📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা

📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা


ইসলামের গোড়া পত্তন হয়েছে শিরকের কলঙ্ক ও পৌত্তলিকতার নোংড়ামী মুক্ত খাঁটি, নিভের্জাল তাওহিদ তথা একত্ববাদের উপর। যার রূপকার لا إله إلا الله محمد رسول الله এর শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান।
لا إله إلا الله এর শাহাদাতের উদ্দেশ্য: বিনয়-নম্র ভাবে নিজেকে আল্লাহর সমীপে সপে দেয়া, তার বশ্যতা মেনে নেয়া। তিনি এক তার কোন শরীক নেই, এটা ঘোষণা দেয়া।
محمد رسول الله এর শাহদাতের উদ্দেশ্য: নিজেকে সপে দেয়ার পদ্ধতি ও এবাদতের বিশদ বর্ণনা মুহাম্মদ সা. এর নিকট হতে গ্রহণ করা। উভয় শাহাদাতের মৌখিক উচ্চারণ ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামকে আলিঙ্গন করার বহিঃপ্রকাশ।
ক্বিয়ামতের দিন দুইটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত কোন আদম সন্তান স্বীয় অবস্থান ত্যাগ করতে পারবে না। প্রথম প্রশ্ন: তোমরা কার এবাদত করতে? দ্বিতীয় প্রশ্ন: রসূল সা.কে কি জাওয়াব দিয়েছ? প্রথম প্রশ্নের উত্তর: ইলম তথা আল্লাহর পরিচয় লাভ, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আমলের মাধ্যমে لا إله إلا الله এর বাস্তবায়ন।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: ইলম তথা রসূল সা. এর পরিচয় লাভ, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আনুগত্যের মাধ্যমে محمد رسول الله এর বাস্তবায়ন।
لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদানের তাৎপর্য: সংবেদনশীল, তাৎপর্যপূর্ণ এ সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ হল: 'সত্যিকারার্থে আল্লাহ ছাড়া কেউ এবাদতের উপযুক্ত নয়। যেহেতু একমাত্র আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকর্তা, অধিপতি, রিযিকদাতা, কল্যাণ সাধনকারী, ক্ষতিসাধনকারী ও পরিচালনাকারী, সেহেতু আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য বান্দা স্বীয় নিবেদন, আশা, ভয়, মহব্বত, মীমাংসা, ভরসা এবং সমস্ত কর্মকান্ডের ব্যাপারে একমাত্র তার শরণাপন্ন হবে, অন্য কারো নয়।
শাহাদাতের মূল ভিত্তি: শাহাদাত বা لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য মূল দুইটি ভিত্তির উপর নির্ভরশীল— ১. প্রত্যাখ্যান। ২. স্বীকৃতি প্রদান।
لا إله: প্রত্যাখ্যান। অর্থাৎ এবাদতের উপযুক্ত যে কোনো উপাস্যের অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা, একমাত্র আল্লাহ তাআলা ব্যতীত। إلا الله: স্বীকৃতি প্রদান। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই এবাদতের উপযুক্ত অন্য কেউ নয়, এর স্বীকৃতি প্রদান করা।
لا إله إلا الله এর শর্ত সমূহ: আলোচিত কালেমায়ে তাওহিদ জান্নাতে প্রবেশের চাবি স্বরূপ, জাহান্নাম তাতে মুক্তির ঢাল স্বরূপ। এরশাদ হচ্ছে— من مات وهو يعلم أن لا إله إلا الله دخل الجنة. “যে لا إله إلا الله (অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই) এর অর্থ, তাৎপর্যের জ্ঞান নিয়ে মৃত্যু বরণ করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” রসূল সা. আরো বলেন— إن الله حرم على النار من قال لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله. “অবশ্যই আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে لا إله إلا الله কালিমাটি পাঠ করেছে।” আফসোস! অনেক মানুষ কালেমায়ে শাহাদাত শুধু মুখে উচ্চারণ করে পরমানন্দে নিশ্চিন্ত বসে আছে, অথচ এর শর্ত, এর দাবী বাস্তবায়ন যে কত অপরিহার্য তা একেবারে বেমালুম ভুলে আছে। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ.কে প্রশ্ন কর হয়েছিল, أليس لا إله إلا الله مفتاح الجنة؟ قال: بلى، ولكن ما من مفتاح إلا وله أسنان، فإن جئت بمفتاح له أسنان فتح لك، وإلا لن يفتح لك. لا إله إلا الله কি জান্নাতের চাবি নয়? তিনি উত্তর দিলেন— অবশ্যই। তবে প্রতিটি চাবির কিন্তু দাঁত থাকে। যদি তুমি দাঁত আছে এমন চাবি নিয়ে আস, তোমাকে দরজা খুলে দেয়া হবে। অন্যথায় দরজা খুলে দেয়া হবে না।
কতেক প্রজ্ঞাময় ওলামায়ে কেরাম নিম্নের পংক্তির মাধ্যমে لا إله إلا الله এর শর্তগুলো একত্রিত করে বর্ণনা করে দিয়েছেন।
علم يقين وإخلاص وصدقك محبة وانقياد والقبول لها.
وزيد ثامنها الكفران منك بما سوى الإله من الأوثان قد ألها.
১. ইলম। ২. দৃঢ় বিশ্বাস। ৩. ইখলাছ। ৪. সততা আন্তরিকতা। ৫. ভালবাসা। ৬. আত্মসমর্পণ। ৭. لا إله إلا الله কে মনে প্রাণে গ্রহণ করা। ৮. আল্লাহর বিপরীতে উপাস্য সকল মূর্তি পত্যাখ্যান করা।
আটটি মূল ভিত্তির উপর সামান্য আলোকপাত : ১. এই কালেমার অর্থ, আবেদন ও দাবী সর্ম্পকে জ্ঞান অর্জন করা, অজ্ঞতা পরিহার করা:
বান্দাকে অবশ্যই জানতে হবে لا إله إلا الله (প্রত্যাখ্যান ও গ্রহণ) অস্বীকৃতি ও স্বীকৃতি দুইটি বিষয়ের সমন্বয়। এই কালিমার দাবি হচ্ছে— আল্লাহ ছাড়া যে কোন জিনিসের এবাদতের উপযুক্ততা প্রত্যাখ্যান করা এবং একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য স্বীকৃতি প্রদান করা। এরশাদ হচ্ছে— فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ. (سورة محمد : ১৯) 'জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ত্রুটির জন্যে।'১ রসূল সা. বলেছেন— مَن مَّاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَن لَّا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ. 'যে ব্যক্তি لا إله إلا الله এর তাৎপর্য ও অর্থ জানাবস্থায় মারা গেল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
২. এই কালেমার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, সংশয়-সন্দেহ পরিত্যাগ করা: لا إله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করার মানে, এর ব্যাপারে কোনো ধরনের সংশয়, সন্দেহ বা কিংকর্তব্য বিমূঢ়তার বিন্দুমাত্র শংমিশ্রন থাকতে পারবে না। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ ﴿১৫﴾ . (سورة الحجرات: ১৫) 'তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।'১ রসূল সা. আবু হুরায়াকে বলেন, يا أبا هريرة اذهب بنعلي هاتين - وأعطاه نعليه - فمن لقيت من وراء এই দেয়ালের ওপাশে অন্তরের অন্তস্থল হতে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদানকারী যার সাথেই তুমি সাক্ষাত করবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।'
৩. এই কালেমার আবেদন ও দাবী স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণ করা, প্রত্যাখ্যান না করা: অন্তর ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে এই কালেমার আবেদন সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি এই কালেমার আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করবে, আন্তরিক ভাবে মেনে না নিবে সে কাফের। সাধারণত প্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকে অহংকার, বিরোধিতা, হিংসা, বাপ-দাদার অন্ধানুকরণ ইত্যাদি কারণে। যেমন পবিত্র কুরআনের ভাষায় অহংকার বশত لا إله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে প্রত্যাখ্যানকারী কাফেরদের ঔদ্ধত্য প্রকাশ সম্পর্কে হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ يَسْتَكْبِرُونَ ﴿৩৫﴾ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوا أَهْتِنَا لِشَاعِرٍ مجنون ﴿سورة الصافات: ৩৫-৩৬﴾ "তাদের যখন বলা হত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব?"১
অতীত উম্মতের ভিতর যারা এই কালেমার আহবান প্রত্যাখ্যান করেছে, আন্ত রিক ভাবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের থেকে নেয়া প্রতিশোধ চিত্র পবিত্র কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে— وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا أَبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُقْتَدُونَ ﴿২৩﴾ قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكُمْ بِأَهْدَى مِمَّا وَجَدْتُمْ عَلَيْهِ أَبَاءَكُمْ قَالُوا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ ﴿২৪﴾ فَانْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ﴿২৫﴾. (سورة الزخرف : ২৩-২৫) 'এমনি ভাবে আপনার পূর্বে আমি যখন কোন জনপদে কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখন তাদেরই বিত্তশালীরা বলেছে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি এক পথের পথিক এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে চলি। সে বলত, তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছ, আমি যদি তদপেক্ষা উত্তম বিষয় নিয়ে তোমাদের কাছে এসে থাকি, তবুও কি তোমরা তাই বলবে, তারা বলত তোমরা যে বিষয়সহ প্রেরিত হয়েছে, তা আমরা মানব না। ফলে আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি। অতঃপর দেখুন, মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে।'২
৪. এই কালেমার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা, পরিত্যক্ত করে না রাখা: বাহ্যিক অঙ্গ-প্রতঙ্গ, আভ্যন্তরিণ মননশীলতার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কালিমার অর্থ, আবেদন ও তাৎপর্যকে সম্পূর্ণরূপে মেনে নেয়া। যার সত্যতা প্রমাণিত হবে, আল্লাহ তাআলার আদেশ বাস্তবায়ন, তার পছন্দনীয় বস্তুগুলো গ্রহণ, অপছন্দনীয় বস্তুগুলো বর্জন এবং তার গোস্বা ও রাগান্বিত বিষয়-বস্তুগুলো পরিহার করার মাধ্যমে। এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ ﴿২২﴾ وَمَنْ كَفَرَ فَلَا يَحْزُنْكَ كُفْرُهُ. (سورة لقمان: ২২-২৩) ‘যে ব্যক্তি সৎকর্ম পরায়ন হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করে, সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এক মজবুত হাতল। যাবতীয় কাজের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে। যে ব্যক্তি কুফরী করে, তার কুফরী যেন আপনাকে ক্লিষ্ট না করে।’১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৬৫﴾. (سورة النساء : ৬৫) 'অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়, তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে।'২ রসূল সা. বলেছেন— لا يؤمن أحدكم حتى يكون هواه تبعا لما جئت به. 'তোমাদের কেউ মুমিন বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমার আনীত বিধানের প্রতি তার প্রবৃত্তি আনুগত্য প্রকাশ না করবে।'
৫. এই কালেমার ব্যাপারে নিরেট সততা প্রর্দশন করা, মিথ্যা ও কপটতা পরিহার করা: বান্দার অন্তরে সুপ্ত অভিব্যক্তির সাথে মুখের উচ্চারণের এতটুকু সমন্বয় থাকতে হবে, যার দ্বারা তার অবস্থা মুনাফিক তথা কপটদের অবস্থা হতে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়— যারা মিথ্যা ও ধোকার আশ্রয় নিয়ে মুখে এমন সব কথা উচ্চারণ করে যা তাদের অন্তরে বিদ্যমান থাকে না। এরশাদ হচ্ছে— وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ ﴿৮﴾ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ ﴿৯﴾ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ ﴿১০﴾ . (سورة البقرة: ৮-১০) 'আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ তারা আদৌ ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এর দ্বারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না। তাদের অন্তকরণ ব্যধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুতঃ তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।'১
রসূল সা. বলেছেন: ما من أحد يشهد ألا إله إلا الله صدقا من قلبه إلا حرمه الله على النار. 'যে ব্যক্তি আন্তরিক ভাবে لا إله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদান করবে তার উপর আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন।'
৬. এই কালেমার প্রতি খাঁটি মহব্বত প্রদর্শন করা, বিদ্বেষ পোষণ না করা: এই কালিমা ও তার আবেদনের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও মহব্বত রাখা। অর্থাৎ এই কালেমা অনুযায়ী আমল পছন্দ করা, যারা এর উপর আমল করে এবং এর প্রতি আহবান করে তাদের মহব্বত করা। যারা এই কালেমাকে অপছন্দ করে এর সাথে প্রতারণা বা মিথ্যারোপ করে, এর থেকে পৃষ্ঠপ্রর্দশন করে ও এর প্রচার প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করে, তাদেরকে অপছন্দ ও প্রতিহত করা। এই কালেমার প্রতি মহব্বতের প্রমাণ দেয়ার জন্য আরো প্রয়োজন— আল্লাহ তাআলার আদেশকৃত ও পছন্দনীয় জিনিসগুলো বাস্তবায়ন করা, যদিও তা প্রবৃত্তির বিপরীত হয়। অপরপক্ষে আল্লাহ তাআলার নিষেধকৃত ও অপছন্দনীয় জিনিসগুলোর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তা হতে দূরে থাকা, যদিও তার প্রতি অন্তর ধাবিত হয়। আল্লাহর বান্দাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। আল্লাহর শত্রুদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা। রসূলের অনুকরণ করা। তার দিক নির্দেশনার অনুসরণ করা। তার আনীত বিধানকে কবুল করা। এ ছাড়া মহব্বত শুধু একটি দাবী যার কোন বাস্তবতা নেই। এরশাদ হচ্ছে— وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهَ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبُّ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا الله. (سورة البقرة : ১৬৫) 'আর কোন লোক এমন রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং এদের প্রতি এমন ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী।'১
অর্থাৎ কালেমায়ে তাওহিদ তাদের অন্তরে ও হৃদয়ে স্থায়ীরূপ নিয়েছে। তাদের অন্তর ও হৃদয় এ কালেমা পরিপূর্ণ করে দিয়েছে, বিধায় অন্য কোনো জিনিসের জন্য তাদের অন্তর উন্মুক্ত হয় না। তাদের অন্তরে যত মহব্বত-বিদ্বেষ দেখা যায় সব এই কালেমার অনুকরণে উৎসারিত হয়।
৭. এই কালেমার প্রতি পূর্ণ এখলাস প্রদর্শন করা, লৌকিকতা, সুখ্যাতি ও অংশিদারিত্ব পরিহার করা: সমস্ত এবাদতে একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট চিত্তে মনোনিবেশন করা। ছোট বড় সমস্ত শিরক হতে নিয়্যত পরিশুদ্ধ রাখা। এরশাদ হচ্ছে— وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ ﴿৫﴾ . (سورة البينة : ৫) 'তাদেরকে এ ছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ট ভাবে আল্লাহ তাআলার এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।'১ রসূল সা. বলেছেন— إن الله حرم على النار من قال لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله عز وجل. 'আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য لا إله إلا الله বলেছে।' وعن أبي هريرة - رضي الله عنه - أنه قال: قلت يارسول الله من أسعد الناس لشفاعتك يوم القيامة ؟ فقال : لقد ظننت يا أبا هريرة أن لا يسألني عن هذا أحد أول منك لما رأিত من حرصك على الحديث. أسعد الناس بشفاعتي يوم القيامة من قال لا إله إلا الله خالصا من قبل نفسه. 'আবুহুরায়রা রা. হতে বর্ণিত: তিনি বলেন আমি বলেছি হে আল্লাহর রসূল সা. কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশের মাধ্যমে কে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যবান হবে? তিনি বললেন: হে আবু হুরায়রা, আমি নিশ্চিতভাবে ধারণা করেছিলাম যে, এ ব্যাপারে তোমার আগে কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। যেহেতু হাদিসের প্রতি তোমার অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। (শুন!) কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত বা সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তি বেশী লাভবান হবে যে অন্তরের অন্তস্থল হতে নিবিষ্ট চিত্তে لا إله إلا الله বলেছে।'
৮. আল্লাহ ব্যতীত সকল উপাস্যদের অস্বীকার করা: বান্দার উচিত আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ধারণা প্রসূত সকল উপাস্য-মা'বুদ অস্বীকার করা। সাথে সাথে এ বিশ্বাস সুদৃঢ় করা যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ ছাড়া যাদের এবাদত করা হচ্ছে সব অসাড়। যে কেউ এ সমস্ত কাজ করে সে আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করে, হোক না সে উপাস্য (মা'বুদ) নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেস্তা, প্রেরিত রসূল, নেককার ওলী, পাথর, গাছ, চন্দ্র, দল, গোষ্টি-জ্ঞাতি, অথবা কোন সংবিধান... ইত্যাদি। এরশাদ হচ্ছে— فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿২৫৬﴾. (سورة البقرة : ২৫৬) 'যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে সে ধারণ করে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংগবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।'১ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْنِبُوا الطَّاغُوتَ. (سورة النحل ৩৬) 'আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।'২ রসূল সা. বলেছেন— من قال لا إله إلا الله وكفر بما يعبد من دون الله حرم ماله ودمه، وحسابه على الله عز وجل. 'যে لا إله إلا الله বলেছে এবং আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যকে অস্বীকার করেছে তার সম্পদ ও জীবন হারাম হয়ে গেছে এবং তার হিসাব আল্লাহর উপর ন্যস্ত।'
হে মুসলিম ভাই! তুমি ভাল করে জেনে নাও: জান্নাতের সৌভাগ্য লাভ করা, জাহান্নাম হতে মুক্তি পাওয়া এ কালেমার উপর অটল, অবিরাম অবিচল থেকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করা ব্যতিত সম্ভব নয়। এরশাদ হচ্ছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ ﴿১০২﴾. (سورة آل عمران: ১০২) 'হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমন ভাবে ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।'১ রসূল সা. বলেছেন:— من مات لا يشرك بالله شيئا دخل الجنة. 'আল্লাহ তাআলার সাথে শিরক না করে যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' অন্যত্র বলেন— ما من عبد قال لا إله إلا الله ثم مات على ذلك إلا دخل الجنة. 'যে ব্যক্তি لا إله إلا الله বলেছে অতঃপর এর উপর স্থির থেকে মারা গিয়েছে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এই কালেমা ভিন্ন অন্য কোন নীতির উপর স্থির থেকে আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হবে এবং শিরক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ. (سورة النساء : ৪৮) 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না, যে লোক তার সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ- যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهُ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ﴿৭২﴾. (سورة المائدة: ৭২) 'নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে অংশিদার স্থির করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান জাহান্নাম। অত্যাচারিদের কোন সাহায্যকারী নেই।'৩ রসূল সা. বলেছেন— مَن لَقِيَ اللهَ لاَ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئاً دَخَلَ الجَنَّةَ، وَمَن لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئاً دَخَلَ النَّارَ. 'যে শিরক মুক্ত অবস্থায় আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি শিরকে জড়িত হয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'
محمد رسول الله এর সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ: মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ দায়িত্ব প্রাপ্ত, রসূল। এরশাদ হচ্ছে— قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعاً. (سورة الأعراف:১৫৮) 'বলে দাও, হে সকল মানব মন্ডলী! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রসূল।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— মُّحَمَّدٌ رَسُولُ الله. (سورة محمد : ২৯) 'মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا ﴿১﴾. (سورة الفرقان: ১) 'পরম করুনাময় তিনি, যিনি তার বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হয়।'৩
'আল্লাহ তাআলা তাকে শিরকসহ সমস্ত অপসন্দ-পরিত্যাজ্য কার্যকলাপ হতে ভীতি প্রদর্শনকারী, নির্ভেজাল তাওহিদসহ সমস্ত পছন্দনীয়-গ্রহণীয় কার্যকলাপের দিকে আহবানকারী রূপে প্রেরণ করেছেন।' এরশাদ হচ্ছে— قُمْ فَأَنْذِرْ ﴿২﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ (৩). (سورة المدثر : ২-৩) 'উঠুন সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মহত্ব ঘোষণা করুন।'৪
অর্থাৎ তাদেরকে শিরক হতে এবং মূর্তি পূজা হতে ও আল্লাহ কর্তৃক সমস্ত অস্বীকৃতির জিনিস হতে ভীতি প্রর্দশন করুন। তাওহিদ ও আল্লাহর অনুমোদিত বিধান মতে তার বড়ত্ব বর্ণনা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন— إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا. (الفاطر: ২৪) 'আমি আপনাকে সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী রূপে।'১ অর্থাৎ আমি তাকে তওহীদ, আনুগত্য ও অধিক সওয়াবের সুসংবাদ দানকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি সাথে সাথে শিরক, গুণাহ ও কঠিন শাস্তির ভীতি প্রদর্শকও করেছি। অধিকন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে শুধু পৌঁছিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এখানেই যথেষ্ট করতে বলেছেন। এর পর কে মানলো আর কে মানলো না এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাবাদ করা হবে না। এরশাদ হচ্ছে— يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ . (سورة المائدة : ৬৭) 'হে রসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তার পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ. (سورة المائدة: ৯৯) 'রসূলের দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া।'৩ তিনি আমৃত্যু তার উপর প্রেরিত ওহী সংযোজন-বিয়োজন ব্যতীত হুবহু আমাদের পর্যন্ত পৌছে দিয়েছেন। যার আদিষ্ট হয়েছেন তা পঙ্খানুপুঙ্খ আদায় করেছেন। উম্মতের কল্যাণ কামনার সর্বশেষ উদাহরণটুকু পেশ করেছেন। এ জন্য আয়েশা রা. বলেছেন— من حدثك أن محمدا صلى الله عليه وسلم كتم شيئا مما أنزل الله فقد كذب. ولوكان كاتما شيئا لكتم عبس وتولى. ليس لك من الأمر شي.
'যদি কেউ তোমাকে বলে, মুহাম্মদ ওহীর কিয়দাংশ গোপন করেছেন, সে মিথ্যুক। কারণ যদি রসূল সা. কোন জিনিস গোপন করতেন, তাহলে অবশ্যই অত্র আয়াত দু'টি গোপন করতেন: عَيْسَ وَتَوَلَّى (عبس : ১) 'তিনি ভ্রু কুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন।'১ لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ (سورة آل عمران: ১২৮) 'এ ব্যাপারে আপনার কোন করণীয় নেই।'২
রসূল সা. আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যা পৌঁছিয়েছেন তাই সম্পূর্ণ দ্বীন। কোনো ধরনের কমতি রাখেননি, যেখানে সংযোজন প্রয়োজন হবে। কোন ধরণের জটিলতা রাখেননি, যা দূরভীত করতে হবে। আবার এমনো সংক্ষিপ্ত সাড় করেননি, যেখানে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে। এরশাদ হচ্ছে— الْيَوْমَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا. (سورة المائدة: ৩) আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।৩ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ. (سورة النحل : ৮৯) 'আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি সেটি এমন যে, তা প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা।' ৪
অতএব যে কোন ব্যক্তির এতে সংযোজন বিয়োজন বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এ ঘোষণা শুনার পর যদি কেউ তাতে কোন রকম পরিবর্তন করে, তবে পরিবর্তনকারীর উপর এর পাপ বর্তাবে। আল্লাহ তাকে সময় মত পাকড়াও করবেন।
محمد رسول الله এর সাক্ষ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক শর্তসমুহ:
যে কোন বান্দার মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ এর সাক্ষ্য প্রদান করার ফলে কয়েকটি জিনিস অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যায়। তন্মেধ্যে গুরুত্ব পূর্ণ হলো:
১. ইহকাল ও পরকালের ব্যাপারে অতীত ও ভবিষ্যত সংক্রান্ত যে সব সংবাদ রসূল সা. দিয়েছেন সে ব্যাপারে সত্যারোপ করা। এরশাদ হচ্ছে— وَما أَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ. (الحشر: ৭) 'রসূল সা. তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— فَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقُلْ رَبُّكُمْ ذُو رَحْمَةٍ وَاسِعَةٍ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُهُ عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ ﴿ سورة الأنعام ১৪৭ ﴾: 'যদি তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে বলে দিন- তোমার প্রতিপালক সুপ্রশস্ত করুনার মালিক। তার শাস্তি অপরাধীদের উপর থেকে টলবে না।'২
২. রসূল সা. এর আদেশ পালন করে ও নিষেধ হতে বিরত থেকে যথাযথ তার অনুসরণ করার প্রমাণ দেয়া। এরশাদ হচ্ছে— مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْসَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا ( سورة النساء : ৮০ ﴾ 'যে লোক রসূলের হুকুম মান্য করল সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমূখতা অবলম্বন করল, আমি তোমাকে (হে মুহাম্মদ) তাদের জন্য রক্ষক নিযুক্ত করে পাঠাইনি।'৩ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ﴿سورة الجن : ২৩﴾ 'যে কেউ আল্লাহ ও তার রসূলের অমান্য করে, তার জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি। তথায় তারা চিরকাল থাকবে।'৪
৩. একমাত্র তার আনুগত্য করা অন্য কারো পথ বা পদ্ধতির অনুকরণে না চলা। এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴿ سورة آل عمران : ৮৫ ﴾ 'যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম অন্বেষণ করে, কস্মিন কালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।'১ রসূল সা. বলেছেন: من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد. 'যে এমন আমল করল যার প্রতি আমাদের নির্দেশ নেই, তা পরিত্যক্ত, পরিত্যাজ্য ও প্রত্যাখ্যাত।' অন্যত্র বলেন— كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى، قالوا: ومن أبى يارسول الله ؟ قال: من أطاعني دخل الجنة ومن عصاني فقد أبي. 'আমার উম্মতের প্রত্যেকেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে প্রত্যাখ্যানকারী ব্যতীত। তারা জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রসূল সা. প্রত্যাখ্যানকারী কে? তিনি বললেন, যে আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে অবাধ্য হবে সেই প্রত্যাখ্যানকারী।'
৪. পরিপূর্ণ রূপে রসূল সা. এর আদর্শে আদর্শবান হওয়া। এরশাদ হচ্ছে— لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴾ سورة الأحزاب : ২১﴾ 'যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।'২
৫. সমস্ত বিরোধপূর্ণ বিষয়ে রসূল সা. এর মীমাংসার শরনাপন্ন হওয়া, সে মীমাংসাতে সন্তুষ্ট থাকার সাথে সাথে ন্যায় ও ইনসাফের বিশ্বাস রাখা। এরশাদ হচ্ছে— فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيما ( سورة النساء : ৬৫﴾ 'অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, যে পর্যন্ত তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়। তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে এবং ওটা সন্তুষ্ট চিত্তে কবুল করে।'১
৬. রসূল সা. এর ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত না হওয়া এবং অবজ্ঞা ও অবাধ্যতা হতে বিরত থাকা: আল্লাহ যতটুকু সম্মান দান করেছেন, ততটুকু সম্মান তাকে প্রদান করা। ইশাদ হচ্ছে— مَا كَانُ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللهَ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ (سورة الأحزاب : ৪০) 'মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী।'২
সুতরাং এমন কোন ধারনা পোষণ করবে না যা আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতের সাথে শিরকের শামিল। যেমন— রসুল সা. এর জন্য আল্লাহর ন্যায় কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে এমন বিশ্বাস পোষণ করা। যেমন— তিনি গায়েব জানেন, দুনিয়ার আবর্তন ও বিবর্তনের অধিকার রাখেন, উপকার ও ক্ষতি করার সামর্থ রাখেন, কিছু দিতে পারেন, বঞ্চিত করতে পারেন ইত্যাদি। অথবা এমন বিশ্বাস পোষণ করা যাবে না, যা আল্লাহর উলুহিয়‍্যাতের সাথে শিরকের শামিল, যেমন— কুরবানী, মান্নত, সাহায্যের আবেদন, সুপারিশ প্রার্থনা, ভরসা, ভয় ও আশা ইত্যাদির ব্যাপারে তার শরনাপন্ন হওয়া। উল্লিখিত যাবতীয় এবাদত একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। যে নবী সা. এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে সে প্রকারন্তরে তার বিরোধীতায় ও অবধ্যতায় লিপ্ত হবে। যেমন তিনি বলেছেন— لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم، فإنما أنا عبد فقولوا عبد الله ورسوله. 'তোমরা আমার ব্যাাপারে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন নাসারারা মরিয়ম তনয় ঈসার ব্যাপারে করেছে। নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে তার বান্দা এবং রসূল বলো।' যেহেতু আল্লাহ তাআলা জানতেন যে, কতিপয় লোক রসূল সা.কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে। তাই তিনি উম্মতকে স্বীয় সাধ্য ও সামর্থ্যের কথা জানিয়ে দেয়ার জন্য রসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে— قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهَ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ. (الأنعام: ৫০) ‘আপনি বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তা ছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই। আমি এমন বলি না যে, আমি ফেরেস্তা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে।’১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ﴿১৮৮) . (سورة الأعراف: ১৮৮) ‘আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান, আর আমি যদি গায়েবের কথা জানতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতাম এবং কোন অমঙ্গল আমাকে কখনও স্পর্শ করতে পারতো না। আমি তো শুধু মাত্র ঈমানরদের জন্য একজন ভীতি প্রদর্শক ও সুসংবাদ দাতা।’২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا ﴿২১﴾ قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهَ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُونِهِ مُلْتَحَدًا ﴿২২﴾ إِلَّا بَلَاغًا مِنَ اللَّهَ وَرِسَالَاتِهِ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ﴿سورة الجن : ২১-২৩﴾ ‘বলুন, আমি তোমাদের ক্ষতি কিংবা কল্যাণ করার ক্ষমতা রাখি না। বলুন, আল্লাহর কবল থেকে কেউ আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। এবং তিনি ব্যতীত আমি কোন আশ্রয়স্থল পাব না। কিন্তু আল্লাহর বাণী পৌঁছানো ও তার পয়গাম প্রচার করাই আমার কাজ। যে আল্লাহ ও তার রসূলের অমান্য করবে, তার জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি। তথায় তারা চিরকাল থাকবে।’৩
তদ্রুপ তাকে ঐ সমস্ত বৈশিষ্টহীন মনে করা, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাকে ভূষিত করেছেন, এটাও এক ধরনের বাড়াবাড়ি। যেমন আল্লাহ তাআলা তাকে সমস্ত সৃষ্টি জীবের উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন, রেসালাতের দায়িত্ব, সুসংবাদদান ও সতর্করণের দায়িত্ব প্রদান করেছেন, অলৌকিক ঘটনাবলীর দ্বারা স্বীয় নবুয়্যতের সত্যতা প্রমান করার ক্ষমতা প্রদান করেছেন। কতিপয় অদৃশ্য জ্ঞানের ইলম এবং হাওযে কাউসার প্রভৃতি দান করেছেন। এ সকল নেয়ামত ও পুরুস্কারের প্রতি বিশ্বাস রাখা, অতিরঞ্জন ও সীমালঙ্ঘন হতে— যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দুনিয়া-আখেরাতে ধ্বংসের ঘাটে নিয়ে যাবে— বিরত থাকা।
এখানে আমরা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তার রসূল সা.কে প্রদত্ত্ব কতিপয় স্বাতন্ত্র ও বৈশিষ্ট নিয়ে আলোচনা করছি, যা পূর্বের কোনো নবীকে দেয়া হয়নি। যার ব্যাপারে রসূল সা. স্বয়ং বলেছেন, এরশাদ হচ্ছে— فضلت على الأنبياء بست : أعطيت جوامع الكلم . ونصرت بالرعب، وأحلت لي الغنائم، وجعلت لي الأرض مسجدا وطهورا، وأرسلت إلى الخلق كافة، وختم بي النبيون. 'আমাকে ছয়টি জিনিসের মাধ্যমে অন্যান্য নবীদের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ১. পরিপূর্ণ অর্থবহ সংক্ষিপ্ত বাক্যবিন্নাশ। ২. শত্রুপক্ষের অন্তরে আতংক। ৩. আমার জন্য গণীমতের সম্পদ বৈধ। ৪. সকল যমিন আমার জন্য মসজিদ ও পত্রিতা অর্জন করার মাধ্যম। ৫. আমাকে সকল মানষের নিকট প্রেরণকরা হয়েছে। ৬. এবং আমার দ্বারা নবুয়্যতের পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।
উম্মতের উপর রসূল সা. এর কতিপয় অধিকার: ১. রসূল সা. এর মহব্বত অবশ্য কর্তব্য, অতীব আবশ্যক। ধন-সম্পদ, নিজের জীবন, পিতা-মাতা, সন্তান, পরিবার-পরিজন ও সমস্ত মানুষের মহব্বতের উপর তার মহব্বতকে অগ্রাধিকার দেয়া। রসূল সা. বলেছেন: لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من أهله وماله والناس أجمعين. 'ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট পরিবার-পরিজন, সম্পদ ও সমস্ত মানুষ হতে অধিক প্রিয় না হবো।' ২. তার উপর দরদ ও সালাম পাঠ করা। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৫৬﴾. (الأحزاب : ৫৬) 'আল্লাহ তাআলা ও তার ফেরেস্তাগণ নবীর উপর রহমত প্রেরণ করে। হে মুমিন গণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের দোয়া কর এবং তার প্রতি সালাম প্রেরণ কর।'
৩. তার কল্যাণ কামনা করা। অর্থাৎ তার সুন্নত ও শরীয়তের হেফাজত ও রক্ষণা বেক্ষণ করা যাতে এর ভিতর কোন ধরনের সংযোজন-বিয়োজন, পরিবর্তন বা পরিবর্ধন না হতে পারে। রসূল সা. বলেছেন, الدين النصيحة ثلاثا قلنا: لمن يارسول الله؟ قال: الله عز وجل، ولكتابه، و لرسوله ولأئمة المسلمين، وعامتهم. 'দ্বীন কল্যাণ কামনার নাম: তিন বার বলেছেন, আমরা পশ্ন করলাম: কার জন্য কল্যাণ কামনা হে আল্লাহর রসূল? তিনি বললেন: আল্লাহর জন্য, তার কিতাবের জন্য, তার রসূলের জন্য, মুসলমানদের প্রতিনিধিদের জন্য এবং সমস্ত মানুষের জন্য।'
৪. রসূল সা. এর আহলে বায়তের ব্যাপারে তার উপদেশ যথাযথ পালন করা। আহলে বায়ত অর্থাৎ হাশেম ও আব্দুল মুত্তালিব এর বংশধর ও রসূল সা. এর স্ত্রীগণ। মুসলমান মাত্রই তার বংশধর এর পবিত্রতা এবং রসূল এর সাথে নৈকট্যতার প্রতি বিষেশ দৃষ্টি দিবে। অর্থাৎ তাদের অভাব মোচন করবে, মহব্বত করবে, তাদের সম্মান রক্ষা করবে। যেহেতু গাদিরে খুম এর দিন রসূল সা. স্বীয় পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে বলেছেন— أذكركم الله في أهل بيتي. 'আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বায়তের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।'
৫. তার সাহাবাদের মহব্বত করা এবং তাদের বিশ্বস্ততার উপর আস্থা রাখা: প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব রসূল সা. এর সাহাবাদের মহব্বত করা। তাদের বিশ্বস্ততার উপর আস্থা রাখা। তাদের সকলের শ্রেষ্টত্বের ঘোষণা দেয়া। তাদের মাঝে সংঘটিত হয়ে যাওয়া বিরোধ নিয়ে সামালোচনা হতে বিরত থাকা। তাদের নামের সাথে রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলা। তাদের ব্যাপারে অন্তর পরিচ্ছন্ন রাখা। তাদের কারো প্রতি বিদ্বেষ না রাখা। তাদের অপবাদ, গালি, কুৎসা রটনা ইত্যাদি হতে নিজের মুখ নিরাপদ রাখা। রসূল সা. বলেছেন— لا تسبوا أصحابي، فوالذي نفسي بيده لو أن أحدكم أنفق مثل أحد ذهبا ما بلغ مد أحدهم ولا نصيفه. 'তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিও না। তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিও না। যার হাতে আমার জান তার শপথ করে বলছি: তোমাদের কেউ ওহুদ পাহাড় পরিমান দান করলেও তাদের এক অঞ্জলী বা তার অর্ধেকর সমানও হবে না।'
সাক্ষ্য ভঙ্গ ও ধর্মচ্যুত হয়ে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। বর্তমান যুগে যাতে মানুষ সচারাচর লিপ্ত হয়, তার মধ্য হতে গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় কারণ নিম্নে উল্লেখ করা হল। ১. আল্লাহ তাআলার এবাদতে অন্য কাউকে শরীক করা: অর্থাৎ শিরকে আকবরের কোনো প্রকারে লিপ্ত হওয়া। যে কারণে সে দ্বীন হতে বের হয়ে যাবে। জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং সেখানে স্থায়ীভাবে থাকবে। যেমন— আল্লাহর জন্য এবং মূর্তির জন্য সেজদাহ করা। আল্লাহ এবং তার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে কুরবানী করা। মান্নত করা। খানায়ে কা'বা, কবর এবং মূর্তির চার পাশে তওয়াফ করা। এরশাদ হচ্ছে— إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ﴿المائدة: ৭২﴾ 'নিশ্চয় যে আল্লাহ তাআলার সাথে অংশিদার স্থির করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।'১
অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا (النساء : ৪৮) 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না, যে লোক তার সাথে কাউকে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক আল্লাহর সাথে অংশিদার সাব্যস্ত করল, সে মারাত্মক অপবাদ আরোপ করল।'২
২. শিরকে আকবার বা বড় ধরনের শিরক করা : যেমন— আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করা, অথবা তার কোন কাজ অস্বীকার করা। যেমন— সৃষ্টি করণ, মালিকানা, পরিকল্পনা করা, অথবা আল্লাহ তাআলার গুণাগুণের কোন একটিকে তার মাখলুকের সাথে সম্পৃক্ত করা। কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা। শরীয়ত ও রেসালতকে মিথ্যারোপ করা। আল্লাহ ও তাঁর রসূল এর আদেশ প্রত্যাখ্যান করা ও অহমিকা প্রদর্শন করা। দ্বীনের জরুরী প্রমাণ্য বিষয়গুলো অস্বীকার করা। এরশাদ হচ্ছে— وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ ﴿البقرة : ৩৪﴾ 'এবং যখন আমি আদমকে সেজদা করার জন্য ফেরেস্তাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফেরদের অর্ন্তভুক্ত হয়ে গেল।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ أَمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴿البقرة : ৯১﴾ 'যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তখন তারা বলে— যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা তাই বিশ্বাস করি, এবং তাছাড়া যা রয়েছে তা তারা অবিশ্বাস করে, অথচ তাদের কাছে যা আছে এ গ্রন্থ তার সত্যতা প্রমাণ করে। তুমি বল যদি তোমরা বিশ্বাসীই ছিলে, তবে ইতিপূর্বে আল্লাহর নবীগনকে হত্যা করেছিলে?'২ وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴿البقرة : ২১৭﴾ 'তোমাদের মধ্যে যে স্বধর্ম হতে ফিরে যায়, এবং কাফের অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে, দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতেই তাদের কর্ম ব্যর্থ। তারা জাহান্নামের অধিবাসি, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।৩
৩. বড় ধরনের নেফাক : যেমন বাহ্যিক ভাবে ইসলাম প্রকাশ করা, অন্তরে অস্বীকৃতি ও কুফরী গোপন করা। অথবা বাহ্যিক ভাবে ইসলামের প্রতি মহব্বত প্রকাশ করা, অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করা, অপছন্দ করা, এর বিলুপ্তি কামনা করা। অথবা বাহ্যিক ভাবে মুসলিম মুজাহিদদের পরাজয় এবং শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কারণে চিন্তিত হওয়া, আন্তরিক ভাবে এ জন্য খুশি হওয়া। অথবা বাহ্যিক ভাবে দ্বীনের কাজ করা। এর প্রতি আহবান জানানো, এ জন্য জেহাদ করা, ভিতরে ভিতরে এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা। মুসলমানদের বিপক্ষে গোয়েন্দাগিরী করা। মুসলমানদের সমূলে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করা। এরশাদ হচ্ছে— وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا ﴿১২﴾. (الأحزاب: ১২) 'এবং মুনাফিরা ও যাদের অন্তরে ব্যধি ছিল তারা বলছিলঃ আল্লাহ এবং তাঁর রসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ . (النساء : ১৪২) 'অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করেছে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا. النساء : ১৪৫﴾ 'নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা থাকবে দোযখের সর্ব নিম্ন স্তরে। আর তুমি তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না।'৩
৪. আল্লাহ তাআলা এবং তার বান্দার মাঝখানে মাধ্যস্থতাকারী সাব্যস্ত করা : আল্লাহ ব্যতিত যাদেরকে তারা ডাকে তাদের কাছে শাফায়াত বা সুপারিশ প্রার্থনা করা। অথবা তাদের উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। অথবা এমন সব জিনিসের ব্যাপারে তাদের কল্যাণের আশা রাখা, তাদের অনিষ্টকে ভয় পাওয়া— যার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা রাখেন। এরশাদ হচ্ছে— وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهُ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴿১৮﴾. (يونس : ১৮) 'আর তারা উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর, যা না তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে, না লাভ, এবং বলে এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বলে দাও : তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আকাশসমূহে আর না যমীনে? তিনি পবিত্র ও তারা যা শিরক করে তা থেকে অনেক উর্ধ্বে।'১ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ ﴿৫﴾ وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا فَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِينَ ﴿৬﴾. (الأحقاف : ৫-৬) 'সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না? এবং এগুলো তাদের প্রার্থনা সম্বন্ধেও অবহিত নয়। যখন মানুষকে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হয়ে দাড়াবে এবং তাদের এবাদত করা অস্বীকার করবে।'২
৫. মুশরিকদের কাফের না বলা : অথবা তাদের কুফরীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা। অথবা তাদের ধর্মকে বৈধ স্বীকৃতি প্রদান করা বা তাদের ধর্মকে সম্মান করা: কারণ আল্লাহ তাআলা তাদের কুফরীর চুরান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন এবং তাদের সাথে শত্রুতা ও সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন— যেহেতু তাদের ভিতর শিরক, কুফর ও স্পষ্ট গোমরাহী বিদ্যমান। এরশাদ হচ্ছে— لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهَ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةٌ آل عمران: ২৮) 'মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে।'৩ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهَ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهَ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا ﴿১৫০﴾ أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا النساء : ১৫০-১৫১﴾ 'যারা আল্লাহ ও তার রসূল এর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে, তদুপরি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায়, আর বলে যে, আমরা কতেককে বিশ্বাস করি, কিন্তু কতেককে বিশ্বাস করি না এবং এরই মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করতে চায়। প্রকৃত পক্ষে এরাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী। আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছি অপমানজনক আযাব।'
৬. নিম্নোক্ত বিশ্বাস পোষণ করা: আল্লাহ তাআলার ধর্ম ও তার রসূল সা. এর শিক্ষার তুলানায় অন্যদের ধর্ম ও শিক্ষা সয়ংসম্পূর্ণ অথবা রসূল সা. এর বিচারের তুলনায় অন্যদের বিচার ইনসাফপূর্ণ। অথবা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বর্তমানে যুগোপযোগী নয়। অথবা ইসলাম ধর্ম নির্দিষ্ট এবাদত উৎযাপনের ভিতর সীমাবদ্ধ, মানুষের পার্থিব জীবনের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অথবা যে কোন ব্যক্তির আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করার নৈতিক অধিকার রয়েছে মনে করা। অথবা কুফরী ও মানব রচিত আইন-কানুনের মাধ্যমে বিচার করা। যদিও এ কাজগুলো সম্পাদনকারী ও বাস্তবায়নকারী ব্যক্তি, শরীয়তে মুহাম্মদীর উপর আমল করে, এ দ্বীন সয়ংসম্পূর্ণ এবং বাকীসব ধর্ম ও শিক্ষার উপর এর প্রাধান্য রয়েছে বলে স্বীকার করে। এরশাদ হচ্ছে— أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا النساء : ৬০). 'আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতিও। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যেন তারা তাকে অমান্য করে। আর শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।'২ অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا শَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৬৫﴾ . (سورة النساء : ৬৫) 'অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, যে পর্যন্ত তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়। তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে এবং ওটা সন্তুষ্ট চিত্তে কবুল করে।'১
৭. রসূল সা. বা তার আনীত বিধানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা: বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি উক্ত বিধান পালন করুক বা না করুক উভয় সমান অপরাধ। এরশাদ হচ্ছে: ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ (سورة محمد : ৯) 'এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা নাযেল করেছেন তারা তা পছন্দ করে না, অতএব আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন।'২ ঈমানের বিপরীত কুফরীই একমাত্র আমল নস্যাৎ করে। এখানে তারা আল্লাহ তাআলার বিধানকে অপছন্দ করে কুফরি করেছে, তাই তাদের আমল আল্লাহ তাআলা বাতিল করে দিয়েছেন। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿سورة الأنعام: ৮৮﴾ 'যদি তারা শিরক করতো, তবে তাদের কাজকর্ম তাদের জন্য ব্যর্থ হয়ে যেত।'৩
৮. উপহাস করা: আল্লাহ, রসূল, কুরআন, শরীয়ত, শরীয়তের কোনো নিদর্শন, সওয়াব, শাস্তি অথবা দ্বীনের উপর অবিচল ও দ্বীনের প্রতি আহবান কারীদের সাথে— দ্বীনের উপর অবিচল থাকার কারণে, দ্বীনের প্রতি আহবান জানানোর কারণে— উপহাস করা। এরশাদ হচ্ছে— قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ﴿৬৫﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ . (سورة التوبة : ৬৫-৬৬) 'আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তার হুকুম-আহকামের সাথে এবং তার রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা করো না, ঈমান গ্রহণের পরও তোমরা কাফের হয়ে গেছ।'১
৯. বন্ধুত্ব স্থাপন করা : মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, তাদের মহব্বত করা এবং মুসলমানদের বিপরীত তাদের সাহায্য করা। এরশাদ হচ্ছে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَفَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿৫১﴾. (سورة المائدة : ৫১) 'হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে সে তাদেরই অর্ন্তভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন না।'২
১০. যাদু: যার একটি শাখা কাল চক্র: অর্থাৎ যাদুর একটি আমল যার মাধ্যমে মানুষকে তার মানবপ্রকৃতি হতে ফেরানো হয়, যেমন- স্বামীকে স্ত্রীর বিপরীত অথবা স্ত্রীকে স্বামীর বিপরীত মহব্বতের পরিবর্তে শত্রুতা করা। আরেকটি শাখা সহানুভুতি: যাদুর এমন একটি দিক আছে যার মাধ্যমে মানুষকে তার অভিষ্ট জিনিসের প্রতি শিরকের পদ্ধতিতে আকষর্ণীয় করে তোলা হয়। যে এ কাজ করল বা এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল সে মূলত কুফরী করল। এরশাদ হচ্ছে— وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ. (سورة البقرة : ১০২) 'তারা উভয়ে একথা না বলে কাউকে বলে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরিক্ষার জন্য, কাজেই তুমি কাফের হয়ো না।'৩
১১. আল্লাহর শরীয়ত এবং তার দিক নির্দেশনা হতে অন্তর-কর্ণ সহ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা: যদিও সে শরীয়তকে সত্যারোপ কিংবা মিথ্যারোপ কোনটাই করে না। এর সাথে বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতাও পোষণ করে না। এবং কোনো ভাবে এর প্রতি কর্ণপাতও করে না। এরশাদ হচ্ছে— وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنتَقِمُونَ ﴿২২﴾. (سورة السجدة : ২২) 'যে ব্যক্তিকে তার পালনকর্তার আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়। অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে? আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দেব' অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে— وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ ﴿৩﴾ . (سورة الأحقاف:৩) 'আর কাফেররা যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।'২
উল্লেখিত সমস্ত বিষয় ঈমান বিনষ্টকারী। উপহাস, ঠাট্টা, ইচ্ছা কিংবা ভয় যেভাবেই করুক সর্বাবস্থায় তা কুফরী। তবে জবরদস্তিমুলক কাউকে কুফরী করতে বাধ্য করা হলে তার বিষয়টি আলাদা। এরশাদ হচ্ছে— إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنُّ بِالْإِيمَانِ ﴿১০৬﴾. (سورة النحل: ১০৬) 'যার উপর জবর দস্তি করা হয় এবং তার অন্তর ঈমানের উপর অটল থাকে সে ব্যতীত।'৩ চাপ প্রয়োগকৃত ব্যক্তির কুফরীকথা বা কাজের সাথে শর্ত হলো তার অন্তর ঈমানের ব্যাপারে আস্থাশীল থাকতে হবে।

টিকাঃ
১ সূরা: মুহাম্মদ-১৯
১ সূরা: আল হুজরাত-১৫
১ সাফফাত:৩৫-৩৬।
২ সূরা: আয যুখবুক- ২৩-২৫
১ সূরা: লুকমান-২২-২৩
২ সূরা নিসা- ৬৪
১ সূরা: আল বাক্বারা-৮-১০
১ সূরা: আল বাক্বারা-১৬৫
১ সূরা: আল বায়ি‍্যনাহ-৫
১ সূরা: আল বাক্বারা-২৫৬
২ সূরা আন নাহল- ৩৬
১ সূরা: আলে ইমরান-১০২
২ সূরা: নিসা-৪৮
৩ সূরা: আল মায়েদা- ৭২
১ সূরা: আরাফ-১৫৮
২ সূরা মুহাম্মদ:২৯।
৩ সূরা: আল ফুরকান-১
৪ সূরা: আল মুদ্দাসির-২-৩
১ সূরা: ফাতের-২৪
২ সূরা আল মায়েদা- ৬৭
৩ সূরা আল মায়েদা-৯৯
১ সূরা: আবাসা-১
২ সূরা: ইমরান-১২৮
৩ সূরা আল মায়েদা-৩
৪ সূরা আন নাহল-৮৯
১ সূরা: আল হাশর-৭
২ সূরা আল আন আম-১৪৭
৩ সূরা: নিসা-৮০
৪ সূরা: জিন-২৩
১. সূরা আলে ইমরান-৮৫
২. সূরা আল আহযাব-৪০
১. সূরা: আল আন আম-৫০
২. সূরা: আল আরাফ-১৮৮
৩. সূরা: জিন:২২-২৩
১ সূরা: আল মায়েদা-৭২
২ সূরা: নিসা-৪৮
১ সূরা: বাক্বারা- ৩৪
২ সূরা: আল বাক্বারা-৯১
৩ সূরা বাকারা: ২১৭।
১ সূরা: আহযাব: ১২।
২ সূরা: নিসা: ১৪২।
৩ সূরা: নিসা: ১৪৫।
১ সূরা: ইউনুস-১৮
২ সূরা আল আহক্বাফ- ৫-৬
৩ সূরা: ইমরান-২৮
১ সূরা: নিসা-১৫০-১৫১
২ সূরা নিসা-৬০
১. সূরা: আন নিসা-৬৫
২. সূরা: মুহাম্মদ-৯
৩. সূরা: আনআম-৮৮
১ সূরা: তওবাহ-৬৫-৬৬
২ সূরা মায়েদা-৫১
৩ সূরা: বাক্বারা-১০২
১ সূরা: সাজদাহ ২২
২ সূরা: আল আহক্বাফ-৩
৩ সূরা: নাহল-১০৬

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 সুদৃঢ় আকিদা

📄 সুদৃঢ় আকিদা


ইসলামের পরিভাষায় ঈমান : আত্মার স্বীকৃতি বা সত্যায়ন, মৌখিক স্বীকৃতি এবং আত্মা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে ঈমান বলা হয়। ভালো কাজে ঈমান বৃদ্ধি পায়, মন্দ কাজে ঈমান হ্রাস পায়।
ঈমানের রুকনসমূহ যে সকল ভিত্তির উপর ঈমান প্রতিষ্ঠিত তার সংখ্যা মোট ছয়টি বলে নবী আলাইহিস সালাম এরশাদ করেছেন— الإيمان: أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر، وتؤمن بالقدر خيره وشره. অর্থ- ১. আল্লাহর উপর বিশ্বাস। ২. তার ফেরেস্তাদের উপর বিশ্বাস। ৩. তার কিতাবসমূহের উপর বিশ্বাস। ৪. তার প্রেরিত নবী রাসুলদের উপর বিশ্বাস। ৫. পরকালের উপর বিশ্বাস। ৬. 'নিয়তির ভাল-মন্দ আল্লাহর হাতে' এ কথায় বিশ্বাস।'১
ঈমানের শাখাসমূহ ঈমানের ৭৭ টির বেশি শাখা রয়েছে। أعلاها قول: لا إله إلا الله، وأدناها إماطة الأذى عن الطريق، والحياء شعبة من الإيمان. ঈমানের সর্বোত্তম শাখা এ স্বীকৃতি প্রদান করা যে আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন উপাস্য নেই। আর ঈমানের নিম্নতম শাখা হলো কষ্টদায়ক বস্তু পথ হতে অপসারণ করা এবং লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।২
সালাফে সালেহীনের নিকট ঈমানের মৌলিকত্ব প্রথমত: আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন। আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন চারটি বিষয় দ্বারা পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্তি হয় বলে সালাফে সালেহীন মনে করেন।
১. আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস।
২. আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতে বিশ্বাস। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহই সবকিছুর সষ্ট্রা। তিনি সব কিছুর প্রকৃত মালিক, সব কিছুর প্রতিপালন তিনিই করেন।
৩. আল্লাহর উলুহিয়্যাতে বিশ্বাস। অর্থাৎ আল্লাহই একমাত্র ইলাহ বা উপাস্য। এ ক্ষেত্রে কোন মর্যাদাবান ফেরেস্তা বা আল্লাহ প্রেরিত কোন নবী রাসূলের অংশিদারিত্ব নেই।
৪. আল্লাহর পবিত্র নাম ও গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন। এর ধরণ হলো, কুরআনুল কারীম এবং হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলী বান্দা শুধু মাত্র তার জন্যই প্রয়োগ করবে। সেগুলোর প্রতি অবিকল বিশ্বাস স্থাপন করবে, ঐ ভাবেই তাকে ডাকবে। এসকল নাম ও গুনাবলীতে কোন প্রকার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, পরিবর্তন, পরিবর্ধনের আশ্রয় নিবে না। রূপক অর্থ গ্রহণ করবে না এবং এর কোন সদৃশ স্থির করবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:- لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴿১১﴾ (الشوري: ১১) তার মত কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।'১
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ফলাফলঃ চারটি নীতিমালার আলোকে আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা যাবতীয় কল্যাণ ও সৌভাগ্যের মূল। এবং ঈমানের অবশিষ্ট রুকুনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে বিষয়টি পূর্ণতা পায়। উপরোল্লেখিত নিয়মাবলী অনুসারে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখা কর্তব্য। যখনই কোন জাতি বা গোষ্ঠি আল্লাহর উপর ঈমানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এ চারটি মৌলিক নীতিমালার প্রতি দিকপাতে অবহেলা প্রদর্শন করেছেন, তখনই তাদের অন্তর নিমজ্জিত হয়েছে গহীন অন্ধকারে। তারা পথভ্রষ্ট ও লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে। এবং ঈমানের অপরাপর ভিত্তির ক্ষেত্রেও সত্যের অনুসরণ করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: ফেরেস্তাদের প্রতি বিশ্বাস ফেরেস্তাগণ অদৃশ্য জগতের অধিবাসী। আল্লাহ তাদেরকে নূর বা জ্যোতি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে তার আদেশের প্রতি পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের যোগ্যতা এবং তার আদেশ বাস্তবায়নের শক্তি-সামর্থ দান করেছেন। প্রভু অথবা উপাস্য হওয়ার নূন্যতম কোন বৈশিষ্ট্য তাদের নেই। তারা হলেন সৃষ্ট। আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করেছেন এবং মর্যাদা দিয়েছেন তার সম্মানিত বান্দা হিসেবে। বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মানুষের সাথে তাদের কোন মিল নেই। তারা পানাহার করেন না, ঘুমান না, বিবাহের প্রয়োজন নেই তাদের। যৌন চাহিদা হতে তারা মুক্ত, এমনকি যাবতীয় পাপাচার হতেও। মানুষের নানান আকৃতিতে আত্মপ্রকাশে তারা সক্ষম।
চারটি বিষয়ের মাধ্যমে ফেরেস্তার উপর ঈমান পূর্ণ হয় ১. আল্লাহ তাদের যে সকল গুণাবলীর বর্ণনা দিয়েছেন সে অনুসারে তাদের অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন।
২. কোরআন এবং বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা তাদের যে সকল নাম আমরা জেনেছি, সে গুলো বিশ্বাস করা, যেমন জিব্রাইল, ইস্রাফিল, মিকায়ীল, মালিক, মুনকার, নাকীর এবং মালাকুল মাউত ফেরেস্তাবৃন্দ এবং তাদের মধ্য হতে যাদের নাম আমাদের জানা নেই, তাদেরকেও সাধারণভাবে বিশ্বাস করা।
৩. তাদের মধ্য হতে যার বৈশিষ্ট্যের কথা কোরআনে এবং বিশুদ্ধ হাদীসে আমরা জেনেছি, তার প্রতি বিশ্বাস পোষণ করা। যেমন, জিব্রাইল আলাইহিস সালামের বৈশিষ্ট্য তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছেন যে আকৃতিতে আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন অবিকল সে আকৃতিতে। যিনি তার ছয়শত ডানায় আচ্ছাদিত করেছিলেন আদিগন্ত। এমনিভাবে আরশ বহনকারী ফেরেস্তার বৈশিষ্ট্য এই যে, তার এক কান হতে অপর কানের দূরত্ব হলো সাতশত বছরের পথ।
৪. তাদের মধ্য হতে যাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আমরা অবগতি লাভ করেছি, তা বিশ্বাস করা। যেমন, ক্লান্তিহীনভাবে দিনরাত তারা আল্লাহর তাসবীহ পাঠে নিমগ্ন থাকেন। কোন প্রকার অবসাদ তাদের স্পর্শ করে না। তাদের মধ্য রয়েছেন, আরশবহনকারী, জান্নাতের প্রহরী এবং জাহান্নামের রক্ষী। আরো আছেন এক ঝাক ভ্রাম্যমান পবিত্র ফেরেস্তা, যারা আল্লাহর আলোচনা হয় এমন স্থানসমূহকে অনুসরণ করেন।
কতিপয় ফেরেস্তার বিশেষ কাজ • জিব্রাইল: অহী আদান প্রদানের দায়িত্বশীল, এবং নবী রাসূলের নিকট অহী নিয়ে অবতরণের দায়িত্ব তার প্রতি ন্যস্ত করা হয়েছে। • ইস্রাফিল: পুনরুত্থান দিবসে সিংগায় ফুৎকারের দায়িত্ব তার প্রতি ন্যস্ত হয়েছে। • মিকায়ীল : বৃষ্টি ও উদ্ভিদ উৎপন্নের দায়িত্বশীল। • মালিক : জাহান্নামের দায়িত্বশীল। • মুনকার এবং নাকীর : তাদের উভয়ের প্রতি কবরে মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে। • মালাকুল মাউত : রূহ কবজের দায়িত্ব তার। • আল মুয়াক্কিবাত : বান্দাদের সর্বাবস্থায় রক্ষার দায়িত্ব তাদের। • আল কিরামুল কাতিবুন : আদম সন্তানদের দৈনন্দিন আমল লেখার কাজে তারা নিয়জিত।
এছাড়া আরো অনেক ফেরেস্তা আছেন, যাদের আমল সম্পর্কে আমরা অবগত নই। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ وَمَا هِيَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْبَشَرِ ﴿৩১﴾ (المدثر: ৩১) আপনার প্রভুর বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। এ তো মানুষের জন্য উপদেশ মাত্র।'১
ফেরেস্তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন মুসলমানদের ব্যক্তি জীবনের নানান উপকারিতার কারণ। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:—
১. আল্লাহর বড়ত্ব এবং শক্তি সম্পর্কে জানা। কারণ সৃষ্টির বড়ত্ব সষ্ট্রার বড়ত্বের প্রমাণ বহন করে।
২. আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহের জন্য কায়মনোবাক্যে এ শুকরিয়া জ্ঞাপন করা যে, তিনি ফেরেস্তা নিয়োজিত করে মানুষকে রক্ষা করেছেন বিভিন্ন আপদ-বিপদ হতে; তাদের আমলগুলো লিপিবদ্ধ করা, আরশে তাদের দোয়া পৌঁছে দেয়া, তাদের জন্য ইস্তেগফার, পুরস্কারের সংবাদ দান—ইত্যাদি দায়িত্বগুলো তাদের কাঁধে অর্পণ করেছেন।
৩. তারা আল্লাহর একান্ত অনুগত ও ইবাদতগুজার—এ জন্য তাদের মোহাব্বাত করা।
৪. ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে তাদের ঘনিষ্ঠ হওয়া। কারণ, তাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় বান্দাদের দৃঢ় মনোবল দান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন— إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبَّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا ﴿১২﴾ (الأنفال: ১২) ঐ মুহূর্তকে স্মরন করুন যখন আপনার প্রভু ফেরেস্তাদের নির্দেশ করলেন আমি তোমাদের সাথে রয়েছি। সুতরাং, ঈমানদারদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির রাখ।'১
৫. সর্বাবস্থায় আল্লাহর পর্যবেক্ষণের আওতায় এবং পরিপূর্ণ সজাগ থাকা; যেন মানুষের কাছ থেকে বৈধ এবং নেক আমল ব্যতীত কোন গুনাহ প্রকাশ না পায়। কারণ মানুষের আমলসমূহ লেখার জন্য আল্লাহ তাআলা সম্মানিত ফেরেস্তা নিয়োজিত করেছেন। তারা মানুষের সকল কর্মকান্ড বিষয়ে অবগত হয়ে থাকেন। তারা সর্বাবস্থায় তাদের রক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে সক্ষম।
৬. ফেরেস্তাদের কষ্ট হয় এই ধরণের কাজ হতে বিরত থাকা। গুনাহের কাজ হলে তারা কষ্ট পায়। এজন্য তারা কুকুর এবং প্রাণীর ছবি আছে এমন ঘরে প্রবেশ করে না। দুর্গন্ধ বস্তু তাদের কষ্টের উদ্রেক করে। যেমন— মসজিদে পেঁয়াজ, রসুন খাওয়া অথবা খেয়ে মসজিদে যাওয়া।
তৃতীয়ত: কিতাব সমূহের উপর ঈমান কিতাব দ্বারা উদ্দেশ্য এমন সব কিতাব, যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য, এবং যা আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকূলের প্রতি রহমত ও পরকালে তাদের জন্য নাজাত ও কল্যাণ স্বরূপ জিব্রাইলের মাধ্যমে রাসূলদের উপর অবতীর্ণ করেছেন।
কিতাব সমূহের উপর ঈমান আনার অর্থ ১. এমন বিশ্বাস পোষণ করা যে, সকল আসমানী কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে আলোকবর্তিকা, হেদায়েতের আকর হিসেবে, সত্য ধর্ম নিয়ে।
২. বিশ্বাস করা যে এ হলো আল্লাহর কালাম বা কথা। কোন সৃষ্টির কালাম নয়। জিব্রায়ীল আল্লাহর নিকট হতে শ্রবণ করেছেন। আর রাসূল শ্রবণ করেছেন জিব্রায়ীল থেকে।
৩. বিশ্বাস করা সকল আসমানী কিতাবে বর্ণিত যাবতীয় বিধি-বিধান ঐ জাতির জন্য অবশ্যই পালনীয় ছিল, যাদের উপর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে।
৪. বিশ্বাস করা আল্লাহর সকল কিতাব একটি অপরটিকে সত্যায়ন করে। পরস্পর কোন বিরোধ নেই। তবে বিধি বিধানের ক্ষেত্রে ভিন্নতা তাৎপর্যপূর্ণ বিশেষ কোন কারণে হয়ে থাকে, যা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন।
৫. কিতাবসমূহ হতে যেগুলোর নাম আমারা জানি সেগুলো বিশ্বাস করা। যেমন— • আল কুরআনুল কারীম : যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। • তাওরাত: যা মুসা আলাইহিস সালামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। • ইঞ্জিল: যা ঈসা আলাইহিস সালামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। • যাবুর: যা দাউদ আলাইহিস সালামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। • ইব্রাহিম এবং মূসা আলাইহিস সালামের উপর সহীফাহ সমূহ। এছাড়া সাধারণভাবে ঐ সকল আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ্বাস করা যার নাম আমাদের জানা নেই।
৬. বিশ্বাস করা আসমানী সকল কিতাব এবং তার বিধান রহিত হয়েছে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণের মাধ্যমে। রহিত সে কিতাবগুলোর বিধান অনুসারে আমল কারো জন্য বৈধ নয়। বরং সকলের প্রতি কুরআনের অনুকরণ, অনুসরণ ফরজ। এ একমাত্র কিতাব, যার কার্যকারিতা কেয়ামত অবধি অব্যাহত থাকবে। অন্য কোন কিতাব কুরআনুল কারীমের বিধানকে রহিত করতে পারবে না।
৭. নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত অন্যান্য ঐশী গ্রন্থগুলো বাণী-বক্তব্যের সত্যতার প্রতি কোরআনের মতই বিশ্বাস স্থাপন করা।
৮. এ মত পোষণ করা যে পূর্বের সকল কিতাবে পরিবর্তন-বিকৃতি ঘটেছে। কেননা, যে জাতির নিকট কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল, রক্ষার দায়িত্বও তাদের হাতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কুরআনুল কারীম যাবতীয় বিকৃতি হতে সুরক্ষিত। কেননা, এর রক্ষার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ নিজের কাছে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন— إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ﴿৯﴾ (الحجر: ৯) 'নিশ্চয় আমি এই কোরআনকে অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।'১
মুসলিম জীবনে আসমানী কিতাবসমূহের উপর ঈমানের উপকারিতা আল্লাহ তাআলা তার একান্ত অনুগ্রহে পৃথিবীর তাবৎ জাতির কাছে তাদের জন্য অশেষ মঙ্গলজনক কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এ ব্যাপারে পূর্ণ অবগতি ও জ্ঞান লাভ করা জরুরী।
১. আমাদের এ ব্যাপারে পূর্ণ অবগতি লাভ করতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা আপন প্রজ্ঞায় প্রতিটি জাতির জন্য উপযুক্ত বিধান প্রণয়ন করেছেন, এ তার পূর্ণ প্রজ্ঞারই পরিচায়ক।
২. আল্লাহ যে যাবতীয় সংশয় হতে মুক্ত বিধান সম্বলিত কুরআন আমাদের নবীর উপর অবতীর্ণ করেছেন, সে জন্য তার শোকর আদায় করা। এই কুরআন হলো কিতাব সমূহের মধ্যে অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী এবং এই কুরআন অন্য সকল কিতাবসমূহের প্রকৃত বিধানাবলীর রক্ষক।
৩. কুরআনের মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হওয়া, এবং তার তিলাওয়াত করা, অর্থ বোঝা, মুখস্ত করা, গবেষণা, বিশ্বাস, আমল এবং এ অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করা।
চতুর্থত: নবী ও রাসূলদের প্রতি ঈমান আনয়ন প্রথম রাসূল নূহ আলাইহিস সালাম, প্রমাণ আল্লাহ তাআলা বলেন— إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ ﴿১৬৩﴾ (النساء: ১৬৩) অর্থ: আমি আপনার প্রতি অহী পাঠিয়েছি, যেমন করে অহী পাঠিয়েছিলাম নূহের প্রতি এবং পরবর্তী সমস্ত নবীদের প্রতি যাঁরা তাঁর পরে প্রেরিত হয়েছেন।'১ এবং শেষ নবী ও রাসূল হলেন, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। দলীল: আল্লাহর বাণী— مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ﴿৪০﴾ (الاحزاب: 40) অর্থ: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তির পিতা নয়, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং নবীদের মধ্যে সর্বশেষ নবী। ২ আদম আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর একজন নবী। আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহবান এবং তার সাথে শিরক করা থেকে মুক্ত থাকার আহবানের ক্ষেত্রে সকল নবী-রাসূলের আহবান ছিল অভিন্ন। প্রমাণ হিসেবে নিম্নোক্ত আয়াতটি দ্রষ্টব্য وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ﴿৩৬﴾ . (النحل: ৩৬) ‘নিশ্চয় আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি এই বার্তা দিয়ে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করবে এবং তাগুতকে প্রত্যাখান করবে।’১
তবে বিধি-বিধান এবং অবশ্যই করণীয় ফরজকাজ সমূহের আহবানের ক্ষেত্রে সকলই একই বক্তব্যের অধিকারী ছিলেন না। বরং প্রেক্ষাপট অনুসারে তাদের বক্তব্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন, অবস্থা ভেদে বিবিধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا (المائدة: ৪৮) অর্থ: ‘আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি।’২
নবী রাসূলদের প্রতি ঈমানের প্রকৃতি রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস কতিপয় বিশ্বাসকে বোঝায়। ১. বিশ্বাস করা আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ ﴿২৪﴾ (الفاطর: ২৪) অর্থ: ‘কোন জাতি নেই, যে তার কাছে সর্তককারী প্রেরণ করা হয়নি।’৩ আল্লাহ তাআলা আরো বলেন— وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا (النحل : ৩৬) ‘আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল প্রেরণ করেছি।’৪
২. নবীগণ আল্লাহর কাছ থেকে যা প্রাপ্ত হয়েছেন, তার ব্যাপারে ছিলেন পূর্ণ সত্যবাদী— এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। তাদের ধর্ম ছিল ইসলাম। তাদের আহবান ছিল একত্ববাদ। তাদের যে কোন একজনের রিসালাতকে অস্বীকার এবং মিথ্যা মনে করার অর্থ হচ্ছে সকলের রিসালাত অস্বীকার এবং সকলের প্রতি মিথ্যারোপ করা। ৩. এই অভিমত পোষণ করা যে তারা হলেন নেককার, পরহেজগার রাসূল। আল্লাহ তাদের উত্তম চরিত্র এবং প্রশংসনীয় গুণাবলী দ্বারা শোভিত করেছেন। তাদের কাছে প্রেরিত অহীর সবটুকুই তারা মানুষকে অবগত করিয়েছেন, সামান্যতম গোপনতা, বৃদ্ধি ও কিংবা বিকৃতির আশ্রয় তারা নেননি।
৪. কুরআনুল কারীমে এবং বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমানিত তাদের যে সকল নাম আমরা জানি যেমন: নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, ঈসা, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বিশ্বাস করা। এবং যে সকল নাম আমরা অবগত নই, তাও সাধারণভাবে বিশ্বাস করা।
৫. কুরআনুল কারীম এবং বিশুদ্ধ হাদীসে তাদের সম্পর্কে যে সকল বর্ণনা এসেছে তা গ্রহণ করা।
৬. তাদের মধ্য হতে যাকে আমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে তার শরীয়ত অনুসারে জীবন যাপন করা। তিনি হলেন শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
৭. বিশ্বাস করা যে, তাদের একে অপরের মর্যাদার ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন উলুল আযমবৃন্দ (দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগন) : নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, ঈসা, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আবার কতিপয়কে আল্লাহ তাআলা বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। যেমন ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ কর্তৃক তার বন্ধু বলে সম্বোধন করা; মূসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলা; মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ করা। ইব্রাহীমের মত তাকেও বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা, এবং মেরাজের রজনীতে তার সাথে কথোপকথন— ইত্যাদি।
৮. বিশ্বাস করা যে, কেউ নবী হওয়া তার আপন ইচ্ছাধীন নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছাধীন। কেউ নিজের চেষ্টায় নবী হতে পারবে না। নবুয়্যতপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেসালাতের মধ্য দিয়ে শেষ এবং পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
নবীদের উপর ঈমানের উপকারিতা নবীদের উপর ঈমান আনয়নের অনেক উপকারিতা রয়েছে। তন্মধ্যে—
১. বান্দার উপর আল্লাহ অনুগ্রহ এবং দয়া সম্পর্কে জানা যায় যে, তিনি তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য নবীদের প্রেরণ করেছেন।
২. এ মহা মূল্যবান নেয়ামতের জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৩. প্রত্যেক নবী রাসূলের যোগ্যতানুযায়ী তাদের প্রশংসা, সম্মান এবং মুহাব্বত করা।
৪. আল্লাহ তাআলার যে কোন আদেশ বাস্তবায়নে তাদের কায়মনোবৃত্তিতে আমাদের জন্য মহৎ শিক্ষা নিহিত রয়েছে। যেমন, আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম আ. কর্তৃক তার সন্তানকে কোরবানী করা। আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবানে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়া এবং একাজে যে কোন ধরনের কষ্ট হাসি মুখে সহ্যকরা, ইত্যাদির প্রতি লক্ষ্য রাখা আমাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষনীয়।
৫. আল্লাহর আদেশ পালনের মাধ্যমে রাসূলের মুহাব্বতের প্রকৃত বাস্তবায়নে আগ্রহী হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন— لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا (২১) (الأحزاب: ২১) অর্থ: 'যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।'১
পঞ্চমত: পরকালে বিশ্বাস করা পরকালে বিশ্বাসে কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।
১. পুনরুত্থানে বিশ্বাস: অর্থাৎ একদিন তাবৎ মৃতদের জীবিত করা হবে এবং তারা পুনরুত্থিত হবে বিশ্ব প্রতিপালকের দরবারে নগ্ন পায়ে, উলঙ্গ ও খতনাবিহীন অবস্থায়। আল্লাহ তাআলা বলেন— ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ لَيْمَيِّتُونَ ﴿১৫﴾ ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ ﴿১৬﴾ . (المؤمنون: ১৬-১৫) অর্থ: 'এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। অত:পর কেয়ামতের দিন তোমারা পুনরুত্থিত হবে।'২
২. হিসাব এবং প্রতিদান দিবসে বিশ্বাস করা। বিশ্বাস করা যে আল্লাহ তাআলা বান্দার ভালো এবং মন্দ সকল কাজের হিসাব নিবেন এবং এর জন্য বান্দা শাস্তি অথবা পুরস্কার লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন— فَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَّرَهُ ﴿৭﴾ وَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَهُ ﴿৮﴾ (زلزال : ৮) 'যে সামান্য পরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে এবং যে সামান্য পরিমাণ মন্দ কাজ করবে তাও সে দেখতে পাবে।'১
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন— إِنَّ إِلَيْنَا إِيَابَهُمْ ﴿২৫﴾ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا حِسَابَهُمْ ﴿২৬﴾. (الغاشيه : ২৬-২৫) 'নিশ্চয় তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট, অতঃপর তাদের হিসাব-নিকাশ আমারই দায়িত্ব।'২
৩. জান্নাত এবং জাহান্নামকে সত্য বলে জানা ও বিশ্বাস করা এবং সৃষ্টির জন্য সর্বশেষ ও চিরস্থায়ী আবাসস্থল বলে মনে করা। জান্নাত হলো সুখ, শান্তি আরামের স্থান, যা সৃষ্টি করা হয়েছে ঈমানদারদের জন্য। আর জাহান্নাম হলো দুঃখ, কষ্ট ও অশান্তির স্থান, যা কাফেরদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
৪. যে সকল বিষয় মৃত্যুর পর সংঘটিত হবে বলে আল্লাহ এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন সে সব বিষয়ের উপর ঈমান আনা। যেমন কবরে শান্তি অথবা শান্তি, মুনকার এবং নাকীর ফেরেস্তার প্রশ্ন করা, হাশরের ময়দানে সূর্য একেবারে মাথার নিকটবর্তী হওয়া, পুলসিরাত, মিজান বা পাল্লা, আমলনামা, হাউজে কাউসার, আল্লাহর নবীর সুপারিশ সবই আছে এবং সত্য বলে বিশ্বাস করা।
পরকালে বিশ্বাস দ্বারা লাভ পরকালে বিশ্বাস দ্বারা অনেক লাভ রয়েছে। তন্মধ্যে—
১. পরকালে আল্লাহর পুরষ্কার লাভের আশায় বান্দার নেক আমলে আগ্রহী হওয়া।
২. পরকালে আল্লাহর শাস্তির ভয়ে বান্দার পাপাচার থেকে দূরে থাকা।
৩. পরকালে আল্লাহর দেওয়া অফুরন্ত সুখ, শান্তি অর্জনের আশায় ইহকালের যে আরাম-আয়েশ তার হাতছাড়া হচ্ছে তাতে মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি লাভ করা।
ষষ্ঠ: তাক্বদীর বা নিয়তির উপর বিশ্বাস করা:
তাক্বদীরে বিশ্বাসের অর্থ: আল্লাহর রহস্যগুলোর মধ্যে একটি রহস্য হচ্ছে তাক্বদীর বা নিয়তি। কোন নিকটতম ফেরেস্তা অথবা প্রেরিত রাসূল এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাক্বদীরের উপর ঈমানের অর্থ বান্দা এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ তাআলা তার ইলম এবং প্রজ্ঞার দাবি অনুসারে কি হয়েছে, কি হবে, কি হচ্ছে সব কিছু পূর্বেই তিনি নির্ধারণ করেন।
তাক্বদীরের উপর বিশ্বাসের স্তরসমূহ তাক্বদীরে বিশ্বাসের চারটি স্তর রয়েছে:
১. আল-ইলম বা জানা: এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সৃষ্টির জন্য কোন বস্তু সৃষ্টির পূর্বেই তার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত এবং বিস্তারিত সবকিছুর সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলার অবগত হয়ে থাকেন। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا ﴿৪০﴾ (الأحزاب: ৪০) 'আল্লাহ সর্ব বিষয় জ্ঞাত'।'১
২. আল-কিতাবাহ বা লিখন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য আকাশ এবং পৃথিবীসমূহ সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলার সব কিছু লাউহে মাহফুজে লেখে রেখেছেন। দলীল, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى الله يَسِيرٌ ﴿২২﴾ . ( الحديد: ২২) অর্থ: পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর এমন কোন বিপদ আসে না, যা জগত সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। নিশ্চয় এ আল্লাহর পক্ষে সহজ।২
৩. আল-মাশিয়‍্যাত বা ইচ্ছা: এর উদ্দেশ্য আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তাই হয়, আর তিনি যা ইচ্ছে করেন না তা কখনোই হয় না। দলীল, আল্লাহর বাণী وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ﴿৬৮﴾ . (القصص: ৬৮) অর্থ: 'আপনার প্রভু যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন'।৩
৪. আল-খালকু বা সৃষ্টি: এর উদ্দেশ্য সারা জগত তার সকল অস্তিত্ব, রূপ এবং কর্মসহ একমাত্র আল্লাহরই সৃষ্টি বা মাখলুক। দলীল, আল্লাহ তাআলা বলেন— وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا ﴿২﴾ . (الفرقان: ২) অর্থ: 'তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন, অত:পর শোধিত করেছে পরিমিতভাবে।'১
তাক্বদীরে বিশ্বাস দ্বারা লাভ তাক্বদীরে বিশ্বাস দ্বারা অনেক লাভ রয়েছে। তন্মধ্যে—
১. বান্দা আল্লাহর বড়ত্ব সম্পর্কে পরিচয় লাভ করে, এবং তার জ্ঞানের প্রশস্ত তা, ব্যাপকতা এবং জগতে ছোট-বড় সব কিছু তার আয়ত্বে তা সম্পর্কে জানে। আরো জানে তার রাজত্বের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে যে, তার অনুমতি ছাড়া সেখানে কোন কিছুই সংঘঠিত হয় না।
২. বান্দা তার সকল কাজে একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপর নির্ভর করবে। কোন বস্তুর উপর নয়। কারণ সব কিছুই আল্লাহরই কুদরতে চলে।
৩. মানুষ কোন কাজে সফলতা পেলে অহংকার করবে না। কারণ এ সফলতা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর অনুগ্রহ মাত্র। আল্লাহই তাকে এই কাজ করার যোগ্যতা ও তাওফীক দান করেছেন।
৪. কোন প্রিয় বস্তুর বিরহ অথবা কোন বিপদ দেখা দিলে আত্মার দৃঢ়তা ও প্রশান্তি লাভ হয়। কারণ সে বিশ্বাস করে সকল কিছুই আল্লাহর ইচ্ছা এবং হুকুমে হচ্ছে।
তাক্বদীরে নির্ভরতার যুক্তি দেখানোর শরয়ী বিধান তাক্বদীরে বিশ্বাসীর উপর অপরিহার্য যে, সে তাক্বদীরকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করে, ওয়াজিব এবং হারাম কাজে জড়িত হতে পারবে না এবং নেক কাজে অলসতা প্রদর্শন সে করবে না।
سئل النبي صلي الله عليه وسلم : أعلم أهل الجنة من أهل النار؟ قال: نعم قال: ففيم يعلم العاملون؟ قال: كل ميسر لما خلق له. (البخاري و مسلم)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, কে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর কে জাহান্নামে যাবে তা কি জানানো হয়েছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, প্রশ্নকারী বলল: তাহলে আমলের প্রয়োজন কি? উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রত্যেকের জন্য সে পথে গমন সহজ করা হয়েছে যে উদ্দেশ্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।'১
যে ব্যক্তি তাক্বদীরকে গুনাহের কাজের বৈধতার যুক্তি হিসাবে পেশ করে, সে বলে আল্লাহ পাপ কাজ করাকে আমার নিয়তিতে লিপিবদ্ধ করেছেন, তাই আমি তা ছাড়বো কিভাবে? এই ব্যক্তির অবস্থা হল, কেউ যদি জোরপূর্বক তার সম্পত্তি নিয়ে যায়, অথবা তার ইজ্জতহানী করে, সে বলে না এটা আমার নিয়তিতে ছিল, করার কিছুই নেই। বরং সে তার সম্পদ উদ্ধার এবং অপরাধীর বিচারের চেষ্টা চালিয়ে যায়। সুতরাং, তাক্বদীরের দোহাই দিয়ে গুনাহ করা কিভাবে বৈধ হবে? আর সে যখন কোন গুনাহ করে বলবে, এটা আমার তাক্বদীরে ছিল? অতঃপর তার গুনাহের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বুঝার বিষয় হল মানুষ জানে না ভবিষ্যতে কি হবে? তাহলে সে কিভাবে মনে করে যে, আল্লাহ তার নিয়তিতে গুনাহ করা লিপিবদ্ধ করেছেন এবং সে গুনাহ পরিত্যাগ করে না। আল্লাহ তাআলা রাসূল প্রেরণ করেছেন, কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। সিরাতে মুস্তাকীমের বর্ণনা দিয়েছেন। আকল-বুদ্ধি, চোখ, কান দান করেছেন। ভালো-মন্দ যাচাই করে চলার যোগ্যতাও আল্লাহ তাআলা মানুষকে দিয়েছেন। অতএব এই সব বলে কেউ তার দায়িত্ব এড়াতে পারবে না। আমাদের জানা দরকার বিবাহ ছাড়া যেমন সন্তান আসে না, খাবার ছাড়া যেমন পরিতৃপ্তি আসে না, তেমনি আল্লাহর আদেশগুলো বাস্তবায়ন এবং নিষেধগুলো বর্জন ছাড়া জান্নাতে যাওয়া যাবে না। তাই মানুষের জন্য অবশ্যই করণীয় হল আল্লাহ খুশি হন এমন কাজ করা এবং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কাজ বর্জন করে জান্নাতের অনুসন্ধান করা এবং এই জন্য আল্লাহ তাআলার সাহায্য কামনা করা। দুর্বলতা এবং অলসতা পরিহার করা। বাসনা করলেই জান্নাতে যাওয়া যাবে না। কারণ এটা আল্লাহর পণ্য। আর আল্লাহর পণ্য খুবই মূল্যবান।
হ্যাঁ, দুনিয়াতে বিপদ আপদ তো আসবেই। এটা দূর করা সম্ভব নয়। মানুষের জানা উচিত বিপদ আপদ তাক্বদীরে আছে বলেই হয়। তখন বলবে "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন"। বিপদে ধৈর্যধারণ করা, খুশি থাকা, মেনে নেওয়া পাক্কা ঈমানদারের কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— المؤمن القوي خير وأحب إلى الله من المؤمن الضعيف، وفي كل خير، احرص على ما ينفعك، واستعن بالله ولا تعجز، و إن أصابك شيئ فلا تقل : لو أني فعلت كذا وكذا ولكن قل: قدر الله وما شاء الله فعل فإن لو تفتح عمل الشيطان. (رواه مسلم) দূর্বল মুমিনের তুলনায় সবল মুমিন উত্তম এবং আল্লাহর প্রিয়। প্রত্যেকের মাঝেই কল্যান রয়েছে। তুমি প্রচেষ্টা কর তোমার মঙ্গলের জন্য। এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা কর। অক্ষমতা প্রকাশ করো না। আর যদি তোমার কোন বিপদ দেখা দেয় বলো না, "যদি আমি এভাবে করতাম তাহলে এরকম হতো। বরং বল: আল্লাহই আমার নিয়তিতে এটা রেখেছেন। আর আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন। কারণ 'যদি' শব্দটি শয়তানের কাজের পথ খুলে দেয়।'১

টিকাঃ
১ মুসলিম: ৯
২ মুসলিম: ৫১
১ সুরা: শুরা আয়াত- ১১
১ সুরা: আল মুদ্দাসসির: আয়াত: ৩১
১ সুরা: আল-আনফাল: আয়াত: ১২
১ সুরা: হিজর: আয়াত: ৯
১ সুরা: হিজর: আয়াত: ৯
১ সূরা: আন-নিসা, আয়াত:১৬৩
২ সূরা: আল আহযাব আয়াত-৪০
১ সূরা: আল নাহল: আয়াত-৩৬
২ সূরা: আল মায়েদা: আয়াত- ৪৮
৩ সূরা: আল-ফাতির-২৪
৪ সূরা: নাহল আয়াত-৩৬
১ সূরা: আল আহযাব: আয়াত-২১
২ সূরা: আল মুমিনুন, আয়াত- ১৫-১৬
১ সূরা: সুরা যিলযাল, আয়াত-৮
২ সূরা: আল-গাশিয়াহ, আয়াত:২৫-২৬
১ সূরা: আল-আহজাব, আয়াত-৪০
২ সূরা: আল হাদীদ, আয়াত- ২২
৩ সূরা আল-কাসাস, আয়াত-৬৮
১ সূরা: আল-ফোরকান, আয়াত-২
১ বুখারী ও মুসলিম
১ মুসলিম

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 সাহাবি বর্গ ও নবি পরিবার সংক্রান্ত আকিদা

📄 সাহাবি বর্গ ও নবি পরিবার সংক্রান্ত আকিদা


'আল-ওয়ালা ওয়াল বারা' ইসলামী ধর্ম-বিশ্বাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক। 'আল-ওয়ালা' শব্দের অর্থ বন্ধুত্ব স্থাপন ও আল-বারা শব্দের অর্থ শত্রুতা বা সম্পর্কচ্ছেদ।
মুসলমানের বাস্তব জীবনে আল্লাহর জন্য ওয়ালা এবং বারা বা আল্লাহর জন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্যই কারো সাথে শত্রুতার যে ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল, তা মুছে যাওয়া এবং দুর্বল হয়ে যাওয়ার বড় কারন হল আল্লাহর জন্য মুসলমানের ইবাদাত এবং মুহব্বত কমে যাওয়া। কারণ আল্লাহর ইবাদত ও তার জন্য ভালোবাসা হলো সবকিছুর মুল। এ থেকেই মুহাব্বত বা কারো সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং ঘৃণা বা কারো সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করন বেরিয়ে আসে। যখনই কোন ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর জন্য ইবাদত এবং মুহাব্বতে পূর্ণতা আসে, তখনই সে ওয়ালা এবং বারার ক্ষেত্রে অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখে। যখনই মুসলমানের মধ্যে পদ, নারী এবং সম্পদের আসক্তি গভীর ভাবে প্রবেশ করল, এবং মনচাই জীবন যাপনের টোপ তারা গিলে ফেলল, তখন তারা মনের ইচ্ছা এবং প্রবৃত্তি মতো যার তার সাথে বন্ধুত্ব এবং সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা শুরু করে দিল। ঐ সকল জাগতিক প্রিয় বস্তুর মধ্যে নিমগ্ন হওয়ার কারণে আল্লাহর জন্য উবুদিয়্যাত বা দাসত্বিতে দুর্বলতা আসল।
বন্ধ হয়ে পড়ল তাদের মধ্যে আল্লাহর এবাদত এবং মুহাব্বত। অতঃপর আল্লাহর জন্য শত্রুতার যে ঐতিহ্য তাদের মধ্যে ছিল তা মারাত্মক ভাবে কমে গেল। অতএব আমরা বলতে পারি আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব আল্লাহর জন্যই শত্রুতা এবং তার উপকরণ সমূহের মূলত: জন্মই হয় আল্লাহর মুহাব্বত ও ইবাদত থেকে। জানা উচিত ওয়ালা ও বারা ঈমানের অংশ। বরং ঈমানের জন্য শর্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন— তَرَى كَثِيرًا مِنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنْفُسُهُمْ أَنْ سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ ﴿৮০﴾ وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِنْهُمْ فَاسِقُونَ ﴿৮১﴾. “আপনি তাদের অনেককে দেখবেন কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে। যদি তারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত এবং যা রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি তবে তারা কাফেরেদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচার।'১
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, শর্তবোধক বাক্যের দাবি হল শর্ত পাওয়া গেলে শর্তাধীন বস্তুটিও পাওয়া যাবে। অন্যথায় নয়। যা আল্লাহর বাণী وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِنْهُمْ فَاسِقُونَ ﴿المائدة : ৮১﴾. মধ্যে আরবী হরফ (লাও) থেকে বোঝায়। যার অর্থ: যদি তারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত তবে কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহন করত না। এতে বুঝা যায় অন্তরে আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং কাফেরদের সাথে সম্পর্ক এক সঙ্গে অবস্থান করতে পারে না। আরো বুঝা যায়, যারা কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে তারা আল্লাহ এবং নবী স. এবং নবীর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমানের যে দাবী, তা তারা পালন করছে না। আরো জানা উচিত যে, আল-ওয়ালা এবং আল-বারা ঈমানের অধিকতর নিরাপদ বন্ধন। যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: أوثق عرى الإيمان الحب في الله والبغض في الله অর্থাৎ ঈমানের অধিকতর নিরাপদ বন্ধন হলো আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা।২
'দ্বীনের পূর্ণতা, জিহাদি ঝান্ডার প্রতিষ্ঠা অথবা সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধ মিশন সফল হবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব, আল্লাহর জন্য শত্রুতার নীতি গ্রহণ করা হবে। শত্রু-মিত্রের বিচার না করে সব মানুষ যদি সঠিক পথের অনুসারী হতো তবে হক্ক-বাতিল, ঈমান-কুফুর, আল্লাহর বন্ধু এবং শয়তানের বন্ধুর মাঝে কোন পার্থক্য যুগ যুগ ধরে চলে আসত না' । ১
আবু ওয়াফা বিন আকীল (মৃত্যু: ৫১৩ হিঃ) এর একটি বাক্য লক্ষ্য করুন। তিনি বলেন— "কোন জনপদের অধিবাসীদের ইসলাম সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে যদি ইচ্ছে করেন, তবে মসজিদে তাদের ভীড় দেখে এবং আরাফার মাঠে গিয়ে প্রকম্পিত আওয়াজে তাদের লাব্বাইক আওয়াজ দেখে নয়। বরং এজন্য দৃষ্টি দিবে ইসলামী শরীয়তের শত্রুদের সাথে তাদের অবস্থানের উপর।" ইবনে আল রুয়ান্দি, আল মুয়ারী তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, তারা গদ্যে এবং পদ্যে নাস্তিকতা ছড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। মেলাতে আসা মাত্রই চড়া দামে তাদের বই বিক্রয় হয়ে যেত। ভোগ বিলাসে তাদের জীবন কেটেছে। তাদের সমাধিতে স্মৃতিসৌধও নির্মান হয়েছিল। এ সব তাদের ও ঐ জনপদের অধিবাসীদের ঈমানের প্রদিপ শীতল হওয়ার প্রমাণ বহন করে। ২
'আল-ওয়ালা আল-বারা'র অর্থ: ওয়ালা অর্থ: হৃদ্যতা, বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠতা। বারা অর্থ: ঘৃণা, শত্রুতা, দূরত্ব। মূলত: ওয়ালা এবং বারা হচ্ছে মনের বিষয়। তবে তা মুখে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তা প্রকাশ পায়। ওয়ালা বা বন্ধুত্ব আল্লাহ তাআলা, তার রাসুল সা. এবং মুমিনদের জন্য হয়ে থাকে— ﴿إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا المائدة : ৫৫ ﴾ "নিশ্চয় তোমাদের বন্ধু হল আল্লাহ, তার রাসুল এবং যারা ঈমানদার"। ৩ মুমিনদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রকাশের মাধ্যম হলো ঈমানের কারনে তাদেরকে ভালবাসা, তাদেরকে সাহায্য করা, তাদের উপর অনুগ্রহ করা, তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করা, তাদের জন্য দোয়া করা, তাদেরকে সালাম দেয়া, তাদের অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, তাদের মৃত ব্যক্তির কাফন দাফনের ব্যবস্থা করা, তাদের সার্বিক খোজ খবর রাখার ইত্যাদি।
কাফেরদের সাথে শত্রুতা প্রকাশের নীতির উদ্দেশ্য হল তারা কাফের এজন্য ঘৃণা প্রকাশ করা, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য না করা, তাদেরকে আগে সালাম না দেওয়া, তাদের অনুগত না হওয়া, অথবা তাদের কারণে গর্ববোধ প্রকাশ না করা, তাদের অনুকরন থেকে দূরে থাকা, ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক হাত, মুখ এবং সম্পদের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, প্রয়োজনে কুফুরী রাষ্ট্র বা সরকার থেকে ইসলামী রাষ্ট্র বা সরকারে হিজরত করা। এছাড়া কাফের হওয়ার কারণে শত্রুতা প্রকাশের আরো যত মাধ্যম আছে তা ব্যবহার করে শত্রুতা প্রকাশ করা। বিস্তারিত আল্লামা কাহতানীর আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা অথবা আল্লামা জালউদ এর 'কিতাবুল মুআলাত ওয়াল মুআদাত' দেখুন।
আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত এর জন্য আল-ওয়ালা আহলে সুন্নত ওয়াল-জামাত মানুষকে দয়া করেন। এবং তারা হক বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন। মুমিনদের প্রতি তারা যত্নবান। তারা মধ্যপন্থী, সহানুভূতিশীল, কল্যাণকামী ও সুপরামর্শদাতা। তারা সকল মুসলমানকে একটি দেহ মনে করেন। যখনই দেহের কোন অংশে ব্যথা হয় তখন সমস্ত দেহে তা অনুভব হয়। আল্লামা আইয়্যুব সাখতীয়ানী বলেন; إنه ليبلغني عن الرجل من أهل السنة إنه مات فكأنها فقدت بعض أعضائي. যখন আমার কাছে কোন আহলেসুন্নাত ওয়ালজামাতের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছে। তখন আমার মনে হয় আমি আমার একটি অঙ্গ হারিয়ে ফেলেছি।'১ (কাওয়ামুস সুন্নাহ) বা হাদীসের অভিভাবক বলে সুপ্রসিদ্ধ আল্লামা ইসমাঈল আল আসফাহানী বলেন و على المرء محبة أهل السنة في أي موضع كانوا رجاء محبة الله له.... একজন ব্যক্তির জন্য অবশ্যই কর্তব্য হকপন্থী আলেম সমাজকে মুহাব্বত করা। সে যেখানে থাকুক না কেন। এ আশায় যে আল্লাহ তাআলা তাকে মুহাব্বত করবেন।১ রাসুল (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন: আমার মুহাব্বত তাদের জন্য ওয়াজিব যারা আমার জন্য পরস্পরের সাথে উঠা বসা করে আমার জন্য পরস্পরের সাথে সাক্ষাত করে।'১
এমনিভাবে একজন ব্যাক্তির অবশ্যই কর্তব্য বিদাআতপন্থীদের ঘৃণা করা, সে যেখানেই থাকুকনা কেন। যেন সে আল্লাহর জন্য কাউকে মুহাব্বত, আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করে এমন ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অর্ন্তভূক্ত হতে পারে। হকপন্থীদের মধ্যে আল-ওয়ালা এর উপস্থিতির কারণ হল, তাদের মানহাজ বা কর্মপন্থা এক, প্রমাণ উপস্থাপন এবং গ্রহণের পথও অভিন্ন। আক্বীদাহ বা ধর্ম বিশ্বাস, শরীয়ত ও আচরণেও তারা একই মত পোষণ করে থাকেন।
উল্লেখিত যে, আল-ওয়ালা দ্বারা ঈমানের বন্ধন অব্যাহত থাকে এবং স্থায়ী হয়। কারণ আল-ওয়ালা এবং আল-বারা দ্বারা উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ তাআলা হলেন, আলআখির বা যার পর আর কিছু নেই। যার লয় নেই, ক্ষয় নেই। আল্লাহ ছাড়া অন্যের সাথে সম্পর্ক এরূপ হয় না। ঐ সকল সম্পর্ক খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়। এবং ইহকাল, পরকাল উভয় জগতে এ সকল বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিণত হতে পারে।
কাফির সম্প্রদায় আমাদের শত্রু অতীতেও ছিল বর্তমানেও আছে। চাই তা জাতিগত ভাবে হোক। যেমন: ইহুদী এবং খ্রীষ্টান অথবা স্বধর্মত্যাগী হোক। আল্লাহ তাআলা বলেন:— لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهَ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللهُ نَفْسَهُ وَإِلَى الله المَصِيرُ ﴿২৮﴾ (آل عمران : ২৮). মুমিনগণ যেন অন্য মুমিন ছেড়ে কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে। আল্লাহ তাআলা, তার সম্পর্কে তোমাদের সর্তক করেছেন এবং সবাইকে তার কাছেই ফিরে যেতে হবে।'১
“এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাম ইবনুল কাসীর রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের নিষেধ করেছেন কাফেরদের পক্ষ সমর্থন করতে। তাদের ভালবাসতে, গোপনে তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাতে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এই বলে অঙ্গীকার করেছেন, যারা এইরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। অর্থাৎ যে ওয়ালা এবং বারার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআ'লার হুকুম মান্য করেনা, আল্লাহ তাআলা তার কোন দায়ভার নিবেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوا اللَّهَ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُبِينًا .(النساء : ১৪৪) অর্থ: হে ঈমানদারগন! তোমরা মুমিনগন ব্যতীত কাফেরদেরকে বন্ধু বানিওনা। তোমরা কি এমনটি করে নিজের উপর আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য দলীল কায়েম করে দিবে?২
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَهَّمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ (المائدة: ৫১) অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।৩
এটাই সত্য ও বাস্তবতা যার বিপরীত আজ অবধি লক্ষ্য করা যায়নি। যে কাফের সম্প্রদায় আমাদের শত্রু, আমাদের প্রতিপক্ষ, যা পবিত্র কোরআনের বহু আয়াত দ্বারা স্থির করা হয়েছে। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন— إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوٌّا مُبِينًا ﴿১০১﴾ (النساء : ১০১) অর্থ: নিশ্চয় কাফের সম্প্রদায় তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।১ আল্লাহ তাআলা বলেন— لَا يَرْقُبُونَ فِي مُؤْمِنٍ إِلَّا وَلَا ذِمَّةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُعْتَدُونَ ﴿১০﴾ (التوبة : ১০) অর্থ: তারা মর্যাদা দেয় না কোন মুসলমানের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার আর না অঙ্গীকারের। আর তারাই সীমা লঙ্গনকারী।
আল্লাহ তাআলা বলেন— مَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَلَا الْمُشْرِكِينَ أَنْ يُنَزَّلَ عَلَيْكُمْ مِنْ خَيْرٍ مِنْ رَبِّكُمْ ১০৫﴾ (البقرة : ১০৫) অর্থ: আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃষ্টান) ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের তাদের মনঃপুত নয় যে, তোমাদের পালনককর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হোক।৩
আল্লাহ বলেন— وَدَّ كَثِيرٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُمْ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقِّ ﴿১০৯﴾ (البقرة : ১০৯) অর্থ: আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃষ্টান) দের অনেকেই প্রতিহিংসাবশত: চায় যে, মুসলমান হবার পর তোমাদেরকে কোন রকমে কাফের বানিয়ে দেয়। তাদের কাছে সত্য প্রমাণিত হবার পর।৪
এইভাবে আল্লাহ তাআলা কাফিরদের থেকে আমাদের কে সতর্ক করেছেন। أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ﴿১৪﴾ (الملك : ১৪) অর্থ: তিনি কি জানবেন না, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি সূক্ষ্ম জ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত।৫
আপনার হৃদয়কে বুঝানোর জন্য আপনি অতীত ও বর্তমানের ইতিহাস দেখতে পারেন। দেখতে পাবেন, অতীতে কাফের সম্প্রদায় কি করেছে, বর্তমানে কি করছে এবং ভবিষ্যতে তারা কি না করবে? আল্লাহ তাআলা ইমাম ইবনুল কাইয়্যুমকে রহম করুন, যখন তিনি তার কিতাবে বিভিন্ন অধ্যায় করতে লাগলেন, তন্মধ্যে একটি অধ্যায় করলেন এভাবে: فصل في سياق الآيات الدالة على غش أهل الذمة للمسلمين وعداوتهم وخيانتهم وتمنيهم السوء لهم، معاداة الرب تعالى لمن أعزهم أو والاهم أو ولاهم أمر المسلمين অর্থ: এই অধ্যায় ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিম সম্প্রদায় কর্তৃক মুসলমানদের সাথে প্রতারণা, শত্রুতা, বিশ্বাসঘাতকতা, বিপদ কামনা, মুসলমানদের কাউকে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক সম্মানিত অথবা তার বন্ধু অথবা মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান বানানোর কারণে আল্লাহ তাআলার সাথে দুশমনি সম্বলিত পবিত্র কোরআনের আয়াত প্রসঙ্গে।'১
আল-ওয়ালা এবং আল-বারার মানদন্ডে মানুষের শ্রেণীবিভক্তি ওয়ালাএবং বারার মানদন্ডে মানুষ তিন প্রকার।
(এক) প্রকৃত ঈমানদার এবং সুযোগ্য ব্যক্তিবর্গ। আমাদের অবশ্যই কর্তব্য হচ্ছে তাদেরকে মুহাব্বত করা। তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা।
(দুই) কাফির এবং মুনাফেক। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তাদেরকে অপছন্দ করা। তাদের থেকে নিরাপদ থাকা।
(তিন) দোষ-ত্রুটি মিশ্রিত। যাদের জীবনে ভালো এবং মন্দ উভয়টা বিরাজ করছে। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তাদের ঈমান তাক্বওয়া ও পরহেজগারী অনুপাতে তাদের মুহাব্বত করা। আবার গুনাহে পাপাচারে জড়িত হবার কারণে সে অনুপাতে তাদের অপছন্দ করা এবং বিরোধিতা করা।
কাফিরদের সাথে মুআলাত বা বন্ধুত্বের বিভিন্ন দিক কাফিরদের সাথে বন্ধুত্বের বিভিন্ন শাখা এবং রূপ রয়েছে। আল্লামা আব্দুল লতিফ বিন আব্দুর রহমান বিন হাসান এই প্রসঙ্গে বলেন, মুআলাত বা বন্ধুত্ব নামক কাজটি বিভিন্ন মানের হতে পারে। (এক) বন্ধুত্বটি সমপূর্ণভাবে ইসলাম থেকে বাহির এবং স্বধর্মত্যাগকে অপরিহার্য করে দেয়। (দুই) বন্ধুত্বটি মানের দিক দিয়ে প্রথমটির চেয়ে নিম্নে, যা দ্বারা হারাম কাজ এবং কবিরা গোনাহে জড়িয়ে পড়ে।'১ কাফিরদের সাথে যে সব সম্পর্ক স্বধর্ম থেকে বাহির হওয়াকে অপরিহার্য করে দেয়। (১) তন্মধ্যে মুশরিকদের সমর্থন করা এবং মুসলমানদের বিপক্ষে তাদের সহায়তা করা। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ (المائدة : ৫১) অর্থ: তাদের সাথে যে বন্ধুত্ব করবে সে তাদেরই অর্ন্তভূক্ত হবে।'২ (২) আরেকটি হলো কাফেরদের কাফের না বলা। তাদের কুফুরীর ব্যাপারে নিরব থাকা। অথবা সন্দিহান হওয়া। এবং তাদের মতামতকে সবল করা।৩ (৩) এমনিভাবে কুফুরী করার কারণে কাফেরদেরকে মুহাব্বত করা। (৪) মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের বিজয় কামনা করা।৪
আল-ওয়ালা এবং আল-বারার বিশ্বাসের উপকারিতাঃ এ নীতির উপর অবস্থানের উপকার হল: (১) ঈমানের দৃঢ়তা অর্জন, দয়াময় করুনাময় আল্লাহর সন্তুষ্টি দ্বারা সাফল্য লাভ, এবং মহা প্রতাপশালী আল্লাহর অসন্তুষ্টি হতে মুক্তিলাভ করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— তَرَى كَثِيرًا مِنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّমَتْ لَهُمْ أَنْفُسُهُمْ أَنْ سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ ﴿৮০﴾ وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِنْهُمْ فَاسِقُونَ ﴿৮১﴾.(المائدة : ৮০-৮১) আপনি তাদের অনেককে দেখবেন কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে, তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন। এবং চিরকাল তারা শান্তি ভোগ করতে থাকড়ো। যদি তারা আল্লাহর প্রতি এবং রাসূলের প্রতি এবং রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচার।'১
(২) বিপদাপদ থেকে নিরাপত্তা লাভ। وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ إِلَّا تَفْعَلُوهُ تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ (الأنفال : ৭৩) অর্থ: আর যারা কুফরী করেছে তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমরা যদি (উপরোক্ত) বিধান কার্যকর না কর তবে পৃথিবীতে ফিৎনা ও মহাবিপর্যয় দেখা দিবে।২ আল্লামা ইবনু কাসীর রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: অর্থাৎ মুশরিক থেকে তোমরা সকলে দূরে থাকবে। মুমিনদের বন্ধু বানাবে। না হয় মানুষের মধ্যে ফেৎনা বিস্তার করবে। আর তাহলো কাজ দূর্বোধ্য হওয়া এবং কাফিরদের সাথে মুমিনদের গোলমাল সৃষ্টি হওয়া। এতে করে মানুষের মধ্যে ফাসাদ অরাজগতা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে।৩
(৩) দুনিয়াতে সচ্ছলতা সমৃদ্ধি অর্জন ও উভয় জগতে সম্মানজনক অবস্থান লাভ। জনৈক বিদ্ধান বলেন— আল্লাহ তাআলা ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যে বর্ননা দিয়েছেন তাতে একটু চিন্তা করুন। আল্লাহ বলেন— فَلَمَّا اعْتَزَلَهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَكُلًّا جَعَلْنَا نَبِيًّا ﴿৪৯﴾ وَوَهَبْنَا هُمْ مِنْ رَحْمَتِنَا وَجَعَلْنَا لَهُمْ لِسَانَ صِدْقٍ عَلِيًّا ﴿৫০﴾ . (مريم : ৪৯ -৫০) অর্থঃ অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে এবং তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের এবাদত করত, তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করলেন, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং প্রত্যেককে নবী করলাম। আমি তাদেরকে দান করলাম আমার অনুগ্রহ এবং তাদেরকে দিলাম সমুচ্চ সু-খ্যাতি। ৪
এতে প্রতীয়মান হয় যে, কাফের থেকে দূরে থাকা সকল সচ্ছলতা ও সম্মানের কারণ। তিনি আরো বললেন, জেনে রাখুন আল্লাহর শত্রুদের থেকে দূরে থাকা, তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যেই দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা। এটা আল্লাহর বাণী— وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنْصَرُونَ. (هود: ১১৩) 'আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, অন্যথায় তোমাদের দোযখের আগুন স্পর্ষ করবে, আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কেউ সহায় হবে না, অতঃপর তোমাদের কোন সাহায্যও করা হবে না।'
এটা সুস্পষ্ট উম্মতের যে সকল মহান ব্যক্তিবর্গ কথায় ও কাজে এই বিষয়টি বাস্তবায়ন করেছেন, আজো আমরা তাদের জন্য দোয়া করি, তাদেরকে ভালো ভাবে স্মরণ করি। এবং সারা জাহানে মানুষের আলোচনায় ভালো হিসাবেই আলোচিত হয়। আল্লাহর সাহায্য এবং পরিণতিতে তাদের বিজয় তো আছেই।
আমিরুল মোমিনীন আবু বকর রা. এর অবস্থানকে চিন্তা করুন। তিনি ধর্মত্যাগী ও জাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে যখন অবস্থান নিলেন আল্লাহ তাকে সাহায্য করলেন এবং তার এই পদক্ষেপের উসিলায় দ্বীনে ইসলামকে শক্তিশালী করলেন। আহলুস সুন্নাহর ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর অবস্থান দেখুন: তিনি বেদআতী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা নিয়ে ছিলেন। তিনি তাদের সাথে তেল মাখামাখি করেননি, আপোষ করেননি, ও নিজ অবস্থান থেকে একটুও নড়েননি। আল্লাহ তাআলা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতকে বিজয় দান করেন। বাতিলকে পরাজিত করেন। মহাবীর সালাহুদ্দীন আইয়্যুবীর অবস্থান লক্ষ করুন। তিনি মুসলমান জাতির এই ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার জন্যই ক্রসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। আল্লাহ তাআলা তাকে বিজয় দান করেন এবং কাফেরদের ধ্বংস করেন। এ রকম উদাহরণ অনেক পাওয়া যাবে।
কুফুর এবং কাফিরদের পরিত্যাগের দৃষ্টান্ত আল্লাহ তাআলা এই মহা ঐতিহ্য, এবং এই ক্ষেত্রে তার প্রেরিত নবী-রাসূলগণ তার আদেশ কিভাবে কার্যকর করেছেন, তা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে আল্লাহর বাণী— قُلْ إِنَّمَا هُوَ إِلَهُ وَاحِدٌ وَإِنَّنِي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ ﴿১৯﴾ (الانعام: ১৯) 'আপনি বলে দিন তিনি একমাত্র উপাস্য। আমি অবশ্যই তোমাদের শিরক থেকে মুক্ত।'১ ইব্রাহিম আ: সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ ﴿৭৮﴾ الأنعাম: ৭৮) 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যে সব বিষয়কে শিরক কর, আমি ঐ সব থেকে মুক্ত।২
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَاءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهَ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهَ وَحْدَهُ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ ﴿৪﴾. (الممتحنة : ৪) 'তোমাদের জন্য ইব্রাহিম এবং তার অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ; তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানিনা। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হল শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য, যদি না তোমরা এক আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তবে ব্যতিক্রম তার পিতার প্রতি ইব্রাহিম এর উক্তিঃ আমি নিশ্চয়ই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং তোমার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট কোন অধিকার রাখি না। হে আমাদের পালনকর্তা! আমারা তো আপনারই উপর নির্ভর করেছি আপনারই অভিমুখী হয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন তো আপনারই নিকট।৩
অতএব মুসলমানদের জন্য ইব্রাহিমের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। তা হলো, আল্লাহ তাআলার সাথে এবং তার মুমিন বান্দাদের সাথে বন্ধুত্ব সৃষ্টি আর কাফের ও মুশরিকদের প্রত্যাখ্যান ক্ষেত্রে। শুধু মাত্র একটি বিষয় ব্যতীত, আর তা হল ইব্রাহিম আ: তার কাফের পিতার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। এক্ষেত্রে তার অনুসরণ করা হবে না। অন্য আয়াতে ইব্রাহিম আ: তার পিতার জন্য যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন— وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ اللَّهُ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ. (التوبة: ১১৪) অর্থ: আর ইব্রাহিম কর্তৃক স্বীয় পিতার মাগফেরাত কামনা ছিল কেবল সেই প্রতিশ্রুতির কারণে, যা তিনি তার সাথে করেছিলেন। অত:পর যখন তার কাছে এ কথা প্রকাশ পেল যে, সে আল্লাহ তাআলার শত্রু, তখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিলেন। নিঃসন্দেহে ইব্রাহিম ছিলেন বড় কোমল হৃদয়, সহনশীল।'১
এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর নবী ইব্রাহিম আ. আল-ওয়ালা এবং আল-বারাকে খুবই গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করেছেন। এমনকি যখন তার নিকট পরিষ্কার হল যে তার পিতা আল্লাহ তাআলার শত্রু তৎক্ষনাত তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন— أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ إِنِ افْتَرَيْتُهُ فَعَلَيَّ إِجْرَامِي وَأَنَا بَرِيءٌ مِمَّا تُجْرِمُونَ ﴿৩৫﴾ (هود: ৩৫) 'তারা কি বলে, আপনি কোরআন রচনা করে এনেছেন? আপনি বলে দিন আমি যদি রচনা করে এনে থাকি, তবে সে অপরাধ আমার উপর বর্তাবে। আর তোমরা যে সব অপরাধ কর, তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।'২ প্রখ্যাত তাফসীরকারক আল্লামা শেখ সাআদী বলেন, এই আয়াত দ্বারা নূহ আ. ও উদ্দেশ্য হতে পারেন। এবং আমাদের নবী মুহাম্মদ সা. ও উদ্দেশ্য হতে পারেন।
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা ফেরআউনকে মুসা আ. এর শত্রু বলে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, أَنِ اقْذِ فِيهِ فِي التَّابُوتِ فَاقْذِفِيهِ فِي الْيَمِّ فَلْيُلْقِهِ الْيَمُّ بِالسَّاحِلِ يَأْخُذْهُ عَدُوٌّ لِي وَعَدُوٌّ لَهُ. (طه: ৩৯) 'যে তুমি মুসাকে সিন্দুকে রাখ, অতঃপর তা দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও। অতঃপর দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দিবে। তাকে আমার শত্রু ও তার শত্রু উঠিয়ে নিবে।'১ এরকমই ছিল পূর্বেকার নবী রাসূল আ. দের বৈশিষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন, أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهِ ﴿১০﴾ (الانعام: ৯০) এরা এমন ছিল যাদেরকে আল্লাহ তাআলা পথ প্রদর্শন করেছিলেন। অতএব আপনিও তাদের পথ অনুসরন করুন।২
এমনিভাবে আল-ওয়ালা এবং আল-বারা বাস্তবায়নে মুহাম্মদ সা. এর গৌরবময় জীবনীতে বিস্ময়কর দৃষ্টান্তের সমাবেশ ঘটেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهَ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ (الفتح : ২৯) অর্থ: মুহাম্মদ আল্লাহ তাআলার রাসূল এবং তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরষ্পর সহানুভূতিশীল।৩ তিনি ছিলেন, অনুকম্পার নবী, বীরত্বের নবী। হ্যাঁ মোমেনদের সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, لَقَدْ جএএসছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মোমেনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।৪
জারীর বিন আব্দুল্লাহ বাজালী রা. বলেন, আমরা সকাল বেলা রাসূল সা. এর নিকট অবস্থান করেছিলাম। ইতিমধ্যে নগ্ন পা, প্রায় উলঙ্গ এবং গলায় তলোয়ার ঝুলিয়ে মুযার গোত্রের সকল লোক অথবা বেশীর ভাগ নবী সা. এর কাছে উপস্থিত হলেন। নবীজী তাদের মধ্যে অভাব অনটন লক্ষ্য করে অস্থির হয়ে গেলেন। ভিতরে প্রবেশ করলেন, আবার বের হলেন। এর মধ্যে সালাতের সময় হলে বিলাল রা. কে আযানের আদেশ দিলেন। এবং সালাত কায়েম করে সাহাবাদের উদ্দেশ্যে এই মর্মে ভাষণ দিলেন, 'হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগনিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট আবেদন করে থাক এবং আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামীকালের জন্য সে কি প্রেরণ করে তা চিন্তা করা। আল্লাহ তাআলা কে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন। কোন ব্যক্তি দিনার, কোন ব্যক্তি দিরহাম, কেহ কাপড় কেহ গম কেহ খেজুর দান করলেন। নবী সা. বললেন, খেজুরের অংশ বিশেষ হলেও দান কর। বর্ণনাকারী বলেন, জনৈক আনসারী সাহাবীও খাদ্যের এক স্তুপ যা বহন করতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল, নিয়ে হাজির হলেন। অত:পর ধারাবাহিকভাবে মানুষ আসতেই থাকল। আমি খাদ্যের একটি এবং কাপড়ের একটি টিলা নবীজির সামনে দেখতে পেলাম। নবীজির মুখমন্ডল দেখলাম যেন স্বর্ণের পলকে আলোকিত হয়ে গেল। অত:পর রাসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি ইসলামে কোন ভাল রীতি প্রবর্তন করে, এই জন্য সে সাওয়াব পাবে। এবং তার পর তার এই রীতি অনুযায়ী কেহ কাজ করলে ঐ সাওয়াবও সে পাবে। তবে তাদের সাওয়াব হতে নূন্যতম কমানো হবে না।'
আল্লামা নববী রাহ: বলেন, নবী সা. খুশি হবার কারণ হল, সাহাবাদের দ্রুত আল্লাহর অনুগত্য করা, আল্লাহর জন্য তাদের সম্পদ দান করা, আল্লাহর রাসূলের আদেশ পালন করা, আগত অভাবী লোকদের অভাব দূর করা, মুসলমানেরা একে অপরের প্রতি সহানুভূতি দেখানো এবং ভাল ও নেককাজে সহায়তা করা, মানুষের উচিত এই জাতীয় কোন কিছুতে দৃষ্টি পড়লে খুশি হওয়া, আনন্দ প্রকাশ করা, এবং মানুষের খুশি-আনন্দ উল্লেখিত কারণেই হওয়া উচিত। আর আল্লাহর শত্রুদের সাথে এবং নবী সা: এর দুশমনদের সাথে ঘৃণা প্রকাশ করা, এ ব্যাপারে আল্লাহ তার নবী এবং তার অনুসারী সাহাবীদের সম্পর্কে বলেন: مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَأَزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا . (الفتح : ২৯) 'তাওরাতে তাদের অবস্থা এরূপ এবং ইঞ্জিলে তাদের অবস্থা যেমন একটি চারা গাছ। যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, অত:পর তা শক্ত ও মজবুত হয়। এবং কান্ডের উপর দাড়ায় দৃঢ়ভাবে। চাষীকে আনন্দে অভিভূত করে। যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের অর্ন্তজালা সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহা পুরষ্কারের ওয়াদা দিয়েছেন।'১
হুদায়বিয়ার সন্ধিতে রাসূল সা. যে সকল উট যবেহ করেছিলেন, তন্মধ্যে একটি ছিল আবু জাহেলের। উদ্দেশ্য ছিল তার মাধ্যমে মুশরিকদের অর্ন্তজ্বালা সৃষ্টি করা। আর এই উট বদর যুদ্ধে নবী সা. যুদ্ধলভ্য সম্পদ হিসাবে পেয়েছিলেন।২ এই ঘটনা হতে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম উদ্ধাবন করেছেন, আল্লাহ তাআ'লার শত্রুদের সাথে ক্রোধান্বিত হওয়া উত্তম।৩
উদ্দেশ্য হল আমরা নবী সা. এর নির্দেশনায় ব্যাপক এবং সার্বিক দিকে দৃষ্টি দিব। তিনি শুধু রহমতের নবী, উদারতার নবী, হৃদ্যতার নবী বলে আমরা মনে করবো না, তেমনি তার বিপরিতও মনে করবো না। বরং তার পবিত্র জীবনী হতে আমরা উভয় দিক গ্রহণ করব। এবং আল-ওয়ালা এবং আল-বারাকে প্রকৃত রূপ দান করবো। অনুরূপভাবে এই নীতি আমাদের জীবনে এড়াং মানুষের মধ্যে বিশ্বাসে, কথায়, কাজে আমরা বাস্তবায়ন করবো। আর এটা সম্ভব হবে, আল্লাহর কিতাব এবং নবী সা. এর সুন্নাতের সাথে সম্পৃক্ত হবার মাধ্যমে। ইতিহাস অধ্যয়ন করা, হক্ক এবং বাতিলের সংঘাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করা, এই উম্মতের পরিচয় এবং ধর্মকে নিঃশেষ করার শত্রুদের প্রতারণা ও চক্রান্ত উদঘাটন করা। আল-ওয়ালা এবং আল-বারাকে প্রকৃত রূপদানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যেমন আল্লাহর পথে দান করা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত বা হকুপন্থি লোকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই হোক তাদের খোজ-খবর নেয়া।

টিকাঃ
১ সুরা আল মায়েদাহ-৮০-৮১
২ আহমদ, হাকেম
১ আওসাক আল-ওরাল ঈমান : শায়খ সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ
২ মানলি আদাবিশরিয়া ১ম খন্ড
৩ সূরা: আল মায়েদা- ৫৫
১ আল হুজ্জাতু ফি বায়ানিল মাহাজ্জাহ ২য় খন্ড, ৪৮৭পৃষ্ঠা
১ মালেক: ১৫০৩, আহমাদ: ২১০২১ 'আল হুজ্জাতু ফি বায়ানিল মাহাজ্জাহ ২য় খন্ড, ৪৮৭পৃষ্ঠা
১ সূরা: আল ইমরান - ২৮
২ সূরা আল নিসা-১৪৪
৩ সূরা: আল মায়েদা- ৫১ (ইবনু কাসীর ১ম খন্ড: ৩৫৭)
১ সূরা: আন নিসা- ১০১

৩ সূরা আল বাক্বারা-১০৫
৪ সূরা আল বাক্বারা-১০৯
৫ সূরা আল মুলক-১৪
১ আহকামু আহলিজ্জিমা ১ম খন্ড:২৩৮
১ আল দুরারুস সুন্নিয়‍্যাহ: ৭ম খন্ড: ১৫৯
২ সূরা মায়েদা: ৫১
৩ আশ-শিফা:২য় খন্ড-১০৭১
৪ আল ওয়ালা ওয়াল আদাউ ফিল ইসলাম:২৩১
৫ আল ওয়ালা ওয়াল আদাউ ফিল ইসলাম:৬৮
১ সূরা: আল মায়েদা-৮০-৮১
২ সূরা আনফাল : ৭৩
৩ ইবনু কাসির ২য় খন্ড: ৩১৬।
৪ সূরা মারয়াম: ৪৯-৫০
১ সূরা হুদ: ১১৩
১ সূরা আল আনআম-১৯
২ সূরা আল আনআম: ৭৮
৩ সূরা আল মুমতাহিনা- ৪
১ সূরা আত তাওবাহ-১১৪
২ সূরা হুদ-৩৫
৩ তাইসিরুল কারিমির রাহমান- ৩৮১
১ সূরা ত্বোহা-৩৯
২ সূরা আল আনআম-৯০
৩ সূরা আল ফাতহ-২৯
৪ সূরা: আত তাওবা-১২৮
১ সূরা আল ফাতহ-২৯
২ যাদুল মাআ'দ ১ম খন্ড:১৩৪
৩ যাদুল মাআ'দ ২য় খন্ড-৩০১

📘 তাওহীদ ও আকাইদ 📄 আল্লাহকে দেখা এবং আল্লাহর অবতরণ বিষয়ক আকিদা

📄 আল্লাহকে দেখা এবং আল্লাহর অবতরণ বিষয়ক আকিদা


সিংগায় ফুঁক: ফুঁক দিবেন ফিরিস্তা ইস্রাফিল। বিশুদ্ধ মত হচ্ছে তিনি সিংগায় ফুঁক দিবেন তিনবার।
(১) نفخة الفزع ভীত বিহবল ফুঁক। যার বর্ণনা সূরা আন-নমলে এসেছে, আল্লাহ বলেন: وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللهُ (النمل: ৮৭) 'যেদিন সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, অতঃপর আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করবেন, তারা ব্যতীত নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যারা আছে তারা ভীতবিহবল হয়ে পড়বে।'
(২) সংজ্ঞাহীনতার ফুক: وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللهُ . (الزمر : ৬৮) 'সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে ফলে আসমান ও যমীনে যারা আছে সবাই বেহুশ হয়ে যাবে তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন।' এই ফুৎকারের মাধ্যমে সব কিছু ধ্বংস ও সকল জীবের মৃত্যু হবে এক মাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া।
(৩) পূণরুত্থানের ফুঁক: এ ফুঁকে মানুষ কবর হতে উঠবে আল্লাহ বলেন— ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ ﴿ الزمر : ৬৮ ﴾ 'অতঃপর আবার সিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তৎক্ষণাৎ তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে।'
শেষ দুই ফুঁকের মধ্যে দূরত্ব সম্পর্কে রাসূলের হাদীসে বর্ণনা এসেছে: ما بين النفختين أربعون (متفق عليه) 'দুই ফুৎকারের মধ্যে ব্যবধান চল্লিশ' তবে চল্লিশ বছর মাস দিন এ রকম কোন ব্যাখ্যা তিনি দেন নাই এ বিষয় আল্লাহ ভালো জানেন।
(৩) হাশর: মানুষ কবর থেকে দন্ডায়মান হওয়ার পর আরদে মাহশার (জমায়েতের স্থান) এর দিকে নিয়ে যাওয়ার নাম হাশর। وَحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ تُغَادِرُ مِنْهُمْ أَحَدًا ﴿كهف : ৪৭﴾ 'আমি মানুষকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।' قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ ﴿৪৯﴾ لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ ﴿৫০﴾ الواقعة 'বলুন; পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ সবাই একত্রিত হবে এক নির্দিষ্ট সময়ে।' দন্ডায়মানের সময় মানুষ প্রতক্ষ্য করবে যে তারা পরিবর্তিত পৃথিবীতে অবস্থান করছে। আল্লাহ বলেন— يَوْمُ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ وَبَرَزُوا اللَّهَ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ﴿৪৮﴾ إبراهيم 'যে দিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আকাশসমূহকে এবং মানুষ পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে পেশ হবে।'
এখানেই মানুষ অপেক্ষা করবে সিদ্ধান্ত ও রায়ের জন্য। এ স্থানেই হবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফাআত— শাফাআতে উজমা এই শাফাআতই হচ্ছে মাকামে মাহমুদ।
(৪) العرض আল-আরদু বা উপস্থাপন:
উপস্থাপন দুই রকমের হবে: (ক) সকল মাখলুককে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হবে। কারো হিসাব হবে, জিজ্ঞাসাবাদ হবে আবার অনেকের হবে না। আল্লাহ বলেন— وَعُرِضُوا عَلَى رَبِّكَ صَفًّا لَقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ (الكهف: ৪৮) 'তারা আপনার পালনকর্তার সামনে পেশ হবে সারিবদ্ধ ভাবে এবং বলা হবে তোমরা আমার কাছে এসে গেছ যেমন তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম।'
(খ) জাহান্নামকে কাফেরদের সামনে প্রদর্শন এবং কাফেরদেরকে জাহান্নাম প্রদর্শন। আল্লাহ বলেন— وَيَوْمَ يُعْرَضُ الَّذِينَ كَفَرُوا عَلَى النَّارِ أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا . (الأحقاف: ২০) 'যে দিন কাফেরদেরকে জাহান্নামের কাছে উপস্থিত করা হবে সেদিন বলা হবে, তোমরা তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই শেষ করেছ।' وَعَرَضْنَا جَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لِلْكَافِرِينَ عَرْضًا ﴿১০০﴾ الكهف 'সেদিন আমি কাফেরদের কাছে জাহান্নামকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করব।' রাসূল সলালাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেন— يؤتى بجهنم لها سبعون ألف زمام مع كل زمام سبعون ألف ملك يجرونها. (মুসলিম: ৫০৭৬) 'জাহান্নামকে সত্তর হাজার লাগামসহ উপস্থিত করা হবে। প্রত্যেক লাগামের সাথে সত্তর হাজার ফেরেস্তা থাকবে, তারা জাহান্নামকে টেনে আনবেন।'
(৫) জিজ্ঞাসাঃ হাশরের পর হবে জিজ্ঞাসা পর্ব, রাসূলগণও তাদের উম্মতদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও আমানত সম্পর্কে, জিজ্ঞাসা করা হবে উম্মতদেরকেও, আল্লাহ বলেন— فَلَنَسْأَلُنَّ الَّذِينَ أُرْسِلَ إِلَيْهِمْ وَلَنَسْأَلَنَّ الْمُرْسَلِينَ (الأعراف : ৬ ) 'আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রসূল প্রেরিত হয়েছিল এবং আমি অবশ্যই জিজ্ঞেস করব রাসূল গণকে।' আল্লাহ বলেন— فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ﴿ الحجر : ৯২ ﴾ 'অতএব আপনার পালন কর্তার কসম আমি অবশ্যই ওদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব।' এ জিজ্ঞাসাবাদ হলো সিদ্ধান্ত নেয়া ও নথিভূক্ত করার জন্য। অন্য আয়াতে এসেছে কাফেরদের জিজ্ঞেস করা হবে না। উভয় আয়াতের সমাধান হলো কিয়ামতে অনেক গুলো অবস্থান হবে, কোনটিতে জিজ্ঞেস করা হবে কোনটিতে হবে না।
(৬) হিসাব: হিসাব হলো সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে সৃষ্টিজগতের কৃতকর্মের ভালোমন্দের নির্দিষ্টকরণ এবং স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে তাদের ভুলে যাওয়া আমল কে। আল্লাহ তাআলা বলেন: يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا أَحْصَاهُ اللهُ وَنَسُوهُ (المجادلة : ৬) 'যে দিন আল্লাহ তাআলা সকলকে পুনরুত্থিত করবেন, অতঃপর তাদেরকে জানিয়ে দিবেন যা তারা করত। আল্লাহ তাআ'লা তার হিসাব রেখেছেন। আর তারা তা ভুলে গেছে।'
হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে মুমিনদের দুই ভাগ করা হবে। (১) বিনা হিসাব এবং বিনা বিচারে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেমনটি সত্তর হাজার এবং তাদের মতো আরো যারা আছে তাদের সম্পর্কে হাদীসে প্রমাণ আছে। (২) যাদের হিসাব হবে, এরা হল যাদের নেক আমল ও বদ আমলে মিশ্রণ হয়েছে। আর কাফিরদের হিসাব, তাদের কাছে তাদের আমল উপস্থিত ও তাদেরকে ভৎসর্না করার মাধ্যমে হবে। আর এ হিসাব হবে তাদের শাস্তির স্তর বর্ণনার জন্য। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য নয়।

টিকাঃ
১ আন নামল-৮২
২ সূরা: আন-নামল: ৮৭
৩ সূরা: আযযুমার: ৬৮
১ সূরা: যুমার: ৬৮
২ মুত্তাফাকুন আলাইহি
৩ কাহাফ: ৪৭
৪ সূরা: ওয়াক্বিয়া - ৪৯-৫০
৫ ইব্রাহীম : ৪৮
১ সূরা: কাহফ- ৪৮
১ সূরা: আহক্বাফ- ২০
১ সূরা: কাহফ- ১০০
২ মুসলিম: ৫০৭৬
৩ সূরা: আল-আরাফ-৬
৪ সূরা: হিজর- ৯২
১ সূরা: মুজাদালাহ - ৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px