📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী
অধ্যায় মহান আল্লাহর বাণী,
حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الكبير [سبأ: ٢٣]
অর্থাৎ, “যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরস্পরে বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কি বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান।” (সূরা সাবাঃ ২৩)
في الصحيح عَنْ أَبي هريرة الله ، إِذَا قَضَى الله الْأَمْرَ فِي السَّماءِ ضَرَبَتْ الْمَلَائِكَةُ بِأَجْنِحَتِهَا خُضْعَانًا لِقَوْلِهِ كَالسَّلْسِلَةِ عَلَى صَفْوَانٍ صَفْوَانٍ، يَنْفُذُهُمْ ذَلِكَ، فَإِذَا فُزَعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا لِلَّذِي قَالَ الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ فَيَسْمَعُهَا مُسْتَرِقُو السَّمْعِ وَمُسْتَرِقُو السَّمْعِ هَكَذَا بَعْضَهُ فوق بعض، وصفه سفيان بن عيينة بكفه، وَفَرَّجَ بَيْنَ أَصَابِعِ يَدِهِ الْيُمْنَى نَصَبَهَا بَعْضَهَا فَوْقَ بَعْضٍ، فحرفها وبدد بين اصحابه، فَيَسْمَعُ الْكَلِمَةَ فَيُلَقَيْهَا إِلَى مَنْ تحته، ثُم يُلْقِيهَا الآخَرُ إلى مَنْ تَحتَهُ، حَتى يُلْقِيْهَا عَلَى لسان الساحر أو الكاهن، فربما أَدْرَكَهُ السَّهَابُ قَبْلَ أَن يُلْقِيهَا . وَرُبمَا أَلْقَاهَا قَبْلَ أَن يُدْرِكَهُ فَيُكَذِّبُ مَعَها مائة كذبة فَيُقَالُ : أَلَيْسَ قَدْ قَالَ لَنَا يَوْمَ كَذَا وَكَذَا : كَذَا وَكَذَا؟ فيصدق بتلك الكلمة التي سمعت من السماء))
অর্থাৎ, সহী হাদীসে আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহ যখন আসমানে কোন বিষয়ের ফয়সালা করেন, তখন তাঁর কথায় বিনয়-নম্র হয়ে ফেরেশতারা তাদের ডানাগুলো এমনভাবে নাড়াতে থাকেন, যেন কোন ভারী পাথরের শিকল পড়েছে, ফেরেশতাদের অন্তরে তা দোলা দেয় “যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন তারা পরস্পরে বলাবলি করে, তোমাদের পালনকর্তা কি বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান.” তখন চুরিতে কথা শ্রবণকারীরা তা শুনে নেয়, হাদীসের বর্ণনাকারী সাফওয়ান এই হাদীস বর্ণনায় 'চুরিতে কথা শ্রবণকারী' শব্দ সম্পর্কে হাতের ইশারায় আঙ্গুলগুলো ফাঁক করে দেখিয়েছেন যে, এইভাবে এই শ্রবণকারীরা অধিক সংখ্যায় উপরে নিচে প্রসারিত থেকে কথা শোনে তার পর তার নিকটের কোন ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেয়, অবশেষে তা কোন যাদুকর বা কোন গণকের জবানি পৃথিবীতে পৌঁছায়. কখনোও কখনোও চুরিতে শ্রবণকারীর উপর তা পৌঁছানোর পূর্বেই অগ্নি বর্ষণ হয়. আবার কখনোও কখনোও অগ্নি বর্ষণের পূর্বেই তা পৃথিবীতে পৌঁছে দেয় এবং প্রাপক তার সাথে শত শত মিথ্যা মিশ্রিত করে। তখন বলা হয়, অমুক অমুক দিনে কি আমাদেরকে এই কথা বলা হয় নি? তখন আসমান থেকে শোনা সেই কথা সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়।"
وَعَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ اللهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ (( إِذَا أَرَادَ اللَّهُ تَعَالَى أَن يُوْحِيَ بِالأَمْرِ، وَتَكَلَّمَ بِالْوَحْيِ أَخَذَتِ السَّمَوَاتُ مِنْهُ رَجْفَةٌ، أَوْ قَالَ: رَعْدَةً شَدِيدَةٌ، خَوْفاً مِّنَ الله عَزَّ وَجَلَّ، فَإِذَا سَمِعَ ذَلِكَ أَهْلُ السَّمَوَاتِ صَعِقُوا وَخَرُّوا لِلَّهُ سُجَّدًا فَيَكُوْنُ أَوَّلَ مَن يَرْفَعُ رَأْسَهُ جِبْرِيلُ، فَيُكَلِّمُهُ اللَّهُ مِنْ وَحْيِهِ بِمَا أَرَادَ، ثُمَّ يَمُرُّ جِبْرِيلُ عَلَى المَلائِكَةِ، كُلَّمَا مَرَّ بِسَمَاءِ سَأَلَهُ مَلَائِكَتُهَا : مَاذَا قَالَ رَبُّنَا يَا جِبْرِيلُ ؟ فَيَقُوْلُ جِبْرِيلُ : قَالَ الحَقِّ، وَهُوَ العَلِيُّ الكَبِيرُ، فَيَقُوْلُوْنَ كُلُّهُمْ مِثْلَ مَا قَالَ جِبْرِيلُ، فَيَنْتَهِي جِبْرِيلُ بِالْوَحْيِ إِلَى حَيْثُ أَمَرَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ ))
অর্থাৎ, নাওয়াস ইবনে সামআন থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যখন মহান আল্লাহ অহী প্রেরণের ইচ্ছা করেন এবং সেই অহীর বাক্য প্রয়োগ করেন, তখন আকাশ ও যমীনসমূহে মহিমান্বিত আল্লাহর ভয়ে কম্পন অথবা বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়, যখন আকাশবাসী তা শোনে, তখন তাঁরা চেতনা হারিয়ে ফেলেন এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদায় পড়ে যান, অতঃপর জিবরীল সর্ব প্রথম মাথা তুলেন এবং আল্লাহ তাঁর সঙ্গে তাহীর কথা উক্তি করেন, তারপর জিবরীল অন্যান্য ফেরেশতাদের নিকট গমন করেন। প্রত্যেক আকাশের ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করেন, হে জিবরীল! আমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন, তখন জিবরীল বলেন, তিনি সত্য বলেছেন, তিনিই সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। অতঃপর সকল ফেরেশতা জিবরীল -এর ন্যায় বলতে থাকেন, এইভাবে জিবরীল তাহী নিয়ে সেই স্থান পর্যন্ত গমন করেন, যেখানে যাওয়ার নির্দেশ মহান আল্লাহ দিয়েছেন।”
কতিপয় মসলা জানা গেলো ১. উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যা। ২. এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত যে, শির্ক বাতিল, বিশেষতঃ সেই শির্ক, যার সম্পর্ক নেক লোকদের সাথে। এই আয়াত সম্পর্কে বলা হয় যে, এটা অন্তর থেকে শির্কের মূলোৎপাটন করে। ৩. আল্লাহর এই বাণীর ব্যাখ্যা, “তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান।” ৪. এ সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসা করার কারণ। ৫. জিবরীল তাদেরকে উত্তর দেন যে, আল্লাহ এই এই বলেন। ৬. সর্ব প্রথম যিনি মাথা উঠাবেন তিনি হবেন জিবরীল। ৭. তিনি সকল আসমানবাসীর কথার উত্তর দিবেন, কারণ, তাঁরা জিজ্ঞাসা করবেন। ৮. সকল আসমানবাসীই অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। ৯. আল্লাহর কালেমার কারণে আসমানে কম্পন সৃষ্টি হওয়া। ১০. জিবরীল সেখানে পৌঁছান, যেখানে আল্লাহ নির্দেশ দেন। ১১. শয়তানরা যে চুরি করে কথা শোনে, তার উল্লেখ। ১২. একে অপরকে কিভাবে কথা পৌঁছায় তার বর্ণনা। ১৩. অগ্নি প্রেরণ।
১৪. কখনো এই অগ্নি ওলীর কানে কথা পৌঁছানোর পূর্বেই তাকে পেয়ে বসে। আবার কখনো সে তার উপর আগুন প্রেরিত হওয়ার পূর্বেই তার ওলীর কানে কথা পৌঁছে দেয়।
১৫. কখনো কখনো গণকরা সত্য বলে।
১৬. তারা একটি সত্যের সাথে একশত মিথ্যা মিশ্রিত করে।
১৭. তাদের সেই কথাটাই সত্য হয়, যা আসমান থেকে চুরি করে শোনা হয়।
১৮. মানুষের অন্তর মিথ্যা এমনভাবে গ্রহণ করে যে, একটি সত্যের প্রতি লক্ষ্য করে, অথচ একশত মিথ্যার প্রতি লক্ষ্য থাকে না।
১৯. এই সত্য কথাটা তারা একে অপরের নিকট পৌঁছায় এবং এরই দ্বারা দলীল কায়েম করে।
২০. আল্লাহর গুণের প্রমাণ, যদিও বিভ্রান্ত আশআরী দল তা মানে না।
২১. এ কথা পরিষ্কার করে জানা গেলো যে, আসমানবাসীদের অজ্ঞান হওয়া এবং আসমানে কম্পন সৃষ্টি হওয়ার কারণ হলো আল্লাহর ভয়।
২২. তাঁরা আল্লাহর জন্য সিজদায় পড়ে যাবেন।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ- এটা (অর্থাৎ এই অধ্যায়ে উল্লিখিত সমস্ত বিষয়ই) হলো তাওহীদ ওয়াজিব হওয়ার এবং শির্ককে বাতিল সাব্যস্ত করার খুব বড় প্রমাণ। এখানে কুরআন ও হাদীসের এমন কথার উল্লেখ হয়েছে, যদ্বারা সেই প্রতিপালকের বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য প্রমাণিত হয়, যাঁর মাহাত্ম্যের সামনে সৃষ্টির মাহাত্ম্য কিছুই থাকে না। যাঁর সামনে ফেরেশতাগণ এবং উভয় জগৎ নত হয়ে যায়, তাঁর কালাম শোনার সময় তাঁরা (ফেরেশতারা) তাঁদের অন্তরকে স্থির রাখতে পারে না। সকল সৃষ্টিই তাঁর গৌরবের সামনে নতি স্বীকার করে, তাঁর মাহাত্ম্য ও মহিমাকে স্বীকার করে এবং তাঁর ভয়ে নত হয়। তাই যে সত্তার এই শান, তিনিই প্রতিপালক। তিনি ইবাদত, প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা পাবার একমাত্র যোগ্য। সম্মান পাবার এবং উপাস্য হওয়ার অধিকার তিনিই রাখেন। তিনি ব্যতীত এই অধিকারের কোন কিছুই কেউ পেতে পারে না। যেমনি তিনিই পূর্ণতা, বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য এবং গৌরব ও সৌন্দর্যের গুণে গুণান্বিত, তিনি ছাড়া অন্য কেউ এ সব গুণে গুণান্বিত হতে পারে না, তেমনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় ইবাদত হলো তাঁরই নির্দিষ্ট অধিকার। কোনভাবেই এতে কেউ শরীক হতে পারে না।
📄 শাফাআ’ত প্রসঙ্গে
শাফাআ'ত প্রসঙ্গে
মহান আল্লাহ বলেন,
وَأَنْذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْ يُحْشَرُوا إِلَى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُمْ مِنْ دُونِهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ ﴾ [الأنعام: ٥١]
অর্থাৎ, "আপনি এ কুরআন দ্বারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়ার যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না।” (সূরা আনআমঃ ৫ ১) তিনি আরো বলেন,
قُل لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا الزمر : ٤٤
অর্থাৎ, “বলুন, সমস্ত সুপারিশ আল্লাহরই ক্ষমাধীন.” (সূরা যুমারঃ ৪৪) তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ﴾ (বাক্বারা: ২৫৫)
অর্থাৎ, “কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?” (সূরা বাক্বারাঃ২৫৫) তিনি আরো বলেন,
﴿وَكَمْ مِنْ مَلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللهُ لَمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى ﴾ [النجم: ٢٦]
অর্থাৎ, “আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না, যতক্ষণ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন, অনুমতি না দেন.” (সূরা নাজমঃ২৬) আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন,
﴿قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الأَرْضِ ﴾ [سبأ : ٢٢-٢٣]
অর্থাৎ, “বলুন, তোমরা তাদেরকে আহ্বান করো, যাদেরকে উপাস্য মনে করতে আল্লাহ ব্যতীত, তারা নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের অণু পরিমাণ কোন কিছুর মালিক নয়, এতে তাদের কোন অংশ নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়, যার জন্যে অনুমতি দেওয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না.” (সূরা সাবাঃ ২২-২৩)
আবুল আব্বাস (ইবনে তাইমিয়া) বলেন, মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত যে সবের উপর আস্থা রেখেছিলো, আল্লাহ সে সবের অস্বীকৃতি ঘোষণা করেন, কাজেই গায়রুল্লাহর কোন কিছুর মালিক হওয়া অথবা কোন কিছুতে তাদের অংশ থাকা বা আল্লাহর সাহায্যকারী হওয়া সব কিছুর অস্বীকার করেছেন, এখন সুপারিশের ব্যাপারটা বাকী ছিলো, তাই বলে দেওয়া হলো যে, এই সুপারিশ কেবল তারই উপকারে আসবে, যার জন্য আল্লাহ অনুমতি দিবেন, যেমন আল্লাহ বলেন, "তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট.” (সূরা আম্বিয়াঃ ২৮) সুতরাং মুশরিকরা কিয়ামতের দিন যে সুপারিশ ফল-প্রসূ হবে বলে মনে করে, কুরআর তার তাস্বীকৃতি দেয়, আর নবী করীম বলেছেন,
(( إِنَّهُ يَأْتِ فَيَسْجُدُ لِرَبِّهِ وَيَحْمَدُهُ لَا يَبْدَأُ بِالشَّفَاعَةِ أَوَّلاً - ثُمَّ يُقَالُ لَهُ : ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَقُلْ تُسْمَعْ ، وَسَلْ تُعْطَ وَاشْفَعْ تُشَفَعْ))
অর্থাৎ, “তিনি তাঁর প্রতিপালকের সামনে এসে সিজদা করবেন এবং অনেক প্রশংসা করবেন, তিনি প্রথমেই সুপারিশ করতে আরম্ভ করবেন না. অতঃপর তাকে বলা হবে, তুমি মাথা তুলো. তুমি বলো, তোমার কথা শোনা হবে. তুমি চাও, তোমাকে দেওয়া হবে. তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে.” আবূ হুরাইরা রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করেন,
(( مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : ((مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ))
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে কে আপনার সুপারিশ দ্বারা সর্বাধিক ধন্য হবে? তিনি বললেন, “যে নিষ্ঠার সাথে অন্তর থেকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-পাঠ করবে।” তাই এই সুপারিশ হবে আল্লাহর অনুমতিতে নিষ্ঠাবানদের জন্যে, আল্লাহর সাথে শরীককারীদের জন্যে হবে না।
প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ তা'য়ালা নিষ্ঠাবান লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন এবং যিনি সম্মান প্রাপ্ত হয়ে শাফাআ'তের অনুমতি লাভ করেছেন এবং ‘মাক্কামে মাহমুদ’ লাভ করেছেন, তাঁর দোআর মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন, সেই শাফাআ'তের কুরআন তঅস্বীকৃতি দিয়েছে, যাতে শির্ক আছে, আবার কুরআনের অনেক স্থানে আল্লাহর অনুমতিক্রমে শাফাআ'ত সাব্যস্ত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন যে, শাফাআ'ত তাওহীদবাদী ও মুখলেস লোকদের জন্যেই নির্দিষ্ট।
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা। ২. নিষিদ্ধ শাফাআ'তের বর্ণনা। ৩. প্রমাণিত শাফাআতের বর্ণনা। ৪. বড় শাফাআ'তের উল্লেখ আর তা হলো মাক্কামে মাহমুদ। ৫. রাসূলুল্লাহ কিভাবে শাফাআত করবেন, তার বর্ণনা তিনি প্রথমেই শাফাআ'ত করবেন না, বরং আল্লাহর জন্য সিজদা করবেন। যখন তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে, তখন তিনি শাফাআ'ত করবেন। ৬. কে সুপারিশ দ্বারা ধন্য হবে? ৭. মুশরিকদের জন্য সুপারিশ হবে না। ৮. প্রকৃত শাফাআ'তের বর্ণনা।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ
লেখক এখানে (শির্কীয় অধ্যায়ের সাথে) শাফাআ'তের অধ্যায়ের বৃদ্ধি করেছেন, কারণ, মুশরিকরা তাদের শির্ক এবং ফেরেশতা, আম্বিয়া ও ওলীদের নিকট তাদের প্রার্থনা করাকে এইভাবে সঠিক সাব্যস্ত করে যে, আমরা তাঁদের নিকট প্রার্থনা করি, অথচ আমরা জানি যে তাঁরা সৃষ্টি ও অন্যের দাস, কিন্তু যেহেতু আল্লাহর নিকটে তাঁদের রয়েছে সুমহান মর্যাদা ও উচ্চ স্থান, তাই তাঁরা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটে করে দিতে পারবেন এবং আমাদের জন্য তাঁর নিকট সুপারিশও করতে পারবেন, যেমন নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজা-বাদশাহদের নিকট সম্মানী ব্যক্তিদের নৈকট্য লাভ করে তাদেরকে মাধ্যম বানানো হয়, এটা হলো সমস্ত বাতিলের বড় বাতিল, আর এটা হলো যে মহান আল্লাহ এবং সম্রাটের সম্রাটকে সকলই ভয় করে ও যাঁর সামনে সমস্ত সৃষ্টিকুল নতি স্বীকার করে, সেই সত্তার সাথে এমন রাজাদের সাদৃশ্য স্থাপন করা, যারা তাদের রাজত্বের পূর্ণতার জন্য এবং নিজেদের শক্তির বাস্তবায়নের জন্য বহু মন্ত্রী ও সহযোগীর মুখাপেক্ষী হয়, তাই আল্লাহ এই (সুপারিশ লাভের) ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছেন এবং পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সমস্ত সুপারিশ তাঁরই ইখতিয়ারাধীন যেমন সমস্ত রাজত্ব তাঁরই। তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর তিনি যার কথা ও কাজে সন্তুষ্ট, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে অনুমতি দিবেন না। আর তিনি কেবল তার প্রতি সন্তুষ্ট, যে তাওহীদবাদী ও নিষ্ঠাবান আমলকারী।
এখানে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, মুশরিকের জন্য শাফাআ'তের কোন অংশ নেই, এ কথাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে যে শাফাআ'ত বাস্তবায়িত হবে, তা কেবল নিষ্ঠাবানদের জন্যই নির্দিষ্ট। আর এই সমস্ত শাফাআ'ত আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ, সুপারিশকারীর সম্মানার্থে এবং যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তাকে ক্ষমা করার জন্য হবে। তাই সেই সত্তাই প্রশংসা পাবার অধিকারী, যিনি মুহাম্মদ ﷺ কে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং তাকে মাক্কামে মাহমুদ দান করবেন। আর এটাই হবে কুরআন ও হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত শাফাআ'ত। লেখক (রাহঃ) শাফাআ'ত' সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমি- য়্যার যে উক্তির উল্লেখ করেছেন তা-ই যথেষ্ট।
শাফাআ'তের অধ্যায়কে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, সেই সব দলীলগুলো তুলে ধরা, যা প্রমাণ করে যে, যে সমস্ত উপাস্যগুলোকে মুশরিকরা অসীলা ও মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে তাদের উপর আস্থা- বান হয়, তা সবই বাতিল, তারা না নিজেই কোন কিছুরই মালিক, না কোন কিছুতে তারা শরীক, আর না কোন কিছুর সাহায্য-সহযোগিতা তারা করতে পারে, আর না শাফাআ'তের কোন অধিকার তারা রাখে। এই সমস্ত কিছুর মালিক হলেন কেবল আল্লাহ, সুতরাং উপাস্যও একমাত্র তিনিই।
📄 আপনি যাকে চান তাকে হেদায়াত দিতে পারেন না
অধ্যায় 'আপনি যাকে চান, তাকে হেদায়েত দিতে পারেন না'
في الصحيح عن ابن المسيب عن أبيه : أَنَّ أَبَا طَالِبٍ لَّمَا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ دَخَلَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ ﷺ وَعِنْدَهُ وَعَبْدُ اللهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ أَبُو جَهْلٍ فَقَالَ: (( أَيْ عَمَّ، قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، كَلِمَةٌ أَحَاجٌ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ، فَقَالَا يَا أَبَا طَالِبٍ تَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَمْ يَزَلْ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْرِضُهَا عَلَيْهِ وَيُعِيدَانِهِ بِتِلْكَ الْمَقَالَةِ، قَالَ آخِرَ شَيْءٍ كَلَّمَهُمْ بِهِ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أَنَّهَ عَنْهُ فَنَزَلَتْ : ﴿ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ وَنَزَلَتْ: ﴿ إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ ﴾
সহী হাদীসে ইবনুল মুসাইয়্যিব থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতার নিকট হতে বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা বলেন, যখন আবু তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, রাসূলুল্লাহ তার নিকট উপস্থিত হোন, আর তখন তার কাছে ছিলো, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমায়্যা এবং আবূ জেহেল, রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, "হে চাচা, বলুন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এটা একটি বাক্য আমি তার দ্বারা আল্লাহর নিকট আপনার ক্ষমা করিয়ে নিবো।” তখন তারা (আবূ উমায়্যা ও আবু জাহল) তাকে বললো, তুমি কি আব্দুল মুত্তালীবের ধর্ম থেকে ফিরে যেতে চাও? অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। তারাও পুনরাবৃত্তি করলো। আবু তালিবের শেষ বাক্য ছিলো এই যে, সে আব্দুল মুত্তালীবের ধর্মেই কায়েম রয়েছে এবং সে 'লা ইলাহা 'ইল্লাল্লাহ' পড়তে অস্বীকার করে, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো, যতক্ষণ না আমাকে নিষেধ করা হবে।” তখনই আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, “নবী ও মু’মিনদের জন্য মুশরিকদের পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত নয়।” (সূরা তাওবাঃ ১১৩) আর আবূ তালিবের সম্পর্কে আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, “তুমি যাকে চাও তাকে হেদায়েত দিতে পারো না, বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হেদায়েত দান করেন।” (সূরা ক্বাসাসঃ ৫৬)
কতিপয় মসলা জানা গেলো
১. ‘তুমি যাকে চাও তাকে হেদায়েত দিতে পারো না’ কথার ব্যাখ্যা। ২. প্রথম আয়াতটির তফসীর। ৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই বাণীর, “বলুন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” প্রকৃত ব্যাখ্যার উপলব্ধি। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ মসলা যা এক শ্রেণীর বিদ্যানদের দাবীর পিরীত। ৪. আবুজাহল ও তার সঙ্গী-সাথীরা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাচাকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করতে বললেন, তখন তার তাৎপর্য কি তা বুঝতে পেরে ছিলো। আবূ জাহলকে আল্লাহ ধ্বংস করুন! তার চেয়ে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে কে বেশী জ্ঞাত ছিলো? ৫. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্বীয় চাচার ইসলাম গ্রহণের জন্য অত্যধিক প্রচেষ্টা। ৬. তাদের খন্ডন করা হয়েছে, যারা মনে করে যে, আব্দুল মুত্তালীব ও তার সহচররা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। ৭. রাসূলুল্লাহ ﷺ তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু ক্ষমা করা হয়নি, বরং নিষেধ করা হয়েছে।
৮. অসৎ সঙ্গী-সাথীর ক্ষতি।
৯. বড়দের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার ক্ষতি।
১০. এ ব্যাপারে বাতিলপন্থীদের সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, কারণ আবূ জেহেল বড়দেরকে দলীলে পেশ করেছে।
১১. শেষ আমলই লক্ষণীয়, কারণ, সে যদি কালেমা পড়তো, তাহলে তাতে সে উপকৃত হতো।
১২. গোমরাহ লোকদের অন্তরে এই গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহের মধ্যে চিন্তনীয় বিষয় রয়েছে, কেননা, উল্লিখিত ঘটনায় তারা এমনভাবে পূর্ব-পুরুষদের অন্ধ অনুসারী ছিলো যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর তঅত্যধিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পূর্ব-পুরুষদের অন্ধ অনুসরণই তাদের উপর প্রাধান্য পেলো।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
এই অধ্যায়টিও পূর্বেকার অধ্যায়ের মতনই, অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ ﷺ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব এবং মর্যাদা-সম্মানে আল্লাহর নিকট সব থেকে মহান ও অসীলার দিক দিয়ে তিনিই আল্লাহর বেশী নিকটের বান্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর চাচাকে হেদায়াত দেওয়ার উপর সামর্থবান ছিলেন না, বরং সর্ব প্রকারের হেদায়াত আল্লাহর হাতে অন্তরের হেদায়াতের মালিক তিনিই, যেমন কেবল তিনিই সৃষ্টির স্রষ্টা, সুতরাং সত্যিকার উপাস্যও তিনিই, তবে আল্লাহ যে বলেছেন, “নিঃসন্দেহে তুমি সঠিক-সোজা পথের দিকে লোকদেরকে পথ দেখাইতেছো।” (সূরা শূরাঃ ৫২) তো এর অর্থ হলো, হেদায়াতের পথ দেখানো, হেদায়াত দান করা নয়, তিনি ছিলেন আল্লাহর সেই অহীর বাহক, যদ্বারা আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে হেদায়াত দান করেছেন।
📄 নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
আদম সন্তানের কুফরী ও তাদের দ্বীন ত্যাগ করার কারণ হলো, নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
﴿يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ ﴾ (النساء: ۱۷۱) আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, “হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না।” (সূরা নিসাঃ ১৭১)
في الصحيح عن ابن عباس رضي الله عنهما، في قول الله تعالى: ﴿وَقالوا لا تَذَرُنَ الهَتَكُمْ وَلا تَذَرُنَ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلا يَغُوْثَ وَيَعُوكَ وَنَسْرًا (نوح : ۲۳) قَالَ : هَذِهِ أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِيْنَ مِنْ قَوْمِ نُوحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوا أَوْحَي الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ : أَنْ انصَبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمْ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُوْنَ فِيْهَا أَنْصَاباً وَسَمُّوْهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوا، وَلَمْ تُعْبَدْ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُوْلَئِكَ وَنُسِيَ الْعِلْمُ، عُبِدَتْ))
সহী হাদীসে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহ তাআলার এই আয়াত “তারা বলেছে, তোমরা তোমা- দের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ, সুয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নসরকে।” (সূরা নূহঃ২৩) সম্পর্কে বলেন, এগুলো নূহ -এর জাতির নেক লোকদের নাম, তাঁরা মারা গেলে শয়তান তাঁদের জাতির অন্তরে এই কথা প্রবেশ করিয়ে দিলো যে, তাঁরা যেখানে বসতেন, সেখানে তাঁদের মূর্তি স্থাপন করে তাঁদের নামে নামকরণ করো, তখন তারা তা-ই করলো, তবে তখন পূজা করা হতো না। অতঃপর যখন এই সব লোক মারা গেলো এবং প্রকৃত তথ্য ভুলিয়ে দেওয়া হলো, তখন পূজা আরম্ভ হয়ে গেলো।”
ইবনুল কাইয়ূম (রাহঃ) বলেন, পূর্বেকার অনেক লোক বলেছেন, তাঁরা যখন মারা গেলেন, লোকজন তাদের কবরে বসতে আরম্ভ করে। তারপর তাঁদের মূর্তি বানায়, অতঃপর দীর্ঘ কাল অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁদের পূজা শুরু হয়।
عَنْ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ الله ﷺ قَالَ: ((لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَ إِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا: عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ)) أخرجاه
উমার থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "তোমরা আমাকে নিয়ে ঐরূপ বাড়াবাড়ি করো না, যেরূপ খ্রীষ্টানরা মারিয়ামের পুত্রকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, আমি তো তাঁর একজন বান্দা, তাতএব তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” (বুখারী-মুসলিম) তিনি আরো বলেন,
(( إِيَّاكُمْ وَالغُلُو، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُو))
অর্থাৎ, “বাড়াবাড়ি করা থেকে বাঁচো, কারণ, এই বাড়াবাড়িই তোমাদের পূর্বেকার অনেককেই ধ্বংস করে দিয়েছে” মুসলিম শরীফে ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “সীমা লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে, এই কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন।”
কতিপয় বিষয় জানা গেলো ১. যে ব্যক্তি এই অধ্যায় এবং এর পরবর্তী দু'টি অধ্যায়কে ভালভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, তার নিকট প্রাথমিক পর্যায় ইসলামের পরিস্থিতি কি ছিলো, তা প্রকট হয়ে যাবে এবং সে আল্লাহর কুদরত ও তাঁর দ্বারা মানুষের অন্তরের বিস্ময়কর পরিবর্তন লক্ষ্য করবে।
২. যমীনে শির্ক প্রথমে কিভাবে শুরু হয়, তা জানা গেলো, তা ছিলো নেক লোকদেরকে কেন্দ্র করে।
৩. সর্ব প্রথম যে জিনিসের দ্বারা নবীদের দ্বীনের পরিবর্তন সূচিত হয়, সে সম্পর্কে ও তার কারণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। আর এটাও জানা গেলো যে, আল্লাহই তাঁদেরকে প্রেরণ করেছিলেন।
৪. শরীয়ত ও প্রকৃতির বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও বিদআতকে গ্রহণ করার কারণ কি, তা জানা গেলো।
৫. এর (কবুল করার) কারণই ছিলো হক্ব ও না-হক্বকে একত্রে মিশ্রিত করণ। যেমন, প্রথমতঃ, নেক লোকদের প্রতি ভালবাসা পোষণ। আর দ্বিতীয়তঃ, আলেমদের একটি দলের এমন কিছু কাজ সম্পাদন করা, যদ্বারা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো ভাল ও সৎ, কিন্তু পরবর্তী লোকেরা মনে করে নেয় যে, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো অন্য কিছু।
৬. সূরা নূহের আয়াতের তাফসীর।
৭. মানুষের প্রকৃতিগত অভ্যাস সম্পর্কে জানা গেলো যে, হজ্বের প্রতি টান অল্প এবং বাতিলের প্রতি ঝোঁক বেশী।
৮. যারা বলেন, বিদআত হলো কুফ্রীর কারণ, আর ইবলীসের নিকট পাপের থেকে বিদআত বেশী প্রিয়, কারণ, পাপ থেকে তাওবা করতে পারে কিন্তু বিদআত থেকে তাওবা করবে না, তাঁদের কথার সমর্থনও (উক্ত হাদীস থেকে) পাওয়া যায়।
৯. বিদআতের পরিণাম সম্পর্কে শয়তান ভালভাবেই জানে, তাতে কর্তার উদ্দেশ্য যতই ভাল হোক না কেন।
১০. শরীয়তের সীমালঙ্ঘনের নিষিদ্ধতার সাধারণ নিয়ম সম্পর্কে এবং সীমালঙ্ঘনের পরিণাম সম্পর্কে অবগত হওয়া।
১১. নেক কাজের উদ্দেশ্যে কবরে অবস্থান করার ক্ষতি।
১২. মূর্তি নির্মাণ নিষিদ্ধ হওয়া এবং তা মিটিয়ে দেওয়ার মধ্যে নিহিত হিকমত সম্পর্কে অবগত হওয়া।
১৩. হাদীসে উল্লিখিত ঘটনার গুরুত্ব এবং সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া অনেক প্রয়োজন, যদিও মানুষ এ ব্যাপারে উদাসীন।
১৪. বড় আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বিদআতীরা উক্ত ঘটনা হাদীস ও তফসীরের কিতাবে পাঠ করে, এর অর্থও ভালভাবে বুঝে এবং আল্লাহ তাদের ও তাদের আক্বীদার মধ্যে প্রতিবন্ধকরূপে দাঁড়ালেও তারা মনে করে যে, নূহ -এর জাতির কার্যসমূহোই ছিলো শ্রেষ্ঠ ইবাদত। আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন, তা-ই হলো কুফরী এবং এই কুফরী কাজে লিপ্ত ব্যক্তির জান-মাল বৈধ।
১৫. এ কথাও পরিষ্কার যে প্রতিমাগুলোর নিকট তারা সুপারিশ ছাড়া আর কিছুই কামনা করে না।
১৬. তাদের বিশ্বাস হলো, যে আলেমরা মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন, তাদেরও অনুরূপ কামনা ছিলো।
১৭. রাসূলুল্লাহ -এর বাণীতে রয়েছে সুমহান এই ঘোষণা, “তোমরা আমার প্রশংসায় ঐরূপ বাড়াবাড়ি করো না, যেরূপ খ্রীষ্টানরা মরীয়মের পুত্রকে নিয়ে করেছিলো।” তিনি তবলীগের মহান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে গেছেন, তাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ হতে দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
১৮. আমাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ -এর নসীহত হলো, যারা শরীয়তের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করবে, তারাই ধ্বংস হবে।
১৯. এখানে এ কথাও পরিষ্কার করে জানা গেলো যে, প্রকৃত জ্ঞান ভুলিয়ে দেওয়ার আগে পর্যন্ত তাদের (মূর্তির) পূজা হয়নি, তাই এতে ইল্ম থাকার উপকারিতা এবং তা না থাকার অপকারিতার বর্ণনাও রয়েছে।
২০. জ্ঞান না থাকার কারণ হলো, আলেমদের মৃত্যু বরণ।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আরবী শব্দ 'গুলু'র অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন করা। অর্থাৎ, মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট অধিকারসমূহের কোন কিছু নেক লোকদের প্রদান করা। কেননা, আল্লাহর যে অধিকারে কেউ অংশীদার হতে পারে না তা হলো, পূর্ণতা, তিনি মুখাপেক্ষীহীন এবং তিনিই সব দিক দিয়ে সব কিছুর পরিচালক। তিনি ব্যতীত কেউ ইবাদতের যোগ্য হতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন সৃষ্টিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি ক'রে এই অধিকারের কোন কিছু প্রদান করে, সে যেন বিশ্বের প্রতিপালকের সাথে তার তুলনা করে। আর এটাই হলো বড় শির্ক, জেনে রাখো, অধিকার হলো তিন প্রকারের, (১) আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট অধিকার, তাতে কেউ অংশীদার হতে পারে না। আর তা হলো, তাঁকেই উপাস্য মনে করা, কেবল তাঁরই ইবাদত করা। তাঁর কোন শরীক নেই, তাঁকেই ভালবাসা ও ভয় করা এবং তাঁরই নিকট আশা করা। (২) এমন অধিকার, যা নবীদের জন্য নির্দিষ্ট যেমন, তাঁদের সম্মান করা এবং তাঁদের অধিকার আদায় করা। (৩) এমন অধিকার, যাতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল উভয়েই শরীক, যেমন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর ঈমান আনা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের অনুসরণ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে ভালবাসা, প্রকৃতপক্ষে এগুলো আল্লাহরই অধিকার এবং আল্লাহর অধিকারের ভিত্তিতেই তা রাসূলগণের অধিকার। হক্ব পন্থীরা এই অধিকারগুলোর মধ্যে পার্থক্য ভালভাবেই জানে। তাই তাঁরা কেবল আল্লাহরই ইবাদত করে এবং দ্বীনকে তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করে। অনুরূপ নবী ও ওলীদের সম্মান ও মর্যাদা অনুপাতে তাঁদেরও অধিকার আদায় করে, আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।