📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 গায়রুল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া

📄 গায়রুল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া


গায়রুল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া অথবা গায়রুল্লাহকে আহ্বান করা শির্ক
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন,
وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ الله مَا لا يَنْفَعُكَ وَلا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذَا مِنَ الظَّالِمِينَ، وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ (يونسঃ ১০৬-১০৭
অর্থ, "আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবে না, যে তোমার ভাল করবে না, মন্দও করবে না। বস্তুতঃ তুমি যদি এমন কাজ করো, তাহলে তখন তুমিও যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আর আল্লাহ যদি তোমার উপর কোন কষ্ট আরোপ করেন, তাহলে তিনি ব্যতীত তা খন্ডাবার মত কেউ নেই।” (সূরা ইউনুসঃ ১০৬-১০৭) তিনি আরো বলেন,
فَابْتَغُوا عِنْدَ اللهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ ﴾ (العنكبوت: ۱۷)
অর্থাৎ, “তোমরা আল্লাহর কাছে রিযিক তালাশ করো এবং তাঁরই ইবাদত করো” (সূরা আনকাবূতঃ ১৭) তিনি অন্যত্র বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ لِمَنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ [الأحقاف : ٥]
অর্থা, "যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে এমন সত্তাকে ডাকে, যে কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে?" (সূরা আহক্বাফঃ ৫) তিনি আরো বলেন,
أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ﴾ [النمل: ٦২]
অর্থাৎ, "বলো তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন, যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন।” (সূরা নামালঃ ৬২) ইমাম তাবরানী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যামানায় এক মুনাফেক ছিলো যে মু'মিনদের কষ্ট দিতো তাই কেউ কেউ বললো, চলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট এই মুনাফেক থেকে নিষ্কৃতির জন্য সাহায্য কামনা করি। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
(( إنه لا يُسْتَغَاتُ بِي، وَإِنَّمَا يُسْتَغَاثُ بِالله ))
অর্থাৎ, “আমার নিকট সাহায্য কামনা করতে হয় না, বরং আল্লাহর নিকটই সাহায্য কামনা করতে হয়."
কতিপয় মসলা জানা গেলো,
১. দুআকে সাহায্য চাওয়ার সাথে সংযুক্ত করা হচ্ছে, সাধারণ জিনিসকে বিশেষ ব্যাপারে নির্দিষ্ট করা। ২. সূরা ইউনুসের আয়াতের তাফসীর। ৩. এটা (গায়রুল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া) হলো, বড় শির্ক, ৪. কোন সৎলোক গায়রুল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে যদি তা করে, তবে সে যালিমদের দলভুক্ত হবে। ৫. পরের আয়াতের তাফসীর। ৬. কুফরী হওয়ার সাথে সাথে তা দুনিয়াতেও কোন উপকারে আসবে না।
৭. তৃতীয় আয়াতের তাফসীর।
৮. রুজী কেবল আল্লাহর নিকট কামনা করা উচিত। অনুরূপ জান্নাতও তাঁরই নিকট চাইতে হয়।
৯. চতুর্থ আয়াতের তাফসীর।
১০. যে গায়রুল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, তার চেয়ে অধিক ভ্রষ্ট আর কেউ নেই।
১১. যাকে ডাকে, সে আহ্বানকারীর ব্যাপারে উদাসীন। তার সম্পর্কে সে কিছুই জানে না।
১২. যাকে ডাকা হয়, এই ডাক তার প্রতি আহ্বানকারীর অসন্তুষ্টির ও শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৩. যাকে ডাকা হয়, এই ডাক তার ইবাদতেরই নামান্তর।
১৪. যাকে ডাকা হয়, এই ইবাদতের কারণে তার কুফরী সাব্যস্ত হয়।
১৫. এই আহ্বানই আহ্বানকারীকে সর্বাধিক ভ্রষ্ট মানুষে পরিণত করে।
১৬. পঞ্চম আয়াতের তাফসীর।
১৭. আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, মূর্তি পূজকরাও স্বীকার করে যে, নিঃস- হায়ের ডাকে আল্লাহ ছাড়া কেউ সাড়া দিতে পারে না। আর এই কারণেই তারা ভয়াবহ বিপদে কেবল আল্লাহকেই ডাকতো।
১৮. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর তাওহীদের সমর্থন এবং আল্লাহর প্রতি আদব শিক্ষাদান।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ
বিগত অধ্যায়ে উল্লিখিত বড় শির্কের যে সংজ্ঞা বলা হয়েছে, অর্থাৎ, (যে ব্যক্তি ইবাদতের কোন কিছুকে গায়রুল্লাহর জন্য সম্পাদন করে, সে মুশরিক বিবেচিত হয়) এই সংজ্ঞা বুঝে থাকলে, এই তিনটি অধ্যায়, যা লেখক পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করেছেন, বুঝতে সক্ষম হবে। কেননা, মানত করা একটি ইবাদত মানত পূরণকারী আল্লাহ কর্তৃক প্রশংসিত, রাসূলুল্লাহ আনুগত্যের মানত পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর যেসব কাজের শরীয়ত প্রশংসা করেছে, অথবা তার সম্পাদনকারীর তারীফ করেছে কিংবা তার নির্দেশ দিয়েছে, তা ইবাদত বলেই গণ্য হয়। কারণ, ইবাদত হলো, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় কথা ও কাজের এমন এক নাম, যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং যাতে তিনি সন্তুষ্ট আর মানত এরই অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপ আল্লাহ প্রত্যেক অনিষ্ট থেকে বাঁচতে তাঁরই নিকট আশ্রয় কামনা করার এবং প্রত্যেক কষ্ট ও বিপদ থেকে রক্ষার জন্য তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন, এগুলো কেবল আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করলে, তা হবে ঈমান ও তাওহীদ, কিন্তু তা গায়রুল্লাহর কাছে করলে, তা হবে শির্ক।
'দুআ' (প্রার্থনা করা), আর 'ইস্তিগাষা' (ফরিয়াদ করা)-এর মধ্যে পার্থক্য হলো, দুআ সাধারণ, যা প্রত্যেক অবস্থাতেই করা হয়, কিন্তু ইস্তিগাষা বা ফরিয়াদ হলো, আল্লাহকে বিপদের সময় ডাকা। এ সবই আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। তিনিই প্রার্থনাকারীদের প্রার্থনা শোনেন, তিনিই বিপদগ্রস্তদের উদ্ধার করেন, কাজেই যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন নবী, ফেরেশতা, ওলী অথবা অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করে কিংবা যদি গায়রুল্লাহর কাছে এমন কিছু কামনা করে, যা কেবল আল্লাহরই ক্ষমতাধীন, তাহলে সে মুশরিক ও কাফের গণ্য হবে।
আর যেহেতু সে দ্বীন থেকে বহিষ্কৃত, সেহেতু সে জ্ঞানশূন্যও বিবেচিত হবে। কেননা, সৃষ্টির কারো কাছে অণু পরিমাণও উপকারিতা নেই, না সে নিজের জন্য কিছু করতে পারে, আর না অপরের জন্য। বরং সকলেই তাদের প্রত্যেক বিষয়ে আল্লাহরই মুখাপেক্ষী,

📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী

📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী


অধ্যায় মহান আল্লাহ বলেন,
أَيُشْرِكُونَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ، وَلَا يَسْتَطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا [الأعراف: ۱۹۲-۱۹۱]
অর্থাৎ, "তারা কি এমন কাউকে শরীক সাব্যস্ত করে যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করে নি, বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর তারা তাদের সাহায্যও করতে পারে না।” (সূরা আ'রাফঃ ১৯১-১৯২) তিনি আরো বলেন
وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنْ قِطْمِيرٍ ﴾ [فاطر: ١٣]
অর্থাৎ, “আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটিরও অধিকারী নয়।” (সূরা ফাত্বিরঃ ১৩) সহী হাদীসে আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
شُجَّ النَّبِيُّ ﷺ يَوْمَ أُحُدٍ، وكسرت رباعيته فَقَالَ: ((كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمٌ شَجُوا نَبِيَّهُمْ فَنَزَلَتْ لَيْسَ لَكَ مِنْ الْأَمْرِ شَيْءٌ
অর্থাৎ, ওহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ তাঁর মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হলে এবং তাঁর সামনের চারটি দাঁত ভেঙ্গে গেলে তিনি বলেন, "সেই জাতি কেমন করে সফলকাম হতে পারে, যারা তাদের নবীকে আঘাত দেয়? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় "এ ব্যাপারে তোমার কোন হাত নেই” সহী হাদীসেই ইবনে উমার থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে ফজরের শেষের রাকআতে রুকু' থেকে উঠার পর এবং 'সামিআল্লাহু লিমানহামিদাহ রাব্বানা লাকাল হামদু' বলার পর এই কথা বলতে শুনেছেন, 'হে আল্লাহ অমুক ও অমুকের উপর লা'নত বর্ষণ করো! তখন আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন, “এ ব্যাপারে তোমার কোন হাত নেই.” অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাফওয়ান ইবনে উমায়্যা, সোহাইল ইবনে আম্র এবং হারিস ইবনে হিশামের উপরে বদ্দুআ করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, "এ ব্যাপারে তোমার কোন হাত নেই."
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : قَامَ رَسُولُ الله ﷺ حِينَ أَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ قَالَ يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ ، أَوْ كَلِمَةٌ نَحْوَهَا، اشْتَرُوا أَنفُسَكُمْ لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنْ اللَّهِ شَيْئًا، يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنْ اللَّهِ شَيْئًا، يَا عَبَّاسُ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنْ اللَّهِ شَيْئًا، وَيَا صَفِيَّةُ عَمَّةَ رَسُولِ اللَّهِ لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنْ اللَّهِ شَيْئًا، وَيَا فَاطِمَةٌ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَلِينِي مَا شِئْتِ مِنْ مَالِي لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنْ اللَّهِ شَيْئًا))
অর্থাৎ, আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর উপর যখন এই আয়াত "আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন” অবতীর্ণ হলো, তখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, "হে কুরায়েশগণ অথবা এই ধরনের কোন বাক্য, তোমরা নিজেদের বাঁচার ব্যবস্থা করে নাও. আমি তোমাদের হয়ে আল্লাহর নিকট কিছুই করতে পারবো না. হে আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র আব্বাস, আমি তোমার হয়ে আল্লাহর কাছে কিছুই করতে পারবো না। হে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ফুফু সাফিয়্যাঃ আমি তোমার হয়ে আল্লাহর নিকট কিছুই করতে পারবো না। হে মুহাম্মাদের বেটী ফাতেমা, আমার মাল-ধন থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও, তোমার হয়ে আল্লাহর নিকট কিছুই করতে পারবো না।"
কতিপয় মসলা জানা গেলো ১. আয়াত দু'টির ব্যাখ্যা। ২. ওহুদের ঘটনা। ৩. সাইয়েদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ ﷺ-এর নামাযে কুনুত পাঠ এবং তাঁর পিছনে সাহাবায়ে কেরামদের আমীন বলা। ৪. যাদের উপর বদ্দুআ করা হয়েছে, তারা কাফের ছিলো। ৫. তারা এমন কিছু কাজ করে ছিলো, যা অধিকাংশ কাফেররা করে নি। যেমন, তাদের নবীকে আঘাত দেওয়া এবং তাঁকে হত্যা করতে আগ্রহী হওয়া। অনুরূপ মৃতদের শারীরিক বিকৃতি ঘটানো, অথচ তারা তাদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত। ৬. এ ব্যাপারেই আল্লাহ তাঁর উপর এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, “এ ব্যাপারে তোমার কোন হাত নেই।” ৭. আল্লাহর বাণী, “হয় আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন, না হয় তাদের শাস্তি দিবেন।” আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন এবং তারা ঈমান আনলো। ৮. বিপদের সময় দুআয়ে কুনুত পড়া। ৯. বদ্দুআকৃত লোকদের নাম এবং তাদের পিতাদের নাম উল্লেখ করা।
১০. নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপর অভিসম্পাত করা।
১১. "আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন!” এই আয়াত অবতীর্ণ হলে নবী করীম যা করে ছিলেন, তার ঘটনা।
১২. সত্যের প্রচারের জন্য রাসূলুল্লাহ চরম সংগ্রাম করেছিলেন, এমন কি তাঁকে পাগল বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছিলো, আজও যদি কোন মুসলিম সত্যের প্রচার করতে যায়, তাকেও অনুরূপ বলা হবে।
১৩. নিকট আত্মীয় ও দূরাত্মীয় সকলের জন্য রাসূলের এই বাণী, "আমি তোমার হয়ে আল্লাহর নিকট কিছুই করতে পারবো না।” এমনকি বললেন, "হে ফাতিমাঃ বিনতে মুহাম্মাদ আমি তোমার হয়েও আল্লাহর নিকট কিছুই করতে পারবো না।”
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ এবারে তাওহীদের দলীল-প্রমাণ পেশ করা আরম্ভ হলো। তাওহীদের প্রমাণে রয়েছে কুরআন ও হাদীসের এবং যুক্তি-সম্বন্ধীয় এমন অনেক দলীল, যা অন্য বিষয়ের নেই, পূর্বে উল্লিখিত তাওহীদে রুবুবিয়্যা/ প্রতিপালকত্বের একত্ববাদ এবং তাওহীদে আসমা অস্-সিফাত/ নাম ও গুণাবলীর একত্ববাদ, এই দু'টিই হলো তাওহীদের সবচেয়ে বড় ও বলিষ্ঠ দলীল, কেননা, যিনি একমাত্র স্রষ্টা ও তত্ত্বাব-ধায়ক এবং সব দিক দিয়েই যিনিই একমাত্র পূর্ণতার অধিকারী, তিনি ব্যতীত উপাস্যের যোগ্য আর কেউ হতে পারে না। অনুরূপ সৃষ্টির ও আল্লাহর সাথে যার পূজা করা হয়, তাদের গুণাবলী সম্পর্কে অবগতি লাভও তাওহীদের বড় দলীল, কারণ, আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয়, তাতে সে কোন ফেরেশতা হোক, মানুষ হোক, বৃক্ষ হোক এবং পাথর ও তান্য যেই হোক না কেন, এ সবই আল্লাহর মুখাপেক্ষী এবং দুর্বল, এদের হাতে অণু পরিমাণও কোন উপকারিতা নেই, এরা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। এরা ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও তারা মালিক নয়। মহান আল্লাহই হচ্ছেন সমস্ত সৃষ্টের স্রষ্টা, তাদের আহারদাতা, সবকিছুর পরিচালক, ইষ্টানিষ্টের মালিক, দাতা ও রোধকারী, তাঁরই হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, সকল জিনিসের প্রত্যাবর্তন তারই দিকে, তাঁরই কাছে আশা করে এবং তারই সমীপে নত হয়।
মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবের বহু স্থানে এবং তাঁর রাসূলের জবানি বারংবার যে দলীলের উল্লেখ করেছেন, তার চেয়ে বড় দলীল আর কোন্টা হতে পারে? ওটা যেমন আল্লাহর একত্ববাদের এবং তাঁর সত্যবাদিতার যুক্তিসংগত ও প্রকৃতিগত দলীল, তেমনি ওটা শ্রবণ-সম্বন্ধীয় শরীয়তী দলীলও বটে। অনুরূপ তা শির্ক বাতিল হওয়ারও দলীল।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ (মুহাম্মাদ ﷺ) তাঁর সব চেয়ে নিকটের যে এবং যার প্রতি তিনি বেশী করুণাসিক্ত, তারই যখন কোন উপকার করার তাধিকার রাখেন না, তখন অপরের কি করতে পারেন? কাজেই ধ্বংস হোক সে, যে আল্লাহর সাথে শরীক করে এবং সৃষ্টির কাউকে আল্লাহর সমতুল্য মনে করে তার দ্বীন বিলুপ্ত হওয়ার পর তার বিবেক-বুদ্ধিও বিলুপ্ত হয়ে গেছে, মহান আল্লাহর গৌরবময় গুণাবলী এবং তাঁরই কেবল পূর্ণতার অধিকারী হওয়া, সব থেকে বৃহৎ দলীল যে, তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য। সৃষ্টির যাবতীয় গুণাবলী, তার মধ্যে বিদ্যমান কমতি, প্রত্যেক ব্যাপারে স্বীয় প্রতিপালকের মুখাপেক্ষী হওয়া এবং তার প্রতিপালক যতটুকু পূর্ণতা দিয়েছেন, তা ব্যতীত কোন কিছুর অধিকার না রাখা হলো, তার উপাস্যতা বাতিল হওয়ার বড় প্রমাণ। সুতরাং যে আল্লাহ এবং সৃষ্টি সম্পর্কে অবগতি লাভ করবে, তার এই অবগতি তাকে বাধ্য করবে কেবল আল্লাহর ইবাদত করতে, তাঁর জন্য দ্বীন খালেস করতে, তাঁর প্রশংসা করতে, জবান ও অন্তরের দ্বারা তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে এবং সৃষ্টির উপর কোন আস্থা না রাখতে। আর এ সবই হবে, ভীতি, আশা ও লোভে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী

📄 অধ্যায়ঃ আল্লাহর বাণী


অধ্যায় মহান আল্লাহর বাণী,
حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الكبير [سبأ: ٢٣]
অর্থাৎ, “যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরস্পরে বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কি বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান।” (সূরা সাবাঃ ২৩)
في الصحيح عَنْ أَبي هريرة الله ، إِذَا قَضَى الله الْأَمْرَ فِي السَّماءِ ضَرَبَتْ الْمَلَائِكَةُ بِأَجْنِحَتِهَا خُضْعَانًا لِقَوْلِهِ كَالسَّلْسِلَةِ عَلَى صَفْوَانٍ صَفْوَانٍ، يَنْفُذُهُمْ ذَلِكَ، فَإِذَا فُزَعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا لِلَّذِي قَالَ الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ فَيَسْمَعُهَا مُسْتَرِقُو السَّمْعِ وَمُسْتَرِقُو السَّمْعِ هَكَذَا بَعْضَهُ فوق بعض، وصفه سفيان بن عيينة بكفه، وَفَرَّجَ بَيْنَ أَصَابِعِ يَدِهِ الْيُمْنَى نَصَبَهَا بَعْضَهَا فَوْقَ بَعْضٍ، فحرفها وبدد بين اصحابه، فَيَسْمَعُ الْكَلِمَةَ فَيُلَقَيْهَا إِلَى مَنْ تحته، ثُم يُلْقِيهَا الآخَرُ إلى مَنْ تَحتَهُ، حَتى يُلْقِيْهَا عَلَى لسان الساحر أو الكاهن، فربما أَدْرَكَهُ السَّهَابُ قَبْلَ أَن يُلْقِيهَا . وَرُبمَا أَلْقَاهَا قَبْلَ أَن يُدْرِكَهُ فَيُكَذِّبُ مَعَها مائة كذبة فَيُقَالُ : أَلَيْسَ قَدْ قَالَ لَنَا يَوْمَ كَذَا وَكَذَا : كَذَا وَكَذَا؟ فيصدق بتلك الكلمة التي سمعت من السماء))
অর্থাৎ, সহী হাদীসে আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহ যখন আসমানে কোন বিষয়ের ফয়সালা করেন, তখন তাঁর কথায় বিনয়-নম্র হয়ে ফেরেশতারা তাদের ডানাগুলো এমনভাবে নাড়াতে থাকেন, যেন কোন ভারী পাথরের শিকল পড়েছে, ফেরেশতাদের অন্তরে তা দোলা দেয় “যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন তারা পরস্পরে বলাবলি করে, তোমাদের পালনকর্তা কি বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান.” তখন চুরিতে কথা শ্রবণকারীরা তা শুনে নেয়, হাদীসের বর্ণনাকারী সাফওয়ান এই হাদীস বর্ণনায় 'চুরিতে কথা শ্রবণকারী' শব্দ সম্পর্কে হাতের ইশারায় আঙ্গুলগুলো ফাঁক করে দেখিয়েছেন যে, এইভাবে এই শ্রবণকারীরা অধিক সংখ্যায় উপরে নিচে প্রসারিত থেকে কথা শোনে তার পর তার নিকটের কোন ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেয়, অবশেষে তা কোন যাদুকর বা কোন গণকের জবানি পৃথিবীতে পৌঁছায়. কখনোও কখনোও চুরিতে শ্রবণকারীর উপর তা পৌঁছানোর পূর্বেই অগ্নি বর্ষণ হয়. আবার কখনোও কখনোও অগ্নি বর্ষণের পূর্বেই তা পৃথিবীতে পৌঁছে দেয় এবং প্রাপক তার সাথে শত শত মিথ্যা মিশ্রিত করে। তখন বলা হয়, অমুক অমুক দিনে কি আমাদেরকে এই কথা বলা হয় নি? তখন আসমান থেকে শোনা সেই কথা সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়।"
وَعَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ اللهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ (( إِذَا أَرَادَ اللَّهُ تَعَالَى أَن يُوْحِيَ بِالأَمْرِ، وَتَكَلَّمَ بِالْوَحْيِ أَخَذَتِ السَّمَوَاتُ مِنْهُ رَجْفَةٌ، أَوْ قَالَ: رَعْدَةً شَدِيدَةٌ، خَوْفاً مِّنَ الله عَزَّ وَجَلَّ، فَإِذَا سَمِعَ ذَلِكَ أَهْلُ السَّمَوَاتِ صَعِقُوا وَخَرُّوا لِلَّهُ سُجَّدًا فَيَكُوْنُ أَوَّلَ مَن يَرْفَعُ رَأْسَهُ جِبْرِيلُ، فَيُكَلِّمُهُ اللَّهُ مِنْ وَحْيِهِ بِمَا أَرَادَ، ثُمَّ يَمُرُّ جِبْرِيلُ عَلَى المَلائِكَةِ، كُلَّمَا مَرَّ بِسَمَاءِ سَأَلَهُ مَلَائِكَتُهَا : مَاذَا قَالَ رَبُّنَا يَا جِبْرِيلُ ؟ فَيَقُوْلُ جِبْرِيلُ : قَالَ الحَقِّ، وَهُوَ العَلِيُّ الكَبِيرُ، فَيَقُوْلُوْنَ كُلُّهُمْ مِثْلَ مَا قَالَ جِبْرِيلُ، فَيَنْتَهِي جِبْرِيلُ بِالْوَحْيِ إِلَى حَيْثُ أَمَرَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ ))
অর্থাৎ, নাওয়াস ইবনে সামআন থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যখন মহান আল্লাহ অহী প্রেরণের ইচ্ছা করেন এবং সেই অহীর বাক্য প্রয়োগ করেন, তখন আকাশ ও যমীনসমূহে মহিমান্বিত আল্লাহর ভয়ে কম্পন অথবা বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়, যখন আকাশবাসী তা শোনে, তখন তাঁরা চেতনা হারিয়ে ফেলেন এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদায় পড়ে যান, অতঃপর জিবরীল সর্ব প্রথম মাথা তুলেন এবং আল্লাহ তাঁর সঙ্গে তাহীর কথা উক্তি করেন, তারপর জিবরীল অন্যান্য ফেরেশতাদের নিকট গমন করেন। প্রত্যেক আকাশের ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করেন, হে জিবরীল! আমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন, তখন জিবরীল বলেন, তিনি সত্য বলেছেন, তিনিই সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। অতঃপর সকল ফেরেশতা জিবরীল -এর ন্যায় বলতে থাকেন, এইভাবে জিবরীল তাহী নিয়ে সেই স্থান পর্যন্ত গমন করেন, যেখানে যাওয়ার নির্দেশ মহান আল্লাহ দিয়েছেন।”
কতিপয় মসলা জানা গেলো ১. উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যা। ২. এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত যে, শির্ক বাতিল, বিশেষতঃ সেই শির্ক, যার সম্পর্ক নেক লোকদের সাথে। এই আয়াত সম্পর্কে বলা হয় যে, এটা অন্তর থেকে শির্কের মূলোৎপাটন করে। ৩. আল্লাহর এই বাণীর ব্যাখ্যা, “তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান।” ৪. এ সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসা করার কারণ। ৫. জিবরীল তাদেরকে উত্তর দেন যে, আল্লাহ এই এই বলেন। ৬. সর্ব প্রথম যিনি মাথা উঠাবেন তিনি হবেন জিবরীল। ৭. তিনি সকল আসমানবাসীর কথার উত্তর দিবেন, কারণ, তাঁরা জিজ্ঞাসা করবেন। ৮. সকল আসমানবাসীই অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। ৯. আল্লাহর কালেমার কারণে আসমানে কম্পন সৃষ্টি হওয়া। ১০. জিবরীল সেখানে পৌঁছান, যেখানে আল্লাহ নির্দেশ দেন। ১১. শয়তানরা যে চুরি করে কথা শোনে, তার উল্লেখ। ১২. একে অপরকে কিভাবে কথা পৌঁছায় তার বর্ণনা। ১৩. অগ্নি প্রেরণ।
১৪. কখনো এই অগ্নি ওলীর কানে কথা পৌঁছানোর পূর্বেই তাকে পেয়ে বসে। আবার কখনো সে তার উপর আগুন প্রেরিত হওয়ার পূর্বেই তার ওলীর কানে কথা পৌঁছে দেয়।
১৫. কখনো কখনো গণকরা সত্য বলে।
১৬. তারা একটি সত্যের সাথে একশত মিথ্যা মিশ্রিত করে।
১৭. তাদের সেই কথাটাই সত্য হয়, যা আসমান থেকে চুরি করে শোনা হয়।
১৮. মানুষের অন্তর মিথ্যা এমনভাবে গ্রহণ করে যে, একটি সত্যের প্রতি লক্ষ্য করে, অথচ একশত মিথ্যার প্রতি লক্ষ্য থাকে না।
১৯. এই সত্য কথাটা তারা একে অপরের নিকট পৌঁছায় এবং এরই দ্বারা দলীল কায়েম করে।
২০. আল্লাহর গুণের প্রমাণ, যদিও বিভ্রান্ত আশআরী দল তা মানে না।
২১. এ কথা পরিষ্কার করে জানা গেলো যে, আসমানবাসীদের অজ্ঞান হওয়া এবং আসমানে কম্পন সৃষ্টি হওয়ার কারণ হলো আল্লাহর ভয়।
২২. তাঁরা আল্লাহর জন্য সিজদায় পড়ে যাবেন।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ- এটা (অর্থাৎ এই অধ্যায়ে উল্লিখিত সমস্ত বিষয়ই) হলো তাওহীদ ওয়াজিব হওয়ার এবং শির্ককে বাতিল সাব্যস্ত করার খুব বড় প্রমাণ। এখানে কুরআন ও হাদীসের এমন কথার উল্লেখ হয়েছে, যদ্বারা সেই প্রতিপালকের বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য প্রমাণিত হয়, যাঁর মাহাত্ম্যের সামনে সৃষ্টির মাহাত্ম্য কিছুই থাকে না। যাঁর সামনে ফেরেশতাগণ এবং উভয় জগৎ নত হয়ে যায়, তাঁর কালাম শোনার সময় তাঁরা (ফেরেশতারা) তাঁদের অন্তরকে স্থির রাখতে পারে না। সকল সৃষ্টিই তাঁর গৌরবের সামনে নতি স্বীকার করে, তাঁর মাহাত্ম্য ও মহিমাকে স্বীকার করে এবং তাঁর ভয়ে নত হয়। তাই যে সত্তার এই শান, তিনিই প্রতিপালক। তিনি ইবাদত, প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা পাবার একমাত্র যোগ্য। সম্মান পাবার এবং উপাস্য হওয়ার অধিকার তিনিই রাখেন। তিনি ব্যতীত এই অধিকারের কোন কিছুই কেউ পেতে পারে না। যেমনি তিনিই পূর্ণতা, বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য এবং গৌরব ও সৌন্দর্যের গুণে গুণান্বিত, তিনি ছাড়া অন্য কেউ এ সব গুণে গুণান্বিত হতে পারে না, তেমনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় ইবাদত হলো তাঁরই নির্দিষ্ট অধিকার। কোনভাবেই এতে কেউ শরীক হতে পারে না।

📘 তাওহিদের সরল ভাষ্য > 📄 শাফাআ’ত প্রসঙ্গে

📄 শাফাআ’ত প্রসঙ্গে


শাফাআ'ত প্রসঙ্গে
মহান আল্লাহ বলেন,
وَأَنْذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْ يُحْشَرُوا إِلَى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُمْ مِنْ دُونِهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ ﴾ [الأنعام: ٥١]
অর্থাৎ, "আপনি এ কুরআন দ্বারা তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়ার যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না।” (সূরা আনআমঃ ৫ ১) তিনি আরো বলেন,
قُل لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا الزمر : ٤٤
অর্থাৎ, “বলুন, সমস্ত সুপারিশ আল্লাহরই ক্ষমাধীন.” (সূরা যুমারঃ ৪৪) তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ﴾ (বাক্বারা: ২৫৫)
অর্থাৎ, “কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?” (সূরা বাক্বারাঃ২৫৫) তিনি আরো বলেন,
﴿وَكَمْ مِنْ مَلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللهُ لَمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى ﴾ [النجم: ٢٦]
অর্থাৎ, “আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না, যতক্ষণ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন, অনুমতি না দেন.” (সূরা নাজমঃ২৬) আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন,
﴿قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الأَرْضِ ﴾ [سبأ : ٢٢-٢٣]
অর্থাৎ, “বলুন, তোমরা তাদেরকে আহ্বান করো, যাদেরকে উপাস্য মনে করতে আল্লাহ ব্যতীত, তারা নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের অণু পরিমাণ কোন কিছুর মালিক নয়, এতে তাদের কোন অংশ নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়, যার জন্যে অনুমতি দেওয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না.” (সূরা সাবাঃ ২২-২৩)
আবুল আব্বাস (ইবনে তাইমিয়া) বলেন, মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত যে সবের উপর আস্থা রেখেছিলো, আল্লাহ সে সবের অস্বীকৃতি ঘোষণা করেন, কাজেই গায়রুল্লাহর কোন কিছুর মালিক হওয়া অথবা কোন কিছুতে তাদের অংশ থাকা বা আল্লাহর সাহায্যকারী হওয়া সব কিছুর অস্বীকার করেছেন, এখন সুপারিশের ব্যাপারটা বাকী ছিলো, তাই বলে দেওয়া হলো যে, এই সুপারিশ কেবল তারই উপকারে আসবে, যার জন্য আল্লাহ অনুমতি দিবেন, যেমন আল্লাহ বলেন, "তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট.” (সূরা আম্বিয়াঃ ২৮) সুতরাং মুশরিকরা কিয়ামতের দিন যে সুপারিশ ফল-প্রসূ হবে বলে মনে করে, কুরআর তার তাস্বীকৃতি দেয়, আর নবী করীম বলেছেন,
(( إِنَّهُ يَأْتِ فَيَسْجُدُ لِرَبِّهِ وَيَحْمَدُهُ لَا يَبْدَأُ بِالشَّفَاعَةِ أَوَّلاً - ثُمَّ يُقَالُ لَهُ : ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَقُلْ تُسْمَعْ ، وَسَلْ تُعْطَ وَاشْفَعْ تُشَفَعْ))
অর্থাৎ, “তিনি তাঁর প্রতিপালকের সামনে এসে সিজদা করবেন এবং অনেক প্রশংসা করবেন, তিনি প্রথমেই সুপারিশ করতে আরম্ভ করবেন না. অতঃপর তাকে বলা হবে, তুমি মাথা তুলো. তুমি বলো, তোমার কথা শোনা হবে. তুমি চাও, তোমাকে দেওয়া হবে. তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে.” আবূ হুরাইরা রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করেন,
(( مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : ((مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ))
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে কে আপনার সুপারিশ দ্বারা সর্বাধিক ধন্য হবে? তিনি বললেন, “যে নিষ্ঠার সাথে অন্তর থেকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-পাঠ করবে।” তাই এই সুপারিশ হবে আল্লাহর অনুমতিতে নিষ্ঠাবানদের জন্যে, আল্লাহর সাথে শরীককারীদের জন্যে হবে না।
প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ তা'য়ালা নিষ্ঠাবান লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন এবং যিনি সম্মান প্রাপ্ত হয়ে শাফাআ'তের অনুমতি লাভ করেছেন এবং ‘মাক্কামে মাহমুদ’ লাভ করেছেন, তাঁর দোআর মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন, সেই শাফাআ'তের কুরআন তঅস্বীকৃতি দিয়েছে, যাতে শির্ক আছে, আবার কুরআনের অনেক স্থানে আল্লাহর অনুমতিক্রমে শাফাআ'ত সাব্যস্ত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন যে, শাফাআ'ত তাওহীদবাদী ও মুখলেস লোকদের জন্যেই নির্দিষ্ট।
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা। ২. নিষিদ্ধ শাফাআ'তের বর্ণনা। ৩. প্রমাণিত শাফাআতের বর্ণনা। ৪. বড় শাফাআ'তের উল্লেখ আর তা হলো মাক্কামে মাহমুদ। ৫. রাসূলুল্লাহ কিভাবে শাফাআত করবেন, তার বর্ণনা তিনি প্রথমেই শাফাআ'ত করবেন না, বরং আল্লাহর জন্য সিজদা করবেন। যখন তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে, তখন তিনি শাফাআ'ত করবেন। ৬. কে সুপারিশ দ্বারা ধন্য হবে? ৭. মুশরিকদের জন্য সুপারিশ হবে না। ৮. প্রকৃত শাফাআ'তের বর্ণনা।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ
লেখক এখানে (শির্কীয় অধ্যায়ের সাথে) শাফাআ'তের অধ্যায়ের বৃদ্ধি করেছেন, কারণ, মুশরিকরা তাদের শির্ক এবং ফেরেশতা, আম্বিয়া ও ওলীদের নিকট তাদের প্রার্থনা করাকে এইভাবে সঠিক সাব্যস্ত করে যে, আমরা তাঁদের নিকট প্রার্থনা করি, অথচ আমরা জানি যে তাঁরা সৃষ্টি ও অন্যের দাস, কিন্তু যেহেতু আল্লাহর নিকটে তাঁদের রয়েছে সুমহান মর্যাদা ও উচ্চ স্থান, তাই তাঁরা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটে করে দিতে পারবেন এবং আমাদের জন্য তাঁর নিকট সুপারিশও করতে পারবেন, যেমন নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজা-বাদশাহদের নিকট সম্মানী ব্যক্তিদের নৈকট্য লাভ করে তাদেরকে মাধ্যম বানানো হয়, এটা হলো সমস্ত বাতিলের বড় বাতিল, আর এটা হলো যে মহান আল্লাহ এবং সম্রাটের সম্রাটকে সকলই ভয় করে ও যাঁর সামনে সমস্ত সৃষ্টিকুল নতি স্বীকার করে, সেই সত্তার সাথে এমন রাজাদের সাদৃশ্য স্থাপন করা, যারা তাদের রাজত্বের পূর্ণতার জন্য এবং নিজেদের শক্তির বাস্তবায়নের জন্য বহু মন্ত্রী ও সহযোগীর মুখাপেক্ষী হয়, তাই আল্লাহ এই (সুপারিশ লাভের) ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছেন এবং পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সমস্ত সুপারিশ তাঁরই ইখতিয়ারাধীন যেমন সমস্ত রাজত্ব তাঁরই। তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর তিনি যার কথা ও কাজে সন্তুষ্ট, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে অনুমতি দিবেন না। আর তিনি কেবল তার প্রতি সন্তুষ্ট, যে তাওহীদবাদী ও নিষ্ঠাবান আমলকারী।
এখানে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, মুশরিকের জন্য শাফাআ'তের কোন অংশ নেই, এ কথাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে যে শাফাআ'ত বাস্তবায়িত হবে, তা কেবল নিষ্ঠাবানদের জন্যই নির্দিষ্ট। আর এই সমস্ত শাফাআ'ত আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ, সুপারিশকারীর সম্মানার্থে এবং যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তাকে ক্ষমা করার জন্য হবে। তাই সেই সত্তাই প্রশংসা পাবার অধিকারী, যিনি মুহাম্মদ ﷺ কে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং তাকে মাক্কামে মাহমুদ দান করবেন। আর এটাই হবে কুরআন ও হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত শাফাআ'ত। লেখক (রাহঃ) শাফাআ'ত' সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমি- য়‍্যার যে উক্তির উল্লেখ করেছেন তা-ই যথেষ্ট।
শাফাআ'তের অধ্যায়কে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, সেই সব দলীলগুলো তুলে ধরা, যা প্রমাণ করে যে, যে সমস্ত উপাস্যগুলোকে মুশরিকরা অসীলা ও মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে তাদের উপর আস্থা- বান হয়, তা সবই বাতিল, তারা না নিজেই কোন কিছুরই মালিক, না কোন কিছুতে তারা শরীক, আর না কোন কিছুর সাহায্য-সহযোগিতা তারা করতে পারে, আর না শাফাআ'তের কোন অধিকার তারা রাখে। এই সমস্ত কিছুর মালিক হলেন কেবল আল্লাহ, সুতরাং উপাস্যও একমাত্র তিনিই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00