📄 পশু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য
আল্লাহ তা'আলা মানুষকে অন্যান্য পশুর ওপর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যা দ্বারা সে অন্যান্য পশুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বাতন্ত্র্য লাভ করে। সে বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি হলো- তার জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক, যা দ্বারা সে তার ভালো-মন্দ এবং কল্যাণ ও অকল্যাণ উপলব্ধি করতে পারে এবং সে তার স্বভাবগত জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা ও হালাল-হারাম পার্থক্য করে চলে। বস্তুত এতেই তার মনুষ্যত্ব ও মানবিক দিকের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে। কাজেই কোনো মানুষ যদি তার জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রে অন্য পশুর মতো আত্মপরায়ণ ও চরম লোভাতুর হয়, ন্যায়-অন্যায় ও হালাল-হারাম পার্থক্য না করে, অপরের স্বার্থহানি করে এবং অসংযত ও উদ্ধত আচরণ করে, তবে তার ও পশুর মধ্যে যে পার্থক্যটা রয়েছে তা আর অবশিষ্ট থাকে না। তার এ অসংযত ও উদ্ধত আচরণের ফলে সে কেবল অন্য পশুর মতো একটি পশুতেই পরিণত হয়, তা নয়; বরং পশুত্বের চরম নিম্নস্তরে নেমে যায়। সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) কতোই চমৎকার বলেছেন,
مَا أَكْثَرَ النَّاسِ لا بَلْ مَا أَقَلُّهُمْ ** اللَّهُ يَعْلَمُ أَنِّي لَم أَقُلْ فَنَدا. إني لأفتح عيني حين أفتحها ** على كثير ولكن لا أرى أحداً.
(লোকেরা বলে,) মানুষ কতোই না বেশি! (আর আমি বলি,) না; বরং তারা কতোই না কম! আল্লাহ তা'আলা জানেন যে, আমি কোনো মিথ্যা কথা বলিনি। আমি যখন চোখ খুলি, তখন অনেক কিছুই দেখি; কিন্তু কোনো (সত্যিকার) মানুষকে দেখতে পাই না।"¹¹
আল্লাহ তা'আলা নাফসের পূজারী মানুষগুলোকে 'আন'আম' অর্থাৎ চতুষ্পদ জন্তু বা এর চাইতেও নিকৃষ্ট বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন,
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أعين لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
আর আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি বহু জিন্ ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে; কিন্তু তা দ্বারা বিবেচনা করে না। তাদের চোখ রয়েছে; কিন্তু তা দ্বারা দেখে না। তাদের কান রয়েছে; কিন্তু তা দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারা হলো উদাসীন।¹²
অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّ شَرَّ الدَّوَابَ عِنْدَ الله الصُّمُ ﴾الْبُكُمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সর্বনিকৃষ্ট জন্তু হলো যারা বধির ও বোবা এবং যারা উপলব্ধি করে না।"¹⁴
অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কাফিরদেরকে জন্তুর সাথে তুলনা করে বলেন,
وَمَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَنِدَاءً صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ
বস্তুত এই সব লোক- যারা আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলতে অস্বীকার করেছে, তাদের অবস্থা ঠিক রাখাল চরানো জন্তুর ন্যায়; রাখাল জন্তুগুলোকে ডাকে, কিন্তু তারা তার ডাকের আওয়াজ ও চিৎকার ছাড়া আর কিছুই শোনতে পায় না। এরা বধির, বোবা এবং অন্ধ। এ কারণে তারা কোনো কথাই অনুধাবন করতে পারে না। ¹⁵
এ আয়াতগুলোর মর্ম এ নয় যে, তারা নিজেদের জৈবিক প্রয়োজন ও চাহিদা সম্পর্কে বোঝে না কিংবা এতদসংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখতে বা শোনতে পায় না; বরং তারা এ সব বিষয় যথেষ্ট বোঝে এবং দেখে ও শোনে। কিন্তু তাদের বুদ্ধিমত্তা ও দর্শন ক্ষমতার ব্যবহার যেহেতু কেবল সে পর্যায়েই সীমিত থাকে, যে পর্যায়ে সাধারণ জন্তু-জানোয়ারের থাকে (অর্থাৎ শুধু পেট ও লিঙ্গের সেবা করা, সত্য-সুন্দর ও ন্যায়ের পরিচর্যা সম্পর্কে কোনো কিছুই না ভাবা বা না দেখা), সেহেতু তারা দুনিয়ার বস্তুগত পর্যায়ে যতোই উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করুক না কেন, তা সবই তাদের পেট ও লিঙ্গের সেবা, তার চেয়ে অধিক কিছু নয়। কাজেই পবিত্র কোরআন বিভিন্ন জায়গায় এ জাতীয় লোককে নির্বোধ, অন্ধ ও বধির বলেছে। এ আয়াতে তাদের উপলব্ধি, দর্শন ও শ্রবণকে অস্বীকার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, তাদের যা বোঝা বা উপলব্ধি করা উচিত ছিল, তারা তা করেনি, যা দেখা উচিত ছিল তা তারা দেখেনি, যা কিছু তাদের শোনা উচিত ছিল তা তারা শোনেনি। আর যা কিছু বোঝেছে, দেখেছে এবং শোনেছে, তা সবই হলো জন্তু-জানোয়ারের পর্যায়ের বোঝা, দেখা ও শোনা, যাতে গাধা- ঘোড়া-গরু-ছাগল সবই সমান।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا . أَمْ تَحْسَبُ أَنْ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا
আপনি কি মনে করেন, যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে, আপনি কি তার যিম্মাদার হতে পারবেন? আপনি কি মনে করেন, তাদের অধিকাংশই শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতোই; বরং আরো নিকৃষ্টতর। ¹⁶
এ আয়াতে প্রবৃত্তির অনুসরণকে প্রবৃত্তির দাসত্ব ও পূজা বলা হয়েছে। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) বলেন, الهوى إله يعبد من دون الله "প্রবৃত্তিও একপ্রকার 'ইলাহ', আল্লাহকে ছেড়ে যার দাসত্ব ও পূজা করা হয়।" তিনি এর প্রমাণ হিসেবে এই আয়াত তিলাওয়াত করেন। ¹⁷ কাজেই এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, যারা আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ অমান্য করে প্রবৃত্তির খেয়াল- খুশি মতো চলে, তারা মানুষ নামে আখ্যায়িত হওয়ার উপযোগী নয়। বস্তুতপক্ষে তারা একটি চতুষ্পদ জন্তুই। এর কারণ হলো- চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ার যেমন জৈবিক চাহিদাসমূহ পূরণের কাজে সদাসর্বদা নিয়োজিত থাকে এবং পেট ও লিঙ্গই হলো তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর, তেমনি প্রবৃত্তিপূজারী মানুষও কেবল তার জৈবিক চাহিদাসমূহ পূরণের কাজে সদাসর্বদা নিয়োজিত থাকে এবং পেট ও লিঙ্গই হয় তার চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর। অধিকন্তু, আয়াতে তাকে চতুষ্পদ জন্তু- জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। এর কারণ হলো, চতুষ্পদ জন্তুগুলো শারী'আতের বিধি-নিষেধের আওতাধীন নয়, তাদের জন্য কোনো সাজা-শাস্তি কিংবা দান-প্রতিদান নেই। তাই তাদের লক্ষ্য যদি-যেভাবে হোক- শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমিত থাকে, তবেই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষকে যে নিজের কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে এবং এ জন্য তাকে সুফল কিংবা শাস্তি ভোগ করতে হবে, তাই যে কোনোভাবেই শুধু জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণকেই নিজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বলে সাব্যস্ত করে নেয়া জন্তু-জানোয়ারের চেয়েও অধিক নির্বুদ্ধিতা। তা ছাড়া জন্তু-জানোয়ার নিজের প্রভু ও মালিকের সেবা যথার্থই সম্পাদন করে। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞ-নাফরমান মানুষ স্বীয় মালিক রাব্বুল 'আলামীনের আনুগত্যে ত্রুটি করে থাকে। সে কারণেও তারা চতুষ্পদ জানোয়ার অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট ও নির্বোধ প্রতিপন্ন হয়।
টিকাঃ
১১. দিওয়ানু 'আলী রা., পৃ.৭৬
১২. আল কোরআন, সূরা আল-আ'রাফ, ৭: ১৭৯
১৩. অভিধান অনুযায়ী যমীনের ওপর বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীকেই ২৬ বলা হয়। কিন্তু সাধারণ প্রচলন ও পরিভাষায় ২৬ বলা হয় শুধুমাত্র চতুষ্পদ জন্তুকে। সুতরাং আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আল্লাহর নিকট সে সব লোকই সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও চতুষ্পদ জন্ততুল্য, যারা সত্য ও ন্যায় শ্রবণের ব্যাপারে বধির এবং তা গ্রহণ করার ব্যাপারে বোবা। বস্তুত বধির ও বোবার মধ্যে সামান্য বুদ্ধি থাকলেও সে ইশারা-ইঙ্গিতে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করে এবং অন্যের কথা উপলব্ধি করে। অথচ এরা বধির ও বোবা হওয়ার সাথে সাথে নির্বোধও বটে।
১৪. আল কোরআন, সূরা আল-আনফাল, ৮: ২২
১৫. আল কোরআন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১৭১ এ উদাহরণটির দু'টি দিক রয়েছে। একটি হলো- যে সব লোক আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলতে প্রস্তুত নয়; বরং বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে তাদের পেছনে পেছনে ভ্রান্ত পথ ধরে চলে, তাদের অবস্থা সেই সব নির্বোধ জন্তু-জানোয়ারের মতো, যাদের পাল নিজ নিজ রাখালের পেছনে থাকে এবং কোনো কিছু না বোঝে অন্ধভাবে শুধু তাদের ধ্বনির পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকে। দ্বিতীয় দিক হলো- ঐ সব লোকের নিকট দীনের দা'ওয়াত পৌঁছানো হয়, তখন মনে হয় যে, কোনো মানুষকে নয়, যেন কতকগুলো নির্বোধ জন্তু-জানোয়ারকেই সম্বোধন করা হচ্ছে। তারা কেবল শব্দ শোনতে পায়; কিন্তু তাদেরকে কী বলা হয়েছে, তা তারা মোটেই বোঝতে পারে না।
১৬. আল কোরআন, সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৪৪
১৭. কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ১৩, পৃ. ৩৫; রাযী, মাফাতীহুল গাইব, খ. ২৪, পৃ. ৭৫
📄 তাযকিয়াতুন নাফস-এর মর্ম
'তাযকিয়াহ' একটি আরবী শব্দ। এর অর্থ পরিশুদ্ধ করা, পূত-পবিত্র করা, বৃদ্ধিসাধন করা। অতএব, 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে নাফসের পরিশুদ্ধি, পবিত্রকরণ, পরিগঠন ও উন্নতিসাধনকে বোঝানো হয়। পরিভাষায় 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে নাফসকে তার পশুত্বসুলভ বক্রচিন্তা, কুবৃত্তি ও অসৎপ্রবণতাসমূহ থেকে মুক্ত ও পবিত্রকরণ এবং মানবিক মূল্যবোধ, সৎচিন্তা, সুকুমার বৃত্তি ও সুন্দর চরিত্রসমূহ দ্বারা তার উন্নতিসাধনকে বোঝানো হয়।¹⁸ তাযকিয়াহর বিপরীত শব্দ হলো- 'তাদসিয়াহ'। এর অর্থ হলো- নাফসকে পাপের মধ্যে নিমজ্জিত করে রাখা।¹⁹ আল্লাহ তা'আলা বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا . وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا - “যে নিজের নাফসকে পরিশুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। আর যে নিজের নাফসকে পাপের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।”²⁰ 'আবদুল্লাহ ইবনু মু'আবিয়া আল-গাদিরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমাতে আরয করেন, مَا تَرْكِيَّةُ الْمَرْءِ نَفْسَهُ؟ "ব্যক্তি কর্তৃক তার নাফসের তাযকিয়াহ বলতে কী বোঝায়?" তিনি উত্তর দেন .أَن يَعْلَمَ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلْ مَعَهُ حَيْثُ كَانَ “ব্যক্তির নাফসের তাযকিয়া হলো, সে এই মর্মে বিশ্বাস পোষণ করবে যে, সে যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তা'আলা তার সাথেই রয়েছেন।"²¹ অর্থাৎ প্রতিটি কাজের সময় সে এ বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তা'আলা তার কাজ সম্পর্কে সম্যক অবহিত, তার কোনো কিছুই আল্লাহর নিকট গোপনীয় ও অস্পষ্ট নয়। কাজেই সে প্রতিটি কাজ করার সময় তাঁকে স্মরণ করবে এবং তাঁকে ভয় করে ও একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিটি কাজ সম্পাদন করবে।
বিশিষ্ট মুফাসসির শিহাবুদ্দীন আল-আলুসী [১২১৭-১২৭০হি.] (রাহ.) 'তাযকিয়াতুন নাফস'-এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, "الاستقامة على التوحيد وإخلاص العمل الله تعالى والتبري عن الشرك." অর্থাৎ "তা হলো তাওহীদের ওপর অটল থাকা, নিষ্ঠার সাথে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে 'আমাল করা এবং শিরক থেকে বেঁচে থাকা।”²²
মোট কথা, 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে 'আকীদা-বিশ্বাস, 'আমাল-আখলাক, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, লেনদেন ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছুরই পরিশুদ্ধিকরণকে বোঝায়।
উল্লেখ্য যে, ইসলাম একটি স্বভাবগত ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা হিসেবে মানুষের জৈবিক চাহিদাসমূহকে অস্বীকার করে না এবং এগুলো পূরণের জন্য চেষ্টা ত্যাগ করতেও বলে না। বরং ইসলামের নির্দেশ হলো- মানুষ তার স্বভাবগত জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণ করবে এবং এ জন্য চেষ্টাও চালাবে।²³
তবে তাকে এ ক্ষেত্রে নাফসের ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাকে তার চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায় ও হালাল-হারাম বাছ-বিচার করতে হবে, অন্যের অধিকার, প্রয়োজন ও স্বার্থের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় লক্ষ্য রাখতে হবে। এরূপ কর্ম অনুশীলনের ফলে ক্রমে নাফসের পশুত্বসুলভ ভাব ও চরিত্র (যেমন- লোভ-লালসা, আত্মপ্রীতি, হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহঙ্কার, অবাধ যৌনাচার, ধন-সম্পদ ও নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল মোহ প্রভৃতি) দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে, পক্ষান্তরে তার বিবেক-বোধ ও সুকুমার বৃত্তি (যেমন- সততা, নিষ্ঠা, ধৈর্য, ক্ষমা, মহানুভবতা, বিনয় ও নম্রতা প্রভৃতি) জাগ্রত ও সবল হয়। ফলে ক্রমে তার মনুষ্যসুলভ ভাব ও নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও বিকশিত হয়। এভাবে মন্দকর্মপ্রবণ নাফস (নাফস আম্মারাহ) পর্যায়ক্রমে লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ও গর্ব-অহঙ্কার প্রভৃতি অশিষ্ট প্রবণতা থেকে পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র হয় এবং তা ক্রমে সুকর্মপ্রবণ প্রশান্ত নাফসে (নাফসে মুতমায়িন্নাহ) রূপান্তরিত হয়। বিশিষ্ট সূফী শাইখ নাসির উদ্দীন চেরাগী দেহলভী (রাহ.) বলেন,
মানুষের নাফস একটি বৃক্ষের মতো। শাইতানী কুমন্ত্রণার সাহায্যে এর অঙ্কুর গজিয়ে ওঠে। অতঃপর এটা বৃহৎ আকারের বৃক্ষরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যদি মানুষ স্বীয় বিবেক-বুদ্ধি, 'ইবাদাত, তাকওয়া, ভালোবাসা ও আল্লাহ প্রেমের মাধ্যমে এই গাছ আন্দোলিত করে, তবে নিঃসন্দেহে এ নাফস আম্মারা নিস্তেজ হয়ে পড়বে, যার ফলে তার মূলোৎপাটন সম্ভবপর হবে। ২৪
টিকাঃ
১৮. ইবনু 'আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, খ. ১, পৃ. ৫৩৪; সালিহ আল-ফাওযান, ইয়া'নাতুল মুস্তাফীদ, খ. ৩, পৃ. ৪২৯
১৯. বিশিষ্ট মুফাসসির যামাখশারী (রাহ.)-এর মতে, 'তাদসিয়াহ' হলো-- النقص والإخفاء بالفحوز ""নাফসকে ত্রুটিযুক্ত করা ও পাপের মধ্যে লিপ্ত করে রাখা।" (যামাখশারী, আল-কাশশাফ, খ. ৪, পৃ. ৭৬৩)
২০. আল কোরআন, সূরা আশ্ শাম্স, ৯১: ৯-১০
২১. তাবারানী, আল-মু'জামুস সাগীর, (বাব: 'আইন/আলী) হা. নং: ৫৫৫; শইবানী, আল-আহাদ ওয়াল মামানী, হা. নং: ১০৬২; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, (কিতাব: আয-যাকাত), হা. নং: ৭৫২৫ বিশিষ্ট হাদীসবিশারদ আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটির সানাদ সাহীহ। (আলবানী, আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ, খ. ৩, পৃ. ১২০, হা. নং: ১০৪৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা "كان الله معه حيث كان" প্রসঙ্গে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া আয-যুহালী (মৃ.২৫৮ হি.] (রাহ.) বলেন, এ কথার উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহ তা'আলার 'ইলম সর্বত্র ব্যাপ্ত, কোনো কিছুই তাঁর 'ইলমের বহির্ভূত নয়। বলাই বাহুল্য, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের ওপরই রয়েছেন।" (তুওয়াইজারী, ইসবাতু 'উলুয়িল্লাহ.., পৃ. ৪৮; হাফিয আয-যাহাবী (রাহ.)-এর "العلو" কিতাব থেকে সংগৃহীত।) এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন, ড. আহমদ আলী রচিত বিদ'আত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬২-৭৯
২২. আলুসী, রূহুল মা'আনী, খ. ১৮, পৃ. ১৫৭
২৩. সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার কয়েকজন সাহাবী মিলিত হয়ে তাঁদের নিজ নিজ ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের একজন বললেন, তিনি রাতে ঘুমোবেন না। সারা রাত জেগে থেকে 'ইবাদাত করবেন। আর একজন সাহাবী বললেন, তিনি দিনে খাবেনই না। প্রত্যহ রোযা রাখবেন। অন্য একজন বললেন, তিনি গোশত খাবেন না। আর এক সাহাবী বললেন, তিনি বিয়ে-শাদীতো করবেনই না; কোনো নারীর কাছেও গমন করবেন না। তাঁদের এ সব ইচ্ছার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পেরে বললেন, أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَحْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي .
"খবরদার! এ রূপ চিন্তা করো না। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সকলের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং তাঁকে মেনে চলি। কিন্তু আমি তো রোযাও রাখি, রোযা রাখা ছেড়েও দেই, (রাতে) নামাযও পড়ি, ঘুমাইও, মেয়েদের বিয়েও করি। অতএব, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত মেনে চলবে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাব: আন-নিকাহ, হা. নংঃ ৪৬৭৫; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আন-নিকাহ), হা. নং: ২৪৮৭) এ হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়, যে ব্যক্তি শারী'আত সম্মত 'ওযর ছাড়া অতি ধার্মিকতার নামে কোনো জৈবিক বৈধ চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকবে, সে মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতকেই পরিত্যাগ করে। ইমাম শাতিবী [মৃ.৭৯০ হি.] (রাহ.) বলেন,
كُلُّ مَنْ مَنَعَ نَفْسَهُ مِنْ تَنَاوُلِ مَا أَحَلَّ اللهُ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ شَرْعِيٌّ فَهُوَ خَارِجٌ عَنْ سُنَّةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم ، وَالْعَامِلُ بِغَيْرِ السَّنَّةِ تَدَيُّنًا هُوَ الْمُبْتَدِعُ بِعَيْنِهِ . "আল্লাহ তা'আলা যে সব বিষয় হালাল করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো শারী'আত সম্মত 'ওযর ছাড়া সে সব বিষয় থেকে নিজেকে বারণ করে রাখবে, সে মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতই পরিত্যাগ করেছে। আর যে ব্যক্তি সুন্নাত নয়- এমন কোনো বিষয়কে ধার্মিকতা মনে করেই মেনে চলবে, সে মূলত বিদ'আতীই।" (শাতিবী, আল-ই'তিসাম, খ. ১, পৃ. ৪৪)
২৪. ঈযাজ আহমাদ আজমী, তাসাউফ পরিচিতি, (মাওলানা মুহাম্ম আবদুল জব্বার রাহ. কর্তৃক অনূদিত ও সংকলিত 'আল-ইহসান' গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত, পৃ. ৩২)
📄 নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ
নাফস পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টা এবং এ উদ্দেশ্যে তার ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠাকে 'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ' নামে আখ্যায়িত করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো- নাফসের মন্দপ্রবণতা ও অবাঞ্ছিত কামনা-বাসনার বিরোধিতা করা এবং সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের অনুসরণ করতে নাফসকে বাধ্য করা। কোনো কোনো হাদীসে এ জিহাদকে সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الْجَهَادِ أَفْضَلُ؟ "ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন্ জিহাদটি সর্বশ্রেষ্ঠ।" তিনি জবাব দিলেন, .أَنْ يُجَاهِدَ الرَّجُلُ نَفْسَهُ وَهَوَاهُ "নিজের নাফস ও লালসার বিরুদ্ধে লড়াই।”²⁵ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু وَأَفْضَلُ الْجِهَادِ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي ذَاتِ اللهِ عَزَّ 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন وَجَلْ -"আর সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো, যে আল্লাহর জন্য নিজের নাফসের বিরুদ্ধে للدَّهُ فِي طَاعَةِ اللّٰهِ লড়াই করে।”²⁶ তিনি আরো বলেন, الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ "(পরিপূর্ণ) মুজাহিদ হলো সে-ই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করার ব্যাপারে নিজের নাফসের সাথে লড়াই করে। "²⁷
'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ'কে সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলার কারণ হলো- প্রথমত, একজন মুসলিমকে সত্যিকারভাবে তার দীন ও ঈমানের ওপর অটল-অবিচল থাকার জন্য নাফসের বিরুদ্ধে নিরন্তর ও প্রাণান্তকর জিহাদ চালিয়ে যেতে হয়। দ্বিতীয়ত, নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ মানুষের স্বভাবগত চাহিদা ও কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে হওয়ায় তা অন্য জিহাদের চাইতে অধিকতর কঠিন ও দুঃসাধ্য। তৃতীয়ত, আল্লাহর দীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে লড়াই করার জন্যেও নাফসের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন জিহাদের প্রয়োজন পড়ে। নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ ব্যতীত কারো পক্ষে দীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়।²⁸ ইমাম ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ [৬৯১-৭৫১ হি.] (রাহ.) বলেন,
ولما كان جهاد أعداء الله في الخارج فرعاً على جهاد العبد نفسه في ذات الله، كما قال النبي صلى الله عليه وسلم: "المجاهد من جاهد نفسه في طاعة الله والمهاجر من هجر ما نهى الله عنه" . كان جهاد النفس مُقَدَّماً على جهاد العدو في الخارج، وأصلاً له، فإنه ما لم يجاهد نفسه أولاً لتفعل ما أمرت به، وتترك ما نهيت عنه، ويحاربها فى الله، لم يُمكنه جهاد عدوه في الخارج.
যেহেতু বান্দাহর নাফসের সাথে লড়াই করার একটি ফল হলো বাইরে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'পরিপূর্ণ মুজাহিদ হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করার ব্যাপারে নিজের নাফসের সাথে লড়াই করে। আর পরিপূর্ণ মুহাজির হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত বিষয়াবলি ছেড়ে দেয়।' কাজেই নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ বাইরে শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের ওপর অগ্রগণ্য এবং এর মূল (প্রেরণাদানকারী শক্তি)। যদি বান্দাহ প্রথমে আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ পালনের জন্য নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ ও লড়াই না করে, তবে তার পক্ষে বাইরে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বের হওয়া সম্ভব হবে না।²⁹
জিহাদের মতো হিজরাত প্রসঙ্গেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ ধরনের কথা বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَی اللَّهُ عَنْهُ- ")(পরিপূর্ণ) মুহাজির হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত বিষয়াবলি ছেড়ে দেয়।”³⁰
এক শ্রেণির লোকদের মতে, 'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ' হলো- কৃষ্ণ সাধনা ও চরম ব্রতাচার অর্থাৎ আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে নাফসের প্রয়োজনীয় ও বৈধ চাহিদাগুলো (যেমন- বিয়েশাদী, পানাহার ও বিশ্রাম প্রভৃতি) কে বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ বা ত্যাগ করে নিভৃতে সারাক্ষণ বিভিন্নরূপ 'ইবাদাতের মধ্যে রত থাকা। এতদুদ্দেশ্যে তাঁরা রুচিসম্মত ও পুষ্টিকর খাদ্য ভক্ষণ করেন না, ঠাণ্ডা সুপেয় পানি পান করেন না এবং মাত্রাতিরিক্ত অল্প ভোজন করে থাকেন। তদুপরি তাঁরা স্বাস্থ্যসম্মত পোশাক বর্জন করেন এবং পশমের মোটা ও খসখসে কাপড় পরিধান করেন। কেউ কেউ আবার সংসার-সমাজ ছেড়ে বনেও চলে যান, প্রয়োজনীয় ঘুম ও বিশ্রাম নেন না। তাঁরা এ রূপ কৃষ্ণ সাধনাকে সর্বশ্রেষ্ঠ 'জিহাদ' মনে করেন। বলাই বাহুল্য, 'নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ'-এর এ রীতি ইসলামী তারীকা নয়। এটি 'ইবাদাত ও মুজাহাদার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার নামান্তর, যা অন্যান্য ধর্ম-দর্শন থেকে ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে।"³¹
বস্তুতপক্ষে এরূপ কৃষ্ণ সাধনা ও চরম ব্রতাচার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবা কিরাম ও তাবি'উন (রা.)-এর তারীকা ছিল না। তাঁরা অবশ্যই খাবারের জন্য কিছু না পেলে অভুক্ত থাকতেন। কিন্তু খাবারের জন্য যখন যা পেতেন তা-ই কৃতজ্ঞ চিত্তে খেতেন। যখন যে পোশাক পেতেন তা-ই কৃতজ্ঞতার সাথে ব্যবহার করতেন, ঘর-সংসার করতেন, প্রয়োজনীয় ঘুম ও বিশ্রাম নিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন শ্রেষ্ঠতম যাহিদ (দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত)। কিন্তু তিনি গোস্ত খেতেন ও পছন্দ করতেন, মিষ্টান্ন দ্রব্য ও মধু খেতে ভালোবাসতেন এবং ঠাণ্ডা সুপেয় পানি পান করতেন, যখনই পেতেন ভালো ও সুন্দর পোশাক পরতেন, ঘর-সংসার করতেন, প্রয়োজনীয় ঘুম যেতেন, বিশ্রাম নিতেন। ³² উপরন্তু, সুচারুরূপে সৎ কর্মগুলো সম্পাদন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যও প্রত্যেককেই নিজের স্বাস্থ্য ও শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের প্রতি যত্ন নেয়া এবং তার সাথে সদয় আচরণ করা উচিত। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং সৎকর্ম করো। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত।³³
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নাবী-রাসূলগণকে দুটি নির্দেশ দিয়েছেন। একটি হলো- পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ করা, অপরটি হলো সৎকর্ম সম্পাদন করা। এ দুটি আদেশকে এক সাথে বর্ণনা করার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সৎকর্ম সম্পাদনে পবিত্র ও হালাল খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা ও প্রভাব অপরিসীম। 'উম্মুল মু'মিনীন সাইয়িদা 'আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বিশিষ্ট সাহাবী 'উসমান ইবনু মায'উন (রা.) কে সতর্ক করে বললেন,
فَاتَّقِ اللَّهَ يَا عُثْمَانُ فَإِنْ لأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِضَيْفِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَصُمْ وَأَفْطِرْ وَصَلَّ وَلَمْ . 'উসমান! আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, তোমার ওপর তোমার পরিবারের অধিকার রয়েছে, তোমার মেহমানের অধিকার রয়েছে, এমনকি তোমার ওপর তোমার নিজেরও অধিকার রয়েছে। অতএব, রোযাও রাখো এবং রোযা রাখা ছেড়েও দাও। নামাযও পড়ো এবং ঘুমাও।³⁴
অতএব, যেহেতু নিজের ওপর নিজের, পরিবারের ও অন্যান্যের অধিকার রয়েছে, তাই এসব অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে যাতে কোনোরূপ বিঘ্ন না ঘটে, এ কারণে শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর বিষয়গুলো সঠিক ও যথার্থভাবে গ্রহণ করা এবং ক্ষতিকর সব বিষয় পরিহার করে চলা একান্ত প্রয়োজন।³⁵ হাফিয শামসুদ্দীন আয-যাহাবী [৬৭৩-৭৪৮হি.] (রাহ.) বলেন,
الطريقة المثلي هي المحمدية ، وهو الأخذ من الطيبات ، وتناول الشهوات المباحة من غير إسراف ، فلم يشرع لنا الرهبانية ولا الوصال ولا صوم الدهر والجوع.
সর্বোত্তম রীতি হলো- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের রীতি। আর তা হলো- পবিত্র বস্তুগুলো গ্রহণ করা ও কোনোরূপ অপচয় ব্যতীত বৈধ চাহিদাগুলো পূরণ করা। তিনি আমাদের জন্য বৈরাগ্য চর্চা, ইফতার ব্যতীত কয়েক দিন লাগাতার রোযা রাখা, বছর ধরে রোযা রাখা ও ক্ষুধার্ত থাকা অনুমোদন করেননি।³⁶
টিকাঃ
২৫. সুয়ূতী, আল-জামি 'উস সাগীর, হা. নং: ১২৪৭ (ইবনুন নাজ্জার-এর সূত্রে বর্ণিত)। সুয়ূতী (রাহ.)-এর মতে, হাদীসটি দা'ঈফ। কিন্তু আলবানী (রাহ,)-এর গবেষণা মতে, এ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ওয়া দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, খ. ৫, পৃ. ৪২৬, হা. নং: ১৯৭৯)
২৬. মারওয়াযী, তা'যীমু কাদরিস সালাত, হা. নং: ৬৩৯; সুয়ূতী, আল-জামি'উল সাগীর, হা. নং: ১২৯২ বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ আলবানী (রাহ.)-এর মতে, এ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফুল জামি'ইস সাগীর, হা. নং: ২০০৯)
২৭. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: ফাদা'য়িলুল জিহাদ), হা. নং: ১৬২১; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ২৪; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান (৭৭), হা. নং: ১০৬১১ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-সাহীহ।
২৮. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, খ. ১১, পৃ. ৩৩৮; মুনাভী, ফাইযুল কাদীর, খ. ২, পৃ. ৪০; বাকরী, দালীলুল ফালিহীন, খ. ২, পৃ. ৪৪-৪৫ কারো কারো মতে, নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদের চারটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর হলো- ন্যায়ের প্রতিপালন ও আদেশ দান অর্থাৎ নিজে ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায় মেনে চলবে এবং অপরকে ন্যায় মেনে চলতে আদেশ দেবে। দ্বিতীয় স্তর হলো- অন্যায় থেকে বিরত থাকা ও বাধা দান। অর্থাৎ নিজে ব্যক্তিগত জীবনে অন্যায় থেকে বিরত থাকবে এবং অপরকে অন্যায় থেকে বাধা দেবে। তৃতীয় স্তর হলো- উত্তম ধৈর্য ধারণ করা অর্থাৎ আল্লাহর পথে দাওয়াত দান ও সৎ পথে চলতে গিয়ে যে সকল বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়, সেগুলোর ওপর উত্তমভাবে ধৈর্য ধারণ করা। আর চতুর্থ স্তর হলো- দুরাচারী ও পাপিষ্ঠ লোকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ত্যাগ করা। (মুনাভী, আত-তাইসীরু বি-শারহিল জামি'ইস সাগীর, খ. ১, পৃ. ৯৯৮) কারো মতে, নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদের চারটি স্তরগুলো হলো- ক. নাফসকে দীনের শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করতে বাধ্য করা। খ. নাফসকে দীনের শিক্ষা ও অনুশাসন মেনে চলতে বাধ্য করা। গ. অজ্ঞ ও মুর্খ লোকদের নিকট দীনের শিক্ষা পৌছে দিতে নাফসকে বাধ্য করা। ও ঘ. লোকদেরকে তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানানো এবং তাদের মধ্যে যারা দীনের বিরোধিতা করবে তাদের সাথে লড়াই করা। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, খ. ১১, পৃ. ৩৩৮)
২৯. ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মা'আদ, খ. ৩, পৃ. ৬
৩০. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ১০
৩১. বস্তুতপক্ষে এ কৃষ্ণসাধনা ও চরম ব্রতাচার সনাতন হিন্দু ও খ্রিষ্ট ধর্ম থেকেই ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে। সনাতন হিন্দুধর্মে আত্মশুদ্ধি ও মোক্ষ লাভের উদ্দেশ্যে গৃহ ও সংসার ত্যাগ করে বনে গমন করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এ সময় অনশন, অগ্নি সহযোগে ভোগ্য বস্তু গ্রহণ বর্জন, ফলমূলাদি ভক্ষণ ও ভূমি শয্যায় শয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে সাধন-মার্গে পৌছার চেষ্টা করা হয়। (ভবেশ রায়, সনাতন হিন্দুধর্ম কী এবং কেন, পৃ. ৫৪) এ ধর্ম মতে- ধর্মানুরাগ, প্রজ্ঞা ও স্রষ্টার নৈকট্য লাভ শুধু সভ্যসমাজ ছেড়ে নির্জন তেপান্তরে কালাতিপাতের মাধ্যমেই সম্ভব। সাধু-সন্ন্যাসীরা রূঢ় নিবৃত্তি অবলম্বনের মাধ্যমে তাঁদের জীবনকে কৃষ্ণ সাধন ও চরম ব্রতাচারে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলে। খ্রিষ্ট ধর্মেও সম্পদ উপার্জনকে ঘৃণা করা হয় এবং অনশন, ভোগ্য বস্তু বর্জন, জীর্ণ বস্ত্র পরিধান প্রভৃতির প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়। (মথি, ১৯: ১৬-২৪, লুক, ১৪: ৩৩)
৩২. শাইখ আবুল হাসান 'আলী আল-মাকদিসী [ ৫৪৪ - ৬১১ হি.) (রাহ.) বলেন,
لم ينقل عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه امتنع من طعام لأجل طيبه قط ، بل كان يأكل الحلوى والعسل والبطيخ والرطب. "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এরূপ কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তিনি কেবল সুস্বাদু হবার কারণে কোনো খাবার খেতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। বরং তিনি হালুয়া, মধু, খরমুজ ও তাজা খেজুর প্রভৃতি খেতেন।" (কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৭, পৃ. ১৯৯)
৩৩. আল কোরআন, সূরা আল-মু'মিনূন, ২৩: ৫১
৩৪. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আত-তাতাও'উ), হা. নং: ১৩৭১ এ হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু সুনানি আবী দাউদ, খ. ৫, পৃ. ১১২)
৩৫. সুয়ূতী, আল-আমরু.., পৃ. ২৫
৩৬. যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', খ. ১২, পৃ. ৮৯-৯০ এ বিষয়ে আমি আমার বিদ'আত ৫ম খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইনশা আল্লাহ।
📄 তাযকিয়াতুন নাফসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
যদি কেউ কামনা করে যে, সে আল্লাহর একান্ত খাঁটি ও প্রিয় বান্দাহতে পরিণত হবে এবং তার নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হবে, তা হলে তাকে অবশ্যই তার নাফসের মন্দপ্রবণতাগুলো দূরীভূত করতে হবে এবং তার যাবতীয় অশিষ্ট চরিত্রসমূহ সংশোধন করতে হবে। তবেই তার মধ্যে আল্লাহর প্রতি প্রবল আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়ে একটি নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং তার আচার-আচরণ হবে অত্যন্ত পরিশীলিত ও মার্জিত। এতে যেমন তার পার্থিব জীবন সুন্দর ও সুখ-সাচ্ছন্দ্যময় হবে, তেমনি তার পরকালীন জীবনও অত্যন্ত সুখ ও শান্তিময় হবে। নুবুওয়াতের চারটি মহান কর্তব্যের মধ্যে আত্মার পরিশুদ্ধকরণ অন্যতম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَتُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ "তিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন।”³⁷
কাজেই নাফস পরিশুদ্ধ করা এবং এ উদ্দেশ্যে তার ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা দীনের একটি অতি অপরিহার্য কর্তব্য ও সর্বাপেক্ষা বড় 'জিহাদ'। ইসলামের সকল 'আলিমের মতে, নাফস পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা ফারযে 'আইন। কেননা নাফস অপরিশুদ্ধ ও কলুষিত হলে বান্দাহর কোনো 'আমালই নির্দোষ ও পবিত্র হবে না। এরূপ অবস্থায় 'আমাল করার অর্থ হলো ময়লাযুক্ত শরীরে সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করার মতোই। ধরুন, সালাত একটি শ্রেষ্ঠ 'ইবাদাত। কিন্তু কেউ যদি এ সালাত লোকদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে আদায় করে, তবে তার এ 'ইবাদাত কবূল তো হবেই না; বরং তা ছোট শিরকের পর্যায়ভুক্ত হবে এবং এ জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর রাস্তায় শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা একটি শ্রেষ্ঠ 'ইবাদাত। কিন্তু কেউ যদি এ জিহাদ সুখ্যাতি অর্জন কিংবা গানীমাত লাভের উদ্দেশ্য নিয়ে করে, তার এ প্রাণপণ সংগ্রামও কবুল হবে না; বরং তা ছোট শিরকের পর্যায়ভুক্ত হবে এবং এ জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত হবে। সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লালাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا قَالَ قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ. قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ جَرِيءٌ. فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أَمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النار ....
'কিয়ামাতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে (দৃশ্যত আল্লাহর পথে লড়াই করতে করতে) শাহাদাত বরণ করেছিল। তাকে (বিচারের জন্য) হাযির করা হবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে তাঁর প্রদত্ত নি'মাতসমূহের কথা জানিয়ে দেবেন। লোকটি তা স্বীকার করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এর বিনিময়স্বরূপ তুমি কী 'আমাল করেছিলে? লোকটি জবাব দেবে, আমি আপনার পথে লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেছি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো; বরং তুমি লড়াই করেছিলে বীররূপে সুখ্যাতি লাভ করার উদ্দেশ্যে। আর (দুনিয়ায়) তুমি সেই খিতাব পেয়ে গেছো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে তাকে উপুড় করে টেনে-হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ³⁸
মোট কথা, নাফসের পরিশুদ্ধি ছাড়া কারো পক্ষে সত্যিকার অর্থে দীনের বিধি- বিধান প্রতিপালন করা, দীনের ওপর অটল ও অবিচল থাকা এবং আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ করা সম্ভব নয়। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় নাফসের মন্দ প্রবণতা দূরীকরণ ও তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও প্রায়ই আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁর নাফসের পরিশুদ্ধি কামনা করে দু'আ করতেন। তিনি বলতেন,
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسي تَقْوَاهَا وَزَكَهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا.
হে আল্লাহ! আমার নাফসে সংযম শক্তি দান করুন! তাকে পরিশুদ্ধ করুন! আপনিই হলেন নাফসের সর্বোত্তম পরিশুদ্ধি দানকারী। আপনিই এর মালিক ও অভিভাবক। ³⁹
কাজেই যদি কারো নাফসের মন্দ প্রবণতা দূরীভূত করা না হয় এবং তার নাফসের মধ্যে পশুত্বসুলভ ভাব ও চরিত্র অবশিষ্ট থাকে, তবে তার পক্ষে যথার্থরূপে দীনের বিধি-বিধান প্রতিপালন তো সম্ভবই নয়; বরং এ আশঙ্কাও বিদ্যমান রয়েছে, সে যতটুকু দীনের বিধিবিধান পালন করে, তা পণ্ডশ্রম হবে ও বিফলে যাবে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا . وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا - "যে নিজের নাফসকে পরিশুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। আর যে নিজের নাফসকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।"⁴⁰ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.) বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّىٰ نَفْسَهُ فَأَصْلَحَهَا وَحَمَلَهَا عَلَىٰ طَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا قَالَ : مَنْ أَهْلَكَهَا وَأَضَلَّهَا وَحَمَلَهَا عَلَىٰ مَعْصِيَةِ اللَّهِ.
যে নিজের নাফসকে পরিশুদ্ধ ও সংশোধন করতে পেরেছে এবং তাকে আল্লাহর 'ইবাদাতে নিয়োজিত করতে পেরেছে, সে-ই সফল হয়েছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নাফসকে ধ্বংস করলো, বিপথগামী করলো এবং তাকে আল্লাহর নাফরমানীর কাজে নিয়োজিত করলো, সে ব্যর্থ মনোরথ হলো। ⁴¹
অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ ۚ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ যে ব্যক্তি নিজের প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং নাফসকে কুপ্রবণতা থেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত। ⁴²
টিকাঃ
৩৭. আল-কুর-আন, সূরা আলু-'ইমরান, ৩: ১৬৪; সূরা আল-জুমু'আহ, ৬২: ২ আরো দেখুন, সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১২৯
৩৮. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল ইমারাহ), হা. নং: ৫০৭২
৩৯. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যিকর...), হা. নং: ৭০৮১
৪০. আল কোরআন, সূরা আশ্ শাম্স, ৯১: ৯-১০ আরো দ্রষ্টব্য, আল কোরআন, সূরা আল-আ'লা, ৮৭: ১৪-১৫