📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 সহজাত আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণ

📄 সহজাত আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণ


সব মানুষেরই তার চাইতে শক্তিশালী সত্তার বন্দনা করার সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে। তাই দেখা যায়, যেসব মানুষ দীনের শিক্ষা পায় না, তারা প্রকৃতি, আগুন, পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, পশ-পক্ষী ও সাধু ব্যক্তি প্রভৃতির পূজা করে। এসব কিছুই মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়। সালাত এমন এক ‘ইবাদাত, যা মহীয়ান স্রষ্টার সাথে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে তার সহজাত আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণ করে।

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 অন্তরের সজীবতা ও প্রাণশক্তির উৎস

📄 অন্তরের সজীবতা ও প্রাণশক্তির উৎস


সালাতে আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক- দু'টি দিক রয়েছে। বাহ্যিক দিকের সৌন্দর্য ছাড়াও এর অন্তর্নিহিত চেতনার রয়েছে অশেষ প্রভাব। বস্তুতপক্ষে সালাত পবিত্র অন্তরের প্রাণশক্তি, সজীবতা ও প্রশান্তির উৎস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ - "সালাতের মধ্যেই আমার চোখের শীতলতা অর্থাৎ শান্তি রাখা হয়েছে।”¹¹⁸ কাজেই পার্থিব জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে আবদ্ধ এবং বস্তুগত চাহিদা মেটাতে ক্লান্ত ও শ্রান্ত মানুষের জীবনে সালাত যেন আধ্যাত্মিকতার বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলার ও সজীবতা অর্জনের এক মুক্ত প্রাঙ্গণ। এ যেন এমন এক স্রোতধারায় অবগাহন, যা ধুয়ে মুছে ফেলে মনের সমস্ত কালিমা ও বস্তুগত গ্লানি। এ কারনেই ইসলামে সালাত কায়েম করার ওপর এতো বেশি জোর দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পবিত্র কোরআনে সমস্যা ও সংকটের সময় সালাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ - "তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো।”¹¹⁹ এভাবে সালাত হলো বিপদ-আপদসহ সব সময়ের সহায় এবং অন্তরের সবচেয়ে বড় প্রশান্তির মাধ্যম। তাই সালাত মানুষের জন্য অন্যতম প্রধান জরুরী বিষয়।

টিকাঃ
১১৮. নাসা'ঈ, আস-সুনান, (কিতাব: 'ইশরাতুন নিসা'), হা. নং: ৩৯৪০; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৪০৩৭; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আন-নিকাহ), হা. নং: ১৩৮৩৬
১১৯. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারা, ২: ৪৫, ১৫৩

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা

📄 আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা


মানুষ অনেক বিষয়ের প্রশিক্ষণ পায় সালাতের মাধ্যমে। মানুষের বেয়াড়া কুপ্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরা এবং নাফসকে সংশোধিত ও দীপ্তিময় করার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো সালাত। সালাতে নাফসকে বিনম্র ও অহঙ্কারমুক্ত করার অনুশীলনের ফলে কুপ্রবৃত্তি জেগে ওঠার সুযোগ পায় না এবং খারাপ অভ্যাসও নামাযীর আচার-আচরণে স্থান পায় না। এভাবে পরিশুদ্ধ হবার পর নামাযী সমাজকেও কল্যাণ ও উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا . إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا ، وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا . إِلَّا الْمُصَلِّينَ . الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ
মানুষকে খুবই অস্থিরচিত্ত দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে বিপদগ্রস্ত হলে হা-হুতাশ করতে থাকে এবং ঐশ্বর্যশালী হলে কৃপণ হয়ে পড়ে, তবে তারা নয়, যারা সালাত আদায় করে, যারা তাদের সালাতে সদা নিষ্ঠাবান। ¹²⁰
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ "আর সালাত কায়িম করো। নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও পাপ থেকে বিরত রাখে।”¹²¹
বলাই বাহুল্য, মানুষের নাফসের মধ্যে রয়েছে বিভিন্নরূপ প্রবৃত্তি ও প্রবণতা। এ সব প্রবৃত্তি ও প্রবণতাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ও ব্যবহার করা সম্ভব হলে মানুষ পরিপূর্ণতার চরম শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হবে। মানুষের সমস্যা হলো তারা অসচেতনতা বা উন্মত্ত অবস্থা থেকে মুক্ত নয়। প্রতিটি মানুষের ভেতরে যে উন্মত্ততা থাকে, তাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে। মহান আল্লাহর স্মরণ ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়ার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। সালাতে আল্লাহর স্মরণ শাণিত ও প্রদীপ্ত হয়। মানুষ যখন সালাত আদায় করে, তখন তার ভেতরের সতর্ককারী বিবেক সজীব বা প্রাণবন্ত হয়। এ বিবেক তাকে বারংবার অশ্লীলতা ও অন্যায়ের ব্যাপারে সতর্ক করতে থাকে। এ বিষয়গুলোর উচ্চারণ ও পুনরাবৃত্তি নাফসকে বিনম্র ও ভীত-সন্ত্রস্ত রাখে। এ জন্য বারবার সালাত আদায়ের বিধান দেয়া হয়েছে। সাওম বছরে একবার, হাজ্জও একবার; কিন্তু সালাত বার বার পড়তে হয়। সালাতের বিশেষ গুরুত্বটা এখানেই। সালাত নিয়মিতভাবে বিনয় ও মনোযোগসহ পড়া হলে শুধু নামাযীর নাফসই নয়, একই সাথে তার আশপাশের পরিবেশও কোমল, বিনম্র ও সুরভিত হয়। সমাজে প্রকৃত ও বিনম্র নামাযীর সংখ্যা যত বাড়বে, ততই স্বার্থপরতা, সংকীর্ণতা, লোভ-লালসা এবং অন্যায়-অবিচারের অন্ধকার কমে যাবে; বরং মুক্তি ও কল্যাণের আলো দিনের পর দিন মানুষের মধ্যে প্রদীপ্ততর হয়ে ওঠবে।

টিকাঃ
১২০. আল কোরআন, সূরা আল-মা'আরিজ, ৭০: ১৯-২৩
১২১. আল কোরআন, সূরা আল-'আনকাবুত, ২৯: ৪৫

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম

📄 আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম


সালাত আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম। এর সাহায্যে একজন মু'মিন অন্তত দিনে পাঁচবার আল্লাহ তা'আলার দরবারে উপস্থিত হবার এবং তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ পায়। এ কারণে সালাতকে معراج المؤمن (মু'মিনের মি'রাজ) বলা হয়। ¹²² এতে বান্দাহ তার প্রতিটি অবস্থায় এবং প্রতিটি যিকর ও দু'আর মাধ্যমে প্রকারান্তরে আল্লাহ তা'আলার সাথে গোপন আলাপচারিতায় লিপ্ত হয়। হাদীসে কুদসীতে সূরা ফাতিহা সম্পর্কে বর্ণিত আছে, যখন বান্দাহ সূরা ফাতিহা পাঠ করে, তখন আল্লাহ তা'আলা তার প্রতিটি কথার উত্তর দিয়ে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
قَسَمْتُ الصَّلاةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ فَإِذَا قَالَ الْعَبْدُ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ). قَالَ اللَّهُ تَعَالَى حَمِدَنِي عَبْدِي وَإِذَا قَالَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ). قَالَ اللَّهُ تَعَالَى أَثْنَى عَلَيَّ عَبْدِي. وَإِذَا قَالَ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ. قَالَ مَحْدَنِي عَبْدِي فَإِذَا قَالَ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ). قَالَ هَذَا بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ. فَإِذَا قَالَ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ ). قَالَ هَذَا لِعَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ.
'সালাত (অর্থাৎ সূরাতুল ফাতিহা) কে আমি আমার এবং আমার বান্দাহর মধ্যে দুভাগে বিভক্ত করেছি। অর্ধেক আমার জন্য আর অর্ধেক আমার বান্দাহর জন্য। আমার বান্দাহ যা চায়, তা তাকে দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন বান্দাহ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ বলে, তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আমার বান্দাহ আমার প্রশংসা করেছে। আর যখন الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বলে, তখন তিনি বলেন যে, আমার বান্দাহ আমার গুণগান করেছে। আর যখন مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ বলে, তখন তিনি বলেন, আমার বান্দাহ আমার মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে। আর যখন إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ বলে, তখন তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমার এবং আমার বান্দার মধ্যেই রইলো। আর বান্দাহ যা চায়, তা তাকে দেয়া হবে। আর যখন اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غيرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ বলে, তখন তিনি বলেন, এটা আমার বান্দাহর জন্য রইলো আর আমার বান্দাহ যা চাইবে তা-ই পাবে। ¹²³

টিকাঃ
১২২. মুল্লা আল-কারী, আল-মিরকাত, খ. ১, পৃ. ১৩৪
কেউ কেউ কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যরূপে বর্ণনা করে থাকেন। আমি কোনো হাদীসগ্রন্থেই এটি তাঁর বক্তব্যরূপে খোঁজে পাইনি। আমার ধারণা, এটি কোনো বুযর্গ 'আলিমের কথা হবে।
১২৩. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আস-সালাত), হা. নং: ৯০৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00