📄 কালের ব্যাধি ও তা দূরীকরণের গুরুত্ব
যেভাবে অসতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণে মানুষের শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সেখানে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়, তেমনিভাবে নাফসের প্ররোচনার অনুকরণের দরুন এবং মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুশীলন না করার কারণে মানুষের অন্তরও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং সেখানে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। কাফির ও মুনাফিকরা যেহেতু পুরোপুরিই নাফসের পূজারী ও স্বার্থান্ধ, তাই তাদের অন্তরসমূহ পুরোপুরি অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত। আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর প্রসঙ্গে বলেন, فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ - "তাদের অন্তঃকরণে রয়েছে ব্যাধি।”⁴³ অর্থাৎ তাদের অন্তর রোগাক্রান্ত ও অসুস্থ। তবে একজন মু'মিনের নিকট ঈমানের একান্ত দাবি হলো, তার অন্তর পুরো সুস্থ ও পরিশুদ্ধ হবে। ⁴⁴ তবে তাদের যে কেউ যতটুকু পরিমাণ নাফসের প্ররোচনার অনুকরণ করবে এবং গুনাহে লিপ্ত হবে, তার অন্তর ততটুকু রোগাক্রান্ত ও অসুস্থ হবে। ⁴⁵
হাদীসে রয়েছে, কোনো মু'মিন যদি নাফসের তাড়নায় কোনো অপকর্মে লিপ্ত হয়, তবে তার কালবের ওপর একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর তার পাপের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে সেখানে একের পর এক দাগও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এ দাগগুলো বাড়তে বাড়তে পুরো অন্তর ছেয়ে যায়। এর ফলে তার অন্তর অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ক্রমে সে সত্য-ন্যায়-সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। পক্ষান্তরে অন্যায়-অসুন্দর ও মিথ্যার প্রতি তার ঝোঁক প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ - "কখনো না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।”⁴⁶ অর্থাৎ তারা গুনাহ করতে করতে তাদের অন্তরে গুনাহের মরিচা পড়ে গেছে। মরিচা যেমন লোহাকে খেয়ে মাটিতে পরিণত করে দেয়, তেমনি তাদের পাপের মরিচা তাদের অন্তরের যোগ্যতা নিঃশেষ করে দেয়। ফলে তারা ভালো-মন্দ পার্থক্য করার উপলব্ধি ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ الْمُؤْمِنَ الْعَبْدَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فِي قَلْبِهِ فَإِنْ تَابَ وَنَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ صُقِلَ قَلْبُهُ وَإِنْ زَادَ زَادَتْ حَتَّى يَعْلُو قَلْبَهُ ذَاكَ الرَّيْنُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ فِي الْقُرْآنِ { كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ } .
মু'মিন/বান্দাহ যখন কোনো পাপ করে, তখন তার কালবের মধ্যে একটি কালো দাগ পড়ে। যদি সে তাওবা করে ফিরে আসে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে তার অন্তর স্বচ্ছ হয়ে যায়। আর যদি সে তাওবা না করে বরং আরো পাপ করে, তবে সে কালো দাগটি বৃদ্ধি পেতে থাকে, এক পর্যায়ে তা তার পুরো অন্তরে ছেয়ে যায়। আর এটাই হলো 'রাইন', যা আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। ৪৯ সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) বলেন,
الْإِيمَانُ يَبْدَأُ نُقْطَةً بَيْضَاءَ فِي الْقَلْبِ ، كُلَّمَا ازْدَادَ الْإِيمَانُ ازْدَادَتْ بَيَاضًا حَتَّى يبيضُ الْقَلْبُ كُلُّهُ ، وَالنَّفَاقُ يَبْدَأُ نُقْطَةٌ سَوْدَاءَ فِي الْقَلْبِ كُلَّمَا ازْدَادَ النِّفَاقُ ازْدَادَتْ سَوَادًا حَتَّى يَسْوَدُ الْقَلْبُ كُلُّهُ ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ شَقَقْتُمْ عَنْ قَلْبِ مُؤْمِنٍ لَوَجَدْتُمُوهُ أَبْيَضَ ، وَلَوْ شَقَقْتُمْ عَنْ قَلْبِ مُنَافِقٍ لَوَجَدْتُمُوهُ أَسْوَدَ الْقَلْبِ .
ঈমান কালবের মধ্যে শুচিশুভ্র দাগ রূপে প্রতিভাত হয়। ঈমান বৃদ্ধির সাথে সাথে তার শুচিতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে, এমনকি এক পর্যায়ে পুরো অন্তর শুচিশুভ্রতে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে নিফাক কালবের মধ্যে কালো দাগরূপে প্রতিভাত হয়। নিফাক বৃদ্ধির সাথে সাথে অন্তরের কৃষ্ণবর্ণও বৃদ্ধি পেতে থাকে, এমনকি এক পর্যায়ে পৌছে পুরো অন্তর কালো দাগে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সে যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন রয়েছে! যদি তোমরা কোনো মু'মিনের কালব বিদীর্ণ করো, তা হলে তোমরা অবশ্যই তাঁর কালবকে শুচিশুভ্র দেখতে পাবে। পক্ষান্তরে যদি তোমরা কোনো মুনাফিকের কালব বিদীর্ণ করো, তা হলে তোমরা অবশ্যই তাঁর কালবকে কালো দেখতে পাবে। ৪৮
উল্লেখ্য যে, কালবে পাপের মরিচা জমতে জমতে একপর্যায়ে তা গাঢ় কালো আস্তরণে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে এ অবস্থাকে 'খাতম' (মোহর লাগা) বলা হয়েছে।৪৯ কালব এ অবস্থায় পৌঁছে সত্য, ন্যায়, ঈমান ও ইসলামের প্রতি সব ধরনের আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে এবং এ সব তাঁর কালবে প্রবেশের কোনো সম্ভাবনা আর বাকী থাকে না। কোরআনের অন্য আয়াতে কালবের এ অবস্থাকে 'তার'আ'ও বলা হয়েছে।৫০ এর অর্থ হলো- যাবতীয় কুকর্ম ও অসৎগুণ কালবের স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়। এ অবস্থায় কালবের মধ্যে সত্য ও ন্যায়ের কথা গ্রহণের যোগ্যতা পুরোটাই নিঃশেষ হয়ে যায়।৫১ স্মর্তব্য যে, কাফির ও মুনাফিকের কালবে যে আস্তরণ জমে তা অত্যন্ত গাঢ় এবং কঠিন পাথরের সাথে তুলনা করা যায়। ফলে তাদের কালবের এ আস্তরণ কখনো অপসারণ হবার মতো নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً -"কিন্তু আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করার পরও শেষ পর্যন্ত তোমাদের অন্তরগুলো কঠিন হয়ে গেছে; বরং তার চেয়েও কঠিনতর।”৫২ এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কাফির-ইয়াহুদীদের অন্তরগুলোকে পাথরের সাথে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, তাদের অন্তরগুলো পাথরের মতো বা পাথর অপেক্ষাও বেশি কঠিন।
অপরদিকে মু'মিনের অন্তরে যে আস্তরণ জমে তা হালকা হয় এবং তাকে আয়নার সাথে তুলনা করা যায়, যার মধ্যে হয়তো কিছুটা মরিচা পড়ে; তবে তা একটু ঘষামাজা করলেই স্বচ্ছ হয়ে যেতে পারে।৫৩ কিন্তু এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি নিজে পাথরের আকৃতি ধারণ করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে জোর করে আয়নাতে পরিণত করবেন না। আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করে দিয়ে বলেন, ﴾فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ﴿ - "যখন তারা নিজেরা বক্র পথ অনুসরণ করেছে, তখন আল্লাহও তাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দিয়েছেন।”৫৪ কেননা আল্লাহর এটা রীতি নয় যে, তিনি অন্যায় পথের পথিককে জবরদস্তি করে হিদায়াত দান করবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ﴿ - "আল্লাহ তা'আলা যালিম লোকদের সত্য পথ প্রদর্শন করেন না।”৫৫ তবে যারা স্বেচ্ছায় ও সরল অন্তঃকরণে হিদায়াতপ্রাপ্ত হতে চায়, আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তাদেরকে হিদায়াত দান করেন। তিনি বলেন, ﴾وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيبُ﴿ - “আল্লাহ তা'আলা তাকেই সৎপথ প্রদর্শন করেন, যে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ দান করে।”৫৬ তিনি আরো বলেন,
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى . وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى ، فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى ، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى ، وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى ، فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى
অতএব, যে দান করে, আল্লাহকে ভয় করে চলে এবং উত্তম বাণীকে সত্য বলে মেনে নেয়, আমি তাকে সুখের বিষয় (অর্থাৎ জান্নাত) লাভের জন্য পথ সহজ করে দেবো। পক্ষান্তরে যে কার্পণ্য করে, বে-পরওয়া হয়ে চলে এবং উত্তম বাণীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আমি তাকে কষ্টের বিষয় (জাহান্নাম) লাভের জন্য পথ সহজ করে দেবো। ⁵⁷
এ আয়াতগুলো থেকে জানা যায়, যারা যে পথে তাদের প্রচেষ্টা ও শ্রম নিয়োজিত করবে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য সে পথ সহজ করে দেবেন। কাজেই যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে ভয় করে চলে এবং তাঁর পথে সম্পদ ব্যয় করে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য জান্নাতের কাজকর্ম সহজ করে দেবেন এবং এগুলো ক্রমে তাদের মজ্জায় পরিণত হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا﴿ - “হে মুমিনগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদেরকে ভালো-মন্দের পার্থক্যের শক্তি দান করবেন।" অর্থাৎ তাদের বিবেক প্রখর হয়, সুষ্ঠু বিচার-বিবেচনার শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে সে ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যে ভুল করে না। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, তাঁকে ভয় করে চলে না এবং তাঁর পথে সম্পদও ব্যয় করে না, তাদের বুদ্ধি-বিবেক ও বিচার-বিবেচনা শক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং এ কারণে তারা ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করতে পারে না। ফলে জাহান্নামের কাজকর্ম তাদের জন্য সহজ হয়ে যায় এবং এগুলোই ক্রমে তাদের মজ্জায় পরিণত হয়।
উল্লেখ্য যে, মানুষের শরীরের যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কালবের অধীন। তাই ইসলাম চায়, কালবের মরীচা দূর করে তাকে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে। এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ.
নিশ্চয় শরীরের মধ্যে গোশতের এমন একটি টুকরো রয়েছে, যা সংশোধিত হলে অন্যান্য সমস্ত অঙ্গই সংশোধিত হয়। আর তা নষ্ট হলে অন্যান্য সমস্ত অঙ্গই নষ্ট হয়। সাবধান! সেই টুকরোটি হলো কালব (অন্তর)। ⁵⁸
অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ.
হওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দাহর ঈমান ঠিক হবে না এবং যবান ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্তর ঠিক হবে না।”⁵⁹
কাজেই কালবকে সদা স্বচ্ছ, পবিত্র ও আলোকিত রাখা ইসলামের কাম্য এবং প্রত্যেক মুসলিমের ওপর তার ঈমানের একান্ত দাবি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন, আল্লাহ তা'আলা বান্দাহর দেহাবয়ব ও 'আকৃতির দিকে দৃষ্টি দেন না; তার কালবের দিকে দৃষ্টি দেন। তিনি বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ.
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আকৃতি ও তোমাদের ধন-সম্পদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তোমাদের অন্তর ও তোমাদের 'আমালের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। ⁶⁰
উপর্যুক্ত হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, মানব জীবনের পরিশুদ্ধি একান্তই কালবের পরিশুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। আর কালবের পরিশুদ্ধি 'আমালের পরিশুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল এবং 'আমালের পরিশুদ্ধি সর্বতোভাবে নাফসের পরিশুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। অতএব, মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজন হলো, নাফসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে একদিকে আল্লাহর নিষিদ্ধ ঘোষিত কর্ম থেকে বিরত থেকে কালবকে পরিচ্ছন্ন রাখা, অপরদিকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে তাঁর নির্দেশিত বিষয়সমূহ পালন করে কালবের ঔজ্জ্বল্য ও সুস্থতা বৃদ্ধি করা। শাইখ 'আবদুল কাদির 'ঈসা (রাহ.) বলেন, فتنقية القلب وتهذيب النفس من أهم الفرائض العينية وأوجب الأوامر الإلهية. নাফসকে সংশোধন করা প্রত্যেকের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফারয ও আল্লাহর প্রদত্ত নির্দেশ।”⁶¹ বলাই বাহুল্য, এ ধরনের সুস্থ কালব সম্পন্ন লোকেরাই আখিরাতে নাজাতপ্রাপ্ত ও সাফল্যমণ্ডিত হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ . إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبِ سَلِيمٍ﴾ (যে দিন (অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন) কোনো অর্থ-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি কারো কোনো উপকারে আসবে না। একমাত্র সে ব্যক্তিই নাজাত পাবে, যে ব্যক্তি সুস্থ ও নীরোগ অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট পৌঁছবে। "৬২ এ আয়াতে সুস্থ অন্তঃকরণ দ্বারা কুফর, শিরক, নিফাক ও বিভিন্ন আত্মিক কদর্যতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র অন্তঃকরণকেই বোঝানো হয়েছে। ⁶³ আর এরূপ অন্তঃকরণ কেবল সৎ ও একনিষ্ঠ মু'মিনেরই হতে পারে। কাফির, মুনাফিক ও পাপিষ্ঠদের অন্তঃকরণ মৃত, রুগ্ন ও অসুস্থ হয়ে থাকে। ⁶⁴
উল্লেখ্য যে, দুনিয়ার বিভিন্ন ধান্ধায় মত্ত থাকা এবং অধিক মাত্রায় অর্থহীন কথাবার্তা ও বাজে কার্যকলাপে লিপ্ত হবার কারণে অনেক সময় মু'মিনের কালবও অত্যন্ত কঠিন ও গাফিল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় পৌঁছে কালব আল্লাহর ভয়ে কেঁপে ওঠে না, ওয়ায-নাসীহাতে নরম ও বিগলিত হয় না এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় চোখে অশ্রু আসে না। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنْ كَثرَةَ الْكَلَامِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ قَسْوَةُ الْقَلْبِ، وَإِنْ أَبَعْدَ النَّاسِ مِنَ اللَّهِ الْقَلْبُ الْقَاسِي.
আল্লাহর যিকর ছাড়া অধিক কথা বলো না। কেননা আল্লাহর যিকর ব্যতীত অধিক কথা বলার কারণে অন্তর কঠিন হয়ে যায়। (সাবধান!) আল্লাহর নিকট থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী লোক হলো কঠিন হৃদয়ের ব্যক্তি। ৬০
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, অন্তরের কঠিনত্ব এমন এক মারাত্মক অবস্থা, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য ও সামীপ্য অর্জন থেকে বঞ্চিত করে। বিশিষ্ট 'আবিদ ফুদাইল ইবনু 'ইয়াদ [১০৫-১৮৭ হি.] (রাহ.) বলেন,
خَمْسٌ مِّنْ عَلَامَاتِ الشَّقَاءِ الْقَسْوَةُ فِي الْقَلْبِ، وَجُمُودُ الْعَيْنِ، وَقِلَّةُ الْحَيَاءِ، وَالرَّغْبَةُ فِي الدُّنْيَا، وَطُولُ الْأَمَلِ.
পাঁচটি বিষয় দুর্ভাগ্যের নিদর্শন। এগুলো হলো- অন্তরের কঠিনতা, চোখের জড়তা, লজ্জাস্বল্পতা, পার্থিব মোহ ও দীর্ঘ আশা-আকাঙ্খা। ⁶⁶
পবিত্র হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে কালবের এ অবস্থা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে শিক্ষা দিয়েছেন এবং তা থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন 'আমাল করার নির্দেশনাও প্রদান করেছেন। যেমন- গভীর চিন্তা-ভাবনাসহ কোরআন তিলাওয়াত করা, রাতে জেগে 'ইবাদাত করা ও কান্নাকাটি করা, বেশি বেশি মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ করা, হালকা ভোজন করা, অনর্থক কথাবার্তা ও কাজকর্ম পরিত্যাগ করা, সৎ লোকদের সাথে মেলামেশা করা ও গরীব-অসহায় লোকদের সেবা করা প্রভৃতি। এ সকল বিষয়ে আমরা যথাস্থানে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ। জনৈক কবি বলেন,
دَوَاء قَلْبِكَ خَمْسٌ عِنْدَ قَسْوَتِهِ ... فَدُمْ عَلَيْهَا تَفُزْ بِالْخَيْرِ وَالظُّفَرِ كَذَا تَضَرُّعُ بَاكٍ سَاعَةَ السَّحَرِ ... خَلَاءُ بَطْنٍ وَقُرْآنٌ تَدَبَّرُهُ وَأَن تُجَالِسَ أَهْلَ الْخَيْرِ وَالْخَبَرِ. ... كَذَا قِيَامُكَ جُنْحَ اللَّيلِ أَوْسَطَهُ
তোমার কালবের কঠিনত্বের পাঁচটি প্রতিষেধক রয়েছে। এ প্রতিষেধকগুলো নিরন্তর ব্যবহার করো, তবেই তুমি কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করবে। এগুলো হলো- পেট খালি রাখা (অর্থাৎ উদরপূর্তি করে পানাহার না করা), চিন্তা-ভাবনাসহ কোরআন তিলাওয়াত করা, রাতের শেষভাগে কাতরতার সাথে ক্রন্দন করা, রাত জেগে 'ইবাদাত করা এবং ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি ও 'আলিমগণের সাথে ওঠাবসা করা। ⁶⁸
টিকাঃ
৪১. বাগাভী, মা'আলিমুত তানযীল, খ. ৮, পৃ. ৪৩৯; ছা'লাবী, আল-কাশফু ওয়াল বায়ান, খ. ১০, পৃ. ২১৪
৪২. আল কোরআন, সূরা আন-নাযি'আত, ৭৯: ৪০-৪১
৪৩. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১০
৪৪. কোরআনের ভাষায় এরূপ কালবকে قلب سليم (সুস্থ ও নীরোগ কালব) বলা হয়। দ্র. আল কোরআন, সূরা আশ-শু'আরা', ২৬: ৮৯; সূরা আস-সাফফাত, ৩৭ : ৮৪
৪৫. কোরআনে নারীলিদু ব্যক্তির অন্তরকে রোগাক্রান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ"...ফলে সে ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে।" (আল কোরআন, সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৩২)
৪৬. আল কোরআন, সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩: ১৪
আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক (১১৮-১৮১হি.) (রাহ.) বলেন, رأيت الذنوب مميت القلوب ** ويُتبعها الذل إدمائها ... وترك الذنوب حياة القلوب ** وخير لنفسك عصيانها.
"আমি দেখছি যে, গুনাহগুলো অন্তরকে মৃত বানিয়ে ফেলছে। বলাই বাহুল্য, গুনাহে নিমগ্নতা লাঞ্ছনা ডেকে আনে। আর গুনাহ-ত্যাগ অন্তরগুলোর জন্য প্রাণসদৃশ। অর্থাৎ এতে অন্তরগুলো প্রাণ ও সজীবতা ফিরে পায়। কাজেই তোমার নাফসের জন্য উত্তম ব্যবস্থা হলো- তুমি তার অবাধ্যতা করবে।” (ইবনুল মুবারাক, দিওয়ান, পৃ.২৬).
৪৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব : তাফসীরুল কোরআন), হা. নং : ৩৩৩৪; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৪৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৭৯৫২ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রাহ)-এর মতে, হাদীসটি হাসান। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৭, পৃ. ৩৩৪)
৪৮. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩০৯৫৭ ইমাম বাইহাকী (রাহ.) তাঁর 'শু'আবুল ঈমান' (হা. নং: ৩৭) এর মধ্যেও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তবে সেখানে মর্ম-এর পরিবর্তে ঊর্ম রয়েছে।
৪৯. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৭
৫০. আল কোরআন, সূরা আন-নিসা', ৪: ১৫৫; সূরা আন-নাহল, ১৬: ১০৮; সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১৬
৫১. এরূপ কালবকে কোরআনের ভাষায় ميت )মৃত অন্তর) বলা হয়। দ্র. কোরআন, সূরা আল-আন'আম, ৬: ১২২ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন, هَلَكَ مَنْ لَمْ يَعْرِفَ قَيْهَ المَعْرُوفَ، وَيُنْكِرْ لَهُ الشكر "ধ্বংস হয়ে গেছে সে ব্যক্তি, যার অন্তর ন্যায় চিনে না এবং অন্যায় প্রত্যাখ্যান করে না।" অর্থাৎ যে ব্যক্তির অন্তর ন্যায়বোধ হারিয়ে ফেলেছে এবং অন্যায়ই তার অন্তরের প্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে, সে প্রকৃতই ধ্বংস হয়ে গেছে। (তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৮৬৬৪) এরূপ ব্যক্তি যদিও জীবিত; কিন্তু তার অন্তর প্রকৃতই মৃত। 'আসিম আল-আহওয়াল (মৃ. ১৪২ হি.) (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রা.) প্রায়ই নিম্নের এ চরণটি আবৃত্তি করতেন, لَيْسَ مَنْ مَاتَ فَاسْتَرَاحَ بِمَيِّتٍ ... إنما اليت ميت الأحياء. "যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে স্বস্তি লাভ করলো সে প্রকৃত অর্থে মৃত নয়; প্রকৃত মৃত ব্যক্তি হলো জীবিতদের মধ্যে মৃত ব্যক্তিই। অর্থাৎ যার অন্তর মৃত।" এরপর তিনি বলতেন, صَدَى وَاللَّهِ ، إِنَّهُ لَيَكُونَ حَبًّا وَهُوَ مَيِّتُ الْقَلْبِ-"আল্লাহর কসম! কবি সত্য কথাই বলেছেন। সে যদিও জীবিতই হয়; কিন্তু বাস্তবে তার অন্তর মৃত।” (ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, কালামুল হাসান আল-বাসরী রাহ.), হা. নং: ৩৬৩৬৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান [৪৭: মু'আলাজাতু কুল্লি যানবিন), হা. নং: ৬৯১৬)
৫২. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৭৪
৫৩. বিশিষ্ট সূফী শাইখ 'আলী আল-হাজবিরী [৪০০-৪৬৫ হি.] (রাহ.) মু'মিনের অন্তরের এরূপ আস্তরণকে 'গাইনী হিজাব' নামে অভিহিত করেছেন। এর বিপরীত হলো 'রাইনী' হিজাব। 'গাইনী হিজাব' এক প্রকার সাময়িক হিজাব বা আস্তরণ। সামান্য চেষ্টা করলে এবং আল্লাহর দিকে অগ্রসর হলে এ আস্তরণ দূরীভূত হয়ে যায়। এ জাতীয় আস্তরণ কম-বেশি সকলের মধ্যেই হয়ে থাকে। এটা দূর করার পদ্ধতি হলো, সরল অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। (গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ১৫)
৫৪. আল কোরআন, সূরা আস-সাফ্ফ, ৬১: ৫
৫৫. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ২৫৮
৫৬. আল কোরআন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ১৩
৫৭. আল কোরআন, সূরা আল-লাইল, ৯২: ৫-১০
৫৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৫২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-মুসাকাত), হা. নং: ৪১৭৮
৫৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩০৪৮; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৮৮৭ হাদীসটি সূত্রগত দিক থেকে হাসান পর্যায়ের। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ.. ২, পৃ. ৩৪৩, হা. নং: ২৫৫৪
৬০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭০৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৭৮২৭; ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ৩৯৪; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১৪৩ সর্বসাধারণকে হাদীসটি এভাবে বর্ণনা করতে দেখা যায়- « إن الله لا ينظر إلى صوركم ولا إلى أعمالكم ، ولكن ينظر إلى قلوبكم » "আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আকৃতির দিকেও দৃষ্টি দেবেন না এবং তোমাদের 'আমালের দিকেও দৃষ্টি দেবেন না; বরং তোমাদের অন্তরের দিকে দৃষ্টি দেবেন।" উল্লেখ্য যে, এরূপ রিওয়ায়াতটি বিশুদ্ধ নয়। তদুপরি তা উপরে বর্ণিত সাহীহ হাদীসের পরিপন্থীও। ইমাম বাইহাকী (রাহ.) বলেন, فهذا لم يبلغنا من وجه يثبت مثله ، وهو خلاف ما في الحديث الصحيح- "এ রূপ রিওয়ায়াত আমাদের নিকট কোনো সুদৃঢ় সূত্রে পৌছেনি। তা ছাড়া এর বক্তব্যও সাহীহ হাদীসের পরিপন্থী।" (বাইহাকী, আল-আসমা' ওয়াস-সিফাত, হা. নং: ৯৫০, খ. ৩, পৃ. ৩৬)
৬১. 'আবদুল জব্বার, এলমে তাছাউফের হাকীকত, পৃ.২৪
৬২. আল কোরআন, ২৬ (সূরা আশ-শু'আরা'): ৮৯
৬৩. কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, খ.১৩, পৃ.১১৩-৪; ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ.৬, পৃ.১৪৯
৬৪. বিশিষ্ট তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রাহ.) বলেন, القلب السليم: هو القلب الصحيح، وهو قلب المومن؛ لأن قلب الكافر والمنافق مريض। "'কালবে সালীম' দ্বারা উদ্দেশ্য সুস্থ অন্তঃকরণ। এটা মু'মিনেরই অন্তর। কেননা কাফির ও মুনাফিকের অন্তর রুগ্ন হয়ে থাকে।" (কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, খ. ১৩, পৃ. ১১৩-৪; ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৬, পৃ. ১৪৯)
৬৫. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪১১ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহ ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৪১১, হা. নং: ২৪১১) উল্লেখ্য যে, হাদীসটির অনুরূপ বক্তব্য সাইয়িদুনা 'ঈসা 'আলাইহিস সালাম থেকেও বর্ণিত রয়েছে। (মালিক, আল-মুওয়াত্তা, হা. নং: ৩৬১৫)
৬৬. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৪: আল-হায়া'), হা. নং: ৭৩৫৪ বিশিষ্ট যাহিদ ও ফাকীহ মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি' [মৃ. ১২৩ হি.] (রাহ.) থেকেও প্রায় অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত রয়েছে। (বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, [৭১: আয-যুহদ), হা. নং: ১০২৯৭)
৬৭. যেমন সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول في دعائه : اللهم إني أعوذ بك من العجز والكسل و الجبن و البخل و الهرم و القسوة و الغفلة ....
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বলে আল্লাহর নিকট দু'আ করতেন যে, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অক্ষমতা, অলসতা, ভীরুতা, কার্পণ্য, বার্ধক্য, কঠিনতা ও গাফলতি থেকে পানাহ চাই।” (হাকিম, আল-মুস্তাতরাক, কিতাব: আদ-দু'আ, হা. নং: ১৯৪৪; তাবারানী, আল-মু'জামুস সাগীর, হা. নং: ৩১৬ ও আদ-দু'আ, হা. নং: ১৩৪৩) বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল-হাকিম (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ।
৬৮. 'আবদুল হাদী, ইসলাহুল কুলুব, পৃ. ৬৫
📄 তাযকিয়াতুন নাফস-এর বিশুদ্ধ পথ
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, নাফস পরিশুদ্ধ করা এবং তার অশিষ্ট চরিত্র ও প্রবণতাসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই করা ফারয। অতএব, এ গুরু কাজের যথার্থ ও বিশুদ্ধ পথ কী?- তাও জানা থাকা সকলের জন্য অত্যাবশ্যক। কারণ, এ কাজের সঠিক পথ জানা না থাকলে পদে পদে বিপথগামী ও সত্যচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কার্যতও আমরা এ বিষয়ে অনেকের মধ্যে বহু বিভ্রান্তি লক্ষ্য করি। আমরা তাদেরকে ভুল পথে চলতে ও পরিচালিত হতে দেখতে পাই। তারা নাফসের পরিশুদ্ধি ও উন্নয়নের নামে এমন সকল 'আমাল করেন, একদিকে তা কোরআন ও হাদীসের ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও পরিচ্ছন্ন জীবন ব্যবস্থার পরিপন্থী, অপরদিকে তা তাদের নাফসের পরিশুদ্ধির জন্য যথার্থ ও কার্যকর ব্যবস্থাও নয়। ফলে দেখা যায় যে, এ সব 'আমালের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে তাদের নাফস পরিশুদ্ধ তো হয় না; বরং উল্টো তাদের নাফস আরো কলুষিত ও বলবান হয়, সুন্দর ও সুকুমার বৃত্তিসমূহ বিকশিত হবার পরিবর্তে মন্দ ও অশিষ্ট বৃত্তিসমূহেই বিকাশ লাভ করে।
অনেক 'আলিম ও শাইখই নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ অন্তরের লোক মনে করেন এবং দাবি করেন যে, তাঁরা লোকদের নাফসের তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো- বাহ্য দৃষ্টিতে তাঁদের আচার-আচরণ থেকে প্রতিভাত হয় যে, তাঁদের মধ্যে অনেকের নিজেদের নাফসই কলুষিত ও রোগগ্রস্ত। তাঁরা হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহঙ্কার, পার্থিব মোহ, লোভ-লালসা, আত্মম্ভরিতা ও আত্মশ্লাঘা ইত্যাদি আত্মিক ব্যাধিসমূহে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। অতএব, যে সকল ব্যক্তি দীর্ঘ সাধনার পরেও তাঁদের নিজেদের নাফসকে পরিশুদ্ধ করতে সক্ষম হননি, তা হলে তাঁরা কীভাবে তাঁদের শিষ্যদের নাফসের সংশোধন করবেন, তাদের অন্তরের ব্যাধিসমূহের জন্যই বা কী ব্যবস্থাপত্র দেবেন? বিশিষ্ট 'আবিদ ফুদাইল ইবনু 'ইয়াদ [১০৫-১৮৭হি.] (রাহ.) বলেন,
الْعَالِمُ طَبِيبُ الدِّينِ وَدَوَاءُ الدُّنْيَا فَإِذَا كَانَ الطَّبِيبُ يَحُرُّ الدَّاءَ إِلَى نَفْسِهِ فَمَتَى يُبْرِئُ غَيْرَهُ؟
'আলিম হলো দীনের চিকিৎসক ও দুনিয়ার প্রতিষেধক। অতএব, চিকিৎসক যদি নিজেই রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তা হলে সে অন্য লোককে কীভাবে সুস্থ করে তোলবে?⁶⁹
জনৈক কবি কতোই চমৎকার বলেছেন, وَغَيْرُ تَقِي يَأْمُرُ النَّاسَ بِالتَّقَى ... طَبِيبٌ يُدَاوِي النَّاسَ وَهُوَ سَقِيمُ.
মুত্তাকী নয়- এমন ব্যক্তি লোকদেরকে তাকওয়া অবলম্বন করতে নির্দেশ দেয়। এরূপ ব্যক্তির উদাহরণ হলো ঐ চিকিৎসক, যে নিজে রোগাক্রান্ত; কিন্তু লোকদের চিকিৎসা করে চলেছে। ⁷⁰
আমরা মনে করি না যে, আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে উপর্যুক্ত 'আলিম ও শাইখদের মধ্যে সকলেরই আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। বরং তাঁদের এ বিচ্যুতির প্রধান কারণ হলো- তাঁদের অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না যে, 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে কী বোঝায়, নাফস ও কালবের ব্যাধি ও ত্রুটিগুলো কী কী এবং এগুলো দূরীভূত করার শারী'আতসম্মত কী কী পথ রয়েছে? ফলে তাঁরা এতদুদ্দেশ্যে গতানুগতিক ত্রুটিযুক্ত পদ্ধতি কিংবা আবেগাশ্রিত ও প্রবৃত্তিতাড়িত মনগড়া পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যা আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো যথার্থ সুফল বয়ে আনে না। এ কারণে কেউ কেউ তাদেরকে সে চিকিৎসকের সাথেও তুলনা করেছেন, যে ধ্বংসাত্মক বিষ প্রয়োগ করে রোগের চিকিৎসা করে। এতে রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে মারাই যায়। ⁷¹
নিম্নে আমরা কোরআন ও হাদীসের আলোকে নাফসকে পরিশুদ্ধ করার ও তার সাথে জিহাদ করার যথার্থ ও বিশুদ্ধ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করতে প্রয়াস পাবো।
টিকাঃ
৬৯. খাদিমী, বারীকাতুন মাহমুদিয়্যাতুন..., খ. ৩, পৃ. ৪৪৪ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহ.) থেকেও অনুরূপ কথা বর্ণিত রয়েছে। (আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, খ. ৬, পৃ. ৩৬১; যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', খ. ৭, পৃ. ২৪৩)
৭০. ইবনু রাজাব, লাতা'য়িফুল মা'আরিফ, পৃ. ১৭, ৮১; ইবনুল হাজ্জ, আল-মাদখাল, খ. ৩, পৃ. ২৭৪; খাদিমী, বারীকাতুন মাহমুদিয়্যাতুন.... খ. ৩, পৃ. ৪৪৪
৭১. 'আবদুল হাদী, ইসলাহুল কুলুব, পৃ. ১৬