেলা করছে। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, لَوْ خَشَعَ قَلْبُهُ لَخَشَعَتْ جَوَارِحُهُ "যদি তার মনে খুশ্ থাকতো, তা হলে তার দেহেও খুশূ'র সঞ্চার হতো।”¹²⁶ যদিও খুশূ'র সম্পর্ক মূলত মনের সাথে এবং মনের খুশৃ' আপনা-আপনি দেহে সঞ্চারিত হয়, তবুও শারী'আতে এমন কিছু নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে, যা একদিকে মনের খুশু' সৃষ্টিতে সহায়তা করে এবং অন্যদিকে মনের খুশূ'র হ্রাস-বৃদ্ধির অবস্থায় সালাতের কর্মকাণ্ডকে বাহ্যিক দিক দিয়ে একটি বিশেষ মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত রাখে। এ নিয়ম-কানুনগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, সালাত আদায়রত ব্যক্তি যেন ডানে-বামে না ফিরে এবং মাথা ওঠিয়ে ওপরের দিকে না তাকায়। সালাতের মধ্যে নড়াচড়া করা এবং বিভিন্ন দিকে ঝুঁকে পড়া নিষিদ্ধ। বারবার কাপড় গুটানো অথবা ঝাড়া কিংবা কাপড় নিয়ে খেলা করা জায়িয নয়। সাজদায় যাওয়ার সময় বসার জায়গা বা সাজদার জায়গা পরিষ্কার করার চেষ্টা করতেও নিষেধ করা হয়েছে। গর্বিত ভঙ্গিতে খাড়া হওয়া, জোরে জোরে আড়মোড়া ভাঙ্গা ও ঢেকুর তোলাও সালাতের মধ্যে বে-আদবী হিসেবে গণ্য। তাড়াহুড়া করে টপাটপ সালাত পড়ে নেওয়াও ভীষণ অপছন্দনীয়। নির্দেশ হলো, সালাতের প্রত্যেকটি কাজ পুরোপুরি ধীরস্থিরভাবে শান্ত সমাহিত চিত্তে সম্পন্ন করতে হবে। এক একটি কাজ যেমন রুকু, সাজদাহ, কিয়াম ও জালসাহ প্রভৃতি যতক্ষণ পুরোপুরি শেষ না হয়, ততক্ষণ অন্য কাজ শুরু করা যাবে না। এ বাহ্যিক আদবের সাথে সাথে সালাতের মধ্যে জেনে-বোঝে সালাতের সাথে অসংশ্লিষ্ট ও অবান্তর কথা চিন্তা করা থেকে দূরে থাকার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিচ্ছাকৃত চিন্তা-ভাবনা মনের মধ্যে আসা ও আসতে থাকা মানুষ মাত্রেরই একটি স্বভাবগত দুর্বলতা। কিন্তু মানুষের পূর্ণ প্রচেষ্টা থাকতে হবে, সালাতের সময় তার মন যেন আল্লাহ তা'আলার প্রতি পূর্ণ আকৃষ্ট থাকে এবং মুখে সে যা কিছু উচ্চারণ করে মনও যেন তারই আর্জি পেশ করে। এ সময়ের মধ্যে মনে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য চিন্তা-ভাবনা এসে যায়, তা হলে যখনই মানুষের মধ্যে এর অনুভূতি সজাগ হবে, তখনই তার মনোযোগ সে দিক থেকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় সালাতের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, رَكْعَتَانِ مُقْتَصِدَتَانِ فِي تَفْكِير خير "গাফিল অন্তর নিয়ে (অর্থাৎ একান্ত মনঃসংযোগ ব্যতীত) সারা রাত জেগে নামায পড়ার চেয়ে চিন্তা-ভাবনার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ দু রাক'আত নামায পড়াই উত্তম।”¹²⁷ বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.) বলেন, كل صلاة لا يحضر فيها القلب فهي إلى العقوبة أسرع "সালাতের মধ্যে অন্তর উপস্থিত থাকবে না, সে সালাত দ্রুত শাস্তির দিকে নিয়ে যাবে।”¹²⁸ বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত আদায় করতেন, তখন তিনি মনে মনে এভাবে কাঁদতেন যে, তাঁর বক্ষদেশ টগবগ করতো। মুতাররিফ (রা.) তাঁর পিতা 'আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
أتيتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يُصَلِّي وَلِحَوْفِهِ لِصَدْرِهِ أَزِيزٌ كَأَزِيرِ الْمِرْجَلِ يَعْنِي يَبْكِي.
একবার আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসলাম। তখন তিনি সালাত আদায় করছিলেন। এ সময় তাঁর বক্ষদেশ টগবগ করছিল যেমন রান্না করার সময় ডেক বা হাঁড়ি টগবগ করে থাকে। অর্থাৎ তিনি কাঁদতেছিলেন। ¹²⁹
সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি সালাত আদায়ের জন্য তৈরি হতেন, তখন তাঁর দেহে কম্পন শুরু হয়ে যেতো। ¹³⁰ বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি বিশিষ্ট যাহিদ হাতিম আল-আসাম্ম [মৃ.২৩৭ হি.] (রাহ.)-এর নিকট তাঁর সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জবাব দেন,
যখন সালাতের সময় হয়, তখন আমি একটি যাহিরী ওযু করি এবং একটি বাতিনী ওযু করি। পানি দ্বারা যাহিরী ওযু করি এবং তাওবাহ দ্বারা বাতিনী ওযু করি। অতঃপর মাসজিদে গিয়ে এমনিভাবে সালাতে দাঁড়াই যেন, কা'বাগৃহ আমার সামনে, ডানে জান্নাত, বাঁয়ে জাহান্নাম। আমি যেন পুলসিরাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছি এবং মালাকুল মাওত আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাকবীর বলি, আদবের সাথে দণ্ডায়মান হই, মর্যাদার সাথে কোরআন পাঠ করি, অত্যন্ত ভয় ও বিনয়ের সাথে রুকূ' ও সাজদা করি। অত্যন্ত সম্মানের সাথে বসে তাশাহ্হুদ পাঠ করি এবং কৃতজ্ঞতার সাথে সালামের মাধ্যমে সালাত শেষ করি। ¹³¹
টিকাঃ
১২৪. গাযালী, বিদায়াতুল হিদায়াহ, পৃ. ১১
১২৫. আল কোরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, ২৩: ১-২
১২৬. এ হাদীসটি সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) ও আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত রয়েছে। (সুলামী, আবূ 'আবদির রাহমান, আদাবুস সুহবাত, পৃ. ১২৩, হা. নং: ২০৬; আল-হাকীম আত-তিরমিযী, নাওয়াদিরুল উসূল, খ. ৩, পৃ. ৩১০; 'আলাউদ্দীন আল-হিন্দী, কানযুল 'উম্মাল, খ. ৮, পৃ. ১৯৭, হা. নং: ২২৫৩০) এ রিওয়ায়াত দুটির সনদ অত্যন্ত দুর্বল। তবে বিশিষ্ট সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান ও বিশিষ্ট তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রা.) থেকে এ জাতীয় বক্তব্য বর্ণিত রয়েছে। (ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ, হা. নং: ১১৮৮; আবু নাসর আল-মারওয়াযী, তা'যীম কাদরিস সালাত, খ. ১, পৃ. ১৯৪, হা. নং: ১৫০, ১৫১; 'আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, অধ্যায়: সালাত, পরিচ্ছেদ: আল-'আবসু ফিস সালাত), হা. নং। ৩৩০৮) উল্লেখ্য যে, 'হাদীসের উপর্যুক্ত কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যরূপে সুপ্রমাণিত নয়; তবে এটা যে হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান ও সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রা.) প্রমুখের বক্তব্য- তা অধিকতর বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত।
১২৭. ইবনু মুবারাক, আয-যুহদ ওয়ার রাকা'য়িক, খ. ১, পৃ. ৩০৫, খ. ৩, পৃ. ১৮৩ (হা. নং: ২৮৯, ১১৩৪]; মারওয়াযী, মুখতাসারু কিয়ামিল লায়ল, পৃ. ২১৫; আবুশ শাইখ আল-ইস্পাহানী, আল-'আযমাতু, হা. নং ৪৩
১২৮. গাযালী, ইহয়া.., খ. ১, পৃ. ১৫৭ ও বিদায়াতুল হিদায়াহ, পৃ. ১১; আবু তালিব আল-মাক্কী, কুতুল কুলুব, খ. ২, পৃ. ১৬০
১২৯. নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুস সালাত), হা. নং: ১২১৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৬৩১৭, ১৬৩২৬
ছাবিত (রা.) তাঁর পিতা থেকেও এরূপ একটি হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, [কিতাব: আল-ইমামাহা, হা. নং: ৯৭১)
১৩০. দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ১৬১
১৩১. দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ.১৬১