📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী

📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী


অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী, ﴿أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ﴾ [الأعراف: ٩৯]
অর্থাৎ, "তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? বস্তুতঃ আল্লাহর পাকড়াও থেকে তারাই নিশ্চিন্ত হতে পারে, যাদের ধ্বংস ঘনিয়ে আসে।” (সূরা আ'রাফঃ ৯৯) তিনি অন্যত্র বলেন, ﴿قَالَ وَمَنْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ﴾ (الحجر: ৫৬)
অর্থাৎ, “পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া কে নিরাশ হয়?” (সূরা হিজর ৫৬)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ : أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ ، سُئِلَ عَنِ الْكَبَائِرِ فَقَالَ : (( الشِّرْكُ بِا اللهِ، وَاليَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ، وَالْأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ)
অর্থাৎ, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহকে মহা পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, “আল্লাহর সাথে শির্ক করা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া।”
وَ عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ : الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَالأَمْنُ مِن مَكْرِ اللَّهِ وَالقَنُوطُ مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ اليَأْسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ)) رواه عبد الرزاق
অর্থাৎ, ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহা পাপ হলো, আল্লাহর সাথে শির্ক করা, আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া, আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিজিকে বঞ্চিত মনে করা.
কতিপয় মসলা জানা গেলো, ১. সূরা আ'রাফের আয়াতের তাফসীর. ২. সূরা হিজরের আয়াতের তাফসীর. ৩. যে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত, তার কঠিন শাস্তি. ৪. যে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়, তারও কঠিন শাস্তি.
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হলো যে, আল্লাহকে ভয় করা, তাঁরই নিকট আশা করা এবং তাঁরই ভীতি অন্তরে সৃষ্টি করা, বান্দার উপর অপরিহার্য, যখন সে তার পাপ এবং আল্লাহর সুবিচার ও তাঁর শাস্তির কথা ভাববে, তখন সে তার প্রতিপালককে ভয় করবে. আর যখন সে আল্লাহর ব্যাপক ও বিশেষ অনুগ্রহ এবং তাঁর সেই ক্ষমার দিকে লক্ষ্য করবে যা সকলকে পরিব্যাপ্ত, তখন সে আশা ও আকাঙ্ক্ষা করবে। আর যখন সে আল্লাহর আনুগত্য করার তাওফীক্ব লাভ করবে, তখন সে এই আনুগত্য কবুল হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ামতের আশা করবে এবং তার কোন ত্রুটির কারণে তার আনুগত্য প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা করবে। যদি সে কোন পাপের দ্বারা পরীক্ষিত হয়, তাহলে আল্লাহর নিকট তার তাওবা কবুল হওয়ার এবং গোনাহ মোচন হওয়ার আশা রাখবে। তাওবায় দুর্বল হলে এবং পাপ করতে থাকলে, (আল্লাহর) শাস্তিকে ভয় করবে। নিয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করলে, তা অব্যাহত থাকার, আরো তাধিক লাভ করার এবং তার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের তাওফীক্ব লাভের আশা করবে ও অকৃতজ্ঞ হলে, তার লোপ পাওয়ার ভয় করবে। বিপদ-আপদ ও কষ্টে পতিত হলে, আল্লাহর নিকট তার দূরীভূত হওয়ার এবং তা থেকে মুক্তি লাভের আশা করবে। আর এই আশাও করবে যে, আল্লাহ তাকে নেকী দান করবেন, যদি সে মুসীবতের উপর ধৈর্য ধারণ করে। আবার বাঞ্ছিত নেকী থেকে বঞ্চিত হওয়া ও অবাঞ্ছনীয় জিনিসে পতিত হওয়া, এই দুই মুসীবত এক সাথে একত্রিত হওয়ার আশঙ্কাও করবে, যদি সে অপরিহার্য ধৈর্য ধারণের তাওফীক্ব লাভ না করে।
তাওহীদবাদী মু'মিন তার প্রত্যেক ক্ষেত্রে ভয় ও আশাকে আঁকড়ে ধরে থাকে। আর এটাই হলো ওয়াজিব ও উপকারীও এরই দ্বারা অর্জিত হয় সৌভাগ্য, আর বান্দার উপর দু'টি খারাপ জিনিসের আশঙ্কা হয়। (১) ভয়-ভীতি এত অধিকহারে তার উপর চেপে বসে যে, সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়। (২) এত বেশী আশা করে ফেলে যে, সে আল্লাহর পাকড়াও ও তাঁর শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ে। যখন তার অবস্থা এই সীমায় পৌঁছবে, তখন সে ভয় ও আশার অপরিহার্যতাকে হারিয়ে ফেলবে, যা তাওহীদ ও ঈমানের মূল। আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার দু'টি নিষিদ্ধ কারণ পাওয়া যায়। যথা,
১. নিজের উপর বান্দার বাড়াবাড়ি করা। হারাম কাজ করতে সাহস করা ও অব্যাহতভাবে তা করতে থাকা এবং গোনাহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে বদ্ধপরিকর হওয়া। রহমতের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকারী উপকরণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে তার নিজেকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত ভাবা। আর সব সময় এই অবস্থায় থাকার কারণে রহমত থেকে বঞ্চিত মনে করা, তার গুণ ও তার অবিচ্ছেদ্য স্বভাবে পরিণত হয়। আর এটাই হলো বান্দার কাছ থেকে শয়তানের শেষ কামনা। যখন সে এই অবস্থায় পৌঁছবে, তখন নিষ্ঠার সাথে তাওবা করা এবং পাপ না করার শক্ত পরিকল্পনা ব্যতীত তার জন্য কল্যাণের আশা করা যাবে না।
২. কৃত পাপের কারণে বান্দার ভয়-ভীতি এত বেশী হয়ে যায় যে, আল্লাহর বিস্তৃত রহমত ও সীমাহীন ক্ষমার ব্যাপারে তার জ্ঞান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মুর্খতার কারণে সে মনে করে যে, সে তাওবা ও প্রত্যাবর্তন করলেও আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না এবং তার প্রতি রহমও করবেন না। তার মনোবল দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে আল্লাহর রহমত থেকে সে নিরাশ হয়ে পড়ে। এটা এমন ক্ষতিকর জিনিস, যা সৃষ্টি হয় প্রতিপালকের ব্যাপারে বান্দার দুর্বল জ্ঞান থেকে এবং তাঁর অধিকার সম্পর্কে না জানা ও নিজিকে কমজুরী ও হীন মনে করার কারণে। অথচ এই ব্যক্তি যদি তার প্রতিপালকের ব্যাপারে জানে এবং এই অবগতির জন্য অলসতায় পড়ে না থাকে, তাহলে সামান্য প্রচেষ্টা তাকে তার প্রতিপালকের রহমত ও তাঁর অনুগ্রহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিবে। আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত থাকারও দু'টি সর্বনাশী কারণ রয়েছে, যথা,
১. বান্দার দ্বীন বিমুখ হয়ে পড়া এবং স্বীয় প্রতিপালক ও তাঁর অধিকার সম্পর্কে জানার ব্যাপারে তার গাফলতি ও উদাসীনতা। অব্যাহতভাবে পালনীয় ওয়াজিব থেকে বিমুখ ও উদাসীনতা এবং হারাম কাজে কঠিনভাবে জড়িত থাকার কারণে আল্লাহর ভয় তার অন্তর থেকে লোপ পেয়ে যায় এবং ঈমানের কোন কিছুই তার অন্তরে অবশিষ্ট থাকে না। কারণ, ঈমান থাকলে তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর শাস্তির ভয়-ভীতি সৃষ্টি হতো।
২. বান্দা হয় এমন মুর্খ আবেদ (ইবাদতকারী) যে, সে নিজেকে নিয়েই আশ্চর্যান্বিত হয়। নিজের আমলকে নিয়ে অহংকার করে। আর এই মুর্খতা অব্যাহত থাকার কারণে তার থেকে ভয় দূর হয়ে যায় এবং সে মনে করে যে, তার জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা, কাজেই তখন সে নিজের দুর্বল ও নগণ্য সত্ত্বার উপর ভরসা করে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ে। আর এই থেকেই সে নিন্দিত হয় এবং তার তাওফীক্ব লাভের পথে অন্তরায় থেকে যায়। কারণ, সে নিজেই নিজের উপর যুলুম করেছে।
এই আলোচনা থেকে জানা গেলো যে, উল্লিখিত জিনিসগুলো তাওহীদ পরিপন্থী।

📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 ভাগ্যের উপর ধৈর্য ধরা

📄 ভাগ্যের উপর ধৈর্য ধরা


আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যের উপর ধৈর্য ধারণ, তাঁর প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
মহান আল্লাহর বাণী, ﴿وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ﴾ (التغابن: ۱۱)
অর্থাৎ, “যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন.” (সূরা তাগাবুনঃ ১১)
আলক্বামা (রহঃ) বলেন, মু'মিন হলো সেই ব্যক্তি, যার উপর কোন বিপদ এলে মনে করে যে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, ফলে সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে এবং তা মেনে নেয়।
وَفِي صَحِيحِ مُسْلِمٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: ((اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرُ : الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ، وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ))
অর্থাৎ, সহী মুসলিম শরীফে আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "এমন দু'টি জিনিস মানব সমাজে রয়েছে, যা তাদের মধ্যে থাকা কুফ্রী (আর তা হলো,) বংশে খোটা দেওয়া এবং মৃতের উপর রোদন করা।"
وَهُمَا عَنِ ابْنِ مَسْعُودِ الله مَرْفُوْعاً : لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ))
অর্থাৎ, বুখারী ও মুসলিম শরীফে ইবনে মাসঊদ থেকে বর্ণিত যে, (রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন), "যে গন্ডদেশে আঁচর কাটে, জামার আস্তিন ফেড়ে ফেলে এবং জাহেলী যুগের ন্যায় রোদন করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ((إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِهِ الْخَيْرَ عَجَلَ لَهُ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا، وَإِذَا أَرَادَ اللهُ بِعَبْدِهِ الشَّرَّ أَمْسَكَ عَنْهُ بِذَنْبِهِ حَتَّى يُوَاقِيَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ))
অর্থাৎ, আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহ যখন তাঁর বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন পার্থিব জীবনেই তার শাস্তি বিধান করেন। পক্ষন্তরে যখন তার তাক- ল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তাকে তার পাপের সাথে আটক করে রাখেন। শেষে কিয়ামত দিবসে তার শাস্তি বিধান করবেন।”
وَ قَالَ النَّبِيِّ ﷺ : ((إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمَ الْبَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرَّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ))
অর্থাৎ, নবী করীম বলেছেন, "নিশ্চয় বিপদ যত বড় হয়, পুরস্কারও তত বড় হয়। আর আল্লাহ যখন কোন জাতিকে ভালো- বাসেন, তখন তাদেরকে বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেন। যে সন্তুষ্ট হয়, তার জন্যে রয়েছে (আল্লাহর) সন্তুষ্টি। আর যে অসন্তুষ্ট হয়, তার জন্যে রয়েছে (আল্লাহর) অসন্তুষ্টি।” ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান (ভাল) বলেছেন।
কতিপয় মসলা জানা গেলো ১. সূরা তাগাবুনের আয়াতের তাফসীর। ২. (ধৈর্য ধারণ) ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। ৩. বংশে খোটা দেওয়া।
৪. তার শাস্তি কঠিন, যে গন্ডদেশে আঁচর কাটে, জামার আস্তিন ফাড়ে এবং জাহেলী যুগের ন্যায় রোদন করে।
৫. আল্লাহর স্বীয় বান্দার কল্যাণ চাওয়ার নিদর্শন।
৬. আল্লাহর স্বীয় বান্দার অকল্যাণ চাওয়ার নিদর্শন।
৭. আল্লাহর স্বীয় বান্দাকে ভালবাসার নিদর্শন।
৮. অসন্তুষ্ট হওয়া হারাম।
৯. মুসীবতে সন্তুষ্ট থাকার নেকী।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যের উপর সবর করা এবং তাঁর আনুগত্যের উপর সবর করা ও তাঁর অবাধ্যতা না করার উপর সবর করা, শুধু যে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত তা নয়, বরং তা ঈমানের মূল ভিত্তি ও তার শাখা-প্রশাখা, আর এটা সকলের জানা বিষয়। কারণ, পূর্ণাঙ্গ ঈমানই হলো, আল্লাহ যা ভালবাসেন, যাতে তিনি সন্তুষ্ট এবং যা তাঁর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, তাতে ধৈর্য ধরা ও আল্লাহর হারাম করা জিনিসের উপর ধৈর্য ধরা, কেননা, দ্বীন তিনটি মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, আর তা হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা বলেছেন, তার সত্যায়ন করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালন করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা। কাজেই আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য কষ্টকর হলেও তাতে সবর করা উল্লিখিত সাধারণ বিষয়ের আওতায় পড়ে, তবে ধৈর্য সম্পর্কে জানা ও সেই অনুযায়ী আমল করার প্রয়োজন খুবই বেশী, বিধায় তা বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ, বান্দা যখন জানবে যে, বিপদ-আপদ আল্লাহর নির্দেশেই আসে, আর আল্লাহ এ ব্যাপারে অত্যধিক কৌশলী, বান্দার উপর এই বিপদ নির্ধারণ করার পিছনে রয়েছে তার জন্য আল্লাহর পরিপূর্ণ নিয়ামত, তখন সে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হবে। তাঁর নির্দেশকে মেনে নিবে এবং কষ্টের উপর ধৈর্য ধরবে। আর এতে তার উদ্দেশ্য হবে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ, তাঁর সাওয়াবের আশা, তাঁর শাস্তিকে ভয় করা এবং উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া। আর তখন তার অন্তর প্রশান্তি লাভ করবে এবং তার ঈমান ও তাওহীদ বলিষ্ঠ হবে।

📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 ‘রিয়া’ প্রসঙ্গে

📄 ‘রিয়া’ প্রসঙ্গে


'রিয়া' (লোক দেখানো কাজ করা) প্রসঙ্গে
মহান আল্লাহর বাণী,
﴿قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ﴾ [الكهف: ١١٠]
অর্থাৎ, “বলো, আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহ-উপাস্য একমাত্র উপাস্য." (সূরা কাহফঃ ১১০)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ؓ مَرْفُوعاً : قَالَ اللهُ تَعَالَى: ((أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنْ الشِّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ)) رواه مسلم
অর্থাৎ, “আবূ হুরাইরা থেকে মারফু' সূত্রে বর্ণিত যে, (রাসূলুল্লাহ বলেছেন, (মহান আল্লাহ বলেন, "আমি শির্ককারীদের আরোপিত শির্ক থেকে একেবারে মুক্ত ও সম্পর্কহীন, যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে, যে আমলে সে আমার সাথে অন্যকে শরীক করে, আমি তাকে তার শির্কসহ বর্জন করবো।” (মুসলিম)
وَعَنْ سَعِيدٍ مَرْفُوعاً: ((أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِي مِنْ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ ؟ قَالُو : بَلَى، فَقَالَ : ((الشَّرْكُ الْخَفِيُّ أَنْ يَقُومَ الرَّجُلُ يُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ )) رواه أحمد
অর্থাৎ, আবু সাঈদ থেকে মারফু' সূত্রে বর্ণিত যে, (রাসূলুল্লাহ বলেছেন,) “আমি কি তোমাদেরকে এমন জিনিসের খবর দিবো না, যা আমার নিকট দাজ্জালের চেয়েও বেশী ভয়াবহ?” সাহাবারা বললেন, অবশ্যই বলুন! তিনি বললেন, “তা হলো, সুক্ষ্ম শির্ক, কোন ব্যক্তি এই জন্য খুব সুন্দর করে নামায পড়ে যে, তার দিকে অন্য কোন ব্যক্তি তাকিয়ে আছে।” (মুসনাদ আহমদ)
কতিপয় মসলা জানা গেলো ১. সূরা কাহাফের আয়াতের তাফসীর। ২. গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালকাজে গায়রুল্লাহর প্রভাব থাকলে, তা প্রত্যাখ্যাত হয়। ৩. তার কারণের উল্লেখ, আর তা হলো, পূর্ণরূপে অন্যের মুখাপে- ক্ষীহীনতা। ৪. আমল বরবাদ হওয়ার কারণসমূহের অন্যতম কারণ হলো, আল্লাহ সমস্ত শরীক থেকে মুক্ত। ৫. নবী করীম-এর স্বীয় সাহাবীদের ব্যাপারে রিয়ার আশঙ্কা। ৬. তিনি রিয়ার ব্যাখ্যা এইভাবে করলেন যে, মানুষ আল্লাহর জন্যেই নামায পড়ে, কিন্তু সুন্দর করে এই জন্য পড়ে যে, কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ
লেখক 'রিয়া' বা লোক দেখানো কাজের প্রসঙ্গ আলোচনা করার পরে পরেই বলেন, মানুষ তার আমল দ্বারা দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্য পোষণ করলে, তা শির্কের আওতায় পড়বে। জেনে রাখা দরকার যে, ইখলাস হলো দ্বীনের মূল ভিত্তি এবং তাওহীদ ও ইবাদতের প্রাণ।
আর ইখলাস হলো, বান্দার তার যাবতীয় আমল দ্বারা একমাত্র উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর নিকট নেকী এবং তাঁর অনুগ্রহ লাভ। ফলে সে ঈমানের ছয়টি মৌলিক বিষয় এবং ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির প্রতিষ্ঠার যথাযথ যত্ন নেবে। আল্লাহ ও বান্দার অধিকার সমূহকে আদায় করবে। আর এতে তার উদ্দেশ্য হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতের শান্তি লাভ। এতে লোক দেখানো, খ্যাতি, সরদারী এবং দুনিয়া লাভের কোন উদ্দেশ্য থাকবে না। আর এরই দ্বারাই তার ঈমান ও তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করবে।
ঈমান ও তাওহীদের কট্টর পরিপন্থী জিনিস হলো, লোক দেখানো এবং তাদের প্রশংসা ও তাদের নিকট সম্মান পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোন কাজ করা অথবা দুনিয়া অর্জনের জন্য করা। আর এটাই হলো ইখলাস ও তাওহীদে দোষযুক্তকারী জিনিস। 'রিয়া' সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। আর তা হলো, বান্দাকে আমলে উদ্বুদ্ধকারী জিনিস যদি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে হয় এবং এই জঘন্য উদ্দেশ্যে সে যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তার আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং তা ছোট শির্কে পরিণত হবে। আর যদি বান্দাকে আমলে উদ্বুদ্ধকারী জিনিস আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাথে সাথে লোক দেখানোও হয়, আর 'রিয়া' থেকে সে যদি ফিরে না আসে, তাহলে কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, এই ক্ষেত্রেও আমল বরবাদ হবে। আর যদি বান্দাকে আমলে উদ্বুদ্ধকারী জিনিস কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়, আর আমল করাকালীন সময়ে 'রিয়া'র উদয় হয়, এমতাবস্থায় সে যদি তা দূর করে নিয়ত ঠিক করে নেয়, তাহলে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু 'রিয়া' যদি তার মধ্যে থেকে যায় এবং তার প্রতি সে যদি সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে আমল কমে যাবে এবং 'রিয়া'কারীর অন্তরে যে পরিমাণ 'রিয়া' থাকবে, সেই পরিমাণ তার ঈমান ও ইখলাসে দুর্বলতা আসবে এবং আল্লাহর জন্য কৃত আমল ও তার সাথে মিশ্রিত 'রিয়া'র মধ্যে দ্বন্দ্ব চলবে।
'রিয়া' বড় এক বিপজ্জনক জিনিস, যার সংশোধনের অতীব প্রয়োজন, নাফসের মধ্যে ইখলাস সৃষ্টি করা, 'রিয়া' এবং ক্ষতিকর উদ্দেশ্য অন্তর থেকে দূরীভূত করা ও এর জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করারও খুব দরকার, যাতে আল্লাহ বান্দার ঈমানকে খাঁটি ঈমানে পরিণত করেন এবং তাকে প্রকৃত তাওহীদবাদী করেন। দুনিয়ার জন্য ও পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করার ব্যাপারে বলা হয়েছে, যদি বান্দার সম্পূর্ণ ইচ্ছা এই রকমই হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও আখেরাত অর্জনের কোন ইচ্ছা যদি তার না থাকে, তাহলে এর জন্য তার আখেরাতে কোন অংশ থাকবে না। তবে এই ধরনের কাজ কোন মু'মিন দ্বারা হয় না। কারণ, মু'মিন দুর্বল ঈমানের হলেও সে তার কাজের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতই কামনা করে।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং দুনিয়া অর্জন, উভয়ের জন্য কাজ করে এবং উভয় উদ্দেশ্য যদি সমান সমান বা কাছাকাছি হয়, তবে এই ব্যক্তি মু'মিন হলেও তার ঈমান, তাওহীদ এবং ইখলাসে ঘাটতি থাকবে। আর ইখলাস না থাকার কারণে তার আমলেও ঘাটতি থাকবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যই কাজ করে এবং সে তার কাজে পূর্ণ নিষ্ঠারও দাবী রাখে, কিন্তু সে তার কাজের বিনিময় নিয়ে স্বীয় কাজের ও দ্বীনের উপর সাহায্য গ্রহণ করে, যেমন, ভাল কাজের উপর বেতন ইত্যাদি গ্রহণ করা এবং যেমন আল্লাহর পথের মুজাহিদ, যে জিহাদে গনিমতের মাল অথবা রুজি হাসিল করে, তদনুরূপ ওয়াক্বফের মাল, যা মসজিদ, মাদরাসা এবং দ্বীনি কাজের উপর নিযুক্ত ব্যক্তিদের দেওয়া হয়, এ সব নেওয়াতে বান্দার ঈমান ও তাওহীদের কোন ক্ষতি হবে না। কারণ, সে তার আমল দ্বারা দুনিয়া কামনা করে নি। বরং তার ইচ্ছা ছিলো দ্বীনের খেদমত করা এবং যা সে অর্জন করছে, তার দ্বারা তার উদ্দেশ্য ছিলো দ্বীনের কাজে সাহায্য গ্রহণ করা। আর এই জন্যই আল্লাহ যাকাত ও গনিমতের মাল ইত্যাদি শরীয়তী সম্পদে তাদের জন্য এক বড় অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যারা দ্বীনি কাজে এবং পার্থিব উপকারী কাজে নিযুক্ত।
বিস্তারিত এই আলোচনা তোমাদের নিকট অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ এই মসলার বিধান পরিষ্কার করে দেয় এবং প্রত্যেক বিষয়কে তার যথাযথ স্থানে রাখা তোমাদের উপর ওয়াজিব করে দেয়, আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 দুনিয়া অর্জনের জন্য ভাল কাজ করা শির্কভুক্ত

📄 দুনিয়া অর্জনের জন্য ভাল কাজ করা শির্কভুক্ত


দুনিয়া অর্জনের জন্য ভাল কাজ করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত
মহান আল্লাহ বলেন, ﴿مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا ﴾ [هود، الآيتان: ١٥-١٦]
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, আমি তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দিবো এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হয় না। এরাই হলো সেইসব লোক, আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া কিছুই নেই, তারা এখানে যা কিছু করেছিলো, সবই বরবাদ করেছে, আর যা কিছু উপার্জনা করেছিলো, সবই বিনষ্ট হলো।” (সুরা হুদঃ ১৫-১৬)
وَ فِي الصَّحِيحِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : (( تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، تَعِسَ عَبْدُ الدَّرْهَمِ ، تَعِسَ عَبْدُ الخَمِيصَةِ، تَعِسَ عَبْدُ الحَمِيلَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ، طُوبَى لِعَبْدِ آخِذٌ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَشْعَثَ رَأْسُهُ، مُغْبَرَةٍ قَدَمَاهُ، إِنْ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ، وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ، إِنْ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَعْ))
অর্থাৎ, সহী হাদীসে আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "দীনার ও দিরহামের দাস ধ্বংস হয়েছে রেশমের দাস ধ্বংস হয়েছে। ভাল কাপড়ের দাস ধ্বংস হয়েছে, তাকে দেওয়া হলে, সন্তুষ্ট হয়, আর না দেওয়া হলে, অসন্তুষ্ট হয়, ধ্বংস হোক, অবনত হোক। আর কাঁটা বিদ্ধ হলে, তা যেন খুলে ফেলার ক্ষমতা না হোক। সেই বান্দা সৌভাগ্যবান, যে আল্লাহর পথে ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কেশ আলু-থালু, তার পদদ্বয় ধুলি ধুসারিত। যদি তাকে পাহারায় লাগানো হয়, তাহলে সে পাহারায় লেগে থাকে। যদি তাকে পশ্চাতের বাহিনীতে লাগানো হয়, তবে সে তাতেই লেগে থাকে। সে অনুমতি চাইলে, তাকে অনুমতি দেওয়া হয় না এবং সে সুপারিশ করলে, তার সুপারিশ কবুল করা হয় না।"
কতিপয় মসলা জানা গেলো ১. মানুষের আখেরাতের কাজ দ্বারা দুনিয়া লাভের ইচ্ছা। ২. সূরা হূদের আয়াতের তাফসীর। ৩. মুসলিমদের দীনার ও দিরহামের দাস নামে নামকরণ। ৪. এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তাকে দেওয়া হলে সন্তুষ্ট আর না পেলে অসন্তুষ্ট। ৫. রাসূলুল্লাহ -এর বাণী, "সে ধ্বংস হোক এবং অবনত হোক." ৬. রাসূলুল্লাহ -এর বাণী, কাঁটা বিদ্ধ হলে, তা খুলে ফেলার ক্ষমতা না হোক." ৭. হাদীসে উল্লিখিত গুণে গুণান্বিত মুজাহিদের প্রশংসা করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00