📄 ভূমিকা
নাফসের পরিশুদ্ধি দীনের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাফস পরিশুদ্ধ হওয়া ছাড়া মানুষের ঈমান ও ইসলাম কখনো বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ হয় না। উল্লেখ্য যে, মানুষের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো বাহ্যিক, অপরটি হলো অভ্যন্তরীণ বা আত্মিক। ইসলাম যেমন মানুষের বাহ্যিক দিককে পূত-পবিত্র করতে চায়, তেমনি তার ভেতরের দিকটিকেও সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত ও সুন্দর করতে চায়। মানুষের এ অভ্যন্তরীণ অর্থাৎ আত্মিক দিকটির পরিশুদ্ধিকেই কোরআনের ভাষায় 'তাযকিয়াহ' বলা হয়। বস্তুত একজন মানুষ তার নাফসকে পবিত্রকরণ ও মনের কলুষ দূরীকরণের মাধ্যমে নিজের আবেগ-অনুভূতিকে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে এমনভাবে নিয়োজিত করতে পারে যে, দীনের বাহ্যিক 'ইবাদাতসমূহ স্বয়ং তার আবেগ ও নাফসের দাবিতে রূপায়িত হয়ে যাবে। যদি কেউ বাহ্যিক ও প্রচলিত নিয়মানুযায়ী সালাত, সাওম, যাকাত ও হাজ্জ পালন করে; কিন্তু তার নাফস পবিত্র ও পরিশুদ্ধ না হয়, তা হলে তার সে 'আমাল ঐ ফুলের মতো, যার রং সুন্দর ও আকর্ষণীয়; কিন্তু তাতে কোনো সুঘ্রাণ নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে যদি কোনো ব্যক্তিকে পরীক্ষা করতে হয়, তা হলে অবশ্য দেখতে হবে যে, তার অন্তর কতোখানি পবিত্র ও কলুষমুক্ত। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাহর অন্তরকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন; বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে নয়। সাইয়িদুনা আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى أَجْسَادِكُمْ، وَلَا إِلَى صُوَرِكُمْ؛ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ.
"আল্লাহ তা'আলা তোমাদের দেহ এবং তোমাদের বাহ্যিক রূপের দিকে তাকাবেন না; বরং তোমাদের অন্তরের দিকেই তাকাবেন।" (মুসলিম, আস-সাহীহ, কিতাবুল বিরর.., হা.নং: ৪৬৫০)
নুবুওয়াতের চারটি মহান কর্তব্যের মধ্যে আত্মার পরিশুদ্ধকরণ অন্যতম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ ويُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই মু'মিনদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝ থেকে একজন ব্যক্তিকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর কিতাবের আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন, অথচ তারা ইতঃপূর্বে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিল। (আল কোরআন, সূরা আলে 'ইমরান, ৩: ১৬৪)
কাজেই নাফস পরিশুদ্ধ করা এবং এ উদ্দেশ্যে তার ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা দীনের একটি অতি অপরিহার্য কর্তব্য ও সর্বাপেক্ষা বড় জিহাদ। ইসলামের সকল 'আলিমের মতে, নাফস পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা ফারযে 'আইন। কেননা, নাফস ত্রুটিযুক্ত ও কলুষিত হলে যেমন বান্দাহর কোনো 'আমালই নির্দোষ ও পবিত্র হতে পারে না, তেমনি নাফসের পরিশুদ্ধি ছাড়া কারো পক্ষে সত্যিকার অর্থে ঈমানের স্বাদ লাভ করা, দীনের বিধি-বিধান প্রতিপালন করা, দীনের ওপর অটল ও অবিচল থাকা এবং আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ করা সম্ভব নয়। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় নাফসের মন্দ প্রবণতাসমূহ দূরীকরণ ও তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর কেউ যদি নাফস পরিশুদ্ধ করতে সচেষ্ট না হয়, তার ব্যাপারেও চরম সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। সাইয়িদুনা নু'মান ইবনু বাশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَلَا وَإِنَّ فِي الْحَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْحَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْحَسَدُ كُلُّهُ أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ.
নিশ্চয়ই শরীরে গোশতের একটি টুকরো আছে, যা ঠিক হয়ে গেলে পুরো শরীর ঠিক হয়ে যায়। আর তা নষ্ট হয়ে গেলে পুরো শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায়। মনে রেখো! সেই টুকরোটি হলো কালব (অন্তর)। (বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল ঈমান, হা.নং: ৫২; মুসলিম, আস-সাহীহ, কিতাবুল মুসাকাত, হা.নং: ৪১৭৮)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো শরীরের 'আমালের ইসলাহ ও সংশোধনকে অন্তরের ইসলাহ ও সংশোধনের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, অন্তরে ত্রুটি দেখা দিলে পুরো শরীরের 'আমালের মধ্যেও ত্রুটি ও বিপর্যয় দেখা দেয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম [৬৯১-৭৫১ হি.] (রাহ.) বলেন,
إن الله على العبد عبوديتين : عبودية باطنة ، وعبودية ظاهرة فله على قلبه عبودية ، وعلى لسانه وجوارحه عبودية ، فقيامه بصورة العبودية الظاهرة مع تعريه عن حقيقة العبودية الباطنة مما لا يقربه إلى ربه ، ولا يوجد له الثواب وقبول عمله .
বান্দাহর ওপর আল্লাহ তা'আলার দু প্রকারের 'ইবাদাতের দায়িত্ব রয়েছে। এক. বাতিনী (অপ্রকাশ্য) 'ইবাদাত ও দুই. যাহিরী (প্রকাশ্য) 'ইবাদাত। বান্দাহকে যেমন তার কালবের মাধ্যমে আল্লাহর 'ইবাদাত করতে হয়, তেমনি তাকে তার জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যোগেও তাঁর 'ইবাদাত করতে হয়। বাতিনী 'ইবাদাতের সারবিহীন 'ইবাদাতের বাহ্যিক রূপের চর্চা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সহায়ক নয়। তদুপরি এ জাতীয় 'ইবাদাতে সাওয়াব পাওয়া যাবে না এবং এ 'আমাল কবুল ও হবে না। (ইবনুল কাইয়্যিম, বাদা'য়িউল ফাওয়া'য়িদ, খ. ৩, পৃ. ৭১০)
'তাযকিয়াতুন নাফস'-এর যথার্থ ও বিশুদ্ধ পথ কী?- এ সম্পর্কে প্রত্যেক মু'মিনেরই স্বচ্ছ ধারণা থাকা অত্যাবশ্যক। কারণ, এ গুরু কাজের সঠিক পথ জানা না থাকলে পদে পদে বিপথগামী ও সত্যচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কার্যতও আমরা এ বিষয়ে অনেকের মধ্যে বহু বিভ্রান্তি লক্ষ্য করি। আমরা তাদেরকে ভুল পথে চলতে ও পরিচালিত হতে দেখতে পাই। তারা নাফসের পরিশুদ্ধি ও উন্নয়নের নামে তাদের মনগড়া আবেগাশ্রিত ও প্রবৃত্তিতাড়িত এমন অনেক 'আমাল করে, যা একদিকে কোরআন ও হাদীসের ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও পরিচ্ছন্ন জীবন ব্যবস্থার পরিপন্থী, অপরদিকে তা তাদের নাফসের পরিশুদ্ধির জন্য যথার্থ ও কার্যকর ব্যবস্থাও নয়। ফলে দেখা যায় যে, এ সব 'আমালের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে তাদের নাফস পরিশুদ্ধ তো হয় না; বরং উল্টো তাদের নাফস আরো কলুষিত ও রোগাক্রান্ত হয়, সুন্দর ও সুকুমার বৃত্তিসমূহ বিকশিত হবার পরিবর্তে মন্দ ও অশিষ্ট বৃত্তিসমূহই বিকাশ লাভ করে। বিশিষ্ট সূফী শাইখ 'আলী আল-হাজবিরী [৪০০-৪৬৫ হি.] (রাহ.) অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন,
এ যুগের কিছু কিছু 'আলিম পর্যন্ত সত্যপথ থেকে বিমুখ থাকে। প্রভাব-প্রতিপত্তির নাম সম্মান, অহঙ্কারের নাম 'ইলম, লোক দেখানো 'ইবাদাতের নাম তাকওয়া, হিংসা ত্যাগ করার পরিবর্তে অন্তরে গোপন রাখার নাম সহনশীলতা, তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ ও হীনমন্যতার সাথে সংগ্রাম করার নাম মহত্ত্ব, মুখে যা আসে তা বলে দেওয়ার নাম মা'রিফাত, ব্যক্তিস্বার্থের নাম আল্লাহপ্রেম, নাস্তিকতার নাম দরবেশী, আল্লাহকে অস্বীকার করার নাম ফানা এবং নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শারী'আতকে পরিত্যাগ করার নাম তারীকাত রেখেছে। (হাজবিরী, কাশফুল মাহজুব, পৃ.১৯-২০)
বিশিষ্ট সূফী আবুল 'আব্বাস আদ-দীনাউরী (রাহ.) বলেন, نَقَضُوا أَرْكَانَ التَّصَوُّفِ، وَهَدَمُوا سَبِيْلَهَا، وَغَيَّرُوا مَعَانِيهَا بِأَسَامِي أَحْدَثُوهَا: سَمُّوا الطَّمْعَ زِيَادَةً، وَسُوْءَ الْأَدَبِ إِخْلَاصاً وَالْخُرُوجَ عَنِ الْحَقِّ شَطْحَا وَالتَّلَدُّذَ بِالْمَذْمُومِ طَيِّبَةً، وَاتَّبَاعَ الْهَوَى ابْتِلَاء وَالرُّجُوعَ إِلَى الدُّنْيَا وَصَلَا، وَسُوءَ الْخُلُقِ صَوْلَةً، وَالْبَحْلَ جَلَادَةً وَالسُّوَالَ عَمَلاً وَبَدَاءَةَ النِّسَانِ مَلَامَةُ، وَمَا هَذَا كَانَ طَرِيقَ الْقَوْمِ.
তারা তাসাউফের স্তম্ভগুলো ভেঙ্গে ফেলেছে, এর রাস্তা নষ্ট করে দিয়েছে এবং এর নানা বিষয়কে নতুন নতুন নাম দিয়ে পরিবর্তন করে ফেলেছে। যেমন- তারা পার্থিব লালসাকে অতিরিক্ত চাহিদা, বে-আদাবীকে ইখলাস, সত্যচ্যুত হওয়াকে বিশেষ অবস্থা, গর্হিত বিষয়ে (যেমন- গান বাজনা, নর্তন-কুর্দনে) মত্ত হওয়াকে পবিত্র স্বাদ আস্বাদন, প্রবৃত্তির অনুসরণকে পরীক্ষা, দুনিয়ার প্রতি রুজু হওয়াকে মিলন, বদ চরিত্রকে পরাক্রমতা, কার্পণ্যকে সাহসিকতা, ভিক্ষাবৃত্তিকে 'আমাল ও অশ্লীল কথাবার্তাকে তিরস্কার নাম রেখেছে। এটা সূফীদের তারীকা ছিল না। (কুশাইরী, আর-রিসালাহ, পৃ.২৯; ইবনুল জাওযী, তালবীসু ইবলীস, পৃ.৩০৯)
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ [৬৬১-৭২৮ হি.] (রাহ.) বলেন, وَلِهَذَا كَثرَ فِي الْمُتَفَقَّهَةِ مَنْ يَنْحَرِفُ عَنْ طَاعَاتِ الْقَلْبِ وَعِبَادَاتِهِ : مِنْ الْإِخْلَاصِ لِلَّهِ وَالتَّوَكَّلِ عَلَيْهِ وَالْمَحَبَّةِ لَهُ ، وَالْخَشْيَةِ لَهُ وَنَحْوِ ذَلِكَ . كَثُرَ فِي الْمُتَفَقِّرَةِ وَالْمُتَصَوِّفَةِ مَنْ يَنْحَرِفُ عَنْ الطَّاعَاتِ الشَّرْعِيَّةِ .... وَهَؤُلَاءِ الْأَقْسَامُ الثَّلَاثَةُ إِذَا كَانُوا مُؤْمِنِينَ مُسْلِمِينَ ؛ فَقَدْ شَابُوا الْإِسْلَامَ إِمَّا بِيَهُودِيَّةٍ وَإِمَّا بِنَصْرَانِيَّةٍ وَاِمَّا بصَابِيَّةِ ؛ إِذَا كَانَ مَا انْحَرَفُوا اِلَيْهِ مُبَدَّلًا مَنْسُوحًا وَإِنْ كَانَ أَصْلُهُ مَشْرُوعًا فموسوية أو عيسوية .
... ফাকীহগণের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা কালবের 'ইবাদাত-বন্দেগী (অর্থাৎ ইখলাস, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, তাঁর ভালোবাসা ও ভয় প্রভৃতি) ব্যাপারে উদাসীন, সত্যচুত। আবার ফকীর-দরবেশ ও সূফীগণের মধ্যেও এমন অনেক রয়েছেন, যারা শারী'আতের নির্দেশাবলির আনুগত্য ছেড়ে অন্য 'আমালের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।... বস্তুতপক্ষে এ তিন প্রকারের লোক যদি সত্যিই মু'মিন-মুসলিম হন, তবে তাঁরা অবশ্যই ইসলামকে হয়তো ইয়াহুদী ধর্মের সাথে অথবা খ্রিস্টান ধর্মের সাথে বা সাবি'য়াহ ধর্মমতের সাথে মিশ্রিত করে ফেলেছে। আর যে সব 'আমালের দিকে তাঁরা ঝুঁকে পড়েছেন, যদিও তা মূলগত বিচারে বিধিবদ্ধ ছিল; কিন্তু সেগুলো পরিবর্তিত ও রহিত হয়ে গেছে, তদুপরি সেগুলো হলো মূসা 'আলাইহিস সালাম কিংবা 'ঈসা 'আলাইহিস সালাম-এর শারী'আতেরই 'আমাল; (ইসলামী শারী'আতের 'আমাল নয়।) (ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু'উল ফাতাওয়া, খ. ২০, পৃ. ৭৪)
এটা অত্যন্ত ভাবনার বিষয় যে, আমাদের অনেকেই আন্তরিকভাবে আত্মশুদ্ধি কামনা করে এবং এ পথে চেষ্টাও করছে; কিন্তু সঠিক পথ জানা না থাকার কারণে তাদের কেউ কেউ পথচ্যুত হয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ যদিও সম্পূর্ণ পথচ্যুত হচ্ছে না; তবুও আসল পথ না জানার কারণে অনেক পেরেশানী উঠাচ্ছে এবং কষ্টের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। জনৈক কবি কতোই চমৎকার বলেছেন, يك سبد بر نان ترا بر فوق سر تو همي جون لب نان در بدر تا بزانوئے میاں جوئے آب وز عطش وزجوع کشتستی خراب
টুকরী ভরা রুটি তোমার মাথার ওপর থাকা সত্ত্বেও (না জানার কারণে) তুমি সামান্য এক টুকরো রুটির জন্য দ্বারে দ্বারে ফিরতেছো। হাঁটু পর্যন্ত পানির মধ্যে রয়েছো, তা সত্ত্বেও (না জানার কারণে) পিপাসায় ছটফট করতেছো। অর্থাৎ অনেক সময় আসল পথ না জানা থাকলে উদ্দেশ্য সঠিক হওয়া সত্ত্বেও অনেক পেরেশানী ও কষ্ট পেতে হয়। (থানবী, কাছদুছ ছবীল, পৃ. ২-৩)
আমি এ গ্রন্থটিতে আমার সামান্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বক্ষ্যমাণ বিষয়ে গবেষণা করে যতটুকু সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি, তা-ই কেবল 'ইলমের প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বানুভূতি থেকেই তোলে ধরতে চেষ্টা করবো এবং কোরআন ও হাদীসের আলোকে 'তাযকিয়াতুন নাফস' বলতে কী বোঝায়, নাফস ও কালবের ব্যাধি ও ত্রুটিগুলো কী কী এবং এগুলো দূরীভূত করার কী কী পথ রয়েছে? প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করতে প্রয়াস পাবো, ইনশা আল্লাহ। আমার এ প্রয়াস কতোখানি সফল হয়েছে, তা পাঠকসমাজই বিচার করবেন। যদি আমার এ প্রয়াস আত্মশুদ্ধি সম্পর্কে বিশুদ্ধ ধারণা প্রচারে সামান্য কাজও করতে সক্ষম হয়, তা হলে আমার শ্রম সার্থক মনে করবো।
আমি অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি যে, বক্ষ্যমাণ বিষয়ে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অতি অল্প। কাজেই আমার কথার মধ্যে ভুল-ত্রুটি ও চিন্তার অপরিপক্কতা থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক। মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে এ প্রার্থনা করি, যদি আমার কথায় কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে, তিনি যেন আমাকে তা ক্ষমা করে দেন এবং সংশোধনের সুযোগ দান করেন। বিজ্ঞ পাঠকবৃন্দের কাছে কোনো ভুল-ত্রুটি ধরা পড়লে তা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
সকলের নিকট আমার অনুরোধ রইলো, কেউ যেন আমার উক্ত কথার এরূপ অর্থ বের না করে যে, 'আমি দাবি করছি, আমার নাফস পূত-পবিত্র এবং আমি আত্মিক ব্যাধিসমূহ থেকে মুক্ত।' বরং আমি মনে করি যে, আমার নাফসই সবচেয়ে বেশি কলুষিত ও ব্যাধিগ্রস্থ। ﴿ وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةُ بِالسُّوءِ ﴾
" আমি নিজের নাফসের পবিত্রতা দাবি করছি না। নিশ্চয়ই নাফস স্বভাবতই মন্দ কর্মপ্রবণ।" (আল কোরআন, সূরা ইউসূফ, ১২ : ৫৩) আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং সকলকে আত্মশুদ্ধির তাওফীক দান করুন! আমীন! إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِالله. "আমি শুধু আমার সামর্থ্যানুযায়ী সংশোধন করতে চাই। আল্লাহই কেবল তাওফীকদাতা।" (আল কোরআন, সূরা হুদ, ১১: ৮৮)
বইটি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করায় আমি বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের বন্ধুবর পরিচালক ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম ভূঁইয়াকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দু' জাহানে উত্তম বিনিময় দান করুন! মহান আল্লাহ আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াসকে কবুল করুন! এর অসীলায় আমাকে, আমার মাতা-পিতা, পরিবার, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং এ বই লিখতে ও প্রকাশ করতে যারা নিষ্ঠার সাথে আমাকে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সকলকে দুনিয়া ও আখিরাতে অসংখ্য কল্যাণ দান করুন! আমীন !!
ড. আহমদ আলী ০১. ০৬. ২০১৫
📄 সাহীহ দীনী 'ইলম অর্জন ও তার চর্চা
নাফসের পরিশুদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো সাহীহ দীনী 'ইলম অর্জন। বলাই বাহুল্য, 'ইলম ও 'আমালের সম্পর্ক পরস্পর অবিচ্ছিন্ন। বলা হয় যে, 'ইলম হলো বীজ এবং আমাল হলো তার ফসল। ৭২ মুজাহাদার ক্ষেত্রে একজন মু'মিনকে তার 'ইবাদাত ও 'আমালসমূহ সম্পর্কে বিশুদ্ধ 'ইলম রাখতে হবে। 'ইলম ব্যতীত মুজাহাদার কোনো কাজই সঠিক ও সুচারুরূপে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। আল্লাহর মা'রিফাত ও সন্তুষ্টি লাভ তো অনেক দূরের ব্যাপার। বলা হয় যে, الْمُتَعْبُدُ بِلَا فِقْهِ كَالْحِمَارِ فِي الطَّاحُونَةِ -"দীনের সঠিক ও ব্যাপক 'ইলম ব্যতীত 'ইবাদাতকারী কলুর গাধার মতো।”৭৩ এ কথা থেকে জানা যায়, যে ব্যক্তি সাহীহ 'ইলম ব্যতীত 'ইবাদাত করে, বস্তুতপক্ষে তার পক্ষে একজন সত্যিকার 'আবিদ হওয়া সম্ভবপর নয়। কেননা সাহীহ 'ইলমের মাধ্যমেই কেবল বিশুদ্ধ তরীকায় 'ইবাদাত ও সাধনা করার পথ জানা যায়। যদি কারো সাহীহ 'ইলম না থাকে, তবে সম্ভাবনা রয়েছে যে, তার সাধনা কোরআন ও হাদীস সমর্থিত তরীকায় সম্পাদিত না হবার কারণে কিংবা কোনো অন্তর্নিহিত ত্রুটির কারণে বিফলে যাবে। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের নানা জায়গায় 'ইলম অর্জন ও চর্চার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মহানাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর আল্লাহ তা'আলার অবতীর্ণ প্রথম বাণী ছিল-
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ . اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ . الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ، عَلْمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
পড়ো তোমার রাব্বের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে মানুষকে। পড়ো! তোমার প্রভু অতীব দয়াময়। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে সে সব শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানতো না। ৭৪
এখানে আল্লাহ তা'আলা অন্য কোন কাজের কথা না বলে প্রথমেই পড়ার জন্য পর পর দু বার নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশের গুরুত্ব মানুষকে অনুধাবন করতে হবে, কেন আল্লাহ তা'আলা পড়ার প্রতি এতো গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রকৃত মু'মিন হতে হলে এবং মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করতে হলে অবশ্যই তাকে 'ইলম অর্জন করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ -"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল 'আলিমরাই তাঁকে ভয় করে থাকেন।” ৭৫
বলাই বাহুল্য, আল্লাহর ভয়ই হলো বান্দাহর 'আমালের পেছনে একটি প্রধান প্রেরণাদায়ক শক্তি। ৭৬ এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, এ ভয় কেবল 'ইলমের মাধ্যমেই অর্জিত হয়ে থাকে। তদুপরি ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য লাভ করতে হলেও 'ইলম অর্জন ছাড়া বিকল্প নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ -"যারা জানে এবং যারা জানে না এ দু সম্প্রদায় কি সমান?" ৭৭ অর্থাৎ শিক্ষিত আর অশিক্ষিত কখনো সমান হতে পারে না। এ দু' শ্রেণির মধ্যে আল্লাহ তা'আলা পৃথক সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। একই কথা আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে এভাবে বর্ণনা করেছেন, ﴾يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتِ face -"তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের মর্যাদা সমুন্নত করে দিবেন।” ৭৮ পবিত্র কোরআনে যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নামাযের তাগিদ এসেছে প্রায় ৮২ বার,৭৯ সেখানে জ্ঞান- বিজ্ঞান চর্চা সম্পর্কে বিভিন্নভাবে অনুপ্রেরণা দেয়া হয়েছে শতাধিক বার। আমাদের প্রিয় নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'ইলম অর্জনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই নির্দেশ দিয়েছেন,.طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ -"জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফারয।”৮০ এ কথা থেকে জানা যায় যে, যে মুসলিম 'ইলম অর্জন করছে না, সে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অমান্য করে চলছে।
বলাই বাহুল্য, ইসলাম 'ইলম চর্চাকে নাফল 'ইবাদাতের ওপরে স্থান দিয়েছে। একটি হাদীসে এভাবে বলা হয়েছে যে, تَدَارُسُ الْعِلْمِ سَاعَةٌ مِنَ اللَّيْلِ خَيْرٌ مِنْ إحْيَائِهَا -"রাতে এক ঘণ্টা জ্ঞান চর্চা করা রাত জেগে 'ইবাদাত করার চাইতে উত্তম।”৮১ অন্য এক হাদীসে রয়েছে, مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ الْعِلْمِ كَانَ فِي سَبِيلِ الله حتى يرجع -"যে ব্যক্তি শিক্ষার জন্য ঘর থেকে বের হয় সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর পথেই থাকে।”৮২ ইসলাম এখানেই ক্ষান্ত হয় নি; ইসলামে 'ইলম চর্চার মাজলিসকে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদাজনক আসন দেয়া হয়েছে। 'ইলম চর্চার মাজলিসকে 'বেহেশতী উদ্যান' বলে অভিহিত করা হয়েছে।৮৩
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধুমাত্র 'ইলম চর্চার নির্দেশ দিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি; শিক্ষার ওপর তিনি যে কতো গুরুত্ব প্রদান করতেন, তা বাদরের যুদ্ধে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ নির্ধারণে উপলব্ধি করা যায়। তিনি প্রত্যেক অসচ্ছল শিক্ষিত যুদ্ধবন্দীর মুক্তিপণ হিসেবে ১০ জন মুসলিম বালকের লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্ব নির্ধারণ করেন। ৮৪ লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, মুসলিমদের আর্থিক অনটনের মুহূর্তে মোটা অংকের মুক্তিপণ নিয়ে যুদ্ধ বন্দীদেরকে মুক্ত করে দেয়াই ছিল স্বাভাবিক যুক্তির চাহিদা। কিন্তু বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক অর্থের লোভে তা করেননি; বরং জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার মহান মানসে চরম শত্রুদেরকেও শিক্ষকের মতো সম্মানজনক মর্যাদার আসনে সমাসীন করতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধও করলেন না। হিজরাতের পূর্বে যাইদ ইবন আরকাম (রা.)-এর বাড়িতে তিনি সর্বপ্রথম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার দায়িত্বে ছিলেন। হিজরাতের পর তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে মাসজিদে নাবাবীসহ মাদীনার অন্য নয়টি মাসজিদে নিয়মিত শিক্ষা প্রদানের সুবন্দোবস্ত করা হয়। ৮৫ 'ইলম বিস্তারের ক্ষেত্রে নাবীজী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অসাধারণ ভূমিকার ফলেই চরম মুর্খ ও বর্বর আরব জাতির মাঝে 'ইলম অর্জন ও চর্চার প্রতি এতো অধিক অনুরাগ সৃষ্টি হয় যে, অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে আরবগণ শিক্ষার আলোতে উদ্ভাসিত হয়েই একদিকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাহতে পরিণত হন এবং অপরদিকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হতে সক্ষম হন।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলামে শিক্ষার গণ্ডী কেবল দীনী শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার পাশাপাশি পার্থিব জীবনের প্রয়োজনে যত প্রকারের বিদ্যা শিক্ষা করতে হয় তাও অর্জন করতে হবে। বৈচিত্রময় প্রকৃতির গুপ্ত তত্ত্ব ও তথ্য আবিষ্কার করে তা মানব কল্যাণে ব্যবহার করার প্রেরণা যুগিয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন।৮৬ সুতরাং প্রকৃতি ও সৃষ্টজগত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে তার মাহাত্ম্য সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং মানুষের কল্যাণে তা ব্যবহার করা একটি মহৎ উচ্চ পর্যায়ের 'ইবাদাতও বটে। তবে এ সব 'ইলম অর্জন করা যেমন প্রত্যেক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি প্রত্যেকের জন্য তা ফারয ও নয়। কিন্তু 'আকীদা-বিশ্বাস, 'ইবাদাত, লেনদেন, আখলাক ও ব্যবহারিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান, যা নাফসের পরিশুদ্ধি ও মুজাহাদার জন্য একান্ত প্রয়োজন, তা অর্জন ও চর্চা করা প্রত্যেকের জন্য ফারয। এ 'ইলম ছাড়া কোনো 'আমালই উপকারী হবে না। এ 'ইলম অর্জন করা ব্যতীত কাউকে 'আলিম, যাহিদ বা সূফী বলে আখ্যায়িত করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি কেউ নিজেকে 'আলিম, যাহিদ বা সূফী বলে পরিচয় দেয়াও সমীচীন নয়।
এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, শুধু দীনী 'ইলমই মানুষের হিদায়াতের জন্য যথেষ্ট নয়। যুগে যুগে আমরা অনেক খ্যাতিমান 'আলিমকেও বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হতে দেখতে পাই। বস্তুতপক্ষে দীনী 'ইলম হলো হিদায়াত লাভের একটি প্রধান মাধ্যম মাত্র। অর্থাৎ তা কেবল সঠিক পথপ্রাপ্তিতে সাহায্যই করতে পারে। এ কারণে হিদায়াত অনুসন্ধানকারীদের জন্য এ 'ইলম অর্জন করা অপরিহার্য বটে; তবে আল্লাহ তা'আলার করুণা ও দয়ায় হিদায়াত লাভ করা যায়। এ জন্য প্রয়োজন অন্তরের সদিচ্ছা ও প্রবল আগ্রহ। এ কারণে 'ইলম অর্জনের সাথে সাথে প্রত্যেককেই অতি বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে এবং সেই সাথে হিদায়াত অর্জন ও ঐ পথে অবিচল থাকার জন্য 'আকীদা ও 'আমাল পরিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে নিরন্তর প্রচেষ্টা (মুজাহাদাহ) চালাতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَالَّذِينَ جَاهَدُوا Galice to a fre " - فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ সাধনা করে, আমি তাদেরকে অবশ্যই আমাকে পাওয়ার রাস্তাসমূহ প্রদর্শন করবো। আর আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মশীল লোকদের সাথেই রয়েছেন। "৮৭ এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর পথ পাওয়ার জন্য কেবল 'ইলমই যথেষ্ট নয়; বরং 'ইলমের সাথে মুজাহাদারও প্রয়োজন রয়েছে। কাজেই যে 'ইলমের সাথে মুজাহাদা নেই, সে 'ইলম উপকারী তো নয়ই; বরং তা আল্লাহ তা'আলার রোষের কারণও হতে পারে। এ প্রকারের 'আলিম ও শাইখদের থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন। শাইখ ইয়াহইয়া ইবনু মু'আয [মৃ.২৫৮ হি.] (রাহ.) বলেন,
اجتنبت صحبة ثلاثة أصناف من الناس : العلماء الغافلين، والقراء / الفقراء المداهنين، والمتصوفة الجاهلين.
আমি তিন প্রকারের লোকের সংশ্রব থেকে দূরে থাকি। এক. গাফিল 'আলিম, দুই. তোষমুদে কারী/দরবেশ ও তিন. জাহিল সূফী।৮৮
গাফিল 'আলিম ও তোষমুদে কারী বা দরবেশ হলো এমন ব্যক্তিরা, যাদের মূল উদ্দেশ্য হলো পার্থিব প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-সম্মান ও ধন-সম্পদ। তারা যালিম ও স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহদের দরবারে যাতায়াত করে, আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের নিকট সম্মান ও 'ইযযাত আশা করে এবং এ লক্ষ্যে তারা তাদের নিজেদের 'ইলম এবং নিজেদের 'আলিমানা ও ফকিরানা বেশভূষাকে ব্যবহার করে। কাদী আবুল হাসান 'আলী আল-জুরজানী (মৃ.৩৯২ হি.] (রাহ.) 'আলিমগণের এ বীভৎস চরিত্র তাঁর নিম্নের দুটি চরণে অতীব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেন,
... بدا طمع صيرته لي سلما و لم أقض حق العلم إن كان كلما . الأخدم من لاقيت لكن لأخدما. و لم أبتذل في خدمة العلم مهجتي .
আমি 'ইলমের দাবি পূরণ করিনি। বরঞ্চ যখনই কোনো লোভ-লালসার উদয় হয়েছে, তখন তা অর্জনের জন্য আমি তাকে সিঁড়িতে পরিণত করেছি। 'ইলমের সেবায় আমি আত্মনিয়োগ করিনি। যাদের সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে তাদের সেবা তো করিনি; বরঞ্চ আমি তাদের সেবা লাভের জন্য 'ইলমকে ব্যবহার করেছি। ৮৯
জাহিল সূফী হলো ঐ সকল লোক, যাদের মধ্যে সত্য ও মিথ্যা, হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করার কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু নিজেরা নিজেদেরকে জনসমাজে সূফী হিসেবে প্রচার করে থাকে।
টিকাঃ
৭২. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৭৮
৭৩. কোনো কোনো গ্রন্থে উপর্যুক্ত কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যরূপে বর্ণিত রয়েছে। (দ্র. দাতাগঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব (বাংলা), পৃ. ২৪; মাকদিসী, যাখীরাতুল হুফফায, হা. নং: ৫৬৮৪) তবে আমি কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থে এটি খোঁজে পাইনি। সম্ভবত এটি কোনো বুযর্গ ব্যক্তির উক্তি হতে পারে। বিশিষ্ট হাদীসবিশারদ আলবানী (রাহ.) একে মাওদু' (জাল) বলে উল্লেখ করেছেন। (আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছিদ দা'য়ীফাতু ওয়াল মাওদ্ 'আহ, খ.২,পৃ.১৯৮, হা. নং: ৭৮২) ইবনুল জাওযী ও মুল্লা আলী আল-কারী (রাহ.) প্রমুখও একে মাওদূ'আতের মধ্যে গণ্য করেছেন। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওদূ'আত, খ. ১, পৃ. ২৬২; মুল্লা আল-কারী, আল-মাওদু'আতুল কুবরা, পৃ. ৩৫১, হা. নং: ৩৫১)
৭৪. আল কোরআন, সূরা আল-'আলাক, ৯৬: ১-৫
৭৫. আল কোরআন, সূরা আল-ফাতির, ৩৫: ২৮
৭৬. ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ )الْهَوَى . فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى- "যে ব্যক্তি নিজের প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং নাফসকে কুপ্রবণতা থেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।" (আল কোরআন, সূরা আন-নাযি'আত, ৭৯: ৪০-৪১) এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, কেবল আল্লাহর ভয়ই নাফসকে তার কুপ্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রাখতে পারে।
৭৭. আল কোরআন, সূরা আয-যুমার, ৩৯: ৯
৭৮. আল কোরআন, সূরা আল-মুজাদালাহ, ৫৮: ১১
৭৯. আল কোরআনের প্রায় ৫৫টি জায়গায় সরাসরি সালাতের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া আরো বহু জায়গায় পরোক্ষভাবে সালাতের কথা এসেছে। অনেকেই মনে করেন যে, সব মিলে কোরআনে নামাযের তাগিদ এসেছে প্রায় ৮২ বার।
৮০. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (বাব : ফাদলুল 'উলামাহ), হা. নং: ২২৪; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৭: তালাবুল 'ইলম), হা. নং: ১৫৪৩, ১৫৪৪; তাবারানী, আল-মু'জামুস সাগীর, হা. নং: ২২, ৬১ শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি সাহীহ। (আলবানী, সাহীহু সুনানি ইবনি মাজাহ, খ. ১, পৃ. ৪৪, হা. নং: ১৮৩)
৮১. দারিমী, আস-সুনান, (আল-মুকাদ্দামাহ), হা. নং: ২৬৪, ৬১৪ শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি দা'ঈফ। (তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, তাহকীক: শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী, বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ১৯৮৫, খ. ১, পৃ. ৫৫, হা. নং: ২৫৬)
৮২. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-'ইলম), হা. নং: ২৬৪৭ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান-গারীব। বিশিষ্ট হাদীস গবেষক শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রাহ.)-এর মতে, এটি দা'ঈফ। (আলবানী, সাহীহু ও দা'ঈফু সুনানিত তিরমিযী, খ. ৬, পৃ. ১৪৭, হা. নং: ২৬৪৭)
৮৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهْلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتِ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفْتُهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عنده.
"যে ব্যক্তি 'ইলম' অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে কোনো রাস্তা দিয়ে চলে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সুগম করে দেন। যে কোনো দল আল্লাহর কোনো ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং তা নিয়ে তারা পরস্পর একে অপরের সাথে আলাপ-আলোচনা করে, নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল হয়, রাহমাত তাদেরকে ঘিরে ধরে, ফেরেশতাগণ চতুর্দিক থেকে তাঁদেরকে বেষ্টিত করে রাখেন এবং স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণের কাছে ঐ সমুদয় ব্যক্তির কথা আলোচনা করেন।" (মুসলিম, আস- সাহীহ, (কিতাব: আয-যিকর...), হা. নং: ৭০২৮)
এ হাদীস থেকে জানা যায়, যে মাজলিসে 'ইলম ও কোরআনের চর্চা হয়, তা অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাসম্পন্ন। ইমাম ইবনুল জাওযী (৫৮০-৬৫৬হি.) (রাহ.) বলেন, وليحضر مجالس العلماء ف رياض الجنة "প্রত্যেকের উচিত, 'আলিমগণের মাজলিসে উপস্থিত হওয়া। কেননা তা জান্নাতের উদ্যান স্বরূপ।" অর্থাৎ তা জান্নাতের উদ্যানের মতোই পবিত্র ও মর্যাদাসম্পন্ন। (ইবনুল জাওযী, আত-তাযকিরাতু ফিল ওয়ায, পৃ. ৫৫)
৮৪. শামী, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ.., খ. ৪, পৃ. ৬৯; ইবনু সাইয়িদিন নাস, 'উয়ূনুল আসার, খ. ১, পৃ. ৩৭০
৮৫. আস-সালিহ, ড. সুবহী, 'উলূমুল হাদীস ওয়া মুস্তালাহুহু, (বৈরূত: দারুল 'ইলম, ১৯৯১), পৃ.১৭
৮৬. দ্র. আল কোরআন, সূরা আলে 'ইমরান, ৩: ১৯০-১; সূরা আল-জাসিয়াহ, ৪৫: ১৩
৮৭. আল কোরআন, সূরা আল-'আনকাবুত, ২৯: ৫৯
৮৮. কোনো কোনো গ্রন্থে দ্বিতীয় শ্রেণির লোকদের নাম 'ফাকীর' (অর্থাৎ দরবেশ), আবার কোনো কোনো গ্রন্থে 'কারী' উল্লেখ করা হয়েছে। (সুলামী, তাবাকাতুস সৃফিয়াহ, পৃ. ৪৬; দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ৩৬; ইবনুল জাওযী, তালবীসু ইবলীস, পৃ. ৩২৭)
৮৯. সা'লাবী, ইয়াতীমাতুদ দাহর, খ. ১, পৃ. ৪৭৮; আবশীহী, আল-মুস্তাতরাফ, খ. ১, পৃ. ২১
📄 বিশুদ্ধ 'আক্বীদা পোষণ
মু'মিনমাত্রই আল্লাহ, নাবী-রাসূল ও আখিরাত প্রভৃতি সম্পর্কে কতিপয় বিশ্বাস ও বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং এগুলো তার অন্তরে গভীরভাবে স্থান করে নেয়ার কারণে এগুলোকে 'আকীদা' বলা হয়। উল্লেখ্য যে, মানুষের অন্তরের সবচেয়ে বড় কলুষ হলো আকীদা বা বিশ্বাসগত ভ্রান্তি যেমন- কুফর, শিরক ও নিফাক। পবিত্র কোরআনের ভাষায় কাফির ও মুশরিকরা অপবিত্র। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَحس "মুশরিকরা অপবিত্রই।”৯০ এ আয়াতে কাফির ও মুশরিকরা 'শারীরিকভাবে অপবিত্র' তা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং এর উদ্দেশ্য হলো, তাদের মন-চিন্তা-চেতনা-বিশ্বাস নিখাদ নয়; বিভিন্ন কলুষযুক্ত। বস্তুতপক্ষে তাদের আত্মার বিশ্বাসগত এ কলুষ দূর করবার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে নাবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। মূসা 'আলাইহিস সালাম ফির'আউনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, فَقُلْ هَل لَكَ إِلَى أَن تَزَكَّى -"তোমার পবিত্র হওয়ার আগ্রহ আছে কি?"৯১ এখানেও পবিত্রতা অর্জন বলতে বিশ্বাসগত পবিত্রতাকেই বোঝানো হয়েছে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর আরোপিত দায়িত্বসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো, মানবাত্মাগুলোকে বিশ্বাসগত ভ্রান্তি থেকে মুক্ত করা এবং তদস্থলে নিখাদ তাওহীদী বিশ্বাসের বীজ বপন করা আর এর ভিত্তিতে আত্মাগুলোকে পূত-পবিত্র ও আলোকিত করে তোলা। ইসলামের প্রধান প্রধান বিধান ফারয করবার পেছনেও মানবাত্মাগুলোকে পরিশুদ্ধ করা এবং বিশ্বাসগত ভ্রান্তি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে।
বলাই বাহুল্য, মানব জীবনে 'আকীদার একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে 'আমালের সুউচ্চ বৃক্ষ। বস্তুতপক্ষে 'আকীদার দৃঢ়তার ওপরই 'আমালের বিশুদ্ধতা নির্ভর করে এবং তা যতোই দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে, 'আমালেও সেভাবে তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلاً كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي ٱلسَّمَاءِ . تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا وَيَضْرِبُ ٱللَّهُ ٱلْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ﴾
তুমি কি লক্ষ্য করো না যে, আল্লাহ তা'আলা কেমন উপমা পেশ করেছেন: পবিত্র কালিমা হলো একটি পবিত্র বৃক্ষের মতো। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে উত্থিত। সে পালনকর্তার নির্দেশে অহরহ ফল দান করে। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।
এ আয়াতটিতে একজন মু'মিনের 'আকীদাকে বৃক্ষের শিকড়ের সাথে এবং তার 'আমালকে ডালপালার সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ একজন মু'মিনের ঈমান ও তার যাবতীয় 'ইবাদাত ও মুজাহাদার দৃষ্টান্ত হলো, এমন একটি বৃক্ষ, যার শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত এবং তার কাণ্ড ও ডালপালা মজবুত ও সুউচ্চ। ভুগর্ভস্থ ঝরণা থেকে সে সিক্ত হয়। গভীর শিকড়ের কারণে বৃক্ষটি এতোই শক্ত যে, দমকা বাতাসে ভূমিস্মাৎ হয়ে যায় না এবং এর ডালপালা ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক উর্ধ্বে থাকার কারণে বৃক্ষটি ও এর ফল ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত।
কাজেই যদি কোনো বৃক্ষের শিকড় সুস্থ ও নীরোগ হয়, তবেই সে বৃক্ষটি সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠবে এবং ডাল-পালায় বিস্তৃতি লাভ করবে। অপরদিকে যদি এর শিকড় বিনষ্ট ও পচা হয়, তা হলে সে শিকড়ই মাটির অভ্যন্তরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং তা থেকে কোনো ডাল-পালা অঙ্কুরিত হবে না, আর কোনো ডাল-পালা গজালেও তা একান্তই সাময়িক; কিছু দিন যেতে না যেতেই তা ধ্বংস হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে কারো ঈমান-'আকীদা যদি সঠিক ও ভ্রান্তিমুক্ত না হয়, তা হলে তার 'ইবাদাত ও মুজাহাদাও কোনো সুফল বয়ে আনবে না এবং তার সকল 'আমালই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَبِيثَةٍ ٱجْتُتَّتْ مِنْ فَوْقِ ٱلْأَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَارٍ﴾
এবং অপবিত্র কালিমা হলো নষ্ট বৃক্ষের মতো। একে মাটির ওপর থেকে উপড়ে নেয়া হয়েছে। এর কোনো স্থিতি নেই।৯২
এ আয়াতে খারাপ 'আকীদাকে খারাপ বৃক্ষের সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে। খারাপ বৃক্ষের শিকড় যেমন ভূগর্ভের অভ্যন্তরে বেশি যায় না, যে কেউ যখন ইচ্ছা করে তাকে সমূলে উৎপাটিত করতে পারে, অনুরূপভাবে খারাপ 'আকীদার ভিত্তিও সুদৃঢ় নয়। যে কোনো সময় তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং তা কোনোরূপ ফলদায়ক নয়। এ কারণে আল্লাহর মা'রিফাত (পরিচয়) লাভ ও 'আমালের বিশুদ্ধতা এবং সেই সাথে নাফসের কাঙ্খিত পরিশুদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য ঈমান- 'আকীদার বিশুদ্ধতা ও দৃঢ়তা একান্তই প্রয়োজন। বিশুদ্ধ ও নির্ভুল 'আকীদা ব্যতীত যেমন সত্যিকার মা'রিফাত লাভ সম্ভব নয়, তেমনি নাফসের পরিশুদ্ধি ও উন্নয়ন সাধনও সম্ভবপর নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُلْ لَمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِنْ قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ বেদুঈনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। (হে নাবী!) আপনি তাদেরকে বলুন, তোমরা ঈমান গ্রহণ করোনি; বরং বলো, আমরা বাহ্যিক আনুগত্য প্রদর্শন করেছি। কেননা, ঈমান আজো তোমাদের অন্তরে সত্যিকারভাবে অনুপ্রবেশ করেনি।৯৩
এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, কেবল সত্যিকার ও সুদৃঢ় ঈমান গ্রহণ করার পরই মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ ও আচার-আচরণে ঈমানের উজ্জ্বলতম পরিচয় ফুটে ওঠে। অন্যথায় তা কেবল দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সমাজে এমন অনেক মুসলিম রয়েছে, যারা নিজেদেরকে ঈমানদাররূপে যাহির করে, অথচ তারা প্রকৃত অর্থে ঈমানদার নয়। তাদের স্বভাব-চরিত্র অত্যন্ত কলুষিত ও অসুন্দর। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
- لَيَأْتِيَنَّ عَلَى النَّاسِ زَمَانَ يَجْتَمِعُونَ فِي الْمَسَاجِدِ ، وَلَيْسَ فِيهِمْ مُؤْمِنٌ.
কাছে এমন একটি যুগ অবশ্যই আসবে, যখন লোকেরা মাসজিদের মধ্যে একত্রিত হবে; কিন্তু তাদের মধ্যে (প্রকৃত) ঈমানদার বলতে কেউ থাকবে না।৯৪
অতএব, যে কোনো ব্যক্তি যখন সে আল্লাহর মা'রিফাত লাভ এবং নিজের নাফসের পরিশুদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যে মুজাহাদার পথে চলতে মনস্থ করবে, তাকে সর্বপ্রথম তার ঈমান-আকীদা বিশুদ্ধ ও সুদৃঢ় করার প্রতি অধিক মনোযোগ দেয়া উচিত। তাকে আল্লাহ তা'আলার যাত, সিফাত, ইখতিয়ার ও কার্যাবলী প্রভৃতি সম্পর্কে একান্ত নির্ভুল ও স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে হবে। পাশাপাশি ঈমানের অন্যান্য বিষয় সম্পর্কেও তাকে নির্ভুল ও পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হবে। বিশিষ্ট সূফী শাইখ দাতা গঞ্জে বখশ (রাহ.)-এর মতে, প্রত্যেক মু'মিনকেই দীনের উসূল অর্থাৎ মৌলিক বিষয়সমূহের 'ইলম লাভ করা ফারয।৯৫ তিনি অন্যত্র বলেন,
'আমালের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে দ্বিতীয় যে বিষয় বান্দাহর সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তা হলো আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে ধারণার অশুদ্ধতা। যতক্ষণ পর্যন্ত তার তাওহীদের বিশ্বাস পূর্ণতা লাভ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার 'আমাল বা 'ইবাদাত অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে।৯৬
আমরা দেখতে পাই যে, অনেক সূফীই ঈমান-'আকীদা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভ করা ছাড়া আল্লাহ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে সাধনা করতে গিয়ে নানা 'আকীদাগত বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়েছে এবং তারা ইসলামে নতুন নতুন বিভিন্ন মত ও দর্শন উদ্ভাবন করেছে, যা সুস্পষ্টত তাওহীদী ধ্যান-ধারণার পরিপন্থী। তদুপরি তারা যাওক, ওয়াজ্জুদ ও কাশফ্ট প্রভৃতির কথা বলে দীন ও শারী'আতের সুপ্রতিষ্ঠিত 'আকীদাগুলো নানাভাবে বিকৃত করেছে।৯৭ এ কারণে বিশিষ্ট 'আলিমগণ, এমনকি তারীকাতের বিভিন্ন বিশিষ্ট শাইখ ও সবসময় উম্মাতকে জাহিল সূফীদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারাক [১১৮-১৮১হি.] (রাহ.) কতোই বাস্তব কথা বলেছেন-
وَهَلْ أَفْسَدَ الدِّينَ إِلا الْمُلُوكُ ... وَأَحْبَارُ سُوءٍ وَرُهْبَانُهَا؟
দীনের যা কিছু নষ্ট হয়েছে তা রাজা-বাদশাহ, অসৎ আলিম ও দরবেশরাই করেছে।৯৮
বিশিষ্ট শাইখ ইয়াহইয়া ইবনু মু'আয [ মৃ.২৫৮ হি.) (রাহ.) নিজে সবসময় জাহিল সূফীদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকতেন এবং অন্যকেও এ ব্যাপারে নির্দেশ দিতেন।৯৯
টিকাঃ
৯০. আল কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ২৮
৯১. আল কোরআন, সূরা আন-নাযি'আত, ৭৯: ১৮
৯২. আল কোরআন, সূরা ইব্রাহীম, ১৪: ২৬
৯৩. আল কোরআন, সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ১৪
৯৪. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাব: আল-ফিতান ওয়াল মালাহিম), হা. নং: ৮৪৮৪; তাহাবী, মুশকিলুল আছার, হা. নং: ৫৯০; এ হাদীস প্রসঙ্গে বিশিষ্ট হাফিযুল হাদীস আল-হাকিম আন- নাইশাপুরী (রাহ.) বলেন هذا حديث صحيح الإسناد على شرط الشيخين - "এটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রাহ.) প্রমুখের শর্তে উত্তীর্ণ একটি বিশুদ্ধ সানাদের হাদীস।
৯৫. দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ.২৬
৯৬. দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ.১৩৯
৯৭. আমি এ সম্পর্কে আমার বিদ'আত ৪র্থ (আকা'ঈদ) ও ৫ম (তাসাউফ) খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইনশা আল্লাহ। সম্মানিত পাঠক ভাইদেরকে খণ্ডদ্বয় থেকে সংশ্লিষ্ট অংশগুলো অধ্যায়ন করার জন্য অনুরোধ করছি।
৯৮. ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কোরআনিল 'আযীম, খ. ৪, পৃ. ৩৮; কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৮, পৃ. ১২০
৯৯. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ঈমান), হা. নং: ৫২; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-মুসাকাত), হা. নং: ৪১৭৮ (মাতন সাহীহ মুসলিমের)
📄 হালাল উপার্জন
'ঈমান-আকীদার পর হালাল উপার্জন ও পবিত্র উপায়ে জীবন যাপন বান্দাহর জন্য প্রধান ফারয হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম একটি পবিত্র ও স্বচ্ছ জীবন ব্যবস্থার নাম। এতে জীবনের সর্বক্ষেত্রে পবিত্রতা ও স্বচ্ছতা অবলম্বনের জন্য কড়া নির্দেশ রয়েছে। একজন মু'মিন কেবল হালাল ও বৈধ উপায়ে আয়-উপার্জন করবে, তা নয়; বরং তাকে সন্দেহযুক্ত আয়-উপার্জন থেকেও বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الْحَلالَ بَيْنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيْنٌ وَبَيْنَهُمَا مُسْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الشَّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ.
নিশ্চয় হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। তবে এতদুভয়ের মধ্যে কতিপয় সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে, যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব, যে সন্দেহজনক বিষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করলো, সে-ই মূলত নিজের দীন ও 'ইযযাত-আব্রুকে রক্ষা করলো।
কাজেই একজন মু'মিনের আয়-উপার্জন, খাওয়ার আহার্য ও পানীয়, পরিধানের পোশাক-পরিচ্ছদ, বসবাসের ঘরবাড়ি ও আরোহনের গাড়ি প্রভৃতি সম্পূর্ণ হালাল ও সন্দেহমুক্ত উপায়ে অর্জিত হতে হবে। বলাই বাহুল্য, আল্লাহর 'ইবাদাতের ঘাঁটি অতিক্রম করা এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করার জন্য হালাল উপার্জন ও পবিত্র উপায়ে জীবন যাপন একটি অত্যাবশ্যক শর্ত। যদি কারো উপার্জন হালাল বা বৈধ না হয় এবং থাকা-খাওয়া-পরা পবিত্র না হয়, তা হলে তার কোনো 'আমালই- তা যতোই বড় ও মর্যাদাসম্পন্ন হোক না কেন- আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তার কোনো দু'আও আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। এরূপ লোকের বাহ্যিক 'আমাল- যতোই বেশি ও চাকচিক্যময় হোক না কেন, তা তার নাফসের পরিশুদ্ধি বা উন্নয়নের কাজে আসবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ الله طَيِّبٌ لا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ) وَقَالَ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ) ». ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَتْ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَحَابُ لِذَلِكَ ».
হে লোকেরা, আল্লাহ তা'আলা হলেন পূত-পবিত্র। কাজেই তিনি পবিত্র ছাড়া অপর কিছু কবুল করেন না। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদেরকে সে নির্দেশই দান করেছেন, যা তিনি তাঁর রাসূলগণকে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, [হে রাসূলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং সৎ কর্ম করো। আমি তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তিনি আরো বলেন, [হে মু'মিনগণ, তোমরা আমার প্রদত্ত রিযক থেকে পবিত্র বস্তুগুলোই ভক্ষণ করো।" রাবী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "কোনো মুসাফির দীর্ঘ সফর শেষে মলিন বদনে দু হাত বিস্তার করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলে যে, ইয়া রাব্ব! ইয়া রাব্ব! অথচ তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় পোশাক হারাম, অধিকন্তু সে হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে, তা হলে কীভাবে তার দু'আ কবুল হতে পারে?¹⁰⁰
সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ اشْتَرَى ثَوْبًا بِعَشَرَةِ دَرَاهِمَ وَفِيهِ دِرْهَمْ حَرَامٌ لَمْ يَقْبَلْ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً مَادَامَ عَلَيْهِ .
যে ব্যক্তি দশ দিরহাম দিয়ে কোনো কাপড় কিনলো, তন্মধ্যে একটি দিরহাম হলো হারামের, তা হলে কাপড়টি যতদিন তার পরনে থাকবে, ততদিন তার কোনো নামায আল্লাহ তা'আলা কবুল করবেন না। ¹⁰¹
আল্লাহর প্রিয় বান্দাহগণ কোনো হারাম খাবার তো খেতেনই না; বরং কোনো সন্দেহযুক্ত খাবারও গ্রহণ করতেন না। এমন কি তাঁদের কেউ কেউ নিজের কোনোরূপ অসাবধানতার কারণে কখনো সন্দেহযুক্ত কোনো কিছু তাঁর পেটে চলে গেলে তাঁর পাকস্থলী তা গ্রহণ করতে পারতো না। তিনি সাথে সাথে তা বমি করে ফেলে দিতেন। উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা ও কায়স ইবনু আবী হাযিম (রা.) প্রমুখ থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, সাইয়িদুনা আবূ বাকর (রা.)-এর এক গোলাম তাঁর কাছে প্রায়ই খাবার নিয়ে আসতো। তবে গোলামটি যখনই কোনো খাবার নিয়ে আসতো, আবূ বাকর (রা.) জিজ্ঞেস না করে তা খেতেন না। যদি তাঁর পছন্দের কিছু হতো, তা হলে খেতেন। আর তাতে অপছন্দের কিছু থাকলে খেতেন না। নিয়ম মতো গোলামটি এক রাতে আবূ বাকর (রা.)-এর নিকট কিছু খাবার নিয়ে আসলো। এ সময় আবূ বাকর (রা.) এতোই ক্ষুধার্ত ছিলেন যে, খাবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গিয়েছিলেন। তিনি খাবারটি পেয়ে তৎক্ষণাৎ এক লুকমা খেয়ে ফেললেন। তারপর তিনি গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলো, আজকে এ খাবার তুমি কিভাবে সংগ্রহ করেছো? সে জবাব দিলো,
كُنتُ تَكَهَّنْتُ لِإِنْسَانِ فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَمَا أُحْسِنُ الْكِهَانَةَ إِلَّا أَنِّي خَدَعْتُهُ فَلَقِيَنِي فَأَعْطَانِي بِذَلِكَ فَهَذَا الَّذِي أَكَلْتَ مِنْهُ.
আমি জাহিলী যুগে এক ব্যক্তির ভাগ্য গণনার কাজ করেছিলাম। তবে তা আমি ভালো করে জানতামও না। প্রতারণাই করেছিলাম। আজকে তার সাথে সাক্ষাত হবার পর সে আমাকে তার বিনিময় দিয়েছে। এ খাদ্য, যা আপনি খেয়েছেন, ঐ কাজেরই বিনিময়।
এ কথা শোনেই আবূ বাকর (রা.) গলায় হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং বমি করে পেটে যা কিছু ছিল সবই বের করে ফেলে দিলেন। ¹⁰²
যায়িদ ইবনু আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত রিওয়ায়াতে রয়েছে, গোলামের মুখে ঐ কথা শোনেই আবূ বাকর (রা.) গলায় হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বমি করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই ভুক্তদ্রব্য বের হয়ে আসছিল না। তখন তিনি পেট ভরে পানি খেতে লাগলেন। অবশেষে পেটে যা কিছু ছিলো সবই বমি বের করে ফেলে দিলেন এবং বললেন,
لَوْ لَمْ تَخْرُجْ إِلَّا مَعَ نَفْسِي لَأَخْرَجْتُهَا، سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: كُلُّ جَسَدٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ. فَخَشِيتُ أَنْ يَنبَتَ شَيْءٌ مِنْ جَسَدِي مِنْ هَذِهِ اللَّقْمَةِ.
ভুক্তদ্রব্য বের করতে আমার প্রাণও যদি চলে যেতো, তা হলেও আমি অবশ্যই তা বের করতাম। কেননা আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হারাম খাদ্য দ্বারা বেড়ে ওঠা প্রতিটি দেহের জন্য জাহান্নামই হলো উপযুক্ত স্থান। আমার তো ভয় হয়েছিল যে, এ লুকমা থেকে আমার দেহের কিছু অংশ বেড়ে ওঠবে। ¹⁰³
আজকাল আমরা লক্ষ্য করি, আমাদের অনেকেই ইমামাত, দা'ওয়াত, তাবলীগ, ওয়ায ও ইরশাদ প্রভৃতি কাজকেই নিজের জীবিকা উপার্জনের একান্ত মাধ্যমে পরিণত করেছে। ¹⁰⁴ আমি মনে করি, এ কাজ অত্যন্ত জঘন্য ও নিন্দিত এবং সালাফে সালিহীনের রীতির পরিপন্থী। সালাফে সালিহীন নিজেদের অর্থকড়ি উদারচিত্তে ব্যয় করে দীনের প্রচার ও খিদমাত করতেন। তাবলীগ, দা'ওয়াত, ওয়ায ও ইরশাদ প্রভৃতি কাজকে কখনো তাঁরা রুটি-রুজি উপার্জনের উপায়ে পরিণত করেননি। তাঁরা এ সকল কিছুর বিনিময় কেবল আল্লাহর কাছেই চাইতেন। জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা যে কোনো পেশা- ছোট হোক বা বড়- অবলম্বন করতেন। তাঁরা ছোট থেকে ছোটতর পেশাকেও নিজেদের জন্য লজ্জাজনক মনে করতেন না। ¹⁰⁵ আমাদের জন্য এটিই একান্ত অনুকরণীয়। প্রাচীন সকল হানাফী ইমামের অভিমত হলো- আযান, ইমামাত, তা'লীমে কুর'আন ও ওয়ায- তাবলীগ প্রভৃতি 'ইবাদাতের জন্য কোনো রূপ পারিশ্রমিক, হাদিয়া ও বিনিময় গ্রহণ করা হারাম।¹⁰⁶ পূর্ববতী হাম্বালী ইমামগণও এ মত পোষণ করেন। ¹⁰⁷ বিশিষ্ট হানাফী ফাকীহ আস-সারাখসী (রাহ.) বলেন,
ويكره للإمام والمؤذن طلب الأجر على ذلك من القوم لأنهما يعملان لأنفسهما فكيف يشترطان الأجر على غيرهما ثم هما خليفتان للرسول في الدعاء والإمامة وقال الله تعالى: {قُلْ لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْراً إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى } فمن يكون خليفته ينبغي أن يكون مثله .
ইমাম ও মুওয়াযযিনের জন্য এলাকাবাসীদের থেকে পারিশ্রমিক দাবি করা মাকরূহ। কেননা তাঁরা দু জনেই তো নিজেদের জন্য এ 'আমাল করে। তা হলে তাঁরা কিভাবে এ 'আমালগুলোর জন্য পারিশ্রমিকের শর্তারোপ করতে পারেন? তদুপরি তাঁরা দু জনেই হলেন ইমামাত ও আযানের জন্য আহ্বানের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের খালীফা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “(হে রাসূল,) আপনি বলুন, আমি আমার দা'ওয়াতের জন্য আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ্য ছাড়া তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিকই চাই না। "¹⁰⁸ সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর খালীফা হবেন, তাঁকেও অনুরূপ চরিত্রের অধিকারী হওয়া উচিত। ¹⁰⁹
আমি মনে করি, জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রত্যেক 'আলিম ও শাইখকে নিজের সামর্থ্যানুযায়ী যে কোনো পেশা- ছোট হোক বা বড়- অবলম্বন করা উচিত অথবা হস্ত-উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে চেষ্টা করা বাঞ্ছনীয় এবং ইমামাত, দা'ওয়াত, ওয়ায ও ইরশাদ.. প্রভৃতি কাজকে আয়-উপার্জনের পেশারূপে গ্রহণ করা থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকা প্রয়োজন। বরং এ সকল কাজ নিরেট আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াব লাভের আশায় করা সমীচীন। সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُؤْمِنَ الْمُحْتَرِفَ "আল্লাহ তা'আলা পেশাজীবী ঈমানদারকে ভালোবাসেন। "¹¹⁰ সাইয়িদুনা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, طَلَبُ الْحَلال جهادٌ وَإِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ الْمُؤْمِنَ الْمُحْتَرِفَ জিহাদের শামিল। আর আল্লাহ তা'আলা পেশাজীবী ঈমানদারকেই ভালোবাসেন।”¹¹¹ সাইয়িদুনা আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এক যুবকের দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ভাব ও পরহেযগারীর কথা আলোচনা করা হলো। তখন তিনি বললেন, !إنْ كَانَتْ لَهُ حِرفة -"যদি তার কোনো পেশা থাকতো!"¹¹² একবার বিশিষ্ট তাবি'ঈ ইব্রাহীম আন-নাখ'ঈ [৪৬-৯৬ হি.] (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে কেবল আল্লাহর ধ্যানেই নিমগ্ন থাকে আর অপর এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তাদের মধ্যে কে উত্তম? তিনি জবাব দেন, التَّاجِرُ الأَمِين “বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীই।”¹¹³ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস সুফইয়ান ইবনু 'উয়াইনাহ [১০৭-১৯৮ হি.] (রাহ.) বলেন, لَيْسَ مِنْ حُبِّكَ الدُّنْيَا أَنْ تَطْلُبَ .فِيهَا مَا يُصْلِحُكَ “দুনিয়ায় প্রয়োজনীয় জীবন উপকরণ তালাশ করা- এটা তোমার দুনিয়াপ্রীতির লক্ষণ নয়।”¹¹⁴
টিকাঃ
১০০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আয-যাকাত), হা. নং: ২৩৯৩
১০১. আহমাদ, ইমাম ইবনু হাম্বাল, আল-মুসনাদ, হাদীস নং: ৫৪৭৩ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শু'আইব আল-আরনাউত (রাহ.) বলেন, এ হাদীসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
১০২. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-মানাকিব), হা. নং: ৩৫৫৪; আহমাদ, আয-যুহদ, হা. নং: ৫৭৩
১০৩. আবূ নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, খ.১, পৃ.১৫; মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, আর-রিয়াদুন নাদিরাতু.., পৃ.৯২
১০৪. ১৯৮১ সালে পরিচালিত বাংলাদেশের আদম শুমারির পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ব্যক্তি তাদের পেশাগত পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, তাদের পেশা হচ্ছে পীর। 'দৈনিক করতোয়া' নামক একটি পত্রিকা এ সংবাদটি প্রকাশ করে এ মন্তব্য করেছে যে, এ সংখ্যাকে বাংলাদেশের মোট গ্রামের মধ্যে ভাগ করলে প্রতি গ্রামের ভাগে মোট চারজন করে 'পীর' পড়বে। এতে প্রমাণিত হয় যে, 'পীর' পেশাই এখন অন্যান্য সকল পেশার চেয়ে লাভজনক। (দ্র. দৈনিক করতোয়া, বগুড়া, ১৮/১২/১৯৮৭ খ্রি.,পৃ.৩) আমার মনে হয়, এ সরলপ্রাণ ব্যক্তিগণ হয়তো পেশা শব্দের অর্থই বুঝেননি অথবা এ শব্দ দ্বারা সরল মনে নিজেদের বাস্তব চিত্রটাই তুলে ধরেছেন। যা হোক, এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, তাঁদের কেউ কেউ পার্থিব উপার্জনের একটি সহজ পথ মনে করে এটাকে একটি পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়ে থাকেন। এরা নিজেদের জীবদ্দশায় যেমন সুকৌশলে সাধারণ মানুষের ঈমান হনন করে সম্পদ অর্জন করে থাকেন, তেমনি তাঁদের মৃত্যুর পরেও তাঁদের বংশধরদের জন্য তাঁদের মাযারগুলোকে পার্থিব উপার্জনের একটি সহজ উপায় হিসেবে রেখে যান। বলাই বাহুল্য, যুগে যুগে এরূপ অনেক লোক দেখা যায় যে, যারা পার্থিব ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান অর্জন করার জন্য সূফীদের বেশ ধারণ করে, অথচ তাসাউফের সাথে তাদের কোনোই সম্পর্ক থাকে না। এ সকল লোককে مستصوف (মুসতাসভিফ) বলা হয়। এ জাতীয় লোকদের সম্পর্কে বিশিষ্ট সূফী শাইখ দাতা গঞ্জে বখশ (রাহ.) এভাবে মন্তব্য করেন: " المستصوف عند الصوفية كالذباب، وعند غيرهم كالذئاب "তারা মাছির ন্যায় হীন ও ঘৃণিত, পার্থিব লোভ-লালসার দাস। সাধারণ লোকদের জন্য তারা হলো নেকড়ে বাঘের মতো।" অর্থাৎ নেকড়ে বাঘ যেমন ছাগলের পালের মধ্যে প্রবেশ করে এদের ধ্বংস করে, তেমনি এরা জনসাধারণের মধ্যে মেলামেশা করে তাদের ঈমান নষ্ট করে। (দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ৪৯)
১০৫. আমাদের সালাফে সালিহীনের মধ্যে সাইয়িদুনা আবূ বাকর, 'উমার, 'উসমান ও 'আবদুর রাহমান ইবনু 'আউফ (রাহ.) প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। সাইয়িদুনা সুহাইব আর-রূমী ও সা'দ ইবনু মু'আয (রা.) কর্মকার ছিলেন। সা'দ (রা.)-এর হাতদুটি হাতুড়ি দিয়ে কাজ করতে করতে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাতে চুমো দিয়ে বললেন, هذه يد لا ممسها النار أبدا - "এ হাতকে কখনো আগুন স্পর্শ করবে না।" (ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, খ. ৩, পৃ. ৮৬; ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, খ. ১, পৃ. ৪২৪-৫) আমাদের পূর্বসূরি ইমাম ও বিশিষ্ট 'আলিমগণের মধ্যে ইমাম আবু হানীফাহ (রাহ.) বস্ত্রব্যবসায়ী, গাযালী (রাহ.) সুতা ব্যবসায়ী, বাযযার (রাহ.) বস্ত্রব্যবসায়ী, বাকালী (রাহ.) সবজি বিক্রেতা, সায়দালানী (রাহ.) আতরব্যবসায়ী ও খায়্যাত (রাহ.) দর্জি ছিলেন। কুদূরী (রাহ.) হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন, আবূ বাকর আল-জাসসাস (রাহ.) সুরকি তৈরি করতেন, খাইয়াম (রাহ.) তাঁবু বানিয়ে বিক্রি করতেন, খাব্বায (রাহ.) রুটি তৈরি করতেন, যাইয়াত (রাহ.) তেল বিক্রি করতেন, কাফ্ফাল (রাহ.) তালা বানাতেন ও বিক্রি করতেন, সাফফার (রাহ.) বাসন-কোষণ বেচাকেনা করতেন ও দাক্কাক (রাহ.) আটা বিক্রি করতেন,......।
১০৬. তবে অধিকাংশ শাফি'ঈ ও মালিকী ফাকীহের মতে- এ ধরনের 'ইবাদাতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয। (ইবনু 'আবদিল বারর, আল-ইস্তিযকারুল জামি', খ. ৫, পৃ. ৪১৮-৯) উল্লেখ্য যে, তাঁদের এ কথার উদ্দেশ্য কখনো এ নয় যে, এ কাজ ভালো এবং সুন্নাত বা মুস্তাহাব্ব। বরং তাঁদের কথার উদ্দেশ্য হলো- তা হারাম নয়। তবে শাফি'ঈ মতাবলম্বী বিশিষ্ট ফাকীহ আল-খাতীব আশ-শারবীনী (মৃ.৯৭৭হি.) (রাহ.)-এর মতে, ইমামাতের জন্য, এমনকি নাফল নামায যেমন-তারাবীহের ইমামাতের জন্যও বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয হবে না। কেননা জামা'আতের যে ফাযীলাত রয়েছে, ইমাম যদি তার জন্য কোনোরূপ বিনিময় গ্রহণ করে, তবে সে কোনোরূপ উপকারিতা পাবে না। (শারবীনী, মুগনিউল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৪৪; নাবাবী, আল-মাজমূ', খ. ১৫, পৃ. ৩৯) মালিকীগণের মতে, আযান ও ইকামাতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয। ইমামাতের বিনিময় গ্রহণ করাও জায়িয, যদি তা আযান কিংবা ইকামাতের অনুগামী হয়। পৃথকভাবে ইমামাতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয নয়। তদুপরি মুসাল্লীদের অর্থ থেকে ইমামাতের বিনিময় গ্রহণ করা মাকরূহ। কিন্তু বাইতুল মাল কিংবা ওয়াকফ সম্পদ থেকে ইমামাতের বিনিময় দেয়া হলে তা গ্রহণ করতে কোনো অসুবিধা নেই। (আবূ 'আবদুল্লাহ আল-'আবদারী, আত-তাজ ওয়াল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ৪৫৫; ফিকহুল 'ইবাদাত 'আলাল মাযহাবিল মালিকী, পৃ. ১২৯)
১০৭. বুহুতী, আর-রাওদুল মুরাব্বা', পৃ. ৫৩; শানকীতী, শারহু যাদিল মুস্তানকি', খ. ২৮, পৃ. ৫
১০৮. আল-কুর'আন, সূরা আশ-শূরা, ৪২: ২৩
১০৯. সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১,পৃ.২৫৬
১১০. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (১৩: আত-তাওয়াক্কুল), হা. নং: ১১৮১; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব হা. নং: ১০৭২; তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা. নং: ৮৯৩৪ হাদীসটি দা'ঈফ। (আলবানী, দা'ঈফুত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ১, পৃ. ২৬১, হা. নং: ১০৪৩)
১১১. ইবনু আবিদ দুনিয়া, ইসলাহুল মাল, হা. নং: ১৯৩; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩৮ হাদীসটি দা'ঈফ। (আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দা'ঈফাহ.., খ. ৩, পৃ. ৪৬৬, হা. নংঃ ১৩০১) তবে এ মর্মের বহু হাদীস রয়েছে। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হাফিয সাখাভী (রাহ.) বলেন, وبعضها يؤكد بعضا لا سيما وشواهدها كثيرة এ হাদীসগুলো পরস্পর তাগিদ করে, বিশেষ করে যেহেতু এ হাদীসগুলোর প্রচুর সমর্থনকারী হাদীসও বিদ্যমান রয়েছে। (সাখাভী, আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, খ. ১, পৃ. ৫০৫)
১১২. ইবনু আবিদ দুনিয়া, ইসলাহুল মাল, হা. নং: ১৯৫; ইবনু তাহির আল-মাকদিসী, যাখীরাতুল হুফফায, হা. নং: ২৯১৪; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩৮
১১৩. ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩০
১১৪. খাল্লাল, আল-হাসসু 'আলাত তিজারাতি.., হা. নং: ৭২; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার ইয়্যাহ, খ. ৩, পৃ. ৪৩০