📄 অলক্ষুণী ও কুলক্ষণ প্রসঙ্গে
অলক্ষ্মী-কুলক্ষণ প্রসঙ্গে
মহান আল্লাহ বলেন
أَلَا إِنَّمَا طَائِرُهُمْ عِنْدَ اللهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ﴾ [الأعراف: ١٣١]
অর্থাৎ, “শুনে রাখো, তাদের তালক্ষণ যে, আল্লাহরই এলেমে রয়েছে, অথচ এদের অনেকেই জানে না।” (সূরা আ'রাফঃ ১৩১) তিনি আরো বলেন,
﴿قَالُوا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ ﴾ يس : ১৯
অর্থাৎ, “রাসূলগণ বললেন, তোমাদের অকল্যাণ তোমাদের সাথেই.” (সূরা ইয়াসীনঃ ১৯)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ه أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ: (( لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةً وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ )) أخرجاه
অর্থাৎ, আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "সংক্রামক ব্যাধি, অলক্ষণ-কুলক্ষ্মী, পেঁচার কোন কুপ্রভাব এবং উদরাময়ের আশঙ্কার কোন কারণ নেই.” (বুখারী-মুসলিম) Imam মুসলিম একটু বাড়িয়ে বলেছেন যে, তারকার প্রভাবে বৃষ্টি হয় না এবং ভূত-প্রেত বলতে কিছুই নেই."
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ه قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: ((لَا عَدْوَى، وَلَا طِيَرَةَ، وَيُعْجِبُنِي الْفَالُ، قَالُوا: وَمَا الْفَالُ؟ قَالَ: ((كَلِمَةٌ طَيِّبَةٌ))
অর্থাৎ, বুখারী-মুসলিমে আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "সংক্রামক কোন ব্যাধি এবং তালক্ষণ- কুলক্ষ্মী বলতে কিছুই নেই, তবে 'ফাল' আমাকে ভাল লাগে." সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'ফাল' কি? তিনি বললেন, "উত্তম বাক্য."
ولأبي داود بسند صحيح، عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: ذُكِرَتْ الطَّيَرَةُ عِنْدَ النَّبِيِّ فَقَالَ : أَحْسَنُهَا الْفَالُ، وَلَا تَرُدُّ مُسْلِمًا ، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ، فَلْيَقُلْ : اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ))
অর্থাৎ, ইমাম আবূ দাউদ সহী সনদে উকবা ইবনে আমের থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ-এর নিকটে অলক্ষণ-কুলক্ষ্মীর উল্লেখ করলে, তিনি বলেন, "তার মধ্যে উত্তম হলো, 'ফাল' বা ভাল আশা করা। অলক্ষণ-কুলক্ষ্মী কোন মুসলিমকে তার কাজ থেকে ফিরাতে পারে না। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অপছন্দনীয় কোন কিছু দেখে, তাহলে সে যেন বলে, 'আল্লাহুম্মা লা ইয়াতী বিল হাসানা-তি ইল্লা- আন্তা অলা-ইয়াদফাউস সাইয়ে আতি ইল্লা- আন্তা অলা- হাউলা অলা-কুওয়াতা ইল্লা- বিকা' (হে আল্লাহ তুমি ছাড়া কেউ কল্যাণ বয়ে আনে না। তুমি ব্যতীত কেউ অকল্যাণ দূর করতে পারে না। তুমি ছাড়া ভাল কাজ করার এবং মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার শক্তিও কারো নেই)।
وَلَهُ مِنْ حَدِيْثِ بْنِ مَسْعُودٍ مَرْفُوْعاً : ((الطَّيَرَةُ شِرْكُ الطَّيَرَةُ شِرْكٌ، وَمَا مِنَّا إِلَّا ... وَلَكِنَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكَّلِ))
অর্থাৎ, আবূ দাউদেই ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, অলক্ষণ-কুলক্ষ্মী মনে করা শির্ক, অলক্ষণ-কুলক্ষ্মী মনে করা শির্ক। এই রকম মনে করা আমাদের আক্বীদা নয়। এ রকম কারো মনে উদয় হলে, সে যেন আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে। এই পূর্ণ আস্থার মাধ্যমে আল্লাহা তার সব দুর্ভাবনা দূর করে দিবেন।
ولأحمد من حديث ابن عمر ) ( مَنْ رَدَّتْهُ الطَّيَرَةُ مِنْ حَاجَةٍ فَقَدْ أَشْرَكَ)) قَالُوا يَا رَسُولَ الله ! مَا كَفَّارَةُ ذَلِكَ ؟ قَالَ : ( أَنْ يَقُولَ: ((اللَّهُمَّ لَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ))
অর্থাৎ, ইমাম আহমদ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যাকে তার অলক্ষণ-কুলক্ষ্মী ভাবা কোন কাজ থেকে ফিরিয়ে দিলো, সে শির্ক করলো। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তার কাফফারা কি হবে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "সে বলবে, 'আল্লা-হুম্মা লা- খায়রা ইল্লা- খায়রুক, অলা ত্বায়রা ইল্লা- ত্বায়রুক, অলা-ইলাহা গায়রুক' (অর্থাৎ, হে আল্লাহ! তোমার পক্ষ থেকে কল্যাণ ব্যতীত আর কোন কল্যাণ নেই, তোমার পক্ষ থেকে দুর্ভাগ্য ব্যতীত আর কোন দুর্ভাগ্য নেই এবং তুমি ছাড়া সত্যিকার কোন উপাস্য নেই).
وله من حديث الفضل بن العباس : (( إِنَّمَا الطَّيَرَةُ مَا أَمْضَاكَ أَوْ رَدَّكَ))
অর্থাৎ, ফাল ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, "অলক্ষণ-কুলক্ষ্মী হলো, যা তোমাকে কোন কাজ করতে বাধ্য করে অথবা কোন কাজ থেকে ফিরিয়ে দেয়।"
যে বিষয়গুলো জানা গেলো ১. উল্লিখিত সূরা আ'রাফ ও সূরা ইয়াসীনের আয়াত দু'টির উপর সতর্কতা প্রদর্শন, ২. সংক্রামক ব্যাধির অস্বীকৃতি ৩. অলক্ষ্মী-কুলক্ষ্ণের তাস্বীকৃতি,
৪. পেঁচার ডাককে অলক্ষ্মণ মনে করার অস্বীকৃতি।
৫. উদরাময়ের আশঙ্কার অস্বীকৃতি।
৬. ভাল আশা করা মুস্তাহাব জিনিস।
৭. 'ফাল' এর তাফসীর।
৮. অলক্ষ্মী-কুলক্ষ্মণ না ভাবা সত্ত্বেও যদি অন্তরে এই ধরনের খেয়াল জেগে উঠে, তাতে কোন ক্ষতি নেই, বরং আল্লাহর উপর ভরসা ও আস্থার দরুণ তা দূর হয়ে যায়।
৯. যদি কারো অন্তরে অলক্ষ্মীর খেয়াল চলে আসে, তাহলে সে যেন অধ্যায়ে উল্লিখিত দুআ পড়ে নেয়।
১০. এ কথা পরিষ্কার যে, অলক্ষ্মী মনে করা শির্ক।
১১. নিন্দনীয় অলক্ষ্মীর ব্যাখ্যা।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অলক্ষ্মী বা কুলক্ষ্মণ মনে করার অর্থ হলো, পাখী, নাম, কথা-বার্তা এবং পবিত্র কোন স্থান ইত্যাদির মাধ্যমে শুভাশুভ নির্ণয় করা। শরীয়ত প্রণেতা এটা নিষেধ বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং এরকম ধারণা যারা পোষণ করে, তাদের নিন্দা করেছেন। তবে শুভ কামনা পছন্দনীয়, পক্ষান্তরে অলক্ষ্মী-কুলক্ষ্মণ মনে করা অপছন্দনীয়। আর এই দু'টির মধ্যে পার্থক্য হলো, ভালোর আশা করা মানুষের আক্বীদার সাথে সম্পর্কিত নয় এবং এতে গায়রুল্লাহর সাথে আন্তরিক কোন আস্থাও রাখা হয় না। বরং এতে কেবল উদ্দেশ্য হয়, আনন্দ ও সন্তোষ অর্জন এবং উপকারী জিনিস অর্জনের উপর আন্তরিক বলিষ্ঠতা, এর পদ্ধতি হলো, কোন বান্দা সফরে যাওয়ার অথবা বিবাহ করার কিংবা কোন চুক্তি করার বা গুরুত্বপূর্ণ কোন পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করলো। অতঃপর সে এ ব্যাপারে এমন কিছু দেখলো, যা তাকে আনন্দ দেয় বা এমন কথা-বার্তা শুনলো, যা তাকে তৃপ্তি দেয়। ফলে তার মনে ভাল আশার জন্ম হলো এবং যে কাজের সে পরিকল্পনা করেছিলো, তা সম্পাদন করার প্রতি তার উদ্যম আরো বেড়ে গেলো। এ সবই ভাল এবং এর পরিণামই উত্তম।
এতে নিষেধ বলতে কোন কিছু নেই, আর অলক্ষ্মী বা কুলক্ষ্মণ হলো এই যে, কোন বান্দা দ্বীন অথবা দুনিয়ার লাভদায়ক কার্যকলাপের কোন কিছু করার পরিকল্পনা করলো, অতঃপর সে অপছন্দনীয় এমন কিছু দেখলো বা শুনলো, যাতে তার অন্তরে দু'টি জিনিসের কোন একটির প্রভাব পড়লো, যার একটি অন্যটির থেকে ভয়াবহ,
১. হয় সে এই অপছন্দনীয় কোন কিছু দেখার বা শুনার কারণে কৃত পরিকল্পনা ত্যাগ করবে, অর্থাৎ, এটাকে অশুভ মনে করে সেই কাজ করা থেকে সে ফিরে আসবে, যা করার সে পরিকল্পনা করেছিলো। এই ক্ষেত্রে সে তার অন্তরকে এই অপছন্দনীয় জিনিসের সাথে দারুনভাবে জড়িতকারী ও সেই অনুযায়ী আমলকারী বিবেচিত হবে। কারণ, এই জিনিসই তাকে তার ইচ্ছা-ইরাদা এবং কাজ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে, সুতরাং এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এতে তার ঈমানের উপর প্রভাব পড়বে এবং তার তাওহীদ ও আল্লাহর উপর আস্থা হ্রাস পাবে। অতঃপর এই জিনিসই তার অন্তরকে দুর্বল ও শক্তিহীন করে দিবে। তার অন্তরে সৃষ্টির ভয় ভরে দেবে। তাকে এমন মাধ্যম ও উপকরণের উপর আস্থাশীল বানাবে, যা মাধ্যম ও উপকরণই নয় এবং তার অন্তরকে আল্লাহ থেকে ছিন্ন করে দিবে।
আর এটাই হলো, তাওহীদের দুর্বলতা, শির্ক ও তার মাধ্যম এবং বুদ্ধি ও বিবেক বিনষ্টকারী কুসংস্কারের প্রবেশ পথ।
২. আর না হয় সে অপছন্দনীয় কোন কিছু দেখে বা শুনে তার পরিকল্পনা ত্যাগ করবে না। কিন্তু মনে দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা এবং বিষাদ রয়ে যাবে। এটা যদিও প্রথমটার মত নয়, তবুও এতে বান্দার জন্য ক্ষতি ও অনিষ্ট রয়েছে, আর এটাও বান্দার অন্তরকে দুর্বল করে এবং আল্লাহর প্রতি তার আস্থাকে কমজুরী করে। তাছাড়া কোন অপছন্দ-নীয় জিনিসের সম্মুখীন হলে ভাবতে পারে যে, এটা ঐ কারণেই হয়েছে, ফলে তার অলক্ষ্মী বা কুলক্ষণ মনে করার মধ্যে বলিষ্ঠতা আসবে এবং ধীরে ধীরে সে প্রথমটার মধ্যে প্রবেশ করে যাবে (অর্থাৎ, কৃত পরিকল্পনা ত্যাগ করবে।)
উক্ত আলোচনার দ্বারা এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, শরীয়ত প্রণেতার অলক্ষ্মী বা কুলক্ষণ মনে করাকে অপছন্দ করার ও তার নিন্দা করার কারণ কি এবং এটা তাওহীদ ও আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী কেন। যে ব্যক্তি তার অন্তরে এই ধরনের কোন কিছু অনুভব করে, তার উচিত অন্তর থেকে তা দূর করার প্রচেষ্টা করা এবং এর জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করা। আর অনুভূত অনিষ্টকে দূর করার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করা।
📄 জ্যোতিষ বিদ্যা প্রসঙ্গে
জ্যোতিষ বিদ্যা প্রসঙ্গে
ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ক্বাতাদাহ বলেন, মহান আল্লাহ এই তারাগুলো তিনটি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, যথা, (১) আসমানের শোভা। (২) শয়তানকে মেরে তাড়ানোর অস্ত্র (৩) পথিকদের পথ নির্দেশনের মাধ্যম, এই তিনটি উদ্দেশ্য ব্যতীত কেউ যদি অন্য কোন উদ্দেশ্য স্থির করে, তাহলে সে ভুল করবে, নিজের অংশ হারাবে এবং এমন বিষয় নিজের উপর চাপিয়ে নিবে, যার সে জ্ঞান রাখে না।
ক্বাতাদাহ (রহঃ) চাঁদের কক্ষপথগুলোর জ্ঞানার্জন অপছন্দ করেন, ইবনে উয়ায়নাও এই জ্ঞানের অনুমতি দেন নাই, হাব উভয়ের পক্ষ থেকে এ কথার উল্লেখ করেছেন, তবে ইমাম আহমদ এবং ইসহাক এই জ্ঞানার্জনের অনুমতি দিয়েছেন।
عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ : قَالَ النَّبِيَّ ﷺ: ((ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ خَمْرٍ، وَقَاطِعُ رَحِمٍ، وَمُصَدِّقُ بِالسِّحْرِ)) رواه أحمد و ابن حبان في صحيحه
আবূ মূসা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না. সর্বদা মদপানকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং যাদুর সত্যায়নকারী.” (আহমদ ও ইবনে হিব্বান) (এখানে যাদু বলতে জ্যোতিষ বিদ্যা বুঝানো হয়েছে)
যে বিষয়গুলো জানা গেলো ১. তারকা সৃষ্টির উদ্দেশ্য, ২. উল্লিখিত উদ্দেশ্য ব্যতীত যে অন্য কিছু মনে করে, তার খন্ডন করণ। ৩. চাঁদের কক্ষপথের জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে মতভেদের উল্লেখ ৪. জ্যোতিষ বিদ্যার সত্যায়নকারীর কঠিন শাস্তি, যদিও সে মনে করে যে এটা বাতিল।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জ্যোতিষ বিদ্যা দু'প্রকারের, যথা,
১. ফলিতজ্যোতিষ (Astrology). অর্থাৎ, গ্রহনক্ষত্রাদির অবস্থান নির্ণয়পূর্বক মানুষের ভবিষ্যৎ শুভাশুভ বিচার বিদ্যা। এটা বাতিল ও অবৈধ, কারণ, এতে সেই অদৃশ্য জ্ঞানে আল্লাহর শরীক হওয়ার দাবী করা হয়, যা কেবল তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট অথবা যে এই জ্ঞানের দাবী করে, তার সত্যায়ন করা হয়, কাজেই এই বাতিল দাবী এবং গায়রুল্লাহর উপর আন্তরিক আস্থা রাখার কারণে এটা তাওহীদ পরিপন্থী ও বুদ্ধিহীনকারী জিনিস, কেননা, যাবতীয় বাতিল তরীকা-পদ্ধতি ও তার সত্যায়ন করা হলো জ্ঞান ও দ্বীন বিনষ্টকারী জিনিস।
২. গ্রহনক্ষত্রাদি-সম্বন্ধীয় বিজ্ঞানশাস্ত্র (Astronomy). অর্থাৎ, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজির অবস্থান নির্ণয়পূর্বক ক্বেবলা, সময় এবং দিক নির্ণয় করা। এটা কোন দোষের জিনিস নয়, বরং যদি তা ইবাদতের সময় জানার অথবা দিক নির্ণয়ের মাধ্যম হয়, তাহলে এই ধরনের বহু উপকারী জ্ঞানার্জনের উপর শরীয়ত উদ্বুদ্ধ করেছে, সুতরাং এই উভয় বিদ্যার মধ্যে কোন্টা বৈধ ও কোন্টা অবৈধ, তার পার্থক্য সুচিত করা ওয়াজিব, প্রথম বিদ্যাটা হলো তাওহীদ পরিপন্থী পক্ষান্তরে দ্বিতীয়টা তাওহীদ পরিপন্থী নয়।
📄 তারকারাজির মাধ্যমে বৃষ্টি কামনা করা
তারকারাজির মাধ্যমে বৃষ্টি কামনা করা
মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ﴾ (الواقعة: ۸۲)
অর্থাৎ, “আর তোমরা মিথ্যা বলাকেই নিজেদের ভূমিকায় পরিণত করেছো.” (সূরা ওয়াকিয়াহঃ ৮২)
وعن أبي مالك الأشعري له أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ : أَرْبَعُ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ : الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ، وَالْاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ. وَقَالَ: النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ)) رواه مسلم
অর্থাৎ, আবূ মালিক আশআরী থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "জাহেলিয়াতের চারটি স্বভাব আমার উম্মতের মধ্যে রয়েগেছে, যা তারা ত্যাগ করতে পারে না. বংশ নিয়ে গৌরব, বংশে খোটা দেওয়া, তারকারাজির মাধ্যমে বৃষ্টি কামনা করা এবং (কারো মৃত্যুতে) রোদন করা। তিনি আরো বলেছেন যে, রোদনকারিণী মৃত্যুর পূর্বে যদি তাওবা না করে, তাহলে আল-কাতরার পায়জামা এবং পাঁচড়ার জামা পরিহিতা অবস্থায় তাকে কিয়ামতের দিনে দাঁড় করানো হবে.” (মুসলিম)
عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ أَنَّهُ قَالَ : صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ صَلَاةَ الصُّبْحِ بِالْحُدَيْبِيَّةِ عَلَى إِثْرِ سَمَاءٍ كَانَتْ مِنْ اللَّيْلَةِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ فَقَالَ: (( هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ ؟ )) قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: ((قَالَ: أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِي مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِنَوْءٍ كَذَا وَكَذَا، فَذَلِكَ كَافِرٌ بِي وَمُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ))
অর্থাৎ, বুখারী ও মুসলিম শরীফে যায়েদ ইবনে খালিদ জুহনী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা হুদাইবিয়্যাতে রাতে বৃষ্টি হলে ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ সকলের দিকে সম্মুখ করে বসে বললেন, "তোমরা জানো কি তোমাদের প্রতিপালক কি বলেন?”
সকলে বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সর্বাধিক জ্ঞাত, বললেন, 'তিনি বলেন, "আমার বান্দাদের মধ্যে কিছু বান্দা মু'মিন হয়ে ও কিছু কাফের হয়ে প্রভাত করেছে, যে ব্যক্তি বলেছে যে, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায় আমাদের উপর বৃষ্টি হলো, সে তো আমার প্রতি মু'মিন (বিশ্বাসী) ও নক্ষত্রের প্রতি কাফের (অবিশ্বাসী), কিন্তু যে ব্যক্তি বলেছে যে, তামুক অমুক নক্ষত্রের ফলে আমাদের উপর বৃষ্টি হলো, সে তো আমার প্রতি কাফের (অবিশ্বাসী) এবং নক্ষত্রের প্রতি মু'মিন (বিশ্বাসী)."
বুখারী ও মুসলিমে ইবনে আব্বাস থেকেও এই অর্থের হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তাতে আছে, কেউ কেউ বলেছিলো, অমুক অমুক তারা সত্যই বটে। ফলে আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, 'আমি তারকারাজির অস্তমিত হওয়ার শপথ করে বলি, তোমরা মিথ্যাচারে লিপ্ত।' (৫৬ঃ ৭৫-৮২)
যে বিষয়গুলি জানা গেলো, ১. সূরা ওয়াক্বিয়ার আয়াতের তাফসীর। ২. জাহেলিয়াতের চারটি স্বভাবের উল্লেখ। ৩. তার কোন কোনটি কুফরী পর্যায় পড়ে। ৪. এমনও কুফরী আছে, যা ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে না। ৫. নিয়ামত অবতরণের কারণে কারো মু'মিন হওয়া আবার কারো কাফের হওয়া। ৬. এই ক্ষেত্রে ঈমান বুঝার মত মেধা থাকা। ৭. এই ক্ষেত্রে কুফরী বুঝার মেধা থাকা। ৮. 'অমুক অমুক তারকা সত্য' কথার তাৎপর্য বুঝার মেধা থাকা। ৯. শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করে মসলা বের করতে পারে। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "তোমরা কি জানো তোমাদের প্রতিপালক কি বলেন?" ১০. রোদনকারিণীর কঠিন শাস্তি।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেহেতু এই স্বীকৃতি দেওয়াও তাওহীদের অন্তর্ভুক্ত জিনিস যে, যাবতীয় সম্পদ দানকারী একমাত্র আল্লাহ এবং অনিষ্ট থেকে রক্ষাকারীও তিনিই, আর এগুলোর স্বীকৃতি মৌখিক ও তাঁর অনুসরণের মাধ্যমে দিতে হয়, সেহেতু কেউ যদি বলে, অমুক নক্ষত্রের ফলে আমাদের উপর বৃষ্টি হলো, তার এই কথা কট্টর তাওহীদ বিরোধী। কথা হবে। কারণ, সে বৃষ্টি বর্ষণ হওয়াকে নক্ষত্রের সাথে সংযুক্ত করেছে, অথচ ওয়াজিব হলো বৃষ্টি ও অন্যান্য যাবতীয় নিয়ামতকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করা। কেননা, তিনিই এগুলোর দ্বারা তাঁর বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন, নক্ষত্ররাজি কোনভাবেই বৃষ্টি বর্ষণের উপকরণ নয়, বরং বৃষ্টি বর্ষণের উপকরণ হলো, আল্লাহর অনুগ্রহ, তাঁর দয়া এবং প্রয়োজনানুযায়ী বান্দাদের স্বীয় প্রতিপালকের নিকট কথা ও কাজের মাধ্যমে চাওয়া। যখন বান্দারা কামনা করে, তখন আল্লাহ দয়াপরবশ উচিত সময়ে তাদের প্রয়োজনানুযায়ী বৃষ্টি বর্ষণ করেন, কাজেই বান্দার তাওহীদ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা লাভ করবে না, যতক্ষণ না সে তার প্রতি এবং অন্যান্য সমগ্র সৃষ্টিকুলের প্রতি আল্লাহর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় নিয়ামতকে স্বীকার করবে এবং এগুলো যে তাঁরই দান, তা মেনে নিবে ও এগুলোর দ্বারা তাঁর ইবাদত সম্পাদনের ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উপর সাহায্য গ্রহণ করবে। এরই মাধ্যমে তাওহীদ খাঁটি কি না এবং ঈমান সম্পূর্ণ, না অসম্পূর্ণ, তা বিবেচিত হয়।
📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী
অধ্যায় আল্লাহর বাণী, (البقرة: ١٦٥) وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَاداً يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ الله ))
অর্থাৎ, “অনেক মানুষ এমনও রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে” (সূরা বাক্বারাঃ ১৬৫) মহান আল্লাহ আরো বলেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ﴾ [التوبة: ٢٤]
অর্থাৎ, “বলো, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা, যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান, যাকে তোমরা পছন্দ করো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা থেকে বেশী প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত.” (সুরা তাওবাঃ ২৪)
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ : ( لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ)) أخرجاه
অর্থাৎ, “তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতে পারে না, যতক্ষণ আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং অন্য সকল মানুষের চেয়েও বেশী প্রিয় পাত্র না হয়ে যাবো.” (বুখারী- মুসলিম)
و لهما عنه قال : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: (( ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبُّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا اللَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ)) وَفِي رواية : (( لا يَجِدُ أَحَدٌ حَلَاوَةَ الإِيمَانِ حَتَّى)) إلى آخره
অর্থাৎ, বুখারী ও মুসলিমে আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তিনটি জিনিস যার মধ্যে থাকবে সে-ই ঈমানের মিষ্টতা লাভ করবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হবে তার নিকট অন্যদের অপেক্ষা সব থেকে প্রিয়। সে মানুষকে আল্লাহরই নিমিত্তে ভালবাসবে। কুফরী থেকে তাকে আল্লাহর নিষ্কৃতি দেওয়ার পর, তাতে ফিরে যাওয়াকে সে ঐরূপ অপছন্দ করবে, যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে সে অপছন্দ করে।” অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ((কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের মিষ্টতা লাভ করবে না, যতক্ষণ না- --)) হাদীসের শেষ পর্যন্ত,
وَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ : (( مَنْ أَحَبَّ فِي اللَّهِ، وَأَبْغَضَ فِي اللَّهِ، وَوَالَى فِي الله، وَعَادَى فِي اللهِ، فَإِنَّمَا وَلايَةَ اللهِ بِذَلِكَ، وَلَن يَجِدَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ، وَإِنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ وَصَوْمُهُ، حَتَّى يَكُوْنَ كَذَلِكَ، وَقَدْ صَارَ عَامَةُ مُؤَاخَاةِ النَّاسِ عَلَى أَمْرِ الدُّنْيَا، ذَلِكَ لا يُجْدِى عَلَى أَهْلِهِ شَنْياً)) رواه ابن جرير
অর্থাৎ, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে আল্লাহর নিমিত্তে ভালবাসে, আল্লাহর নিমিত্তে ঘৃণা করে এবং আল্লাহর নিমিত্তে বন্ধুত্ব করে ও আল্লাহর নিমিত্তে শত্রুতা করে, সে এর দ্বারা আল্লাহর ভালবাসা লাভ করে। আর এই রকম না হওয়া পর্যন্ত কোন বান্দা ঈমানের মিষ্টতা লাভ করতে পারবে না, যদিও তার নামায ও রোযা অধিক হয়ে থাকে। বস্তুতঃ পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন হয়ে থাকে। তবে এতে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনকারীর প্রকৃত স্বার্থ সিদ্ধি হবে না।” (ইবনে জারির)
আল্লাহর এই বাণীর "এবং তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে" ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে, প্রকৃত ভালবাসা।
যে মসলাগুলো জানা গেলো
১. সূরা বাক্বারার আয়াতের তাফসীর।
২. সূরা তাওবার আয়াতের তাফসীর।
৩. রাসূলুল্লাহ -এর ভালবাসাকে জান-মাল ও পরিবারবর্গের ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেওয়া ওয়াজিব।
৪. ঈমানের অস্বীকৃতি, ইসলাম থেকে বহিষ্কারের দলীল নয়।
৫. ঈমানের স্বাদ আছে কখনো মানুষ তা পায়, আবার কখনো পায় না।
৬. চারটি অন্তর সম্পর্কিত আমল, যার ব্যতিরেকে আল্লাহর ভালবাসা পাওয়া যায় না এবং তা ব্যতীত ঈমানের স্বাদও কেউ পায় না।
৭. ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সাধারণত দুনিয়ার স্বার্থেই হয়ে থাকে। এই বাস্তব ব্যাপারটি সাহাবীর উপলব্ধি।
৮. "এবং তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হবে" এই আয়াতের ব্যাখ্যা।
৯. মুশরিকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিলো, যে আল্লাহকে দারুণ ভালবাসতো।
১০. যার নিকট (আয়াতে উল্লিখিত) আটটি জিনিস বেশী প্রিয়, তার প্রতি ধমক।
১১. যে আল্লাহর কোন অংশীদার স্থাপন করে তাকে আল্লাহর মত ভালবাসলে, তার এ কাজ বড় শির্ক হিসাবে গণ্য হবে।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ
আল্লাহর বাণী, "অনেক মানুষ এমনও রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে." তাওহীদের মূল ও তার প্রাণ হলো, নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা পোষণ করা। আর এটাই হলো আল্লাহর প্রকৃত ইবাদত, যতক্ষণ না বান্দার ভালবাসা তার প্রতিপালকের জন্য পূর্ণ হবে এবং সকল ভালবাসার ঊর্ধ্বে তাঁর ভালবাসা স্থান পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করবে না। আর বান্দার সকল ভালবাসা হবে এই ভালবাসার অনুগত, যার উপর বান্দার সৌভাগ্য ও মুক্তি নির্ভরশীল, আর এই ভালবাসাকে পূর্ণকারী জিনিসের মধ্যে হলো, আল্লাহর নিমিত্তে ভালবাসা, কাজেই আমল ও ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আল্লাহ যা ভালবাসেন, সেও তা ভাল-বাসবে এবং তিনি যা ঘৃণা করেন, সেও তা ঘৃণা করবে, তাঁর ওলীদের সাথে বন্ধুত্ব রাখবে এবং তাঁর দুশমনদের সাথে শত্রুতা রাখবে, এরই মাধ্যমে বান্দার ঈমান ও তার তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করবে।
আল্লাহর সৃষ্টির কাউকে তাঁর অংশীদার স্থাপন করে তাদেরকে তাঁর মত করে ভালবাসা, তাদের আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রাধান্য দেওয়া এবং তাদের ধ্যানে ও তাদের নিকট প্রার্থনা করাতে নিবিষ্ট থাকা হলো বড় শির্ক, যা ক্ষমা করবেন না। এই শির্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার অন্তর পরাক্রমশীল আল্লাহর ভালবাসা থেকে ছিন্ন করে অন্যের সাথে জুড়ে যে তার জন্য কিছুই করতে পারে না। মুশরিকদের অবলম্বিত এই অনর্থক মাধ্যম সেই কিয়ামতের দিন টুটে যাবে, যখন বান্দা তার আমলের প্রতিদানের অত্যাধিক প্রয়োজন বোধ করবে। আর তখন এই ভালবাসা ও বন্ধুত্ব বিদ্বেষ ও শত্রুতায় পরিণত হবে।
জেনে রেখো, ভালবাসা তিন প্রকারের, যথা,
প্রথমতঃ, আল্লাহর ভালবাসা, যা ঈমান ও তাওহীদের মূল।
দ্বিতীয়তঃ, আল্লাহর নিমিত্তে কাউকে ভালবাসা, যেমন, আল্লাহর ওলীদের, তাঁর রাসূলগণ ও তাঁদের অনুসারীদেরকে ভালবাসা। আমল, কাল ও স্থানসমূহের মধ্যে যা আল্লাহ ভালবাসেন, তা ভালবাসা। এই ভালবাসা আল্লাহর ভালবাসার ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় এবং তার পরিপূরক।
তৃতীয়তঃ, আল্লাহর সাথে কাউকে ভালবাসা। আর এই হলো মুশরি- কদের তাদের উপাস্য এবং শরীকদেরকে ভালবাসা, যা তারা বৃক্ষ, পাথর, মানুষ এবং ফেরেশতা প্রভৃতির মধ্য থেকে বানিয়ে নিয়ে ছিলো। এটাই হলো প্রকৃত শির্ক ও তার ভিত্তি। চতুর্থ আরো এক ভালবাসা পাওয়া যায়, যা প্রাকৃতিক ভালবাসা। যে ভালবাসার কারণে বান্দা তিরস্কৃত হয় না। যেমন, পানাহার, বিবাহ, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সুন্দর জীবন লাভ ইত্যাদির প্রতি ভালবাসা। এগুলো যদি বৈধ পন্থায় হয় এবং এগুলোর দ্বারায় যদি আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর অনুসরণের সাহায্য গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা ইবাদতের অধ্যায়ে পড়বে। কিন্তু যদি এগুলো ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকারী হয় এবং যদি এগুলোর দ্বারা এমন কাজের সাহায্য গ্রহণ করা হয়, যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তাহলে তা নিষিদ্ধ বস্তুর পর্যায় পড়বে। অন্যথায় তা বৈধ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।