📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 হালাল উপার্জন

📄 হালাল উপার্জন


'ঈমান-আকীদার পর হালাল উপার্জন ও পবিত্র উপায়ে জীবন যাপন বান্দাহর জন্য প্রধান ফারয হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম একটি পবিত্র ও স্বচ্ছ জীবন ব্যবস্থার নাম। এতে জীবনের সর্বক্ষেত্রে পবিত্রতা ও স্বচ্ছতা অবলম্বনের জন্য কড়া নির্দেশ রয়েছে। একজন মু'মিন কেবল হালাল ও বৈধ উপায়ে আয়-উপার্জন করবে, তা নয়; বরং তাকে সন্দেহযুক্ত আয়-উপার্জন থেকেও বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الْحَلالَ بَيْنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيْنٌ وَبَيْنَهُمَا مُسْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الشَّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ.
নিশ্চয় হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। তবে এতদুভয়ের মধ্যে কতিপয় সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে, যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব, যে সন্দেহজনক বিষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করলো, সে-ই মূলত নিজের দীন ও 'ইযযাত-আব্রুকে রক্ষা করলো।
কাজেই একজন মু'মিনের আয়-উপার্জন, খাওয়ার আহার্য ও পানীয়, পরিধানের পোশাক-পরিচ্ছদ, বসবাসের ঘরবাড়ি ও আরোহনের গাড়ি প্রভৃতি সম্পূর্ণ হালাল ও সন্দেহমুক্ত উপায়ে অর্জিত হতে হবে। বলাই বাহুল্য, আল্লাহর 'ইবাদাতের ঘাঁটি অতিক্রম করা এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করার জন্য হালাল উপার্জন ও পবিত্র উপায়ে জীবন যাপন একটি অত্যাবশ্যক শর্ত। যদি কারো উপার্জন হালাল বা বৈধ না হয় এবং থাকা-খাওয়া-পরা পবিত্র না হয়, তা হলে তার কোনো 'আমালই- তা যতোই বড় ও মর্যাদাসম্পন্ন হোক না কেন- আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তার কোনো দু'আও আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। এরূপ লোকের বাহ্যিক 'আমাল- যতোই বেশি ও চাকচিক্যময় হোক না কেন, তা তার নাফসের পরিশুদ্ধি বা উন্নয়নের কাজে আসবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ الله طَيِّبٌ لا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ) وَقَالَ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ) ». ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَتْ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَحَابُ لِذَلِكَ ».
হে লোকেরা, আল্লাহ তা'আলা হলেন পূত-পবিত্র। কাজেই তিনি পবিত্র ছাড়া অপর কিছু কবুল করেন না। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদেরকে সে নির্দেশই দান করেছেন, যা তিনি তাঁর রাসূলগণকে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, [হে রাসূলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং সৎ কর্ম করো। আমি তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তিনি আরো বলেন, [হে মু'মিনগণ, তোমরা আমার প্রদত্ত রিযক থেকে পবিত্র বস্তুগুলোই ভক্ষণ করো।" রাবী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "কোনো মুসাফির দীর্ঘ সফর শেষে মলিন বদনে দু হাত বিস্তার করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলে যে, ইয়া রাব্ব! ইয়া রাব্ব! অথচ তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় পোশাক হারাম, অধিকন্তু সে হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে, তা হলে কীভাবে তার দু'আ কবুল হতে পারে?¹⁰⁰
সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ اشْتَرَى ثَوْبًا بِعَشَرَةِ دَرَاهِمَ وَفِيهِ دِرْهَمْ حَرَامٌ لَمْ يَقْبَلْ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً مَادَامَ عَلَيْهِ .
যে ব্যক্তি দশ দিরহাম দিয়ে কোনো কাপড় কিনলো, তন্মধ্যে একটি দিরহাম হলো হারামের, তা হলে কাপড়টি যতদিন তার পরনে থাকবে, ততদিন তার কোনো নামায আল্লাহ তা'আলা কবুল করবেন না। ¹⁰¹
আল্লাহর প্রিয় বান্দাহগণ কোনো হারাম খাবার তো খেতেনই না; বরং কোনো সন্দেহযুক্ত খাবারও গ্রহণ করতেন না। এমন কি তাঁদের কেউ কেউ নিজের কোনোরূপ অসাবধানতার কারণে কখনো সন্দেহযুক্ত কোনো কিছু তাঁর পেটে চলে গেলে তাঁর পাকস্থলী তা গ্রহণ করতে পারতো না। তিনি সাথে সাথে তা বমি করে ফেলে দিতেন। উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা ও কায়স ইবনু আবী হাযিম (রা.) প্রমুখ থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, সাইয়িদুনা আবূ বাকর (রা.)-এর এক গোলাম তাঁর কাছে প্রায়ই খাবার নিয়ে আসতো। তবে গোলামটি যখনই কোনো খাবার নিয়ে আসতো, আবূ বাকর (রা.) জিজ্ঞেস না করে তা খেতেন না। যদি তাঁর পছন্দের কিছু হতো, তা হলে খেতেন। আর তাতে অপছন্দের কিছু থাকলে খেতেন না। নিয়ম মতো গোলামটি এক রাতে আবূ বাকর (রা.)-এর নিকট কিছু খাবার নিয়ে আসলো। এ সময় আবূ বাকর (রা.) এতোই ক্ষুধার্ত ছিলেন যে, খাবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গিয়েছিলেন। তিনি খাবারটি পেয়ে তৎক্ষণাৎ এক লুকমা খেয়ে ফেললেন। তারপর তিনি গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলো, আজকে এ খাবার তুমি কিভাবে সংগ্রহ করেছো? সে জবাব দিলো,
كُنتُ تَكَهَّنْتُ لِإِنْسَانِ فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَمَا أُحْسِنُ الْكِهَانَةَ إِلَّا أَنِّي خَدَعْتُهُ فَلَقِيَنِي فَأَعْطَانِي بِذَلِكَ فَهَذَا الَّذِي أَكَلْتَ مِنْهُ.
আমি জাহিলী যুগে এক ব্যক্তির ভাগ্য গণনার কাজ করেছিলাম। তবে তা আমি ভালো করে জানতামও না। প্রতারণাই করেছিলাম। আজকে তার সাথে সাক্ষাত হবার পর সে আমাকে তার বিনিময় দিয়েছে। এ খাদ্য, যা আপনি খেয়েছেন, ঐ কাজেরই বিনিময়।
এ কথা শোনেই আবূ বাকর (রা.) গলায় হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং বমি করে পেটে যা কিছু ছিল সবই বের করে ফেলে দিলেন। ¹⁰²
যায়িদ ইবনু আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত রিওয়ায়াতে রয়েছে, গোলামের মুখে ঐ কথা শোনেই আবূ বাকর (রা.) গলায় হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বমি করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই ভুক্তদ্রব্য বের হয়ে আসছিল না। তখন তিনি পেট ভরে পানি খেতে লাগলেন। অবশেষে পেটে যা কিছু ছিলো সবই বমি বের করে ফেলে দিলেন এবং বললেন,
لَوْ لَمْ تَخْرُجْ إِلَّا مَعَ نَفْسِي لَأَخْرَجْتُهَا، سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: كُلُّ جَسَدٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ. فَخَشِيتُ أَنْ يَنبَتَ شَيْءٌ مِنْ جَسَدِي مِنْ هَذِهِ اللَّقْمَةِ.
ভুক্তদ্রব্য বের করতে আমার প্রাণও যদি চলে যেতো, তা হলেও আমি অবশ্যই তা বের করতাম। কেননা আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হারাম খাদ্য দ্বারা বেড়ে ওঠা প্রতিটি দেহের জন্য জাহান্নামই হলো উপযুক্ত স্থান। আমার তো ভয় হয়েছিল যে, এ লুকমা থেকে আমার দেহের কিছু অংশ বেড়ে ওঠবে। ¹⁰³
আজকাল আমরা লক্ষ্য করি, আমাদের অনেকেই ইমামাত, দা'ওয়াত, তাবলীগ, ওয়ায ও ইরশাদ প্রভৃতি কাজকেই নিজের জীবিকা উপার্জনের একান্ত মাধ্যমে পরিণত করেছে। ¹⁰⁴ আমি মনে করি, এ কাজ অত্যন্ত জঘন্য ও নিন্দিত এবং সালাফে সালিহীনের রীতির পরিপন্থী। সালাফে সালিহীন নিজেদের অর্থকড়ি উদারচিত্তে ব্যয় করে দীনের প্রচার ও খিদমাত করতেন। তাবলীগ, দা'ওয়াত, ওয়ায ও ইরশাদ প্রভৃতি কাজকে কখনো তাঁরা রুটি-রুজি উপার্জনের উপায়ে পরিণত করেননি। তাঁরা এ সকল কিছুর বিনিময় কেবল আল্লাহর কাছেই চাইতেন। জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা যে কোনো পেশা- ছোট হোক বা বড়- অবলম্বন করতেন। তাঁরা ছোট থেকে ছোটতর পেশাকেও নিজেদের জন্য লজ্জাজনক মনে করতেন না। ¹⁰⁵ আমাদের জন্য এটিই একান্ত অনুকরণীয়। প্রাচীন সকল হানাফী ইমামের অভিমত হলো- আযান, ইমামাত, তা'লীমে কুর'আন ও ওয়ায- তাবলীগ প্রভৃতি 'ইবাদাতের জন্য কোনো রূপ পারিশ্রমিক, হাদিয়া ও বিনিময় গ্রহণ করা হারাম।¹⁰⁶ পূর্ববতী হাম্বালী ইমামগণও এ মত পোষণ করেন। ¹⁰⁷ বিশিষ্ট হানাফী ফাকীহ আস-সারাখসী (রাহ.) বলেন,
ويكره للإمام والمؤذن طلب الأجر على ذلك من القوم لأنهما يعملان لأنفسهما فكيف يشترطان الأجر على غيرهما ثم هما خليفتان للرسول في الدعاء والإمامة وقال الله تعالى: {قُلْ لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْراً إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى } فمن يكون خليفته ينبغي أن يكون مثله .
ইমাম ও মুওয়াযযিনের জন্য এলাকাবাসীদের থেকে পারিশ্রমিক দাবি করা মাকরূহ। কেননা তাঁরা দু জনেই তো নিজেদের জন্য এ 'আমাল করে। তা হলে তাঁরা কিভাবে এ 'আমালগুলোর জন্য পারিশ্রমিকের শর্তারোপ করতে পারেন? তদুপরি তাঁরা দু জনেই হলেন ইমামাত ও আযানের জন্য আহ্বানের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের খালীফা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “(হে রাসূল,) আপনি বলুন, আমি আমার দা'ওয়াতের জন্য আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ্য ছাড়া তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিকই চাই না। "¹⁰⁸ সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর খালীফা হবেন, তাঁকেও অনুরূপ চরিত্রের অধিকারী হওয়া উচিত। ¹⁰⁹
আমি মনে করি, জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রত্যেক 'আলিম ও শাইখকে নিজের সামর্থ্যানুযায়ী যে কোনো পেশা- ছোট হোক বা বড়- অবলম্বন করা উচিত অথবা হস্ত-উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে চেষ্টা করা বাঞ্ছনীয় এবং ইমামাত, দা'ওয়াত, ওয়ায ও ইরশাদ.. প্রভৃতি কাজকে আয়-উপার্জনের পেশারূপে গ্রহণ করা থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকা প্রয়োজন। বরং এ সকল কাজ নিরেট আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াব লাভের আশায় করা সমীচীন। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُؤْمِنَ الْمُحْتَرِفَ "আল্লাহ তা'আলা পেশাজীবী ঈমানদারকে ভালোবাসেন। "¹¹⁰ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, طَلَبُ الْحَلال جهادٌ وَإِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ الْمُؤْمِنَ الْمُحْتَرِفَ জিহাদের শামিল। আর আল্লাহ তা'আলা পেশাজীবী ঈমানদারকেই ভালোবাসেন।”¹¹¹ সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এক যুবকের দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ভাব ও পরহেযগারীর কথা আলোচনা করা হলো। তখন তিনি বললেন, !إنْ كَانَتْ لَهُ حِرفة -"যদি তার কোনো পেশা থাকতো!"¹¹² একবার বিশিষ্ট তাবি'ঈ ইব্রাহীম আন-নাখ'ঈ [৪৬-৯৬ হি.] (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে কেবল আল্লাহর ধ্যানেই নিমগ্ন থাকে আর অপর এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তাদের মধ্যে কে উত্তম? তিনি জবাব দেন, التَّاجِرُ الأَمِين “বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীই।”¹¹³ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস সুফইয়ান ইবনু 'উয়াইনাহ [১০৭-১৯৮ হি.] (রাহ.) বলেন, لَيْسَ مِنْ حُبِّكَ الدُّنْيَا أَنْ تَطْلُبَ .فِيهَا مَا يُصْلِحُكَ “দুনিয়ায় প্রয়োজনীয় জীবন উপকরণ তালাশ করা- এটা তোমার দুনিয়াপ্রীতির লক্ষণ নয়।”¹¹⁴

টিকাঃ
১০০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যাকাত), হা. নং: ২৩৯৩
১০১. আহমাদ, ইমাম ইবনু হাম্বাল, আল-মুসনাদ, হাদীস নং: ৫৪৭৩ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শু'আইব আল-আরনাউত (রাহ.) বলেন, এ হাদীসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
১০২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-মানাকিব), হা. নং: ৩৫৫৪; আহমাদ, আয-যুহদ, হা. নং: ৫৭৩
১০৩. আবূ নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, খ.১, পৃ.১৫; মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, আর-রিয়াদুন নাদিরাতু.., পৃ.৯২
১০৪. ১৯৮১ সালে পরিচালিত বাংলাদেশের আদম শুমারির পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ব্যক্তি তাদের পেশাগত পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, তাদের পেশা হচ্ছে পীর। 'দৈনিক করতোয়া' নামক একটি পত্রিকা এ সংবাদটি প্রকাশ করে এ মন্তব্য করেছে যে, এ সংখ্যাকে বাংলাদেশের মোট গ্রামের মধ্যে ভাগ করলে প্রতি গ্রামের ভাগে মোট চারজন করে 'পীর' পড়বে। এতে প্রমাণিত হয় যে, 'পীর' পেশাই এখন অন্যান্য সকল পেশার চেয়ে লাভজনক। (দ্র. দৈনিক করতোয়া, বগুড়া, ১৮/১২/১৯৮৭ খ্রি.,পৃ.৩) আমার মনে হয়, এ সরলপ্রাণ ব্যক্তিগণ হয়তো পেশা শব্দের অর্থই বুঝেননি অথবা এ শব্দ দ্বারা সরল মনে নিজেদের বাস্তব চিত্রটাই তুলে ধরেছেন। যা হোক, এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, তাঁদের কেউ কেউ পার্থিব উপার্জনের একটি সহজ পথ মনে করে এটাকে একটি পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়ে থাকেন। এরা নিজেদের জীবদ্দশায় যেমন সুকৌশলে সাধারণ মানুষের ঈমান হনন করে সম্পদ অর্জন করে থাকেন, তেমনি তাঁদের মৃত্যুর পরেও তাঁদের বংশধরদের জন্য তাঁদের মাযারগুলোকে পার্থিব উপার্জনের একটি সহজ উপায় হিসেবে রেখে যান। বলাই বাহুল্য, যুগে যুগে এরূপ অনেক লোক দেখা যায় যে, যারা পার্থিব ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান অর্জন করার জন্য সূফীদের বেশ ধারণ করে, অথচ তাসাউফের সাথে তাদের কোনোই সম্পর্ক থাকে না। এ সকল লোককে مستصوف (মুসতাসভিফ) বলা হয়। এ জাতীয় লোকদের সম্পর্কে বিশিষ্ট সূফী শাইখ দাতা গঞ্জে বখশ (রাহ.) এভাবে মন্তব্য করেন: " المستصوف عند الصوفية كالذباب، وعند غيرهم كالذئاب "তারা মাছির ন্যায় হীন ও ঘৃণিত, পার্থিব লোভ-লালসার দাস। সাধারণ লোকদের জন্য তারা হলো নেকড়ে বাঘের মতো।" অর্থাৎ নেকড়ে বাঘ যেমন ছাগলের পালের মধ্যে প্রবেশ করে এদের ধ্বংস করে, তেমনি এরা জনসাধারণের মধ্যে মেলামেশা করে তাদের ঈমান নষ্ট করে। (দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ৪৯)
১০৫. আমাদের সালাফে সালিহীনের মধ্যে সাইয়িদুনা আবূ বাকর, 'উমার, 'উসমান ও 'আবদুর রাহমান ইবনু 'আউফ (রাহ.) প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। সাইয়িদুনা সুহাইব আর-রূমী ও সা'দ ইবনু মু'আয (রা.) কর্মকার ছিলেন। সা'দ (রা.)-এর হাতদুটি হাতুড়ি দিয়ে কাজ করতে করতে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাতে চুমো দিয়ে বললেন, هذه يد لا ممسها النار أبدا - "এ হাতকে কখনো আগুন স্পর্শ করবে না।" (ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, খ. ৩, পৃ. ৮৬; ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, খ. ১, পৃ. ৪২৪-৫) আমাদের পূর্বসূরি ইমাম ও বিশিষ্ট 'আলিমগণের মধ্যে ইমাম আবু হানীফাহ (রাহ.) বস্ত্রব্যবসায়ী, গাযালী (রাহ.) সুতা ব্যবসায়ী, বাযযার (রাহ.) বস্ত্রব্যবসায়ী, বাকালী (রাহ.) সবজি বিক্রেতা, সায়দালানী (রাহ.) আতরব্যবসায়ী ও খায়্যাত (রাহ.) দর্জি ছিলেন। কুদূরী (রাহ.) হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন, আবূ বাকর আল-জাসসাস (রাহ.) সুরকি তৈরি করতেন, খাইয়াম (রাহ.) তাঁবু বানিয়ে বিক্রি করতেন, খাব্বায (রাহ.) রুটি তৈরি করতেন, যাইয়াত (রাহ.) তেল বিক্রি করতেন, কাফ্ফাল (রাহ.) তালা বানাতেন ও বিক্রি করতেন, সাফফার (রাহ.) বাসন-কোষণ বেচাকেনা করতেন ও দাক্কাক (রাহ.) আটা বিক্রি করতেন,......।
১০৬. তবে অধিকাংশ শাফি'ঈ ও মালিকী ফাকীহের মতে- এ ধরনের 'ইবাদাতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয। (ইবনু 'আবদিল বারর, আল-ইস্তিযকারুল জামি', খ. ৫, পৃ. ৪১৮-৯) উল্লেখ্য যে, তাঁদের এ কথার উদ্দেশ্য কখনো এ নয় যে, এ কাজ ভালো এবং সুন্নাত বা মুস্তাহাব্ব। বরং তাঁদের কথার উদ্দেশ্য হলো- তা হারাম নয়। তবে শাফি'ঈ মতাবলম্বী বিশিষ্ট ফাকীহ আল-খাতীব আশ-শারবীনী (মৃ.৯৭৭হি.) (রাহ.)-এর মতে, ইমামাতের জন্য, এমনকি নাফল নামায যেমন-তারাবীহের ইমামাতের জন্যও বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয হবে না। কেননা জামা'আতের যে ফাযীলাত রয়েছে, ইমাম যদি তার জন্য কোনোরূপ বিনিময় গ্রহণ করে, তবে সে কোনোরূপ উপকারিতা পাবে না। (শারবীনী, মুগনিউল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৪৪; নাবাবী, আল-মাজমূ', খ. ১৫, পৃ. ৩৯) মালিকীগণের মতে, আযান ও ইকামাতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয। ইমামাতের বিনিময় গ্রহণ করাও জায়িয, যদি তা আযান কিংবা ইকামাতের অনুগামী হয়। পৃথকভাবে ইমামাতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয নয়। তদুপরি মুসাল্লীদের অর্থ থেকে ইমামাতের বিনিময় গ্রহণ করা মাকরূহ। কিন্তু বাইতুল মাল কিংবা ওয়াকফ সম্পদ থেকে ইমামাতের বিনিময় দেয়া হলে তা গ্রহণ করতে কোনো অসুবিধা নেই। (আবূ 'আবদুল্লাহ আল-'আবদারী, আত-তাজ ওয়াল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ৪৫৫; ফিকহুল 'ইবাদাত 'আলাল মাযহাবিল মালিকী, পৃ. ১২৯)
১০৭. বুহুতী, আর-রাওদুল মুরাব্বা', পৃ. ৫৩; শানকীতী, শারহু যাদিল মুস্তানকি', খ. ২৮, পৃ. ৫
১০৮. আল-কুর'আন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ২৩
১০৯. সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১,পৃ.২৫৬
১১০. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৩: আত-তাওয়াক্কুল), হা. নং: ১১৮১; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব হা. নং: ১০৭২; তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৮৯৩৪ হাদীসটি দা'ঈফ। (আলবানী, দা'ঈফুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ১, পৃ. ২৬১, হা. নং: ১০৪৩)
১১১. ইবনু আবিদ দুনিয়া, ইসলাহুল মাল, হা. নং: ১৯৩; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩৮ হাদীসটি দা'ঈফ। (আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দা'ঈফাহ.., খ. ৩, পৃ. ৪৬৬, হা. নংঃ ১৩০১) তবে এ মর্মের বহু হাদীস রয়েছে। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হাফিয সাখাভী (রাহ.) বলেন, وبعضها يؤكد بعضا لا سيما وشواهدها كثيرة এ হাদীসগুলো পরস্পর তাগিদ করে, বিশেষ করে যেহেতু এ হাদীসগুলোর প্রচুর সমর্থনকারী হাদীসও বিদ্যমান রয়েছে। (সাখাভী, আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, খ. ১, পৃ. ৫০৫)
১১২. ইবনু আবিদ দুনিয়া, ইসলাহুল মাল, হা. নং: ১৯৫; ইবনু তাহির আল-মাকদিসী, যাখীরাতুল হুফফায, হা. নং: ২৯১৪; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩৮
১১৩. ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩০
১১৪. খাল্লাল, আল-হাসসু 'আলাত তিজারাতি.., হা. নং: ৭২; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩০

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 ইস্তিক্বামাত (সর্ব পরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা)

📄 ইস্তিক্বামাত (সর্ব পরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা)


ইস্তিকামাত অর্থ সর্বাবস্থায় ও সকল কাজে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা। এটি দীনের একটি অপিরহার্য বিষয় এবং আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা। নাফস সর্বমুহূর্তে মানুষকে তার স্বভাবগত চাহিদাগুলো ন্যায়ানুগভাবে হোক কিংবা অন্যায়ভাবে- পূরণ করতে প্রেরণা যোগায় ও তাগাদা দেয়। কাজেই এ স্বভাবগত প্রেরণা ও তাগাদা সত্ত্বেও সর্ব অবস্থায় ও সকল কাজে সত্য ও ন্যায়ের ওপর চলা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এর জন্য প্রয়োজন নাফসের ওপর পূর্ণ শাসন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তা ছাড়া মানব জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে বহু ধরনের পরীক্ষা হয় এবং এ সব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা কার্যত দেখতে চান যে, কে তাঁর প্রকৃত মু'মিন বান্দাহ, আর কে মিথ্যুক, কে তাঁর পূর্ণ অনুগত বান্দাহ, আর কে তাঁর অবাধ্য ও কপট দাবিদার? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ . الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ) এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সকলেই তাঁরই নিকট ফিরে যাবো। ২১৯
অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ . وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ ﴾ মানুষ কি মনে করে নিয়েছে যে, তারা এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না। অথচ আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। এভাবে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই কার্যত সত্যবাদীদের জেনে নেবেন এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যাবাদীদেরও। ২২০
সাইয়িদুনা সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি জিজ্ঞেস করেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَشَدُّ النَّاسِ بَلَاءً؟ - "ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কারা সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন হন?" তিনি জবাব দিলেন,
الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ يُبْتَلَى الْعَبْدُ عَلَى حَسْبِ دِينِهِ، فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلَابَةٌ زِيدَ صَلَابَةٌ، وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةٌ خُفْفَ عَنْهُ. সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন হন নাবীগণ, তারপর তাঁদের পরবর্তী উৎকৃষ্ট লোকগণ, অতঃপর তাঁদের পরবর্তী উৎকৃষ্ট লোকগণ। বস্তুত বান্দাহকে তার দীনদারির মাত্রা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। কাজেই যে ব্যক্তি দীনের ওপর কঠোরভাবে অটল থাকতে চাইবে, তার বিপদের কঠোরতাও বেড়ে যাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দীন পালনে কোনোরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন করবে, তার বিপদের মাত্রাও সে পরিমাণে হ্রাস পাবে। ২২১
উপর্যুক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, এ দুনিয়া, বিশেষ করে মু'মিনদের জন্য পরীক্ষাগার। এখানে তাদেরকে নানা দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন করা হয়। তাঁদের মধ্যে যে যতো বেশি সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে চাইবে, সে ততো বেশি দুঃখ-কষ্ট-বিপদের সম্মুখীন হবে। পক্ষান্তরে সুবিধাবাদী চরিত্রের লোকেরা অধিকতর সুখ-সাচ্ছন্দ্যের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করে থাকে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الدُّنْيا سِحْنٌ لِلْمُؤْمِنِ وَجَنَّةٌ لِلْكَافِرِ- "দুনিয়া হলো মু'মিনের জন্য কারাগার স্বরূপ আর কাফিরের জন্য জান্নাত স্বরূপ।”২২২
কাজেই প্রত্যেক মু'মিনের প্রতি তার ঈমানের একান্ত দাবি হলো, সে সকল পরিস্থিতিতে ও সকল কাজে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকবে এবং এ জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَنْ تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
অতএব, আপনি সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকুন, যেভাবে আপনাকে আদেশ দেয়া হয়েছে। আর যারা (শিরক ও কুফর থেকে) তাওবাহ করে আপনার সাথী হয়েছে, তারাও যেন সত্য পথে অবিচল থাকে আর আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করবে না। কেননা তিনি তোমাদের প্রতিটি কার্যকলাপ লক্ষ্য করছেন। ২২৩
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সকল মু'মিনকেই তাঁদের সকল কাজে সর্বাবস্থায় ইস্তিকামাত অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। 'ইস্তিকামাত'-এর প্রকৃত অর্থ হলো- কোনো দিকে একটু পরিমাণ না ঝুঁকে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা। বস্তুত এ কোনো সহজ কাজ নয়। কোনো লৌহদণ্ড বা পাথরের খাম একজন সুদক্ষ প্রকৌশলী হয়তো এমনভাবে দাঁড় করাতে পারে, কিন্তু কোনো মানুষের পক্ষে সর্বাবস্থায় সোজা দাঁড়িয়ে থাকা কতো দুষ্কর তা কোনো সাধারণ বোধসম্পন্ন ব্যক্তির অজানা নয়। আয়াতে সর্বাবস্থায় সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ হলো- 'আকাইদ, 'ইবাদাত, লেনদেন, আচার-ব্যবহার, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ উপার্জন ও ব্যয় তথা নীতি- নৈতিকতার যাবতীয় ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে তাঁরই নির্দেশিত সোজা পথে চলা। তন্মধ্যে কোনো ক্ষেত্রে, কোনো কার্যে এবং পরিস্থিতিতে গড়িমসি করা, বাড়াবাড়ি করা অথবা ডানে-বামে ঝুঁকে পড়া ইস্তি কামাতের পরিপন্থী।
দুনিয়ায় যত গোমরাহী ও পাপাচার দেখা যায়, তা সবই ইস্তিকামাত হতে সরে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। 'আকাইদের ক্ষেত্রে ইস্তিকামাত না থাকলে মানুষ বিদ'আত থেকে শুরু করে কুফর ও শিরক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ, তাঁর পবিত্র সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সুষ্ঠু ও সঠিক মূলনীতি শিক্ষা দিয়েছেন, তার মধ্যে বিন্দুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি বা পরিবর্ধন-পরিবর্জনকারী পথভ্রষ্টরূপে আখ্যায়িত হবে, যদিও তার নিয়্যাত ভালো হোক না কেন। অনুরূপভাবে নাবী-রাসূলগণের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার যে সীমারেখা নির্ধারিত হয়েছে, সে ব্যাপারে ত্রুটি করা কিংবা বাড়াবাড়ি করা স্পষ্ট ধৃষ্টতা ও পথভ্রষ্টতা। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা এরূপ বাড়াবাড়ির কারণেই বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়েছে।
'ইবাদাত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পথনির্দেশ করেছেন, তার মধ্যে কোনোরূপ কমতি বা গাফলাতি মানুষকে যেমন ইস্তিকামাতের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে, অনুরূপভাবে তার নিজের পক্ষ থেকে কোনো সংযোজন বা পরিবর্ধনও মানুষকে বিদ'আতে লিপ্ত করে।
অনুরূপভাবে স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, আদান-প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ উপার্জন, বিয়ে-শাদী ও সাধনা তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশিত মূলনীতিগুলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাস্তবে রূপায়িত করে একটা সুষ্ঠু ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা পত্তন করেছেন। এ ব্যবস্থা পুরোপুরি অবলম্বন করেই মানুষ সত্যিকার মানুষে পরিণত হতে পারে। তা থেকে বিচ্যুত হলেই একদিকে মানুষের নৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় ঘটবে, অপরদিকে সামাজিক বিপর্যয়ও দেখা দেবে।
সুফইয়ান ইবনু 'আবদিল্লাহ আস-সাকাফী (রা.) একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমীপে আরয করলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْ لِي فِي الإسلام قَوْلاً لَا أَسْأَلُ عَنْهُ أَحَدًا بَعْدَكَ- “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলাম সম্পর্কে আমাকে এমন একটি ব্যাপক শিক্ষা দান করুন, যেন আপনার পরে আমার আর কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না হয়।” তিনি বললেন, قُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ فَاسْتَقِمْ “তুমি বলো যে, আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। অতঃপর ইস্তিকামাত অবলম্বন করো।”২২৪
'উসমান ইবনু হাদির আল-আযদী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) সমীপে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম, أَوْصِنِي-"আপনি আমাকে উপদেশ দান করুন।” তদুত্তরে তিনি বললেন, عَلَيْكَ بِتَقْوَى الله وَالِاسْتِقَامَةِ، أَتَّبِعْ وَلَا تَبْتَدِعْ - “তাকওয়া ও ইস্তিকামাত অবলম্বন করো। (আর এর সঠিক পন্থা হলো) দীনী ব্যাপারে শারী'আতের অনুশাসন হুবহু মেনে চলো, নিজের পক্ষ থেকে হ্রাস-বৃদ্ধি করতে যেয়ো না।”২২৫ বস্তুতপক্ষে এ দুনিয়ায় ইস্তিকামাতই সবচেয়ে দুষ্কর কার্য। এ জন্যই দীনের বুযর্গ ব্যক্তিগণ বলেন যে, الاستقامة فوق الكرامة -"কারামাতের চেয়ে ইস্তিকামাতের মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে।" অর্থাৎ যে ব্যক্তি সর্বকাজে ইস্তিকামাত অবলম্বন করেন, যদি জীবনভর তাঁর দ্বারা কোনো অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত নাও হয়, তথাপি ওলীগণের মধ্যে তাঁর মর্যাদা সবার উর্ধ্বে।
সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) বলেন, مَا نَزَلَ عَلَى رَسُولُ الله صلى عليه وسلم آية هي : هيَ أَشَدُّ وَلَا أَشَقُّ مِنْ هَذِهِ الْآيَةِ عَلَيْهِ. " আল্লাহ মধ্যে উপযুক্ত আয়াত (অর্থাৎ فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ)-এর হুকমের চেয়ে কঠিন ও কষ্টকর কোনো হুকম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল হয়নি।"২২৬ একবার সাহাবা কিরাম (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়ি মুবারাকের কয়েক গাছি পেকে গেছে দেখতে পেলেন, তখন আফসোস করে বললেন, لَقَدْ أَسْرَعَ إِلَيْكَ الشَّيْبُ! - “আপনার দিকে দ্রুত গতিতে বার্ধক্য এগিয়ে আসছে!” তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, شَيَّبَتْنِي هُودُ وَأَخَوَاتُهَا -"সূরা হুদ এবং এ জাতীয় সূরাগুলো আমাকে বৃদ্ধ করেছে।”২২৭ সূরা হুদে বর্ণিত পূর্ববর্তী বিভিন্ন জাতির ওপর কঠোর আযাবের ঘটনাবলিও এর কারণ হতে পারে। তবে ইবনু 'আব্বাস (রা.) বলেন, "ইস্তিকামাতের নির্দেশই ছিল বার্ধক্যের কারণ।"২২৮ বিশিষ্ট সূফী শাইখ আবূ 'আলী মুহাম্মাদ ইবনু 'উমার আস-সিররী (রাহ.) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিয়ারাত লাভ করে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি এ কথা বলেছেন যে, সূরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ করেছে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবূ 'আলী আস-সিররী (রাহ.) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, উক্ত সূরায় বর্ণিত নাবীগণের কাহিনী ও তাঁদের কাওমসমূহের ওপর আপতিত আযাবের ঘটনাবলিই কি আপনাকে বৃদ্ধ করেছে? তিনি জবাব দিলেন, {فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ} - لا ولكن قوله : {فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ}. কথাটিই আমাকে বৃদ্ধ করেছে।”২২৯
উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিপূর্ণ মানুষের বাস্তব নমুনারূপে এ জগতে শুভাগমন করেছিলেন। ইস্তিকামাতের ওপর সুদৃঢ় থাকাই ছিল তাঁর জন্মগত স্বভাব। তথাপি অত্র নির্দেশকে এতটুকু গুরুভার মনে করার কারণ এই যে, অত্র আয়াতে আল্লাহ তাঁকে শুধু সোজা পথে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং "যেভাবে আপনাকে আদেশ করা হয়েছে" বলে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নাবী ও রাসূলগণের অন্তরে অপরিসীম আল্লাহভীতির প্রবল প্রভাবের কথা কারো অজানা নয়। তাই পূর্ণ ইস্তিকামাতের ওপর কায়িম থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যেরূপ ইস্তিকামাতের নির্দেশ দিয়েছেন, তা পুরোপুরি আদায় হচ্ছে কি না? আরেকটি কারণ এই হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ইস্তিকামাতের জন্য বিশেষ চিন্তিত ছিলেন না। কেননা, আল্লাহর অনুগ্রহে তা তাঁর পূর্ণমাত্রায় হাসিল ছিল। কিন্তু উক্ত আয়াতে সমগ্র উম্মাতকে সোজা পথে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ উম্মাতের জন্য এটা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টকর। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতীব চিন্তিত ও শঙ্কিত ছিলেন। ২৩০

টিকাঃ
২২৪. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১৬৮
২২৫. দারিমী, আস-সুনান, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ১৩৯
২২৬. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৯, পৃ. ১০৭
২২৭. সা'ঈদ ইবনু মানছুর, আস-সুনান, খ. ৫, পৃ. ৩৭০
২২৮. মুহাম্মাদ আত-তাহির, আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, খ. ১২, পৃ. ১৭৬
২২৯. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৯, পৃ. ১০৭; যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', খ. ১৬, পৃ. ৪২৪
২৩০. শফী, মা'আরিফুল কোরআন, পৃ. ৬৪৬

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 নবী-রাসূল ও সাহাবীগণের জীবনী অধ্যয়ন

📄 নবী-রাসূল ও সাহাবীগণের জীবনী অধ্যয়ন


আত্মসংশোধন ও উন্নয়নের একটি শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা হলো নাবী-রাসূল ও সাহাবীগণের জীবনী অধ্যয়ন। বলাই বাহুল্য, নাবী-রাসূল ও তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারী সাহাবীগণ হলেন ইনসানী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম আদর্শ মানুষ। যে সকল উপাদান মানব মন ও চরিত্রকে সুন্দর, উন্নত, মহৎ ও পরিপূর্ণ করে তোলতে পারে, তার সবগুলোই তাঁদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিভাবে মানুষ তার আত্মার উন্নতি বিধান করবে, কিভাবে তার জীবন গঠন করবে, কিভাবে জীবন সংগ্রামে সে জয়ী হবে- সবকিছুর পরিপূর্ণ আদর্শ তাঁরা আমাদের দেখিয়ে গেছেন। কাজেই যে কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যত পথ-নির্দেশের জন্য তার উত্তম ও সত্যপরায়ণ পূর্বসূরীদেরকে গভীর দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করাই সর্বাধিক ফলপ্রসু ব্যবস্থা। ব্যক্তি জীবনে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, তা থেকে নিজেকে উদ্ধার করার জন্যও অতীতের সত্যনিষ্ঠ ও মহৎ লোকদের সংগ্রামমুখর ও স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসও নিজের সামনে সদা হাযির রাখা আবশ্যক। মোটকথা, অতীত প্রজন্মের ইতিহাসের মধ্যে বর্তমান ও অনাগত প্রজন্মসমূহের জন্য বিরাট শিক্ষা নিহিত থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ -"তাঁদের (অর্থাৎ নাবী-রাসূলগণের) কাহিনীতে বিবেকসম্পন্ন লোকদের জন্য রয়েছে শিক্ষার বিশেষ উপকরণ।”৫৩১ এসব শিক্ষার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মানুষের মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার চাইতে অধিক গভীর ও অনায়াসলব্ধ হয়। এ কারণেই গোটা মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নির্দেশনামা হিসেবে প্রেরিত পবিত্র কুর'আনের বিভিন্ন জায়গায় অতীতের নাবী-রাসূল ও তাঁদের সত্যনিষ্ঠ অনুসারীগণের বহু ঘটনা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যত সংশোধনের জন্য একটি অমোঘ ব্যবস্থাপত্র। কাজেই যে কোনো ব্যক্তি যদি সে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ এবং তার জীবনকে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে চায়, তবে সে যেন অবশ্যই নাবী-রাসূল ও তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীগণের সংযমী ও সংগ্রামমুখর জীবনীসমূহ অধ্যয়ন করে। তা থেকে সে নিঃসন্দেহে তার মনের অনেক খোরাক ও প্রেরণা লাভ করতে পারে।

টিকাঃ
৫৩১. আল-কোরআন, সূরা ইউসূফ, ১২: ১১১

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তা

📄 মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তা


মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তাও আত্মশুদ্ধি, আত্মিক শক্তি ও নৈতিক উৎকর্ষ লাভের অন্যতম ব্যবস্থা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দুনিয়াই মু'মিনের কর্মস্থল এবং সবকিছু তাকে এখানেই করতে হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে বিশ্বাস করে যে, এ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় সে যা কিছু করে, তা এখানেই শেষ হয়ে যায় না; বরং এ দুনিয়ার পর আরো একটি জগত রয়েছে, যা স্থায়ী এবং যেখানে তাকে তার প্রত্যেকটি কাজের জন্য হিসাব দিতে হবে এবং এর জন্য তাকে ভালো কি মন্দ ফল ভোগ করতে হবে। এ বিশ্বাস যতো সুদৃঢ় হবে এবং এ চিন্তা বেশি সময় ধরে স্থায়ী হবে, ততোই তার অনুভব-মনন, কথা, কর্ম ও আচার-আচরণের মধ্যে এ বিশ্বাস ও চিন্তার প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। কোনো মু'মিনের অন্তরে যখন এ বিশ্বাস প্রগাঢ় হয়, তখন সে এ দুনিয়ায় যা কিছু করে, তা বস্তুতপক্ষে এ দুনিয়ার সাফল্য লাভের জন্য করে না; বরং আখিরাতের জন্য করে এবং দুনিয়ার ফলাফলের দিকে তার লক্ষ্য থাকে না; বরং তার লক্ষ্য থাকে আখিরাতের ফলাফলের প্রতি। যে সব কাজ আখিরাতে লাভজনক সেসব সে করে এবং যে কাজের ফলে আখিরাতে কোনো লাভ হবে না বা ক্ষতি হবে, সেগুলো সে বর্জন করে চলে। তার অন্ত রজুড়ে বিরাজ করে একমাত্র আখিরাতের সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং শান্তি ও পুরস্কারের চিন্তা। এর মুকাবিলায় দুনিয়ার কোনো শান্তি ও পুরস্কারের গুরুত্ব তার কাছে থাকে না। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে নানাভাবে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ ও আখিরাতে সাফল্য লাভের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ “ পার্থিব সুখ-সম্ভোগের প্রতি মোহভঙ্গকারী মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো।”৫৭৮ তিনি আরো বলেন, الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ "বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি, যে নিজের নাফসের সমালোচনা করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সাফল্যের জন্য 'আমাল করে। "৫৭৯ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ أَكْيْسَ النَّاسِ أَكْثَرُهُمْ لِلْمَوْتِ ذِكْرًا، وَأَحْسَنُهُمْ لِلْمَوْتِ اسْتِعْدَادًا - "সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমান লোক হলো যে ব্যক্তি সকলের চাইতে বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এবং মৃত্যুর জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করে।”৫৮০
দীর্ঘদিন গুনাহ করার কারণে অন্তরের মধ্যে যে গাফলাতি, কাঠিন্য ও রুচিবিকৃতির সৃষ্টি হয়, তা দূরীভূত করার একটি প্রধান ব্যবস্থা হলো বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ هَذِهِ الْقُلُوبَ تَصْدَأُ ، كَا .يَصْدَأُ الْحَدِيدُ إِذَا أَصَابَهُ الْمَاءِ -"এ অন্তরগুলোতে মরিচা ধরে যেমন লোহায় মরিচা ধরে যখন তাতে পানি লাগে।" সাহাবীগণ আরয করলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا جَلَاؤُهَا ؟- "ইয়া রাসূলাল্লাহ, এটা পরিষ্কার করার উপায় কী?” তিনি জবাব দিলেন, কَثرَةُ ذِكْرِ الْمَوْتِ وَتِلَاوَةُ الْقُرْآنِ. - "বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা ও কোরআন তিলাওয়াত করা।”৫৮১ উল্লেখ্য যে, ইসলামে কবর যিয়ারাতের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ এবং দুনিয়ার প্রতি নির্মোহভাব সৃষ্টি।
মানুষ যখন কার দেখতে পায় এবং স্মরণ করে, যে জীবনে সে আনন্দ-ভোগ-বিলাসে মত্ত, সে জীবন অচিরেই ফুরিয়ে যাবে, তাকে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করতেই হবে, অতঃপর কবরের সংকীর্ণতা ও তার কঠিন শাস্তি নিয়ে চিন্তা করে এবং ভবিষ্যতের কঠোর হিসাব ও জবাবদিহিতার চিত্র হৃদয়পটে ভেসে ওঠে, তখন অবশ্যই তার অন্তর পরকালের ভয়ে একান্তই নরম ও বিগলিত হয়ে যাবে, যা তার বাকী জীবনের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের একান্ত পাথেয় রূপে কাজ করবে। সাইয়িদুনা আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইhi ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنِّي نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَرُورُوهَا فَإِنَّ .فِيهَا عِبْرَة - "আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারাত করা থেকে নিষেধ করতাম। এখন তোমরা কবর যিয়ারাত করো। কেননা যিয়ারাতের মধ্যে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উপকরণ রয়েছে।”৫৮২ বর্ণিত রয়েছে যে, বিশিষ্ট তাবি'ঈ রাবী' ইবনু খায়সাম (রাহ.) যখনই কোনোরূপ গাফলাতি অনুভব করতেন, তখন তিনি কবরের দিকে চলে যেতেন এবং কাঁদতেন ও বলতেন যে, আমরাও ছিলাম, তোমরাও ছিলে! এভাবে পুরো রাত সেখানে কেটে দিতেন। সকালে যেন তাঁকে কবর থেকে বের করা হতো। ৫৮৩ এ কারণেই অনেক 'আলিমই বলেছেন, অন্তরের জন্য- বিশেষ করে যখন তা কঠোর হয়ে যায়- কবর যিয়ারাতের চেয়ে অধিক উপকারী আর কিছুই নেই। জনৈক ব্যক্তি ইমাম আহমাদ (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করলো, كَيْفَ يَرقُ قلبي ؟-"কিভাবে আমার অন্তর বিনম্র হবে? তিনি জবাব দিলেন, .اَدْخُلْ الْمَقْبَرَةَ - “তুমি কবরস্থানে গমন করো।”৫৮৪

টিকাঃ
১৩১. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩০৭; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৫৮
৫৭৯. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৬০
৫৮০. হাইসামী, বুগইয়াতুল বাহিস.., বাব: যিকরুল মাওত, হা. নং: ১১১৬-৭; তাবারানী (রাহ.) ও অন্য একটি সূত্রে সামান্য শব্দগত পরিবর্তন হাদীসটি তাঁর মু'জামসমূহে উল্লেখ করেছেন। (দ্র. আল-মুজামুস সাগীর, হা. নং: ১০০৮, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ২১০৩: আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ১৩৬৩৬)
৫৮১. কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ১১৭৮; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৯: তা'যীমুল কোরআন), হা. নং: ১৮৫৯ এ হাদীসটি দা'ঈফ। (আবুল ফাদল আল-'ইরাকী, আল-মুগনী 'আন হামলিল আসফার, খ. ১, পৃ. ২২২, হা. নং: ৮৬৬)
৫৮২. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১০৯০১। এ হাদীসটি সাহীহ।
৫৮৩. 'আলী মাহফুয, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৮
৫৮৪. ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ. ৩,পৃ. ৩৪৬; মিরদাভী, আল-ইনসাফ, খ. ৪,পৃ. ৩৭৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00