📄 এই উম্মতের অনেকেই মূর্তিপূজা করবে
এই উম্মতের অনেকেই মূর্তির পূজা করবে
মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ ٱلْكِتَٰبِ يُؤْمِنُونَ بِٱلْجِبْتِ وَٱلطَّـٰغُوتِ ۚ ﴾ [النساء : ٥١]
অর্থাৎ, “তুমি কি তাদেরকে দেখো নি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও তাগুতকে.” (সূরা নিসাঃ ৫১) তিনি আরো বলেন,
﴿ قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُم بِشَرٌّ مِّن ذَٰلِكَ مَثُوبَةً عِندَ ٱللَّهِ ۚ مَن لَّعَنَهُ ٱللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ ٱلْقِرَدَةَ وَٱلْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ ٱلطَّـٰغُوتَ ۚ ﴾ [المائدة: ٦٠]
অর্থাৎ, "বলো, আমি তোমাদেরকে বলি, তাদের মধ্যে কার মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, যাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন এবং যারা শয়তানের ও তাগুতের ইবাদত করেছে” (সূরা মায়েদাঃ৬০) তিনি অন্যত্র বলেন,
قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَتَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَسْجِدًا﴾ (الكهف: ۲۱)
"তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো, তারা বললো, আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে মসজিদ নির্মাণ করবো.” (সূরা কাহফঃ ২১)
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَذْوَ الْقُدَّةِ بِالْقُذَّةِ، حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَدَخَلْتُمُوهُ، قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى؟ قَالَ: ((فَمَنْ)) أخرجاه
অর্থাৎ, আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় তোমরা তোমাদের পূর্বের জাতির ভ্রান্ত নীতির পূর্ণ অনুসরণ করবে। এমনকি তারা যদি গুই সাপের গর্তে প্রবেশ করে, তবে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে” সাহাবায়ে কেরামগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কি ইয়াহুদী ও খ্রীস্টান? তিনি বললেন, তারা ছাড়া আবার কে?' (বুখারী-মুসলিম)
والمسلم عَنْ ثَوْبَانَ رضي الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: ((إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِي الْأَرْضَ فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَإِنَّ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا ، وَأُعْطِيتُ الْكَنْزَيْنِ : الْأَحْمَرَ وَالْأَبْيَضَ، وَإِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي لِأُمَّتِي أَنْ لَا يُهْلِكَهَا بِسَنَةٍ عَامَّةٍ، وَأَنْ لَا يُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ،
وَإِنَّ رَبِّي قَالَ يَا مُحَمَّدُ، إِنِّي إِذَا قَضَيْتُ قَضَاءَ فَإِنَّهُ لَا يُرَدُّ، وَإِنِّي أَعْطَيْتُكَ لِأُمَّتِكَ أَنْ لَا أُهْلِكَهُمْ بِسَنَةٍ عَامَّةٍ، وَأَنْ لَا أُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنفُسِهِمْ يَسْتَبِيحُ بَيْضَتَهُمْ، وَلَوْ اجْتَمَعَ عَلَيْهِمْ مَنْ بِأَقْطَارِهَا، حَتَّى يَكُونَ بَعْضُهُمْ يُهْلِكُ بَعْضًا وَيَسْبِي بَعْضُهُمْ بَعْضًا))
অর্থাৎ, মুসলিম শরীফে সোবান থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহ আমার জন্য যমীনকে একত্রিত করে দিলেন, তখন আমি তার পশ্চিম ও পূর্ব পর্যন্ত দেখলাম, আর আমার উম্মতের রাজত্ব ঐ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে, যতদূর পর্যন্ত আমার জন্য একত্রিত করা হয়েছে, আর আমি লাল শুভ্র বর্ণের দু'টি ধন-ভান্ডার লাভ করলাম, আর আমার প্রতিপালকের নিকট চাইলাম যে, তিনি যেন আমার উম্মতকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষে ধ্বংস না করেন এবং বাইরের এমন শত্রু যেন তাদের উপর চাপিয়ে না দেন, যারা তাদেরকে ধ্বংস করে ছাড়বে। আমার প্রতিপালক বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি যখন কোন বিষয়ের ফয়সালা করে নিই, তখন তা আর রদ্দ হয় না। আমি তোমার উম্মতের ব্যাপারে তোমার প্রার্থনা কবুল করলাম যে, তাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষে ধ্বংস করবো না। আর বাইরের এমন কোন শত্রুকে তাদের উপর চাপিয়ে দিবো না, যারা তাদের সম্পদ লুটে খাবে, যদিও বিশ্ববাসী তাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে ওঠেপড়ে লাগে। অবশ্য তারা আপসে একে অপরকে হত্যা করবে এবং একে অপরকে বন্দী করবে.'
এই হাদীসটি হাফেয বুরক্বানী তাঁর সহী গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং তিনি নিম্নের বাক্যগুলো বৃদ্ধি করেছেন,
وَإِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي الْأَئِمَّةَ الْمُضِلَّينَ، وَإِذَا وَقَعَ السَّيْفُ عَلَيْهِمْ لَمْ يُرْفَعْ عَنْهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَلَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ، وَحَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي الْأَوْثَانَ، وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلَاثُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ، لَا نَبِيَّ بَعْدِي، وَلَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي على الحق لا يضرهم من خذلهم حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ))
অর্থাৎ, “আমি আমার উম্মতের উপর বিভ্রান্ত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির আশঙ্কা বোধ করছি, তাদের উপর একবার তরবারী নেমে এলে, কিয়ামত পর্যন্ত তা আর খাপবদ্ধ হবে না। আর যতক্ষণ না আমার উম্মতের একটি দল মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে এবং যতক্ষণ না আমার উম্মতের একটি দল মূর্তি পূজায় লিপ্ত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত কায়েম হবে না। আর আমার উম্মত থেকে ৩০ জন এমন মিথ্যুকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা সকলেই নিজেকে নবী মনে করবে। অথচ আমি শেষ নবী। আমার পর কোন নবী নেই। আর আমার উম্মতের একটি দল সত্যের উপর বিজয় থাকবে। তাদের কেউ অনিষ্ঠ করতে চাইলে, তা করতে পারবে না, এমনকি আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশ এসে পৌঁছবে।”
যে বিষয়গুলো জানা গেলো,
১. সূরা নিসার আয়াতের তাফসীর,
২. সূরা মায়েদার আয়াতের তাফসীর,
৩. সূরা কাহফের আয়াতের তাফসীর।
৪. গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, 'জিবত' ও 'তাগুত'এর উপর ঈমান আনার অর্থ কি? তার অর্থ কি অন্তরের বিশ্বাস, নাকি তাদের প্রতি ঈমান পোষণকারীদেরকে ঘৃণা করা সত্ত্বেও আমলে তাদের শরীক ও অনুকূল থাকা?
৫. কাফেরদের কুফরী সম্পর্কে অবহিত থাকা সত্ত্বেও মুশরিকরা মনে করে যে, তারা মু'মিনদের থেকে বেশী সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত।
৬. এই উম্মতের মধ্যেও এমন লোক অবশ্যই পাওয়া যাবে, যার উল্লেখ আবূ সাঈদ থেকে বর্ণিত হাদীসে হয়েছে।
৭. এই উম্মতের অনেক জনসমষ্টিতে মূর্তি পূজার প্রচলন শুরু হবে।
৮. এই উম্মত থেকে এমন লোকের তাবির্ভাব ঘটবে, যে নবী হওয়ার দাবী করবে যেমন মুখতার নামক এক ব্যক্তি করেছিলো, সে কালেমার পাঠক ছিলো। বিশ্বাস করতো রাসূল সত্য এবং কুরআনও সত্য। আর এই কুরআনেই আছে যে, মুহাম্মাদ শেষ নবী। সাহাবীদের শেষ যুগে মুখতারের আবির্ভাব ঘটে ছিলো, আবার অনেকেই তার অনুসরণ করেছিলো।
৯. এটা একটি সুখবর যে, সত্য একেবারে শেষ হয়ে যাবে না, বরং এর উপর একটি দল কায়েম থাকবে।
১০. আহলে হক্বের সব থেকে বড় নিদর্শন হলো, তাঁরা সংখ্যায় অল্প হলেও, তাঁদের দুর্নামকারীরা ও তাঁদের বিরোধিতাকারীরা তাঁদের কোন অনিষ্ট করতে পারবে না।
১১. আহলে হক্বদের অস্তিত্ব কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
১২. (হাদীস থেকে রাসুলুল্লাহ -এর) বড় বড় কিছু নিদর্শন প্রমাণিত হয়। যেমন, আল্লাহর তাঁর জন্য পূর্ব ও পশ্চিমের যমীনকে একত্রিত করে দেওয়া, তিনি যেভাবে খবর দিয়েছেন, সেইভাবেই তা সংঘটিত। হওয়া, তিনি খবর দিয়েছেন যে, তাঁকে দু'টি ধন-ভান্ডার দেওয়া হয়েছে, তিনি খবর দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাঁর উম্মতের ব্যাপারে দু'টি প্রার্থনা কবুল করেছেন, তিনি খবর দিয়েছেন যে, তাঁর তৃতীয় প্রার্থনা গৃহীত হয় নি. তিনি খবর দিয়েছেন যে, (উম্মতের উপর) তরবারী নেমে এলে, কিয়ামত পর্যন্ত তা উঠবে না. তিনি খবর দিয়েছেন যে, মানুষরা আপসে একে অপরকে হত্যা করবে এবং বন্দী করবে. তিনি উম্মতের মধ্যে ভ্রান্ত নেতাদের আবির্ভাবের আশঙ্কা বোধ করেছেন, তিনি এ খবরও দিয়েছেন যে, এই উম্মতে নবুওয়াতের দাবীদারের উদ্ভব ঘটবে তিনি এ খবরও দিয়েছেন যে, একদল লোক সত্যের উপর কায়েম থাকবে. এই সব ব্যাপার জ্ঞানের বহির্ভূত হলেও, তিনি যেভাবে খবর দিয়েছেন, সেভাবেই সংঘটিত হয়েছে, ১৩. রাসূলুল্লাহ নিজের উপর শুধু ভ্রান্ত নেতাদের আশঙ্কা বোধ করেছেন.
১৪. তিনি মূর্তি পূজার অর্থ সম্পর্কে অবহিত করিয়েছেন
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এই অধ্যায়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো, শির্কের ব্যাপারে সতর্ক করা ও ভয় দেখানো এবং এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া যে, এই উম্মতের মধ্যে এটা অতি বাস্তব বিষয়, আর এতে সেই ব্যক্তির ধারণার খন্ডন করা হয়েছে, যে মনে করে যে, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠকারী ইস- লামের উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যদিও সে তাওহীদ বিরোধী কোন কাজ করে. যেমন, কবরবাসীদের নিকট দুআ ও ফরিয়াদ করা. তার এই ধারণাও বাতিল যে, এটা অসীলা, ইবাদত নয়, কারণ, আরবী শব্দ 'আল অযান' সেই সমস্ত উপাস্যদের বলা হয় আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করা হয়, তাতে তা বৃক্ষাদি, পাথর ও কোন ইমারত হোক বা তারা আম্বিয়া এবং সৎ ও অসৎ লোকদের কেউ হোক না কেন, এখানে এ সবের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, কেননা, ইবাদত হলো একমাত্র আল্লাহর অধিকার। সুতরাং যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহকে আহ্বান করবে অথবা তার ইবাদত করবে, সে তাকে উপাস্যরূপে গ্রহণকারী বিবেচিত হবে এবং এরই জন্য সে ইসলাম বহির্ভূত গণ্য হবে। তার নিজেকে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত করা কোন উপকারে আসবে না। বহু মুশরিক, ধর্মদ্রোহী এবং কাফের ও মুনাফেক নিজেকে মুসলমান মনে করেছে। (কিন্তু তারা কেউ প্রকৃত- পক্ষে মুসলমান ছিলো না)। দ্বীনের বিধি-বিধানের উপর কায়েম থাকাই হলো আসল লক্ষণীয়, নাম ও মৌখিক স্বীকৃতির কোন মূল্য নেই।
📄 যাদু প্রসঙ্গে
যাদু প্রসঙ্গে
মহান আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ ﴾ [البقرة: ١٠٢]
অর্থাৎ, “তারা ভালরূপে জানে যে, যে কেউ যাদু অবলম্বন করে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই।” (সূরা বাক্বারাঃ ১০২) তিনি আরো বলেন,
يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ ﴾ (النساء: ٥٠)
অর্থাৎ, “তারা প্রতিমা ও শয়তানের উপর আস্থা রাখে।” (সূরা নিসাঃ ৫১)
উমার বলেন, 'জিবত' বলতে যাদু বুঝায়, আর 'তাগুত' বলতে শয়তান বুঝায়।
জাবির বলেন, 'তাওয়াগীত' বলতে ঐ সব গণৎকার, যাদের উপর শয়তান অবতরণ করে থাকে, প্রত্যেক গোত্রে একজন করে থাকে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ﷺ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ: ((اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ، قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ، وَمَا هُنَّ ؟ قَالَ : الشَّرْكُ بِاللهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ ))
অর্থাৎ, আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "সাতটি ধ্বংসকারী জিনিস থেকে বাঁচো." সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কি কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু, কোন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সূদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং সাদাসিধা ও সতী মু'মিন মহিলার উপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।” (বুখারী-মুসলিম)
عَنْ جُنْدُبٍ مَرْفُوعاً: (( حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ)) رواه الترمذي وقال: الصحيح أنه موقوف.
অর্থাৎ, জুন্দুব থেকে মার্কু সূত্রে বর্ণিত যে, যাদুকরের শাস্তি হলো, তাকে তরবারী দ্বারা হত্যা করা। (ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, সঠিক কথা হলো, হাদীসটি মাওকুফ,
وَفِي صَحِيحِ الْبُخَارِي عَنْ بَجَالَةَ بْنِ عَبْدَةَ قَالَ: كَتَبَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ : أَنِ اقْتُلُوْا كُلَّ سَاحِرٍ وَ سَاحِرَةٍ، قَالَ: فَقَتَلْنَا ثَلَاثَ سَوَاحِر))
অর্থাৎ, সহী বুখারীতে বাজালা ইবনে আবদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার ইবনে খাত্তাব এই মর্মে লিখিত নির্দেশ জারী করেন যে, তোমরা প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ এবং প্রত্যেক যাদুকারিণী মহিলাকে হত্যা করো, ফলে আমরা তিনজন যাদুকরকে হত্যা করি। সহী সূত্রে হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর একজন দাসী তাঁকে যাদু করলে, তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন, ফলে তাকে হত্যা করা হয়। অনুরূপ জুন্দুব থেকে সহী সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম আহমদ বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর তিনজন সাহাবী থেকে এর প্রমাণ রয়েছে।
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. সূরা বাক্বারার আয়াতের তাফসীর। ২. সূরা নিসার আয়াতের তাফসীর। ৩. 'জিবত' ও 'তাগুত' এর ব্যাখ্যা এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য। ৪. 'তাগুত' জ্বিনদের মধ্যে থেকেও হতে পারে, আবার মানুষদের মধ্যে থেকেও হতে পারে। ৫. নিষিদ্ধ সাতটি সর্বনাশী বস্তুর জ্ঞান লাভ। ৬. যাদুকর কাফের। ৭. তাকে হত্যা করা হবে। তাকে তাওবা করতে বলা হবে না। ৮. উমার -এর যুগে যাদুকর থাকলে, তার পরের যুগে থাকা স্বাভাবিক।
📄 যাদুর প্রকার
যাদুর কয়েকটি প্রকার
ইমাম আহমদ (রাহঃ) বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনে জা'ফার হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাদেরকে আউফ হায়্যান ইবনে আ'লা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাদেরকে ঝুতন ইবনে ক্বাবীসা তাঁর পিতা হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী করীম কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেছেন,
(( إِنَّ العِيَافَةَ وَالطَّرْقَ وَالطَّيَرَةَ مِنَ الْجِبْتِ))
"নিশ্চয় 'ইয়াফা', 'তারকা' এবং 'তিয়ারাহ' যাদুর অন্তর্ভুক্ত." আউফ বলেন, 'ইয়াফা' হলো পাখী তাড়া করা। আর 'তারকা' হলো, সেই দাগ, যা যমীনে আঁকা হয়। 'জিবত' সম্পর্কে হাসান বলেন, তা হলো শয়তানের তন্ত্র-মন্ত্র,
مَنْ اقْتَبَسَ شعبة مِنْ النُّجُومِ اقْتَبَسَ شُعْبَةٌ مِنْ سِحْرٍ زَادَ مَا زَادَ)) رواه
أبو داود، إسناده صحيح
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি কিছু জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা করলো, সে যেন কিছু যাদু শিক্ষা করলো, যত বেশী সে ঐ বিদ্যা শিখবে, তত বেশী সে যাদু শিখবে,।” (আবু দাউদ) এই হাদীসের সনদ সহীহ।
নাসায়ী শরীফে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, ((যে ব্যক্তি কোন কিছুতে গিরে লাগিয়ে তাতে ফুঁক দেয়, সে যাদু করে। আর যে যাদু করে, সে শির্ক করে। আর যে ব্যক্তি কোন কিছু ঝুলায়, তাকে তারই উপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হয়)).
عَنْ ابْنِ مَسْعُودٍ له أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: أَلَا أُنَبِّئُكُمْ مَا الْعَضْهُ؟ هِيَ النَّمِيمَةُ، الْقَالَةُ بَيْنَ النَّاسِ)) رواه مسلم
ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "আমি তোমাদেরকে দাঁত কাটা কাকে বলে সেই খবর দিবো কি? তা হলো চুগলী করা, মানুষের মাঝে কথা ছড়ানো।” (মুসলিম)
وَهُمَا عَن ابْنِ عُمَرَ الله، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: (( إِنَّ مِنَ البَيَانِ لَسِحْراً))
অর্থাৎ, বুখারী ও মুসলিম শরীফে ইবনে উমার থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “অবশ্যই কোন কোন বক্তব্যে যাদু হয়."
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. 'ইয়াফা, 'তারকা' এবং 'তিয়ারা' যাদুর অন্তর্ভুক্ত। ২. উল্লিখিত জিনিসগুলোর ব্যাখ্যা। ৩. জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা করা যাদুর অন্তর্ভুক্ত। ৪. গিরেতে ফুঁক দেওয়াও যাদুর আওতাভুক্ত। ৫. চুগলী করাও এক প্রকার যাদু। ৬. অলংকার পূর্ণ অনেক কথাও যাদুর আওতায় পড়ে।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তাওহীদের অধ্যায়ে যাদুর প্রসঙ্গ নিয়ে আসার কারণ হলো, বহু প্রকারের যাদু এমনও রয়েছে, যা শির্ক ও খবীস আত্মার মাধ্যম গ্রহণ ব্যতীত যাদুকর তার লক্ষ্যে সফলকাম হয় না। সুতরাং বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত পাক্কা তাওহীদবাদী হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে অল্প-বেশী সমস্ত রকমের যাদু ত্যাগ করবে। আর এরই কারণে বিধানদাতা যাদুকে শির্কের সাথে সংযুক্ত করেছেন। যাদু দুই দিক দিয়ে শির্কের আওতায় পড়ে। এক দিক হলো, এতে শয়তানকে কাজে লাগানো হয়। তাদের সাথে সম্পর্ক কায়েম করতে হয়। আবার অনেক সময় তাদের খেদমত নেওয়ার জন্যে ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের নিকট যা পছন্দনীয় তার নজরানা পেশ করতে হয়। আর দ্বিতীয় দিক হলো, এতে অদৃশ্য জ্ঞানের এবং আল্লাহর জ্ঞানে শরীক হওয়ার দাবী করা হয়। আর যাদুর জন্য এমন নিয়ম-পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়, যা শির্ক ও কুফ্রীর আওতাভুক্ত জিনিস। অনুরূপ এতে রয়েছে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং জঘন্য কার্যকলাপ, যেমন, হত্যা করা, দুই ব্যক্তি মধ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রেম-প্রীতি নষ্ট করা, কাউকে কারো থেকে বিমুখ করা, আবার কাউকে কারো প্রতি আকৃষ্ট করা এবং বিবেক-বুদ্ধির বিকৃতি ঘটানোর প্রচেষ্টা করা। আর এগুলো হলো, জঘন্যতম হারাম জিনিস, কেননা, এগুলো শির্ক ও তার উপকরণের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু যাদুকর অত্যধিক অনিষ্টকারী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, সেহেতু তাকে হত্যা করা অত্যাবশ্যক।
অনেক মানুষের মধ্যে প্রচলিত চুগলীও যাদুর অন্তর্ভুক্ত জিনিস। কারণ, তারাও যাদুতে অংশ গ্রহণ করে, যেমন, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা, ভালবাসার উপর প্রতিষ্ঠিত দুই ব্যক্তির অন্তরকে পরিবর্তন করে দেওয়া এবং তাদের অন্তরে মন্দ জিনিস ভরে দেওয়া। কাজেই যাদু হলো অনেক প্রকারের ও বহু ধরনের। এর কোন প্রকার অন্য প্রকারের থেকে জঘন্য ও নিকৃষ্ট।
📄 গণৎকার প্রসঙ্গে
গণৎকার ইত্যাদি প্রসঙ্গে
روى مسلم في صحيحه عَنْ بَعْضِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ ﷺ عَنْ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ يَوْمًا))
ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে নবী করীম -এর কোন কোন স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যে ব্যক্তি গায়েব জানার দাবীদারের নিকট এসে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করবে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায গৃহীত হবে না।"
(( مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ )) رواه أبو داود
আবূ হুরাইরা নবী করীম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি গণকের নিকট এসে তার কথার সত্যায়ন করলো, সে ঐ জিনিসের অস্বীকার করলো, যা মুহাম্মাদ-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।” (আবূ দাউদ)
وللأربعة والحاكم، وقال: صحيح على شرطهما، عن أبي هريرة، ((مَنْ أَتَى عَرَّافاً أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ))
সুনানে আরবা' ও হাকিমেও এই হাদীস বর্ণিত হয়েছে, ইমাম হাকিম বলেন, এই হাদীস বুখারী ও মুসলিমের শর্ত মুতাবেক, আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত যে, "যে ব্যক্তি গায়েব জানার দাবীদারের নিকট অথবা গণকের নিকট এসে তার কথার সত্যায়ন করলো, সে ঐ জিনিসের তাস্বীকার করলো, যা মুহাম্মাদ -এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে” আবূ ইয়া'লা ভাল সনদে ইবনে মাসউদ থেকে মাওকুফ সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ مَرْفُوْعاً : (( لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ أَوْ تُطَيِّرَ لَهُ، أَوْ تَكَهَّنَ أَوْ تُكَهَّنَ لَهُ، أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُ ، وَمَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ))
ইমরান ইবনে হুসাইন থেকে মার্ক' সূত্রে বর্ণিত যে, (রাসূলুল্লাহ বলেছেন,) “সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে পাখী তাড়া ক'রে ভাগ্য নির্ণয় করে অথবা যার জন্য পাখী তাড়ানো হয় কিংবা যে গণক হয় বা যার জন্য গণনা করা হয় অথবা যে যাদু করে কিংবা যার জন্য যাদু করা হয়। আর যে গণকের নিকট এসে তার কথার সত্যায়ন করে, সে ঐ জিনিসের অস্বীকার করে, যা মুহাম্মাদ-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে.” (বাযযার)
ইমাম বাগবী বলেন, 'আররাফ' হলো ঐ ব্যক্তি, যে দাবী করে যে, সে বিশেষ নিয়মের মাধ্যমে অনেক কিছুই তাবহিত আছে, চোরাই মাল ও তার স্থান সম্পর্কেও সে বলতে পারে। আবার কেউ কেউ বলে 'আররাফ' হলো 'কাহেন' এর তাপর নাম. আর কাহেন হলো ঐ ব্যক্তি, যে ভবিষ্যৎ জ্ঞানের দাবী করে। আবার কেউ কেউ বলে, 'কাহেন' হলো ঐ ব্যক্তি, যে অন্তরের খবর বলে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা বলেন, 'আররাফ' হলো, গণৎকার, জ্যোতিষী এবং রাম্মাল ইত্যাদির তাপর নাম, যারা নিজেদের বিশেষ নিয়মের ভিত্তিতে অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী করে. আর যারা 'আবযাদ' অক্ষরগুলো লিখে তারার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কোন কিছুর দাবী করে, তাদের সম্পর্কে ইবনে আব্বাস বলেন, আমি মনে করি যারা এরূপ করে, তাদের আখেরাতে কোন অংশ নেই।
যে বিষয়গুলো জানা গেলো ১. কুরআনের প্রতি বিশ্বাস, আর গণকের কথার সত্যায়ন, এই জিনিস দু'টি একত্রে জমা হতে পারে না। ২. গণৎকারের কথার সত্যায়ন করা হলো কুফরী কাজ। ৩. যার জন্য ভাগ্য গণনা করা হয়, তার উল্লেখ। ৪. পাখী তাড়িয়ে যার জন্য ভাগ্য পরীক্ষা করা হয়, তার উল্লেখ। ৫. যার জন্য যাদু করা হয়, তার উল্লেখ। ৬. 'আবজাদ' অক্ষরগুলো যে শিখে, তার উল্লেখ। ৭. 'কাহেন' ও 'আররাফ' এর মধ্যে পার্থক্য কি তার উল্লেখ।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ- এই অধ্যায় হলো গণৎকার ইত্যাদি প্রসঙ্গে, অর্থাৎ, যারা বিভিন্ন কলাকৌশলের মাধ্যমে অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী করে, তাদের প্রসঙ্গে। গায়েবের ইল্ম এক ও এককভাবে কেবল মহান আল্লাহই রাখেন। কাজেই যে ব্যক্তি গণনা ও ভবিষ্যদ্বাণী করে অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী করবে অথবা যে দাবী করে, তার সত্যায়ন করবে, সে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যে অন্যকে অংশীদার স্থাপনকারী বিবেচিত হবে এবং আল্লাহর ও তাঁর রাসূলকে মিথ্যুক সাব্যস্তকারী গণ্য হবে। গণনা সংক্রান্ত বহু শয়তানী কার্যকলাপ না তো শির্ক থেকে মুক্ত, আর না এমন মাধ্যম অবলম্বন করা থেকে মুক্ত, যদ্দ্বারা অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী করার উপর সাহায্য গ্রহণ করা হয়, অতএব তা আল্লাহর জন্য।
নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যে শরীক হওয়ার দাবী করার কারণে এবং গায়রুল্লাহর নৈকট্য কামনা করার কারণে শির্ক গণ্য হবে। আল্লাহ সৃষ্টিকে এখানে এমন কুসংস্কার থেকে দূরে রেখেছেন, যা তার দ্বীন ও বুদ্ধিকে নষ্ট করে দেয়।