📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী
অধ্যায় আল্লাহর বাণী, (البقرة: ١٦٥) وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَاداً يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ الله ))
অর্থাৎ, “অনেক মানুষ এমনও রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে” (সূরা বাক্বারাঃ ১৬৫) মহান আল্লাহ আরো বলেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ﴾ [التوبة: ٢٤]
অর্থাৎ, “বলো, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা, যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান, যাকে তোমরা পছন্দ করো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা থেকে বেশী প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত.” (সুরা তাওবাঃ ২৪)
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ : ( لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ)) أخرجاه
অর্থাৎ, “তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতে পারে না, যতক্ষণ আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং অন্য সকল মানুষের চেয়েও বেশী প্রিয় পাত্র না হয়ে যাবো.” (বুখারী- মুসলিম)
و لهما عنه قال : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: (( ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبُّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا اللَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ)) وَفِي رواية : (( لا يَجِدُ أَحَدٌ حَلَاوَةَ الإِيمَانِ حَتَّى)) إلى آخره
অর্থাৎ, বুখারী ও মুসলিমে আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তিনটি জিনিস যার মধ্যে থাকবে সে-ই ঈমানের মিষ্টতা লাভ করবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হবে তার নিকট অন্যদের অপেক্ষা সব থেকে প্রিয়। সে মানুষকে আল্লাহরই নিমিত্তে ভালবাসবে। কুফরী থেকে তাকে আল্লাহর নিষ্কৃতি দেওয়ার পর, তাতে ফিরে যাওয়াকে সে ঐরূপ অপছন্দ করবে, যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে সে অপছন্দ করে।” অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ((কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের মিষ্টতা লাভ করবে না, যতক্ষণ না- --)) হাদীসের শেষ পর্যন্ত,
وَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ : (( مَنْ أَحَبَّ فِي اللَّهِ، وَأَبْغَضَ فِي اللَّهِ، وَوَالَى فِي الله، وَعَادَى فِي اللهِ، فَإِنَّمَا وَلايَةَ اللهِ بِذَلِكَ، وَلَن يَجِدَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ، وَإِنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ وَصَوْمُهُ، حَتَّى يَكُوْنَ كَذَلِكَ، وَقَدْ صَارَ عَامَةُ مُؤَاخَاةِ النَّاسِ عَلَى أَمْرِ الدُّنْيَا، ذَلِكَ لا يُجْدِى عَلَى أَهْلِهِ شَنْياً)) رواه ابن جرير
অর্থাৎ, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে আল্লাহর নিমিত্তে ভালবাসে, আল্লাহর নিমিত্তে ঘৃণা করে এবং আল্লাহর নিমিত্তে বন্ধুত্ব করে ও আল্লাহর নিমিত্তে শত্রুতা করে, সে এর দ্বারা আল্লাহর ভালবাসা লাভ করে। আর এই রকম না হওয়া পর্যন্ত কোন বান্দা ঈমানের মিষ্টতা লাভ করতে পারবে না, যদিও তার নামায ও রোযা অধিক হয়ে থাকে। বস্তুতঃ পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন হয়ে থাকে। তবে এতে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনকারীর প্রকৃত স্বার্থ সিদ্ধি হবে না।” (ইবনে জারির)
আল্লাহর এই বাণীর "এবং তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে" ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে, প্রকৃত ভালবাসা।
যে মসলাগুলো জানা গেলো
১. সূরা বাক্বারার আয়াতের তাফসীর।
২. সূরা তাওবার আয়াতের তাফসীর।
৩. রাসূলুল্লাহ -এর ভালবাসাকে জান-মাল ও পরিবারবর্গের ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেওয়া ওয়াজিব।
৪. ঈমানের অস্বীকৃতি, ইসলাম থেকে বহিষ্কারের দলীল নয়।
৫. ঈমানের স্বাদ আছে কখনো মানুষ তা পায়, আবার কখনো পায় না।
৬. চারটি অন্তর সম্পর্কিত আমল, যার ব্যতিরেকে আল্লাহর ভালবাসা পাওয়া যায় না এবং তা ব্যতীত ঈমানের স্বাদও কেউ পায় না।
৭. ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সাধারণত দুনিয়ার স্বার্থেই হয়ে থাকে। এই বাস্তব ব্যাপারটি সাহাবীর উপলব্ধি।
৮. "এবং তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হবে" এই আয়াতের ব্যাখ্যা।
৯. মুশরিকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিলো, যে আল্লাহকে দারুণ ভালবাসতো।
১০. যার নিকট (আয়াতে উল্লিখিত) আটটি জিনিস বেশী প্রিয়, তার প্রতি ধমক।
১১. যে আল্লাহর কোন অংশীদার স্থাপন করে তাকে আল্লাহর মত ভালবাসলে, তার এ কাজ বড় শির্ক হিসাবে গণ্য হবে।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ
আল্লাহর বাণী, "অনেক মানুষ এমনও রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে." তাওহীদের মূল ও তার প্রাণ হলো, নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা পোষণ করা। আর এটাই হলো আল্লাহর প্রকৃত ইবাদত, যতক্ষণ না বান্দার ভালবাসা তার প্রতিপালকের জন্য পূর্ণ হবে এবং সকল ভালবাসার ঊর্ধ্বে তাঁর ভালবাসা স্থান পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করবে না। আর বান্দার সকল ভালবাসা হবে এই ভালবাসার অনুগত, যার উপর বান্দার সৌভাগ্য ও মুক্তি নির্ভরশীল, আর এই ভালবাসাকে পূর্ণকারী জিনিসের মধ্যে হলো, আল্লাহর নিমিত্তে ভালবাসা, কাজেই আমল ও ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আল্লাহ যা ভালবাসেন, সেও তা ভাল-বাসবে এবং তিনি যা ঘৃণা করেন, সেও তা ঘৃণা করবে, তাঁর ওলীদের সাথে বন্ধুত্ব রাখবে এবং তাঁর দুশমনদের সাথে শত্রুতা রাখবে, এরই মাধ্যমে বান্দার ঈমান ও তার তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করবে।
আল্লাহর সৃষ্টির কাউকে তাঁর অংশীদার স্থাপন করে তাদেরকে তাঁর মত করে ভালবাসা, তাদের আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রাধান্য দেওয়া এবং তাদের ধ্যানে ও তাদের নিকট প্রার্থনা করাতে নিবিষ্ট থাকা হলো বড় শির্ক, যা ক্ষমা করবেন না। এই শির্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার অন্তর পরাক্রমশীল আল্লাহর ভালবাসা থেকে ছিন্ন করে অন্যের সাথে জুড়ে যে তার জন্য কিছুই করতে পারে না। মুশরিকদের অবলম্বিত এই অনর্থক মাধ্যম সেই কিয়ামতের দিন টুটে যাবে, যখন বান্দা তার আমলের প্রতিদানের অত্যাধিক প্রয়োজন বোধ করবে। আর তখন এই ভালবাসা ও বন্ধুত্ব বিদ্বেষ ও শত্রুতায় পরিণত হবে।
জেনে রেখো, ভালবাসা তিন প্রকারের, যথা,
প্রথমতঃ, আল্লাহর ভালবাসা, যা ঈমান ও তাওহীদের মূল।
দ্বিতীয়তঃ, আল্লাহর নিমিত্তে কাউকে ভালবাসা, যেমন, আল্লাহর ওলীদের, তাঁর রাসূলগণ ও তাঁদের অনুসারীদেরকে ভালবাসা। আমল, কাল ও স্থানসমূহের মধ্যে যা আল্লাহ ভালবাসেন, তা ভালবাসা। এই ভালবাসা আল্লাহর ভালবাসার ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় এবং তার পরিপূরক।
তৃতীয়তঃ, আল্লাহর সাথে কাউকে ভালবাসা। আর এই হলো মুশরি- কদের তাদের উপাস্য এবং শরীকদেরকে ভালবাসা, যা তারা বৃক্ষ, পাথর, মানুষ এবং ফেরেশতা প্রভৃতির মধ্য থেকে বানিয়ে নিয়ে ছিলো। এটাই হলো প্রকৃত শির্ক ও তার ভিত্তি। চতুর্থ আরো এক ভালবাসা পাওয়া যায়, যা প্রাকৃতিক ভালবাসা। যে ভালবাসার কারণে বান্দা তিরস্কৃত হয় না। যেমন, পানাহার, বিবাহ, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সুন্দর জীবন লাভ ইত্যাদির প্রতি ভালবাসা। এগুলো যদি বৈধ পন্থায় হয় এবং এগুলোর দ্বারায় যদি আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর অনুসরণের সাহায্য গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা ইবাদতের অধ্যায়ে পড়বে। কিন্তু যদি এগুলো ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকারী হয় এবং যদি এগুলোর দ্বারা এমন কাজের সাহায্য গ্রহণ করা হয়, যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তাহলে তা নিষিদ্ধ বস্তুর পর্যায় পড়বে। অন্যথায় তা বৈধ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী
অধ্যায় মহান আল্লাহর বাণী
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنتُمْ مُّؤْمِنِينَ ﴾ [آل عمران: ١٧৫]
অর্থাৎ, “এরা যে রয়েছে, এরাই হলো শয়তান, এরা নিজেদের বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না। আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো।” (সূরা আল-ইমরানঃ ১৭৫) তিনি আরো বলেন,
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَأَتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا الله ﴾ [التوبة : ١৮]
অর্থাৎ, “নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং প্রতিষ্ঠা করেছে নামায ও আদায় করে যাকাত; আর তারা আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না।” (সূরা তাওবাঃ ১৮) তিনি অন্যত্র বলেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ الله ﴾ [العنكبوت: ١٠]
অর্থাৎ, “কতক লোক বলে, আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি; কিন্তু আল্লাহর পথে যখন নির্যাতিত হয়, তখন তারা মানুষের নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মত মনে করে।” (সুরা আনকাবুতঃ ১০)
عَنْ أَبِي سَعِيدِ مَرْفُوْعاً : (( أَنَّ مِنْ ضَعْفِ اليَقِيْنِ أَنَّ تَرْضِيَ النَّاسَ بِسَخَطِ الله، وَأَنْ تَحْمَدَهُمْ عَلَى رِزْقِ الله ، وَ أَنْ تَذُمَّهُمْ عَلَى مَا لَمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ، أَنَّ رِزْقَ الله لَا يَجُرُّهُ حِرْصُ حَرِيْصٍ، وَلَا يَرُدُّهُ كَرَاهِيَةٌ كَارِهِ))
আবু সাঈদ থেকে মারফু' সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, দুর্বল বিশ্বাস হলো আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করা, আল্লাহ প্রদত্ত রুজীতে মানুষের প্রশংসা করা, আল্লাহ তোমাকে দেন নাই বলে, তাদের দুর্নাম করা। নিশ্চয় কোন লোভীর লোভ আল্লাহর রুজি বয়ে আনতে পারে না এবং কোন অপছন্দকারীর অপছন্দ তা (আল্লাহ রুজি) রোধ করতেও পারে না।
وَ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا، أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ : (( مَنِ التَمَسَ رِضَا الله بِسَخَطِ النَّاسِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَ أَرْضَى عَنْهُ النَّاسَ، وَ مَنِ التَمَسَ رِضَا النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّه سَخِطَ اللهُ عَلَيْهِ وَ أَسْخَطَ عَلَيْهِ النَّاسَ)) رواه ابن حبان في صحيحه
অর্থাৎ, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি লোকদের অসন্তুষ্ট করে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং লোকদেরকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট বানিয়ে দেন, আর যে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে লোকদের সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হোন এবং লোকদের- কেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট বানিয়ে দেন।” (ইবনে হিব্বান)
যে মসলাগুলো জানা গেলো ১. সূরা আল ইমরানের আয়াতের তাফসীর। ২. সূরা তাওবার আয়াতের তাফসীর, ৩. সূরা আনকাবূতের আয়াতের তাফসীর। ৪. ঈমান ও ইয়াক্বীন দুর্বলও হয়, আবার শক্তিশালীও হয়। ৫. দুর্বল ইয়াক্বীনের নিদর্শন, তন্মধ্যে উল্লিখিত তিনটি জিনিস। ৬. কেবল আল্লাহকেই ভয় করা হলো ফরয বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। ৭. যে আল্লাহর ভয় পরিত্যাগ করে, তার শাস্তির উল্লেখ। ৮. যে আল্লাহকে ভয় করে, তার পুরস্কার।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ এই অধ্যায়ে লেখক (রহঃ) কেবল আল্লাহকে ভয় করা যে ওয়াজিব, সেই কথার উল্লেখ করেছেন এবং কোন সৃষ্টির উপর আস্থা রাখা যে নিষেধ, তারও উল্লেখ করেছেন, তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এ ছাড়া তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করে না। তবে এখানে বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের খুবই দরকার যাতে সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়ে যায়।
জেনে রাখা দরকার যে, ভয়-ভীতি কখনো ইবাদত গণ্য হয়। আবার কখনো তা প্রাকৃতিক ও স্বভাবের আওতায় পড়ে, এটা ভয়- ভীতির কারণ ও তা সম্পর্কীয় বিষয়ের মাধ্যমে বুঝা যায়। যদি ভয়-ভীতি ইবাদত ও উপাসনাযুক্ত ও সেই সত্ত্বার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে হয়, যাকে ভয় করছে এবং যার না-ফারমানী করলে ধমক খেতে হয়, তাহলে তার এই ভয়-ভীতি ঈমানের ওয়াজিবসমূহের বড় ওয়াজিবের পর্যায় পড়বে এবং গায়রুল্লাহকে ভয় করা হবে বড় শির্কের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। কারণ, সে অন্তরের এই ইবাদতে আল্লাহর সাথে গায়রুল্লাহকে শরীক করেছে আবার গায়রুল্লাহর ভয় আল্লাহর ভয়ের থেকে বেশীও হতে পারে। যে কেবল আল্লাহকে ভয় করে, সে হয় নিষ্ঠাবান তাওহীদবাদী। আর যে গায়রুল্লাহকে ভয় করে, সে ঐ ব্যক্তি ন্যায় ভয়-ভীতিতে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীককারীবিবেচিত হয়, যে তাঁর ভালবাসায় অন্যকে শরীক করে। যেমন, কেউ কবর-বাসীকে এই জন্য ভয় করে যে, সে তার ক্ষতি করে বসতে কিংবা তার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে নিয়ামত বন্ধ করে দিবে অথবা অন্য কোন কারণে, যা কবর পূজারীদের দ্বারা বাস্তবেই হয়ে থাকে।
আর ভয়-ভীতি যদি সহজাত হয়, যেমন কারো শত্রুকে অথবা হিংস্র জন্তু-জানোয়ারকে কিংবা সাপ ইত্যাদিকে ভয় করা, যার বাহ্যিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে এই ধরনের ভয় ইবাদত হবে না। অনেক মু'মিনের মধ্যেও এই ভয় বিদ্যমান থাকে। কাজেই এটা ঈমান পরিপন্থী নয়। যদি এই ভয় প্রকৃত কোন কারণে হয়, তাহলে তা নিন্দনীয় নয়, কিন্তু যদি এই ভয় কেবল কোন কিছু ধারণা করে হয়, যার প্রকৃত কোন কারণ থাকে না অথবা দুর্বল কারণের ভিত্তিতে হয়, তাহলে তা নিন্দনীয় হবে এবং ভয়কারী কাপুরুষদের বিশেষণে বিশেষিত হবে। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ কাপুরুষতা থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করেছেন। কাজেই তা হলো মন্দ চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। আর এই কারণেই পূর্ণ ঈমান, আল্লাহর উপর আস্থা এবং সাহস এই প্রকারের ভয়কে প্রশ্রয় দেয় না। তাই প্রকৃত ও শক্তিশালী মু'মিন-গণের ঈমানী শক্তি, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা এবং নির্ভিকতার কারণে তাদের সমস্ত ভয়-ভীতি নিরাপত্তায় ও প্রশান্তিতে পরিবর্তন হয়ে যায়।
📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী
অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী,
﴿ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ (المائدة: ٢٣)
অর্থাৎ, “আর আল্লাহর উপরেই ভরসা করো, যদি তোমরা মু’মিন হও।” (সূরা মায়েদাঃ ২৩) তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ ﴾ [الأنفال: ٢]
অর্থাৎ, “যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয়, তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর” (সূরা আনফালঃ ২) তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾ (الطلاق: ۳)
অর্থাৎ, “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক্বঃ ৩) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসবুনাল্লাহ অ নি’মাল ওয়াকীল” দুআটি ইবরাহীম তখন পাঠ করেছিলেন, যখন তিনি আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়ে ছিলেন, আর মুহাম্মাদ উক্ত দুআটি তখন পাঠ করেছিলেন, যখন লোকেরা তাঁকে বলেছিলো, “তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমবেত হচ্ছে, কাজেই তাদের ভয় করো, তখন তাঁদের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়েগেছিলো।” (আল-ইমরানঃ ১৭৩)
কতিপয় মসলা জানা গেলো, ১. (আল্লাহর উপরে) ভরসা করা ফরয বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। ২. তা ঈমানের শর্তসমূহের অন্তর্ভুক্ত। ৩. সূরা আনফালের আয়াতের তাফসীর, ৪. সূরা তালাক্বের আয়াতের তাফসীর, ৫. এটা বড় গুরুত্বপূর্ণ বাক্য যে, ইবরাহীম কঠিন সময়ে তা পাঠ করেছিলেন।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ- আল্লাহর উপর ভরসা রাখা হলো তাওহীদ ও ঈমানের ওয়াজিব সমূহের সুমহান ওয়াজিব। যে বান্দার আল্লাহর উপর ভরসা যত বলিষ্ঠ হবে, তার ঈমান তত শক্তিশালী হবে এবং তার তাওহীদ তত পূর্ণতা লাভ করবে। আর বান্দা দুনিয়া ও আখেরাতের যেসব বিষয় সম্পাদন করতে চায় বা ত্যাগ করতে চায়, তাতে সে আল্লাহর উপর ভরসা রাখার এবং তাঁর সাহায্যের অত্যধিক প্রয়োজন বোধ করে। আল্লাহর উপর প্রকৃত ভরসা রাখা হলো, বান্দার জেনে নেওয়া যে, সমস্ত বিষয়ই আল্লাহর ক্ষমতাধীন, যা তিনি চান, তা-ই হয়, আর যা তিনি চান না, তা হয় না। ক্ষতি ও লাভ তাঁরই পক্ষ থেকে এবং দেওয়া ও না দেওয়া সব তাঁরই ব্যাপার। তিনি ব্যতীত কেউ ভাল কাজ করতে পারে না এবং মন্দ কাজ থেকে বাঁচতে পারে না। এই অবগতির পর বান্দা ইহকালের ও পরকালের কল্যাণ অর্জনে এবং অকল্যাণ ও ক্ষতি দূরীকরণে তার প্রতিপালকের উপর ভরসা রাখবে। তার যাবতীয় উদ্দেশ্য সাধনে আল্লাহকেই শক্ত করে ধরবে এবং এর সাথে সাথে সে উপকারী উপকরণ ও মাধ্যম অবলম্বন করতে। প্রচেষ্টা করবে, যখন বান্দার মধ্যে এই জ্ঞান, এই ভরসা ও বিশ্বাস চিরস্থায়ী হবে, তখনই সে প্রকৃতার্থে আল্লাহর উপর ভরসাকারী বিবেচিত হবে। আর তখন সে তার জন্য আল্লাহর হিফাযতের এবং ভরসাকারীদের সাথে আল্লাহর কৃত অঙ্গীকারের সুসংবাদে ধন্য হবে। আর যখন সে তার সম্পর্ক গায়রুল্লাহর সাথে জুড়বে, তখন সে মুশরিক বিবেচিত হবে। আর যে গায়রুল্লাহর উপরে ভরসা করবে, তাকে তারই উপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হবে এবং তার সকল আশা ব্যর্থ হবে।
📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী
অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী, ﴿أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ﴾ [الأعراف: ٩৯]
অর্থাৎ, "তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? বস্তুতঃ আল্লাহর পাকড়াও থেকে তারাই নিশ্চিন্ত হতে পারে, যাদের ধ্বংস ঘনিয়ে আসে।” (সূরা আ'রাফঃ ৯৯) তিনি অন্যত্র বলেন, ﴿قَالَ وَمَنْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ﴾ (الحجر: ৫৬)
অর্থাৎ, “পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া কে নিরাশ হয়?” (সূরা হিজর ৫৬)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ : أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ ، سُئِلَ عَنِ الْكَبَائِرِ فَقَالَ : (( الشِّرْكُ بِا اللهِ، وَاليَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ، وَالْأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ)
অর্থাৎ, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহকে মহা পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, “আল্লাহর সাথে শির্ক করা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া।”
وَ عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ : الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَالأَمْنُ مِن مَكْرِ اللَّهِ وَالقَنُوطُ مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ اليَأْسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ)) رواه عبد الرزاق
অর্থাৎ, ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহা পাপ হলো, আল্লাহর সাথে শির্ক করা, আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া, আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিজিকে বঞ্চিত মনে করা.
কতিপয় মসলা জানা গেলো, ১. সূরা আ'রাফের আয়াতের তাফসীর. ২. সূরা হিজরের আয়াতের তাফসীর. ৩. যে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত, তার কঠিন শাস্তি. ৪. যে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়, তারও কঠিন শাস্তি.
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হলো যে, আল্লাহকে ভয় করা, তাঁরই নিকট আশা করা এবং তাঁরই ভীতি অন্তরে সৃষ্টি করা, বান্দার উপর অপরিহার্য, যখন সে তার পাপ এবং আল্লাহর সুবিচার ও তাঁর শাস্তির কথা ভাববে, তখন সে তার প্রতিপালককে ভয় করবে. আর যখন সে আল্লাহর ব্যাপক ও বিশেষ অনুগ্রহ এবং তাঁর সেই ক্ষমার দিকে লক্ষ্য করবে যা সকলকে পরিব্যাপ্ত, তখন সে আশা ও আকাঙ্ক্ষা করবে। আর যখন সে আল্লাহর আনুগত্য করার তাওফীক্ব লাভ করবে, তখন সে এই আনুগত্য কবুল হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ামতের আশা করবে এবং তার কোন ত্রুটির কারণে তার আনুগত্য প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা করবে। যদি সে কোন পাপের দ্বারা পরীক্ষিত হয়, তাহলে আল্লাহর নিকট তার তাওবা কবুল হওয়ার এবং গোনাহ মোচন হওয়ার আশা রাখবে। তাওবায় দুর্বল হলে এবং পাপ করতে থাকলে, (আল্লাহর) শাস্তিকে ভয় করবে। নিয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করলে, তা অব্যাহত থাকার, আরো তাধিক লাভ করার এবং তার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের তাওফীক্ব লাভের আশা করবে ও অকৃতজ্ঞ হলে, তার লোপ পাওয়ার ভয় করবে। বিপদ-আপদ ও কষ্টে পতিত হলে, আল্লাহর নিকট তার দূরীভূত হওয়ার এবং তা থেকে মুক্তি লাভের আশা করবে। আর এই আশাও করবে যে, আল্লাহ তাকে নেকী দান করবেন, যদি সে মুসীবতের উপর ধৈর্য ধারণ করে। আবার বাঞ্ছিত নেকী থেকে বঞ্চিত হওয়া ও অবাঞ্ছনীয় জিনিসে পতিত হওয়া, এই দুই মুসীবত এক সাথে একত্রিত হওয়ার আশঙ্কাও করবে, যদি সে অপরিহার্য ধৈর্য ধারণের তাওফীক্ব লাভ না করে।
তাওহীদবাদী মু'মিন তার প্রত্যেক ক্ষেত্রে ভয় ও আশাকে আঁকড়ে ধরে থাকে। আর এটাই হলো ওয়াজিব ও উপকারীও এরই দ্বারা অর্জিত হয় সৌভাগ্য, আর বান্দার উপর দু'টি খারাপ জিনিসের আশঙ্কা হয়। (১) ভয়-ভীতি এত অধিকহারে তার উপর চেপে বসে যে, সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়। (২) এত বেশী আশা করে ফেলে যে, সে আল্লাহর পাকড়াও ও তাঁর শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ে। যখন তার অবস্থা এই সীমায় পৌঁছবে, তখন সে ভয় ও আশার অপরিহার্যতাকে হারিয়ে ফেলবে, যা তাওহীদ ও ঈমানের মূল। আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার দু'টি নিষিদ্ধ কারণ পাওয়া যায়। যথা,
১. নিজের উপর বান্দার বাড়াবাড়ি করা। হারাম কাজ করতে সাহস করা ও অব্যাহতভাবে তা করতে থাকা এবং গোনাহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে বদ্ধপরিকর হওয়া। রহমতের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকারী উপকরণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে তার নিজেকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত ভাবা। আর সব সময় এই অবস্থায় থাকার কারণে রহমত থেকে বঞ্চিত মনে করা, তার গুণ ও তার অবিচ্ছেদ্য স্বভাবে পরিণত হয়। আর এটাই হলো বান্দার কাছ থেকে শয়তানের শেষ কামনা। যখন সে এই অবস্থায় পৌঁছবে, তখন নিষ্ঠার সাথে তাওবা করা এবং পাপ না করার শক্ত পরিকল্পনা ব্যতীত তার জন্য কল্যাণের আশা করা যাবে না।
২. কৃত পাপের কারণে বান্দার ভয়-ভীতি এত বেশী হয়ে যায় যে, আল্লাহর বিস্তৃত রহমত ও সীমাহীন ক্ষমার ব্যাপারে তার জ্ঞান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মুর্খতার কারণে সে মনে করে যে, সে তাওবা ও প্রত্যাবর্তন করলেও আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না এবং তার প্রতি রহমও করবেন না। তার মনোবল দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে আল্লাহর রহমত থেকে সে নিরাশ হয়ে পড়ে। এটা এমন ক্ষতিকর জিনিস, যা সৃষ্টি হয় প্রতিপালকের ব্যাপারে বান্দার দুর্বল জ্ঞান থেকে এবং তাঁর অধিকার সম্পর্কে না জানা ও নিজিকে কমজুরী ও হীন মনে করার কারণে। অথচ এই ব্যক্তি যদি তার প্রতিপালকের ব্যাপারে জানে এবং এই অবগতির জন্য অলসতায় পড়ে না থাকে, তাহলে সামান্য প্রচেষ্টা তাকে তার প্রতিপালকের রহমত ও তাঁর অনুগ্রহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিবে। আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত থাকারও দু'টি সর্বনাশী কারণ রয়েছে, যথা,
১. বান্দার দ্বীন বিমুখ হয়ে পড়া এবং স্বীয় প্রতিপালক ও তাঁর অধিকার সম্পর্কে জানার ব্যাপারে তার গাফলতি ও উদাসীনতা। অব্যাহতভাবে পালনীয় ওয়াজিব থেকে বিমুখ ও উদাসীনতা এবং হারাম কাজে কঠিনভাবে জড়িত থাকার কারণে আল্লাহর ভয় তার অন্তর থেকে লোপ পেয়ে যায় এবং ঈমানের কোন কিছুই তার অন্তরে অবশিষ্ট থাকে না। কারণ, ঈমান থাকলে তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর শাস্তির ভয়-ভীতি সৃষ্টি হতো।
২. বান্দা হয় এমন মুর্খ আবেদ (ইবাদতকারী) যে, সে নিজেকে নিয়েই আশ্চর্যান্বিত হয়। নিজের আমলকে নিয়ে অহংকার করে। আর এই মুর্খতা অব্যাহত থাকার কারণে তার থেকে ভয় দূর হয়ে যায় এবং সে মনে করে যে, তার জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা, কাজেই তখন সে নিজের দুর্বল ও নগণ্য সত্ত্বার উপর ভরসা করে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ে। আর এই থেকেই সে নিন্দিত হয় এবং তার তাওফীক্ব লাভের পথে অন্তরায় থেকে যায়। কারণ, সে নিজেই নিজের উপর যুলুম করেছে।
এই আলোচনা থেকে জানা গেলো যে, উল্লিখিত জিনিসগুলো তাওহীদ পরিপন্থী।