📘 তাওহিদের ডাক > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিকগণ ইসলামের মৌল বাণী “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সঠিক অর্থ সম্পর্কে অবগত নয়। এই পবিত্র বাণীর মর্মার্থ সম্পর্কে অবগত নয় বলেই তারা তাদের জীবনে কালেমার সঠিক শিক্ষা বাস্ত বায়ন করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, তারা কালেমা তায়্যেবার মর্মার্থের সরাসরি বিরোধী কাজ তথা বড় বড় শির্কেও লিপ্ত হচ্ছে। মাজারে সেজদা করাসহ শির্কের এমন কোন প্রকার নেই যাতে এক শ্রেণীর নামধারী মুসলিম লিপ্ত হচ্ছেনা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মুসলিম উম্মার এক শ্রেণীর আলেমদেরও তাওহীদ ও শির্ক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। যায় ফলে তারা জাতিকে নির্ভেজাল তাওহীদের প্রতি আহবান করতে সক্ষম নয়।
কিন্তু তাদের মধ্যে হতে ইসলামের ভালবাসা উঠে যায়নি। তারা চায় জাতিকে পরিপূর্ণ মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে ও মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের ন্যায় একটি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা তৈরী করতে। অথচ এ সমস্ত ইসলামী কাফেলার নেতা-কর্মীদের মধ্যে তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে তারা জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারছেনা। নবী (ﷺ) যেভাবে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, যে পদ্ধতি তিনি অনুসরণ করেছেন, সে সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নেই। ফলে মুসলিম যুব সমাজ আজ হাতাশাগ্রস্ত। তারা তাওহীদের শিক্ষা অর্জন না করে এবং তাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবণে ইসলামের মূল শিক্ষা বাস্তবায়ন না করেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামকে বিজয়ী দেখতে চায় এবং যে কোনভাবে রাষ্ট্রীয় মতা দখল করে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। অথচ এটি নবী-রাসূলদের পদ্ধতি নয়। সকল নবীই সর্বপ্রথম তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ সম্পর্কে মানুষের সকল ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন করতে আজীবণ সংগ্রাম করেছেন। সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)ও একই পথ অনুসরণ করেছেন। নবুওয়াতের তেরটি বছর তিনি মক্কা নগরীতে নানা বাধা-বিগ্নতা ও নির্যাতন সহ্য করে তাওহীদে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমানে ইসলামী দল ও সংগঠনগুলোর কর্ম-কান্ডের প্রতি গভীরভাকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে তারা তাওহীদের প্রতি বেশী গুরুত্ব দিচ্ছেনা। ক্ষমতায় যাওয়ার জনই তাদের অধিকাংশ মেধা ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মার আলেম ও দ্বীনী সংগঠনের কর্মীদের করণীয় সম্পর্কে যুগ শ্রেষ্ঠ ভিজ্ঞ আলেম আল্লামা মুহাম্মাদ নাসির উদ্দীন আলবানী (রঃ) যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, অত্র পুস্তিকায় আমরা তা পাঠক সমাজের সামনে তুলে ধরছি। পুস্তিকাটি পড়ে পাঠক সমাজ উপকৃত সংশোধন হয় তবেই আমার শ্রম সার্থ হয়েছে বলে মনে করব। যাদের সহযোগিতায় বইটি প্রকাশিত হল আল্লাহ তাদেরকে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন। আমীন।
আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী
পি.ও. বক্স: ১৫৮০, আল-জুবাইল- ৩১৯৫১, সৌদি আরব
মোবাইল: ০৫০৩০৭৬৩৯০, বাংলাদেশ: ০১৭৩২৩২২১৫৯

📘 তাওহিদের ডাক > 📄 তাওহীদ ভিত্তিক সমাজ গঠনের দিক নির্দেশনা চেয়ে ইমাম আলবানীর নিকট তিনটি প্রশ্ন

📄 তাওহীদ ভিত্তিক সমাজ গঠনের দিক নির্দেশনা চেয়ে ইমাম আলবানীর নিকট তিনটি প্রশ্ন


সম্মানিত শায়খ! আপনি অবশ্যই অবগত আছেন যে, বিভিন্ন কারণে বর্তমানে মুসলিম জাতির ধর্মীয় অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তারা সঠিক আকীদাহ সম্পর্কে অজ্ঞ, দলে দলে বিভক্ত। অধিকাংশ অঞ্চলে তারা সালাফী আকীদাহ ও আমলের দাওয়াতের ক্ষেত্রে চরম অবহেলা করে চলছে। অথচ সঠিক আকীদাহ ও আমলের বাস্তবায়নের মাধ্যমেই মুসলিম জাতি সংশোধিত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে মুসলিম জাতির এই বেদনাদায়ক অবস্থা একদল নিষ্ঠাবান লোকদের মাঝে চেতনার সৃষ্টি করেছে এবং জাতিকে বর্তমান বেদনাদায়ক অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য তাদের মাঝে প্রবল আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু জাতিকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করার পদ্ধতির ক্ষেত্রে তাদের মাঝে প্রচুর মতবিরোধ রয়েছে। এই মতবিরোধ বিভিন্ন ইসলামী দল ও আন্দোলনের নিকট তাদের আকীদাহ ও আমল গ্রহণের উৎস্যের বিভিন্নতার কারণেই সৃষ্ট হয়েছে। অথচ এ সমস্ত ইসলামী দল বছরের পর বছর ধরে জাতিকে সংশোধন ও উদ্ধারের দাবী করে আসছে। তাদের এই প্রচেষ্টা সফল হওয়া তো দূরের কথা; বরং রাসূল (ﷺ) কর্তৃক আনীত কর্ম পদ্ধতি, আকীদাহ ও সুন্নাত বিরোধী আকীদাহ ও কর্ম পদ্ধতির কারণে মুসলিম জাতির উপর বড় বড় মুসিবত, ধ্বংস ও ফিতনা নেমে এসেছে। যার ফলাফল স্বরূপ মুসলমানগণ বিশেষ করে যুবক সমাজ বর্তমান অবস্থা থেকে উদ্ধারের পদ্ধতি নিয়ে চরম হতাশায় ভোগছে।
নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর সুন্নাত ও সাহাবী এবং তাবেয়ীদের পথের অনুসারী একজন সচেতন মুসলিম অবশ্যই অনুভব করে যে, এই বেদনাদায়ক অবস্থা থেকে মুসলিম মিল্লাতকে উদ্ধার, সংশোধন অথবা সংশোধনে অংশ গ্রহণের ব্যাপারে তার উপর মহান আমানত সমর্পিত রয়েছে।
• সম্মানিত শায়খ! যে সমস্ত আন্দোলন ও দলের কর্মীগণ জাতিকে উদ্ধারের কাজে আত্মনিয়োগ করতে চাচ্ছে, তাদেরকে আপনি কি উপদেশ দিচ্ছেন?
• জাতিকে এই করুণ পরিস্থিতি হতে উদ্ধারের ক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টিতে সফলজনক কর্মপদ্ধতি কি?
• মুসলিম ব্যক্তি কিয়ামতের দিনে কিভাবে আল্লাহর দরবারে আপন জিম্মাদারী ও দায়িত্ব হতে রেহাই পেতে পারে?
যুগ শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুহাদ্দিছ আল্লামা মুহাম্মাদ নাসির উদ্দীন আলবানী (রঃ) উপরোক্ত জিজ্ঞাসার যে সুস্পষ্ট জবাব প্রদান করেছেন দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী হিসাবে দর্শনার্থী যুবক ও ছাত্র সমাজের কাছে তা উপস্থাপন করছি:

📘 তাওহিদের ডাক > 📄 নবী ও রাসূলদের পথ ছিল সর্বপ্রথম তাওহীদের প্রতি আহবান করা

📄 নবী ও রাসূলদের পথ ছিল সর্বপ্রথম তাওহীদের প্রতি আহবান করা


উল্লেখিত প্রশ্নে মুসলিম উম্মার যে শোচনীয় অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে, তার উত্তরে আমি বলব যে, এই বেদনায়ক অবস্থা রাসূল (ﷺ) এর প্রেরণের সময়কালের আইয়‍্যামে জাহেলীয়াতের আরবদের অবস্থার চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট নয়। কারণ আমাদের মাঝে রয়েছে পরিপূর্ণ রেসালাত, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি দল, যারা মানুষকে সঠিক পথের দিকে এবং মানুষকে সঠিক ইসলামী আকীদাহ, আমল, আখলাক ও জীবন পদ্ধতির দিকে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে। কোন সন্দেহ নেই যে, বর্তমানকালের অনেক মুসলিম জনসমাজের অবস্থা জাহেলী যুগের মুশরিক আরবদের অবস্থার মতই। বর্তমানে মুসলমানদের বিরাট এক অংশের মাঝে বিভিন্ন প্রকার শির্কের ছড়াছড়ি। কবর পূজা, মাজার পূজা, কবরে সেজদা করা, অলী-আওলীয়াদের উসীলা দেয়া, গাইরুল্লাহর কাছে দু'আ করা, পীর-ফকীরের নামে পশু কুরবানী করা, মানত করা ইত্যাদি। কোন কোন ক্ষেত্রে মক্কার মুশরেকদের চেয়ে বর্তমানকালের মুসলমানদের শির্ক অধিক ভয়াবহ। যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সন্তান চাওয়া, সাহায্য চাওয়া, বিপদে-আপদে গাইরুল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা ইত্যাদি।
এর উপর ভিত্তি করে আমি বলব যে, রাসূল (ﷺ) যেভাবে প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন, সেভাবেই শুরু করতে হবে। যেহেতু উভয় সমাজের অবস্থা একই, তাই চিকিৎসা একই হবে। যেভাবে রাসূল (ﷺ) জাহেলী সমাজকে দাওয়াতের মাধ্যমে শির্কের কদর্যতা থেকে মুক্ত করেছিলেন, আজকের সকল আলেম ও দাঈদের কর্তব্য হল তারা )لا إله إلا الله( এর সঠিক অর্থ অনুধাবন করে তা মানুষকে বুঝাতে সচেষ্ট হবে এবং রাসূল (ﷺ) যে পদ্ধতিতে সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তারাও তাই করবে। আমার এই কথার অর্থ খুবই সুস্পষ্ট। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولَ اللهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا )
"তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবনীতে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহজাব: ২১)
আমাদের বর্তমান বিশ্বের মুসলমানদের এবং সকল যুগের মুসলমানদের সকল সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ) আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। একথার অর্থ এই যে, রাসূল (ﷺ) যার মাধ্যমে দাওয়াত শুরু করেছেন, আমরাও তা দিয়ে আরম্ভ করব। তা এই যে আমরা প্রথমে মুসলমানদের ভ্রান্ত আকীদাহ সংশোধনের কাজে আত্মনিয়োগ করব। অতঃপর আমল সংশোধন। তারপর তাদের চরিত্র গঠনের চেষ্টা। আমি এই ধারাবাহিকতার মাধ্যমে উপরোক্ত বিষয়গুলোর একটি হতে অন্যটিকে পৃথক করতে চাইনি। আমার কথার অর্থ হল আকীদা সংশোধনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করবে। মুসলমানদের আকীদাহ সংশোধনের ক্ষেত্রে দাঈ ও আলেমদের কথা আসবে সবার পূর্বে। কারণ আলেমদের ভিতরে কুরআন-সুন্নার সঠিক জ্ঞানের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তা সত্বেও তারা ইসলামের প্রচারক ও খাদেম হিসাবে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছে। আলেমদের ইলম শুণ্য অবস্থার ক্ষেত্রে জ্ঞানীদের সুপ্রসিদ্ধ আরবী প্রবাদ বাক্যটি প্রজোয্য। فاقد الشئ لا يعطيه অর্থাৎ যার কাছে যে জিনিষ নেই সে তা অপরকে দিবে কিভাবে? আমরা জানি, মুসলিম উম্মার মাঝে লক্ষ লক্ষ ইসলাম প্রচারক রয়েছেন। মানুষের কাছে তারা তাবলীগ জামাতের মুরব্বী বা আলেম হিসাবে পরিচিত। তাদের অধিকাংশই দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ। যেমন আল্লাহ বলেন:
(وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسَ لَا يَعْلَمُونَ)
“কিন্তু অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ”। তাবলীগীদের দাওয়াতের তরীকা হল, তারা প্রথম মূলনীতির (আকীদাহ) প্রতি গুরুত্ব দেয়া থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ। অথচ তার মাধ্যমেই রাসূল (ﷺ) তাঁর সংশোধনের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। শুধু আমাদের নবী নন; সমস্ত নবী-রাসূলগণই তাওহীদের মাধ্যমে তাদের দাওয়াতী মিশন আরম্ভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ)
"আল্লাহর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেয়ার জন্যে আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি। (সূরা নাহল: ৩৬) তাবলীগীরা ইসলামের এই প্রথম রুকন ও মূলনীতির উপর মোটেই গুরুত্ব প্রদান করেনা। এই মূলনীতির দিকে পৃথিবীবাসীর নিকট প্রেরিত প্রথম রাসূল নূহ (আঃ) প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। আর একথা সকলের জানা যে, আমাদের দ্বীনের ন্যায় পূর্ববর্তী শরীয়ত সমূহের মধ্যে ইবাদত ও বৈষয়িক জীবনের আহকামগুলোর বিস্তারিত বিবরণ ছিলনা। কেননা আমাদের দ্বীন সর্বশেষ দ্বীন। এ দ্বীন পূর্বের সকল দ্বীনের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেছে। অথচ নূহ (আঃ) তাঁর জাতির মাঝে নয় শত পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করে বেশীরভাগ সময় জাতির লোকদেরকে তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর জাতির লোকেরা তাঁর দাওয়াত কবুল করেনাই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوْنَا وَيَعُوْفًا وَنَسْرًا )
“এবং তারা বলেছিল, তোমরা কখনও পরিত্যাগ করোনা তোমাদের দেবদেবী, পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সু'আ, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসরকে”। (সূরা নূহ: ২৩) এই আয়াতের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম যে, সঠিক ইসলামের প্রচারকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল সদাসর্বদা তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়া। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
(فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ)
“আপনি জেনে নিন যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মাবুদ নেই”। নবী (ﷺ) এর তরীকা এটাই ছিল যে প্রথমে তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়া। এ কথাটি বেশী বুঝিয়ে বলার দরকার নাই। মক্কী জীবনে রাসূল (ﷺ) সমস্ত কাজ-কর্ম অধিকাংশ সময়ই তাঁর গোত্রের লোকদেরকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াত দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তিনি কাউকে শিক্ষা দেয়ার সময়ও তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়ার শিক্ষা দিতেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবী (ﷺ) যখন মুয়ায (রাঃ) কে ইয়ামানের গভর্ণর ও শাসক নির্বাচন করে পাঠালেন তখন তাকে বলে দিলেন যে,
فَادْعُهُمْ إِلَى أَنْ يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَأَخْبِرُهُمْ أَنَّ اللهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَأَخْبِرُهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةٌ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابُ
“তুমি তাদেরকে সর্বপ্রথম এ কথার সাক্ষ্য দেয়ার প্রতি আহবান জানাবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মাবুদ নেই। তারা যদি তোমার এ কথা মেনে নেয় তবে তুমি তাদেরকে বল যে, আল্লাহ তা'আলা দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করেছেন। যদি তারা এটিও মেনে নেয়, তখন তুমি তাদেরকে বল যে, আল্লাহ তোমাদের সম্পদের উপর যাকাত ফরজ করেছেন। ধনীদের নিকট থেকে তা আদায় করা হবে এবং দরীদ্রদের মাঝে তা বিতরণ করা হবে। একথা যখন তারা মেনে নিবে তখন যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে বেছে বেছে ভাল সম্পদগুলো গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। আর বিশেষ করে অত্যাচারিত ব্যক্তির বদ দু'আ থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ অত্যাচারিতের বদ দু'আ এবং আল্লাহর মাঝে কোন আবরণ নেই।' হাদীসটি সকলের কাছে পরিচিত।
সুতরাং রাসূল (ﷺ) যা দিয়ে আরম্ভ করেছেন, তাঁর সাহাবীদেরকেও তা দিয়ে আরম্ভ করার আদেশ দিয়েছেন। আর তা হল তাওহীদের মাধ্যমে শুরু করা। কোন সন্দেহ নেই যে, জাহেলী যুগের মুশরিক আরব ও বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমানদের মধ্যে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ বুঝার ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আরবের মুশরেকরা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ বুঝত। কিন্তু মুখে তা উচ্চারণ করতনা। এই জন্যই তাদেরকে মুখে এই বাক্যটি উচ্চারণ করার দাওয়াত দিয়েছেন। বর্তমান কালের সকল মাযহাবের ও ফির্কার অনেক মুসলমানই মুখে কালেমাটি উচ্চারণ করে কিন্তু এর অর্থ বুঝেনা। তাই তাদেরকে তা মুখে উচ্চারণের দাওয়াত দেয়ার প্রয়োজন নেই। তারা এই পবিত্র বাক্যটির অর্থ বুঝার প্রতি খুবই মুখাপেক্ষী। প্রথম যুগের আরবগণ এই পার্থক্যটি ভাল করেই বুঝত। রাসূল (ﷺ) যখণ তাদেরকে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার দিকে আহবান জানাত, তখন তারা অহংকার করত। কুরআনে তাদের এই অহংকারের কথা বর্ণিত হয়েছে। তারা কেন অহংকার করত? কারণ তারা এই বাক্যটির গভীর মর্মকথা অনুধাবন করেছিল। তাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, এই কথা উচ্চারণ করলে আল্লাহর সাথে অন্য কোন অংশীদার নির্ধারণ করা চলবেনা, চলবেনা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত। অথচ তারা দীর্ঘদিন থেকে আল্লাহর ইবাদতের সাথে শরীক করে আসছে, গাইরুল্লাহকে আহবান করে আসছে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে আসছে। একই সাথে তারা গাইরুল্লাহর জন্য মানতি পেশ, গাইরুল্লাহর উসীলা দেয়া, গাইরুল্লাহর জন্য পশু যবাই করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে বিচার ফয়সালা নিয়ে যাওয়া সহ বিভিন্ন প্রকার শির্কে লিপ্ত ছিল।
এই সমস্ত বহুল প্রচলিত শির্কে লিপ্ত থাকার সাথে সাথে তারা এটাও জানত যে, এই পবিত্র বাক্য “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর দাবী হল তাদের সমস্ত শির্কী উসীলা ও দেব-দেবীর সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন ঘোষণা করা। কারণ এই সমস্ত বাতিল মাবূদদের সাথে সম্পর্ক রাখা “লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ” এর অর্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

টিকাঃ
১ - বুখারী, অধ্যায়: কিতাবুয যাকাত।

📘 তাওহিদের ডাক > 📄 বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ বুঝেনা

📄 বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ বুঝেনা


বর্তমান কালের অধিকাংশ মুসলমান যারা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সাক্ষ্য দেয় তারা ভালভাবে এর অর্থ বুঝেনা; বরং তারা অনেক সময় এর উল্টা অর্থ করে থাকে। আমি একটি উদাহরণ পেশ করে তা বুঝাতে চেষ্টা করব। জনৈক সূফী সাধক “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ ব্যাখ্যা করে একটি পুস্তিকা রচনা করলেন। তিনি )لا إله إلا الله( এর অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: )لا رب إلا الله( অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নেই। মক্কার মুশরিকরা এই অর্থ বিশ্বাস করত এবং এর উপরই তারা ছিল। কিন্তু এই ঈমান তাদের কোন উপকার করেনাই। মক্কার মুশরিকরা যে আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা ও প্রভু হিসাবে বিশ্বাস করত তার প্রমাণ হল আল্লাহর বাণী:
(وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمُوتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ )
“আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন এই আকাশ-যমিন কে সৃষ্টি করেছে তখন তারা অবশ্যই বলবে: 'আল্লাহ'। (সূরা লুকমান: ২৫) মুশরিকরা বিশ্বাস করত যে, এই বিশ্ব জগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছে। সৃষ্টিতে তার কোন শরীক নেই। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদতে অসংখ্য অংশীদার নির্ধারণ করত। তারা বিশ্বাস করত যে, রব তথা প্রতিপালক মাত্র একজন। তবে মাবুদ অগণিত। আল্লাহ তাদের একথার প্রতিবাদ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى)
“যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছে তারা বলে আমরা এই সমস্ত দেব-দেবীর পূজা এই জন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্যিধ্যে পৌঁছিয়ে দিবে। (সূরা যুমার: ৩)
মুশরিকরা অবশ্যই জানতো যে, )لا إله إلا الله( কথাটি উচ্চারণ করার অর্থই আল্লাহ ছাড়া যত বস্তুর ইবাদত করা হয় তাদের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করা। বর্তমান কালের অধিকাংশ মুসলমান এই পবিত্র বাক্যটির ব্যখ্যায় বলে আল্লাহ ছাড়া কোন রব বা প্রতিপালক নেই। সুতরাং যে মুসলিম কেবলমাত্র এই বিশ্বাস করবে তার এবং মুশরিকের মধ্যে আকীদার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই। যদিও বাহ্যিকভাবে তার মধ্যে ইসলামের বৈশিষ্ট দেখা যায়। কেননা সে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'পাঠ করে। এই বাক্যটি পাঠ করার কারণে সে প্রকাশ্যভাবে মুসলমান।
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ইসলামের প্রচারকদের (দাঈদের) উপর ওয়াজিব হল তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেয়া এবং যারা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'এর অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের কাছে এর সঠিক মর্ম তুলে ধরা। মুশরিকের ব্যাপারটা ভিন্ন। কেননা সে 'লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ' বলতে অস্বীকার করে। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে কোনভাইে সে মুসলমান নয়। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমান প্রকাশ্যে মুসলমান হিসাবে গণ্য। কেননা রাসূল (ﷺ) বলেছেন: যারা উহা উচ্চারণ করল, তারা আমার হাত থেকে তাদের জান-মালকে নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামের কোন হক যদি তাদের উপর আবশ্যক হয় তবে অবশ্যই তাদের উপর তা কার্যকর হবে। আর তাদের অন্ত রের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর ন্যস্ত রইল।'
এ জন্যই আমি মাঝে মাঝে একটি বাক্য উচ্চারণ করি। তা এই যে, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' নামক পবিত্র বাক্যটির অর্থ অনুধাবনের ক্ষেত্রে বর্তমানে অনেক মুসলমানের অবস্থা জাহেলী যুগের অধিকাংশ মুশরিকদের অবস্থা থেকেও নিকৃষ্ট। কেননা আরবের মুশরিকরা এর অর্থ বুঝতে পারত। কিন্তু এর মর্মার্থের উপর ঈমান আনয়ন করতনা। আর মুসলমানেরা এই বাক্যটি মুখে উচ্চারণ করে কিন্তু এর অর্থ বুঝেনা। মুখে উচ্চারণ করে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। কিন্তু সঠিক অর্থে এর উপর ঈমান আনয়ন করেনাই। তারা কবরের উপাসনা করে, গাইরুল্লাহ এর নামে পশু যবাই করে, মৃত ব্যক্তিদের কাছে দু'আ করা সহ বিভিন্ন প্রকার শির্কে লিপ্ত হয়। এটি একটি প্রকৃত ও বাস্তব সত্য কথা। রাফেযী², সূফী ও বিভিন্ন তরীকাপন্থীগণ এই ধরণের শির্কে লিপ্ত। কবরের কাছে হজ্জ করতে যাওয়া, শির্কের আস্তানা স্বরূপ গম্বুজ তৈরী করে তার চার পার্শ্বে কাবা ঘরের তাওয়াফের ন্যায় তাওয়াফ করা, নেককার লোকদের কাছে বিপদাপদে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং অলীদের নামে শপথ করা তাদের অন্যতম আকীদাহ।
এ জন্যই আমি বিশ্বাস করি যে, মুসলিম উম্মার দাঈদের কর্তব্য হল, এই পবিত্র বাক্যটির উপর গুরুত্ব প্রদান করবে এবং প্রথমে অতি সংক্ষেপে এর অর্থ বর্ণনা করবে। অতঃপর বিস্তারিতভাবে এই কালেমার দাবীগুলো বর্ণনা করবে। এই কালেমার দাবী হল সকল প্রকার ইবাদত একনিষ্টভাবে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা। আল্লাহ তা'আলা যখন মুশরিকদের বক্তব্য,
(وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى)
“যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাকরূপে গ্রহণ করে, তারা বলে আমরা তো এদের পূজা এজন্যেই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্যিধ্যে এনে দিবে” কুরআন মাযীদে উল্ল্যেখ করলেন তখন আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে ইবাদত করাকে পবিত্র বাক্য 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'এর সাথে কুফরী হিসাবে সাব্যস্ত্য করেছেন।
এই জন্যই আমি আজ বলব যে, কালেমা তাইয়্যেবার অর্থ না বুঝে মসলমানদের বিভিন্ন দল গঠন করা এবং দল ভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ভিতরে কোন কল্যাণ নেই। এরকম দল গঠন করা দুনিয়াতে ও আখেরাতের কোথায়ও কোন উপকারে আসবেনা। আমরা জানি যে, রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি অন্তর থেকে এই সাক্ষ্য প্রদান করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নাই, আল্লাহ তার শরীরকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। অন্য বর্ণনায় আছে, সে ব্যক্তি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে”। যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে এই বাক্যটি পাঠ করবে তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের গ্যারান্টি রয়েছে। যদিও তা শাস্তি ভোগ করার পর হোক না কেন। এই বাক্যটির উপর সঠিকভাবে বিশ্বাসকারী যদিও বিভিন্ন কবীরা গুনায় লিপ্ত হওয়ার কারণে জাহান্নামের আযাব ভোগ করবে, কিন্তু তার শেষ পরিণতি হবে জান্নাত। অপর পক্ষে জবানের মাধ্যমে যে ব্যক্তি এই বাক্যটি পাঠ করবে, অথচ তার অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি তার জন্য পরকালে এই বাক্যটি কোন উপকারে আসবেনা। তবে দুনিয়াতে এই বাক্যটি পাঠ করে মুসলমানদের হাত থেকে জীবন রক্ষা করতে পারবে। যদি মুসলমানদের হাতে শক্তি ও রাজত্ব থাকে। কিন্তু পরকালে কোন উপকারে আসবেনা। তবে এর পাঠক যদি অর্থ বুঝে এবং সঠিকভাবে তার অর্থের উপর ঈমান আনয়ন করে তাহলে তার উপকারে আসবে। 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর বিষয় বস্তুর উপর ঈমান না এনে শুধুমাত্র অর্থ বুঝা যথেষ্ট নয়। এই বিষয়টি সম্পর্কে বর্তমানে অধিকাংশ মানুষই উদাসীন। এই বাক্যটির অর্থ বুঝলেই তাঁর উপর ঈমান আনা হয়ে যায়নি। ঈমানদার হওয়ার জন্য দু'টি বিষয় এক সাথে বর্তমান থাকা জরুরী। কেননা অনেক ইহুদী-নাসারারা জানত যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) নবুওয়াত ও রেসালাতে সত্যবাদী। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে একথাটি উল্লেখ করেছেন:
(يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ)
“তারা তাঁকে আপন সন্তানদের মতই চিনে”। (সূরা বাকারা: ১৪৬) তাদের এজানা কোন উপকারে আসেনি। কেননা তারা নবী ও রাসূল হিসাবে সত্যায়ন করেনি এবং তার উপর ঈমান আনেনি। তাই বলছি ঈমান আনার পূর্বে যে বিষয়ের উপর ঈমান আনা হবে তার জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কিন্তু এই জ্ঞানই যথেষ্ঠ নয়; বরং জ্ঞান ও ঈমান এবং আনুগত্য একই সাথে থাকতে হবে। আল্লাহ তা'আলা কুরআন মযীদে বলেন:
(فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ)
"আপনি জেনে নিন যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই অতঃপর আপনার গুনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করুন”। (সূরা মুহাম্মাদ: ১৯)
সুতরাং কোন মুসলিম যদি জবানের মাধ্যমে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার উপর জরুরী হল প্রথমে সংক্ষেপে এর অর্থ জানা অতঃপর বিস্তারিতভাবে তা জানবে। যখন জানবে তখন সত্যায়ন করবে এবং ঈমান আনবে, তার ক্ষেত্রে একটু আগে উল্লেখিত হাদীসগুলো প্রযোজ্য। রাসূল (ﷺ) এর বাণী:
(مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ نَفَعَتْهُ يَوْمًا مِنْ دَهْرِهِ)
“যে ব্যক্তি “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পাঠ করবে, কোন না কোন দিন অবশ্যই বাক্যটি তার উপকারে আসবে”।' অর্থাৎ এই পবিত্র কালেমাটির অর্থ ও মর্ম বুঝে যদি পড়া হয়, তাহলে এই বাক্যটি তার পাঠকারীকে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হওয়া থেকে রক্ষা করবে। এই কথাটি আমি বার বার বলি। যাতে মানুষের মগজে কথাটি ভালভাবে প্রবেশ করে। হয়ত কোন কোন লোক সৎ আমল করা এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এই বাক্যটির হক পূর্ণভাবে আদায় করতে ব্যর্থ হবে। কিন্তু শির্কে আকবারে তথা বড় শির্কে লিপ্ত হওয়া থেকে মুক্ত থাকবে এবং ঈমানের দাবী অনুপাতে প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য সকল প্রকার সৎ কাজে লিপ্ত হবে। এরকম লোক আল্লাহর ইচ্ছাধীন। পাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে কিংবা দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু এই পবিত্র বাক্যটির কারণে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করেন। এটিই নবী(ﷺ) এর বাণী:
(مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ نَفَعَتْهُ يَوْمًا مِنْ دَهْرِهِ)
“যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করবে, কোন না কোন দিন অবশ্যই বাক্যটি তার উপকারে আসবে”।
আর যে ব্যক্তি অর্থ না বুঝে বাক্যটি উচ্চারণ করল কিংবা অর্থ বুঝে উচ্চারণ করল কিন্তু অর্থের দাবীর উপর ঈমান আনয়ন করল না তাকে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কোন উপকার করবেনা। তবে দুনিয়াতে সে যদি ইসলামী হুকুমতের অধীনে বসবাস করে থাকে তা হলে সে রেহাই পেতে পারে। কিন্তু পরকালে আল্লাহর শাস্তি হতে রেহাই পাবেনা।
এ জন্যই যে সমস্ত সমাজ বা সংগঠণ ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে সে সমস্ত সমাজে প্রথমে তাওহীদের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। যে সমস্ত ইসলামী দল আল্লাহর যমিনে দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্টায় লিপ্ত তাদের উদ্দেশ্য ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবেনা, যতক্ষণ না তারা নবী (ﷺ) এর গৃহীত মূলনীতির মাধ্যমে কাজ শুরু করবে। তা হলো প্রথমে নির্ভেজাল তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমে সমাজ সংস্কার করার চেষ্টা করা।
আকীদার প্রতি বেশী গুরুত্ব দেয়ার অর্থ এই নয় যে, এবাদত, আচার-আচরণ এবং অন্যান্য চারিত্রিক গুণাগুণ সম্পর্কে অবহেলা করতে হবে; বরং আল্লাহ যেহেতু এই দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেছেন তাই আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবানকারীগণ প্রথমে তাওহীদের প্রতি বেশী গুরুত্ব প্রদান করে মানুষের কাছে ইসলামের সকল দিক তুলে ধরবে।
আমার কথার সার সংক্ষেপ হল ইসলামের সত্যিকার প্রচারকগণ প্রথমে ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সঠিক আকীদা তথা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবুদ নেই- এর মর্মার্থের প্রতি বেশী গুরুত্ব দিবে। কিন্তু একেই যথেষ্ট মনে করবেনা। আল্লাহর ইবাদতের রূপ-রেখাও বুঝাতে হবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাখলুকের জন্য ইবাদতের কোন অংশ প্রদান করা যাবে না। বিষয়টি আরও পরিস্কার করে বলতে হবে। কারণ সংক্ষিপ্ত বিবরণ অনেক সময় যথেষ্ট হয়না।
অনেক তাওহীদপন্থী এমন মুসলমান রয়েছে যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ইবাদতের কোন অংশ প্রদান করেনা অথচ আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (ﷺ) সুন্নাতে বর্ণিত অনেক সঠিক আকীদাহ হতে তাদের মস্তিস্ক সম্পূর্ণ মুক্ত। তারা আকীদার সাথে সম্পৃক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ পাঠ করে কিন্তু তার অর্থ উপলদ্ধি করতে পারে না। অথচ তা আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ঈমানের অন্তর্ভূক্ত। উদাহরণ স্বরূপ সমস্ত মাখুলেকর উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়ার বিষয়টিকে ধরতে পারি। আমি অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি যে, আমার অনেক সালাফী ভাই কোন প্রকার ব্যাখ্যা বা ধরণ বর্ণনা ব্যতীত আমাদের মতই বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ আরশের উপরে। কিন্তু সমকালীন বাতিল ফির্কার কোন লোক এসে যখন তাকে আকীদার বিষয়ে সন্দেহে ফেলে দেয় তখন সে বিভ্রান্তির ভিতর পড়ে যায়। এর কারণ হল কুরআন এবং সুন্নায় আকীদার মাসআলাগুলো যেভাবে বিস্ত ারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে সেভাবে সে সঠিক আকীদার শিক্ষা গ্রহণ করেনি। বর্তমান কালের কোন মু'তাযেলী লোক যখন বলে আল্লাহ তো বলেছেন:
(أَأَمِنتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُوْرُ أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ)
“তোমরা কি ভাবনামুক্ত হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেবেন, অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে। না তোমরা নিশ্চিত হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি আছেন, তিনি প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্কবাণী”। (সূরা মুলক: ১৬-১৭) তাই তোমরা বল আল্লাহ আকাশে। এতে করে তোমরা আল্লাহকে তাঁর একটি সৃষ্ট বস্তু আকাশের ভিতরে সীমাবদ্ধ করে দিলে। এভাবে মু'তাযেলীরা মানুষকে সন্দেহে ফেলে দেয়।

টিকাঃ
'-বুখারী, অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান।
2-শিয়াদের একটি ফির্কার নাম রাফেযী।
1 - তাবারানী তার মু'যামুল আওছাতে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আলবানী (রঃ) সহীহ বলেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00