📄 মানুষ ও জ্বিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য
মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾ (الذاريات: ٥٦)
অর্থাৎ, “আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানুষ ও জ্বিন জাতি সৃষ্টি করেছি.” (সূরা যারিয়াতঃ৫৬) তিনি আরো বলেন, وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ) (النحل: ٣٦)
অর্থাৎ, "আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে বিরত থাকো.” (সূরা নাহলঃ৩৬) তিনি অন্যত্র বলেন, وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً﴾ (الإسراء: ۲۳
অর্থাৎ, “তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো.” (সূরা বানী-ইস্রাঈলঃ ২৩) তিনি অন্য আয়াতে বলেন, وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا (النساء: ٣٦)
অর্থাৎ, "আর ইবাদত-বন্দেগী করো আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে." (সূরা নিসাঃ ৩৬) তিনি আরো বলেন,
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَاهُمْ وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ﴾ (الأنعام: ١٥١)
অর্থাৎ, “তুমি বলো, এসো, আমি তোমাদেরকে ঐ সব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর হারাম করেছেন, তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দিই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্যে হোক কিংবা অপ্রকাশ্যে, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা বুঝো।” (সূরা আনআমঃ ১৫১) ইবনে মাসউদ বলেন,
(( مَنْ أَرَادَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى وَصِيَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ الَّتِي عَلَيْهَا خَاتَمُهُ فَلْيَقْرَأْ قَوْلَهُ تَعَالَى ﴿ قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَن لَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا إِلَى قَوْلَهُ: ﴿ وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا )
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ-এর মোহরকৃত উপদেশ দেখার ইচ্ছা পোষণ করে, সে যেন মহান আল্লাহর এই আয়াত পড়ে নেয়, "তুমি বলো, এসো, আমি তোমাদেরকে ঐ সব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর হারাম করেছেন, তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না-আমি তোমাদেরকে ও তাদেরক আহার দিই। নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্যে হোক কিংবা অপ্রকাশ্যে, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা বোঝ।” এই আয়াত থেকে নিয়ে ১৫৩ নং আয়াত পর্যন্ত "নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ, অতএব এ পথে চলো এবং অন্যান্য পথে চলো না."
عَنْ مُعَادٍ قَالَ: كُنْتُ رِدْفَ النَّبِيِّ ﷺ عَلَى حِمَارٍ فَقَالَ : يَا مُعَاذُ هَلْ تَدْرِي حَقَّ اللَّهُ عَلَى عِبَادِهِ وَمَا حَقُّ الْعِبَادِ عَلَى الله ؟ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: فَإِنَّ حَقَّ الله عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَحَقَّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ أَنْ لَا يُعَذِّبَ مَنْ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا، فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَفَلَا أُبَشِّرُ بِهِ النَّاسَ ؟ قَالَ : لَا تُبَشِّرْهُمْ فَيَتَّكِلُوا ))
অর্থাৎ, মুআ'য ইবনে জাবাল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একটি গাধার উপর নবী করীম -এর পশ্চাতে বসেছিলাম। তিনি কে লক্ষ্য ক'রে বললেন, "হে মুআ'য, তুমি কী জানো বান্দাদের উপর আল্লাহর অধিকার কি এবং আল্লাহর উপরে বান্দাদের আবদার কি?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সর্বাধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, "বান্দাদের উপর আল্লাহর অধিকার হলো, তারা শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না. আর আল্লাহর উপর বান্দাদের দাবী হলো, তিনি তাকে শাস্তি দিবেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না. আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ সুসংবাদ কি আমি লোকদের দিবো না? তিনি বললেন “তাদের এ সুসংবাদ দিয়ো না, তাহলে এরই উপর তারা ভরসা করে বসবে.” (বুখারী-মুসলিম)
কতিপয় মসলা জানা গেলো, ১. মানুষ ও জ্বিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য. ২. ইবাদতই হলো প্রকৃত তাওহীদ, কারণ, দ্বন্দ্ব এ ব্যাপারেই. ৩. তাওহীদবিহীন ইবাদতই হয় না. আর এ ব্যাপারেই বলা হয়েছে, (وَلا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ) এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি. ৪. রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য. ৫. রেসালাত সলফ উম্মতের জন্যই. ৬. সমস্ত নবীদের দ্বীন একই ছিলো. ৭. তাগুতকে অস্বীকার না করলে ইবাদত কোন ইবাদত বলে গণ্য হয় না. কারণ, এ ব্যাপারেই বলা হয়েছে, (فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ) অর্থাৎ, যে তাগুতকে অস্বীকার করে. ৮. আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসবের ইবাদত করা হয়, তা সবই তাগুত, ৯. সালাফের নিকট সূরা আনামের সুস্পষ্ট তিনটি আয়াতের বড় মর্যাদা ছিলো, যাতে দশটি মসলা-মাসায়েল বর্ণিত হয়েছে, তন্মধ্যে প্রথমে আনা হয়েছে শির্ক থেকে নিষেধ প্রদান. ১০. সূরা ইসরাতে এমন কিছু সুস্পষ্ট আয়াতের উল্লেখ হয়েছে, যাতে রয়েছে ১৮টি মসলা-মাসায়েল আর তা আরম্ভ হয়েছে আল্লাহর এই বাণী দিয়ে,
﴿لاَ تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلهًا آخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُومًا مَّخْذُولًا﴾ (الاسراء: ٢٢)
অর্থাৎ, “স্থির করো না আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে।” আর শেষ হয়েছে তাঁর এই বাণী দ্বারা,
﴿وَلَا تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلهًا آخَرَ فَتُلْقَى فِي جَهَنَّمَ مَلُومًا مَدْحُورًا﴾ (الاسراء: ٣٩)
অর্থাৎ, “আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য স্থির করো না, তাহলে অভিযুক্ত ও আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।” আর এই মসলাগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন তাঁর এই বাণী দ্বারা,
﴿ذَلِكَ مِمَّا أَوْحَى إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ﴾
অর্থাৎ, “এটা ঐ হিকমতের অন্তর্ভুক্ত, যা আপনার পালনকর্তা আপনাকে অহী মারফত দান করেছেন।” ১১. সূরা নিসার আয়াতের উল্লেখ, যা দশ অধিকার বিশিষ্ট আয়াত হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে, এই আয়াতকেও আল্লাহ তাঁর এই বাণী দ্বারা শুরু করেছেন,
﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا﴾
অর্থাৎ, “আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করো না।” ১২. রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর মৃত্যুর সময়ের অসীয়ত সম্পর্কে সতর্কতা। ১৩. আমাদের উপর আল্লাহর অধিকার সম্পর্কে জানা। ১৪. আল্লাহর উপর বান্দাদের অধিকার সম্পর্কে জানা, যখন তারা তাঁর অধিকার আদায় করবে। ১৫. এই ব্যাপারটা অধিকাংশ সাহাবীরা জানতেন না. ১৬. কোন ভাল উদ্দেশ্যে জ্ঞান গোপন করা যায়. ১৭. মুসলিমকে এমন সুসংবাদ দেওয়া ভাল, যাতে সে আনন্দ বোধ করে। ১৮. আল্লাহর ব্যাপক রহমতের উপর ভরসা করে বসে থাকা আশঙ্কাজনক। ১৯. জিজ্ঞাসিত বিষয় না জানলে বলা, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সর্বাধিক জ্ঞাত।' ২০. মানুষের মধ্যে কিছু মানুষকে বিশেষ কোন জ্ঞানে নির্দিষ্ট করা জায়েয। ২১. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নম্রতার প্রমাণ হয় যে, তিনি গাধার উপর সাওয়ার হতেন এবং পিছনে অন্যকে বসাতেন। ২২. সাওয়ারীর পিছনে বসা জায়েয। ২৩. মুআ'য ইবনে জাবাল এর ফযীলত। ২৪. এই মসলাটির গুরুত্ব
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
'কিতাবুত তাওহীদ' নামে নামকরণই এই কিতাবের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কি উদ্দেশ্য, তা বলে দেয়, অর্থাৎ, এই কিতাবে রয়েছে তাওহীদুল উলুহিয়্যা ও ইবাদতের বর্ণনা, এই তাওহীদের বিধান, তার শর্তাবলী, তার ফযীলত, তার প্রমাণাদি, মূল বিষয় ও তার বিশ্লেষন, উপায়-উপকরণ, তার উপকারিতা ও দাবী, কিসে তাওহীদ বৃদ্ধি পায় ও মজবুত হয়, কিসে হ্রাস পায় ও দুর্বল হয় এবং কিসে তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করে, এ সবেরই বর্ণনা এই কিতাবটির মধ্যে রয়েছে। জেনে রাখুন, তাওহীদ হলো, এই জ্ঞান রাখা ও স্বীকার করা যে, প্রতিপালক তাঁর পরিপূর্ণ গুণসহ এক ও একক। অনুরূপ এই বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তাঁর মাহাত্ম্যে ও গৌরবে একক এবং কেবল তাঁকেই ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা। এই তাওহীদ তিন প্রকারের, যথা,
প্রথমতঃ, তাওহীদুল আসমা অসিফাতঃ আর তা হলো, এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, মহিমময় আল্লাহ এক ও একক। মাহাত্ম্য, গৌরব ও সৌন্দর্যসহ সকল গুণে সবদিক দিয়ে তিনি পরিপূর্ণ। এতে কোনভাবেই কেউ তাঁর শরীক নেই, অর্থাৎ, কিতাব ও সুন্নাতে যে সমস্ত নাম ও গুণাবলী তার অর্থ ও বিধানসহ আল্লাহ স্বীয় নাফসের জন্য অথবা তাঁর রাসূল তাঁর জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তার কোন কিছুর বিকৃতি, অস্বীকৃতি এবং পরিবর্তন ও সাদৃশ্য পেশ না করে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, যেন তা তাঁর মাহাত্ম্য ও গৌরব উপযোগী হয়। আর তাঁর পূর্ণতা পরিপন্থী যে সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে তিনি নিজেকে অথবা তাঁর রাসূল তাঁকে মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তা থেকে তাঁকে মুক্ত মনে করা।
দ্বিতীয়তঃ, তাওহীদে রুবুবিয়্যাহঃ অর্থাৎ, বান্দা এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহই একমাত্র সকল সৃষ্টির প্রতিপালক, রুজিদাতা এবং পরিচালক, যিনি বহু নিয়ামত দিয়ে সৃষ্টির লালন-পালন করছেন। তিনি তাঁর বিশেষ বান্দাদের যথা, আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের অনুসারীদের সঠিক আক্বীদাহ, সুন্দর চরিত্র, উপকারী জ্ঞান এবং নেক আমল করার তাওফীক দিয়ে লালন-পালন করে থাকেন, আর এই তারবিয়াতই হলো অন্তর ও আত্মার জন্য লাভদায়ক। আর এই তারবিয়াতই বয়ে আনবে ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য। তৃতীয়তঃ, তাওহীদে উলুহিয়্যাহঃ একে তাওহীদে ইবাদতও বলা হয়। অর্থাৎ, এই জ্ঞান রাখা ও স্বীকার করা যে, মহান আল্লাহই তাঁর সকল সৃষ্টির এবাদত ও উপাসনার অধিকারী, তাঁকেই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য মনে করা এবং দ্বীনকে তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করা।
শেষোক্ত এই তাওহীদ উল্লিখিত উভয় তাওহীদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং উভয় তাওহীদকেই শামিল করে থাকে। কারণ, উপাস্য হওয়া এমন এক গুণ, যার মধ্যে আল্লাহর মাহাত্ম্য ও তাঁর রুবুবিয়্যাতসহ তাঁর সকল পূর্ণ গুণ শামিল, কেননা, তিনি এমন উপাস্য ও মাবুদ, যিনি মাহাত্ম্য ও গৌরবের গুণে গুণান্বিত, যিনি দান করেছেন তাঁর সৃষ্টিকে বহু অনুগ্রহ ও করুণা, কাজেই তিনিই যখন সমস্ত পূর্ণ গুণের অধিকারী ও তিনিই প্রতিপালক, তখন অবশ্যই তিনি ব্যতীত আর কেউ ইবাদতের অধিকারী হতে পারে না। প্রথম থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক নবীর দাওয়াতের মূল বিষয়ই ছিলো এই তাওহীদের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো, লেখক এই পরিচ্ছদে এমন কিছু আয়াত ও হাদীস উল্লখে করেছেন, যা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো, তারা যেন তাঁরই এবাদত করে এবং তাঁরই জন্যে দ্বীনকে নির্দিষ্ট করে আর এটা হলো তাদের উপর আল্লাহর অপরিহার্য অধিকার।
প্রত্যেক আসমানী কিতাব এবং সকল রাসূল এই তাওহীদেরই দাওয়াত দিয়েছেন এবং এর পরিপন্থী বিষয় শির্ক থেকে নিষেধ প্রদান করেছেন, বিশেষ করে রাসূলে করীম এবং এই কুরআন তাওহীদের নির্দেশ দিয়েছেন, তা ফরয করেছেন এবং বড় গুরুত্বের সাথে তার বর্ণনা দিয়েছেন ও জ্ঞাত করিয়েছেন যে, এই তাওহীদ ব্যতীত মুক্তি, পরিত্রান এবং সৌভাগ্য লাভের কোন উপায় নেই, কুরআন ও হাদীস, বিবেক-বুদ্ধি পৃথিবীর দিগন্তে বিদ্যমান যাবতীয় জিনিস এবং সৃষ্টিকুলের অস্তিত্ব, এগুলি এমন অকাট্য দলীল, যা তাওহীদ ও তার ওয়াজিব হওয়ার কথাই প্রমাণ করে, আর এটা হলো দ্বীনের নির্দেশসমূহের মধ্যে মূল ও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। অনুরূপ এটাই হলো দ্বীন ও আমলের মূল ভিত্তি।
📄 তাওহীদের ফযীলত
তাওহীদের ফযীলত এবং তা পাপের কাফফারা হয়
মহান আল্লাহ বলেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبَسُوا إِيمَا تَهُمْ بِظُلْمٍ﴾ الانعام: ۸۲
অর্থাৎ, "যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শির্কের সাথে মিশ্রিত করে না।” (সূরা আনআমঃ৮২) উবাদা বিন সামিত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
- أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، وَأَنَّ عِيسَى عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ، وَالْجَنَّةُ حَقٌّ، وَالنَّارُ حَقٌّ، أَدْخَلَهُ اللهُ الْجَنَّةَ عَلَى مَا كَانَ مِنْ الْعَمَلِ)) أخرجاه. ولهما في حديث عتبان : (( فَإِنَّ اللَّهَ قَدْ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ الله )) (مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا
অর্থাৎ, “যে সাক্ষ্য দিলো যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন উপাস্য নেই, তিনি এক ও একক। তাঁর কোন শরীক নেই আর মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর সাক্ষ্য দিলো যে, ঈসা আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর এমন এক বাক্য, যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ যা তাঁর কাছ থেকে আগত, আর সাক্ষ্য দিলো যে, জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তাতে তার আমল যাই হোক না কেন। (বুখারী-মুসলিম) বুখারী-মুসলিমেই ইতবান থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, "নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিষ্ঠার সাথে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে'।
আবূ সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মুসা আল্লাহকে বলেছিলেন,
(( يا رب علمني شيئا أذكرك وأدعوك به، قال: قل يا موسى: لا إله إلا الله، قال: كل عبادك يقولون هذا؟ قال: يا موسى، لو أن السموات السبع وعامر هن غيري والأرضين السبع في كفة، ولا إله إلا الله في كفة، مالت بهن لا إله إلا الله)) رواه ابن حبان والحاكم وصححه.
অর্থাৎ, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমন কিছু বিষয় শিখিয়ে দাও, যা দিয়ে তোমাকে স্মরণ করবো এবং তোমার নিকট প্রার্থনা করবো, তখন আল্লাহ বললেন, "হে মুসা, বলো, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'।” তিনি (মুসা) বললেন, হে আল্লাহ! তোমার সকল বান্দা তো এটা বলে. আল্লাহ বললেন, "হে মূসা, সপ্তাকাশ এং আমি ব্যতীত সেখানে বসবাসকারী সকলকে ও সপ্ত যমীনকে যদি এক পাল্লায় রাখো, আর 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'কে এক পাল্লায় রাখো, তবে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র পাল্লা ভারী হয়ে যাবে।” (ইবনে হিব্বান ও হাকিম) ইমাম হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, তিরমিযী শরীফে আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ( ( قال الله تعالى: يَا ابْنَ آدَمَ ، إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا، ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئاً ، لأَتَيْتُكَ بِقُرابِهَا مَغْفِرَةٌ))
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, "হে আদম সন্তান, যদি তুমি যমীন ভরতি گোনাহ নিয়ে আমার নিকট উপস্থিত হও, আর আমার সাথে যদি কাউকে শরীক না করে থাকো, তাহলে আমিও তোমাকে যমীন ভরতি ক্ষমা দান করবো।"
কতিপয় মসলা জানা গেলো, ১. আল্লাহর অনুগ্রহ বিস্তৃত। ২. আল্লাহর নিকট তাওহীদের নেকী অনেক। ৩. তাওহীদ থাকলে অন্যান্য گোনাহ ক্ষমা হয়। ৪. সূরা আনআ'মের আয়াতের ব্যাখ্যা। ৫. উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লিখিত পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা। ৬. যখন ইতবান থেকে বর্ণিত হাদীসের বিষয় ও তার পরের বিষয়কে একত্রে জমা করবে, তখন তোমার নিকট 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং যারা ধোঁকায় পড়ে আছে, তাদের ত্রুটি তোমার নিকট ধরা পড়ে যাবে। ৭. ইতবান থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লিখিত শর্তের উপর সতর্ক করা হয়েছে, ৮. আম্বিয়ায়ে কেরামরাও 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র ফযীলত সম্পর্কে অবহিত করণের মুখাপেক্ষী ছিলেন, ৯. এ ব্যাপারে সতর্ক করা যে, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সমস্ত সৃষ্টি থেকে বেশী ভারী হবে, অথচ এই কালেমার তানেক পাঠকের পাল্লা হালকা হয়ে যাবে।
১০. প্রমাণ হলো যে, যমীনেরও আসমানের মত সাতটি স্তর আছে।
১১. এও জানা গেলো যে, এতে অবস্থানকারী আছে।
১২. আল্লাহর সিফাতের (গুণের) প্রমাণ হয়, যদিও আশআ'রীরা তা মানে না।
১৩. যখন তুমি আনাস থেকে বর্ণিত হাদীসের বিষয় সম্পর্কে জেনে যাবে, তখন তুমি ইতবান এর হাদীসে বর্ণিত, 'আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিষ্ঠার সাথে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করেছে' কথার সঠিক অর্থ জেনে যাবে যে, শির্ক ত্যাগ করার কথা শুধু মুখে বললে হবে না।
১৪. ঈসা ও মুহাম্মাদ কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল হওয়ার ব্যাপারে একত্রে আনার বিষয় সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করা।
১৫. ঈসা -এর বৈশিষ্ট্যের জ্ঞান লাভ যে তিনি আল্লাহর এক বাক্য ছিলেন।
১৬. তাঁর রূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার বৈশিষ্ট্য জানা গেলো।
১৭. জান্নাত ও জাহান্নামের উপর বিশ্বাসের ফযীলত সম্পর্কে জানা গেলো।
১৮. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী, 'যে নিষ্ঠার সাথে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়বে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাতে তার আমল যাই হোক না কেন- এর অর্থ জানা গেলো।
১৯. জানা গেলো যে, দাঁড়ির দু'টি পাল্লা হবে।
২০. আল্লাহর 'অজহ' মুখমন্ডল আছে, এ ব্যাপারে অবগত হওয়া গেলো।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
আগের অধ্যায়ে তাওহীদের আবশ্যকতা এবং তা সকল বান্দার উপর ওয়াজিব হওয়ার কথা উল্লেখ করার পর, এই অধ্যায়ে তার ফযীলত, তার প্রশংসনীয় প্রভাব এবং তার সুন্দর পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন, আর এ কথার উল্লেখ করেছেন যে, কোন জিনিসই তাওহীদের মত সুন্দর প্রভাব এবং তার মত বিভিন্ন প্রকারের ফযীলত রাখে না। কেননা, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ হলো, এই তাওহীদ ও তার ফযীলতের ফল। অনুরূপ گোনাহ মাফ হওয়া ও گোনাহের জন্য কাফফারা হওয়া তাওহীদের ফযীলত ও তার সুফলেরই কিছু অংশ।
এটাও তাওহীদের ফযীলতের ব্যাপার যে, তা হলো দুনিয়া ও আখেরাতের কষ্ট ও শান্তি দূরীভূত হওয়ার ও দূরীকরণের সব থেকে বড় মাধ্যম। আর এর সব থেকে বড় লাভ হলো, তা কাউকে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হতে দিবে না, যদি অন্তরে সামান্য পরিমাণও তাওহীদ থাকে।
এটাও তাওহীদের ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত যে, তাওহীদবাদী পূর্ণ হেদায়ত এবং দুনিয়া ও আখেরাতে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করে।
তাওহীদের আরো ফযীলত হলো, এর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর সাওয়াব অর্জিত হয়। আর মানুসের মধ্যে সেই-ই মুহাম্মাদ- এর সুপারেশি লাভে ধন্য হবে, যে আন্তরিকতার সাথে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে।
তাওহীদের সব থেকে বড় ফযীলত হলো, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় কথা ও কাজ গ্রহণ হওয়া, তাতে পূর্ণতা লাভ করা এবং তার নেকী অর্জন হওয়া, সব কিছুই এরই (তাওহীদের) উপর নির্ভর-শীল, কাজেই তাওহীদ ও আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা যত মজবুত হবে, যাবতীয় আমল তত পূর্ণতা লাভ করবে।
এটাও তাওহীদের ফযীলত যে, তা বান্দার জন্য ভাল কাজ করা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা আসান করে দেয় এবং তাকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে, সুতরাং যে আল্লাহর উপর ঈমান আনায় ও তাওহীদে নিষ্ঠাবান হবে, তার জন্য অনেক ভাল কাজ সম্পাদন করা সহজ হয়ে যাবে। কেননা, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নেকীর আশা রাখে, অনুরূপ প্রবৃত্তির চাহিদার পাপ থেকে বাঁচাও তার জন্য সহজ হয়ে যাবে।কারণ, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে।
এও তাওহীদের বৈশিষ্ট্য যে, যখন তা অন্তরে পূর্ণতা লাভ করবে, তখন মহান আল্লাহ ঈমানের প্রতি তার ভালবাসা সৃষ্টি করে দিবেন। তার অন্তরকে ঈমান দ্বারা সৌন্দর্যমন্ডিত করে দিবেন এবং কুফরী, পাপ ও অবাধ্যতা, সবই তার নিকট ঘৃণ্য বস্তুতে পরিণত করে দিবেন, আর তাকে হেদায়াত প্রাপ্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে দিবেন।
এটাও তাওহীদের ফযীলতের আওতায় পড়ে যে, তা দুঃখ-কষ্ট বান্দার জন্য অতি সহজ ও আসান করে দেয়, কাজেই বান্দার অন্তর যখন তাওহীদ ও ঈমানে ভরতি হয়, তখন সে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ও মেনে নিয়ে প্রশান্ত মনে ও মুক্তচিত্তে যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের মোকাবিলা করে।
তাওহীদের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, তা বান্দাকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে, তাদের উপর ভরসা করা থেকে, তাদের নিকট আশা রাখা থেকে এবং তাদের জন্যই আমল করা থেকে মুক্তি দান করে। আর এটাই হলো প্রকৃত ইজ্জত ও সুমহান সম্মান, এরই (তাওহীদের) মাধ্যমে সে আল্লাহর ইবাদত করার যোগ্য হবে। আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে আশা করবে না। তাঁকে ব্যতীত কাউকে ভয় করবে না। না এবং (সর্ব ক্ষেত্রে) তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। এরই মাধ্যমে সুনিশ্চিত হবে তার সাফল্য ও পরিত্রাণ।
এই তাওহীদের যে ফযীলতের সাথে কোন কিছু মিশ্রিত হয় না, তা হলো এই যে, তাওহীদ যখন অন্তরে পূর্ণতা লাভ করে এবং পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে বাস্তবেই তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন তা অল্প আমলকে তাধিক করে দেয়, আমলকে সংখ্যাতীত বৃদ্ধি করে দেয়।
এই নিষ্ঠাপূর্ণ বাক্য বান্দার (হিসাবের) পাল্লায় এত ভারী হবে যে, আসমান ও যমীনসহ তাতে বসবাসকারী আল্লাহর সকল সৃষ্ট তার মোকাবিলা করতে পারবে না। যেমন, আবূ সাঈদ খুদরী -এর হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, অনুরূপ এক টুকরো কাগজ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস-যাতে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' লেখা থাকবে -তাকে নব্বইটি এমন گোনাহের খাতার সাথে ওজন করা হবে, যা ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যতদূর দৃষ্টি পৌঁছবে (অথচ কাগজের এই ছোট্ট টুকরোর ওজন ভারী হয়ে যাবে।) আবার এই কালেমার পাঠকদেরই কেউ (এই মর্যাদা) লাভ করবে না। কারণ, সে তাওহীদ ও নিষ্ঠায় পরিপূর্ণ হবে না। যেমন এই বান্দা পূর্ণ নিষ্ঠাবান ছিলো।
এটাও তাওহীদের ফযীলতের আওতায় পড়ে যে, আল্লাহ তাও- হীদবাদীদের বিজয় দানের, দুনিয়াতে তাদের সহযোগিতা করার, তাদের ইজ্জত ও সম্মান দানের, তাদের হেদায়াত লাভের, তাদের সমস্যা সমাধানের এবং তাদের যাবতীয় কথা ও কাজকে যথার্থতা দান করার যামীন হয়েছেন।
এটাও তাওহীদের ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত যে, আল্লাহ ঈমানদার তাওহীদবাদীদের থেকে দুনিয়া ও আখেরাতের অকল্যাণ দূরীভূত করেন এবং মধুর ও শান্তিদায়ক জীবন দান ক'রে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন, কুরআন ও হাদীসে এর দৃষ্টান্ত অনেক। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
📄 যে তাওহীদের বাস্তব রূপ দিবে
যে ব্যক্তি তাওহীদের বাস্তব রূপ দিবে, সে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে
মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةٌ قَانِتًا لِلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ﴾ النحل ١٢٠
অর্থাৎ, “নিশ্চয় ইবরাহীম ছিলেন এ সম্প্রদায়ের প্রতীক, সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহরই অনুগত এবং তিনি শির্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না.” (সূরা নাহলঃ ১২০) তিনি আরো বলেন, وَالَّذِينَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُوْنَ﴾ المؤمنون: ٥٩
অর্থাৎ, "আর তারা তাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক করে না.” (সূরা মু'মিনূনঃ ৫৯) হুসাইন ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كُنْتُ عِنْدَ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ فَقَالَ : أَيُّكُمْ رَأَى الْكَوْكَبَ الَّذِي انْقَضَ الْبَارِحَةَ؟ قُلْتُ : أَنَا، ثُمَّ قُلْتُ : أَمَا إِنِّي لَمْ أَكُنْ فِي صَلَاةٍ، وَلَكِنِّي لُدِغْتُ، قَالَ: فَمَاذَا صَنَعْتَ ؟ قُلْتُ: اسْتَرْقَيْتُ، قَالَ : فَمَا حَمَلَكَ عَلَى ذَلِكَ ؟ قُلْتُ : حَدِيثٌ حَدَّثَنَاهُ الشَّعْبِيُّ، فَقَالَ : وَمَا حَدَّثَكُمْ الشَّعْبِيُّ ؟ قُلْتُ : حَدَّثَنَا عَنْ بُرَيْدَةَ بْنِ حُصَيْبٍ الْأَسْلَمِيُّ أَنَّهُ قَالَ : لَا رُقْيَةَ إِلَّا مِنْ عَيْنٍ أَوْ حُمَةٍ، فَقَالَ: قَدْ أَحْسَنَ مَنْ انْتَهَى إِلَى مَا سَمِعَ، وَلَكِنْ حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ عَنْ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: ((عُرِضَتْ عَلَيَّ الْأُمَمُ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ وَمَعَهُ الرُّهَيْطُ، وَالنَّبِيَّ وَمَعَهُ الرَّجُلُ وَالرَّجُلَانِ، وَالنَّبِيَّ لَيْسَ مَعَهُ أَحَدٌ، إِذْ رُفِعَ لِي سَوَادٌ عَظِيمٌ، فَظَنَنْتُ أَنَّهُمْ أُمَّتِي، فَقِيلَ لِي: هَذَا مُوسَى ال وَقَوْمُهُ، وَلَكِنْ انْظُرْ إِلَى الْأُفُقِ، فَنَظَرْتُ فَإِذَا سَوَادٌ عَظِيمٌ، فَقِيلَ لِي: انْظُرْ إلَى الْأُفُقِ الْآخَرِ فَإِذَا سَوَادٌ عَظِيمٌ، فَقِيلَ لِي هَذِهِ أُمَّتُكَ وَمَعَهُمْ سَبْعُونَ أَلْفًا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ وَلَا عَذَابٍ، ثُمَّ نَهَضَ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ، فَخَاضَ النَّاسُ فِي أُولَئِكَ الَّذِينَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ وَلَا عَذَابٍ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ : فَلَعَلَّهُمْ الَّذِينَ صَحِبُوا رَسُولَ اللهِ ﷺ ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: فَلَعَلَّهُمْ الَّذِينَ وُلِدُوا فِي الْإِسْلَامِ وَلَمْ يُشْرِ كُوا بِاللَّهِ، وَذَكَرُوا أَشْيَاءَ، فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ رَسُولُ الله ﷺ فَقَالَ : مَا الَّذِي تَخُوضُونَ فِيهِ؟ فَأَخْبَرُوهُ، فَقَالَ: هُمْ الَّذِينَ لَا يَرْقُونَ وَلَا يَسْتَرْقُونَ وَلَا يَتَطَيَّرُونَ وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ))، فَقَامَ عُكَاشَةُ بْنُ مِحْصَنٍ فَقَالَ : ادْعُ اللهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ فَقَالَ: أَنْتَ مِنْهُمْ ثُمَّ قَامَ رَجُلٌ آخَرُ فَقَالَ: ادْعُ اللَّهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ، فَقَالَ سَبَقَكَ بِهَا عُكَاشَةُ))
আমি (কোন এ বৈঠকে) সাঈদ ইবনে জুবায়ের -এর কাছে ছিলাম, তিনি বললেন, কাল যে তারাটি কক্ষচ্যুত হয়েছিল, সেটা কে দেখেছে? আমি বললাম, আমি দেখেছি, আমি নামাযে ছিলাম না। কারণ, আমি দংশিত হয়েছিলাম, তিনি বললেন, তখন তুমি কি করলে? আমি বললাম, আমি তখন ঝাড়-ফুঁক করালাম, তিনি বললেন, এটা তুমি কোন ভিত্তিতে করলে? আমি বললাম, শা'বী থেকে বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে। তিনি বললেন, তিনি (শা'বী) তোমাদেরকে কি বর্ণনা করেছেন? আমি বললাম, তিনি আমাদেরকে বুরায়দা ইবনে হুসাইব-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নজরদোষ, অথবা কোন কিছুর বিষ ব্যতীত আর কোন কিছুতে ঝাড়-ফুঁক নেই। তখন তিনি (সাঈদ ইবনে জুবায়ের) বললেন, যে ব্যক্তি তার শোনা হাদীস অনুযায়ী আমল করলো, সে অতি উত্তম কাজ করলো, তবে আমাদেরকে ইবনে আব্বাস নবী করীম থেকে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, "প্রত্যেক উম্মতকে আমার নিকট পেশ করা হলো। একজন নবীকে একটি ছোট দলসহ দেখলাম, আর একজন নবীকে দেখলাম, তাঁর সাথে একজন ও দু'জন লোক ছিলো। আর একজন নবীকে দেখলাম, তাঁর সাথে কেউ ছিলো না। হঠাৎ এক বিরাট দল দেখলাম। আমি ভাবলাম, এটা হয়তো আমার উম্মত, কিন্তু আমাকে বলা হলো, এটা মুসা ও তাঁর উম্মত, তবে আপনি ওপর দিকে দেখুন, আমি দেখলাম, সেখানেও এক বিরাট দল। আমাকে বলা হলো, এটা তোমার উম্মত, এদের মধ্যে ৭০ হাজার এমনও লোক রয়েছে, যারা বিনা হিসাব ও বিনা কোন শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তাতঃপর নবী করীম সেখান থেকে উঠে তাঁর হুজরায় চলে গেলেন, লোকেরা উক্ত লোকদের ব্যাপারে চিন্তা- ভাবনা শুরু করে দিলেন, কেউ বলেন, ওরা মনে হয় সেই লোক, যারা রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গ লাভ করে ছিলো, কেউ বলেন, ওরা মনে হয় সেই লোক, যারা ইসলাম নিয়েই দুনিয়াতে জন্মগ্রহণ করেছিলো এবং আল্লাহর সাথে কোন অংশীদার স্থাপন করে নি। আরো বিভিন্ন কথা-বার্তা তাঁরা বালাবলি করছিলেন, এ সময় রাসূলু- লাহ তাঁদের সামনে উপস্থিত হলেন এবং তাঁদেরকে লক্ষ্য ক'রে বললেন, "কি ব্যাপারে তোমরা চিন্তা-ভাবনা করছো?” তাঁরা তাকে এ সম্পর্কে জানালেন, তিনি বললেন, "ওরা হলো সেই লোক, যারা কারো নিকট ঝাড়-ফুঁক কামনা করে না, অলক্ষণ-কুলক্ষণ বলে কোন কিছুকে মনে করে না এবং কারো দ্বারা নিজেদের দেহে দাগ ও চিহ্ন দেওয়ায় না। বরং তারা আল্লাহর উপর ভরসা রাখে." এ (কথা শোনার পর) উক্কাশা ইবনে মেহসান দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! দুআ করেন, যেন আমিও তাদের একজন হই। তিনি বললেন, "তুমি তাদের একজন।” এরপর অন্য একজন দাঁড়িয়ে বললো, আমার জন্যেও দুআ করে দেন, যেন আমি তাদের একজন হই। তিনি বললেন, "উক্কাশা এ ব্যাপারে তোমার অগ্রবর্তী হয়ে গেছে।” (বুখারী-মুসলিম)
কতিপয় মসলা জানা গেলো,
১. তাওহীদে মানুষের শ্রেণীবিভাগ।
২. তাওহীদের বাস্তব রূপদানের অর্থ।
৩. আল্লাহ কর্তৃক ইবরাহীম -এর প্রশংসা করণ যে, তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।
৪. আল্লাহ কর্তৃক অলীদের প্রশংসা করণ যে, তাঁরা শির্কমুক্ত ছিলেন।
৫. ঝাড়-ফুঁক ও দাগা ত্যাগ করাই হলো তাওহীদের বাস্তব রূপ দেওয়া।
৬. যে জিনিস ঐ গুণাবলীর জন্ম দেয়, তারই নাম নির্ভরশীলতা।
৭. সাহাবায়ে কেরাম-দের গভীর জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। কেননা, তাঁরা বুঝেছিলেন যে, এই মর্যাদা (বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ হওয়া) কেউ আমল ব্যতীত লাভ করবে না।
৮. ভাল কাজের প্রতি সাহাবাদের বড় আগ্রহ ছিলো।
৯. এটাও এই উম্মতের ফযীলত যে, সংখ্যায় ও গুণে এরা সর্বাধিক।
১০. মুসা -এর উম্মতের ফযীলত।
১১. নবী করীম -এর নিকট প্রত্যেক উম্মতকে পেশ করা হয়ে ছিলো।
১২. প্রত্যেক উম্মত পৃথক পৃথকভাবে তাদের নবীদের সঙ্গে হাশর প্রান্তে উপস্থিত হবে।
১৩. নবীদের (অনেকের) দাওয়াত কবুল করেছে, এমন লোকের সংখ্যা কম হবে।
১৪. যে নবীর দাওয়াত কেউ কবুল করে নি, তিনি হাশরে একা থাকবেন।
১৫. এই জ্ঞানের ফল হলো এই যে, সংখ্যায় আধিক্য দেখে প্রতারিত হওয়া এবং সংখ্যায় অল্প দেখে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
১৬. নজরদোষ এবং দংশণজনিত বিষ দূরীকরণের জন্যে ঝাড়- ফুঁকের অনুমতি আছে।
১৭. ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ শুনে সেই মত যে ব্যক্তি আমল করলো, সে উত্তম কাজ করলো।’ এই বাক্যের দ্বারা সালফে সালেহী- নদের জ্ঞানের গভীরতার প্রমাণ হয়। আর জানা গেল যে, প্রথম হাদীসটি দ্বিতীয় হাদীসের বিরোধিতা করে না।
১৮. কারো প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করা সালাফদের (পূর্ববর্তী যুগের পুণ্যবান ব্যক্তিবর্গ) রীতি ছিলো না।
১৯. রাসূলুল্লাহ-এর এই বাণী, ‘তুমি তাঁদের একজন’ নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন।
২০. (হাদীসে) উক্কাশা-এর ফযীলতের কথা রয়েছে।
২১. (প্রয়োজনে কোন কথা) প্রত্যক্ষভাবে না বলে পরোক্ষভাবে বলা যায়।
২২. রাসূলুল্লাহ-এর চারিত্রিক সৌন্দর্য।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
এই অধ্যায় হলো গত অধ্যায়ের পূরক ও তার অংশ, কারণ, তাওহীদকে বাস্তব রূপ দেওয়ার অর্থ হলো, তাকে ছোট ও বড় শির্কের আবর্জনা, বিশ্বাস থেকে জন্ম কথার বিদআত, আমল থেকে সৃষ্ট কাজের বিদআত এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ রাখা, আর এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন যাবতীয় কথা ও কাজে এবং ইচ্ছা-ইরাদায় আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নিষ্ঠাবান হবে ও যখন তাওহীদ পরিপন্থী এবং তাওহীদে পূর্ণতা লাভে বাধা দানকারী বড় ও ছোট শির্ক থেকে এবং বিদআত থেকে মুক্ত হবে। অনুরূপ তাওহীদে কলঙ্ক সৃষ্টিকারী এবং তার সুফল অর্জনে অন্তরায় সৃষ্টিকারী সমস্ত পাপাচার থেকে নিরাপদ হবে।
যে ব্যক্তি তাওহীদের বাস্তব রূপ দিবে, অর্থাৎ, তার অন্তর যখন ঈমান, তাওহীদ এবং নিষ্ঠায় পরিপূর্ণ হবে, আর তার আমল এর সত্যায়ণ করবে, অর্থাৎ, সে আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তিত হয়ে ও তাঁর আনুগত্য ক'রে তাঁর নির্দেশের সামনে নিজেকে নত করে দিবে এবং কোন পাপের দ্বারা এসবকে কলঙ্কিত করবে না, এই ব্যক্তিই বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সে সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশকারীদের একজন হবে। বিশেষভাবে যে জিনিস তাওহীদের বাস্তব রূপ দেওয়াকে প্রমাণ করে তা হলো, সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর অনুগত হওয়া এবং আল্লাহর উপর এমন মজবুত আস্থা রাখা যে, অন্তর কোন ব্যাপারে কোন সৃষ্টির প্রতি ঝোঁকবে না। প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তাদের নিকট কোন কিছু কামনা করবে না। বরং তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ, যাবতীয় কথা ও কাজ, তার ভালবাসা ও বিদ্বেষ এবং তার সবকিছুর দ্বারা হবে আল্লাহর রাসূলের অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি লাভ। কেবল কামনা এবং মিথ্যা দাবী করলেই তাওহীদকে বাস্তব রূপ দেওয়া হয় না, বরং তা হয় ঈমান ও নিষ্ঠাকে অন্তরে স্থান দিয়ে, যার সত্যায়ণ করে উত্তম চরিত্র ও নেক আমল। এইভাবে যে তাওহীদের বাস্তব রূপ দিবে, সেই-ই গত অধ্যায়ে উল্লিখিত সমস্ত ফযীলত পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে সক্ষম হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
📄 শির্ককে ভয় করা
শির্ককে ভয় করা
মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللَّهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ مِنْ يَشَاءُ﴾ (النساء: ٤٨
অর্থাৎ, “নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এ ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা ৪৮) আর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এইভাবে দুআ করে ছিলেন,
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الأَصْنَامَ (ابراهيم: ٣٥)
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ! আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন।” (সূরা ইবরাহীমঃ ৩৫) আর হাদীসে এসেছে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,)
(( أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشَّرْكُ الأَصْغَرُ)) فَسُئِلَ عَنْهُ؟ فَقَالَ: ((الرياء))
অর্থাৎ, "আমি তোমাদের উপর সব থেকে যে জিনিসের আশঙ্কা বোধ করি, তা হলো ছোট শির্ক, আর ছোট শির্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “তা হলো রিয়া” (লোক দেখানো কোন কাজ করা। আর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলু- ল্লাহ বলেছেন,
(( مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو اللَّهِ نِدًا دَخَلَ النَّارِ)) البخاري
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে আহ্বান করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (বুখারী) মুসলিম শরীফে জাবির থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ دَخَلَ النَّارَ)) البخاري
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি শির্ক মুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে শির্ক নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (বুখারী)
যে বিষয়গুলো জানা গেলো, ১. শির্ককে ভয় করা, ২. ‘রিয়া’ (লোক দেখানো কাজ) শির্কের অন্তর্ভুক্ত, ৩. তবে এটা ছোট শির্ক, ৪. নেক লোকদের জন্য এটাই (ছোট শির্ক) হলো সর্বাধিক ভীতিপ্রদ শির্ক। ৫. জান্নাত ও জাহান্নামের নৈকট্য। ৬. জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়েরই নিকটে হওয়ার কথা একটি হাদীসে এসেছে। ৭. যে ব্যক্তি শির্কমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে শির্ক নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, যদিও সে মানুষের মধ্যে সব থেকে বেশী ইবাদতকারী হয়।
৮. বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবরাহীম -এর আল্লাহর নিকট মূর্তি পূজা থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা।
৯. তাদের তঅধিকাংশের অবস্থার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, যেমন বলা হয়েছে, “হে আমার প্রতিপালক! এরা অনেক মানুষকে বিপথগামী করেছে"
১০. এতে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র ব্যাখ্যা রয়েছে, যেমন ইমাম বুখারী উল্লেখ করেছেন।
১১. শির্ক থেকে মুক্ত ব্যক্তির ফযীলত,
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণঃ আল্লাহর উপাস্যে এবং তাঁর ইবাদতে শরীক করা, তাওহীদের ঘোর বিরোধী। আর তা দু'প্রকারেরঃ-(১) বড় তথা স্পষ্ট শির্ক (২) ছোট তথা সূক্ষ্ম শির্ক, বড় শির্ক হলো, আল্লাহর কোন শরীক নিযুক্ত ক'রে তাকে আল্লাহর মত আহ্বান করা, অথবা ভয় করা, কিংবা তার নিকট আশা করা, বা আল্লাহর মত তাকে ভালবাসা, কিংবা ইবাদতের কোন কিছু তার জন্য সম্পাদন করা। এই শির্ক যে করবে, সে সম্পূর্ণ তাওহীদ শূন্য হবে। আর এই মুশরিকের জন্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, ওর ঠিকানা হবে জাহান্নাম, আর যে ইবাদত গায়রুল্লাহর জন্য সম্পাদন করা হয়েছে, তার নাম ইবাদত রাখা হোক, কিংবা অসীলা রাখা হোক, অথবা অন্য যে কোন নামেই তার নামকরণ করা হোক না কেন, সবই বড় শির্ক গণ্য হবে। কারণ, জিনিসের অর্থ ও তার মূল বিষয়ই লক্ষণীয়। শাব্দিক পার্থক্য লক্ষণীয় নয়। আর ছোট শির্ক হলো, সেই সমস্ত কথা ও কাজ, যদ্দ্বারা বড় শির্ক পর্যন্ত পৌঁছা হয়, যেমন, কোন সৃষ্টির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ক'রে তাকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া, অথচ সে এর যোগ্য নয় এবং গায়রুল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ ও লোক দেখানো কোন কাজ করা ইত্যাদি।
শির্ক যখন তাওহীদ পরিপন্থী, যা জাহান্নামে প্রবেশ এবং সেখানে চিরন্তন অবস্থানকে ওয়াজিব করে, আর তা বড় হলে, জান্নাত হারাম করে এবং তা থেকে মুক্ত না থাকা পর্যন্ত সৌভাগ্য লাভের কোন উপায়ই নেই, তখন প্রত্যেক বান্দার অপরিহার্য কর্তব্য হলো, শির্ককে দারুণভাবে ভয় করা। তা থেকে এবং তার সমস্ত পথ ও উপায়- উপকরণ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করা। আর আম্বিয়া, পূণ্যবান এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ লোকদের মত তা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করা, আর বান্দার উচিত অন্তরে মজবুত নিষ্ঠার স্থান দেওয়া। আর এটা হবে আল্লাহর সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে এবং তাঁকেই একমাত্র উপাস্য ভেবে। তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়ে। তাঁকেই ভয় করে, তাঁরই নিকট কামনা ও আশা করে। বান্দা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে যা কিছু করবে ও যা ত্যাগ করবে, এসবের মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর সাওয়াব লাভ। কারণ, ইখলাসের গুণই হলো যে, তা ছোট ও বড় শির্ককে দূর করে। আর দুর্বল ইখলা- সের কারণেই মানুষ শির্কে পতিত হয়।