📄 শাফাআ’ত প্রসঙ্গে
শাফাআ'ত প্রসঙ্গে
মহান আল্লাহ বলেন,
وَأَنْذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْ يُحْشَرُوا إِلَى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُمْ مِنْ دُونِهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ ﴾ [الأنعام: ٥١]
অর্থাৎ, "আপনি এ কুরআন দ্বারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়ার যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না।” (সূরা আনআমঃ ৫ ১) তিনি আরো বলেন,
قُل لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا الزمر : ٤٤
অর্থাৎ, “বলুন, সমস্ত সুপারিশ আল্লাহরই ক্ষমাধীন.” (সূরা যুমারঃ ৪৪) তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ﴾ (বাক্বারা: ২৫৫)
অর্থাৎ, “কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?” (সূরা বাক্বারাঃ২৫৫) তিনি আরো বলেন,
﴿وَكَمْ مِنْ مَلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللهُ لَمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى ﴾ [النجم: ٢٦]
অর্থাৎ, “আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না, যতক্ষণ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন, অনুমতি না দেন.” (সূরা নাজমঃ২৬) আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন,
﴿قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الأَرْضِ ﴾ [سبأ : ٢٢-٢٣]
অর্থাৎ, “বলুন, তোমরা তাদেরকে আহ্বান করো, যাদেরকে উপাস্য মনে করতে আল্লাহ ব্যতীত, তারা নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের অণু পরিমাণ কোন কিছুর মালিক নয়, এতে তাদের কোন অংশ নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়, যার জন্যে অনুমতি দেওয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না.” (সূরা সাবাঃ ২২-২৩)
আবুল আব্বাস (ইবনে তাইমিয়া) বলেন, মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত যে সবের উপর আস্থা রেখেছিলো, আল্লাহ সে সবের অস্বীকৃতি ঘোষণা করেন, কাজেই গায়রুল্লাহর কোন কিছুর মালিক হওয়া অথবা কোন কিছুতে তাদের অংশ থাকা বা আল্লাহর সাহায্যকারী হওয়া সব কিছুর অস্বীকার করেছেন, এখন সুপারিশের ব্যাপারটা বাকী ছিলো, তাই বলে দেওয়া হলো যে, এই সুপারিশ কেবল তারই উপকারে আসবে, যার জন্য আল্লাহ অনুমতি দিবেন, যেমন আল্লাহ বলেন, "তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট.” (সূরা আম্বিয়াঃ ২৮) সুতরাং মুশরিকরা কিয়ামতের দিন যে সুপারিশ ফল-প্রসূ হবে বলে মনে করে, কুরআর তার তাস্বীকৃতি দেয়, আর নবী করীম বলেছেন,
(( إِنَّهُ يَأْتِ فَيَسْجُدُ لِرَبِّهِ وَيَحْمَدُهُ لَا يَبْدَأُ بِالشَّفَاعَةِ أَوَّلاً - ثُمَّ يُقَالُ لَهُ : ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَقُلْ تُسْمَعْ ، وَسَلْ تُعْطَ وَاشْفَعْ تُشَفَعْ))
অর্থাৎ, “তিনি তাঁর প্রতিপালকের সামনে এসে সিজদা করবেন এবং অনেক প্রশংসা করবেন, তিনি প্রথমেই সুপারিশ করতে আরম্ভ করবেন না. অতঃপর তাকে বলা হবে, তুমি মাথা তুলো. তুমি বলো, তোমার কথা শোনা হবে. তুমি চাও, তোমাকে দেওয়া হবে. তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে.” আবূ হুরাইরা রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করেন,
(( مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : ((مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ))
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে কে আপনার সুপারিশ দ্বারা সর্বাধিক ধন্য হবে? তিনি বললেন, “যে নিষ্ঠার সাথে অন্তর থেকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-পাঠ করবে।” তাই এই সুপারিশ হবে আল্লাহর অনুমতিতে নিষ্ঠাবানদের জন্যে, আল্লাহর সাথে শরীককারীদের জন্যে হবে না।
প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ তা'য়ালা নিষ্ঠাবান লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন এবং যিনি সম্মান প্রাপ্ত হয়ে শাফাআ'তের অনুমতি লাভ করেছেন এবং ‘মাক্কামে মাহমুদ’ লাভ করেছেন, তাঁর দোআর মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন, সেই শাফাআ'তের কুরআন তঅস্বীকৃতি দিয়েছে, যাতে শির্ক আছে, আবার কুরআনের অনেক স্থানে আল্লাহর অনুমতিক্রমে শাফাআ'ত সাব্যস্ত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন যে, শাফাআ'ত তাওহীদবাদী ও মুখলেস লোকদের জন্যেই নির্দিষ্ট।
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা। ২. নিষিদ্ধ শাফাআ'তের বর্ণনা। ৩. প্রমাণিত শাফাআতের বর্ণনা। ৪. বড় শাফাআ'তের উল্লেখ আর তা হলো মাক্কামে মাহমুদ। ৫. রাসূলুল্লাহ কিভাবে শাফাআত করবেন, তার বর্ণনা তিনি প্রথমেই শাফাআ'ত করবেন না, বরং আল্লাহর জন্য সিজদা করবেন। যখন তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে, তখন তিনি শাফাআ'ত করবেন। ৬. কে সুপারিশ দ্বারা ধন্য হবে? ৭. মুশরিকদের জন্য সুপারিশ হবে না। ৮. প্রকৃত শাফাআ'তের বর্ণনা।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ
লেখক এখানে (শির্কীয় অধ্যায়ের সাথে) শাফাআ'তের অধ্যায়ের বৃদ্ধি করেছেন, কারণ, মুশরিকরা তাদের শির্ক এবং ফেরেশতা, আম্বিয়া ও ওলীদের নিকট তাদের প্রার্থনা করাকে এইভাবে সঠিক সাব্যস্ত করে যে, আমরা তাঁদের নিকট প্রার্থনা করি, অথচ আমরা জানি যে তাঁরা সৃষ্টি ও অন্যের দাস, কিন্তু যেহেতু আল্লাহর নিকটে তাঁদের রয়েছে সুমহান মর্যাদা ও উচ্চ স্থান, তাই তাঁরা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটে করে দিতে পারবেন এবং আমাদের জন্য তাঁর নিকট সুপারিশও করতে পারবেন, যেমন নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজা-বাদশাহদের নিকট সম্মানী ব্যক্তিদের নৈকট্য লাভ করে তাদেরকে মাধ্যম বানানো হয়, এটা হলো সমস্ত বাতিলের বড় বাতিল, আর এটা হলো যে মহান আল্লাহ এবং সম্রাটের সম্রাটকে সকলই ভয় করে ও যাঁর সামনে সমস্ত সৃষ্টিকুল নতি স্বীকার করে, সেই সত্তার সাথে এমন রাজাদের সাদৃশ্য স্থাপন করা, যারা তাদের রাজত্বের পূর্ণতার জন্য এবং নিজেদের শক্তির বাস্তবায়নের জন্য বহু মন্ত্রী ও সহযোগীর মুখাপেক্ষী হয়, তাই আল্লাহ এই (সুপারিশ লাভের) ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছেন এবং পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সমস্ত সুপারিশ তাঁরই ইখতিয়ারাধীন যেমন সমস্ত রাজত্ব তাঁরই। তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর তিনি যার কথা ও কাজে সন্তুষ্ট, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে অনুমতি দিবেন না। আর তিনি কেবল তার প্রতি সন্তুষ্ট, যে তাওহীদবাদী ও নিষ্ঠাবান আমলকারী।
এখানে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, মুশরিকের জন্য শাফাআ'তের কোন অংশ নেই, এ কথাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে যে শাফাআ'ত বাস্তবায়িত হবে, তা কেবল নিষ্ঠাবানদের জন্যই নির্দিষ্ট। আর এই সমস্ত শাফাআ'ত আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ, সুপারিশকারীর সম্মানার্থে এবং যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তাকে ক্ষমা করার জন্য হবে। তাই সেই সত্তাই প্রশংসা পাবার অধিকারী, যিনি মুহাম্মদ ﷺ কে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং তাকে মাক্কামে মাহমুদ দান করবেন। আর এটাই হবে কুরআন ও হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত শাফাআ'ত। লেখক (রাহঃ) শাফাআ'ত' সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমি- য়্যার যে উক্তির উল্লেখ করেছেন তা-ই যথেষ্ট।
শাফাআ'তের অধ্যায়কে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, সেই সব দলীলগুলো তুলে ধরা, যা প্রমাণ করে যে, যে সমস্ত উপাস্যগুলোকে মুশরিকরা অসীলা ও মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে তাদের উপর আস্থা- বান হয়, তা সবই বাতিল, তারা না নিজেই কোন কিছুরই মালিক, না কোন কিছুতে তারা শরীক, আর না কোন কিছুর সাহায্য-সহযোগিতা তারা করতে পারে, আর না শাফাআ'তের কোন অধিকার তারা রাখে। এই সমস্ত কিছুর মালিক হলেন কেবল আল্লাহ, সুতরাং উপাস্যও একমাত্র তিনিই।
📄 আপনি যাকে চান তাকে হেদায়াত দিতে পারেন না
অধ্যায় 'আপনি যাকে চান, তাকে হেদায়েত দিতে পারেন না'
في الصحيح عن ابن المسيب عن أبيه : أَنَّ أَبَا طَالِبٍ لَّمَا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ دَخَلَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ ﷺ وَعِنْدَهُ وَعَبْدُ اللهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ أَبُو جَهْلٍ فَقَالَ: (( أَيْ عَمَّ، قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، كَلِمَةٌ أَحَاجٌ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ، فَقَالَا يَا أَبَا طَالِبٍ تَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَمْ يَزَلْ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْرِضُهَا عَلَيْهِ وَيُعِيدَانِهِ بِتِلْكَ الْمَقَالَةِ، قَالَ آخِرَ شَيْءٍ كَلَّمَهُمْ بِهِ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أَنَّهَ عَنْهُ فَنَزَلَتْ : ﴿ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ وَنَزَلَتْ: ﴿ إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ ﴾
সহী হাদীসে ইবনুল মুসাইয়্যিব থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতার নিকট হতে বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা বলেন, যখন আবু তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, রাসূলুল্লাহ তার নিকট উপস্থিত হোন, আর তখন তার কাছে ছিলো, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমায়্যা এবং আবূ জেহেল, রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, "হে চাচা, বলুন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এটা একটি বাক্য আমি তার দ্বারা আল্লাহর নিকট আপনার ক্ষমা করিয়ে নিবো।” তখন তারা (আবূ উমায়্যা ও আবু জাহল) তাকে বললো, তুমি কি আব্দুল মুত্তালীবের ধর্ম থেকে ফিরে যেতে চাও? অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। তারাও পুনরাবৃত্তি করলো। আবু তালিবের শেষ বাক্য ছিলো এই যে, সে আব্দুল মুত্তালীবের ধর্মেই কায়েম রয়েছে এবং সে 'লা ইলাহা 'ইল্লাল্লাহ' পড়তে অস্বীকার করে, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো, যতক্ষণ না আমাকে নিষেধ করা হবে।” তখনই আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, “নবী ও মু’মিনদের জন্য মুশরিকদের পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত নয়।” (সূরা তাওবাঃ ১১৩) আর আবূ তালিবের সম্পর্কে আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, “তুমি যাকে চাও তাকে হেদায়েত দিতে পারো না, বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হেদায়েত দান করেন।” (সূরা ক্বাসাসঃ ৫৬)
কতিপয় মসলা জানা গেলো
১. ‘তুমি যাকে চাও তাকে হেদায়েত দিতে পারো না’ কথার ব্যাখ্যা। ২. প্রথম আয়াতটির তফসীর। ৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই বাণীর, “বলুন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” প্রকৃত ব্যাখ্যার উপলব্ধি। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ মসলা যা এক শ্রেণীর বিদ্যানদের দাবীর পিরীত। ৪. আবুজাহল ও তার সঙ্গী-সাথীরা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাচাকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করতে বললেন, তখন তার তাৎপর্য কি তা বুঝতে পেরে ছিলো। আবূ জাহলকে আল্লাহ ধ্বংস করুন! তার চেয়ে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে কে বেশী জ্ঞাত ছিলো? ৫. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্বীয় চাচার ইসলাম গ্রহণের জন্য অত্যধিক প্রচেষ্টা। ৬. তাদের খন্ডন করা হয়েছে, যারা মনে করে যে, আব্দুল মুত্তালীব ও তার সহচররা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। ৭. রাসূলুল্লাহ ﷺ তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু ক্ষমা করা হয়নি, বরং নিষেধ করা হয়েছে।
৮. অসৎ সঙ্গী-সাথীর ক্ষতি।
৯. বড়দের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার ক্ষতি।
১০. এ ব্যাপারে বাতিলপন্থীদের সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, কারণ আবূ জেহেল বড়দেরকে দলীলে পেশ করেছে।
১১. শেষ আমলই লক্ষণীয়, কারণ, সে যদি কালেমা পড়তো, তাহলে তাতে সে উপকৃত হতো।
১২. গোমরাহ লোকদের অন্তরে এই গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহের মধ্যে চিন্তনীয় বিষয় রয়েছে, কেননা, উল্লিখিত ঘটনায় তারা এমনভাবে পূর্ব-পুরুষদের অন্ধ অনুসারী ছিলো যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর তঅত্যধিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পূর্ব-পুরুষদের অন্ধ অনুসরণই তাদের উপর প্রাধান্য পেলো।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
এই অধ্যায়টিও পূর্বেকার অধ্যায়ের মতনই, অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ ﷺ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব এবং মর্যাদা-সম্মানে আল্লাহর নিকট সব থেকে মহান ও অসীলার দিক দিয়ে তিনিই আল্লাহর বেশী নিকটের বান্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর চাচাকে হেদায়াত দেওয়ার উপর সামর্থবান ছিলেন না, বরং সর্ব প্রকারের হেদায়াত আল্লাহর হাতে অন্তরের হেদায়াতের মালিক তিনিই, যেমন কেবল তিনিই সৃষ্টির স্রষ্টা, সুতরাং সত্যিকার উপাস্যও তিনিই, তবে আল্লাহ যে বলেছেন, “নিঃসন্দেহে তুমি সঠিক-সোজা পথের দিকে লোকদেরকে পথ দেখাইতেছো।” (সূরা শূরাঃ ৫২) তো এর অর্থ হলো, হেদায়াতের পথ দেখানো, হেদায়াত দান করা নয়, তিনি ছিলেন আল্লাহর সেই অহীর বাহক, যদ্বারা আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে হেদায়াত দান করেছেন।
📄 নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
আদম সন্তানের কুফরী ও তাদের দ্বীন ত্যাগ করার কারণ হলো, নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
﴿يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ ﴾ (النساء: ۱۷۱) আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, “হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না।” (সূরা নিসাঃ ১৭১)
في الصحيح عن ابن عباس رضي الله عنهما، في قول الله تعالى: ﴿وَقالوا لا تَذَرُنَ الهَتَكُمْ وَلا تَذَرُنَ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلا يَغُوْثَ وَيَعُوكَ وَنَسْرًا (نوح : ۲۳) قَالَ : هَذِهِ أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِيْنَ مِنْ قَوْمِ نُوحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوا أَوْحَي الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ : أَنْ انصَبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمْ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُوْنَ فِيْهَا أَنْصَاباً وَسَمُّوْهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوا، وَلَمْ تُعْبَدْ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُوْلَئِكَ وَنُسِيَ الْعِلْمُ، عُبِدَتْ))
সহী হাদীসে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহ তাআলার এই আয়াত “তারা বলেছে, তোমরা তোমা- দের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ, সুয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নসরকে।” (সূরা নূহঃ২৩) সম্পর্কে বলেন, এগুলো নূহ -এর জাতির নেক লোকদের নাম, তাঁরা মারা গেলে শয়তান তাঁদের জাতির অন্তরে এই কথা প্রবেশ করিয়ে দিলো যে, তাঁরা যেখানে বসতেন, সেখানে তাঁদের মূর্তি স্থাপন করে তাঁদের নামে নামকরণ করো, তখন তারা তা-ই করলো, তবে তখন পূজা করা হতো না। অতঃপর যখন এই সব লোক মারা গেলো এবং প্রকৃত তথ্য ভুলিয়ে দেওয়া হলো, তখন পূজা আরম্ভ হয়ে গেলো।”
ইবনুল কাইয়ূম (রাহঃ) বলেন, পূর্বেকার অনেক লোক বলেছেন, তাঁরা যখন মারা গেলেন, লোকজন তাদের কবরে বসতে আরম্ভ করে। তারপর তাঁদের মূর্তি বানায়, অতঃপর দীর্ঘ কাল অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁদের পূজা শুরু হয়।
عَنْ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ الله ﷺ قَالَ: ((لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَ إِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا: عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ)) أخرجاه
উমার থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "তোমরা আমাকে নিয়ে ঐরূপ বাড়াবাড়ি করো না, যেরূপ খ্রীষ্টানরা মারিয়ামের পুত্রকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, আমি তো তাঁর একজন বান্দা, তাতএব তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” (বুখারী-মুসলিম) তিনি আরো বলেন,
(( إِيَّاكُمْ وَالغُلُو، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُو))
অর্থাৎ, “বাড়াবাড়ি করা থেকে বাঁচো, কারণ, এই বাড়াবাড়িই তোমাদের পূর্বেকার অনেককেই ধ্বংস করে দিয়েছে” মুসলিম শরীফে ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “সীমা লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে, এই কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন।”
কতিপয় বিষয় জানা গেলো ১. যে ব্যক্তি এই অধ্যায় এবং এর পরবর্তী দু'টি অধ্যায়কে ভালভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, তার নিকট প্রাথমিক পর্যায় ইসলামের পরিস্থিতি কি ছিলো, তা প্রকট হয়ে যাবে এবং সে আল্লাহর কুদরত ও তাঁর দ্বারা মানুষের অন্তরের বিস্ময়কর পরিবর্তন লক্ষ্য করবে।
২. যমীনে শির্ক প্রথমে কিভাবে শুরু হয়, তা জানা গেলো, তা ছিলো নেক লোকদেরকে কেন্দ্র করে।
৩. সর্ব প্রথম যে জিনিসের দ্বারা নবীদের দ্বীনের পরিবর্তন সূচিত হয়, সে সম্পর্কে ও তার কারণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। আর এটাও জানা গেলো যে, আল্লাহই তাঁদেরকে প্রেরণ করেছিলেন।
৪. শরীয়ত ও প্রকৃতির বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও বিদআতকে গ্রহণ করার কারণ কি, তা জানা গেলো।
৫. এর (কবুল করার) কারণই ছিলো হক্ব ও না-হক্বকে একত্রে মিশ্রিত করণ। যেমন, প্রথমতঃ, নেক লোকদের প্রতি ভালবাসা পোষণ। আর দ্বিতীয়তঃ, আলেমদের একটি দলের এমন কিছু কাজ সম্পাদন করা, যদ্বারা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো ভাল ও সৎ, কিন্তু পরবর্তী লোকেরা মনে করে নেয় যে, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো অন্য কিছু।
৬. সূরা নূহের আয়াতের তাফসীর।
৭. মানুষের প্রকৃতিগত অভ্যাস সম্পর্কে জানা গেলো যে, হজ্বের প্রতি টান অল্প এবং বাতিলের প্রতি ঝোঁক বেশী।
৮. যারা বলেন, বিদআত হলো কুফ্রীর কারণ, আর ইবলীসের নিকট পাপের থেকে বিদআত বেশী প্রিয়, কারণ, পাপ থেকে তাওবা করতে পারে কিন্তু বিদআত থেকে তাওবা করবে না, তাঁদের কথার সমর্থনও (উক্ত হাদীস থেকে) পাওয়া যায়।
৯. বিদআতের পরিণাম সম্পর্কে শয়তান ভালভাবেই জানে, তাতে কর্তার উদ্দেশ্য যতই ভাল হোক না কেন।
১০. শরীয়তের সীমালঙ্ঘনের নিষিদ্ধতার সাধারণ নিয়ম সম্পর্কে এবং সীমালঙ্ঘনের পরিণাম সম্পর্কে অবগত হওয়া।
১১. নেক কাজের উদ্দেশ্যে কবরে অবস্থান করার ক্ষতি।
১২. মূর্তি নির্মাণ নিষিদ্ধ হওয়া এবং তা মিটিয়ে দেওয়ার মধ্যে নিহিত হিকমত সম্পর্কে অবগত হওয়া।
১৩. হাদীসে উল্লিখিত ঘটনার গুরুত্ব এবং সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া অনেক প্রয়োজন, যদিও মানুষ এ ব্যাপারে উদাসীন।
১৪. বড় আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বিদআতীরা উক্ত ঘটনা হাদীস ও তফসীরের কিতাবে পাঠ করে, এর অর্থও ভালভাবে বুঝে এবং আল্লাহ তাদের ও তাদের আক্বীদার মধ্যে প্রতিবন্ধকরূপে দাঁড়ালেও তারা মনে করে যে, নূহ -এর জাতির কার্যসমূহোই ছিলো শ্রেষ্ঠ ইবাদত। আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন, তা-ই হলো কুফরী এবং এই কুফরী কাজে লিপ্ত ব্যক্তির জান-মাল বৈধ।
১৫. এ কথাও পরিষ্কার যে প্রতিমাগুলোর নিকট তারা সুপারিশ ছাড়া আর কিছুই কামনা করে না।
১৬. তাদের বিশ্বাস হলো, যে আলেমরা মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন, তাদেরও অনুরূপ কামনা ছিলো।
১৭. রাসূলুল্লাহ -এর বাণীতে রয়েছে সুমহান এই ঘোষণা, “তোমরা আমার প্রশংসায় ঐরূপ বাড়াবাড়ি করো না, যেরূপ খ্রীষ্টানরা মরীয়মের পুত্রকে নিয়ে করেছিলো।” তিনি তবলীগের মহান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে গেছেন, তাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ হতে দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
১৮. আমাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ -এর নসীহত হলো, যারা শরীয়তের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করবে, তারাই ধ্বংস হবে।
১৯. এখানে এ কথাও পরিষ্কার করে জানা গেলো যে, প্রকৃত জ্ঞান ভুলিয়ে দেওয়ার আগে পর্যন্ত তাদের (মূর্তির) পূজা হয়নি, তাই এতে ইল্ম থাকার উপকারিতা এবং তা না থাকার অপকারিতার বর্ণনাও রয়েছে।
২০. জ্ঞান না থাকার কারণ হলো, আলেমদের মৃত্যু বরণ।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আরবী শব্দ 'গুলু'র অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন করা। অর্থাৎ, মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট অধিকারসমূহের কোন কিছু নেক লোকদের প্রদান করা। কেননা, আল্লাহর যে অধিকারে কেউ অংশীদার হতে পারে না তা হলো, পূর্ণতা, তিনি মুখাপেক্ষীহীন এবং তিনিই সব দিক দিয়ে সব কিছুর পরিচালক। তিনি ব্যতীত কেউ ইবাদতের যোগ্য হতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন সৃষ্টিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি ক'রে এই অধিকারের কোন কিছু প্রদান করে, সে যেন বিশ্বের প্রতিপালকের সাথে তার তুলনা করে। আর এটাই হলো বড় শির্ক, জেনে রাখো, অধিকার হলো তিন প্রকারের, (১) আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট অধিকার, তাতে কেউ অংশীদার হতে পারে না। আর তা হলো, তাঁকেই উপাস্য মনে করা, কেবল তাঁরই ইবাদত করা। তাঁর কোন শরীক নেই, তাঁকেই ভালবাসা ও ভয় করা এবং তাঁরই নিকট আশা করা। (২) এমন অধিকার, যা নবীদের জন্য নির্দিষ্ট যেমন, তাঁদের সম্মান করা এবং তাঁদের অধিকার আদায় করা। (৩) এমন অধিকার, যাতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল উভয়েই শরীক, যেমন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর ঈমান আনা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের অনুসরণ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে ভালবাসা, প্রকৃতপক্ষে এগুলো আল্লাহরই অধিকার এবং আল্লাহর অধিকারের ভিত্তিতেই তা রাসূলগণের অধিকার। হক্ব পন্থীরা এই অধিকারগুলোর মধ্যে পার্থক্য ভালভাবেই জানে। তাই তাঁরা কেবল আল্লাহরই ইবাদত করে এবং দ্বীনকে তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করে। অনুরূপ নবী ও ওলীদের সম্মান ও মর্যাদা অনুপাতে তাঁদেরও অধিকার আদায় করে, আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
📄 কবরের নিকট আল্লাহর ইবাদত করা নিষেধ
কোন নেক লোকের কবরের নিকট যখন আল্লাহর ইবাদত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তখন সেই নেক লোকের ইবাদত করলে কি হতে পারে
فِي الصَّحِيحِ عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ أُمَّ سَلَّمَةً ذَكَرَتْ لِرَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ كَنِيسَةٌ رَأَتُهَا بِأَرْضِ الحَبْشَةِ، وَمَا فِيهَا مِنَ الصُّوَرِ، فَقَالَ : (( إِنَّ أُولَئِكَ إِذَا مَاتَ فِيهِمْ الرَّجُلُ الصَّالِحُ ، أَوِ العَبْدُ الصَّالِحُ ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، فَأُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ ))
সহী হাদীসে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহকে হাবশায় তাঁর দেখা এক উপাসনালয় এবং তাতে রাখা মূর্তির কথা উল্লেখ করেন, তিনি বললেন, "ওরা হলো এমন লোক যে, যখন তাদের মধ্যেকার কোন নেক লোক অথবা নেক বান্দার মৃত্যু হতো, তখন তারা তার কবরে মসজিদ নির্মাণ করতো এবং তাতে তাদের মূর্তি স্থাপন করতো, এরা হলো আল্লাহর নিকট সৃষ্টির নিকৃষ্টতম।” এরা দুই ফিতনাকে একত্রিত করেছে, কবর এবং মূর্তির ফিতনা।
وَهُمَا عَنْهَا قَالَتْ: لَمَّا نَزَلَ بِرَسُولِ اللهِ ﷺ طَفِقَ يَطْرَحُ خَمِيصَةٌ لَهُ عَلَى وَجْهِهِ، فَإِذَا اغْتَمَّ بِهَا كَشَفَهَا عَنْ وَجْهِهِ، فَقَالَ وَهُوَ كَذَلِكَ : لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ يُحَذِّر ما صنعوا، لَوْلَا ذَلِكَ أُبْرِزَ قَبْرُهُ، غَيْرَ أَنَّهُ خَشِيَ أَنَّ يُتَّخَذَ مَسْجِدًا.
বুখারী ও মুসলিম শরীফে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে, স্বীয় মুখমন্ডল তদীয় একটি চাদর দ্বারা ঢেকে নিলেন, যখন তিনি কষ্ট অনুভব করতেন, তখন তা তাঁর মুখমন্ডল থেকে সরিয়ে দিতেন, আর এই অবস্থায় তিনি বলতেন, "ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের উপর আল্লাহর লা'নত হোক, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে." তারা যা করেছে, তা থেকে তিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক করেছেন, যদি তিনি তাঁর কবরকে মসজিদে পরিণত করার আশঙ্কা বোধ না করতেন, তাহলে তাঁর কবরকে আরো উচ্চ করা হতো।'
وَالْمُسْلِمِ عَنْ جُنْدَب بنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ قَبْلَ أَنْ يَمُوتَ بِخَمْسٍ وَهُوَ يَقُولُ : ((إِنِّي أَبْرَأُ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَكُونَ لِي مِنْكُمْ خَلِيلٌ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَدْ اتَّخَذَنِي خَلِيلًا، كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا، أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، فَإِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ ))
মুসলিম শরীফে জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, "আমি আল্লাহর নিকট দায়মুক্ত ঘোষণা করছি যে, তোমাদের মধ্যে থেকে কাউকে আমি বন্ধুরূপে গ্রহণ করিনি। কেননা, আল্লাহ আমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন, যেমন ইবরাহীম -কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছিলেন, শোন, তোমাদের পূর্বে যারা ছিলো, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছিলো, কাজেই তোমরা কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করবে না। আমি তোমাদেরকে এ থেকে নিষেধ করছি।” রাসূলুল্লাহ তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে কবরকে মসজিদে পরিণত করতে নিষেধ দান করেছেন, তার প্রতি অভিসম্পাতও করেছেন, যে এ রকম করে।
কবরে নামায পড়াও তাকে মসজিদে পরিণত করার অন্তর্ভুক্ত, যদিও মসজিদ না বানানো হয়। 'তিনি কবরকে মসজিদে পরিণত করার আশঙ্কা বোধ করতেন' কথার অর্থই হলো, সেখানে নামায ইত্যাদি পড়া, কারণ, সাহাবারা এমন ছিলেন না যে, তাঁরা কবরে মসজিদ তৈরী করবেন, যেখানেই নামায পড়ার ইচ্ছা করা হয়, তা মসজিদ বিবেচিত হয়, অনুরূপ যেখানেই নামায পড়া হয়, সেই স্থানকে মসজিদ বলা হয়, যেমন রাসূলুল্লাহ বলেন, “সম্পূর্ণ যমীনকে আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছেন।”
وَلأَحْمَدَ بِسَنَدٍ جَيْدٍ عَن ابْنِ مَسْعُودٍ له مرفوعا ((إِنَّ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُ السَّاعَةُ وَهُمْ أَحْيَاءٌ، وَالَّذِينَ يَتَّخِذُوْنَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ))
ইমাম আহমদ ইবনে মাসউদ থেকে মারফু' সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, মানুষের মধ্যে নিকৃষ্ট সেই সব লোক, যাদের জীবদ্দশায় কিয়ামত উপস্থিত হবে, আর সেই সব লোক, যারা কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করে।”
যে বিষয়গুলো জানা গেলো,
১. যে ব্যক্তি কোন নেক লোকের কবরে মসজিদ নির্মাণ করে সেখানে আল্লহর ইবাদত করে, রাসূলুল্লাহ -এর বক্তব্য তার উপরেও বর্তাবে, যদিও কর্তার নিয়ত সৎ হয়।
২. মূর্তির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে,
৩. এ (কবরকে মসজিদ বানানোর) ব্যাপারে কিভাবে গুরুত্বের সাথে বাধা প্রদান করেছেন, তা তাঁর বক্তব্য থেকে জানা যায়, প্রথমে তিনি খুব জোর দিয়ে নিষেধ করেন, অতঃপর মৃত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে তার পুনরাবৃত্তি করেন, আবার সাহাবাদের সমাবেশেও তার উল্লেখ করেন।
৪. তিনি তাঁর কবরের অস্তিত্ব লাভের পূর্বেই সেখানে কোন কিছু করতে নিষেধ প্রদান করেছেন,
৫. কবরকে মসজিদে পরিণত করা হলো, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের তরীকা।
৬. তারা এই কারণে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক অভিশপ্ত।
৭. ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের প্রতি রাসূলুল্লাহ -এর লা'নত করার অর্থ হলো, আমাদেরকে তাঁর কবরের ব্যাপারে সতর্ক করা।
৮. তাঁর কবরকে উচ্চ না করার কারণ জানা গেলো।
৯. কবরকে মসজিদে পরিণত করার অর্থ কি জানা গেলো।
১০. যারা কবরকে মসজিদে পরিণত করে এবং যাদের উপর কিয়ামত কায়েম হবে এই দুই শ্রেণীর লোককে রাসূলুল্লাহ এক সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ, তিনি শির্ক সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার পরিণাম ও তার উপকরণের উল্লেখ করে দিয়েছেন।
১১. রাসূলুল্লাহ স্বীয় মৃত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে খুৎবার মধ্যে সেই দুই দলের আক্বীদার খন্ডন করেন, যারা বিদআতীদের মধ্যে সব থেকে নিকৃষ্টতম দল, বরং কোন কোন আলেমরা তো এদেরকে ৭৩ ফির- ক্বার মধ্যে গণ্য করেছেন, আর ওরা হলো, রাফেযাঃ এবং জাহমিয়াঃ। রাফেযাদের কারণেই শির্ক ও কবর পূজার জন্ম হয়, আর এরাই সর্ব প্রথম কবরে মসজিদ নির্মাণ করে।
১২. মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ ﷺকে অনেক কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
১৩. তিনি আল্লাহর বন্ধু হওয়ার গুণে গুণান্বিত ছিলেন।
১৪. বন্ধু হওয়ার মর্যাদা মুহাব্বাতের থেকে বেশী।
১৫. এতে এ কথাও পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, আবু বাকার সাহাবীর মধ্যে উত্তম ছিলেন।
১৬. তাঁর খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিতও এতে রয়েছে।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিগত দুই অধ্যায়ে লেখক যেসব বিষয়ের উল্লেখ করেছেন, তা থেকে নেক লোকের কবরকে কেন্দ্র করে যেসব কার্যকলাপ করা হয়, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। কবরে যা কিছু করা হয়, তা দু'প্রকারের, যথা, জায়েয ও না জায়েয। জায়েয হলো তা-ই, যা শরীয়ত প্রণয়নকারী প্রণয়ন করেছেন, যেমন, শরীয়তী তরীকায় কবর যিয়ারত করা। তবে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা যায় না। সুন্নাত অনুযায়ী মুসলিম কবরের যিয়ারত করবে। সকল কবরবাসীর জন্য সাধারণ দুআ করবে এবং নিজের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের জন্য বিশেষ করে দুআ করবে, তাদের জন্য দুআ, ক্ষমা চাওয়া এবং তাদের উপর রহমত বর্ষণের প্রার্থনা করার কারণে, সে তাদের প্রতি এবং সুন্নাতের অনুসরণ, আখেরাতের স্মরণ ও কবর থেকে উপদেশ গ্রহণ করার কারণে স্বীয় নাফসের প্রতিও অনুগ্রহকারী বিবেচিত হবে। আর না জায়েয হলো দু'প্রকারের যথা,
১. হারাম ও শির্কের মাধ্যম, যেমন, কবরকে স্পর্শ করা, কবরবাসীকে আল্লাহর নিকট মাধ্যম বানানো এবং সেখানে নামায পড়া, অনুরূপ কবরে বাতি জ্বালানো, তার উপর কোন কিছু নির্মাণ করা এবং কবর ও কবরবাসীকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা।
২. বড় শির্ক, যেমন, কবরবাসীদের নিকট দুআ করা, তাদের নিকট ফরিয়াদ করা এবং তাদেরই নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের প্রয়োজনাদির কামনা করা, অতএব এটা হলো বড় শির্ক আর এটাই হলো সেই কাজ, যা মূর্তিপূজকরা তাদের মূর্তির সাথে করে। যদিও কর্তাদের এই কাজ এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে হয় যে, তারা তাদেরই নিকট উদ্দেশ্য অর্জনের আশা রাখে অথবা এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে, তারা তাদেরকে আল্লাহর নিকট কেবল মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে, এ সবের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, কারণ, মুশরিকরা বলতো,
﴿مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى﴾ (الزمر: 3)
অর্থাৎ, "আমরা তো তাদের ইবাদত কেবল এই জন্য করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিবে।” (সূরা যুমারঃ ৩)
আর বলে,
﴿وَيَقُولُونَ هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ الله﴾ (ইউনুস : ১৮)
অর্থাৎ, “তারা বলে যে, এরা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশকারী হবে।” (সূরা ইউনুসঃ ১৮) কাজেই কেউ যদি মনে করে যে, কবরবাসীর নিকট প্রার্থনা করা ও তাদেরকে ইষ্টানিষ্টের মালিক মনে করা কুফরী নয়, অনুরূপ এই মনে করাও কুফ্রী নয় যে, প্রকৃতপক্ষে কর্তা হলেন আল্লাহ, তারা কেবল আল্লাহ ও তাদের নিকট যারা প্রার্থনা করে ও ফরিয়াদ করে, তাদের মাধ্যম ও অসীলা, তাহলে সে কাফের গণ্য হবে। কেননা, যে এই রূপ ধারণা পোষণ করলো, সে যেন কিতাব ও সুন্নাহের আনিত বিষয়কে মিথ্যা সাব্যস্ত করলো। আর এ ব্যাপারে উম্মতের একমত যে, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে, তাতে তাদেরকে মাধ্যম বানিয়ে হোক বা তাদের নিকট সরাসরি প্রার্থনা করা হোক, উভয় ক্ষেত্রেই সে মুশরিক ও কাফের বিবেচিত হবে। আর এটা শরীয়তের এমন বিষয়, যা অতি সহজেই জানা যায়, পাঠকের উচিত বিস্তারিত এই আলোচনাকে ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নেওয়া, যাতে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্যে পার্থক্য করে নিতে পারে। কারণ এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই অনেক ফিৎনা ও ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয়েছে, ফিৎনা থেকে তারাই মুক্তি পেয়েছে, যারা সত্য জেনে তার অনুসরণ করেছে।