📄 লেখকের আবেদন
প্রশংসা মাত্রই আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এবং তাঁর পরিবার ও সাহাবাগণের প্রতি বর্ষিত হোক।
প্রতিটি নবী-রসূলের দা'ওয়াত ও তাবলীগের উসুল হলো চারটি: তাওহীদ, রেসালাত, তাকওয়া ও আখেরাত। প্রথমটিই হলো তাওহীদ কায়েম করা।
তাওহীদ হচ্ছে মানুষের দুই জগতের শান্তির চাবিকাঠি। তাওহীদ ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে নাজাতের কোন উপায় নেই।
বর্তমানে তাওহীদের জ্ঞান না থাকায় মানুষ তার অজান্তে শিরকে পতিত হচ্ছে এবং নিজের দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনের সুখ-শান্তি ধ্বংস করছে।
তাই আমরা সকল প্রকার মানুষকে তাওহীদের জ্ঞান দেয়ার উদ্দেশ্যে "তাওহীদ ও তার উপকারিতা" এই ছোট্ট বইটি উপহার দিচ্ছি।
বইটির প্রথম প্রকাশ করতে পারায় আমরা আল্লাহ তা'য়ালার অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
পাঠক মহোদয় ইহা থেকে উপকৃত হলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে। যাঁরা এ মহৎ কাজে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সকলকে আমাদের সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাই।
পরিশেষে আমাদের নিবেদন এই যে, সংশোধনের কাজ কোন দিনও চূড়ান্ত করা যায় না। অতএব, বইটি পড়ার সময় কোন ভুল-ত্রুটি বা ভ্রম কারো দৃষ্টিগোচর হলে অথবা কোন নতুন প্রস্তাব থাকলে তা আমাদেরকে অবহিত করালে সাদরে গৃহীত হবে। আর পরবর্তী সংস্করণে যথাযথ বিবেচনা করা হবে।
হে আল্লাহ! আমাদের এই মহতী উদ্যোগ ও ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে কবুল করুন। আমীন!
আবু আহমাদ সাইফুদ্দীন বেলাল। আল-আহসা ইসলামিক সেন্টার, বাংলা বিভাগ, সৌদি আরব। ১০/১০/১৪৩২হি: ০৮/০৯/২০১১ ইং
📄 ভূমিকা
আফ্রিকার কোন এক গ্রাম্য এলাকায় একজন ইহুদি পীরে কামেল সেজে বড় আলখেল্লা, টুপি-পাগড়ি পরে সবার প্রিয় হয়ে বসে। সে তাদের সব ব্যাপারে যা ইচ্ছা তাই নির্দেশ করে, আর মূর্খরা সবকিছুই মেনে চলতে থাকে। এমনকি নতুন বউকে বরকত ও লতিফা দেওয়ার নামে সর্বপ্রথম সেই উদ্বোধন করে দিত।
এক পর্যায়ে এক যুবক তার স্ত্রীর উদ্বোধনের ঘটনা সহ্য না করতে পেরে তাকে হত্যা করে ফেলে। যার ফলে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে সকলে মিলে সে যুবককে হত্যা করে দেয়।
এরপর সকল নারীরা মুখ খুললে ভণ্ড দরবেশের সকল ভেদ ফাঁস হয়ে যায় এবং তারা দরবেশকেও হত্যা করে। এবার সকলে দু'জনকে পাশাপাশি কবর দেয়। ঘটনা এখানেই শেষ নয় বরং এরচেয়ে জঘন্য হচ্ছে: সকলে মিলে ঐ যুবকের কবরে তওয়াফ আর ঐ ভণ্ডর করবে গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করা আরম্ভ করে দেয়। ইহাই হলো তাওহীদ ও শিরকের জ্ঞান না থাকার পরিণাম।
📄 তাওহীদ ও শিরকের সম্পর্ক
তাওহীদ আল্লাহ তা'য়ালার পজিটিভ (Positive) তথা ইতিবাচক অধিকার। আর শিরক নেগেটিভ (Negative) তথা নেতিবাচক অধিকার। তাওহীদ প্রতিষ্ঠা অর্থ শিরক বর্জন আর শিরক বর্জন মানে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা।
বিদ্যুতের দু'টি তার যদি নেগেটিভ হয়, তবে বাতি জ্বলবে না। অনুরূপ দু'টি পজিটিভ হলেও জ্বলবে না।
আবার পজিটিভ ও নেগেটিভ একসাথে মিলে গেলে বাতি না জ্বলে আগুন জ্বলবে। মুসলিম জাতি আজ নেগেটিভ (শিরক) ও পজিটিভ (তাওহীদ) এক সাথে মিলিয়ে দিয়েছে, যার ফলে দুনিয়াতে জ্বলছে এবং পরকালেও নিশ্চয় অনন্তকাল ধরে জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। যখন নেগেটিভ ও পজিটিভ যার যার স্থানে থাকবে অর্থাৎ তাওহীদ প্রতিষ্ঠা হবে আর শিরক উৎখাত হবে তখনই দুনিয়া ও আখেরাতে আলোর বাতি জ্বলবে এবং আগুন জ্বলবে না।
📄 তাওহীদ ও শিরকের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব
তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং শিরক উৎখাতের জন্যই হলো:
১. সকল সৃষ্টিকুলের সৃষ্টি: আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: “আমি জিন ও মানুষকে একমাত্র আমার এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” [সূরা যারিয়াত: ৫৬] একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত তখনই হবে যখন তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক মুক্ত হবে।
২. সকল আসমানি কেতাবের নাজিল: তওরাত সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “আমি মূসাকে নির্দেশনাবলীসহ প্রেরণ করেছিলাম যে, স্বজাতিকে অন্ধকার (শিরক) থেকে আলোর (তাওহীদ) দিকে আনয়ন করে।” [সূরা ইবরাহীম: ৫] কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: "এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি- যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার (শিরক) থেকে আলোর (তাওহীদ) দিকে বের করে আনেন।" [সূরা ইবরাহীম:১]
৩. সকল রসূলগণের প্রেরণ: আল্লাহ তা'আলা বলেন: "আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর এবাদত (তাওহীদ প্রতিষ্ঠা) কর এবং তাগুত (শিরক) থেকে দূরে থাক।” [সূরা নাহাল: ৩৬]
৪. সকল নবী-রসূলগণের মূল দা'ওয়াত: আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “আপনার পূর্বে প্রেরিত সকল রসূলকে এই ঐশী বাণী করা হয়েছিল যে, আমি ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ- উপাস্য নেই। অতএব, একমাত্র আমারই এবাদত কর।” [সূরা আম্বিয়া: ২৫]
৫. কুরআনের সর্বপ্রথম নির্দেশ তাওহীদ এবং নিষেধ শিরক: আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “হে মানজ জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা বাকারা: ২১] আল্লাহ তা'য়ালার বাণী: “অতএব, আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকেও সমকক্ষ (শরিক) করো না। বস্তুত: এসব তোমরা জান।” [সূরা বাকারা: ২২]
৬. তাওহীদ হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম মা'রূফ তথা সৎকাজ আর শিরক হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য মুনকার তথা অসৎ কাজ।
৭. তাওহীদ হলো জানার ও করণীয় সবচেয়ে বড় ফরজ আর শিরক হলো জানার ও বর্জনীয় সবচেয়ে বড় ফরজ।
৮. সমস্ত কুরআনের অর্ধেক তাওহীদ ও অর্ধেক শিরকের আলোচনা। যেমন: তাওহীদ কি, তাওহীদপন্থী কারা, তাদের দুনিয়ায় করণীয় কি, তাদের কষ্ট ও মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই ও বিজয় এবং পরকালে পরম সুখের জান্নাত। আর শিরক কি, মুশরিকের পরিচয়, দুনিয়ায় তাদের পরাজয় এবং আখেরাতে জাহান্নাম ইত্যাদি।
৯. কুরআনুল কারীমে সূরা আন'আমে আল্লাহ দশটি নির্দেশের সর্বপ্রথম নির্দেশ করেছেন তাওহীদের আর নিষেধ করেছেন শিরকের। [সূরা আন'আম: ১৫১-১৫২]
১০. রসূলুল্লাহ (ﷺ) সর্বপ্রথম তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের দাওয়াত আরম্ভ করেন। তিনি মক্কায় ১৩ বছর শুধু "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর দাওয়াত দেন। আর এ দাওয়াত তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করার জন্যে ইহুদি-খ্রীষ্টানদের প্রতি অভিশাপ করেন। [বুখারী হা: নং ১২৪৪ মুসলিম হা: নং ৮২৩]
১১. রসূলুল্লাহ (ﷺ) কোথাও কোন ইসলামের আহবানকারী ও প্রচারক প্রেরণ করার সময় সর্বপ্রথম তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার জন্যে নির্দেশ করতেন। যেমন নির্দেশ করেছিলেন মু'আয ইবনে জাবাল [] কে ইয়ামেনে প্রেরণের সময়। [বুখারী: হা: ১৪০১ মুসলিম হা: ২৭]
১২. রসূলুল্লাহ []-এর দৈনন্দিনের এবং বিভিন্ন সময়ের পঠনীয় জিকির ও দোয়ার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায় যে, সবগুলোতে তাওহীদ ও শিরকের কথা রয়েছে। যেমন: প্রতি ফরজ সালাতের পর, সকাল-সন্ধ্যায়, হজ্ব-উমরার তালবিয়াতে, সাফা-মারওয়া পাহাড়ে, আরাফাতের ময়দানে, শহর-গ্রাম ও বাজারে প্রবেশের দোয়াতে: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লাা শারীকা লাহ্ --।"
১৩. রসূলুল্লাহ [] প্রতি রাতের শেষ ও দিনের শুরু করতেন তাওহীদ দ্বারা। তিনি রাতের শেষে বেতরের সালাতে পড়তেন সূরা কাফিরুন ও সূরা এখলাস। আর দিনের শুরু ফজরের দু'রাকাত সুন্নতেও পড়তেন সূরা কাফিরুন ও সূরা এখলাস। অনুরূপ তিনি দিনের মধ্যভাগে মাগরিবের সুন্নতে উক্ত সূরা দু'টি পড়তেন। এ ছাড়া তওয়াফের পর দু'রাকাত সালাতে ও ঘুমানোর সময়ও সূরা দু'টি পড়তেন। এ সূরা দু'টিতে সংক্ষিপ্তভাবে তাওহীদে উলুহিয়া ও রবুবিয়ার আলোচনা রয়েছে।
১৪. রসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে তয়েফবাসী চরম দুর্ব্যবহার ও মারধর করার ফলে তিনি মাটিতে ঢলে পড়েন। অবস্থা স্বাভাবিক হলে জিবরাঈল ফেরেশতা পাহাড়ের ফেরেশতাকে সঙ্গে নিয়ে এসে যখন বললেন: আপনি চাইলে 'আখশাবাইন' পর্বতদ্বয় (মক্কার সবচেয়ে বড় দু'টি পর্বত) দ্বারা কাফের-মুশরিকদের ধ্বংস করে দেই। এমন কঠিন মুহূর্তে 'রাহমাতুল লিল'আলামীন' ﷺ তাঁর দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য প্রকাশ করে বলেন: “না, তাদেরকে ধ্বংস করতে হবে না। আমি আশা করি আল্লাহ তাদের ঔরষ থেকে এমন এক জাতি বের করবেন যারা একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার এবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।” [বুখারী হা: ২৯৯২ মুসলিম হা:৩৩৩২]
১৫. তাওহীদ হলো জান্নাতে প্রবেশের মূল ভিত্তি আর শিরক হলো জাহান্নামে প্রবেশের মূল চাবিকাঠি।
১৬. মানুষের তাওহীদ-শিরক জানার প্রয়োজন তাদের পানাহারের চাইতেও বেশি; কারণ পানাহার না করলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তাওহীদ-শিরক না জানলে রুহ-আত্মা মারা যায়।
১৭. তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের জন্যই জিহাদের মত একটি কঠিন ও ফজিলতপূর্ণ এবাদতকে শরয়িতে বিধিবিধান করা হয়েছে।
১৮. মানব জীবনের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ও আরাম আয়েশ নির্ভর করে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের উপর।
১৯. মানব জাতির দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ হয় ও সুখ-শান্তি নির্ভর করে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং শিরক ও তার সকল মাধ্যম মিটানোর উপর।
২০. তাওহীদের দ্বারা জমিনে ও বান্দার কল্যাণ ও শিরকের দ্বারা জমিনে ও বান্দার বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
২১. যতক্ষণ তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং শিরক থেকে না বাঁচা যাবে ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে নাজাত পাওয়া যাবে না।
২২. যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ তাওহীদের প্রতিষ্ঠা ও পূর্ণ শিরকের অপনোদন না হবে ততক্ষণ কোন আমলই আল্লাহ তা'য়ালার নিকট কবুল হবে না।
২৩. আল্লাহ তা'য়ালা সূরা নূরের ৫৫ নং আয়াতে মুমিনদের ঈমান ও সৎ আমলের শর্তে যে খেলাফাত দান ও পছন্দনীয় দ্বীনকে সুদৃঢ় এবং ভয়-ভীতির পরিবর্তে শান্তি দানের ওয়াদা করেছেন তার উদ্দেশ্য তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরকের অপনোদন। তাই আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন: "তারা একমাত্র আমারই এবাদত করবে এবং আমার সাথে কোন কিছুকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।" [সূরা নূর: ৫৫]
২৪. আল্লাহ তা'য়ালা সূরা শূরার ১৩ নং আয়াতে নূহ [], ইবরাহিম [], মূসা [], ঈসা [] ও মুহাম্মদ [] পাঁচ জন উলূল 'আজম রসূলের যে দ্বীন কায়েমের অসিয়ত উল্লেখ করেছেন সেটিও তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরকের অপনোদন। কারণ দ্বীন অর্থ আল্লাহ তা'য়ালার আনুগত্য। আর তাঁর আনুগত্য হয় তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের দ্বারা। এ কথা আয়াতের শেষাংশে উল্লেখ হয়েছে: "আপনি মুশরিকদের যে বিষয়ের প্রতি আমান্ত্রণ জানান, তাদের কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়।" [সূরা শূরা: ১৩] আর নিঃসন্দে মুশরিকদের নিকট কঠিন জিনিস ছিল রসূলুল্লাহ []-এর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর দাওয়াত। যার অর্থ তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাত করা।