📄 বর্তমান দুঃখজনক প্রেক্ষাপটে একজন মুসলিম কিভাবে দায়িত্ব পালন করে কিয়ামতের দিন জিম্মাদারী হতে রেহাই পেতে পারে?
উত্তরে বলব যে, প্রত্যেক মুসলিম আপন আপন সামর্থ অনুযায়ী কাজ করবে। আলেমের উপর এমন বিষয় ওয়াজিব, যা সাধারণ লোকের উপর ওয়াজিব নয়। এ প্রসঙ্গে আমরা বলব যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবের মাধ্যমে দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেছেন এবং তাঁর কিতাবকে মুমিনদের জন্য সংবিধান হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ)
“তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর”। (সূরা আম্বীয়া: ৭) আল্লাহ তা'আলা ইসলামী সমাজকে দু'ভাগে বিভক্ত করেছেন। আলেম সমাজ এবং সাধারণ সমাজ। আর আলেমের উপর যা আবশ্যক, সাধারণ মানুষের উপর তা আবশ্যক নয়। সুতরাং যারা আলেম নয়, তাদের উচিত আলেমদেরকে জিজ্ঞাসা করা। আলেমদের উপর আবশ্যক হল, তাদেরকে যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে, তার উত্তর দিবে। কাজেই ব্যক্তি অনুপাতে দায়িত্ব বিভিন্ন রকম হবে। আলেমদের উচিত, তাদের সামর্থ অনুযায়ী সত্যের দিকে আহবান জানাবো। সাধারণ লোকদের উচিত তারা তাদের নিজেদের এবং অধিনস্ত স্ত্রী-সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় জিজ্ঞাসা করা। উভয় শ্রেণীর লোকেরা তাদের দায়িত্ব পালন করলে তারা পরিত্রাণ পাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا )
“আল্লাহ কাউকে সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না”। (সূরা বাকারা: ২৮৬)
পরিতাপের বিষয় এই যে, মুসলমানেরা বর্তমানে এমন বিপর্যয়ের ভিতরে রয়েছে, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। পৃথিবীর সমস্ত কাফের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। যেমন নবী (ﷺ) বলেছেন:
(تَدَاعَى عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الْأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا فَقَالَ قَائِلٌ وَمِنْ قِلَّةٍ نَحْنُ يَوْمَئِذٍ قَالَ بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرٌ وَلَكِنَّكُمْ غُشَاءُ كَغُثَاءِ السَّيْلِ وَلَيَنْزَعَنَّ اللَّهُ مِنْ صُدُورِ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ وَلَيَقْذِفَنَّ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمُ الْوَهْنَ فَقَالَ قَائِلٌ يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا الْوَهْنُ قَالَ حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ )
“তোমাদের উপর পৃথিবীর সমস্ত জাতি ঝাঁপিয়ে পড়বে যেভাবে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিরা খাদ্যের বাসনকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে। সাহাবীগণ বললেন: আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে সেদিন এরকম হবে? নবী (ﷺ) বললেন: না তোমাদের সংখ্যা সেদিন অনেক হবে। কিন্তু তোমরা সেদিন বন্যায় ভাসমান তৃণলতার মত দুর্বল হবে। তোমাদের শত্রুদের অন্তর হতে ভয় ছিনিয়ে নেয়া হবে। তোমাদের অন্তরে ওয়াহান ঢেলে দেয়া হবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন: ওয়াহান কাকে বলে? উত্তরে তিনি বললেন: দুনিয়ার ভালবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।'
সুতরাং আলেমদের উচিত মুসলমানদেরকে সংশোধন করা। আর তা সঠিক তাওহীদ এবং বিশুদ্ধ ইবাদত ও চরিত্র শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমেই সম্ভব। প্রত্যেকেই আপন আপন সামর্থ অনুযায়ী নিজ নিজ দেশে কাজ করবে। সঠিক আকীদা এবং বিশুদ্ধ ইবাদত ও চরিত্র শিক্ষা দানের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণ এই যে, তারা ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অক্ষম। কারণ তাঁরা ঐক্যবদ্ধ নয়। তারা এক দেশ বা একই কাতারে সমবেত নয়। তাই শত্রুদের বিরুদ্ধে বর্তমানে এধরণের জিহাদে অংশ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে তাদের উচিত শরীয়ত সম্মত সকল প্রকার উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা। যদিও আমাদের শক্তি থাকে তথাপিও আমরা কিছু করতে সক্ষম নই। কারণ অনেক ইসলামী দেশের সরকার ইসলামী আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র চালায়না। সুতরাং যেহেতু আমরা জিহাদ করতে সক্ষম নই তাই আমাদের উচিত আমরা আকীদা ও চরিত্র সংশোধনের কাজে লিপ্ত থাকব। সুতরাং যে দেশে ইসলামী শাসন নেই সে দেশের আলেম ও দাঈগণ যদি উপরোক্ত দু'টি কাজে লিপ্ত থাকে তাহলে আমি বিশ্বাস করি যে তাদের উপরে আল্লাহর বাণী:
(وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ بِنَصْرِ اللَّهِ)
“এবং মুমিনগণ সে দিন আল্লাহর সাহায্যে আনন্দিত হবে”। (সূরা রোম: ৪-৫)
টিকাঃ
1 - আবু দাউদ, অধ্যায়: কিতাবুল মালাহিম।
📄 প্রত্যেক মুসলিমের উচিত তার ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম বাস্তবায়ন করা
প্রত্যেক মুসলিমের উপর আবশ্যক হল সাধ্যানুযায়ী কাজ করা। আল্লাহ কারো উপর সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন নি। তাওহীদ ও সঠিক ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা এবং যে রাষ্ট্রে ইসলামী আইন নেই, সেখানে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা একটি অপরটির জন্য জরুরী নয়। কেননা তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করাই হল আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে ফয়সালা করার প্রথম পর্যায়। কোন কোন যুগে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে না জড়িয়ে তা থেকে দূরে থাকাই উত্তম ছিল। এ সকল পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম ব্যক্তি জনসমাজ থেকে দূরে সরে গিয়ে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হবে এবং মানুষের অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকবে। এমর্মে অনেক হাদীস রয়েছে। ইবনে উমার হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেন:
الْمُسْلِمُ إِذَا كَانَ مُخَالِطًا النَّاسَ وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ خَيْرٌ مِنَ الْمُسْلِمِ الَّذِي لَا يُخَالِطُ النَّاسَ وَلَا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ
“যে মুসলিম ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলা-মেশা করে এবং তাদের পক্ষ হতে প্রাপ্ত কষ্ট সহ্য করে সে ঐ মুসলিম হতে ভাল যে মানুষের সাথে মেলা-মেশা করেনা এবং তাদের থেকে আগত কষ্টও সহ্য করেনা”।¹ পৃথিবীতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তাওহীদ প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম মাত্র। তা মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নয়।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কিছু কিছু আলেম এমন বিষয় বাস্তবায়নের চেষ্টা করে এবং সহজ বলে মনে করে, যা তাদের ক্ষমতায় নেই। এ বিষয়ে তারা শ্রমও ব্যয় করে থাকে। এ ব্যাপারে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি তার অনুসারীদেরকে বলেছেন, “তোমাদের নিজেদের ভিতরে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম কর, তাহলেই তোমাদের যমিনে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হবে।” তারপরও আমরা উক্ত ব্যক্তির অনেক অনুসারীকেই তার কথার বিরোধিতা করতে দেখি। তারা সব সময় জোর দিয়ে বলে থাকে হুকুমের মালিক একমাত্র আল্লাহ। কোন সন্দেহ নেই যে, হুকুমের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাতে কোন শরীক নেই। কিন্তু তাদের প্রত্যেকেই কোন না কোন মাযহাবের অনুসরণ করে থাকেন। যখন তাদের কাছে সহীহ হাদীস পৌঁছে তখন বলে, এটি আমার মাযহাবের পরিপন্থী। কোথায় গেল সুন্নাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর অবতারিত বিষয় দিয়ে ফয়সালা? তাদের কেউ কেউ আবার সূফী তরীকায় আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। কোথায় গেল তাওহীদের মাধ্যমে আল্লাহর অবতারিত বিষয় দিয়ে ফয়সালা করা? তাদের নিজেদের ভিতরে যে জিনিষ নেই তা তারা অন্যের নিকট দাবী করে থাকে। তোমার আকীদাহ, ইবাদত, চরিত্র, ঘর, সন্তান-সন্ততি এবং ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর অবতারিত বিষয় বাস্তবায়ন করা খুবই সহজ। অথচ যে শাসক অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার করেনা তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো অত্যন্ত কঠিন। তবে কেন তুমি সহজটি ছেড়ে দিয়ে কঠিনের দিকে যাচ্ছ?
তাদের এ পথে যাওয়ার পিছনে দু'টি কারণের একটি কারণ রয়েছে। হয়ত তারা সঠিক শিক্ষা ও দিক নির্দেশনা পায়নি অথবা তাদের আকীদাহ ভাল নয়। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা এবং মন্দ আকীদাহ তাদেরকে সম্ভব বিষয়কে বাদ দিয়ে অসম্ভব বিষয় বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত করছে। আজকের প্রেক্ষাপটে সঠিক শিক্ষা, মানুষকে সঠিক আকীদা এবং ইবাদতের দিকে আহবান করা ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিৎ মনে করিনা। প্রত্যেকেই সামর্থ অনুযায়ী এ কাজে আঞ্জাম দিয়ে যাবে। আল্লাহ সাধ্যাতীত দায়িত্ব কাউকে চাপিয়ে দেননি। আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী এবং নবী পরিবারের সকলের উপর রহমত বর্ষণ করুন। আমীন৷৷
টিকাঃ
¹ - তিরমিযী, অধ্যায়: সিফাতুল কিয়ামাহ।