📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 আল্লাহকে দেখা এবং আল্লাহর অবতরণ বিষয়ক আকিদা

📄 আল্লাহকে দেখা এবং আল্লাহর অবতরণ বিষয়ক আকিদা


সিংগায় ফুঁক: ফুঁক দিবেন ফিরিস্তা ইস্রাফিল। বিশুদ্ধ মত হচ্ছে তিনি সিংগায় ফুঁক দিবেন তিনবার।
(১) نفخة الفزع ভীত বিহবল ফুঁক। যার বর্ণনা সূরা আন-নমলে এসেছে, আল্লাহ বলেন: وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللهُ (النمل: ৮৭) 'যেদিন সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, অতঃপর আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করবেন, তারা ব্যতীত নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যারা আছে তারা ভীতবিহবল হয়ে পড়বে।'
(২) সংজ্ঞাহীনতার ফুক: وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللهُ . (الزمر : ৬৮) 'সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে ফলে আসমান ও যমীনে যারা আছে সবাই বেহুশ হয়ে যাবে তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন।' এই ফুৎকারের মাধ্যমে সব কিছু ধ্বংস ও সকল জীবের মৃত্যু হবে এক মাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া।
(৩) পূণরুত্থানের ফুঁক: এ ফুঁকে মানুষ কবর হতে উঠবে আল্লাহ বলেন— ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ ﴿ الزمر : ৬৮ ﴾ 'অতঃপর আবার সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তৎক্ষণাৎ তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে।'
শেষ দুই ফুঁকের মধ্যে দূরত্ব সম্পর্কে রাসূলের হাদীসে বর্ণনা এসেছে: ما بين النفختين أربعون (متفق عليه) 'দুই ফুৎকারের মধ্যে ব্যবধান চল্লিশ' তবে চল্লিশ বছর মাস দিন এ রকম কোন ব্যাখ্যা তিনি দেন নাই এ বিষয় আল্লাহ ভালো জানেন।
(৩) হাশর: মানুষ কবর থেকে দন্ডায়মান হওয়ার পর আরদে মাহশার (জমায়েতের স্থান) এর দিকে নিয়ে যাওয়ার নাম হাশর। وَحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ تُغَادِرُ مِنْهُمْ أَحَدًا ﴿كهف : ৪৭﴾ 'আমি মানুষকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।' قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ ﴿৪৯﴾ لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ ﴿৫০﴾ الواقعة 'বলুন; পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ সবাই একত্রিত হবে এক নির্দিষ্ট সময়ে।' দন্ডায়মানের সময় মানুষ প্রতক্ষ্য করবে যে তারা পরিবর্তিত পৃথিবীতে অবস্থান করছে। আল্লাহ বলেন— يَوْمُ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ وَبَرَزُوا اللَّهَ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ﴿৪৮﴾ إبراهيم 'যে দিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আকাশসমূহকে এবং মানুষ পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে পেশ হবে।'
এখানেই মানুষ অপেক্ষা করবে সিদ্ধান্ত ও রায়ের জন্য। এ স্থানেই হবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফাআত— শাফাআতে উজমা এই শাফাআতই হচ্ছে মাকামে মাহমুদ।
(৪) العرض আল-আরদু বা উপস্থাপন:
উপস্থাপন দুই রকমের হবে: (ক) সকল মাখলুককে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হবে। কারো হিসাব হবে, জিজ্ঞাসাবাদ হবে আবার অনেকের হবে না। আল্লাহ বলেন— وَعُرِضُوا عَلَى رَبِّكَ صَفًّا لَقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ (الكهف: ৪৮) 'তারা আপনার পালনকর্তার সামনে পেশ হবে সারিবদ্ধ ভাবে এবং বলা হবে তোমরা আমার কাছে এসে গেছ যেমন তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম।'
(খ) জাহান্নামকে কাফেরদের সামনে প্রদর্শন এবং কাফেরদেরকে জাহান্নাম প্রদর্শন। আল্লাহ বলেন— وَيَوْمَ يُعْرَضُ الَّذِينَ كَفَرُوا عَلَى النَّارِ أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا . (الأحقاف: ২০) 'যে দিন কাফেরদেরকে জাহান্নামের কাছে উপস্থিত করা হবে সেদিন বলা হবে, তোমরা তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই শেষ করেছ।' وَعَرَضْنَا جَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لِلْكَافِرِينَ عَرْضًا ﴿১০০﴾ الكهف 'সেদিন আমি কাফেরদের কাছে জাহান্নামকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করব।' রাসূল সলালাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেন— يؤتى بجهنم لها سبعون ألف زمام مع كل زمام سبعون ألف ملك يجرونها. (মুসলিম: ৫০৭৬) 'জাহান্নামকে সত্তর হাজার লাগামসহ উপস্থিত করা হবে। প্রত্যেক লাগামের সাথে সত্তর হাজার ফেরেস্তা থাকবে, তারা জাহান্নামকে টেনে আনবেন।'
(৫) জিজ্ঞাসাঃ হাশরের পর হবে জিজ্ঞাসা পর্ব, রাসূলগণও তাদের উম্মতদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও আমানত সম্পর্কে, জিজ্ঞাসা করা হবে উম্মতদেরকেও, আল্লাহ বলেন— فَلَنَسْأَلُنَّ الَّذِينَ أُرْسِلَ إِلَيْهِمْ وَلَنَسْأَلَنَّ الْمُرْسَلِينَ (الأعراف : ৬ ) 'আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রসূল প্রেরিত হয়েছিল এবং আমি অবশ্যই জিজ্ঞেস করব রাসূল গণকে।' আল্লাহ বলেন— فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ﴿ الحجر : ৯২ ﴾ 'অতএব আপনার পালন কর্তার কসম আমি অবশ্যই ওদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব।' এ জিজ্ঞাসাবাদ হলো সিদ্ধান্ত নেয়া ও নথিভূক্ত করার জন্য। অন্য আয়াতে এসেছে কাফেরদের জিজ্ঞেস করা হবে না। উভয় আয়াতের সমাধান হলো কিয়ামতে অনেক গুলো অবস্থান হবে, কোনটিতে জিজ্ঞেস করা হবে কোনটিতে হবে না।
(৬) হিসাব: হিসাব হলো সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে সৃষ্টিজগতের কৃতকর্মের ভালোমন্দের নির্দিষ্টকরণ এবং স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে তাদের ভুলে যাওয়া আমল কে। আল্লাহ তাআলা বলেন: يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا أَحْصَاهُ اللهُ وَنَسُوهُ (المجادلة : ৬) 'যে দিন আল্লাহ তাআলা সকলকে পুনরুত্থিত করবেন, অতঃপর তাদেরকে জানিয়ে দিবেন যা তারা করত। আল্লাহ তাআ'লা তার হিসাব রেখেছেন। আর তারা তা ভুলে গেছে।'
হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে মুমিনদের দুই ভাগ করা হবে। (১) বিনা হিসাব এবং বিনা বিচারে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেমনটি সত্তর হাজার এবং তাদের মতো আরো যারা আছে তাদের সম্পর্কে হাদীসে প্রমাণ আছে। (২) যাদের হিসাব হবে, এরা হল যাদের নেক আমল ও বদ আমলে মিশ্রণ হয়েছে। আর কাফিরদের হিসাব, তাদের কাছে তাদের আমল উপস্থিত ও তাদেরকে ভৎসর্না করার মাধ্যমে হবে। আর এ হিসাব হবে তাদের শাস্তির স্তর বর্ণনার জন্য। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য নয়।

টিকাঃ
১ আন নামল-৮২
২ সূরা: আন-নামল: ৮৭
৩ সূরা: আযযুমার: ৬৮
১ সূরা: যুমার: ৬৮
২ মুত্তাফাকুন আলাইহি
৩ কাহাফ: ৪৭
৪ সূরা: ওয়াক্বিয়া - ৪৯-৫০
৫ ইব্রাহীম : ৪৮
১ সূরা: কাহফ- ৪৮
১ সূরা: আহক্বাফ- ২০
১ সূরা: কাহফ- ১০০
২ মুসলিম: ৫০৭৬
৩ সূরা: আল-আরাফ-৬
৪ সূরা: হিজর- ৯২
১ সূরা: মুজাদালাহ - ৬

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 দাঁড়িপাল্লা ও হাউজ বিষয়ক আকিদা

📄 দাঁড়িপাল্লা ও হাউজ বিষয়ক আকিদা


(৭) মিজান বা পাল্লা: মিজান দ্বারা উদ্দেশ্য হল ঐ মিজান যা দাঁড় করানো হবে কিয়ামত দিবসে বান্দার আমলসমূহ মাপা এবং পৃথক করার জন্য। মাপ হবে হিসাবের পর। মাপ হবে আমলের পরিমাণ প্রকাশ করার জন্য। যাতে ঐ অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ ﴿৪৭ ﴾ أنبياء
'আমি কিয়ামত দিবসে ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করবো। সুতরাং কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয় আমি তা উপস্থিত করবো এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ঠ।'
وَالْوَزْنُ يَوْমَئِذٍ الْحَقُّ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿৮﴾ وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَظْلِمُونَ ﴿৯﴾ أعراف
'আর সেইদিন যথার্থই ওজন হবে। অত:পর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে। এবং যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই এমন যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা তারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করত।'
বিশুদ্ধ কথা হল, ছহিফায় আমল বা আমলের পুস্তিকা তথা মানুষের সকল কর্ম পাল্লাতে মাপা হবে। হাদীস দ্বারা এমনই প্রমাণ পাওয়া যায়।
(৮) আমলের ছহীফা: হিসাব এবং মিজানের পর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আমলের পুস্তিকা দেওয়া হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি পৃথিবীতে তার সকল কর্মের প্রতিবেদন পাবে ও তা গ্রহণ করবে। এবং তা পড়বে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا ﴿১৩﴾ اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا ﴿১৪﴾ إسراء
'আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। কিয়ামতের দিন বের করে দেখাবো তাকে একটি কিতাব যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ঠ।'
يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَى رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ ﴿৬﴾ فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ ﴿৭﴾ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا ﴿৮﴾ (الإنشقاق : ৮-৬)
'হে মানুষ তোমাকে তোমার পালনকর্তা পর্যন্ত পৌছতে কষ্ট স্বীকার করতে হবে। অতঃপর তার সাক্ষাৎ ঘটবে। যাকে আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে তার হিসাব সহজ হয়ে যাবে।'
ফঅ্যাম্মা মান উতিয়া কিতাবাহু বি ইয়ামিনহী... (সূরা হাক্কাহ: ১৯-২১) 'অত:পর যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, নাও, তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে।'
وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهُ ﴿২৫﴾ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهُ ﴿২৬﴾ الحاقة
'যার আমলনামা বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, হায়! আমার যদি আমলনামা না দেওয়া হত, আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব।'
অত:পর প্রত্যেকে আপন গন্তব্যের দিকে যাবে। যাদের আমলনামা ডান হাতে তারা জান্নাতে আর যাদের আমলনামা বাম হাতে তারা আগুনের দিকে। আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি পারাপার হতে সিরাতের উপর দিয়ে। কিয়ামতের ময়দানে হাউজে কাউসার থাকবে যেখান থেকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতদের পানি পান করাবেন।

টিকাঃ
১ সূরা আম্বিয়া-৪৭
২ সূরা আরাফ: ৮-৯
১ সূরা বনি ইসরাইল: ১৩-১৪
২ সূরা হাক্কাহ: ১৯-২১
৩ সূরা: ইনশিক্বাক্ব- ৬-৮
৪ সূরা হাক্কাহ: ২৫-২৬

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 পুলসিরাত বিষয়ক আকিদা

📄 পুলসিরাত বিষয়ক আকিদা


(৯) আসসিরাত বা সেতু: এটা হলো জাহান্নামের উপর নির্মিত সেতু। যার উপর দিয়ে অতিক্রম করবে পৃথিবীর শুরু হতে শেষ পর্যন্ত সকলে। যে অতিক্রম করতে পারবে সে আগুন থেকে নিরাপদ থাকল। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
ويضرب الصراط بين ظهري جهنم فأكون أنا وأمتي أول من يجيز ولا يتكلم يومئذ إلا الرسل ودعوى الرسل يومئذ: سلم سلم وفي جهنم كلاليب مثل شوك السعدان هل رأيتم السعدان ...... (البخاري : ৬৮৫৮)
'জাহান্নামের উপর সেতু নির্মিত হবে। আমি আর আমার উম্মতই প্রথমে এই সেতু অতিক্রম করবো। ঐ দিন রাসূলগণ ছাড়া অন্য কেউ কথা বলবে না। ঐ দিন রাসূলদের আহবান হবে শুধু সাল্লিম, বা শান্তি, রক্ষা কর। জাহান্নামের মধ্যে কালালিব থাকবে সুউদানুনের কাটার মত। সুউদানুন কি দেখেছো? উত্তরে সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ। নবী সা. বললেন, কালালিব হচ্ছে, সুউদানুনের কাটার মত। তবে আল্লাহ তাআলা ছাড়া তার সংখ্যা কত অন্য কেউ বলতে পারবে না। ভয়াবহ সিরাত থেকে মানুষ উদ্ধার হবে একমাত্র তার আমল দ্বারা।'
কালালিব (كلالیب) হচ্ছে কুলুব-এর বহুবচন। অর্থ: মাথা বাঁকানো লোহা বা লোহার হুক। 'সুউদান' একপ্রকার উদ্ভিদ, যার বড় বড় কাঁটা রয়েছে। অন্য হাদীসে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'ঈমানদারগণ চোখের পলকের মত, বিজলির মত, বাতাসের মত, পাখীর মত, দ্রুতগামী ঘোড়ার মত পার হতে থাকবে। কতিপয় নিরাপদে মুক্তি পাবে। কতিপয় আঘাতপ্রাপ্ত হবে, আর কতিপয় জাহান্নামে পতিত হবে। আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমার কাছে এই বার্তা এসেছে যে, সেতুটি চুল থেকেও চিকন আর তরবারীর চেয়েও ধার। এই জাতীয় বিষয়ে নিজেদের মনমত কোন কথা বলা যাবে না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, দুনিয়ার অবস্থা এবং তার বিধানের চেয়ে আখেরাতের বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্নতর। আখেরাতের আলাদা কিছু বৈশিষ্ট ও অবস্থা আছে, যা দুনিয়ার মধ্যে নেই। আর দুনিয়াতেও অনেক আশ্চর্য বিষয় আছে, যেমন শুন্যে পাখীর উড্ডয়ন এবং পানির উপর অবস্থান, এগুলো আশ্চার্যজনক হলেও মানুষ তা বিশ্বাস করে। আর আল্লাহর কুদরত এত যে কোন মাখলুক তা আয়ত্ত করতে অক্ষম।
(১০) আল ক্বানতারাহ: জাহান্নামের উপর নির্মিত সেতুর ভয়াবহতা থেকে আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের মুক্তি দেয়ার পর তারা জান্নাত এবং জাহান্নামের মধ্যখানে কানতারা বা পুলের উপর অবস্থান করবে। সেখানে একে অপর থেকে প্রতিশোধ নিবে। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
يخلص المؤمنون من النار، فيحبسون على قنطرة بين الجنة والنار فيقضي لبعضهم من بعض مظالم كانت بينهم في الدنيا، حتى إذا هذبوا ونقوا أذن لهم في دخول الجنة فوالذي نفس محمد بيده لأحدهم أهدى بمنزله في الجنة منه بمنزله كان في الدنيا. (البخاري: ৬০৫৪)
'আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। অত:পর আটক করবেন জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝখানে ক্বানতারর উপর। এতে একে অপর থেকে জুলুমের প্রতিশোধ নিবে, যা তাদের মধ্যে দুনিয়াতে ছিল। এরপর তারা যখন নির্মল এবং মার্জিত হবে তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। যে জাতে পাকের হাতে মুহাম্মদের জীবন, তার শপথ করে বলছি, তাদের জন্য জান্নাতে এতটুকু স্থান দুনিয়া হতে অনেক শ্রেষ্ঠ।'
এসব মানুষের উপর অত্যাচার করা থেকে বেঁচে থাকা ও দুনিয়াতেই হকুদ্দারের হক আদায়ের দিকে আহবান জানায়।

টিকাঃ
১ বুখারী: ৬৮৫৮
১ বুখারী: ৬০৫৪

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 জান্নাত ও জাহান্নাম বিষয়ক আকিদা

📄 জান্নাত ও জাহান্নাম বিষয়ক আকিদা


(ঘ) জান্নাত এবং জাহান্নাম: এই হল সকল গন্তব্যের শেষস্থান। জান্নাত হলো সম্মানের সর্বোচ্চ স্থান। জাহান্নাম হলো পরিতাপের স্থান। উভয়টি বিদ্যমান আছে। প্রত্যেক স্থানের অধিবাসী সেখানে থাকবে চিরকাল। চির জীবন পাবে, মৃত্যু তাদের স্পর্শ করবে না। মুসলমান পাপী লোক জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে, তাদের গোনাহ অনুযায়ী। যদি আল্লাহ তাদের ক্ষমা না করেন। অত:পর মুক্তি পেয়ে জান্নাতে যাবে। জান্নাত-জাহান্নামের বৈশিষ্টের উপর কোরআন ও হাদীসে বহু জায়গায় বর্ণনা এসেছে, যা সকল মুসলমান জানেন। এরপরও বলতে হয় জান্নাতে আল্লাহ অকল্পনীয় নেয়ামত রাজি রেখেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা হাদীসে কুদসীতে বলেন,
أعدت لعبادي الصالحين، ما لا عين رأت ولا أذن سمعت، ولا خطر على قلب بشر.... (البخاري: ৩০০৫)
'আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত করেছি, যা তাদের চোখে দেখেনি, কানে শোনেনি। কোন মানুষ অন্তরে কখনো কল্পনাও করেনি।' তোমাদের ইচ্ছা হলে পড়— فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ (السجدة: ১৭) "কেউ জানেনা তার কৃতকর্মের জন্য কি কি নয়নপ্রীতিকর প্রতিদান লুকায়ীত আছে।"১
আর জাহান্নাম থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এই সম্পর্কে নবী সা. এর একটি হাদীস যথেষ্ঠ। যাতে বলা হয়েছে:
إن أهون أهل النار عذابا من له نعلان وشراكان من نار يغلي منهما دماغه كما يغلي المرجل ، ما يرى أن أحدا أشد منه عذابا وإنه لأهونهم عذابا. (مسلم: ৩১৪)
'জাহান্নামের শাস্তির দিকে দিয়ে সহজতর শাস্তি ঐ ব্যক্তির হবে, যার পায়ে আগুনের দুইটি পাদুকা ও ফিতা হবে। সেগুলোর তাপে তার মস্তিষ্ক উথলিয়ে যাবে। যেমনিভাবে কড়াইয়ে খাদ্য টগবগ করে ফোটে। এর চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কারো হচ্ছে বলে মনে হবে না। অথচ জাহান্নামীদের মধ্যে তার শাস্তি হচ্ছে সহজতর শাস্তি।'
আজাব এবং পুরস্কার উভয়কে অনুমান করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসটি একটু চিন্তা করি,
يؤتى بأنعم أهل الدنيا من أهل النار فيصبغ في النار صبغة ثم يقال : يا بن آدم هل مر بك نعيم قط ؟ فيقول: لا والله يا رب ويؤتى بأشد الناس بؤسا في الدنيا من أهل الجنة فيصبغ صبغة في الجنة فيقال: يا ابن آدم هل رأيت بؤسا قط هل مربك من شدة قط ؟ فيقول لا والله يا رب ما رأيت بؤسا قط ولا مر بي من شدة قط. (مسلم : ৫০২১)
'দুনিয়াতে সবচে সুখী ব্যক্তি, অথচ আজ সে জাহান্নামী। তাকে উপস্থিত করা হবে। আর জাহান্নামে একবার মাত্র তাকে চুবানো হবে। অত:পর জিজ্ঞেস করা হবে, তোমার উপর কি সুখের কোন কাল অতিবাহিত হয়েছিল? সে বলবে, না, হে আল্লাহ! কখনো অতিবাহিত হয়নি। অত:পর দুনিয়াতে সবচে বেশী দূদর্সা, অভাবগ্রস্থ ব্যক্তি আজ সে জান্নাতি তাকেও উপস্থিত করা হবে এবং জান্নাতের মধ্যে একবার মাত্র আবগাহন করানো হবে। অত:পর তাকে জিজ্ঞেসা করা হবে হে বনী আদম! তোমার উপর কি দুঃখের কোন কাল অতিবাহিত হয়েছিল? সে বলবে, হে আল্লাহ! না দুঃখ আমাকে কখনো স্পর্শ করেনি। আর আমি কখনো দুঃখ দেখেনি।'

টিকাঃ
১ সূরা সেজদা: ১৭, বুখারী: ৩০০৫
২ মুসলিম: ৩১৪
১ মুসলিম: ৫০২১

ফন্ট সাইজ
15px
17px