📘 তাওহীদ পরিচিতি > 📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আল্লাহর অনুগ্রহ নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে সমস্ত জগতের বশ্যতা ও নতি স্বীকার

📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আল্লাহর অনুগ্রহ নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে সমস্ত জগতের বশ্যতা ও নতি স্বীকার


আল্লাহর আনুগত্য ও নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে সমস্ত জগতের বশ্যতা ও নতি স্বীকার
নিশ্চয় পুরো বিশ্বজগত -যাতে রয়েছে আসমান-যমীন, গ্রহ-নক্ষত্র, প্রাণীকূল, বৃক্ষ এবং জল-স্থল ও অন্তরীক্ষ, মালাঈকা, জিন্ন ও ইনসান...এর সবকিছুই আল্লাহর বশীভূত ও তাঁর জাগতিক নির্দেশের অনুগত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَهُۥٓ أَسۡلَمَ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ طَوۡعٗا وَكَرۡهٗا ﴾ [ال عمران: ٨٣]
“আকাশমণ্ডলী ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সকলেই স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৩]
তিনি আরো বলেন,
﴿بَل لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ كُلّٞ لَّهُۥ قَٰنِتُونَ ١١٦ ﴾ [البقرة: ١١٦]
“বরং আকাশমণ্ডলী ও যমীনে যা কিছু আছে সব তাঁরই। সব তাঁরই অনুগত।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১১৬]
﴿وَلِلَّهِۤ يَسۡجُدُۤ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ مِن دَآبَّةٖ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَهُمۡ لَا يَسۡتَكۡبِرُونَ ٤٩ ﴾ [النحل: ٤٩]
“আর আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সাজদাহহ করছে যা কিছু রয়েছে আকাশমণ্ডলীতে এবং যেসকল প্রাণী রয়েছে যমীনে, আর মালাঈকাগণ যারা কখনো অহংকার করে না।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৯]
﴿أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ يَسۡجُدُۤ لَهُۥۤ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَن فِي ٱلۡأَرۡضِ وَٱلشَّمۡسُ وَٱلۡقَمَرُ وَٱلنُّجُومُ وَٱلۡجِبَالُ وَٱلشَّجَرُ وَٱلدَّوَآبُّ وَكَثِيرٞ مِّنَ ٱلنَّاسِۖ ﴾ [الحج: ١٨]
“তুমি কি দেখো না আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাজদাহ করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও যা কিছু আছে যমীনে এবং সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজী, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সাজদাহ করে মানুষের মধ্যে অনেকে?” [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ১৮]
﴿وَلِلَّهِۤ يَسۡجُdudۤ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ طَوۡعٗا وَكَرۡهٗا وَظِلَٰلُهُم بِٱلۡغُدُوِّ وَٱلۡأٓصَالِ۩ ١٥ ﴾ [الرعد: ١٥]
“আল্লাহর জন্যই আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সব কিছু ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় সাজদাবনত হয় এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের ছায়াগুলোও।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৫]
সুতরাং এ সৃষ্টি ও সৃষ্টজগতসমূহের সবকিছুই আল্লাহর অনুগত ও তাঁর ক্ষমতার কাছে বশীভূত। এগুলো আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী এবং তাঁর নির্দেশক্রমে পরিচালিত হয়। এর কোনো কিছুই আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না। অতি সুক্ষ্ম নিয়ম ও শৃঙ্খলার সাথে তারা নিজ নিজ কর্তব্য পালন করে এবং অনিবার্য ফলাফলে উপনীত হয় আর নিজেদের স্রষ্টাকে সকল দোষ, ত্রুটি ও অক্ষমতা থেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿تُسَبِّحُ لَهُ ٱلسَّمَٰوَٰتُ ٱلسَّبۡعُ وَٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهِنَّۚ وَإِن مِّن شَيۡءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمۡدِهِۦ وَلَٰكِن لَّا تَفۡقَهُونَ تَسۡبِيحَهُمۡۚ ﴾ [الاسراء: ٤٤]
“সপ্ত আকাশ, যমীন এবং এ সকলের অন্তবর্তী সকল কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৪৪]
সুতরাং নীরব ও সরব, জীবিত ও মৃত, এ সৃষ্টিজগতের সবকিছুই আল্লাহর অনুগত। তাঁর জাগতিক নির্দেশের অনুসারী। এসব কিছুই তাদের বাস্তব অবস্থা ও বক্তব্যের ভাষায় সকল দোষ-ত্রুটি ও অক্ষমতা থেকে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছে। কোনো বিবেকবান ব্যক্তি যখনই এ সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে সে জানতে পারবে যে, এগুলো সত্যসহকারে এবং সত্যের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। আর এগুলো তাদের প্রতিপালকের নির্দেশমত পরিচালিত হয়, তাঁর নির্দেশ অমান্য করা ও তা থেকে পিছপা হওয়ার কোনো অপচেষ্টা এদের মধ্যে নেই। সকলেই স্বভাবজাত তাড়নায় তাদের স্রষ্টার স্বীকৃতি প্রদান করছে।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহেমাহূল্লাহ বলেন,”তারা অনুগত ও আত্মসমর্পণকারী এবং স্বপ্রণোদিতভাবে বশীভূত হতে বাধ্য কয়েক দিক থেকেঃ
এক. তারা স্রষ্টার প্রতি তাদের হাজত, প্রয়োজন, উপযোগিতা ও জরুরত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।
দুই. আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর ও ইচ্ছা যে তাদের ওপর জারী হচ্ছে, বিনয়ের সাথে তারা তা মেনে নেয় এবং তার প্রতি আত্মসমর্পণ করে।
তিন. বিপদে-আপদে তারা আল্লাহর কাছেই দো‘আ করে থাকে।
মুমিন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার রবের নির্দেশের অনুগত হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত তাকদীরের লিখন অনুযায়ী যে সকল বালা-মুসীবত তার ওপর আপতিত হয় তা সে মেনে নেয়। কেননা সে বালা-মুসীবতের সময় স্বেচ্ছায় সবর ও অন্যান্য যেসব নির্দেশ তাকে করা হয়েছিল তা পালন করে থাকে। অতএব, সে স্বেচ্ছায় আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী এবং স্বেচ্ছায় সে আল্লাহর অনুগত।
আর কাফির ব্যক্তি তার রবের জাগতিক নির্দেশ মেনে নিয়ে থাকে। জগতের সকল কিছুর সাজদাহ বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে, অনুগত থাকা। প্রত্যেক বস্তুর সাজদাহ সে বস্তু অনুপাতেই হয়ে থাকে যা তার জন্য উপযোগী। মহান রাববুল আলামীনের অনুগত হওয়া এ সাজদাহর মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। আর প্রত্যেক বস্তুর তাসবীহ পাঠ সে বস্তু অনুসারেই ধরে নিতে হবে প্রকৃত অর্থে, রূপক অর্থে নয়।
আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿أَفَغَيۡرَ دِينِ ٱللَّهِ يَبۡغُونَ وَلَهُۥٓ أَسۡلَمَ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ طَوۡعٗا وَكَرۡهٗا وَإِلَيۡهِ يُرۡجَعُونَ ٨٣ ﴾ [ال عمران: ٨٣]
“তারা কি আল্লাহর দীন ব্যতীত অন্য কিছু অনুসন্ধান করছে? অথচ আল্লাহরই কাছে আত্মসমর্পণ করেছে আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু রয়েছে স্বেচ্ছায় ও অনিচ্ছায় এবং তাঁর কাছেই তাদেরকে ফিরে যেতে হবে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৩]
এ আয়াতটির ব্যাখ্যায় শায়খুল ইসলাম তাইমিয়্যা রহ. বলেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা স্বেচ্ছায় ও অনিচ্ছায় সৃষ্টিজগতের আত্মসমর্পণের কথা এখানে উল্লে¬খ করেছেন। কেননা সৃষ্টিজগতের সবকিছুই পরিপূর্ণভাবে তাঁরই ইবাদাত করে থাকে, চাই কোনো স্বীকৃতিদানকারী এর স্বীকৃতি দান করুক কিংবা তা অস্বীকার করুক। তারা তাঁর কাছে ঋনী, তাঁর দ্বারা পরিচালিত। সুতরাং তারা স্বেচ্ছায় ও অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণকারী। আল্লাহ যা চেয়েছেন, যা তাকদীরে নির্ধারিত করেছেন এবং যে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিজগতের কারো পক্ষেই তা থেকে বের হওয়ার সাধ্য নেই। আর তিনি ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থও নেই। তিনি সৃষ্টির সকলের রব, তাদের মালিক। তিনি যেমন ইচ্ছা তাদেরকে পরিচালিত করেন। তিনি তাদের প্রত্যেকের স্রষ্টা, তাদের অস্তিত্বদানকারী এবং তাদের অবয়বদানকারী। তিনি ছাড়া আর যা কিছু আছে সবই তাঁর অধিনস্ত, তাঁর সৃষ্ট ও তৈরিকৃত, তাঁর দেওয়া বৈশিষ্টমণ্ডিত, তাঁর মুখাপেক্ষী, তাঁর অনুগত, তাঁর কাছে পর্যদুস্ত। আর তিনি পবিত্র ও মহান একক সত্ত্বা, পরাক্রমশালী স্রষ্টা, সৃষ্টিকারী এবং অবয়বপ্রদানকারী।

📘 তাওহীদ পরিচিতি > 📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: সৃষ্টি, জীবিকাপ্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে আল-কুরআনের নীতি

📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: সৃষ্টি, জীবিকাপ্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে আল-কুরআনের নীতি


স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর একত্ববাদ প্রমাণে আল-কুরআনের নীতি
স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর একত্ববাদ প্রমাণে আল-কুরআনের নীতি সঠিক ফিতরাত ও স্বভাব এবং সুস্থ বিবেকের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আর এ নীতি বাস্তবায়িত হয়েছে এমন বিশুদ্ধ প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে যদ্বারা বিবেক সম্পন্ন সকল মানুষ সন্তুষ্ট হয় এবং প্রতিপক্ষ তা মেনে নেয়। এ সকল বিশুদ্ধ প্রমাণের মধ্যে রয়েছে:
১. এটা সবারই জরুরী জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত যে, প্রত্যেক ঘটনার পেছনে অবশ্যই একজন ঘটনাসৃষ্টিকারী রয়েছে। এটি সর্বজনগ্রাহ্য ও জরুরীভাবে ফিতরাত দ্বারা অর্জিত জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়। এমনকি বিষয়টি শিশুদের কাছেও বোধগম্য। কোনো শিশুকে যদি কোনো প্রহারকারী প্রহার করে এবং শিশুটি প্রহারকারীকে দেখতে না পায় তবে সে অবশ্যই প্রশ্ন করবে, কে আমাকে মেরেছে? যদি তাকে বলা হয় তোমাকে কেউই প্রহার করে নি তখন তার বিবেক একথা গ্রহণ করবে না যে, কোনো ধরনের ঘটনা প্রবাহ সৃষ্টিকারী ছাড়াই প্রহারের ঘটনাটি ঘটেছে। যদি তাকে বলা হয়, অমুক তোমাকে মেরেছে, সে কাঁদতে থাকবে যতক্ষণ না তার প্রহারকারীকে প্রহার করা হয়। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন
﴿أَمۡ خُلِقُواْ مِنۡ غَيۡرِ شَيۡءٍ أَمۡ هُمُ ٱلۡخَٰلِقُونَ ٣٥ ﴾ [الطور: ٣٤]
“তাদেরকে কি সৃষ্টি করা হয়েছে কোনো কিছু ছাড়াই, নাকি তারাই সৃষ্টিকারী?” [সূরা আত-তূর, আয়াত: ৩৫]
এটি একটি সুনির্দিষ্ট বন্টন যা আল্লাহ তা‘আলা অস্বীকৃতিজ্ঞাপক প্রশ্নবোধক শব্দের মাধ্যমে উল্লে¬খ করেছেন একথা বর্ণনা করার জন্য যে, এ ভূমিকাটুকু অবশ্যম্ভাবীভাবে সর্বজনবিদিত, কারো পক্ষেই একে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। তিনি বলেছেন, “তারা কি তাদেরকে সৃষ্টিকারী কোনো স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারাই নিজেদেরকে সৃষ্টি করেছে?” দু’টো বিষয়ের প্রত্যেকটিই বাতিল ও অশুদ্ধ। অতএব, এটা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, তাদের অবশ্যই এমন একজন স্রষ্টা রয়েছেন যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ সুবহানাহু। তিনি ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা নেই। তিনি বলেছেন,
﴿هَٰذَا خَلۡقُ ٱللَّهِ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ ٱلَّذِينَ مِن دُونِهِۦۚ ﴾ [لقمان: ١١]
“এ হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং আমাকে দেখাও তিনি ছাড়া আর যেসব সত্ত্বা রয়েছে তারা কি সৃষ্টি করেছে?” [সূরা লুকমান, আয়াত: ১১]
﴿أَرُونِي مَاذَا خَلَقُواْ مِنَ ٱلۡأَرۡضِ ﴾ [الاحقاف: ٤]
“আমাকে দেখাও যে তারা যমীন থেকে কি সৃষ্টি করেছে?” [সূরা আল-আহ্কাফ, আয়াত: ৪]
﴿أَمۡ جَعَلُواْ لِلَّهِ شُرَكَآءَ خَلَقُواْ كَخَلۡقِهِۦ فَتَشَٰبَهَ ٱلۡخَلۡقُ عَلَيۡهِمۡۚ قُلِ ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُوَ ٱلۡوَٰحِدُ ٱلۡقَهَّٰرُ ١٦ ﴾ [الرعد: ١٦]
“নাকি তারা আল্লাহর জন্য এমন সব শরীক স্থির করে রেখেছে যারা তাদেরকে সৃষ্টি করেছে যেভাবে তিনি সৃষ্টি করেন, ফলে তাদের কাছে উভয় সৃষ্টি এক রকম হয়ে গিয়েছে? বল, আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা। তিনি একক, পরাক্রমশালী।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৬]
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَن يَخۡلُقُواْ ذُبَابٗا وَلَوِ ٱجۡتَمَعُواْ لَهُ﴾ [الحج: ٧٣]
“নিশ্চয় যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কিছুকে আহ্বান করে, তারা সম্মিলিত হয়েও কখনোই একটি মাছিকেও সৃষ্টি করতে পারবে না।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৭৩]
﴿وَٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَخۡلُقُونَ شَيۡ‍ٔٗا وَهُمۡ يُخۡلَقُونَ ٢٠ ﴾ [النحل: ٢٠]
“যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কিছুকে আহ্বান করে তারা কোনো কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ২০]
﴿أَفَمَن يَخۡلُقُ كَمَن لَّا يَخۡلُقُۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ١٧ ﴾ [النحل: ١٧]
“যিনি সৃষ্টি করেন তিনি কি ঐ বস্তুর ন্যায় যা সৃষ্টি করে না? তবু কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করছো না?” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১৭]
বার বার দেওয়া এ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি কেউই এ দাবী করে নি যে, সে কোনো কিছু সৃষ্টি করেছে। বরং কোনো প্রমাণ সাব্যস্ত করা তো দূরে থাকুক, শুধুমাত্র এ দাবীর উত্থাপনও কেউ করে নি। ফলে এটা সুনির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, মহান আল্লাহ সুবহানাহুই হচ্ছেন একমাত্র স্রষ্টা। তাঁর কোনো শরীক নেই।
২. সারা জাহানের সুশৃঙ্খল ও সুদৃঢ় ব্যবস্থাপনা হলো এ বিষয়ে সবচেয়ে বড় দলীল যে, এর পরিচালক একজন মাত্র ইলাহ, একজনই রব, যার কোনো শরীক নেই, নেই কোনো বিবাদীও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿مَا ٱتَّخَذَ ٱللَّهُ مِن وَلَدٖ وَمَا كَانَ مَعَهُۥ مِنۡ إِلَٰهٍۚ إِذٗا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَٰهِۢ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعۡضُهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ ﴾ [المؤمنون: ٩١]
“আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি এবং তাঁর সাথে কোনো অন্য ইলাহও নেই। যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করত।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ৯১]
সুতরাং সত্যিকার ইলাহ এমন এক স্রষ্টা হওয়া বাঞ্ছনীয় যিনি হবেন কর্মবিধায়ক। যদি তাঁর সাথে আর কোনো ইলাহ থেকে থাকে যিনি তাঁর রাজত্বে তাঁর সাথে শরীক - আল্লাহ তা থেকে পবিত্র ও মহান -, তাহলে অবশ্যই সে ইলাহেরও সৃষ্টিকাজ ও অন্যান্য কাজ থাকবে। যদি সত্যি এমন হয় তাহলে তাঁর সাথে অন্য ইলাহের শরীকানা তাঁকে খুশি করবে না বরং তিনি যদি তাঁর শরীককে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হন এবং একাই রাজত্ব ও ইলাহিয়্যাতের মালিক হতে পারেন তবে তিনি তাই করবেন। আর যদি তা করতে অসমর্থ হন তাহলে তিনি রাজত্ব ও সৃষ্টিতে নিজের অংশ নিয়েই একাকী পড়ে থাকবেন যেভাবে দুনিয়ার বাদশাহরা নিজ নিজ রাজত্ব নিয়ে অন্যদের থেকে পৃথক হয়ে পড়ে আছেন। এমতাবস্থায় জগতে বিভক্তি দেখা দেবে। সুতরাং পুরো অবস্থাটি তিন অবস্থার একটি অবশ্যই হবে:
ক. হয় একজন অন্যজনের ওপর বিজয়ী হবে এবং সকল মালিকানার অধিকারী হবে।
খ. অথবা তাদের প্রত্যেকেই একে অন্য থেকে পৃথক হয়ে নিজ নিজ রাজত্ব ও সৃষ্টি নিয়ে থাকবে ফলে জগত বিভক্ত হবে।
গ. অথবা তাদের উভয়ে একজন মালিকের অধীনস্থ থাকবে যিনি তাদের ব্যাপারে যা ইচ্ছা তাই করবেন। তিনিই হবেন প্রকৃত ইলাহ এবং তারা হবে তাঁর বান্দা。
এ শেষোক্ত কথাটিই হচ্ছে মূল বাস্তবতা। কেননা জগতে কোনো বিভক্তি নেই এবং কোনো ত্রুটিও নেই। এ দ্বারা প্রমাণিত হয় জগতের পরিচালনাকারী একজনই এবং তাঁর কোনো বিবাদী নেই এবং তিনিই একমাত্র মালিক, তাঁর কোনো শরীক নেই।
৩. সৃষ্টিজগতকে তার দায়িত্ব আদায় ও কর্তব্য পালনে অনুগত রাখা。
এ জগতে এমন কোনো সৃষ্ট বস্তু নেই যা তার দায়িত্ব পালনকে অস্বীকার করে ও তা থেকে বিরত থাকে। মূসা আলাইহিস সাল্লাম এ বিষয়টি দিয়েই প্রমাণ পেশ করেছিলেন যখন ফেরআউন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ﴿قَالَ فَمَن رَّبُّكُمَا يَٰمُوسَىٰ ٤٩ ﴾ [طه: ٤٩] “ফির‘আউন বলল, হে মূসা! তোমাদের রব কে?” [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ৪৯] মূসা আলাইহিস সাল্লাম একটি পরিপূর্ণ জবাব দিয়ে বলেছিলেন,
﴿رَبُّنَا ٱلَّذِيٓ أَعۡطَىٰ كُلَّ شَيۡءٍ خَلۡقَهُۥ ثُمَّ هَدَىٰ ٥٠ ﴾ [طه: ٥٠]
“‘আমাদের রব হচ্ছেন সেই সত্ত্বা, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে হিদায়াত দিয়েছেন।” [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ৫০]
এর অর্থ হচ্ছে আমাদের প্রভূ হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যিনি সকল সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক সৃষ্ট বস্তুকে তার উপযুক্ত অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, চাই সেটা দেহের বড়ত্ব-ছোটত্ব বা মধ্যম অবয়ব হোক ও অন্যান্য গুণাবলী সংক্রান্তই হোক। অতঃপর প্রত্যেক সৃষ্টিকে যে জন্য সৃষ্টি করেছেন সে দিকে হিদায়াত দিয়েছেন। আর এ হিদায়াত হচ্ছে পথনির্দেশমূলক ও জ্ঞানগত হিদায়াত। আর এ হিদায়াতই সমস্ত মাখলুকাতের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে দেখা যায়। অতএব, প্রত্যেক মাখলুক সেজন্যই চেষ্টা করে যে কল্যাণের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তার থেকে যাবতীয় অনিষ্ট প্রতিরোধের জন্য চেষ্টা করে থাকে। এমনকি আল্লাহ জীবজন্তুকেও উপলব্ধি ও অনুভূতি শক্তি দান করেছেন যা দ্বারা সে নিজের উপকারী কাজ করতে সক্ষম হয় এবং তার জন্য যা ক্ষতিকর তা প্রতিরোধ করতে সমর্থ হয়। আর যা দ্বারা সে তার জীবনে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿ٱلَّذِيٓ أَحۡسَنَ كُلَّ شَيۡءٍ خَلَقَهُۥۖ ﴾ [السجدة: ٧]
“যিনি সব কিছুকে সুন্দর অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ৭]
সুতরাং যিনি সমস্ত মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেছেন এবং এ সকল সৃষ্টিকে সুন্দর অবয়ব দান করেছেন যে সুন্দর অবয়বের ওপর বিবেক কোনো আপত্তি উপস্থাপন করতে পারে না। আর এসব কিছুকেই তাদের কল্যাণের দিকে পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত রব। তাকে অস্বীকার করার অর্থই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বাস্তব ও সবচেয়ে বড় সত্ত্বাকে অস্বীকার করা। আর এটি হচ্ছে বড় ধরনের অহংকার ও স্পষ্ট মিথ্যাবাদিতা। আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টির সকলকে সবকিছু দান করেছেন, দুনিয়ায় যার প্রয়োজন তাদের রয়েছে। তারপর তাদেরকে সে সব বস্তু দ্বারা কল্যাণ অর্জনের পদ্ধতি শিখিয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি সকল প্রকার বস্তুকে তার উপযোগী আকৃতি ও অবয়ব দান করেছেন, পারস্পরিক বিবাহ-মিলন ও ভালোবাসায় প্রত্যেক জাতের নর-নারীকে তার উপযুক্ত আকৃতি দান করেছেন। আর প্রত্যেক অঙ্গকে তার ওপর অর্পিত কাজের উপযোগী আকৃতি প্রদান করেছেন। এসবকিছুর মধ্যেই সুস্পষ্ট, সুদৃঢ় ও সন্দেহমুক্ত এ প্রমাণ রয়েছে যে, মহান আল্লাহ তা‘আলাই সবকিছুর রব। তিনিই একমাত্র ইবাদাতের অধিকারী, অন্য কিছু নয়। কবি বলেন,
সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে তাঁর একটি নিদর্শন
যা প্রমাণ করে যে তিনি এক।
আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সৃষ্টিকাজে মহান আল্লাহ সুবহানাহুর একক রুবুবিয়্যাত প্রমাণ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত ওয়াজিব হওয়ার ওপর প্রমাণ পেশ করা, যার কোনো শরীক নেই। একে বলা হয় তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ। সুতরাং কোনো মানুষ যদি তাওহীদুর রুবুবিয়্যার প্রতি স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে কিন্তু তাওহীদুল উলুহিয়্যাহকে সে অস্বীকার করে অথবা সঠিক ও বিশুদ্ধ পন্থায় তাওহীদুল উলুহিয়্যার স্বীকৃতি আদায় না করে, তবে সে মুসলিম হবে না এবং সে তাওহীদপন্থী বলেও স্বীকৃতি পাবে না বরং সে বিবেচিত হবে অস্বীকারকারী কাফিররূপে। ইনশাআল্লাহ পরবর্তী পরিচ্ছেদে আমরা এ সম্পর্কেই আলোচনা করব।

📘 তাওহীদ পরিচিতি > 📄 পঞ্চম পরিচ্ছেদ: তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ যে অপরিহার্যভাবে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহকে শামিল করে তার বর্ণনা

📄 পঞ্চম পরিচ্ছেদ: তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ যে অপরিহার্যভাবে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহকে শামিল করে তার বর্ণনা


উলুহিয়্যাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে একত্ববাদ মেনে নেওয়ার অপরিহার্য্য দাবী
এর অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ তথা রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে একত্ববাদকে স্বীকার করে নেয়। যেমন, সে এ স্বীকৃতি প্রদান করে যে, মহান আল্লাহ ছাড়া জগতের কোনো স্রষ্টা নেই, রিযিকদাতা নেই, পরিচালনাকারী নেই, তার জন্য এ স্বীকৃতি দেওয়াও অপরিহার্য্য হয়ে উঠে যে, সকল প্রকার ইবাদাতের হক্বদার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। আর এটিই হলো তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা। কেননা উলুহিয়্যাতের অর্থ হচ্ছে ইবাদাত। আর ‘ইলাহ’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে মা‘বুদ বা উপাস্য। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে আহ্বান করা যাবে না, কারো কাছে দো‘আ করা যাবে না, আল্লাহর কাছে ছাড়া আর কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা যাবে না। তাঁর ওপরই কেবল তাওয়াক্কুল ও নির্ভরতা স্থাপন করা যাবে। যত কুরবানী শুধু তাঁর জন্যই যবেহ করা হবে এবং মানত শুধু তাঁর নামেই করা হবে। সকল প্রকার ইবাদাত শুধু তাঁর জন্যই পালন করা হবে। অতএব, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ হচ্ছে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ অপরিহার্য্য হওয়ার দলীল বা প্রমাণ। এজন্যই অনেক সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাওহীদুল উলুহিয়্যাহকে যারা অস্বীকার করে তাদের ওপর সে সব বিষয় দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, তাওহীদুর রুবুবিয়্যার যে বিষয়ে তারা স্বীকৃতি প্রদান করত। যেমন, আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٢٢﴾ [البقرة: ٢١، ٢٢]
“হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদাত করো যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকেও সৃষ্টি করেছেন যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। তিনি তোমাদের জন্য যমীনকে বিছানা করেছেন আর আকাশকে করেছেন ছাদ। আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের রিযিকস্বরূপ ফলমূল উৎপাদন করেছেন। সুতরাং তোমরা জেনে শুনে আল্লাহর জন্য কোনো সমকক্ষ স্থির করো না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২১-২২]
অতএব, আল্লাহ বান্দাদেরকে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ মেনে নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আর এ প্রকারের তাওহীদ হচ্ছে তাঁরই ইবাদাতের নাম। তিনি তাদের কাছে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ দিয়ে দলীল পেশ করেছেন, যে তাওহীদের মানেই হচ্ছে পূর্ববর্তী পরবর্তী সকল মানুষের সৃষ্টি, আসমান ও যমীন এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুর সৃষ্টি, বাতাসকে অনুগত করা, বৃষ্টিবর্ষণ, উদ্ভিদ উৎপাদন এবং সে সব ফলমূল সৃষ্টি করা যা বান্দাদের রিযিক বলে বিবেচিত। সুতরাং বান্দাদের জন্য এটা সমীচিন নয় যে, তারা তাঁর সাথে অন্য এমন কারোর শরীক করবে যাদের ব্যাপারে তারা জানে যে, ওরা এ সবের কোনো কিছু কিংবা অন্য কিছুও করে নি। অতএব, তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ প্রমাণের স্বভাবজাত পন্থা হচ্ছে এ ধরনের তাওহীদের ওপর তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ দিয়ে প্রমাণ পেশ করা। কেননা মানুষ প্রথমত তার সৃষ্টির উৎস, তার কল্যাণ ও অকল্যাণের প্রতি ঔৎসুক্য দেখায়। তারপর সে ঐ সব মাধ্যমের প্রতি তার মনোযোগ স্থির করে যা তাকে সে উৎসের নিকবর্তী করে দেয় এবং যা তার মনপুত আর তার নিজের ও সে উৎসের মধ্যকার সম্পর্ককে মজবুত করে।
অতএব, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ হচ্ছে তাওহীদুল উলুহিয়্যার প্রবেশদ্বার। এজন্যই আল্লাহ এ পন্থায় মুশরিকদের ওপর দলীল পেশ করেছেন এবং তাঁর রাসূলকে এ পন্থা দ্বারাই মুশরিকদের বিরুদ্ধে দলীল পেশ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُل لِّمَنِ ٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهَآ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٨٤ سَيَقُولُونَ لِلَّهِۚ قُلۡ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ٨٥ قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ ٱلسَّبۡعِ وَرَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡعَظِيمِ ٨٦ سَيَقُولُونَ لِلَّهِۚ قُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ ٨٧ قُلۡ مَنۢ بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيۡهِ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٨٨ سَيَقُولُونَ لِلَّهِۚ قُلۡ فَأَنَّىٰ تُسۡحَرُونَ ٨٩﴾ [المؤمنون: ٨٤، ٨٩]
“তুমি জিজ্ঞাসা কর, এ যমীন এবং এতে যারা আছে তারা কার মালিকানাধীন যদি তোমরা জেনে থাকো? তারা বলবে, আল্লাহরই মালিকানাধীন। বল, তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবেনা? তুমি জিজ্ঞাসা কর, কে সপ্তাকাশ ও মহা আরশের অধিপতী? তারা বলবে, আল্লাহ। বল, তবুও কি তোমরা সতর্ক হবে না? তুমি জিজ্ঞাসা কর, সকল কিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে? যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার ওপর আশ্রয়দাতা নেই, যদি তোমরা জেনে থাকো। তারা বলবে, আল্লাহ। বল, তবু তোমরা কেমন করে মোহগ্রস্ত হচ্ছো?” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ৮৪-৮৯]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمۡۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖ فَٱعۡبُدُوهُۚ ﴾ [الانعام: ١٠٢]
“তিনি আল্লাহ তোমাদের রব। তিনি ছাড়া আর প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। তিনি সবকিছুর স্রষ্টা। সুতরাং তাঁর ইবাদাত করো।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১০২]
আল্লাহ রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদের দলীল দিয়ে তিনি যে ইবাদাতের হক্বদার সে বিষয়ের ওপর প্রমাণ পেশ করেছেন। আর তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ প্রতিষ্ঠার জন্যই আল্লাহ সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ ﴾ [الذاريات: ٥٦]
“আর আমি জিন্ন ও ইনসানকে একমাত্র আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬]
“আমার ইবাদাতের জন্য” কথাটির অর্থ হচ্ছে তারা শুধুমাত্র আমারই ইবাদাত করবে। বান্দা শুধুমাত্র তাওহীদুর রুবুবিয়্যার ব্যাপারে স্বীকৃতি জ্ঞাপনের মাধ্যমে একত্ববাদী হতে পারে না যতক্ষণ না সে তাওহীদুল উলুহিয়্যার স্বীকৃতি প্রদান করবে এবং তা কার্যে পরিণত করবে। অন্যথায় মুশরিকরা তো তাওহীদুর রুবুবিয়্যার প্রতি স্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল, অথচ সে স্বীকৃতি তাদেরকে ইসলামে প্রবেশ করায় নি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে জিহাদ করেছিলেন। যদিও তারা এ স্বীকৃতি প্রদান করত যে, আল্লাহই স্রষ্টা, রিযিকদাতা, জীবনদাতা ও মৃত্যুদানকারী। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ ﴾ [الزخرف: ٨٧]
“যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮৭]
﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡعَلِيمُ ٩ ﴾ [الزخرف: ٩]
“যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আকাশমণ্ডলী ও যমীন সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই অবশ্যই বলবে, মহা পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৯]
﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ﴾ [يونس: ٣١]
“বল, কে তোমাদেরকে আকাশ ও যমীন হতে জীবিকা সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন? জীবতকে মৃত থেকে কে বের করেন এবং মৃতকে জীবিত হতে কে বের করেন? এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা বলবে, আল্লাহ।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩১]
আল-কুরআনে এ রকম আরো বহু আয়াত রয়েছে। অতএব, যে ব্যক্তি এ ধারণা রাখে যে, তাওহীদ হচ্ছে শুধু আল্লাহর অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া অথবা এ স্বীকৃতি দেওয়া যে, আল্লাহই হচ্ছেন স্রষ্টা এবং জগতের কর্মবিধায়ক আর এ প্রকারের উপরেই সে তার স্বীকৃতিকে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে তাওহীদের হাক্বীকাত সম্পর্কে সে জানে বলে বিবেচিত হবে না, যে তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছিলেন রাসূলগণ। কেননা সে অপরিহার্য্য বিষয়টি ছেড়ে যার জন্য অপরিহার্য্য সেটির কাছে থেমে গেছে। অন্যকথায় সে দলীলের নির্দেশনা ত্যাগ করে দলীলের কাছে থেমে গেছে।
আল্লাহর উলুহিয়্যাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সকল দিক থেকেই এতে রয়েছে পরম পূর্ণতা, যাতে কোনো দিক থেকেই কোনো ধরনের ত্রুটি নেই এবং এটি সব ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত হওয়াকে অপরিহার্য করে। অনুরূপভাবে সম্মান প্রদর্শন, ভয়, দো‘আ, আশা, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাওয়াক্কুল ও নির্ভরতা, সাহায্য প্রার্থনা, পরম ভালোবাসার সাথে অবনত হওয়া ইত্যাদি সব কিছুই বিবেক, শরী‘আত ও ফিতরাতের দিক থেকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত হওয়াকে অপরিহার্য করে তোলে। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য এগুলো পালন করা বিবেকের দিক থেকে, শরী‘আতের দিক থেকে এবং ফিতরাতের দিক থেকে নিষিদ্ধ বলেই বিবেচিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00