📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 তাযকিয়াতুন নাফস-এর মর্ম

📄 তাযকিয়াতুন নাফস-এর মর্ম


'তাযকিয়াহ' একটি আরবী শব্দ। এর অর্থ পরিশুদ্ধ করা, পূত-পবিত্র করা, বৃদ্ধিসাধন করা। অতএব, 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে নাফসের পরিশুদ্ধি, পবিত্রকরণ, পরিগঠন ও উন্নতিসাধনকে বোঝানো হয়। পরিভাষায় 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে নাফসকে তার পশুত্বসুলভ বক্রচিন্তা, কুবৃত্তি ও অসৎপ্রবণতাসমূহ থেকে মুক্ত ও পবিত্রকরণ এবং মানবিক মূল্যবোধ, সৎচিন্তা, সুকুমার বৃত্তি ও সুন্দর চরিত্রসমূহ দ্বারা তার উন্নতিসাধনকে বোঝানো হয়।¹⁸ তাযকিয়াহর বিপরীত শব্দ হলো- 'তাদসিয়াহ'। এর অর্থ হলো- নাফসকে পাপের মধ্যে নিমজ্জিত করে রাখা।¹⁹ আল্লাহ তা'আলা বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا . وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا - “যে নিজের নাফসকে পরিশুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। আর যে নিজের নাফসকে পাপের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।”²⁰ 'আবদুল্লাহ ইবনু মু'আবিয়া আল-গাদিরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমাতে আরয করেন, مَا تَرْكِيَّةُ الْمَرْءِ نَفْسَهُ؟ "ব্যক্তি কর্তৃক তার নাফসের তাযকিয়াহ বলতে কী বোঝায়?" তিনি উত্তর দেন .أَن يَعْلَمَ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلْ مَعَهُ حَيْثُ كَانَ “ব্যক্তির নাফসের তাযকিয়া হলো, সে এই মর্মে বিশ্বাস পোষণ করবে যে, সে যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তা'আলা তার সাথেই রয়েছেন।"²¹ অর্থাৎ প্রতিটি কাজের সময় সে এ বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তা'আলা তার কাজ সম্পর্কে সম্যক অবহিত, তার কোনো কিছুই আল্লাহর নিকট গোপনীয় ও অস্পষ্ট নয়। কাজেই সে প্রতিটি কাজ করার সময় তাঁকে স্মরণ করবে এবং তাঁকে ভয় করে ও একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিটি কাজ সম্পাদন করবে।
বিশিষ্ট মুফাসসির শিহাবুদ্দীন আল-আলুসী [১২১৭-১২৭০হি.] (রাহ.) 'তাযকিয়াতুন নাফস'-এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, "الاستقامة على التوحيد وإخلاص العمل الله تعالى والتبري عن الشرك." অর্থাৎ "তা হলো তাওহীদের ওপর অটল থাকা, নিষ্ঠার সাথে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে 'আমাল করা এবং শিরক থেকে বেঁচে থাকা।”²²
মোট কথা, 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে 'আকীদা-বিশ্বাস, 'আমাল-আখলাক, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, লেনদেন ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছুরই পরিশুদ্ধিকরণকে বোঝায়।
উল্লেখ্য যে, ইসলাম একটি স্বভাবগত ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা হিসেবে মানুষের জৈবিক চাহিদাসমূহকে অস্বীকার করে না এবং এগুলো পূরণের জন্য চেষ্টা ত্যাগ করতেও বলে না। বরং ইসলামের নির্দেশ হলো- মানুষ তার স্বভাবগত জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণ করবে এবং এ জন্য চেষ্টাও চালাবে।²³
তবে তাকে এ ক্ষেত্রে নাফসের ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাকে তার চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায় ও হালাল-হারাম বাছ-বিচার করতে হবে, অন্যের অধিকার, প্রয়োজন ও স্বার্থের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় লক্ষ্য রাখতে হবে। এরূপ কর্ম অনুশীলনের ফলে ক্রমে নাফসের পশুত্বসুলভ ভাব ও চরিত্র (যেমন- লোভ-লালসা, আত্মপ্রীতি, হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহঙ্কার, অবাধ যৌনাচার, ধন-সম্পদ ও নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল মোহ প্রভৃতি) দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে, পক্ষান্তরে তার বিবেক-বোধ ও সুকুমার বৃত্তি (যেমন- সততা, নিষ্ঠা, ধৈর্য, ক্ষমা, মহানুভবতা, বিনয় ও নম্রতা প্রভৃতি) জাগ্রত ও সবল হয়। ফলে ক্রমে তার মনুষ্যসুলভ ভাব ও নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও বিকশিত হয়। এভাবে মন্দকর্মপ্রবণ নাফস (নাফস আম্মারাহ) পর্যায়ক্রমে লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ও গর্ব-অহঙ্কার প্রভৃতি অশিষ্ট প্রবণতা থেকে পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র হয় এবং তা ক্রমে সুকর্মপ্রবণ প্রশান্ত নাফসে (নাফসে মুতমায়িন্নাহ) রূপান্তরিত হয়। বিশিষ্ট সূফী শাইখ নাসির উদ্দীন চেরাগী দেহলভী (রাহ.) বলেন,
মানুষের নাফস একটি বৃক্ষের মতো। শাইতানী কুমন্ত্রণার সাহায্যে এর অঙ্কুর গজিয়ে ওঠে। অতঃপর এটা বৃহৎ আকারের বৃক্ষরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যদি মানুষ স্বীয় বিবেক-বুদ্ধি, 'ইবাদাত, তাকওয়া, ভালোবাসা ও আল্লাহ প্রেমের মাধ্যমে এই গাছ আন্দোলিত করে, তবে নিঃসন্দেহে এ নাফস আম্মারা নিস্তেজ হয়ে পড়বে, যার ফলে তার মূলোৎপাটন সম্ভবপর হবে। ২৪

টিকাঃ
১৮. ইবনু 'আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, খ. ১, পৃ. ৫৩৪; সালিহ আল-ফাওযান, ইয়া'নাতুল মুস্তাফীদ, খ. ৩, পৃ. ৪২৯
১৯. বিশিষ্ট মুফাসসির যামাখশারী (রাহ.)-এর মতে, 'তাদসিয়াহ' হলো-- النقص والإخفاء بالفحوز ""নাফসকে ত্রুটিযুক্ত করা ও পাপের মধ্যে লিপ্ত করে রাখা।" (যামাখশারী, আল-কাশশাফ, খ. ৪, পৃ. ৭৬৩)
২০. আল কোরআন, সূরা আশ্ শাম্স, ৯১: ৯-১০
২১. তাবারানী, আল-মু'জামুস সাগীর, (বাব: 'আইন/আলী) হা. নং: ৫৫৫; শইবানী, আল-আহাদ ওয়াল মামানী, হা. নং: ১০৬২; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আয-যাকাত), হা. নং: ৭৫২৫ বিশিষ্ট হাদীসবিশারদ আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটির সানাদ সাহীহ। (আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ, খ. ৩, পৃ. ১২০, হা. নং: ১০৪৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা "كان الله معه حيث كان" প্রসঙ্গে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া আয-যুহালী (মৃ.২৫৮ হি.] (রাহ.) বলেন, এ কথার উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহ তা'আলার 'ইলম সর্বত্র ব্যাপ্ত, কোনো কিছুই তাঁর 'ইলমের বহির্ভূত নয়। বলাই বাহুল্য, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের ওপরই রয়েছেন।" (তুওয়াইজারী, ইসবাতু 'উলুয়িল্লাহ.., পৃ. ৪৮; হাফিয আয-যাহাবী (রাহ.)-এর "العلو" কিতাব থেকে সংগৃহীত।) এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন, ড. আহমদ আলী রচিত বিদ'আত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬২-৭৯
২২. আলুসী, রূহুল মা'আনী, খ. ১৮, পৃ. ১৫৭
২৩. সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার কয়েকজন সাহাবী মিলিত হয়ে তাঁদের নিজ নিজ ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের একজন বললেন, তিনি রাতে ঘুমোবেন না। সারা রাত জেগে থেকে 'ইবাদাত করবেন। আর একজন সাহাবী বললেন, তিনি দিনে খাবেনই না। প্রত্যহ রোযা রাখবেন। অন্য একজন বললেন, তিনি গোশত খাবেন না। আর এক সাহাবী বললেন, তিনি বিয়ে-শাদীতো করবেনই না; কোনো নারীর কাছেও গমন করবেন না। তাঁদের এ সব ইচ্ছার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পেরে বললেন, أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَحْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي .
"খবরদার! এ রূপ চিন্তা করো না। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সকলের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং তাঁকে মেনে চলি। কিন্তু আমি তো রোযাও রাখি, রোযা রাখা ছেড়েও দেই, (রাতে) নামাযও পড়ি, ঘুমাইও, মেয়েদের বিয়েও করি। অতএব, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত মেনে চলবে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাব: আন-নিকাহ, হা. নংঃ ৪৬৭৫; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আন-নিকাহ), হা. নং: ২৪৮৭) এ হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়, যে ব্যক্তি শারী'আত সম্মত 'ওযর ছাড়া অতি ধার্মিকতার নামে কোনো জৈবিক বৈধ চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকবে, সে মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতকেই পরিত্যাগ করে। ইমাম শাতিবী [মৃ.৭৯০ হি.] (রাহ.) বলেন,
كُلُّ مَنْ مَنَعَ نَفْسَهُ مِنْ تَنَاوُلِ مَا أَحَلَّ اللهُ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ شَرْعِيٌّ فَهُوَ خَارِجٌ عَنْ سُنَّةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم ، وَالْعَامِلُ بِغَيْرِ السَّنَّةِ تَدَيُّنًا هُوَ الْمُبْتَدِعُ بِعَيْنِهِ . "আল্লাহ তা'আলা যে সব বিষয় হালাল করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো শারী'আত সম্মত 'ওযর ছাড়া সে সব বিষয় থেকে নিজেকে বারণ করে রাখবে, সে মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতই পরিত্যাগ করেছে। আর যে ব্যক্তি সুন্নাত নয়- এমন কোনো বিষয়কে ধার্মিকতা মনে করেই মেনে চলবে, সে মূলত বিদ'আতীই।" (শাতিবী, আল-ই'তিসাম, খ. ১, পৃ. ৪৪)
২৪. ঈযাজ আহমাদ আজমী, তাসাউফ পরিচিতি, (মাওলানা মুহাম্ম আবদুল জব্বার রাহ. কর্তৃক অনূদিত ও সংকলিত 'আল-ইহসান' গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত, পৃ. ৩২)

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ

📄 নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ


নাফস পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টা এবং এ উদ্দেশ্যে তার ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠাকে 'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ' নামে আখ্যায়িত করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো- নাফসের মন্দপ্রবণতা ও অবাঞ্ছিত কামনা-বাসনার বিরোধিতা করা এবং সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের অনুসরণ করতে নাফসকে বাধ্য করা। কোনো কোনো হাদীসে এ জিহাদকে সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الْجَهَادِ أَفْضَلُ؟ "ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন্ জিহাদটি সর্বশ্রেষ্ঠ।" তিনি জবাব দিলেন, .أَنْ يُجَاهِدَ الرَّجُلُ نَفْسَهُ وَهَوَاهُ "নিজের নাফস ও লালসার বিরুদ্ধে লড়াই।”²⁵ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু وَأَفْضَلُ الْجِهَادِ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي ذَاتِ اللهِ عَزَّ 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন وَجَلْ -"আর সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো, যে আল্লাহর জন্য নিজের নাফসের বিরুদ্ধে للدَّهُ فِي طَاعَةِ اللّٰهِ লড়াই করে।”²⁶ তিনি আরো বলেন, الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ "(পরিপূর্ণ) মুজাহিদ হলো সে-ই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করার ব্যাপারে নিজের নাফসের সাথে লড়াই করে। "²⁷
'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ'কে সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলার কারণ হলো- প্রথমত, একজন মুসলিমকে সত্যিকারভাবে তার দীন ও ঈমানের ওপর অটল-অবিচল থাকার জন্য নাফসের বিরুদ্ধে নিরন্তর ও প্রাণান্তকর জিহাদ চালিয়ে যেতে হয়। দ্বিতীয়ত, নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ মানুষের স্বভাবগত চাহিদা ও কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে হওয়ায় তা অন্য জিহাদের চাইতে অধিকতর কঠিন ও দুঃসাধ্য। তৃতীয়ত, আল্লাহর দীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে লড়াই করার জন্যেও নাফসের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন জিহাদের প্রয়োজন পড়ে। নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ ব্যতীত কারো পক্ষে দীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়।²⁸ ইমাম ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ [৬৯১-৭৫১ হি.] (রাহ.) বলেন,
ولما كان جهاد أعداء الله في الخارج فرعاً على جهاد العبد نفسه في ذات الله، كما قال النبي صلى الله عليه وسلم: "المجاهد من جاهد نفسه في طاعة الله والمهاجر من هجر ما نهى الله عنه" . كان جهاد النفس مُقَدَّماً على جهاد العدو في الخارج، وأصلاً له، فإنه ما لم يجاهد نفسه أولاً لتفعل ما أمرت به، وتترك ما نهيت عنه، ويحاربها فى الله، لم يُمكنه جهاد عدوه في الخارج.
যেহেতু বান্দাহর নাফসের সাথে লড়াই করার একটি ফল হলো বাইরে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'পরিপূর্ণ মুজাহিদ হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করার ব্যাপারে নিজের নাফসের সাথে লড়াই করে। আর পরিপূর্ণ মুহাজির হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত বিষয়াবলি ছেড়ে দেয়।' কাজেই নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ বাইরে শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের ওপর অগ্রগণ্য এবং এর মূল (প্রেরণাদানকারী শক্তি)। যদি বান্দাহ প্রথমে আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ পালনের জন্য নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ ও লড়াই না করে, তবে তার পক্ষে বাইরে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বের হওয়া সম্ভব হবে না।²⁹
জিহাদের মতো হিজরাত প্রসঙ্গেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ ধরনের কথা বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَی اللَّهُ عَنْهُ- ")(পরিপূর্ণ) মুহাজির হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত বিষয়াবলি ছেড়ে দেয়।”³⁰
এক শ্রেণির লোকদের মতে, 'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ' হলো- কৃষ্ণ সাধনা ও চরম ব্রতাচার অর্থাৎ আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে নাফসের প্রয়োজনীয় ও বৈধ চাহিদাগুলো (যেমন- বিয়েশাদী, পানাহার ও বিশ্রাম প্রভৃতি) কে বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ বা ত্যাগ করে নিভৃতে সারাক্ষণ বিভিন্নরূপ 'ইবাদাতের মধ্যে রত থাকা। এতদুদ্দেশ্যে তাঁরা রুচিসম্মত ও পুষ্টিকর খাদ্য ভক্ষণ করেন না, ঠাণ্ডা সুপেয় পানি পান করেন না এবং মাত্রাতিরিক্ত অল্প ভোজন করে থাকেন। তদুপরি তাঁরা স্বাস্থ্যসম্মত পোশাক বর্জন করেন এবং পশমের মোটা ও খসখসে কাপড় পরিধান করেন। কেউ কেউ আবার সংসার-সমাজ ছেড়ে বনেও চলে যান, প্রয়োজনীয় ঘুম ও বিশ্রাম নেন না। তাঁরা এ রূপ কৃষ্ণ সাধনাকে সর্বশ্রেষ্ঠ 'জিহাদ' মনে করেন। বলাই বাহুল্য, 'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ'-এর এ রীতি ইসলামী তারীকা নয়। এটি 'ইবাদাত ও মুজাহাদার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার নামান্তর, যা অন্যান্য ধর্ম-দর্শন থেকে ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে।"³¹
বস্তুতপক্ষে এরূপ কৃষ্ণ সাধনা ও চরম ব্রতাচার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবা কিরাম ও তাবি'উন (রা.)-এর তারীকা ছিল না। তাঁরা অবশ্যই খাবারের জন্য কিছু না পেলে অভুক্ত থাকতেন। কিন্তু খাবারের জন্য যখন যা পেতেন তা-ই কৃতজ্ঞ চিত্তে খেতেন। যখন যে পোশাক পেতেন তা-ই কৃতজ্ঞতার সাথে ব্যবহার করতেন, ঘর-সংসার করতেন, প্রয়োজনীয় ঘুম ও বিশ্রাম নিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন শ্রেষ্ঠতম যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত)। কিন্তু তিনি গোস্ত খেতেন ও পছন্দ করতেন, মিষ্টান্ন দ্রব্য ও মধু খেতে ভালোবাসতেন এবং ঠাণ্ডা সুপেয় পানি পান করতেন, যখনই পেতেন ভালো ও সুন্দর পোশাক পরতেন, ঘর-সংসার করতেন, প্রয়োজনীয় ঘুম যেতেন, বিশ্রাম নিতেন। ³² উপরন্তু, সুচারুরূপে সৎ কর্মগুলো সম্পাদন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যও প্রত্যেককেই নিজের স্বাস্থ্য ও শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের প্রতি যত্ন নেয়া এবং তার সাথে সদয় আচরণ করা উচিত। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং সৎকর্ম করো। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত।³³
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নাবী-রাসূলগণকে দুটি নির্দেশ দিয়েছেন। একটি হলো- পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ করা, অপরটি হলো সৎকর্ম সম্পাদন করা। এ দুটি আদেশকে এক সাথে বর্ণনা করার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সৎকর্ম সম্পাদনে পবিত্র ও হালাল খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা ও প্রভাব অপরিসীম। 'উম্মুল মু'মিনীন সাইয়িদা 'আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বিশিষ্ট সাহাবী 'উসমান ইবনু মায'উন (রা.) কে সতর্ক করে বললেন,
فَاتَّقِ اللَّهَ يَا عُثْمَانُ فَإِنْ لأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِضَيْفِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَصُمْ وَأَفْطِرْ وَصَلَّ وَلَمْ . 'উসমান! আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, তোমার ওপর তোমার পরিবারের অধিকার রয়েছে, তোমার মেহমানের অধিকার রয়েছে, এমনকি তোমার ওপর তোমার নিজেরও অধিকার রয়েছে। অতএব, রোযাও রাখো এবং রোযা রাখা ছেড়েও দাও। নামাযও পড়ো এবং ঘুমাও।³⁴
অতএব, যেহেতু নিজের ওপর নিজের, পরিবারের ও অন্যান্যের অধিকার রয়েছে, তাই এসব অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে যাতে কোনোরূপ বিঘ্ন না ঘটে, এ কারণে শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর বিষয়গুলো সঠিক ও যথার্থভাবে গ্রহণ করা এবং ক্ষতিকর সব বিষয় পরিহার করে চলা একান্ত প্রয়োজন।³⁵ হাফিয শামসুদ্দীন আয-যাহাবী [৬৭৩-৭৪৮হি.] (রাহ.) বলেন,
الطريقة المثلي هي المحمدية ، وهو الأخذ من الطيبات ، وتناول الشهوات المباحة من غير إسراف ، فلم يشرع لنا الرهبانية ولا الوصال ولا صوم الدهر والجوع.
সর্বোত্তম রীতি হলো- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের রীতি। আর তা হলো- পবিত্র বস্তুগুলো গ্রহণ করা ও কোনোরূপ অপচয় ব্যতীত বৈধ চাহিদাগুলো পূরণ করা। তিনি আমাদের জন্য বৈরাগ্য চর্চা, ইফতার ব্যতীত কয়েক দিন লাগাতার রোযা রাখা, বছর ধরে রোযা রাখা ও ক্ষুধার্ত থাকা অনুমোদন করেননি।³⁶

টিকাঃ
২৫. সুয়ূতী, আল-জামি 'উস সাগীর, হা. নং: ১২৪৭ (ইবনুন নাজ্জার-এর সূত্রে বর্ণিত)। সুয়ূতী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটি দা'ঈফ। কিন্তু আলবানী (রাহ,)-এর গবেষণা মতে, এ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ওয়া দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, খ. ৫, পৃ. ৪২৬, হা. নং: ১৯৭৯)
২৬. মারওয়াযী, তা'যীমু কাদরিস সালাত, হা. নং: ৬৩৯; সুয়ূতী, আল-জামি'উল সাগীর, হা. নং: ১২৯২ বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ আলবানী (রাহ.)-এর মতে, এ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, হা. নং: ২০০৯)
২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: ফাদা'য়িলুল জিহাদ), হা. নং: ১৬২১; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২৪; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান (৭৭), হা. নং: ১০৬১১ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।
২৮. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, খ. ১১, পৃ. ৩৩৮; মুনাভী, ফাইযুল কাদীর, খ. ২, পৃ. ৪০; বাকরী, দালীলুল ফালিহীন, খ. ২, পৃ. ৪৪-৪৫ কারো কারো মতে, নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদের চারটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর হলো- ন্যায়ের প্রতিপালন ও আদেশ দান অর্থাৎ নিজে ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায় মেনে চলবে এবং অপরকে ন্যায় মেনে চলতে আদেশ দেবে। দ্বিতীয় স্তর হলো- অন্যায় থেকে বিরত থাকা ও বাধা দান। অর্থাৎ নিজে ব্যক্তিগত জীবনে অন্যায় থেকে বিরত থাকবে এবং অপরকে অন্যায় থেকে বাধা দেবে। তৃতীয় স্তর হলো- উত্তম ধৈর্য ধারণ করা অর্থাৎ আল্লাহর পথে দাওয়াত দান ও সৎ পথে চলতে গিয়ে যে সকল বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়, সেগুলোর ওপর উত্তমভাবে ধৈর্য ধারণ করা। আর চতুর্থ স্তর হলো- দুরাচারী ও পাপিষ্ঠ লোকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ত্যাগ করা। (মুনাভী, আত-তাইসীরু বি-শারহিল জামি'ইস সাগীর, খ. ১, পৃ. ৯৯৮) কারো মতে, নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদের চারটি স্তরগুলো হলো- ক. নাফসকে দীনের শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করতে বাধ্য করা। খ. নাফসকে দীনের শিক্ষা ও অনুশাসন মেনে চলতে বাধ্য করা। গ. অজ্ঞ ও মুর্খ লোকদের নিকট দীনের শিক্ষা পৌছে দিতে নাফসকে বাধ্য করা। ও ঘ. লোকদেরকে তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানানো এবং তাদের মধ্যে যারা দীনের বিরোধিতা করবে তাদের সাথে লড়াই করা। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, খ. ১১, পৃ. ৩৩৮)
২৯. ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মা'আদ, খ. ৩, পৃ. ৬
৩০. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১০
৩১. বস্তুতপক্ষে এ কৃষ্ণসাধনা ও চরম ব্রতাচার সনাতন হিন্দু ও খ্রিষ্ট ধর্ম থেকেই ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে। সনাতন হিন্দুধর্মে আত্মশুদ্ধি ও মোক্ষ লাভের উদ্দেশ্যে গৃহ ও সংসার ত্যাগ করে বনে গমন করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এ সময় অনশন, অগ্নি সহযোগে ভোগ্য বস্তু গ্রহণ বর্জন, ফলমূলাদি ভক্ষণ ও ভূমি শয্যায় শয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে সাধন-মার্গে পৌছার চেষ্টা করা হয়। (ভবেশ রায়, সনাতন হিন্দুধর্ম কী এবং কেন, পৃ. ৫৪) এ ধর্ম মতে- ধর্মানুরাগ, প্রজ্ঞা ও স্রষ্টার নৈকট্য লাভ শুধু সভ্যসমাজ ছেড়ে নির্জন তেপান্তরে কালাতিপাতের মাধ্যমেই সম্ভব। সাধু-সন্ন্যাসীরা রূঢ় নিবৃত্তি অবলম্বনের মাধ্যমে তাঁদের জীবনকে কৃষ্ণ সাধন ও চরম ব্রতাচারে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলে। খ্রিষ্ট ধর্মেও সম্পদ উপার্জনকে ঘৃণা করা হয় এবং অনশন, ভোগ্য বস্তু বর্জন, জীর্ণ বস্ত্র পরিধান প্রভৃতির প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়। (মথি, ১৯: ১৬-২৪, লুক, ১৪: ৩৩)
৩২. শাইখ আবুল হাসান 'আলী আল-মাকদিসী [ ৫৪৪ - ৬১১ হি.) (রাহ.) বলেন,
لم ينقل عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه امتنع من طعام لأجل طيبه قط ، بل كان يأكل الحلوى والعسل والبطيخ والرطب. "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এরূপ কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তিনি কেবল সুস্বাদু হবার কারণে কোনো খাবার খেতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। বরং তিনি হালুয়া, মধু, খরমুজ ও তাজা খেজুর প্রভৃতি খেতেন।" (কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৭, পৃ. ১৯৯)
৩৩. আল কোরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, ২৩: ৫১
৩৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আত-তাতাও'উ), হা. নং: ১৩৭১ এ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু সুনানি আবী দাউদ, খ. ৫, পৃ. ১১২)
৩৫. সুয়ূতী, আল-আমরু.., পৃ. ২৫
৩৬. যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', খ. ১২, পৃ. ৮৯-৯০ এ বিষয়ে আমি আমার বিদ'আত ৫ম খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইনশা আল্লাহ।

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 তাযকিয়াতুন নাফসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

📄 তাযকিয়াতুন নাফসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা


যদি কেউ কামনা করে যে, সে আল্লাহর একান্ত খাঁটি ও প্রিয় বান্দাহতে পরিণত হবে এবং তার নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হবে, তা হলে তাকে অবশ্যই তার নাফসের মন্দপ্রবণতাগুলো দূরীভূত করতে হবে এবং তার যাবতীয় অশিষ্ট চরিত্রসমূহ সংশোধন করতে হবে। তবেই তার মধ্যে আল্লাহর প্রতি প্রবল আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়ে একটি নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং তার আচার-আচরণ হবে অত্যন্ত পরিশীলিত ও মার্জিত। এতে যেমন তার পার্থিব জীবন সুন্দর ও সুখ-সাচ্ছন্দ্যময় হবে, তেমনি তার পরকালীন জীবনও অত্যন্ত সুখ ও শান্তিময় হবে। নুবুওয়াতের চারটি মহান কর্তব্যের মধ্যে আত্মার পরিশুদ্ধকরণ অন্যতম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَتُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ "তিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন।”³⁷
কাজেই নাফস পরিশুদ্ধ করা এবং এ উদ্দেশ্যে তার ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা দীনের একটি অতি অপরিহার্য কর্তব্য ও সর্বাপেক্ষা বড় 'জিহাদ'। ইসলামের সকল 'আলিমের মতে, নাফস পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা ফারযে 'আইন। কেননা নাফস অপরিশুদ্ধ ও কলুষিত হলে বান্দাহর কোনো 'আমালই নির্দোষ ও পবিত্র হবে না। এরূপ অবস্থায় 'আমাল করার অর্থ হলো ময়লাযুক্ত শরীরে সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করার মতোই। ধরুন, সালাত একটি শ্রেষ্ঠ 'ইবাদাত। কিন্তু কেউ যদি এ সালাত লোকদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে আদায় করে, তবে তার এ 'ইবাদাত কবূল তো হবেই না; বরং তা ছোট শিরকের পর্যায়ভুক্ত হবে এবং এ জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর রাস্তায় শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা একটি শ্রেষ্ঠ 'ইবাদাত। কিন্তু কেউ যদি এ জিহাদ সুখ্যাতি অর্জন কিংবা গানীমাত লাভের উদ্দেশ্য নিয়ে করে, তার এ প্রাণপণ সংগ্রামও কবুল হবে না; বরং তা ছোট শিরকের পর্যায়ভুক্ত হবে এবং এ জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত হবে। সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লালাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا قَالَ قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ. قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ جَرِيءٌ. فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أَمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النار ....
'কিয়ামাতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে (দৃশ্যত আল্লাহর পথে লড়াই করতে করতে) শাহাদাত বরণ করেছিল। তাকে (বিচারের জন্য) হাযির করা হবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর প্রদত্ত নি'মাতসমূহের কথা জানিয়ে দেবেন। লোকটি তা স্বীকার করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এর বিনিময়স্বরূপ তুমি কী 'আমাল করেছিলে? লোকটি জবাব দেবে, আমি আপনার পথে লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেছি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো; বরং তুমি লড়াই করেছিলে বীররূপে সুখ্যাতি লাভ করার উদ্দেশ্যে। আর (দুনিয়ায়) তুমি সেই খিতাব পেয়ে গেছো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে তাকে উপুড় করে টেনে-হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ³⁸
মোট কথা, নাফসের পরিশুদ্ধি ছাড়া কারো পক্ষে সত্যিকার অর্থে দীনের বিধি- বিধান প্রতিপালন করা, দীনের ওপর অটল ও অবিচল থাকা এবং আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ করা সম্ভব নয়। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় নাফসের মন্দ প্রবণতা দূরীকরণ ও তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও প্রায়ই আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁর নাফসের পরিশুদ্ধি কামনা করে দু'আ করতেন। তিনি বলতেন,
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسي تَقْوَاهَا وَزَكَهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا.
হে আল্লাহ! আমার নাফসে সংযম শক্তি দান করুন! তাকে পরিশুদ্ধ করুন! আপনিই হলেন নাফসের সর্বোত্তম পরিশুদ্ধি দানকারী। আপনিই এর মালিক ও অভিভাবক। ³⁹
কাজেই যদি কারো নাফসের মন্দ প্রবণতা দূরীভূত করা না হয় এবং তার নাফসের মধ্যে পশুত্বসুলভ ভাব ও চরিত্র অবশিষ্ট থাকে, তবে তার পক্ষে যথার্থরূপে দীনের বিধি-বিধান প্রতিপালন তো সম্ভবই নয়; বরং এ আশঙ্কাও বিদ্যমান রয়েছে, সে যতটুকু দীনের বিধিবিধান পালন করে, তা পণ্ডশ্রম হবে ও বিফলে যাবে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا . وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا - "যে নিজের নাফসকে পরিশুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। আর যে নিজের নাফসকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।"⁴⁰ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.) বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّىٰ نَفْسَهُ فَأَصْلَحَهَا وَحَمَلَهَا عَلَىٰ طَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا قَالَ : مَنْ أَهْلَكَهَا وَأَضَلَّهَا وَحَمَلَهَا عَلَىٰ مَعْصِيَةِ اللَّهِ.
যে নিজের নাফসকে পরিশুদ্ধ ও সংশোধন করতে পেরেছে এবং তাকে আল্লাহর 'ইবাদাতে নিয়োজিত করতে পেরেছে, সে-ই সফল হয়েছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নাফসকে ধ্বংস করলো, বিপথগামী করলো এবং তাকে আল্লাহর নাফরমানীর কাজে নিয়োজিত করলো, সে ব্যর্থ মনোরথ হলো। ⁴¹
অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ ۚ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ যে ব্যক্তি নিজের প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং নাফসকে কুপ্রবণতা থেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত। ⁴²

টিকাঃ
৩৭. আল-কুর-আন, সূরা আলু-'ইমরান, ৩: ১৬৪; সূরা আল-জুমু'আহ, ৬২: ২ আরো দেখুন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১২৯
৩৮. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল ইমারাহ), হা. নং: ৫০৭২
৩৯. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যিকর...), হা. নং: ৭০৮১
৪০. আল কোরআন, সূরা আশ্ শাম্স, ৯১: ৯-১০ আরো দ্রষ্টব্য, আল কোরআন, সূরা আল-আ'লা, ৮৭: ১৪-১৫

📘 তাযকিয়াতুন নাফস > 📄 কালের ব্যাধি ও তা দূরীকরণের গুরুত্ব

📄 কালের ব্যাধি ও তা দূরীকরণের গুরুত্ব


যেভাবে অসতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণে মানুষের শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সেখানে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়, তেমনিভাবে নাফসের প্ররোচনার অনুকরণের দরুন এবং মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুশীলন না করার কারণে মানুষের অন্তরও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং সেখানে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। কাফির ও মুনাফিকরা যেহেতু পুরোপুরিই নাফসের পূজারী ও স্বার্থান্ধ, তাই তাদের অন্তরসমূহ পুরোপুরি অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত। আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর প্রসঙ্গে বলেন, فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ - "তাদের অন্তঃকরণে রয়েছে ব্যাধি।”⁴³ অর্থাৎ তাদের অন্তর রোগাক্রান্ত ও অসুস্থ। তবে একজন মু'মিনের নিকট ঈমানের একান্ত দাবি হলো, তার অন্তর পুরো সুস্থ ও পরিশুদ্ধ হবে। ⁴⁴ তবে তাদের যে কেউ যতটুকু পরিমাণ নাফসের প্ররোচনার অনুকরণ করবে এবং গুনাহে লিপ্ত হবে, তার অন্তর ততটুকু রোগাক্রান্ত ও অসুস্থ হবে। ⁴⁵
হাদীসে রয়েছে, কোনো মু'মিন যদি নাফসের তাড়নায় কোনো অপকর্মে লিপ্ত হয়, তবে তার কালবের ওপর একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর তার পাপের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে সেখানে একের পর এক দাগও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এ দাগগুলো বাড়তে বাড়তে পুরো অন্তর ছেয়ে যায়। এর ফলে তার অন্তর অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ক্রমে সে সত্য-ন্যায়-সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। পক্ষান্তরে অন্যায়-অসুন্দর ও মিথ্যার প্রতি তার ঝোঁক প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ - "কখনো না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।”⁴⁶ অর্থাৎ তারা গুনাহ করতে করতে তাদের অন্তরে গুনাহের মরিচা পড়ে গেছে। মরিচা যেমন লোহাকে খেয়ে মাটিতে পরিণত করে দেয়, তেমনি তাদের পাপের মরিচা তাদের অন্তরের যোগ্যতা নিঃশেষ করে দেয়। ফলে তারা ভালো-মন্দ পার্থক্য করার উপলব্ধি ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ الْمُؤْمِنَ الْعَبْدَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فِي قَلْبِهِ فَإِنْ تَابَ وَنَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ صُقِلَ قَلْبُهُ وَإِنْ زَادَ زَادَتْ حَتَّى يَعْلُو قَلْبَهُ ذَاكَ الرَّيْنُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ فِي الْقُرْآنِ { كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ } .
মু'মিন/বান্দাহ যখন কোনো পাপ করে, তখন তার কালবের মধ্যে একটি কালো দাগ পড়ে। যদি সে তাওবা করে ফিরে আসে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে তার অন্তর স্বচ্ছ হয়ে যায়। আর যদি সে তাওবা না করে বরং আরো পাপ করে, তবে সে কালো দাগটি বৃদ্ধি পেতে থাকে, এক পর্যায়ে তা তার পুরো অন্তরে ছেয়ে যায়। আর এটাই হলো 'রাইন', যা আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। ৪৯ সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) বলেন,
الْإِيمَانُ يَبْدَأُ نُقْطَةً بَيْضَاءَ فِي الْقَلْبِ ، كُلَّمَا ازْدَادَ الْإِيمَانُ ازْدَادَتْ بَيَاضًا حَتَّى يبيضُ الْقَلْبُ كُلُّهُ ، وَالنَّفَاقُ يَبْدَأُ نُقْطَةٌ سَوْدَاءَ فِي الْقَلْبِ كُلَّمَا ازْدَادَ النِّفَاقُ ازْدَادَتْ سَوَادًا حَتَّى يَسْوَدُ الْقَلْبُ كُلُّهُ ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ شَقَقْتُمْ عَنْ قَلْبِ مُؤْمِنٍ لَوَجَدْتُمُوهُ أَبْيَضَ ، وَلَوْ شَقَقْتُمْ عَنْ قَلْبِ مُنَافِقٍ لَوَجَدْتُمُوهُ أَسْوَدَ الْقَلْبِ .
ঈমান কালবের মধ্যে শুচিশুভ্র দাগ রূপে প্রতিভাত হয়। ঈমান বৃদ্ধির সাথে সাথে তার শুচিতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে, এমনকি এক পর্যায়ে পুরো অন্তর শুচিশুভ্রতে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে নিফাক কালবের মধ্যে কালো দাগরূপে প্রতিভাত হয়। নিফাক বৃদ্ধির সাথে সাথে অন্তরের কৃষ্ণবর্ণও বৃদ্ধি পেতে থাকে, এমনকি এক পর্যায়ে পৌছে পুরো অন্তর কালো দাগে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সে যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন রয়েছে! যদি তোমরা কোনো মু'মিনের কালব বিদীর্ণ করো, তা হলে তোমরা অবশ্যই তাঁর কালবকে শুচিশুভ্র দেখতে পাবে। পক্ষান্তরে যদি তোমরা কোনো মুনাফিকের কালব বিদীর্ণ করো, তা হলে তোমরা অবশ্যই তাঁর কালবকে কালো দেখতে পাবে। ৪৮
উল্লেখ্য যে, কালবে পাপের মরিচা জমতে জমতে একপর্যায়ে তা গাঢ় কালো আস্তরণে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে এ অবস্থাকে 'খাতম' (মোহর লাগা) বলা হয়েছে।৪৯ কালব এ অবস্থায় পৌঁছে সত্য, ন্যায়, ঈমান ও ইসলামের প্রতি সব ধরনের আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে এবং এ সব তাঁর কালবে প্রবেশের কোনো সম্ভাবনা আর বাকী থাকে না। কোরআনের অন্য আয়াতে কালবের এ অবস্থাকে 'তার'আ'ও বলা হয়েছে।৫০ এর অর্থ হলো- যাবতীয় কুকর্ম ও অসৎগুণ কালবের স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়। এ অবস্থায় কালবের মধ্যে সত্য ও ন্যায়ের কথা গ্রহণের যোগ্যতা পুরোটাই নিঃশেষ হয়ে যায়।৫১ স্মর্তব্য যে, কাফির ও মুনাফিকের কালবে যে আস্তরণ জমে তা অত্যন্ত গাঢ় এবং কঠিন পাথরের সাথে তুলনা করা যায়। ফলে তাদের কালবের এ আস্তরণ কখনো অপসারণ হবার মতো নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً -"কিন্তু আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করার পরও শেষ পর্যন্ত তোমাদের অন্তরগুলো কঠিন হয়ে গেছে; বরং তার চেয়েও কঠিনতর।”৫২ এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কাফির-ইয়াহুদীদের অন্তরগুলোকে পাথরের সাথে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, তাদের অন্তরগুলো পাথরের মতো বা পাথর অপেক্ষাও বেশি কঠিন।
অপরদিকে মু'মিনের অন্তরে যে আস্তরণ জমে তা হালকা হয় এবং তাকে আয়নার সাথে তুলনা করা যায়, যার মধ্যে হয়তো কিছুটা মরিচা পড়ে; তবে তা একটু ঘষামাজা করলেই স্বচ্ছ হয়ে যেতে পারে।৫৩ কিন্তু এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি নিজে পাথরের আকৃতি ধারণ করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে জোর করে আয়নাতে পরিণত করবেন না। আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করে দিয়ে বলেন, ﴾فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ﴿ - "যখন তারা নিজেরা বক্র পথ অনুসরণ করেছে, তখন আল্লাহও তাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দিয়েছেন।”৫৪ কেননা আল্লাহর এটা রীতি নয় যে, তিনি অন্যায় পথের পথিককে জবরদস্তি করে হিদায়াত দান করবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ﴿ - "আল্লাহ তা'আলা যালিম লোকদের সত্য পথ প্রদর্শন করেন না।”৫৫ তবে যারা স্বেচ্ছায় ও সরল অন্তঃকরণে হিদায়াতপ্রাপ্ত হতে চায়, আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তাদেরকে হিদায়াত দান করেন। তিনি বলেন, ﴾وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيبُ﴿ - “আল্লাহ তা'আলা তাকেই সৎপথ প্রদর্শন করেন, যে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ দান করে।”৫৬ তিনি আরো বলেন,
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى . وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى ، فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى ، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى ، وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى ، فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى
অতএব, যে দান করে, আল্লাহকে ভয় করে চলে এবং উত্তম বাণীকে সত্য বলে মেনে নেয়, আমি তাকে সুখের বিষয় (অর্থাৎ জান্নাত) লাভের জন্য পথ সহজ করে দেবো। পক্ষান্তরে যে কার্পণ্য করে, বে-পরওয়া হয়ে চলে এবং উত্তম বাণীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আমি তাকে কষ্টের বিষয় (জাহান্নাম) লাভের জন্য পথ সহজ করে দেবো। ⁵⁷
এ আয়াতগুলো থেকে জানা যায়, যারা যে পথে তাদের প্রচেষ্টা ও শ্রম নিয়োজিত করবে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য সে পথ সহজ করে দেবেন। কাজেই যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে ভয় করে চলে এবং তাঁর পথে সম্পদ ব্যয় করে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য জান্নাতের কাজকর্ম সহজ করে দেবেন এবং এগুলো ক্রমে তাদের মজ্জায় পরিণত হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا﴿ - “হে মুমিনগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদেরকে ভালো-মন্দের পার্থক্যের শক্তি দান করবেন।" অর্থাৎ তাদের বিবেক প্রখর হয়, সুষ্ঠু বিচার-বিবেচনার শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে সে ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যে ভুল করে না। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, তাঁকে ভয় করে চলে না এবং তাঁর পথে সম্পদও ব্যয় করে না, তাদের বুদ্ধি-বিবেক ও বিচার-বিবেচনা শক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং এ কারণে তারা ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করতে পারে না। ফলে জাহান্নামের কাজকর্ম তাদের জন্য সহজ হয়ে যায় এবং এগুলোই ক্রমে তাদের মজ্জায় পরিণত হয়।
উল্লেখ্য যে, মানুষের শরীরের যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কালবের অধীন। তাই ইসলাম চায়, কালবের মরীচা দূর করে তাকে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে। এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ.
নিশ্চয় শরীরের মধ্যে গোশতের এমন একটি টুকরো রয়েছে, যা সংশোধিত হলে অন্যান্য সমস্ত অঙ্গই সংশোধিত হয়। আর তা নষ্ট হলে অন্যান্য সমস্ত অঙ্গই নষ্ট হয়। সাবধান! সেই টুকরোটি হলো কালব (অন্তর)। ⁵⁸
অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ.
হওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দাহর ঈমান ঠিক হবে না এবং যবান ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্তর ঠিক হবে না।”⁵⁹
কাজেই কালবকে সদা স্বচ্ছ, পবিত্র ও আলোকিত রাখা ইসলামের কাম্য এবং প্রত্যেক মুসলিমের ওপর তার ঈমানের একান্ত দাবি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন, আল্লাহ তা'আলা বান্দাহর দেহাবয়ব ও 'আকৃতির দিকে দৃষ্টি দেন না; তার কালবের দিকে দৃষ্টি দেন। তিনি বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ.
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আকৃতি ও তোমাদের ধন-সম্পদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তোমাদের অন্তর ও তোমাদের 'আমালের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। ⁶⁰
উপর্যুক্ত হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, মানব জীবনের পরিশুদ্ধি একান্তই কালবের পরিশুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। আর কালবের পরিশুদ্ধি 'আমালের পরিশুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল এবং 'আমালের পরিশুদ্ধি সর্বতোভাবে নাফসের পরিশুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। অতএব, মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজন হলো, নাফসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে একদিকে আল্লাহর নিষিদ্ধ ঘোষিত কর্ম থেকে বিরত থেকে কালবকে পরিচ্ছন্ন রাখা, অপরদিকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে তাঁর নির্দেশিত বিষয়সমূহ পালন করে কালবের ঔজ্জ্বল্য ও সুস্থতা বৃদ্ধি করা। শাইখ 'আবদুল কাদির 'ঈসা (রাহ.) বলেন, فتنقية القلب وتهذيب النفس من أهم الفرائض العينية وأوجب الأوامر الإلهية. নাফসকে সংশোধন করা প্রত্যেকের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফারয ও আল্লাহর প্রদত্ত নির্দেশ।”⁶¹ বলাই বাহুল্য, এ ধরনের সুস্থ কালব সম্পন্ন লোকেরাই আখিরাতে নাজাতপ্রাপ্ত ও সাফল্যমণ্ডিত হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ . إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبِ سَلِيمٍ﴾ (যে দিন (অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন) কোনো অর্থ-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি কারো কোনো উপকারে আসবে না। একমাত্র সে ব্যক্তিই নাজাত পাবে, যে ব্যক্তি সুস্থ ও নীরোগ অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট পৌঁছবে। "৬২ এ আয়াতে সুস্থ অন্তঃকরণ দ্বারা কুফর, শিরক, নিফাক ও বিভিন্ন আত্মিক কদর্যতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র অন্তঃকরণকেই বোঝানো হয়েছে। ⁶³ আর এরূপ অন্তঃকরণ কেবল সৎ ও একনিষ্ঠ মু'মিনেরই হতে পারে। কাফির, মুনাফিক ও পাপিষ্ঠদের অন্তঃকরণ মৃত, রুগ্ন ও অসুস্থ হয়ে থাকে। ⁶⁴
উল্লেখ্য যে, দুনিয়ার বিভিন্ন ধান্ধায় মত্ত থাকা এবং অধিক মাত্রায় অর্থহীন কথাবার্তা ও বাজে কার্যকলাপে লিপ্ত হবার কারণে অনেক সময় মু'মিনের কালবও অত্যন্ত কঠিন ও গাফিল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় পৌঁছে কালব আল্লাহর ভয়ে কেঁপে ওঠে না, ওয়ায-নাসীহাতে নরম ও বিগলিত হয় না এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় চোখে অশ্রু আসে না। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنْ كَثرَةَ الْكَلَامِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ قَسْوَةُ الْقَلْبِ، وَإِنْ أَبَعْدَ النَّاسِ مِنَ اللَّهِ الْقَلْبُ الْقَاسِي.
আল্লাহর যিকর ছাড়া অধিক কথা বলো না। কেননা আল্লাহর যিকর ব্যতীত অধিক কথা বলার কারণে অন্তর কঠিন হয়ে যায়। (সাবধান!) আল্লাহর নিকট থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী লোক হলো কঠিন হৃদয়ের ব্যক্তি। ৬০
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, অন্তরের কঠিনত্ব এমন এক মারাত্মক অবস্থা, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য ও সামীপ্য অর্জন থেকে বঞ্চিত করে। বিশিষ্ট 'আবিদ ফুদাইল ইবনু 'ইয়াদ [১০৫-১৮৭ হি.] (রাহ.) বলেন,
خَمْسٌ مِّنْ عَلَامَاتِ الشَّقَاءِ الْقَسْوَةُ فِي الْقَلْبِ، وَجُمُودُ الْعَيْنِ، وَقِلَّةُ الْحَيَاءِ، وَالرَّغْبَةُ فِي الدُّنْيَا، وَطُولُ الْأَمَلِ.
পাঁচটি বিষয় দুর্ভাগ্যের নিদর্শন। এগুলো হলো- অন্তরের কঠিনতা, চোখের জড়তা, লজ্জাস্বল্পতা, পার্থিব মোহ ও দীর্ঘ আশা-আকাঙ্খা। ⁶⁶
পবিত্র হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে কালবের এ অবস্থা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে শিক্ষা দিয়েছেন এবং তা থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন 'আমাল করার নির্দেশনাও প্রদান করেছেন। যেমন- গভীর চিন্তা-ভাবনাসহ কোরআন তিলাওয়াত করা, রাতে জেগে 'ইবাদাত করা ও কান্নাকাটি করা, বেশি বেশি মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ করা, হালকা ভোজন করা, অনর্থক কথাবার্তা ও কাজকর্ম পরিত্যাগ করা, সৎ লোকদের সাথে মেলামেশা করা ও গরীব-অসহায় লোকদের সেবা করা প্রভৃতি। এ সকল বিষয়ে আমরা যথাস্থানে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ। জনৈক কবি বলেন,
دَوَاء قَلْبِكَ خَمْسٌ عِنْدَ قَسْوَتِهِ ... فَدُمْ عَلَيْهَا تَفُزْ بِالْخَيْرِ وَالظُّفَرِ كَذَا تَضَرُّعُ بَاكٍ سَاعَةَ السَّحَرِ ... خَلَاءُ بَطْنٍ وَقُرْآنٌ تَدَبَّرُهُ وَأَن تُجَالِسَ أَهْلَ الْخَيْرِ وَالْخَبَرِ. ... كَذَا قِيَامُكَ جُنْحَ اللَّيلِ أَوْسَطَهُ
তোমার কালবের কঠিনত্বের পাঁচটি প্রতিষেধক রয়েছে। এ প্রতিষেধকগুলো নিরন্তর ব্যবহার করো, তবেই তুমি কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করবে। এগুলো হলো- পেট খালি রাখা (অর্থাৎ উদরপূর্তি করে পানাহার না করা), চিন্তা-ভাবনাসহ কোরআন তিলাওয়াত করা, রাতের শেষভাগে কাতরতার সাথে ক্রন্দন করা, রাত জেগে 'ইবাদাত করা এবং ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি ও 'আলিমগণের সাথে ওঠাবসা করা। ⁶⁸

টিকাঃ
৪১. বাগাভী, মা'আলিমুত তানযীল, খ. ৮, পৃ. ৪৩৯; ছা'লাবী, আল-কাশফু ওয়াল বায়ান, খ. ১০, পৃ. ২১৪
৪২. আল কোরআন, সূরা আন-নাযি'আত, ৭৯: ৪০-৪১
৪৩. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১০
৪৪. কোরআনের ভাষায় এরূপ কালবকে قلب سليم (সুস্থ ও নীরোগ কালব) বলা হয়। দ্র. আল কোরআন, সূরা আশ-শু'আরা', ২৬: ৮৯; সূরা আস-সাফফাত, ৩৭ : ৮৪
৪৫. কোরআনে নারীলিদু ব্যক্তির অন্তরকে রোগাক্রান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ"...ফলে সে ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে।" (আল কোরআন, সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৩২)
৪৬. আল কোরআন, সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩: ১৪
আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক (১১৮-১৮১হি.) (রাহ.) বলেন, رأيت الذنوب مميت القلوب ** ويُتبعها الذل إدمائها ... وترك الذنوب حياة القلوب ** وخير لنفسك عصيانها.
"আমি দেখছি যে, গুনাহগুলো অন্তরকে মৃত বানিয়ে ফেলছে। বলাই বাহুল্য, গুনাহে নিমগ্নতা লাঞ্ছনা ডেকে আনে। আর গুনাহ-ত্যাগ অন্তরগুলোর জন্য প্রাণসদৃশ। অর্থাৎ এতে অন্তরগুলো প্রাণ ও সজীবতা ফিরে পায়। কাজেই তোমার নাফসের জন্য উত্তম ব্যবস্থা হলো- তুমি তার অবাধ্যতা করবে।” (ইবনুল মুবারাক, দিওয়ান, পৃ.২৬).
৪৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব : তাফসীরুল কোরআন), হা. নং : ৩৩৩৪; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৪৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৭৯৫২ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ। বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রাহ)-এর মতে, হাদীসটি হাসান। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৭, পৃ. ৩৩৪)
৪৮. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩০৯৫৭ ইমাম বাইহাকী (রাহ.) তাঁর 'শু'আবুল ঈমান' (হা. নং: ৩৭) এর মধ্যেও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তবে সেখানে মর্ম-এর পরিবর্তে ঊর্ম রয়েছে।
৪৯. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৭
৫০. আল কোরআন, সূরা আন-নিসা', ৪: ১৫৫; সূরা আন-নাহল, ১৬: ১০৮; সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১৬
৫১. এরূপ কালবকে কোরআনের ভাষায় ميت )মৃত অন্তর) বলা হয়। দ্র. কোরআন, সূরা আল-আন'আম, ৬: ১২২ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা.) বলেন, هَلَكَ مَنْ لَمْ يَعْرِفَ قَيْهَ المَعْرُوفَ، وَيُنْكِرْ لَهُ الشكر "ধ্বংস হয়ে গেছে সে ব্যক্তি, যার অন্তর ন্যায় চিনে না এবং অন্যায় প্রত্যাখ্যান করে না।" অর্থাৎ যে ব্যক্তির অন্তর ন্যায়বোধ হারিয়ে ফেলেছে এবং অন্যায়ই তার অন্তরের প্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে, সে প্রকৃতই ধ্বংস হয়ে গেছে। (তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৮৬৬৪) এরূপ ব্যক্তি যদিও জীবিত; কিন্তু তার অন্তর প্রকৃতই মৃত। 'আসিম আল-আহওয়াল (মৃ. ১৪২ হি.) (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রা.) প্রায়ই নিম্নের এ চরণটি আবৃত্তি করতেন, لَيْسَ مَنْ مَاتَ فَاسْتَرَاحَ بِمَيِّتٍ ... إنما اليت ميت الأحياء. "যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে স্বস্তি লাভ করলো সে প্রকৃত অর্থে মৃত নয়; প্রকৃত মৃত ব্যক্তি হলো জীবিতদের মধ্যে মৃত ব্যক্তিই। অর্থাৎ যার অন্তর মৃত।" এরপর তিনি বলতেন, صَدَى وَاللَّهِ ، إِنَّهُ لَيَكُونَ حَبًّا وَهُوَ مَيِّتُ الْقَلْبِ-"আল্লাহর কসম! কবি সত্য কথাই বলেছেন। সে যদিও জীবিতই হয়; কিন্তু বাস্তবে তার অন্তর মৃত।” (ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, কালামুল হাসান আল-বাসরী রাহ.), হা. নং: ৩৬৩৬৭; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান [৪৭: মু'আলাজাতু কুল্লি যানবিন), হা. নং: ৬৯১৬)
৫২. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৭৪
৫৩. বিশিষ্ট সূফী শাইখ 'আলী আল-হাজবিরী [৪০০-৪৬৫ হি.] (রাহ.) মু'মিনের অন্তরের এরূপ আস্তরণকে 'গাইনী হিজাব' নামে অভিহিত করেছেন। এর বিপরীত হলো 'রাইনী' হিজাব। 'গাইনী হিজাব' এক প্রকার সাময়িক হিজাব বা আস্তরণ। সামান্য চেষ্টা করলে এবং আল্লাহর দিকে অগ্রসর হলে এ আস্তরণ দূরীভূত হয়ে যায়। এ জাতীয় আস্তরণ কম-বেশি সকলের মধ্যেই হয়ে থাকে। এটা দূর করার পদ্ধতি হলো, সরল অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। (গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ১৫)
৫৪. আল কোরআন, সূরা আস-সাফ্ফ, ৬১: ৫
৫৫. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ২৫৮
৫৬. আল কোরআন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ১৩
৫৭. আল কোরআন, সূরা আল-লাইল, ৯২: ৫-১০
৫৮. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৫২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-মুসাকাত), হা. নং: ৪১৭৮
৫৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৩০৪৮; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা. নং: ৮৮৭ হাদীসটি সূত্রগত দিক থেকে হাসান পর্যায়ের। (আলবানী, সাহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ.. ২, পৃ. ৩৪৩, হা. নং: ২৫৫৪
৬০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বির...), হা. নং: ৬৭০৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ৭৮২৭; ইবনু হিব্বান, আস-সাহীহ, হা. নং: ৩৯৪; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১৪৩ সর্বসাধারণকে হাদীসটি এভাবে বর্ণনা করতে দেখা যায়- « إن الله لا ينظر إلى صوركم ولا إلى أعمالكم ، ولكن ينظر إلى قلوبكم » "আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আকৃতির দিকেও দৃষ্টি দেবেন না এবং তোমাদের 'আমালের দিকেও দৃষ্টি দেবেন না; বরং তোমাদের অন্তরের দিকে দৃষ্টি দেবেন।" উল্লেখ্য যে, এরূপ রিওয়ায়াতটি বিশুদ্ধ নয়। তদুপরি তা উপরে বর্ণিত সাহীহ হাদীসের পরিপন্থীও। ইমাম বাইহাকী (রাহ.) বলেন, فهذا لم يبلغنا من وجه يثبت مثله ، وهو خلاف ما في الحديث الصحيح- "এ রূপ রিওয়ায়াত আমাদের নিকট কোনো সুদৃঢ় সূত্রে পৌছেনি। তা ছাড়া এর বক্তব্যও সাহীহ হাদীসের পরিপন্থী।" (বাইহাকী, আল-আসমা' ওয়াস-সিফাত, হা. নং: ৯৫০, খ. ৩, পৃ. ৩৬)
৬১. 'আবদুল জব্বার, এলমে তাছাউফের হাকীকত, পৃ.২৪
৬২. আল কোরআন, ২৬ (সূরা আশ-শু'আরা'): ৮৯
৬৩. কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, খ.১৩, পৃ.১১৩-৪; ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ.৬, পৃ.১৪৯
৬৪. বিশিষ্ট তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়‍্যাব (রাহ.) বলেন, القلب السليم: هو القلب الصحيح، وهو قلب المومن؛ لأن قلب الكافر والمنافق مريض। "'কালবে সালীম' দ্বারা উদ্দেশ্য সুস্থ অন্তঃকরণ। এটা মু'মিনেরই অন্তর। কেননা কাফির ও মুনাফিকের অন্তর রুগ্ন হয়ে থাকে।" (কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, খ. ১৩, পৃ. ১১৩-৪; ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৬, পৃ. ১৪৯)
৬৫. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৪১১ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহ ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৫, পৃ. ৪১১, হা. নং: ২৪১১) উল্লেখ্য যে, হাদীসটির অনুরূপ বক্তব্য সাইয়িদুনা 'ঈসা 'আলাইহিস সালাম থেকেও বর্ণিত রয়েছে। (মালিক, আল-মুওয়াত্তা, হা. নং: ৩৬১৫)
৬৬. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৪: আল-হায়া'), হা. নং: ৭৩৫৪ বিশিষ্ট যাহিদ ও ফাকীহ মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি' [মৃ. ১২৩ হি.] (রাহ.) থেকেও প্রায় অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত রয়েছে। (বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, [৭১: আয-যুহদ), হা. নং: ১০২৯৭)
৬৭. যেমন সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول في دعائه : اللهم إني أعوذ بك من العجز والكسل و الجبن و البخل و الهرم و القسوة و الغفلة ....
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বলে আল্লাহর নিকট দু'আ করতেন যে, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অক্ষমতা, অলসতা, ভীরুতা, কার্পণ্য, বার্ধক্য, কঠিনতা ও গাফলতি থেকে পানাহ চাই।” (হাকিম, আল-মুস্তাতরাক, কিতাব: আদ-দু'আ, হা. নং: ১৯৪৪; তাবারানী, আল-মু'জামুস সাগীর, হা. নং: ৩১৬ ও আদ-দু'আ, হা. নং: ১৩৪৩) বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল-হাকিম (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ।
৬৮. 'আবদুল হাদী, ইসলাহুল কুলুব, পৃ. ৬৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00