📄 তাওহীদ ও শিরকের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব
তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং শিরক উৎখাতের জন্যই হলো:
১. সকল সৃষ্টিকুলের সৃষ্টি: আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: “আমি জিন ও মানুষকে একমাত্র আমার এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” [সূরা যারিয়াত: ৫৬] একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত তখনই হবে যখন তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক মুক্ত হবে।
২. সকল আসমানি কেতাবের নাজিল: তওরাত সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “আমি মূসাকে নির্দেশনাবলীসহ প্রেরণ করেছিলাম যে, স্বজাতিকে অন্ধকার (শিরক) থেকে আলোর (তাওহীদ) দিকে আনয়ন করে।” [সূরা ইবরাহীম: ৫] কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: "এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি- যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার (শিরক) থেকে আলোর (তাওহীদ) দিকে বের করে আনেন।" [সূরা ইবরাহীম:১]
৩. সকল রসূলগণের প্রেরণ: আল্লাহ তা'আলা বলেন: "আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর এবাদত (তাওহীদ প্রতিষ্ঠা) কর এবং তাগুত (শিরক) থেকে দূরে থাক।” [সূরা নাহাল: ৩৬]
৪. সকল নবী-রসূলগণের মূল দা'ওয়াত: আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “আপনার পূর্বে প্রেরিত সকল রসূলকে এই ঐশী বাণী করা হয়েছিল যে, আমি ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ- উপাস্য নেই। অতএব, একমাত্র আমারই এবাদত কর।” [সূরা আম্বিয়া: ২৫]
৫. কুরআনের সর্বপ্রথম নির্দেশ তাওহীদ এবং নিষেধ শিরক: আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “হে মানজ জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা বাকারা: ২১] আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “অতএব, আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকেও সমকক্ষ (শরিক) করো না। বস্তুত: এসব তোমরা জান।” [সূরা বাকারা: ২২]
৬. তাওহীদ হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম মা'রূফ তথা সৎকাজ আর শিরক হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য মুনকার তথা অসৎ কাজ।
৭. তাওহীদ হলো জানার ও করণীয় সবচেয়ে বড় ফরজ আর শিরক হলো জানার ও বর্জনীয় সবচেয়ে বড় ফরজ।
৮. সমস্ত কুরআনের অর্ধেক তাওহীদ ও অর্ধেক শিরকের আলোচনা। যেমন: তাওহীদ কি, তাওহীদপন্থী কারা, তাদের দুনিয়ায় করণীয় কি, তাদের কষ্ট ও মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই ও বিজয় এবং পরকালে পরম সুখের জান্নাত। আর শিরক কি, মুশরিকের পরিচয়, দুনিয়ায় তাদের পরাজয় এবং আখেরাতে জাহান্নাম ইত্যাদি।
৯. কুরআনুল কারীমে সূরা আন'আমে আল্লাহ দশটি নির্দেশের সর্বপ্রথম নির্দেশ করেছেন তাওহীদের আর নিষেধ করেছেন শিরকের। [সূরা আন'আম: ১৫১-১৫২]
১০. রসূলুল্লাহ (ﷺ) সর্বপ্রথম তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের দাওয়াত আরম্ভ করেন। তিনি মক্কায় ১৩ বছর শুধু "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর দাওয়াত দেন। আর এ দাওয়াত তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করার জন্যে ইহুদি-খ্রীষ্টানদের প্রতি অভিশাপ করেন। [বুখারী হা: নং ১২৪৪ মুসলিম হা: নং ৮২৩]
১১. রসূলুল্লাহ (ﷺ) কোথাও কোন ইসলামের আহবানকারী ও প্রচারক প্রেরণ করার সময় সর্বপ্রথম তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার জন্যে নির্দেশ করতেন। যেমন নির্দেশ করেছিলেন মু'আয ইবনে জাবাল [] কে ইয়ামেনে প্রেরণের সময়। [বুখারী: হা: ১৪০১ মুসলিম হা: ২৭]
১২. রসূলুল্লাহ []-এর দৈনন্দিনের এবং বিভিন্ন সময়ের পঠনীয় জিকির ও দোয়ার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায় যে, সবগুলোতে তাওহীদ ও শিরকের কথা রয়েছে। যেমন: প্রতি ফরজ সালাতের পর, সকাল-সন্ধ্যায়, হজ্ব-উমরার তালবিয়াতে, সাফা-মারওয়া পাহাড়ে, আরাফাতের ময়দানে, শহর-গ্রাম ও বাজারে প্রবেশের দোয়াতে: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লাা শারীকা লাহ্ --।"
১৩. রসূলুল্লাহ [] প্রতি রাতের শেষ ও দিনের শুরু করতেন তাওহীদ দ্বারা। তিনি রাতের শেষে বেতরের সালাতে পড়তেন সূরা কাফিরুন ও সূরা এখলাস। আর দিনের শুরু ফজরের দু'রাকাত সুন্নতেও পড়তেন সূরা কাফিরুন ও সূরা এখলাস। অনুরূপ তিনি দিনের মধ্যভাগে মাগরিবের সুন্নতে উক্ত সূরা দু'টি পড়তেন। এ ছাড়া তওয়াফের পর দু'রাকাত সালাতে ও ঘুমানোর সময়ও সূরা দু'টি পড়তেন। এ সূরা দু'টিতে সংক্ষিপ্তভাবে তাওহীদে উলুহিয়া ও রবুবিয়ার আলোচনা রয়েছে।
১৪. রসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে তয়েফবাসী চরম দুর্ব্যবহার ও মারধর করার ফলে তিনি মাটিতে ঢলে পড়েন। অবস্থা স্বাভাবিক হলে জিবরাঈল ফেরেশতা পাহাড়ের ফেরেশতাকে সঙ্গে নিয়ে এসে যখন বললেন: আপনি চাইলে 'আখশাবাইন' পর্বতদ্বয় (মক্কার সবচেয়ে বড় দু'টি পর্বত) দ্বারা কাফের-মুশরিকদের ধ্বংস করে দেই। এমন কঠিন মুহূর্তে 'রাহমাতুল লিল'আলামীন' ﷺ তাঁর দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য প্রকাশ করে বলেন: “না, তাদেরকে ধ্বংস করতে হবে না। আমি আশা করি আল্লাহ তাদের ঔরষ থেকে এমন এক জাতি বের করবেন যারা একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।” [বুখারী হা: ২৯৯২ মুসলিম হা:৩৩৩২]
১৫. তাওহীদ হলো জান্নাতে প্রবেশের মূল ভিত্তি আর শিরক হলো জাহান্নামে প্রবেশের মূল চাবিকাঠি।
১৬. মানুষের তাওহীদ-শিরক জানার প্রয়োজন তাদের পানাহারের চাইতেও বেশি; কারণ পানাহার না করলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তাওহীদ-শিরক না জানলে রুহ-আত্মা মারা যায়।
১৭. তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের জন্যই জিহাদের মত একটি কঠিন ও ফজিলতপূর্ণ এবাদতকে শরয়িতে বিধিবিধান করা হয়েছে।
১৮. মানব জীবনের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ও আরাম আয়েশ নির্ভর করে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের উপর।
১৯. মানব জাতির দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ হয় ও সুখ-শান্তি নির্ভর করে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং শিরক ও তার সকল মাধ্যম মিটানোর উপর।
২০. তাওহীদের দ্বারা জমিনে ও বান্দার কল্যাণ ও শিরকের দ্বারা জমিনে ও বান্দার বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
২১. যতক্ষণ তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং শিরক থেকে না বাঁচা যাবে ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে নাজাত পাওয়া যাবে না।
২২. যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ তাওহীদের প্রতিষ্ঠা ও পূর্ণ শিরকের অপনোদন না হবে ততক্ষণ কোন আমলই আল্লাহ তা'য়ালার নিকট কবুল হবে না।
২৩. আল্লাহ তা'য়ালা সূরা নূরের ৫৫ নং আয়াতে মুমিনদের ঈমান ও সৎ আমলের শর্তে যে খেলাফাত দান ও পছন্দনীয় দ্বীনকে সুদৃঢ় এবং ভয়-ভীতির পরিবর্তে শান্তি দানের ওয়াদা করেছেন তার উদ্দেশ্য তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরকের অপনোদন। তাই আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: "তারা একমাত্র আমারই এবাদত করবে এবং আমার সাথে কোন কিছুকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।" [সূরা নূর: ৫৫]
২৪. আল্লাহ তা'য়ালা সূরা শূরার ১৩ নং আয়াতে নূহ [], ইবরাহিম [], মূসা [], ঈসা [] ও মুহাম্মদ [] পাঁচ জন উলূল 'আজম রসূলের যে দ্বীন কায়েমের অসিয়ত উল্লেখ করেছেন সেটিও তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরকের অপনোদন। কারণ দ্বীন অর্থ আল্লাহ তা'য়ালার আনুগত্য। আর তাঁর আনুগত্য হয় তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের দ্বারা। এ কথা আয়াতের শেষাংশে উল্লেখ হয়েছে: "আপনি মুশরিকদের যে বিষয়ের প্রতি আমান্ত্রণ জানান, তাদের কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়।" [সূরা শূরা: ১৩] আর নিঃসন্দে মুশরিকদের নিকট কঠিন জিনিস ছিল রসূলুল্লাহ []-এর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর দাওয়াত। যার অর্থ তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাত করা।
📄 তাওহীদের ফজিলত
১. নিরাপত্তা ও হেদায়েত লাভ: আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: "যারা নিজেদের ঈমানকে জুলুমের সাথে (শিরকের সাথে) সংমিশ্রিত করেনি প্রকৃতপক্ষে তারাই শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত।” [সূরা আন'আম: ৮২]
২. জান্নাত লাভ: উবাদাহ ইবনে সামেত [রা.] হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ [সা.] বলেছেন: "যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই, তিনি একক তাঁর কোন শরিক নেই এবং মুহাম্মদ [] তাঁর বান্দা ও রসূল। আর 'ঈসা [] আল্লাহ তা'য়ালার বান্দা ও রসূল এবং তাঁর বাণী যা মরিয়ম (রা:)-এর গর্ভে নিক্ষেপ করেছিলেন ও আল্লাহ তা'য়ালার রূহ। জান্নাত-জাহান্নাম সত্য। (এ সকল সাক্ষ্য প্রদান করলে) আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন চাহে সে যে কোন আমল করুক না কেন।" [বুখারী ও মুসলিম]
৩. জাহান্নাম হারাম: ইতবান বিন মালেক [4]-এর বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে 'লাা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়বে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন।” [বুখারী ও মুসলিম]
৪. আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা: আবু যার গেফারী [] থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ [] কে বলতে শুনেছি যে: “আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: “যে ব্যক্তি পৃথিবী বরাবর পাপ নিয়ে আমার সাথে সাক্ষাত করবে যাতে আমার সঙ্গে কোন কিছুকে শরিক করেনি। আমি তার সাক্ষাত করব অনুরূপ (পৃথিবী) বরাবর ক্ষমা নিয়ে।” [মুসলিম]
📄 এবাদতের ক্ষেত্রে মানুষের প্রকার
১. না আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত করে আর না অন্য কারো এবাদত করে। (নাস্তিক)
২. আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত করে এবং অন্যেরও এবাদত করে। (মুশরিক)
৩. আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত করে না বরং অন্যের এবাদত করে। (মুশরিক)
৪. একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত করে আর অন্য কারো এবাদত করে না। (মুমিন)
উপরের তিন প্রকার মানুষের ঠিকানা হবে জাহান্নাম আর শেষ প্রকারের স্থান হবে জান্নাত।
📄 তাওহীদ ও তার প্রকার
তাওহীদের সংজ্ঞা: ‘তাওহীদ’ আরবী শব্দ যার আভিধানিক অর্থ কোন কিছুকে একক সাব্যস্ত করা। আর ইহা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্যে প্রযোজ্য নয়; কারণ আল্লাহ ব্যতীত সবকিছুর সদৃশ ও দ্বিতীয় রয়েছে。
আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “তাঁর কোন সদৃশ নেই। তিনি শুনেন ও দেখেন।” [সূরা শূরা:১১]
ইসলামের পরিভাষায় তাওহীদ হচ্ছে: আল্লাহকে তাঁর রবুবিয়াতে (কাজে), আসমা ও সিফাতে (নামসমূহ, গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যে) একক সাব্যস্ত করা এবং উলুহিয়াতে তথা বান্দার সকল এবাদت একমাত্র তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করাকে তাওহীদ বলে। তাওহীদকে জানা, অন্তরে তা দৃঢ় বিশ্বাস করা। ও সর্বপ্রকার কথা, কাজে, এবাদতে ও অবস্থায় তা বাস্তবায়ন করা ফরজ।
তাওহীদের প্রকারসমূহ: তাওহীদুর রাবুবিয়্যাহ। তাওহীদুল আসমা ওয়াসিফাত। তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ।
প্রথমত: তাওহীদুর রাবুবিয়্যাহ: সংজ্ঞা: তাওহীদুর রাবুবিয়্যাহ হলো আল্লাহ তা'য়ালার কাজে তাঁকে একক সাব্যস্ত করা। যেমন: সৃষ্টি করা, রাজত্ব পরিচালনা করা ও মহা ব্যবস্থাপনা। তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা, জীবন ও মরণদাতা, লাভ ও ক্ষতির ইত্যাদির একমাত্র তিনিই মালিক।
তাওহীদের এ প্রকারটি রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগের মুশরেকরা স্বীকার করেছিল। কিন্তু ইহা তাদেরকে ইসলামে প্রবেশ করায়নি; বরং রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং আল্লাহ তাদেরকে হত্যা করা ও সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করা হালাল করে দিয়েছিলেন।
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: "জেনো রাখো, সৃষ্টির একমাত্র কর্তা তিনিই আর হুকুমের একমাত্র মালিক তিনিই।" [সূরা আ'রাফ: ৫৪] আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন: "এবং আসমান-জমিনের মালিকত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্যই।” [সূরা জাছিয়া: ২৭] আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন: “তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, আকাশসমূহ ও জমিন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে: আল্লাহ।” [সূরা লোকমান: ২৫]
আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন: “সকল প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহর জন্যই।” [সূরা ফাতিহা: ১]
দ্বিতীয়ত: তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ:
সংজ্ঞা: তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ হলো: সকল প্রকার এবাদত একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার জন্য নির্দিষ্ট করা। যেমন: দোয়া, জবাই, নজর-মান্নত, সালাত, কুরবানি ইত্যাদি।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য এবাদত না করা, চাই কোন সম্মানিত ফেরেশতা হোক বা কোন নবী-রসূল কিংবা অলি-বুজুর্গ হোক। একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার জন্যই সকল প্রকার এবাদত করাই বান্দার প্রতি সবচেয়ে বড় এবং সর্বপ্রথম ফরজ।
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: "আল্লাহর এবাদত করবার ও তাগুতকে বর্জন করবার নির্দেশ দিবার জন্যেই আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রসূল পাঠিয়েছি।” [সূরা নাহল: ৩৬]
আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন: "বল! তিনিই আল্লাহ একক।” [সূরা এখলাস: ১]
তৃতীয়ত: তাওহীদুল আসমা ওয়াসিফাত:
ক) "ইসম” শব্দের বহুবচন আসমা।' অর্থাৎ নামসমূহ যেমন: আররহমান, আররহীম, আল-কু-হির, আল-কুদদূস ইত্যাদি।
খ) “সিফাহ” শব্দের বহুবচন সিফাত অর্থাৎ গুণাবলী ও বৈশিষ্ট।
গ) তাওহীদুল আসমা ওয়াসসিফাতের সজ্ঞা: আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কিতাব কুরআনুল কারীমে এবং নবী ﷺ তাঁর বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে যে সকল আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ, মহান গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোকে হুবহু সাব্যস্ত করা। আর যে সকল নামসমূহ, গুণাবলী ওবৈশিষ্টকে অস্বীকার করেছেন সেগুলোকে অস্বীকার করা। আর ইহা কারো সাথে কোন প্রকার সদৃশ বা অর্থের পরীবর্তন ঘটানো কিংবা ইচ্ছামত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা অথবা অর্থ বিলুপ্ত করা ছাড়াই হতে হবে। আর কোন ধরণ ও আকৃতি ছাড়াই সাব্যস্ত করতে হবে। ইহাই সঠিক আকিদা এ ছাড়া সবই বাতিল বিশ্বাস।
আল্লাহ তা'য়ালার গুণাবলী দুই প্রকার:
(ক) সিফাত যাতীয়্যাহ তথা সত্ত্বীয় গুণাবলী: যেগুলো সর্বদা তাঁর সাথে মিলিত। যেমন: জ্ঞান, শক্তি, শুনা, দেখা, কথোপকথন ইত্যাদি। এর মধ্যে আবার কিছু আছে যেগুলো "সিফাত খাবারিয়্যাহ” তথা আল্লাহ তা'য়ালা যেগুলো সিফাতের খবর দিয়েছেন। যেমন: আল্লাহর চেহারা, তাঁর দু'হাত ও তাঁর দু'চোখ ইত্যাদি।
(খ) সিফাত ফে'লীয়্যাহ তথা কার্যীয় গুণাবলী: যেগুলো আল্লাহ তা'য়ালার ইচ্ছার সাথে সম্পর্ক। তিনি চাইলে করেন আর না চাইলে করেন না। যেমন: দুনিয়ার আসমানে 'নুজুল' তথা অবতরণ, আরশের উপর 'ইসতিওয়াা' তথা ওপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে থাকা ইত্যাদি।
নোট:
আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত একটি আকিদা আছে যে, আল্লাহ তা'য়লা সর্বত্র বিরজমান। এর অর্থ যদি এ হয় যে, আল্লাহর শক্তি, দৃষ্টি, সাহায্য, মহা ব্যবস্থাপনা, প্রতিপালন ইত্যাদি সর্বত্র বিরাজমান তাহলে আকিদা সঠিক। আর যদি এর অর্থ এ হয় যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালার যাত তথা সত্ত্বা সর্বত্র বিরাজমান তাহলে ইহা বাতিল আকিদা; কারণ আল্লাহ তা'য়ালা সপ্তম আকাশে আরশে আযীমের উপরে আছেন বিশ্বাস করা ফরজ। এর বিপরীত আকিদা পোষণ করা কুফরি।
এছাড়াও আরো একটি আকিদা প্রচলিত আছে যে, আল্লাহ তা'য়ালা নিরাকার। এর অর্থ যদি এ হয় যে, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কোন সৃষ্টির সদৃশ আকার নয় তাহলে আকিদা সঠিক। কারণ এ বিশ্বাস করা ফরজ যে, আল্লাহ তা'য়ালার স্বকার তাঁর মহত্ত্ব ও মর্যাদার জন্য উপযুক্ত সিফাত তথা গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য দ্বারা ভূষিত। আর যদি আল্লাহ তা'য়ালার নিজস্ব উপযুক্ত সিফাত দ্বারা যে তাঁর স্বকার আছে তা অস্বীকর করে বলে: "আল্লাহ নিরাকার" তাহলে ইহা বাতিল আকিদা; কারণ এর দ্বারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হবে। এ ছাড়া আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সৃষ্টির সাথে সদৃশ ও রূপকে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁর নিজস্ব স্বকারকে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: "কোন কিছুই তাঁর (আল্লাহর) অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন।” [সূরা শূরা: ১১]
এ আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তা'য়ালা সৃষ্টির সাথে তাঁর অনুরূপ ও সদৃশকে অস্বীকার করেছেন। আর দ্বিতীয়াংশে নিজস্ব দু'টি গুণ শুনেন ও দেখেন সাব্যস্ত করে নিজস্ব স্বকার সাব্যস্ত করেছেন। ইহাই হচ্ছে সকল ইমামগণের আকিদা। এর বিপরীত আকিদা আহলুসুন্নাহ ওয়ালজামাতের পরিপন্থী বাতিল আקיদা।
আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে ৩টি দল ভ্রষ্ট
প্রথম দল: মু'য়াত্তেলা তথা আল্লাহর গুণাবলী ও বৈশিষ্টকে অস্বীকারকারী দল, যারা আল্লাহর সকল নামসমূহ, গুণাবলী ও বৈশিষ্টকে অথবা কিছুকে অস্বীকার করে। তাদের ধারণা যে, ইহা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করলে সৃষ্টির সঙ্গে সদৃশ অপরিহার্য হয়ে পড়বে যা জায়েয নয়। তাদের এ ধারণা কয়েকটি কারণে বাতিল:
১. এ বিশ্বাসের কারণে আরো অনেকগুলো বাতিল জিনিস অপরিহার্য হয়ে যাবে। যেমন: আল্লাহর কুরআনের বাণীসমূহে বৈপরীত্য দেখা দেবে; কেননা আল্লাহ তা'য়ালা নিজের জন্য নামসমূহ ও গুণাবলী এবং বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করেছেন এবং অন্য দিকে তাঁর সদৃশকে অস্বীকার করেছেন। অতএব, উহা সাব্যস্ত করা যদি সদৃশ্যতা অপরিহার্য হয়, তবে আল্লাহর বাণীর মধ্যে পরসস্পর বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং এক অংশ অন্য অংশকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে যা মোটেই সম্ভব নয়।
২. দু'টি জিনিস কোন নামে বা গুণে কিংবা বৈশিষ্ট্যে এক হওয়াটা একটি অপরটির অনুরূপ হতেই হবে এমন কথা জরুরি নয়। আপনি দু'জন মানুষকে দেখুন, তারা দু'জনেই মানুষ, দু'জনেই শুনেন, দু'জনেই দেখেন, দু'জনেই কথা বলেন। কিন্তু এর জন্য অপরিহার্য না যে, দু'জনেই মানবতায়, শ্রবণে, দৃষ্টিপাতে ও কথোপকতনে একে অপরের সদৃশ হতেই হবে। আপনি জীবজন্তু দেখবেন তাদের হাত, পা ও চোখ রয়েছে কিন্তু একই জাতির হলেই যে, হাতে, পায়ে ও চোখে সদৃশ হওয়া অপরিহার্য তা নয়। সুতরাং সৃষ্টি জিবের মধ্যে নামে বা গুণে কিংবা বৈশিষ্ট্যে মিল থাকার পরেও যখন অদৃশ্যতা সুস্পষ্ট তাহলে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য হওয়াটা আরো বড় ও সুস্পষ্ট।
দ্বিতীয় দল: মুশাব্বিহা ও মুজাস্সামা তথা সদৃশকারী দল, যারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী এবং বৈশিষ্টকে সৃষ্টির সাথে সদৃশ সাব্যস্ত ক'রে। তাদের ধারণা হলো যে, ইহাই দলিলসমূহের দাবি; কারণ আল্লাহ তা'য়ালা বান্দাকে এমন বিষয়ে সম্বোধন করেন যা তাদের বিবেক সম্মত। তাদের এ ধারণা কয়েকটি কারণে বাতিল:
১. আল্লাহ তা'য়ালা সৃষ্টির সদৃশ হওয়া এমন একটি জিনিস যা বিবেক ও শরিয়ত বাতিল বলে প্রমাণ করে। আর স্মরণ রাখতে হবে যে, কুরআন ও সুন্নাহ কোন বাতিল সম্মত জিনিস হতে পারে না।
২. আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে এমন বিষয়ের সম্বোধন করেন যা প্রকৃত অর্থের দিক থেকে বোধ সম্মত। কিন্তু তার হকিকত ও প্রকৃত জ্ঞান যা তাঁর সত্ত্বা ও গুণাবলী এবং বৈশিষ্টের সাথে সম্পর্ক একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। অতএব, যদি আল্লাহ তাঁর জন্য সাব্যস্ত করেন যে, তিনি শ্রবণকারী তাহলে প্রকৃত অর্থের দিক থেকে শ্রবণের অর্থ জানা ব্যাপার। কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালার শ্রবণ কেমন এর হকিকত অজানা; কারণ শ্রবণের হকিকত সৃষ্টি জীবের মধ্যেও পার্থক্য হয়ে থাকে। সুতরাং স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্যটা আরো সুস্পষ্ট ও বড়।
অতএব, আল্লাহ তা'য়ালা যদি নিজের সত্ত্বা সম্পর্কে খবর দেন যে, তিনি আরশের উপরে আছেন তাহলে আসল অর্থের দিক থেকে ইহা জানা কথা। কিন্তু তাঁর বিদ্যমান থাকার প্রকৃত অবস্থা অর্থাৎ কিভাবে আছেন তা অজানা; কেননা বিদ্যমান থাকার হকিকত সৃষ্টির মধ্যেও আছে। যেমন: একটি চেয়ারের উপর সমাসীন হওয়াটা এবং একটি দ্রুত ভাগন্ত উটের উপর সমাসীনের মত নয়। তাহলে বুঝা গেল যে, যখন সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে তাহলে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য থাকাটা সুস্পষ্ট ও বড়।
তৃতীয় দল: মুওয়াওবিলা তথা আল্লাহর সিফাতগুলোকে তা'বীল অর্থাৎ-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকারী দল। যেমন: আল্লাহর হাত মানে কুদরতী হাত, আল্লাহর চোখ মানে কুদরতী চোখ এবং ইস্তাওয়া অর্থ ইস্তাওলা ইত্যাদি। তাদের এ আকিদা কয়েকটি কারণে বাতিল:
১. এর দ্বারা প্রকৃত অর্থ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
২. এর দ্বারা আল্লাহকে তাঁর প্রকৃত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য হতে শূন্য করা হয়।
৩. এর দ্বারা সঠিক আকিদার স্থানে বাতিল আקיদার জন্ম নেই।
মুওয়াত্তেলা দল শিরক থেকে বাঁচার জন্য অস্বীকার করে কুফরি করেছে। আর মুশাব্বিাহা দল সাব্যস্ত করতে গিয়ে শিরকে পতিত হয়েছে। আর মুওয়াওবিলা দল তা'বীল (ব্যাখ্যা) করতে গিয়ে মূল জিনিসকে অস্বীকার করেছে। আর আহলে সুন্নত ওয়ালজামাত আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলী এবং বৈশিষ্ট্যে তাঁর মহত্ত্ব ও মর্যাদার জন্য যেমন উপযুক্ত হুবহু তাই সাব্যস্ত করে সর্বপ্রকার সমস্যা ও বিপদ হতে মুক্ত রয়েছে।