📄 শির্ককে ভয় করা
শির্ককে ভয় করা
মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللَّهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ مِنْ يَشَاءُ﴾ (النساء: ٤٨
অর্থাৎ, “নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এ ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা ৪৮) আর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এইভাবে দুআ করে ছিলেন,
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الأَصْنَامَ (ابراهيم: ٣٥)
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ! আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন।” (সূরা ইবরাহীমঃ ৩৫) আর হাদীসে এসেছে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,)
(( أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشَّرْكُ الأَصْغَرُ)) فَسُئِلَ عَنْهُ؟ فَقَالَ: ((الرياء))
অর্থাৎ, "আমি তোমাদের উপর সব থেকে যে জিনিসের আশঙ্কা বোধ করি, তা হলো ছোট শির্ক, আর ছোট শির্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “তা হলো রিয়া” (লোক দেখানো কোন কাজ করা। আর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলু- ল্লাহ বলেছেন,
(( مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو اللَّهِ نِدًا دَخَلَ النَّارِ)) البخاري
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে আহ্বান করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (বুখারী) মুসলিম শরীফে জাবির থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ دَخَلَ النَّارَ)) البخاري
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি শির্ক মুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে শির্ক নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (বুখারী)
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. শির্ককে ভয় করা, ২. ‘রিয়া’ (লোক দেখানো কাজ) শির্কের অন্তর্ভুক্ত, ৩. তবে এটা ছোট শির্ক, ৪. নেক লোকদের জন্য এটাই (ছোট শির্ক) হলো সর্বাধিক ভীতিপ্রদ শির্ক। ৫. জান্নাত ও জাহান্নামের নৈকট্য। ৬. জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়েরই নিকটে হওয়ার কথা একটি হাদীসে এসেছে। ৭. যে ব্যক্তি শির্কমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে শির্ক নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, যদিও সে মানুষের মধ্যে সব থেকে বেশী ইবাদতকারী হয়।
৮. বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবরাহীম -এর আল্লাহর নিকট মূর্তি পূজা থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা।
৯. তাদের তঅধিকাংশের অবস্থার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, যেমন বলা হয়েছে, “হে আমার প্রতিপালক! এরা অনেক মানুষকে বিপথগামী করেছে"
১০. এতে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র ব্যাখ্যা রয়েছে, যেমন ইমাম বুখারী উল্লেখ করেছেন।
১১. শির্ক থেকে মুক্ত ব্যক্তির ফযীলত,
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ আল্লাহর উপাস্যে এবং তাঁর ইবাদতে শরীক করা, তাওহীদের ঘোর বিরোধী। আর তা দু'প্রকারেরঃ-(১) বড় তথা স্পষ্ট শির্ক (২) ছোট তথা সূক্ষ্ম শির্ক, বড় শির্ক হলো, আল্লাহর কোন শরীক নিযুক্ত ক'রে তাকে আল্লাহর মত আহ্বান করা, অথবা ভয় করা, কিংবা তার নিকট আশা করা, বা আল্লাহর মত তাকে ভালবাসা, কিংবা ইবাদতের কোন কিছু তার জন্য সম্পাদন করা। এই শির্ক যে করবে, সে সম্পূর্ণ তাওহীদ শূন্য হবে। আর এই মুশরিকের জন্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, ওর ঠিকানা হবে জাহান্নাম, আর যে ইবাদত গায়রুল্লাহর জন্য সম্পাদন করা হয়েছে, তার নাম ইবাদত রাখা হোক, কিংবা অসীলা রাখা হোক, অথবা অন্য যে কোন নামেই তার নামকরণ করা হোক না কেন, সবই বড় শির্ক গণ্য হবে। কারণ, জিনিসের অর্থ ও তার মূল বিষয়ই লক্ষণীয়। শাব্দিক পার্থক্য লক্ষণীয় নয়। আর ছোট শির্ক হলো, সেই সমস্ত কথা ও কাজ, যদ্দ্বারা বড় শির্ক পর্যন্ত পৌঁছা হয়, যেমন, কোন সৃষ্টির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ক'রে তাকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া, অথচ সে এর যোগ্য নয় এবং গায়রুল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ ও লোক দেখানো কোন কাজ করা ইত্যাদি।
শির্ক যখন তাওহীদ পরিপন্থী, যা জাহান্নামে প্রবেশ এবং সেখানে চিরন্তন অবস্থানকে ওয়াজিব করে, আর তা বড় হলে, জান্নাত হারাম করে এবং তা থেকে মুক্ত না থাকা পর্যন্ত সৌভাগ্য লাভের কোন উপায়ই নেই, তখন প্রত্যেক বান্দার অপরিহার্য কর্তব্য হলো, শির্ককে দারুণভাবে ভয় করা। তা থেকে এবং তার সমস্ত পথ ও উপায়- উপকরণ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করা। আর আম্বিয়া, পূণ্যবান এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ লোকদের মত তা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করা, আর বান্দার উচিত অন্তরে মজবুত নিষ্ঠার স্থান দেওয়া। আর এটা হবে আল্লাহর সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে এবং তাঁকেই একমাত্র উপাস্য ভেবে। তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়ে। তাঁকেই ভয় করে, তাঁরই নিকট কামনা ও আশা করে। বান্দা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে যা কিছু করবে ও যা ত্যাগ করবে, এসবের মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর সাওয়াব লাভ। কারণ, ইখলাসের গুণই হলো যে, তা ছোট ও বড় শির্ককে দূর করে। আর দুর্বল ইখলা- সের কারণেই মানুষ শির্কে পতিত হয়।
📄 লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’র সাক্ষ্য দান
'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন,
قُل هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو الى الله على بصيرة (يوسف: ۱۰৮)
অর্থাৎ, “বলে দিন, এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে- সুজে দাওয়াত দিই।” (সূরাঃ ১০৮) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ যখন মুআ'যকে ইয়ামান অভিমুখে পাঠিয়ে ছিলেন, তখন বলেছিলেন,
(( إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوْهُمْ إِلَيْهِ شَهَادَةُ أَن لا إلَهَ إِلَّا اللهُ)) وَفِي رَوَايَةٍ : ((إِلَى أَن يُوَحِّدُوا اللَّهَ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ، فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ، فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَاهِمْ، وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُوْمِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَ بَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ)) اخر جاه
অর্থাৎ, “তুমি এমন এক জাতির কাছে যাচ্ছ, যারা আহলে কিতাব। অতএব সর্ব প্রথম যে জিনিসের দিকে তাদেরকে আহ্বান করবে, তা হবে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র সাক্ষ্য প্রদান। অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'তারা যেন আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করে নেয়। যখন তারা এটা মেনে নিবে, তখন তাদের বলবে, আল্লাহ তাদের উপর দিন রাতে পাঁচ ওয়াক্তের নামায ফরয করেছেন। যখন তারা এটা মেনে নিবে, তখন তাদের বলবে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, তাদের বিত্তশালীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং গরীবদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। যখন তারা এ ব্যাপারে তোমার কথা মেনে নিবে, তখন তাদের উত্তম মাল থেকে সাবধান থাকবে এবং মযলুমের বদ্দুআকে ভয় করবে। কারণ, এই দুআ ও আল্লাহর মাঝে কোন আড়াল নেই।” (বুখারী-মুসলিম) বুখারী-মুসলিমেই সাহল ইবনে সাআ'দ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ খায়বারের দিন বলেছিলেন,
(الأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ، قَالَ: فَبَاتَ النَّاسُ يَدُوكُونَ لَيْلَتَهُمْ أَيُّهُمْ يُعْطَاهَا، فَلَمَّا أَصْبَحَ النَّاسُ غَدَوْا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ كُلُّهُمْ يَرْجُو أَنْ يُعْطَاهَا ، فَقَالَ أَيْنَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ ؟ فَقَالُوا : يَشْتَكِي عَيْنَيْهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ ! قَالَ: فَأَرْسِلُوا إِلَيْهِ، فَأْتُونِي بِهِ، فَلَمَّا جَاءَ بَصَقَ فِي عَيْنَيْهِ وَدَعَا لَهُ فَبَرَأَ حَتَّى كَأَنْ لَمْ يَكُنْ بِهِ وَجَعٌ، فَأَعْطَاهُ الرَّايَةَ فَقَالَ: انْفُذْ عَلَى رِسْلِكَ حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ، وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُّ عَلَيْهِمْ مِنْ حَقٌّ اللَّهِ فِيهِ، فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ))
অর্থাৎ, “অবশ্যই আমি কাল এমন লোকের হাতে ঝান্ডা দিবো, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও ভালবাসেন, আল্লাহ তাঁরই হাতে বিজয় দান করবেন, লোকেরা এই ভাবনা-চিন্তায় তা অস্থির হয়ে রাত্রি যাপন করলো যে, তাদের মধ্যে কাকে এই ঝান্ডা দেওয়া হবে। প্রভাত হলে সকলেই এই আশা নিয়ে রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত হলো যে, তাকে এই ঝান্ডা দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, 'আলী ইবনে আবী তালেব কোথায়?' বলা হলো, তিনি চক্ষু পীড়ায় ভুগছেন, অতঃপর লোক পাঠিয়ে তাঁকে আনা হলো, রাসূলুল্লাহ তাঁর চক্ষুদ্বয়ে থুথু লাগিয়ে দিলেন এবং তাঁর জন্য দুআ করলে, তিনি এমনভাবে পীড়ামুক্ত হলেন যে, তাঁর কোন ব্যথাই যেন ছিলো না। অতঃপর তিনি তাঁকে ঝান্ডা দিয়ে বললেন, তুমি তাদের দিকে ধীরস্থিরভাবে এগিয়ে যাও এবং তাদের প্রাঙ্গণে পৌঁছে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করো ও তাদের উপর আল্লাহ তা'য়ালার অপরিহার্য অধিকার সম্পর্কে অবহিত করো আল্লাহর শপথ! যদি একটি মানুষও তোমার মাধ্যমে সুপথ পায়, তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের থেকেও উত্তম হবে।” (বুখারী-মুসলিম)
যে বিষয়গুলি জানা গেলো, ১. আল্লাহর প্রতি আহ্বান করা তারই রীতি, যে রাসূলুল্লাহ -এর অনুসরণ করেছে।
২. ইখলাসের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, কারণ, অনেকেই হজ্বের দিকে আহ্বান করলেও তাদের উদ্দেশ্য হয় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি।
৩. জ্ঞানের আলোকে দাওয়াত দেওয়া অপরিহার্য।
৪. সব থেকে সুন্দর তাওহীদের প্রমাণ হলো, আল্লাহকে সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত মনে করা।
৫. সব থেকে নিকৃষ্ট শির্ক হলো, আল্লাহকে দোষযুক্ত ভাবা।
৬. এটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হলো, মুসলিমকে মুশরিকদের থেকে দূরে রাখা, যাতে সে শির্ক না করা সত্ত্বেও তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যায়।
৭. তাওহীদই হলো প্রথম ওয়াজিব।
৮. সমস্ত কিছুর আগে তাওহীদ দিয়ে আরম্ভ করতে হবে, এমন কি নামাযেরও আগে।
৯. আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করার অর্থ হলো, এই সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মা'বুদ নেই।
১০. মানুষের মধ্যে অনেকে আহলে কিতাব হওয়া সত্ত্বেও শাহাদত কি বুঝে না। আবার কেউ বুঝলেও তদনুযায়ী আমল করে না।
১১. পর্যায়ক্রমভাবে শিক্ষা দেওয়ার গুরুত্ব।
১২. সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষা প্রদান আগে শুরু করা।
১৩. যাকাতের অধিকারী কে?
১৪. শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীর সন্দেহ-সংশয় দূরীকরণ।
১৫. উত্তম মাল নেওয়া থেকে নিষেধ প্রদান।
১৬. মযলুমের বদ্দুআ থেকে বাঁচা।
১৭. মযলুমের বদ্দুআ যে বৃথা যায় না সে ব্যাপারে অবহিত করণ।
১৮. নবী সম্রাট এবং বড় বড় তালীদের উপর যে সংকট, ক্ষুধার তাড়না এবং বিপদাপদ বয়ে গেছে, তাও তাওহীদের দলীলসমূহের অন্তর্ভুক্ত।
১৯. 'কাল আমি অবশ্যই ঝান্ডা দিবো'-শেষ পর্যন্ত-এটা নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন।
২০. আলী-এর চক্ষুদ্বয়ে রাসূলুল্লাহ -এর থুথু লাগিয়ে দেওয়াও নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন।
২১. আলী -এর ফযীলত।
২২. বিজয়ের সুসংবাদ শুনে সেই রাতে সাহাবায়ে কেরামদের উদ্বেগ, অস্থিরতা এবং ব্যস্ততায় মধ্যে থাকার ফযীলত।
২৩. ভাগ্যের উপর ঈমান আনা কখনো এমন ব্যক্তি (বিশেষ কোন) সম্মান লাভে ধন্য হয়, যে তার জন্য কোন চেষ্টাই করে না। আবার কেউ চেষ্টা করা সত্ত্বেও তা পায় না।
২৪. ‘ধীরপদক্ষেপে এগিয়ে যাও’ এর দ্বারা আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
২৫. যুদ্ধের পূর্বে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া।
২৬. ইসলামের দাওয়াত তাদের জন্যও জায়েয, যাদেরকে ইতিপূর্বে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং যাদের সাথে যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছে।
২৭. কৌশলের সাথে দাওয়াত দেওয়া। কারণ, বলা হয়েছে, ‘তাদেরকে তাদের উপর ওয়াজিব জিনিস সম্পর্কে জানাবে।
২৮. ইসলামে আল্লাহর অধিকার কি তা জানা।
২৯. যার হাতে একজন মানুষও সুপথ পাবে, তার অনেক সাওয়াবের বর্ণনা।
৩০. ফাতাওয়া দেওয়া প্রসঙ্গে শপথ গ্রহণ।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ লেখকের এই অধ্যায়কে এখানে আনা খুবই উপযুক্ত হয়েছে, কারণ, বিগত অধ্যায়গুলোতে তাওহীদের আবশ্যকতা, তার ফযীলত, তার পূর্ণতা লাভের প্রতি উৎসাহ প্রদান, তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রূপ দান এবং তার বিপরীত জিনিসকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে, আর এরই মাধ্যমে যে বান্দা পূর্ণতা লাভ করতে পারে, সে কথাও বলা হয়েছে। অতঃপর এই অধ্যায়কে উক্ত অধ্যায়গুলোর পূরক হিসাবে উল্লেখ করেছেন, আর তা হবে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাক্ষ্য দানের প্রতি আহ্বান করার মাধ্যমে। কারণ, তাওহীদ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা লাভ করতে পারে না, যতক্ষণ বান্দা তার সমস্ত দিকে পূর্ণতা লাভ করে অন্যের জন্যও চেষ্টা না করবে। আর এটাই ছিলো সমস্ত নবীদের তরীকা, কারণ, তাঁরা সর্ব প্রথম যে জিনিসটির প্রতি তাদের জাতিকে আহ্বান করেছিলেন, তা ছিলো একমাত্র আল্লাহর। ইবাদত করা, যার কোন শরীক নেই, আর এটাই ছিলো নবী সম্রাট ও সকল নবীদের ইমাম মুহাম্মাদ-এর তরীকা। কেননা, তিনি এই দাওয়াত নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তাঁর প্রতিপালকের পথের দিকে আহ্বান করেছিলেন কৌশল, উত্তম নসীহত এবং সুন্দর বিতর্কের মাধ্যমে। তাঁর অব্যাহত দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাঁর দ্বারা বিশাল সৃষ্টিকে হেদায়াত দান করেন।
তাঁর দাওয়াতের বরকতে দ্বীন পূর্ব ও পশ্চিমের প্রান্ত সীমা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। তিনি নিজেও তাঁর অনুসারীদের বলতেন, সমস্ত কিছুর পূর্বে আল্লাহ ও তাঁর একত্ববাদের দিকে ডাক দিবে। কারণ, যাবতীয় আমল সঠিক হওয়া এবং তা কবুল হওয়া নির্ভর করে তাওহীদের উপর।
আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করা যেমন বান্দার উচিত, তেমনি উত্তম পন্থায় অন্যদেরকেও এর প্রতি আহ্বান জানানো তার কর্তব্য। কারণ, যারই মাধ্যমে কেউ সুপথ পাবে, সেও হেদায়াত লাভকারীদের মত নেকী পাবে। তবে হেদায়াত লাভকারীদের নেকী থেকে কোন কিছু কম করা হবে না। আল্লাহ ও 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র সাক্ষ্য দানের প্রতি আহ্বান করা যখন প্রত্যেকের অপরিহার্য কর্তব্য, তখন প্রত্যেকের উচিত সাধ্যানুসারে তা পালন করা। তবে বক্তৃতার মাধ্যমে এর প্রতি দাওয়াত দেওয়া অন্যদের থেকে আলেমদের দায়িত্ব বেশী। অনুরূপ যারা শারীরিক মেহনত দানে সমর্থবান অথবা যারা মাল ও কথার দ্বারা দাওয়াতী কাজ করতে সক্ষম, তাদের দায়িত্ব ওদের থেকে বেশী, যারা এসবের সামর্থ রাখে না। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾ (التغابن: ١٦) ]
অর্থাৎ, “আল্লাহকে তোমরা তোমাদের সাধ্যানুসারে ভয় করো।” তার প্রতি আল্লাহ রহম করুন! যে দ্বীনের সহযোগিতা করে, সামান্য বাক্য দিয়ে হলেও। আর ধ্বংস তখনই নেমে আসে, যখন সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দ্বীনের দাওয়াতের কাজ ত্যাগ করা হয়।
📄 মুনীবও থেকে বাঁচতে ও দূর করতে বালা-তাগার ব্যবহার
বিপদ-আপদ থেকে বাঁচার জন্য অথবা তা দূরীকরণের জন্য সুতা ও গোলাকার কোন কিছু ব্যবহার করা, শির্কের অন্তর্ভুক্ত।
মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ (الزمر: ۳۸)
অর্থাৎ, “বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছো কি, যদি আল্লাহ আমার তঅনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাকো, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে?” (সূরা যুমারঃ ৩৮)
((عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الْحُصَيْنِ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ رَأَى رَجُلًا فِي يَدِهِ حَلْقَةٌ مِنْ صُفْرٍ فَقَالَ: ((مَا هَذِهِ الْحَلْقَةُ ؟ )) قَالَ : هَذِهِ مِنْ الْوَاهِنَةِ، قَالَ: انْزِعْهَا فَإِنَّهَا لَا تَزِيدُكَ إِلَّا وَهْنًا، فَإِنَّكَ لَوْ مِتَّ وَهِيَ عَلَيْكَ مَا أَفْلَحْتَ أَبَدًا))
অর্থাৎ, ইমরান ইবনে হুসাইন থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ এক ব্যক্তির হাতে পিতলের গোলাকার একটি জিনিস দেখে বললেন, "এটা কি?” সে বললো, ব্যাধির জন্য এটা ব্যবহার করেছি, তিনি বললেন, "এটা খুলে ফেলে দাও। কারণ, এতে তোমার ব্যাধি বৃদ্ধি পাবে, কমবে না. আর তুমি যদি এই জিনিসটা নিয়েই মৃত্যু বরণ করো, তাহলে কখনোই মুক্তি পাবে না.” (ইমাম আহমদ দোষমুক্ত সনদে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন, ইমাম আহমদ (রাহঃ) উকবা ইবনে আমের থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন,
( ( مَنْ تَعَلَّقَ تَمِيمَةٌ فَلَا أَتَمَّ اللهُ لَهُ، وَمَنْ تَعَلَّقَ وَدَعَةٌ فَلَا وَدَعَ اللَّهُ لَهُ )) وفي رواية: ((مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةٌ فَقَدْ أَشْرَكَ))
অর্থাৎ, “যে তাবীজ ব্যবহার করলো, আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করে. আর যে ব্যক্তি ঘুঙ্গুর ঝুলালো, আল্লাহ যেন তাকে রক্ষা না করে.” অন্য আর এক বর্ণনায় এসেছে, "যে তাবীয ব্যবহার করলো, সে শির্ক করলো.” আবূ হাতেমের পুত্র হুযাইফা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এক ব্যক্তির হাতে জ্বরের জন্য ব্যবহারকৃত সূতা দেখলে, তিনি তা কেটে ফেলেন এবং আল্লাহর এই বাণী পাঠ করেন,
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ﴾ (يوسف: ١٠٦)
অর্থাৎ, “অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শির্ক করে.” (সূরা ইউসুফঃ ১০৬)
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. গোলাকার কোন জিনিস ও সূতা প্রভৃতি ব্যবহারের ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ দান. ২. যদি সাহাবীর এরই উপর মৃত্যু হতো, তাহলে তিনি মুক্তি পেতেন না. এটা সহাবায়ে কেরাম-এর এই মন্তব্যের সাক্ষ্য হয়ে যায় যে, ছোট শির্ক কাবীরা گোনাহের থেকেও মারাত্মক. ৩. অজ্ঞতার ওযর-আপত্তি গ্রহণীয় নয়.
৪. বালা ও সূতা পরিধানে ব্যাধির কোন উপশম ঘটবে না, বরং এতে ব্যাধি বৃদ্ধি পাবে।
৫. কঠোরভাবে তার প্রতিবাদ, যে এ রকম করে।
৬. এ কথা পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন কিছু ঝুলাবে, তাকে তারই উপর নির্ভরশীল করা দেওয়া হবে।
৭. এ কথাও পরিষ্কার যে, যে ব্যক্তি তাবীয ব্যবহার করলো, সে শির্ক করলো।
৮. জ্বরের জন্য সূতা বাঁধাও শির্কের অন্তর্ভুক্ত,
৯. হুযাইফা -এর আয়াত পাঠ এ কথা প্রমাণ করে যে, সাহাবায়ে কেরামগণ বড় শির্কের আয়াতকে ছোট শির্কের উপর দলীল সাব্যস্ত করতেন, যেমন ইবনে আব্বাস সূরা বাক্বারার আয়াতে উল্লেখ করেছেন,
১০. নজরদোষ থেকে বাঁচার জন্য ঘুঙ্গুর ব্যবহার করাও শির্কের অন্তর্ভুক্ত
১১. যে তাবীয ব্যবহার করে, তার জন্য এই বলে বদ্দুআ করা, আল্লাহ যেন তার মনোবাসনা পূরণ না করেন, আর যে ঘুঙ্গুর ব্যবহার করে, আল্লাহ যেন তাকে রক্ষা না করেন।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ এই অধ্যায়কে তখনই বুঝতে পারবে, যখন উপায়-উপকরণের বিধান সম্পর্কে জানবে, অর্থাৎ, উপকরণ ও মাধ্যমের ব্যাপারে তিনটি বিষয় জানা প্রত্যেক বান্দার উপর ওয়াজিব। (আর তা হলো,)
১. সেই জিনিসকেই মাধ্যম মনে করবে, যার মাধ্যম হওয়ার কথা শরীয়ত কর্তৃক সাব্যস্ত।
২. মাধ্যমের উপরেই ভরসা করবে না। বরং শরীয়ত সমর্থিত মাধ্যম গ্রহণ করে যিনি মাধ্যম বানিয়েছেন ও নির্ধারিত করেছেন, তাঁরই উপর ভরসা করবে এবং উপকারী মাধ্যম গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে।
৩. এই মাধ্যমগুলো যতই বড় ও বলিষ্ঠ হোক না কেন, সবই আল্লাহর ফয়সালা ও তাঁর ক্ষমতাধীন। আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে যেতে পারে না। মহান আল্লাহ যেভাবে চান এগুলোর নিয়ন্ত্রণ করেন। আল্লাহ তাঁর হিকমতের দাবী অনুপাতে যদি চান মধ্যবর্তিতা বাকী রাখেন, যাতে বান্দারা তা অবলম্বন করে আল্লাহর পূর্ণ হিকমত সম্পর্কে অবহিত হয়। আবার যদি চান মাধ্যমের প্রভাব বাকী রাখেন না, যাতে বান্দারা যেন তার উপর ভরসা না করে এবং তারা যেন আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত হয় যে, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এবং যা ইচ্ছা তা-ই করার ইখতিয়ার কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। মাধ্যমগুলোর ব্যাপারে এই ধরনের ধ্যান-ধারণা রাখাই হলো বান্দার উপর ওয়াজিব। এই অবগতির পর যে ব্যক্তি বালা অথবা সূতা বা এই ধরনের কোন জিনিস আসন্ন বিপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্য, অথবা আগত বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যবহার করবে, সে মুশরিক বিবেচিত হবে। কারণ, তার এই বিশ্বাস যদি হয় যে, তাই রক্ষাকারী, তাহলে তা বড় শির্ক গণ্য হবে। আর এটা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে শির্ক করা হবে। কারণ, সে এই বিশ্বাস রাখলো যে, সৃষ্টি করা ও ব্যবস্থাপনায় আল্লাহর কেউ শরীক আছে। আবার এটা তাঁর ইবাদতেও শির্ক হবে। কারণ, তার অন্তর লাভের আশা ও আকাঙ্ক্ষায় অন্যের সাথে জড়িত। আর সে যদি এই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহই রক্ষাকারী, কিন্তু সে এই জিনিসগুলো মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেছে, তাহলে সে এমন জিনিসকে মাধ্যম বানিয়েছে, যা শরীয়ত কর্তৃকও মাধ্যম বলে উল্লেখ হয় নি এবং বাস্তবের আলোকেও তা মাধ্যম নয়। বরং এটা হারাম এবং শরীয়ত ও বাস্তবতার উপর মিথ্যা আরোপ।
শরীয়তী মাধ্যম এটা নয়, কারণ শরীয়ত এ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ দান করেছে, আর যা থেকে শরীয়ত নিষেধ দান করে, তা উপকারী মাধ্যম হতে পারে না। বাস্তবতার আলোকেও এটা মাধ্যম নয়, কারণ, এতে কোন উদ্দেশ্য সাধন হয় বলে জানা যায় নি। আর এটা বৈধ ফলপ্রসূ কোন ঔষধ নয়। অনুরূপ এটা শির্কের মাধ্যমসমূহের অন্যতম। কারণ, যে এসব ব্যবহার করে, তার অন্তর এর সাথে জড়িয়ে থাকে। আর এই (জড়িয়ে থাকা) এক প্রকার শির্ক ও তার মাধ্যম।
এই জিনিসগুলো যখন রাসূলুল্লাহ কর্তৃক প্রমাণিত শরীয়তী মধ্যম নয়, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর নেকীর আশায় অবলম্বন করা যায় এবং বাস্তবতার আলোকেও তার কোন উপকার জানা যায় নি, যেমন বৈধ ঔষধ দ্বারা উপকার পাওয়া যায়, তখন তা ত্যাগ করাই হলো মু'মিনের জন্য জরুরী, যাতে তার ঈমান ও তাওহীদ পরিপূর্ণ হয়। কেননা, তাওহীদ পরিপূর্ণ থাকলে, অন্তর তার পরিপন্থী বিষয়ের সাথে জুটবে না। ক্ষতি ব্যতীত কোন প্রকারের উপকার যাতে নাই, তা ব্যবহার করা অজ্ঞতারই পরিচয় হবে। শরীয়তের মূল লক্ষ্য হলো, মানুষকে মূর্তি পূজা ও সৃষ্টির উপর ভরসা করা থেকে মুক্ত করে তাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করা এবং কুসংস্কার ও মিথ্যা জিনিস থেকে মুক্ত করে এমন জিনিসের প্রচেষ্টায় লাগানো, যা জ্ঞানের জন্য হবে উপকারী, নাফসের জন্য হবে পবিত্রকারী এবং দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় বিষয়ের জন্য হবে সংশোধনকারী, আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
📄 ঝাড়-ফুঁক প্রসঙ্গে
ঝাড়-ফুঁক প্রসঙ্গে
((في الصحيح عن أبي بشير الأنصاري أَنَّهُ كَانَ مَعَ رَسُولِ الله ﷺ في بعض أسفاره ، فأرسل رسول الله ﷺ رَسُولاً أَنْ لَا يَبْقَيَنَّ فِي رَقَبَةِ بَعِيرٍ قِلَادَةٌ مِنْ وَتَرٍ أَوْ قِلَادَةٌ إِلَّا قُطِعَتْ))
সহী হাদীসে আবূ বাশীর আনসারী থেকে বর্ণিত যে, তিনি কোন এক সফরে রাসূলে কারীম -এর সাথে ছিলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁকে এই মর্মে পাঠালেন যে, কোন উটের গর্দানে ধনুকের অথবা অন্য কোন কিছুর হার যেন না থাকে। থাকলে তা যেন ছিঁড়ে ফেলা হয়।” ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,
(( إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتَّوَلَةَ شِرْكٌ)) رواه أحمد وأبو داود
অর্থাৎ, “নিশ্চয় ঝাড়-ফুঁক, তাবীয ব্যবহার এবং যাদু-বিদ্যা শির্ক” (আহমদ ও আবূ দাউদ) আব্দুল্লাহ ইবনে উকাইম থেকে বর্ণিত যে,
((مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئاً وكلَ إِلَيْهِ)) رواه أحمد والترمذي
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি কোন কিছু ঝুলাবে, তাকে তারই উপর নির্ভর- শীল করে দেওয়া হবে।”
'তামীমাহ' এমন জিনিস, যা নজরদোষ থেকে বাঁচার জন্য শিশুদের গলায় (বা শরীরের কোন স্থানে) ঝুলানো হয়, তবে যা ঝুলানো হয়, তা যদি কুরআন থেকে হয়, তাহলে সালফে সালেহীনদের কেউ কেউ অনুমতি দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ তার অনুমতি দেন নাই। বরং তা নিষিদ্ধ জিনিসের মধ্যেই গণ্য করেছেন। ইবনে মাসউদ হলেন এদের অন্যতম।
'আরুক্বা' বা ঝাড়-ফুঁক, এর তাপর নাম 'আযায়েম', শির্কমুক্ত ঝাড়-ফুঁক প্রমাণাদির ভিত্তিতে সাধারণ ঝাড়-ফুঁকের ব্যতিক্রম। কেননা, রাসূলুল্লাহ নজরদোষ ও বিষাক্ত প্রাণির দংশনে তার অনুমতি দিয়েছেন। আর 'তিওয়ালাহ' হলো এমন জিনিস, যার আশ্রয় মানুষ এই ধারণা নিয়ে গ্রহণ করে যে, এর দ্বারা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর এবং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রেম আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, ইমাম আহমদ 'রুআইফা' থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( يَا رُوَيْفِعُ لَعَلَّ الْحَيَاةَ سَتَطُولُ بِكَ بَعْدِي، فَأَخْبِرُ النَّاسَ أَنَّهُ مَنْ عَقَدَ لِحِيْتَهُ أَوْ تَقَلَّدَ وَتَرَا أَوْ اسْتَنْجَى بِرَجِيعِ دَابَّةٍ أَوْ عَظْمٍ فَإِنَّ مُحَمَّدًا بَرِيءٌ مِنْهُ ))
অর্থাৎ, “হে রুআইফা, হতে পারে তুমি দীর্ঘ জীবন লাভ করবে, কাজেই মানুষদের এই খবর জানিয়ে দিবে যে, যে ব্যক্তি দাড়িতে গিরা দিবে অথবা তাবীয-কবয কিছু ঝুলাবে কিংবা জানোয়ারের গবর, বা হাড় দিয়ে ইস্তিঞ্জা করবে, মুহাম্মাদ তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন ঘোষণা করছেন।” সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
(( مَنْ قَطَعَ تَمِيْمَةٌ مِنْ إِنْسَانٍ كَانَ كَعَدْلِ رَقَبَةٍ)) رواه وكيع
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি কোন মানুষের তাবীয ছিঁড়ে ফেলে, সে এক ক্রীতদাস স্বাধীন করার নেকী পায়। আর ইবরাহীম (রাহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালফে সালেহীনগণ যাবতীয় তাবীয অপছন্দ করতেন, তাতে তা কুরআন থেকে হোক, বা অন্য কিছু থেকে।
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. 'আরুক্বা' এবং 'তামায়েম' এর ব্যাখ্যা। ২. 'তেওয়ালা'র ব্যাখ্যা। ৩. কোন ব্যতিক্রম ছাড়াই এ তিনটি শির্কের অন্তর্ভুক্ত। ৪. নজরদোষে ও কোন বিষাক্ত প্রাণির দংশনে সত্য বাক্য দ্বারা ঝাড়- ফুঁক করা শির্কের আওতায় পড়ে না। ৫. তাবীয যদি কুরআন থেকে হয়, তাহলে তা জায়েয হবে কিনা এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ৬. বদ-নজর থেকে বাঁচার জন্য জানোয়ারের গলায় ধনুক ইত্যাদি ঝুলানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত। ৭. তাকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, যে ধনুক ঝুলাবে। ৮. তার ফযীলতের কথা, যে কোন মানুষের তাবীয ছিঁড়ে ফেলে। ৯. ইবরাহীম (রাহঃ) এর মন্তব্য উল্লিখিত মতভেদের বিপরীত নয়। কেননা, তাঁর উদ্দেশ্য আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ-এর সহচরবৃন্দ।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ তাবীয ব্যবহার করা, বালা ও সূতা ব্যবহার করার মতনই, যার কথা আগে বলা হয়েছে। কোন কোন তাবীয তো বড় শির্কের আওতায় পড়ে, যেমন শয়তান অথবা কোন সৃষ্টির সাহায্য কামনা করা হয়েছে এই ধরনের তাবীয। কারণ, গায়রুল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া, যার সে শক্তি রাখে না, বড় শির্ক গণ্য হয়। আগত অধ্যায়ে এর বয়ান আসবে ইনশা---- আবার কোন কোন তাবীয হারাম, যেমন, এমন সব নাম বিশিষ্ট তাবীয, যার অর্থ বোধগম্য নয়, এই তাবীয শির্ক পর্যন্ত নিয়ে যায়, তবে যা ঝুলানো হয়, তা যদি কুরআন অথবা হাদীস কিংবা পবিত্র কোন দুআ হয়, তাহলে তাও ত্যাগ করাই উত্তম।
কেননা, প্রথমতঃ, শরীয়তে এর উল্লেখ হয় নি। দ্বিতীয়তঃ, এটা অন্যান্য হারাম জিনিস ব্যবহারের মাধ্যম হয়ে যাবে। তৃতীয়তঃ, যে ঝুলায়, সে এর সম্মান দেয় না। এই তাবীয নিয়ে নোংরা স্থানেও সে প্রবেশ করে। তবে ঝাড়-ফুঁকের ব্যাপারে ব্যাখ্যা এসেছে, আর তা হলো, যদি তা কুরআন অথবা সুন্নাত কিংবা ভাল বাক্য দ্বারা হয়, তাহলে যে ঝাড়-ফুঁক করে দেয়, তার জন্য তা জায়েয, কেননা, তা অনুগ্রহের আওতায় পড়ে এবং তাতে উপকারও রয়েছে, আর এটা তার জন্যও বৈধ, যাকে ঝাড়া হয়, তবে উচিত প্রথমেই কারো নিকট ঝেড়ে দেওয়া কামনা না করা, কারণ, বান্দার (আল্লাহর উপর) পূর্ণ ভরসা এবং বলিষ্ঠ প্রত্যয় হলো, সৃষ্টির কারো কাছে ঝাড়-ফুঁক প্রভৃতি তলব না করা, তবে যদি ঝাড়ে গায়রুল্লাহকে আহ্বান করা হয় এবং গায়রুল্লাহর নিকট আরোগ্য কামনা করা হয়, তাহলে তা বড় শির্ক বলে গণ্য হবে। কারণ, এটা হলো গায়রুল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা এবং তার কাছে ফরিয়াদ করা। এই ব্যাখ্যাটা ভাল করে বুঝে নিতে হবে। যেহেতু ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যম ও উদ্দেশ্য বিভিন্ন প্রকারের, তাই শুধু এক রকম বিচার করলে হবে না। (বরং এ ব্যাপারে ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে,